চিত্রকলা নবকুমারের রিকশাচিত্র – মইনুদ্দীন খালেদ

চিত্রকলা

নবকুমারের রিকশাচিত্র

মইনুদ্দীন খালেদ

 

একটা সবুজ রংয়ের কুমির। তাকে স্ট্রেচারে করে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে একটা বাদামি শেয়াল, লাল বানর আর হলুদ চিতা। রাস্তাটা বেশ চওড়া। দূরে উঁচু উঁচু দালান। তাই বোঝা যায় এটা রাজধানী ঢাকার রাস্তা। নবকুমারকে জিজ্ঞাস করলাম, ‘ছবির বিষয় কী?’ ছবিটির শিল্পী একমুহূর্ত হতবাক থেকে পরক্ষণেই বললেন, ‘আরে বুঝলেন না, কুমিরের অসুখ; হগলে অহন ওরে হাসপাতালে লইয়া যাইতাছে।’

ছবির গল্পটা শিশুতোষ; বেশ মজার। কিন্তু কথা কি এখানেই শেষ! তা তো নয়। আমি শিল্পী নবকুমারের সঙ্গে বাক্যলাপ করার বিষয় তুলে ধরে ওর ছবির প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আগত শ্রোতাদের জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা এটা কি শুধুই একটা মজার গল্প এবং যে গল্প শুনে আমরা মুচকি হাসব আর শিশুরা হাসবে খিলখিলিয়ে?’ কোনো উত্তর পেলাম না।

যারা লোকবিদ্যা বা লোকজমনীষার বিষয়টা বোঝেন তারা কিন্তু জানেন ওই গল্পের অন্তরালে একটি আদর্শের কথা বলা হয়েছে। ওই ছবির বিষয় আসলে দয়া, ইংরেজিতে চ্যারিটি। সমবেত সুধীবৃন্দ এখন বুঝতে পারলেন। ছবির উপরিতলে আসলে সব কথা ব্যক্ত থাকে না।

নবকুমার রিকশাচিত্রকর। পুরানো ঢাকার বাসিন্দা, কয়েক পুরুষ ধরে তারা মোঘল ঢাকার স্মৃতিবিজড়িত পরিবেশে বসবাস করে আসছেন। এই চিত্রীর প্রদর্শনী চলছে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ-এর জুম গ্যালারিতে।

নবকুমারের ছবি বিষয়ে বিশদ বলার আগে রিকশাচিত্র বিষয়ে দুচার কথা বলা প্রাসঙ্গিক বোধ হচ্ছে। রিকশাচিত্র কোন জাতের শিল্প। একে আমরা ‘নাগরিক লোকশিল্প’ নাম দিয়েছি। লোকশিল্প কি নাগরিক হয়? জগতের কোনো প্রশ্নেরই উত্তর ‘হা’ বা না’ দিয়ে হয় না। ‘হা’ বা ‘না’ বলে শুধু অর্ধসত্যই জানা যায়। আমরা বলি, লোকশিল্পের আঁতুড় ঘর ও লালন-ভূমি পল্লীবাংলা। গ্রাম্য জনগোষ্ঠীর সমষ্টিগত মানুষের বোধ, বুদ্ধি ও আবেগ নিয়ে যে শিল্প স্বতঃস্ফূর্তভাবে চর্চিত হয় তাকে বলে লোকশিল্প। একই বিষয়ের বহু সংস্করণ তৈরি করা লোকশিল্পের আদর্শ। কারণ, বহুজন তা কিনে নেয়, সংগ্রহ করে, নষ্টও করে থেকে এবং বছরান্তের নতুন মেলা বসলে আবারও তা কেনে। লোকশিল্প প্রতিবছর নতুন জীবন পায়। এজন্য এ-শিল্পকে বহমান ঐতিহ্য বা লিভিং ট্রাডিশন বলা হয়।

তাহলে রিকশাচিত্র কি লোকশিল্প? আমাদের মনে হয়, এর লোকশিল্প হিসেবে গৃহীত হওয়ার দাবিটা সঙ্গত। আর এর জন্ম যেহেতু ঢাকা শহর বা আজকের মহানগরের। তাই একে নাগরিক লোকশিল্প নাম দিলেও কোনো অসঙ্গতি হয় না।

2রিকশাকে ‘যানচিত্র’ বলা যেতে পারে। আরও ভালো হয়, যদি বলি, ত্রিচক্রযানচিত্র। বাহনের গায়ে ছবি আঁকাকে ইতিহাসপূর্বকাল পর্যন্ত ঠেকিয়ে দেয়া যায়। মানুষ তার বাহনকে সুদৃশ্য রাখতে চায়। একটা ঘোড়ায় চড়ে চললেও ঘোড়াটার পশম হাতের আঙুল বুলিয়ে ও চিরুনি চালিয়ে মসৃণ রাখতে চায়। তার পিঠে নকশি কাপড় জড়িয়ে তারপর সওয়ার হয়। ঘোড়া বা অন্য পশু যখন গাড়ি টানতে শুরু করে তখনও ওই গাড়ির দরজায় পাখি, ফুল ইত্যাদির ছবি আঁকা হতে থাকে। পৃথিবীর অনেক দেশেই ট্রাক ও অন্যান্য অনেক বাহনে ছবি আঁকা হয়। এই ছবির সঙ্গে বাহনের চালকের বা মালিকের রুচি ও সৌন্দর্যভাবনার সম্পর্ক আছে। একে বাহনচিত্র বা ভেহিকুলার আর্ট বলেও সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

রিকশাচিত্রীরা সবচেয়ে বেশি আঁকে পদ্মফুল ও লতানো গোলাপ। রিকশার সারা দেহে ছবি। তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের এমন কোনো কলকব্জা নেই যেখানে ছবি বা কমপক্ষে একটা নকশা আঁকা হয়নি। এমনকি যে অংশ বাইরে থেকে দেখা যায় না, তাও চিত্রিত। রিকশাকে কেন এমন পরির মতো সুন্দরী যানে পরিণত করা হলো? তার হুড, প্যাডেললগ্ন লোহার চ্যাপ্টা পাত এবং বিশেষ করে পেছনের আয়তাকার টিনের পাতাটিতে একটা বক্তব্যধর্মী চিত্র আঁকা হয়ে থাকে। রিকশা শুধু রিকশা নয়, একটি চলমান প্রদর্শনী এবং এর মধ্যে শুধু কালের পাড়হীন নয়নসুখকর সুন্দর আঁকা হয়নি; এতে সমকালও আছে।

এবার নবকুমারে ফিরে আসা যাক। প্রদর্শনীর শুরুতে তিনি নিজের মায়ের ছবি এঁকেছেন। মাতৃভক্তি শুধু মায়ের ছবি এঁকেই শেষ হয়নি। মায়ের দোয়া-এ-কথাটি অক্ষরে লিখে তার সঙ্গে জুড়েছেন রঙিন পালকের পাখি ও রঙিন ফুল। মাতৃভক্তির প্রাকপৌরানিক আবেগ এখনও যে সজীব তা আমরা রিকশাতেই বেশি লক্ষ্য করে থাকি। রিকশার পেছনে বা চাকার ওপর দুদিকে দুটি পানতোয়া গড়ন জুড়ে তাতে ‘মা’ কথাটা লেখা থাকে। গাঁয়ের নারীরাও ফুল-লতা-বিথীর মাঝখানে সুঁই দিয়ে উজ্জ্বল সুতায় লেখে ‘মা’। এই ‘মা’ লেখার বা আঁকার বিষয়টা নিয়ে গবেষণা চালাতে গেলে আমরা মাতৃতান্ত্রিক বাংলার সভ্যতার সূচনাবিন্দুতে পৌঁছে যেতে পারি। সব মরে, শুধু মা মরে না। মা মরে গেলে সভ্যতা অচল হয়ে পড়ে। তাই মাকে আমরা ভক্তিতে বাঁচিয়ে রাখি। মাতৃতান্ত্রিকতার সুধারস যে চুইয়ে চুইয়ে এখনও নতুন শিল্পের জন্ম দিচ্ছে তারই মোক্ষম প্রমাণ ওই ‘মা’ শব্দের শিল্পায়ন।

নবকুমার সুন্দর প্রকৃতি, পশুপাখি, ফুল-লতাই শুধু আঁকেননি। এঁকেছেন ভয়ঙ্কর লোমহর্ষক দৃশ্যও। এতে হয়ত নৃশংতা নয়, 3বন্যপ্রাণির জীবন প্রণালিই প্রকাশিত হয়েছে। শিল্পী শিকার দৃশ্য এঁকেছেন প্রচুর। মানুষ পশু শিকার করছে না, পশুই পশুর আমিষাশী স্বাদ মেটাচ্ছে। চিতা কামড়ে ধরেছে জিরাফ, সিংহ গর্জন করছে, কুমিরের ধারাল দাঁতের সারি দেখা যাচ্ছে হা-মুখে, হাতি শুর তুলেছে ইত্যাদি। জঙ্গলে প্রাণিকূলের সহবস্থান ও লড়াই চিত্তাকর্ষক। এতে শিশুমনের আনন্দ মাত্রাতিরিক্ত শিহরণ পাবে। কিন্তু আলাভোলা মনের সুন্দরদর্শনই রিকশাচিত্রের শেষ কথা নয়। নবকুমাররা যে এসব দৃশ্য আঁকেন এর গভীরে অন্য ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসের পাতায় আমরা পাঠ করি মোঘল রাজধানী ঢাকার কথা। এখানকার মানুষের জীবন-যাপন, অভিরুচি আর পুরানো দিল্লির মানুষের জীবনভাবনার মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। সেখানেও যানচিত্র আঁকা হয়, লোকজন মোঘলাই খাবার খায়, চক্রাবক্রা নকশাদার পোশাক পরে। মোঘল মিনিয়েচার শিল্পীরা দিল্লি ও অংশত ঢাকাতে বসেও ফুলবাসনা ও লোমহর্ষক শিকার দৃশ্য আঁকতেন। রিকশাচিত্রকে কি মোঘল দরবারি শিল্পের অপভ্রংশ হিসাবে ভাবা যেতে পারে না?

রিকশার পেছনে যে আয়তাকার টিনের পাতটি সাঁটা থাকে তাতে আঁকা হয় সময়ের ছবি। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পরপর মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াই, পাক-বাহিনীর আত্মসমর্পণ, রাজাকারের হাস্যকর চিত্র এঁকেছেন রিকশার শিল্পীরা। এদিক দিয়ে তারা কালসচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। ১৯৭৩ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, ইন্দিরা গান্ধী প্রমুখ মহামানবকে নাকাল করে নিজস্ব শৈলীতে সেই টিনের পাতে চিত্রিত করেছেন এই শিল্পীরা।

এই নাগরিক লোকশিল্পীদের মনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। তারা অস্তিত্বকে ভক্তির দোলায় আন্দোলিত করতে চায়। যা কিছু অভূতপূর্ব বা অদ্ভুতুড়ে বা একজোটি বা তা-ই তাদের আকর্ষণ করে। তারা তাই লন্ডন ব্রিজ, যমুনা সেতু, তাজমহল, লুইকানের সংসদভবন, আজমির শরিফ ইত্যাদি উজ্জ্বলতর রঙে ভক্তি ও বিস্ময়কে উপচিয়ে প্রকাশ করে। আসলে তারা আইকন ভালোবাসে। তাজমহলই হোক, আর লন্ডন ব্রিজই হোক,  সবই তো স্পেসে পূজনীয় ইমেজ।

তবে তারা বিস্ময়বোধে আটকে নেই। টিনের পাতে প্রায়শ তারা আঁকেন বাংলা সিনেমার অতিরঞ্জিত নায়িকা আর ব্যায়ামবীর নায়ক, যে না-কি খলচরিত্রের সঙ্গে লড়াই করতে পারবে। ’৬০-এর দশকে অবশ্য তারা সুন্দর নায়ক আর সুন্দরী নায়িকার যুগলবন্দি রূপ রূপায়িত করতেন ওই টিনের পাতে। তারপর ত্রিভূজ প্রেমে দুই নায়ক, এক নায়িকা এল। ১৯৭০-এর দশকের শেষে মারদাঙ্গা সিনেমায় নায়ক ও নায়িকার মাঝখানে এসে দাঁড়াল নিষ্ঠুর ভিলেন। এবার আঁকা হলো প্রেম ও প্রেমের শত্রু সেই ভিলেনের বিরুদ্ধে নায়কের, কখনও বা নায়ক-নায়িকা উভয়ের যূথবদ্ধ লড়াই। এভাবে শুভ ও অশুভ, সুন্দর ও অসুন্দরের সংঘর্ষ চিত্রায়িত হলো রিকশাচিত্রীদের চিত্রতলে। সিনেমার আইকনদের রূপায়িত করে রিকশাশিল্পীরা যেন এসে দাঁড়ালেন পপ-আর্টিস্টদের সারিতে। পপ গুরুশিল্পী আমেরিকার অ্যান্ডি ওরহোলের সঙ্গে নবকুমারদের সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ছবির তুলনা খুবই প্রাসঙ্গিক। এবার লোকশিল্প ও পপ-আর্টের সম্পর্ক নিয়ে দু’চারকথা বলা যেতে পারে। পপ মানে পপুলার। আর পপুলার এসেছে পিপল থেকে। ফরাসিরা লোকশিল্পকে বলে ‘লার্ত পপুল্যের’। লোকশিল্প ইংরেজিতে ফোক আর্ট। ফোক আর লোক একই কথা। দুটিরই অর্থ সাধারণ জনগোষ্ঠী।

অ্যান্ডি ওরহোলের ‘মেরিলিন মনরো’, ‘লিজ টেলর’ আর নবকুমার ও তার পূর্বজ রিকশাশিল্পীদের ‘শাবানা, কবরী’ ‘ববিতা’র চিত্রের তুলনামূলক বিশ্লেষণ দাঁড় করাতে পারলে লোকশিল্প ও পপ-আর্টের ঐক্যসূত্র সহজেই অনুধাবন করা যাবে।

কলাপাতা সবুজ, উজ্জ্বল হলুদ আর বিশেষ করে হাওয়াই মিঠাই লাল মিলিয়ে রিকশাচিত্রীরা যে বর্ণজোট বা কালারস্কিমে যেভাবে প্রমাণ আয়তনকে একটু বাড়িয়ে-ছড়িয়ে ছবি আঁকেন তা আমাদের মতো তথাকথিত উচ্চশিক্ষিতদের তেমন আকর্ষণ করে কি? আমরা অপেক্ষাকৃত মার্জিত রুচির মানুষ বলে প্রকাশ্যে না হলেও মনে মনে দাবি করি। ওই সব রং ও রূপের দিকে তাকালে কুঞ্চিত হয় আমাদের নাকের পেশী। কিন্তু যারা আজও বাংলা সিনেমা দেখে তারাই লোক, ফোক, পিপল এবং এই সূত্রে তারাই মূলত এই শিল্পের সমঝদার। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আমার আপনার তাদের ছবি ভালো না লাগলে তাতে কিছু আসে যায় না। কেননা, তারা নগরে বাস করেও লোকশিল্পীদের মতো নিজস্ব ভাবনায় দৃঢ়প্রত্যয়ী, তারা চিত্রাঞ্জলি রচনা করবেই বিখ্যাত সৌধ ও সিনেমার আইকন বা ইমেজের জন্য। নবকুমাররা রচনা করেছেন পপ-আর্টের বঙ্গজ সংস্করণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares