গল্প

জাতক ও জন্মভূমি

সাব্বির জাদিদ

 

তৃতীয় সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে নাসরিন সুলতানা ঠেকে গেল।

নাসরিন সুলতানার ডাকনাম ছলনা। নামটা রেখেছিল তার মা। মায়ের নিশ্চয় ছলনা শব্দের অর্থ তখন জানা ছিল না। থাকলে যে নামে মেয়ে বিব্রত হবে সে নাম তিনি রাখতেন না। বড় মেয়ে তুলনার সাথে মিলিয়ে তিনি এই নামটা পছন্দ করেছিলেন। ছোটবেলায় নিজের নাম নিয়ে কখনও মাথা ঘামায়নি ছলনা। কিন্তু কলেজে ওঠার পর ছেলেরা যখন নাম নিয়ে খোঁচাতে শুরু করল- ছলনা শুধু ছলনা করে- তখন সে অস্বস্তিতে পড়ে। সেই থেকে নতুন পরিচিত হওয়া যে-ই তার নাম জিজ্ঞেস করেছে, সে ভালো নামটা বলেছে- নাসরিন সুলতানা।

নাসরিন সুলতানা যেহেতু চায় না- কেউ তাকে ছলনা নামে ডাকুক, আমরাও এই নামে তাকে আর ডাকব না। উচ্চারণে একটু সময় লাগলেও আমরা তাকে নাসরিন সুলতানা সম্বোধনেই ডাকব। এতে সে খুশি হবে।

নাসরিন সুলতানা সন্তানসম্ভাবা। এবারই প্রথম নয়। এর আগে সে দুই মেয়ের মা হয়েছে। টুম্পা আর ঝুম্পা। দুই মেয়ের মা হওয়ার পর তৃতীয় সন্তান নিতে চায়নি সে। কিন্তু জহুরুল ইসলামের একটা ছেলে চাই। অভাবের সংসারে বড় হওয়া জহুরুল ইসলামের বৈষয়িক সাফল্য উজ্জ্বল নয়। পেশায় সে মুদি দোকানি। দোকান থেকে যা আয় হয় মোটামুটি চলে যায় সংসার। নিজে বড় হতে পারেনি বলে ছেলেকে বড় বানাতে চায়। ছেলের ভেতর দিয়ে নিজের পূরণ না-হওয়া স্বপ্নটা বাস্তবায়ন করার ইচ্ছা। স্বামীর স্বপ্ন পূরণে তাই ছেলের আশায় আরেকবার ঝুঁকি নিতে বসেছে নাসরিন সুলতানা। মেয়েদুটো স্কুলে চলে গেলে নাসরিন যখন ঘরে একা হয়ে যায়, বাতাসভর্তি বেলুনের মতো ফুলে ওঠা পেটটায় আদুরে হাত বুলায়। কখনও আহ্লাদ করে কথাও বলে এখনও পৃথিবীর মুখ না-দেখা সন্তানের সাথে- কী রে বাবু,  এবার তুই ছাওয়াল হবি তো! তুই যদি ছাওয়াল না হোস তোর বাপ কিন্তু খুব মন খারাপ করবে। বাপের দিক তাকা তুই ছাওয়াল হ। কী, হবি তো!

নাসরিন সুলতানার মনে হয়, ছেলের আশায় এই যে তৃতীয়বার সে সন্তান জন্ম দিতে চলেছে, এ যেন নদীতে বঁড়শি অথবা জাল ফেলা। জেলে যখন নদীতে জাল ফেলে, তার মনের ভেতর নিশ্চয় বাজারের চড়া দামের নির্দিষ্ট কিছু মাছের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু জেলের স্বপ্ন কি সব সময় পূরণ হয়! হয় না। নাসরিন নদীর পারের মেয়ে। যেখানে সে বড় হয়েছে, সেই গ্রামের বুকের ঠিক মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে কিশোরীর চুলের ফিতের মতো চিকন একনদী। নাসরিনের বড়ভাই ফারুকের ছিল মাছ ধরার নেশা। বঁড়শি দিয়ে কালী নদীতে মাছ ধরত। মাছের খোলই ধরে রাখার জন্য প্রায় দিন সঙ্গে যেত কিশোরী নাসরিন। ফারুক ভাইয়ের লক্ষ্য থাকত টেঙরা মাছ। এজন্য সে গ্রামময় ঘুরে ঘুরে বোলতার বাসা ভেঙে ডিম সংগ্রহ করত। বোলতার ডিম টেঙরা মাছের পছন্দের খাবার। বোলতার ডিম সে বড়শির আগায় গেঁথে পানিতে ফেলে ফাতনার দিকে তাকিয়ে থাকত শকুন-চোখে। তাকিয়ে থাকত নাসরিনও। তবে শকুন-চোখে নয়, কিশোরীর কৌতূহলী চোখে। মাছ বড়শিতে ঠোঁক দিলে ফাতনা নড়ে উঠত। তখন খুব কৌশলে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ছিপ ধরে টান দিতো ফারুক ভাই। একবার পেছনে খোলই হাতে দাঁড়িয়ে থাকা নাসরিনের কানে বিঁধে গিয়েছিল পানির ভেতর থেকে বিজলির বেগে ছুটে আসা বঁড়শি। কান ফুটো হয়ে গিয়েছিল। কী ভয়ানক রক্তারক্তি অবস্থা। টানা তেরো দিন সে কানের ব্যথায় ভুগেছিল। ফুটো হয়েছিল ডান কান বলে সে দীর্ঘদিন ডানকাঁধে ঘুমাতে পারেনি। একপাশ হয়ে শুতে শুতে তার বাঁ-পাশটা ব্যথা হয়ে গিয়েছিল। প্রতিজ্ঞা করেছিল, আর কোনোদিন ভাইয়ের সাথে মাছ ধরতে যাবে না। কিন্তু তার প্রতিজ্ঞা ছিল নিছক মুরগির প্রতিজ্ঞা। মুরগি ঝোড়ে জঙ্গলে পায়খানা খায়। পায়খানা খায় আর মাটিতে ঠোঁট মুছে ওয়াদা করে, আর কোনোদিন গু খাব না। পরক্ষণে সে দ্বিতীয় ঠোঁক দেয় গুয়ের দ্বিতীয় দলায়। নাসরিনের কান যখন ভালো হয়ে উঠল, ভুলে গেল অসুস্থতার নির্ঘুম রাতগুলোর কথা। সে এক সকালে সতেজ হয়ে উঠে বলল, মিয়েভাই, যাবিনে মাছ ধত্তি!

কান ফুটো হওয়ার আগে পরে অনেকদিন মিয়েভাইয়ের সাথে মাছ ধরতে গেছে নাসরিন। মিয়েভাই টোপ ফেলেই বলত, দেখিস ছলনা, এইবার মস্তবড় ডিমওয়ালা টেঙরা বাঁধবে। মিয়েভাইয়ের কথা শেষ হতো না, দেখা যেত বঁড়শির সাথে উঠে এসেছে দীর্ঘদিন খেতে না পাওয়া রোগ-শোকা এক পুঁটিমাছ। পুঁটি দেখে মন খারাপ হয়ে যেত ফারুক ভাইয়ের। মন খারাপ হতো নাসরিনেরও। নাসরিন এবার পাহাড়ি নদী নয়, বঁড়শি ফেলেছে তার দেহের নদীতে। টেঙরা মাছের আশায়। টেঙরা কি বাঁধবে! নাকি এবারও পুঁটি মাছ পেয়ে ফারুক ভাইয়ের মতো তার মন খারাপ হবে!

রাতে দোকান বন্ধ করে জহুরুল ইসলাম ঘরে ফিরলে ভাত খেতে খেতে নাসরিন তার ভয়ের কথাটা বলেÑ এইবারও যদি মিয়া হয়!

জহুরুল সজনের ডাটা চিবাতে চিবাতে বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে, হবিনেন, হবিনেন। এইবার ছাওয়ালই হবি, আমি কয়ে দিলাম। গরিব শাহ মাজারে মোরগ মান্নত করিচি। বাবার দয়া থাকলি ছাওয়াল হওয়া কেউ ঠ্যাকাতি পারবিনেন!

আমার ভয় করে। তুমার আশা যদি পূরণ কত্তি না পারি!

চিন্তা করো না তুমি। কয়মাস যিন চলছে?

ক্যান, তুমার মনে নি?

ভুলে গিছি।

হায়রে আমার বাপ! সাতমাস চলে।

এইবারও তো বাড়িতিই হবি, কী কও?

সুমায় তো আসুক। তখুন দেখা যাবি।

টুম্পা আর ঝুম্পার জন্য হাসপাতালে যেতে হয়নি। নাসরিন শক্ত মেয়ে। তার মাও ছিল শক্ত। নাসরিনরা পাঁচ ভাইবোন। পাঁচ পাঁচটা সন্তান জন্ম দিয়েছে মা, পেট কাটতে হয়নি। অবশ্য তখন পেটকাটার এত প্রচলনও ছিল না। নাসরিন মায়ের গুণটা ভালোমতো পেয়েছে। টুম্পা ঝুম্পা হওয়ার সময় বলতে গেলে সে টেরই পায়নি। পায়খানা কষা হলে একটু কোঁত দিতে হয়। নাসরিন কষা পায়খানার মতো একটা কোঁত দিয়েছে, টুম্পা হয়েছে। আরেকটা কোঁত দিয়েছে, ঝুম্পা হয়েছে। আশা করা যায়, এবারও সে একটা কোঁত দিয়ে স্বামীর স্বপ্ন পূরণকারী ছেলেটাকে পয়দা করে ফেলবে। কারণ, হাসপাতালে গিয়ে পেট কেটে বাচ্চা বের করতে গেলে কমছে কম হাজার দশেক টাকার মামলা। একটু কষ্ট করে যদি স্বামীর দশটা হাজার টাকা সে বাঁচিয়ে দিতে পারে, মন্দ কী! টাকাটা হাসপাতালে না গিয়ে সংসারে লাগুক, সেটাই তো উত্তম। তাছাড়া সখীপুরে রতনের মা নামে অভিজ্ঞ এক দাই আছে। এই কাজে সে পঁয়ত্রিশ বছর। জহুরুলও হয়েছে রতনের মায়ের হাতে। এখন পর্যন্ত তার ভুলে একটা মা কিংবা একটা বাচ্চার ক্ষতি হয়েছে, এমন কথা কেউ বলতে পারবে না। ধারণা করা হয়, রতনের মা যতদিন বেঁচে আছে, সখীপুরের বউদের হাসপাতালের বারান্দা মাড়ানোর দরকার পড়বে না। গরিব স্বামীরা তাই রতনের মায়ের লম্বা হায়াতের জন্য উঠতে বসতে দোয়া করে।

কয়েকদিন আগে জহুরুল গিয়েছিল রতনের মা’র বাড়িতে, বউয়ের অবস্থা জানাতে। বুড়ির স্মরণশক্তি খুবই প্রখর। দৃষ্টিশক্তিও। বয়স সত্তর পেরিয়ে গেলে কী হবে, চশমা লাগে না। নিজের কাজ নিজেই করে। পানের নেশা। সব সময় তার ঠোঁটে পানের লালা লেগেই থাকে। রতনের মা জহুরুলকে দূর থেকে দেখেই চিনে ফেলে। পানের পিক ফেলে বলে, হ্যাতনেয় (বারান্দায়) উঠে বস। তা এত আগে আগে আইছিস ক্যাঁ! এখুনু তো দ্যাড়মাস বাকি।

জহুরুল অবাক হয়ে বলে, দ্যাড়মাসের খবর আমি জানিনে, তুমি ক্যাম্মা জানলে, রতনের মা!

বুড়ি এবার হাসে। হাসির ধাক্কায় তার কুঁচকানো চেহারা আরো কুঁচকে যায়। গালের কোণা দিয়ে পানের লাল পিক গড়িয়ে পড়ে অনিচ্ছায়। ন্যাকড়া হয়ে ওঠা ফ্যাকাশে শাড়ির আঁচল দিয়ে গাল মুছে সে বলে, এককুড়ি পনেরো বছর ধরে কাম করছি। প্যাট দেকলিই বুঝতি পারি কার কয় দিন।

বউডা পুয়াতি, তুমার মাথায় যিন থাকে সেই জন্নি আগে আগে কতি আইছিলাম। কিন্তু এখুন দেখছি আমাচ চে’ তুমিই বেশি জানো।

চিন্তা করিসনে জহুরুল। আমি সুমায় মতো হাজির হয়ে যাব।

আল্লাহ তুমাক একশ বছর বাঁচা রাখুক। তুমার জন্নি আমাগের গিরামের বউসগল প্যাটকাটার দায় থেকে বাঁচছে। আর আমরা বাঁচছি পয়সা খরচের ঝক্কি থেকে।

নাসরিন সুলতানার ব্যথা উঠল আষাঢ়ের এক ঝমঝম বৃষ্টির বিকেলে। সেই আষাঢ়ে বলতে গেলে বৃষ্টিই ছিল না। ঝাঁ ঝাঁ রোদ। মানুষেরা একফোঁটা বৃষ্টির জন্য দাপাদাপি করছিল। রসিকজনেরা বলছিল, ম্যাগ মনে হয় আষাঢ় মাসের কতা ভুলে গেছে। ম্যাগের কাছে এট্টা বাঙলা ক্যালেন্ডার পাঠালি ক্যামুন হয়! এইসব ঘটনার ভেতর যেদিন আকাশ ফেটে বৃষ্টি নামল, সেদিনই ব্যথা উঠল নাসরিনের। মাকে বউয়ের কাছে রেখে কালো ছাতা মাথায় জহুরুল ছুটল রতনের মা’র বাড়ির দিকে। কিন্তু আজব ব্যাপার, বাড়ি পর্যন্ত যেতে হলো না। পথেই পাওয়া গেল রতনের মাকে। একটা জামগাছের নিচে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে। সে জহুরুলের বাড়িতেই আসছিল। কিন্তু বুড়ি মানুষ। রাস্তায় কাদা। পেতলের পানের বাটা নিয়ে একটানা হাঁটতে পারছিল না বলে জামগাছের নিচে সাময়িক যাত্রা-বিরতি। জহুরুল তাড়াতাড়ি পানের বাটা নিজ জিম্মায় নিয়ে রতনের মাকে পেছন পেছন আসতে বলল। বাড়িতে পৌঁছে গামছায় মুখ-মাথা মুছে রতনের মা কাজে নেমে পড়ল। জহুরুল বৃষ্টির ছাঁট আসা বারান্দায় অস্থির ছন্দে হাঁটাহাঁটি করতে লাগল। অনেকদিন পরের বৃষ্টি, চারপাশ কেমন ঠান্ডা, এর ভেতর জহুরুল অল্প অল্প ঘামছে। টুম্পা আর ঝুম্পা নিজেদের ঘরে। ওদের চেহারায় ভয়। একটু একটু লজ্জা।

রতনের মা’র কাজ শেষ হতে সময় লাগে বিশ মিনিট। টুম্পা আর ঝুম্পার বেলায় এমনই হয়েছিল। জহুরুলের মনে আছে। কিন্তু এইবার একঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও আঁতুড়ঘরের দরজা না খুললে জহুরুলের ঘামাঘামি বেড়েই চলে। অস্থির জহুরুল বাচ্চার কান্না শোনার আশায় একটু পরপর দরজায় কান পাতলে বউয়ের গোঙানি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো শব্দ শুনতে পায় না। জহুরুলকে দুশ্চিন্তার সাগরে চুবিয়ে চুবিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা পর রতনের মা হতাশ চেহারায় দরজায় খোলে। জানায়- নাসরেিনর পেটে আটকে গেছে বাচ্চা। ইমাম সাহেবের পড়া পানি খাওয়ালে আটকা পড়া বাচ্চা ছাড়া পেতে পারে।

বৃষ্টি তখনো পড়ছে। এই জনমে আর থামবে বলে মনে হয় না। সেই বৃষ্টির ভেতর জহুরুলকে আবার ছুটতে হয় মসজিদের দিকে, ইমাম সাহেবের পড়া পানি আনতে। তখন মাত্রই ইশার নামাজ শেষ হয়েছে। ইমাম সাহেব মসজিদ লাগোয়া কামরায় খেতে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তখন হাজির জহুরুল। ভেজা কাক। জহুরুলের চেহারা দেখে ইমাম সাহেব খাওয়া স্থগিত রেখে দোয়া লেখার কাজে হাত লাগান। বেশ চটপট তিনি জাফরানের পানি দিয়ে চিনামাটির প্লেটে একটা দোয়া লেখেন। সেই প্লেটধোয়া পানি নাসরিনকে খেতে বলেন। নাসরিনকে জাফরানের পানি খাওয়ানো হয়। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। নাসরিন ক্রমেই তলিয়ে যেতে থাকে নির্জীবতার সাগরে। তখন রতনের মা পরাজয় শিকার করে নাসরিনকে হাসপাতালে নিতে বলে। এককুড়ি পনের বছরের কর্মের অভিজ্ঞতায় এটাই কি বুড়ির প্রথম পরাজয়! জহুরুল অতো ভাবতে পারে না। তার মাথায় এখন হাসপাতালের খরচ আর নাসরিনকে হাসপাতালে নেয়ার মতো বাহনের চিন্তা। এই বৃষ্টির রাতে গ্রাম থেকে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দূরে জেলা শহরের হাসপাতালে কিভাবে নেয়া হবে নাসরিনকে! তখন জহুরুলের মনে পড়ে ছিয়ামের কথা। ছিয়াম নসিমন চালায়। জহুরুলের দোকান থেকে নিয়মিত বাকিতে সদাইপাতি করে। সম্পর্ক ভালো। ছিয়ামকে ধরলে নিশ্চয় ফেলতে পারবে না অনুরোধ। ছিয়ামের বাড়ি যেতে যেতে হঠাৎ কেন যেন নাসরিনের মুখটা দেখতে ইচ্ছা করে জহুরুলের। মাথার পাশে বসে বউয়ের ঘেমে ওঠা কপালে হাত বুলাতে ইচ্ছা করে। তৃতীয় সন্তান নেয়ার সায় ছিল না নাসরিনের। জহুরুলের হঠকারিতায় মিনিকেট চালের মতো ঝকঝকে মেয়েটার আজ মরণদশা।

ছিয়াম প্রথমে রাজিই হয় না হাসপাতালে যেতে। কারণ, শহরের অবস্থা ভালো না। এই কিছুদিন আগে ঢাকায় জঙ্গি হামলা হয়েছে। নড়ে উঠেছে সারা দেশ। সবখানে পুলিশের কঠিন পাহারা। পুলিশ দেখলে ছিয়ামের ভয় করে। যতটা না নিজের জন্য ভয়, তারচেয়ে বেশি ভয় নসিমনটার জন্য। যদি আটকে দেয়! তার রিজিক বন্ধ হয়ে যাবে। ছিয়াম তাই রাজি হয় না যেতে। কিন্তু জহুরুলের জোরাজুরি আর তার অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে শেষমেশ রাজি হয় সে। সেই ঝুম বৃষ্টির রাতে বাড়িতে দুই মেয়েকে রেখে মাকে সঙ্গে নিয়ে ছাওয়ালের বাপ হওয়ার ইচ্ছায় জহুরুল সদর হাসপাতালের দিকে যাত্রা করে। যাত্রাপথে বড় দুই ভাই মনিরুল আর তরিকুলের প্রতি কৃতজ্ঞতায় চোখে পানি এসে যায় জহুরুলের। কারণ, এই বিপদের দিনে বড় ভাইদুটো টাকা ধার দিয়ে সাহায্য না করলে বউটা তার অচিকিৎসায় মারা যেত। মানুষের বুক থেকে দয়ামায়া এখনও মুছে যায়নি ভাবতে ভাবতে ছিয়ামের নসিমন শহরের উপকণ্ঠে প্রবেশ করে। আর তখন জহুরুল বড় বড় চোখে খেয়াল করে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশ। জহুরুল বহুদিন শহরে আসে না। পুলিশমোড়া শহর তার অপরিচিত। প্রশ্ন জাগে, এখনকার শহর কি সব সময় পুলিশের চাদরে মুড়িয়ে থাকে! নাকি শহরের কিছু হয়েছে! জহুরুলের উৎকণ্ঠা আর কৌতূহলমাখা চেহারা চোখ এড়ায় না ছিয়ামের। ছিয়াম সবজান্তার হাসি হেসে জঙ্গিবাদের সমস্যার কথা জানায় জহুরুলকে। এটা শোনার পর স্বাভাবিক ছিল নিজের জন্য জহুরুলের ভয় পেয়ে ওঠা। কিন্তু নিজের জন্য নয়, জহুরুলের দুশ্চিন্তা হয় বউয়ের পেটের বাচ্চাটার জন্য। কোন্ কুক্ষণে সে সন্তান নিতে বসেছে! এই জন্যই কি অভিমানে কিংবা ভয়ে মায়ের পেট থেকে বের হতে চাইছে না তার সন্তান! যেটা ঝুম্মা এবং টুম্মার বেলায় হয়নি!

সেই রাতে জরুরি বিভাগে কোনো ডাক্তার ছিল না। নাসরিনকে মা হওয়ার জন্য সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। বউয়ের মরে যাওয়াটা জহুরুল এবার নিশ্চিত হয়ে যায়। শুধু শুধু বউকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করা হলো। এরচে’ বাড়িতে থাকলেই বউটার শান্তিময় মরণ হতো। সে ভাবে। সে মায়ের হাত ধরে শিশুদের মতো ভেউভেউ করে কেঁদে ওঠে- একুন তালি কী হবি, মা!

অবুঝ ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে মা বলে, আল্লরে ডাক বাপ। আল্লার রহমত থাকলি কিছুই হবিনেন।

মায়ের কথাই সত্য হয়। কেয়ামতময় সেই রাতটা নাসরিন দাঁতে দাঁত পিষে পার করে দেয়। ব্যথার তীব্রতায় বারবার সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কিন্তু হেরে যায় না জীবনের কাছে। সে ভাঙে কিন্তু মচকায় না। জহুরুল অবাক হয়ে ভাবে, মা হতি এত জ্বালা!

পরদিন সকালে ইমার্জেন্সিতে ভর্তি হয় নাসরিন। তার তলপেট কাটা হয়। অভিজ্ঞ ডাক্তার রোগীর জরায়ুর ভেতর সম্পূর্ণ নতুন জিনিস লক্ষ্য করেন। জরায়ুর ভেতর উল্টে আছে ছেলে শিশু। উল্টে অনেক শিশুই থাকে। কিন্তু এই শিশু শুধু উল্টে নেই, সে দুইহাতে জরায়ুর পর্দা খামচে ধরে আছে। ভাবটা এমন, মায়ের কোল ছেড়ে সে বেরোবে না। চেহারাজুড়ে কেমন আতঙ্ক। ডাক্তারের গ্লাভ্স পরা হাত আলতো স্পর্শে শিশুটাকে বের করে আনতে চায়। কিন্তু শিশু খামচে ধরে থাকে জরায়ুর পর্দা। এবং তার কচি চেহারায় ফুটে ওঠে ভয়ের আভা। অপরিচিত কেউ হঠাৎ এসে মায়ের কোল থেকে বাচ্চা কেড়ে নিতে গেলে এমন ভয়ের ভাবটা প্রায় প্রত্যেক বাচ্চার চেহারায় ফুটে ওঠে। একবার দু’বারের পর ডাক্তার যখন জোর খাটিয়ে বাচ্চাটাকে বের করেন, চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। আর ঠিক তখন হাসপাতালের গেটে প্রচণ্ড শব্দে একটা বোমা বিস্ফোরিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares