গল্প : হাবিবুল্লাহ ফাহাদ

গল্প

গণক

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ

 

অর্ধেক কলা ছিলে টিয়ার খাঁচায় দিয়ে তাকিয়ে আছে মবিন। টিয়াটা বাঁকানো ঠোঁটে ঠোকর বসাচ্ছে কলায়। একটা করে ঠোকর দিয়ে মাথা তুলে এদিক-সেদিক দেখে আবারও ঠোঁট বসাচ্ছে কলায়। কয়েক মুহূর্তে কলাটার গায়ে ছোটো ছোটো গর্তে ভরে গেছে। খাঁচার ভেতরের লাঠিটা থেকে নেমে নিচে রাখা পানিতে ঠোঁট ভিজিয়ে আবার উপরে উঠে এল পাখিটা। মবিন খুব মনযোগে পাখির খাওয়া দেখছে।

দীর্ঘ আট বছর মবিনের সঙ্গে থাকা এই পাখিটার একটা নামও আছে। কুটুম। কুটুমই বটে। এক দুপুরে, পুকুর থেকে গোসল শেষে বাড়ি ফিরছিল মবিন। পথে একটা টিয়ার ছানাকে মরার মতো পড়ে থাকতে দেখে সে। ভেবেছিল হয়তো গাছের উপর থাকা বাসা থেকে ছিটকে পড়েছে নিচে। কিন্তু উপরে তাকাতেই মবিনের চোখে পড়ল আম গাছটার ডালে থাকা একটি চিল চোখ তাক করে তাকিয়ে আছে নিচে পড়ে থাকা ছোট্ট টিয়া’র দিকে। সে বুঝতে পারে ছানাটাকে হয়তো মায়ের বুক থেকে ছিনিয়ে এনেছে চিলটা। মরেনি। পরম মায়ায় মবিন তাকে তুলে বাড়ি নিয়ে আসে। ছেলের হাতে টিয়ার ছানাটা দেখে মজিরন জানতে চায়, এ ছানা তুই কোথায় পেলি বাপ?

ওই তো উঠোনের কোণায় পড়েছিল। চিলে ধরে এনেছে। পাখির ছানার প্রতি ছেলের দরদ দেখে খুশিতে মনটা ভরে ওঠে মজিরনের। হওয়ারই তো কথা। মবিনের বাবা ছিলেন বক শিকারি। ফাঁদ ফেলে বক শিকার করতেন। শেষ বয়সে এক চোখ নিয়ে পৃথিবী ছেড়েছে আতোয়ার। মারা যাবার দু’বছর আগে একবার হাওরের বিলে বক মারতে গিয়ে চোখ খুইয়ে এসেছিল সে। বকে ঠোকর দিয়ে তুলে নিয়েছিল বাঁ-চোখের মনি। তারপরও তো বক মারা বন্ধ হয়নি। তার সংসার চলতো পাখি শিকার করে। আজ পাখির ছানার জন্য ছেলের দরদ দেখে মা তো খুশি হবেই।

মজিরন ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে বলে, বেটা আমার কুটুম নিয়া এসেছে ঘরে। কুটুমের যত্ন-আত্তি করতি হবি। ও, বাপ দাও দেখি এদিক। দেখি তো ছানাটার কী হাল?

মবিন মায়ের হাতে তুলে দেয় কুটুম। তারপর চলে মা-ছেলের যতœ-আত্তি। মাসের পর মাস খুলুর খুলুর কাশিতেও যে মানুষটা বদ্যি বাড়ির সীমানায় যায়নি, সেই মজিরন এবার ছুটেছে পাঞ্জু খা’র উঠোনে। শুধু টিয়াছানাটার জন্য। কবিরাজ পাঞ্জু খা’র কথামতো, গাছ-গাছলা বেঁটে পাখিটার গায়ের ক্ষতস্থানে দিনের পর দিন লাগিয়ে অনেকটা সারিয়ে তুলেছে। কুটুমের যত্ন-আত্তিতে এতটুকু কমতি হয়নি। মবিনও ইস্কুলে যাওয়া বাদ দিয়ে ফড়িং ধরে এনেছে কুটুমের জন্য। ইস্কুল কামাই দেয়ায় মজিরন দু-একবার শক্ত করে বকে দিয়েছে ছেলেকে। ‘আরে বাপ আমি আছি ক্যান? ওর জন্যি ফড়িং লাগবে না ঘাস পোকা ধরা লাগবি, তা আমি বোঝবো। ইস্কুল কামাই দিয়ে মাঠে মাঠে তোমার ফড়িং ধরতি হবি ক্যান?’ মায়ের কথা মাথা নিচু করে শুনেছে মবিন। তারপর ইস্কুল কামাই দেয়নি আর। প্রাইমারি পাস দিলেও হাইস্কুল পাস দেয়ার আগেই ইস্কুল ছেড়েছে। উপায় ছিল না। মা অসুস্থ। সংসারে এই দুটো প্রাণি। অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা করা সংসার চালানোর জন্য তো টাকা দরকার। তাই হাইস্কুলে পড়ার বয়সে সে আয়ে নেমে পড়ে।

আয়ের জন্য শহরে এসেছিল মবিন। সঙ্গে ছিল তার পোষা কুটুমও। ওইটুকু ছেলেকে কে কাজ দেবে। মস্ত শহর ঢাকা। চেনাজানাও নেই। প্রথম কয়েকদিন গুলিস্তানে বঙ্গভবনের উল্টো দিকের পার্কের বেঞ্চিতে রাত কেটেছে তার। কাজের সন্ধান মেলেনি। এই শহরে ঘুরতে ঘুরতে একদিন রাস্তার পাশে এক গণককে চোখে পড়ে যায়। রাস্তার ওপর মাদুর বিছিয়ে তার ওপর অসংখ্য লাল-নীল বর্ডারের সাদা খাম রাখা, পাশের একটা খাঁচায় দুটো টিয়া, তার পাশে মানুষটা বসা। মবিন লোকটার কাছাকাছি ফুটপাতে বসে মন দিয়ে তার কাজ দেখে। কেউ একজন এলে খাঁচা খুলে একটা লম্বা লাঠি ভেতরে দেয়। লাঠির ডগায় টিয়া বসলে তাকে বের করে এনে ছেড়ে দেয়া হয় মাদুরে থরে থরে সাজানো খামের ওপর। টিয়াটি একটু আগে-পিছে হেঁটে ঠোঁট দিয়ে একটা খাম তুলে আনে। লোকটা সেই খাম খুলে তার মধ্যে থাকা চিরকুটটা পড়ে শোনান খদ্দেরকে। মাঝেসাঝে হাতের তালু দেখেও গল গল করে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ বলে দেয় লোকটা। অবাক হয় মবিন। টিয়া দিয়ে ভাগ্য গণনার এই কাজ তার ভালো লাগে। একজন লোক কীভাবে এত মানুষের ভাগ্য জানে? খদ্দেররাও বেশ বিস্ময় নিয়ে চেয়ে থাকে গণকের চোখের দিকে। গণক বলতে থাকে, আপনার ভাগ্য ভাল। ধৈর্য্য ধরে থাকলে উন্নতি নিশ্চিত। তয় উন্নতির পথে কয়েকজন শত্রু আছে। এরা আপনার বন্ধুরূপী শত্রু। গলায় গলায় পিরিত, ভেতরে ভেতরে আপনার ক্ষতি করতাছে। এদের ব্যাপারে সাবধান থাকবেন। মনের কথা, ঘরের কথা পরের কাছে বলবেন না। ঘরের স্ত্রীর কাছেও সব কথা খুইলা বলবেন না। ক্ষতি হইতে পারে। মহিলা থেকে সাবধানে থাকবেন। কারণ, আপনার ক্ষতি যে করার চেষ্টা করতাছে  সে একজন মহিলা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রায় সবাইকে একই কথা বলে গণক। কিন্তু তারপরও মানুষগুলো মন দিয়ে গণকের কথা শুনে এমনভাবে মাথা নাড়ায় যেন সব নিজের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। একেক জন ভাগ্য গুনে যাবার সময় পকেট থেকে পাঁচ টাকার নোট বের করে দিয়ে যাচ্ছে। কী অদ্ভুত এই শহর। আচ্ছা এই শহরের সবার ভাগ্যই কি তবে এক? সবার পেছনেই কি বন্ধুরূপী শত্রু আছে? চিন্তা করে মবিন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকে বসে থাকতে দেখে গণক একবার জানতে চেয়েছিল, তোমার বাড়ি কই?

কুষ্টিয়ার কুমারখালি। জবাব দেয় মবিন।

এইখানে থাকো কই?

থাকার জায়গা নাই। যেখানে রাতই সেখানেই কাইত।

এই শহরে ক্যান আইছো? তোমার আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত কেউ কি আছে?

না কেউ নাই। কাজের জন্য আয়েছি। কিন্তু কাজ তো পাই না।

হে হে হে কী যে কও মিয়া। এইখানে কাজ কেউ কাউরে দেয় না। কাজ খুঁইজা লইতে হয়। কুটুমের দিকে চোখ যায় গণকের। আঙুল উঁচিয়ে বলে, পাখিটা তোমার লগে থাকে সব সময়?

আমার পোষা টিয়া।

কাজ তো তোমার হইয়্যা গেছে।

কেমনে, কে দেবে কাজ?

এই যে তোমার টিয়া। পারবা না?

কী করতে হবে?

আমার মতো মানুষের ভাগ্য দেখবা

কিন্তু আমি তো কিছুই জানি না।

জানা লাগবো না। আমি তোমারে সব শিখায়ে দেবো।

শোনো বাপ, ডান হাত হইতাছে কর্মের হাত। এ হাতের রেখা খুব ঘন ঘন বদলায়। বাম হাতের রেখা মোটামুটি ঠিক থাকে। সহজে বদলায় না। যারা ডান হাতে কর্ম করে তাগো ডান হাতই বেশি দেখতে হয়। আর যাগো বাম হাতে কর্ম  তাগো ভাগ্য দেখবা বাম হাতে। তয় তাগো বাম হাতের রেখা ঘন ঘন বদলায়। নারী, পুরুষ সবার বেলায় একই। গুরুদীক্ষা চলল কয়েকমাস। তারপর শিষ্য নিজেই বসল গুলিস্তান পার্ক ঘেষা ফুটপাতে। বয়স কম তাতে কি। বয়স নয়, বিদ্যা মানুষকে বড় করে- গুরু গণক ইদরিস মিয়ার কথা মনে রেখে হাতের পর হাত দেখে যায় মবিন। তবে এই গণনা কাজের কিছু গোপন কথাও আছে। দীক্ষা যেদিন শেষ সেদিন ইদরিস তার মাথায় হাত রেখে শপথ করিয়ে বলেছে, আপন সাধন কথা না কইবা যথাতথা। সে কথা রেখেছে। এখন পর্যন্ত কাউকে বলেনি। কারণ ওই গোপন সাধন তত্ত্বে ভর করে আছে তার রুটিরুজি। টিয়া দিয়ে ভাগ্য গণনা আর হাত দেখায় সে এতটাই পারদর্শী হয়ে ওঠে যে, মানুষের চোখ-মুখ দেখলে অর্ধেক কথা বলে দিতে পারে গরগর করে। ভাগ্যে সফলতা আছে, শত্রু মোকাবেলা করতে হবে কৌশলে। সবুরে মেওয়া ফলে। ধৈর্য্য ধরে মাটি কামড়ে থাকতে হবে। উল্টো চিত্রও আছে। সংসারে অশান্তি, ব্যবসা বাণিজ্যে ভাটা, চাকরি-বাকরি হচ্ছে না, শনির দশা, ভালবাসার মানুষ এই কাছে আসে, এই দূরে যায়, শরীরে কঠিন ব্যামো বাসা বেঁধেছেÑ এমন  অনেক সমস্যার কথা খদ্দেরের মুখ দেখলেই সে বলে দিতে পারে, হাত দেখা লাগে না।

শুধু সমস্যাই নয়, সমাধানও আছে তার কাছে। দাওয়াই। টিয়া দিয়ে ভাগ্য গণনায় পাঁচ টাকা। হাত দেখলে আরও পাঁচ। দাওয়াই নিতে সর্বোচ্চ একশ টাকা হাদিয়া লাগে। বিনিময়ে তামার ঠোসে ভরা একটা তাবিজ তুলে দেয় খদ্দরের হাতে। যেমন-তেমনভাবে এই তাবিজ ব্যবহার চলবে না। এর জন্য নিয়ম-কানুন আছে। সময় নিয়ে এগুলো বলে দেয় সে। অমাবস্যার রাতে কালো কাইতন দিয়া হাতের বাজুতে কিংবা কোমরে ঝুলাতে হবে একদমে। দম ছাড়তে হবে তাবিজ বান্ধা হয়ে গেলে। তার আগে শরীরে কোনো সুতাও রাখা যাবে না। একেবারে গোপনে। কেউ যেন না দেখে। এই জন্য অমাবস্যার রাত পূর্বশর্ত। তাবিজ নিয়া মরা বাড়ি, বিয়া বাড়ি যাওয়া মানা। গেলে তাবিজের গুণ শেষ। গুণ শেষ হয়ে গেলে একমুহূর্ত আর শরীরেও রাখা যাবে না। এতে উল্টা কাজ হবে। সঙ্গে সঙ্গে খুলে ফেলে দিতে হবে স্রোত আছে এমন নদীতে কিংবা রাতের অন্ধকারে কবরস্থানে গেড়ে ফেলতে হবে।

আয়-ইনকাম খারাপ হয়নি শুরুতে। মায়ের চিকিৎসা হয়েছে গণনার টাকায়। মাকে গ্রাম থেকে ঢাকায় এনে কেরাণীগঞ্জে এক খুপরিতে তুলেছে। মা ছেলের সংসার ভালোই যাচ্ছিল। এভাবে তিনবছর যেতে না যেতে একদিন মা মবিনকে ডেকে বলল, আমি আর কয়দিন। এবার নাতি-নাতনির মুখ আমারে দেখাবি না?

মায়ের কোনো আবদার সে ফেলেনি। নুরনাহারকে ঘরে তোলার দুই বছরের মাথায় মায়ের ইচ্ছেও পূরণ করল। ছেলের নাম সে রাখলো বাবার নামে। আতোয়ারের বয়স যখন একবছর পুরলো ওই বছরই চোখ বুজল মজিরন। মাকে হারানোর পর ঠিকমতো কাজে যেতে পারেনি মবিন। এভাবে কেটেছে মাস ছয়। কিন্তু সে ঠিকঠাক কাজ না করলে বউ-ছেলের মুখে ভাত উঠবে না। কাজে তার মনোযোগ দিতে হবে। নিজেকে নিজেই বোঝায়। ভেঙে পড়ার কী আছে? মায়ের কথা মনে করে, পৃথিবীতে কেউ চিরদিনের জন্যে থাকতে আসে নাই বাপ। পৃথিবী একটা মায়ার বাগান। এই বাগানের ফুল হইছে স্বামী, ছেলে-সন্তান, নাতিপুতি, আত্মীয়-স্বজন। মানুষ জন্মের সাথে সাথে একটা ফুল গাছের জন্ম হয়। সেই গাছ বড় হয়। ফুল ফোঁটে। সুবাস ছড়ায়। একসময় ফুলটা ঝইরা যায়। মাটিতে পইরা শুকায়। এভাবেই মায়া মাটিতে মিলায়। মায়ায় মাটি উর্বর হয়। আবার জন্ম নেয় নতুন গাছ।

নিজেকে শক্ত করে কাজে মন দেয় মবিন। আগের চেয়ে বেশি সময় দেয় কাজে। সকাল থেকে সন্ধ্যা। কখনও কখনও হেরিকেন জ্বালিয়ে রাতেও বসে থাকে ফুটপাতে। যদি একজন খদ্দের মেলে। কিন্তু আগের মতো আর সেই আয়-ইনকাম তার হয় না। মা মারা গেছে বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। দিন দিন ব্যবসায় ভাটা পড়তেছে। গুরু ইদরিসও নিরুদ্দেশ। কোথায় গেছে কেউ বলতে পারে না। বিয়ে থা করেনি ইদরিস। একাই থাকতো যাত্রাবাড়িতে। সেখানেও কয়েকদিন গিয়েছে মবিন, দেখা পায়নি। ইদরিস তার আয় থেকে নিজের জন্য সামান্য কিছু রেখে বাকিসব টাকা প্রতিমাসে রায়ের বাজারে একটি এতিমখানায় দিয়ে আসতো। গত ১৫ বছর একই কাজ করেছে সে। নিজে কখনও একটা নতুন লুঙ্গি কিনে পরেনি। পুরাতন কাপড়ের দোকান থেকে কেনা লুঙ্গি আর শার্টে জীবন পার হয়েছে তার। মবিন খোঁজ নিয়ে জেনেছে এতিমখানার ছেলেপুলেরাও ইদরিসের দেখা পাচ্ছে না। শেষ যেবার সে এতিমখানায় গিয়েছিল সেদিন এতিম ছেলেপুলেদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়েছে। গরুর মাংস, মুরগির মাংস, বড় কাতল মাছ আর পোলার চাল সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল। খাবার শেষে বিদায় নেয়ার আগে এতিমখানার বড় মৌলনার পাশে সে দীর্ঘসময় বসে ছিল। কখনও তাকে এভাবে বসে থাকতে দেখেননি মৌলানা আব্দুল হামিদ। তিনি জানতে চান, ভাই কিছু বলবেন? ইদরিস মাথা তোলে না। মৌলানা সাহেব আবার ডাকলে মাথা তোলেন। তার চোখে পানি।

কী ব্যাপার আপনি কাঁদছেন কেন? আব্দুল হামিদ জানতে চান।

কান্দি না হুজুর। ইদানীং চোখে সমস্যা, সময় সময় পানি পড়ে।

আপনি মিথ্যা বলছেন ইদরিস ভাই। মিথ্যা বলা কবিরা গুনাহ।

আচ্ছা হুজুর এই যে আমি সারাজীবন আল্লাতালার হুকুম মানি নাই। নামাজ পড়ি নাই। রোজা রাখি নাই। মরণের পর আমার স্থান কি জাহান্নামে হইব?  দুহাতে চোখের পানি মুছে জানতে চায় ইদরিস।

ভাইসাহেব মানুষ জীবনে অনেক ভুল করে। পাপী। আর তিনি গাফুরুর রহিম। কেউ যদি নিজের ভুল বুঝতে পেরে তার রাস্তায় ফিরে এসে তওবা করে, আল্লাপাক গুনাহ মাফ করে দেন। আপনার সময় তো এখনও ফুরায়ে যায় নাই।

আমার মতো পাপী বান্দারে আল্লা কখনও ক্ষমা করব বইলা আপনের মনে হয়?

কেন করবে না? করবে। ভাইসাহেব পৃথিবীতে অনেক কাজ আছে। সেসব করেও জীবন বাঁচানো যায়। এই যে পাখি দিয়ে ভাগ্য গণনা, হাত দেখা- এগুলা হারাম কাজ। মানুষের ভাগ্যে কী আছে তা কেউ বলতে পারে না।

মৌলনার কথা শুনে আবারও মাথা নিচু করে ফেলে ইদরিস। মনে মনে ভাবে, এই ভাগ্য গণনা করেই গত ১৫ বছর প্রতিমাসে এই এতিমখানায় হাজার হাজার টাকা সে দিয়েছে। তার টাকায় আজ দুপুরেও ভালোমন্দ খেয়েছে এতিম বাচ্চারা। সৃষ্টিকর্তার কাছে তার এই দানের কোনো প্রতিদানই তবে নেই?

ইদরিস মিয়া উঠে দাঁড়ায়। মৌলানা হামিদও উঠে দাঁড়ান, ‘চলে যাবেন ভাইসাহেব?’

ইদরিস মৌলানার চোখের দিকে তাকায়, কথা বলে না। এতিমখানা থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর আর কেউ তাকে দেখেনি। মায়ের মৃত্যুতে যতটুকু শোক তাকে না ছুঁয়েছে গুরুর উধাও হওয়া তার চেয়ে বেশি কাতর করেছে। একধ্যানে বসে থাকে। খদ্দের নিয়ে তার চিন্তাভাবনা নেই। প্রতিদিন ভোরে ঘর থেকে বের হয় ঠিকই। ফেরে মাঝরাতে। স্ত্রী নুরনাহারের সঙ্গেও খুব একটা কথাবার্তা বলে না। আদরের ছেলেটার দিকেও কোনো খেয়াল নেই। প্রতিদিন যে কয়েকটাকা কামাই হয় ডানো দুধের একটা লম্বা কৌটায় রেখে সকালে বেরিয়ে আসে। ছয় মাস হয়েছে বউটা পোয়াতি। চলা ফেরায় কষ্ট। স্বামীর মন খারাপ। কেমন জানি সব সময় একটা খেয়ালে থাকে। নুরনাহারের সাহস হয় না কারণ জানতে চায়। কিন্তু আর কত? একদিন সে সাহস করে। বলে, ‘আপনের কি শরিল খারাপ?’

না, শরিল ঠিক আছে। মবিন উত্তর দেয়।

তয় কিছু নিয়া চিন্তায় আছেন?

কীসে চিন্তা।

সব সময় এমন মন মরা হইয়া থাকেন যে…

সারাদিন খাটুনির পর ঘরে আইসা কি নাচগান করবো? ধমকে ওঠে মবিন

তাই বলে আমাগো লগে একটু ভালোমন্দ কথাও বলা যায় না। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে নুরনাহার।

ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগে মবিন বলে, কথায় কথায় এমন করে কাঁদবানা বউ। কান্না আমার ভালো লাগে না।

মানুষের ভাগ্য কি আসলেই গোনা যায়? ভাগ্য লিখন কি দেখা যায়? কেউ কি দেখতে পায়? ভাগ্য লিখনের আদৌ কোনো অস্তিত্ব আছে? এতলোকের ভাগ্য লিখন গলগল করে পরে দিতে পারে হাই ইস্কুল পার হতে না পারা মবিন। কিন্তু নিজের ভাগ্য? গুরু ইদরিস বলেছিলেন, দেখো বাবা, মানুষ সব সময় নিজের সম্পর্কে ভাল ভাল কথা শুনতে চায়। নিজের ভবিষ্যৎ ভাল এই চিন্তা করতে চায়। আর এটা কেউ তারে কয় না, তাই আসে গণকের কাছে। হাতের রেখায় সব লেখা আছে, এইটা তার বিশ্বাস। তাই তারে সব সময় বেশি বেশি আশার বাণী শোনাতে হয়। মবিন জানতে চেয়েছিল, তাহলে আপনে যে তাদের সমস্যার কথা, শত্রুর কথা বলেন?

কোন মানুষের শত্রু নাই কও তো? মানুষ একটা সময় নিজের ঘরের বউকেও শত্রু মনে করে। আপন ভাই-বোনও শত্রু হয়। শত্রু না থাকলেও মাঝেমধ্যে নিজে নিজে অন্যরে শত্রু ভাবতে থাকে। আসলে এইটা তার মনের শত্রু। যখন শত্রুর কথা বলবা, তখন তার মধ্যে বিশ্বাস হইব। মনে মনে ভাববো, আসলেই তো আমার শত্রু আছে। গুরুর বলা গোপন তত্ত্বগুলো আজ খুব বেশি মনে পড়ছে মবিনের। ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে অনেক সময় হল। পথ ধরে হেটে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে সে কি তা জানে? জানে না। আজ তার কাজেও মন বসছে না। হাঁটতে হাঁটতে সে চলে এসেছে শাহবাগে। রাস্তার ওপাশে ফুলের দোকানগুলো ঘেঁষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তাটা আজ খুব বেশি অচেনা মনে হচ্ছে। অনেক দিন আসে না এই দিকটায়। চারুকলার উল্টোদিকে ছবির হাটের সামনে এক লোক বসে আছে প্লাস্টিকের একটা চালের বস্তার ওপর সাদা কাপড় বিছিয়ে। পাশে একটা খাঁচা। তাতে টিয়া পাখি। সামনে অগুন্তি লাল-নীল খাম। মবিন তার সামনে দাঁড়ায়। এক পলকে তার সঙ্গে গুরুর মিল খোঁজে। ইদরিসের মাথাভর্তি সাদা চুল ছিল। এই লোকটার মাথায় মাঝ থেকে কপাল পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকটা চুল লম্বা হয়ে আছে। লোকটার মুখে দাড়ি, গোঁফগুলো খাড়া খাড়া। কয়েকদিন সেভ করেনি হয়তো। পরনে লুঙ্গি, গায়ে রংচটা সবুজ পাঞ্জাবি। কিন্তু তার গুরুর মুখে দাড়ি ছিল না। মোটা গোঁফ ছিল। পাঞ্জাবি পরনে তাকে দেখা যায়নি কখনও। গণক লোকটা জানতে চায়, কি মিয়া ভাগ্য গোনবেন? মবিন নির্লিপ্ত। বসে পড়ে ডান হাত বাড়িয়ে দেয়। এক কাচা ভাঙা চশমাটা চোখে দিয়ে লোকটা গভীর মনোযোগে মবিনের হাতের রেখা দেখতে থাকে। এক পর্যায়ে বাঁ হাতটাও টেনে নেয়। বলতে থাকে, হুম, মনে সুখ নাই। আপন মানুষরে পর পর লাগে। যেজন হারায়ে গেছে, তারে খুঁজে লাভ নাই। ঘরে নতুন অতিথি আইবো। তার দিকে মন দেন। কাজে কর্মে মন দিলে উন্নতি…।

লোকটার কথাশুনে মবিন হাসে। হাত দুটো টেনে নিয়ে পকেট থেকে পাঁচ টাকার নোটটা বের করে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। যেতে যেতে গায়, সে মানুষ চেয়ে চেয়ে/ফিরিতেছি পাগল হয়ে/ মরমে জ্বলছে আগুন, আর নেভে না।

কুটুমকে কলা ছিলে দিতে গিয়ে আজ কেন জানি তার সেই গণকের কথা মনে পরছে। সে নিজেও গণক। গণনার রহস্য তার জানা। তারপরও শাহবাগের সেই মানুষটার কথাগুলো কেন জানি বিশ্বাসে আটকে গেছে। আর একদিন সময় করে তার কাছে গেলে কেমন হয়, মবিন ভাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares