গল্প

বন্ধুত্ব

জুনাইদুল হক

 

-কী নাঈম, কেমন আছো তুমি? তোমার ‘জিলিবি’ কেমন আছে?

– ভালো আছি। জিলিবি? ও হ্যাঁ, সেও ভালো আছে। (হেসে) পারো বটে তুমি, এই তেরো-চৌদ্দ বছর পরও মনে রেখেছো কথাটা (আবার হাসি)।

– ছেলেরা মেয়েদের মতো নয়, জনাব নাঈম। থুড়ি, জনাবা নাঈম। তারা মেয়েদের মতো ভুলে যায় না। (হেসে) থ্যাঙ্কস্ ফর লুকিং সিøম অ্যান্ড বিউটিফুল। গত তেরো বছরে কতজনকে যে বলেছি, আমার এক বান্ধবী ছিল, সারা জীবনের একটাই ঘনিষ্ঠ বান্ধবী, তার নাম আবার ছেলেদের মতো। দেখতে উত্তর-পশ্চিম ভারতের খাঁটি অপরূপা, নামখানা পুরুষের। মজার ব্যাপার না? তো সারা জীবন ছেলেঘেঁষা থেকেও এই মেয়েটির বন্ধুত্বের আকর্ষণ এড়াতে পারলাম না। মেয়েটি চেহারায়-স্বভাবে খুব মনের মতো ছিল যে। কি আর করি! তো যা বলছিলাম, ছেলেরা ভোলে না। আন্তরিকতা, আনুগত্য এসব তো ছেলেদেরই গুণ। তারা সত্যিকার বন্ধুকে ভোলে না। পোগো হলে তো না-ই।

– পোগো! হ্যাঁ, কতদিন এ শব্দটা শুনি না। আধ-পাগলদের তুমি পোগো বলতে। বিষণ্ন, সংবেদনশীল, যা কিছুতে হাত দেয় তাতেই ব্যর্থ হয়, এমন মানুষকে তুমি পোগো বলতে। পাজি শব্দটা বাংলাদেশে থাকার সময়ই শিখেছিলাম। তোমাকে শেষদিকে খুব করে পাজি পোগো বলতাম, মনে আছে?

– সে আর নেই! ‘পাজি’ বলে অ্যাড্রেস করে চিঠিও লিখতে। তোমার দেওয়া ভারতীয় ইংরেজি উপন্যাসের দু’একটির মধ্যে টুকটাক চিঠি এখনও পাওয়া যাবে। খুব ভদ্র, মার্জিত চিঠি। মেয়েরা এত নিরাপদ থাকতে চায়! ছেলেদের মতো ঘোর রোমান্টিক হতে পারে না।

– তোমাকে বলেছে! মেয়েদের চান্স পেলেই খোঁচা দেওয়ার অভ্যাসটি যায়নি দেখছি। মেয়েরাও আন্তরিক, মশাই। তারাও রোমান্টিক। তবে তারা তোমার মতো পাগল না। (ব্লাশ করতে করতে) প্রেমিকার সঙ্গে বিয়ে থামিয়ে রেখে বিবাহিত বান্ধবীকে নিয়ে মাতামাতি করা ছেলেদেরই সাজে বা পোগোদের।

– পোগোরা আর কেউ না, ক্যামুর আউটসাইডার, এলিয়টের প্রুফ্রক। কোলকাতার লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এক গল্পে এই নামে এক চরিত্রও ছিল। বিয়ের কথা বলছিলে। কোনো কিছু সময়মতো করে ওঠা কপালে নেই পোগোদের। নাঈম, তুমি কিন্তু পোগোদের ব্যাপারে একদিন একটি সুন্দর প্রশংসাবাক্য বলেছিলে। তুমি হাসতে হাসতে একদিন বলেছিলে, পোগোরা এক বিস্ময়কর প্রজাতি, ভদ্রলোক বলেই এরা বিবাহিত বান্ধবীর কাছে সাংঘাতিক সব দাবি জানিয়েও স্বচ্ছন্দে পার পেয়ে যায়। বলো নাঈম, অনেকটা বালকের সরলতা নিয়ে ভরা যৌবনে তোমায় ধফসরৎব করিনি? এই সিনিক্যাল পৃথিবীতে আমার মতো নিষ্কলুষ আবেগের মানুষ তুমি খুব বেশি পাবে না। তোমার প্রতি আমার বন্ধুসুলভ ভালোবাসাকে আমি স্বর্গীয় বলতে চাই।

– জনাব পোগো, বক্তৃতা তো ভালোই দেন দেখছি। নিজের প্রশংসা করা ভালোই রপ্ত করেছেন। আগে তো দেখতাম সারাক্ষণ মুখে অন্যের প্রশংসা। এই, তোমার মার্মেইড কেমন আছে, তোমার ইলিশ মাছ?

– তুমিও ভোলনি দেখছি। তোমারই দেওয়া নাম। ইলিশ মাছ ওরফে মার্মেইড লন্ডনে থাকে স্বামীর সঙ্গে। এক মাইক্রোবায়োলোজিস্টের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। সুখে আছে। বুঝতেই পারছো আমার সঙ্গে বিয়ে হয়নি। অনেক জ্বালিয়েছি ওকে, অনেক কষ্ট দিয়েছি। বেচারির এখনকার সুখ আর শান্তি তার প্রাপ্য ছিল। তরুণ হিসেবে ভাবতাম সেই আমায় বেশি কষ্ট দিয়েছে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নিজের দোষ চিনতে পেরেছি আর ওর সব দোষ ক্ষমা করতে পেরেছি। ওর মঙ্গল চাই আমি। তুমি ওকে সুন্দর বলতে, আমি গর্বের সঙ্গে স্মরণ করছি (বিষণ্ন হাসি)।

– কেন বলবো না? ও সুন্দর মেয়ে না হলে কে সুন্দর? তুমিই ওর কদর বুঝলে না।

– বুঝতাম নাঈম। ওর জন্য আমার হৃদয় কম রক্তাক্ত হয়নি। তবে কদর ভালোভাবে বুঝেছি ওকে হারিয়ে। মার্ক ফিরবে কখন? তোমরা কাড়ি কাড়ি পয়সা খরচ করে সোনারগাঁও-এ আছো কেন?

– নিজের পয়সায় কি আর আছি? ইউনিসেফ রাখছে। আমিও কয়েক বছর আগে ইউনিসেফে জয়েন করেছি। মার্ক তো সেখানে বরাবরই ছিল, তুমি জানো। মার্ক ওর এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেছে, ফিরবে এক্ষুনি। বসো।

– ভালোই হলো। জিলিবিকে অফিসে বসেও চোখে চোখে রাখতে পারবে। সে কি তোমার মতো হালকা-পাতলা আছে এখোনো? না, আমার মতো ভারি হচ্ছে?

– ভারি হয়নি, তবে মাথায় চুল খুব কম। মার্কিনিদের ওপর কি তুমি এখনও রেগে আছো?

– (হেসে) না। থেকে আর লাভ কী? তোমার ভাই করিম কেমন আছে? তোমার ভাবী সন্ধ্যা? তোমার আব্বা-আম্মা? শাশুড়ি? ইশ কতোদিন পর দেখা হলো!

– বলছি, বলছি। করিম দিব্যি আছে। তোমার সমবয়সী, চল্লিশ পার করেছে। আব্বার প্র্যাকটিস দেখছে। বম্বেতেই প্রায় সারা বছর থাকে। সন্ধ্যা ভাবী বেশ আছে। ওদের ফুটফুটে দু’টি বাচ্চা আছে।

– সন্ধ্যা কি এখনও ‘হরি ওম’ বলে? তুমি বলতে, স্বামীর উদ্দেশে `Hurry home!’ বলছে।

– (আবার হাসি) সব মনে আছে দেখছি। আব্বা-আম্মা বুড়ো হয়েছেন। শাশুড়ি হিউস্টনেই থাকেন, এখনো শক্ত-সমর্থ আছেন। পঁচাত্তর পার করেছেন। সত্যি কতো বছর পর বাংলাদেশে এলাম। বাংলার গ্রেট চিকেন-ইটারকে আবার দেখতে পেলাম। মুরগির রান খুব প্রিয় ছিল তোমার।

– তোমার আব্বা খুব সুপুরুষ। রূপটা তুমি বাবার কাছেই বেশি পেয়েছো। বাবা-মা দু’জনই তোমার খুব প্রিয় ছিলেন, তবে বাবার প্রতি তুমি একটু বেশি দুর্বল ছিলে। বাপভক্ত মেয়ে আমারও খুব প্রিয়। নিজের মেয়ে নেই বলেই যেন বেশি প্রিয়। তোমার ভাই হিন্দু বিয়ে করে ভারতের জাতীয় সংহতি মজবুত করলো। আর তুমি মার্কিনি বিয়ে করে আন্তর্জাতিক সংহতির কাজ করলে। তোমাদের ছেলেমেয়ে?

– নেই।

– নেই মানে? তোমার কপালও আমার মতো?

– তোমাদেরও নেই?

– হ্যাঁ। ডাক্তার বলেছেন, আমাদের এখনো আশা আছে। তোমরা কি ইচ্ছ করে নাওনি?

– (করুণ হেসে) তুমি সহজ-সরল মানুষ, থাক ওসব। তোমার বউয়ের কথা বলো।

– (মলিন মুখে) পনের বছর আগেও বলেছি, তোমার একশ’ ছেলেমেয়ে থাকা উচিত ছিল। তোমার অনেকগুলো কপি থাকা দরকার। (একটু থেমে) আমার বউ সাদাসিধে ভালো মানুষ, পেশায় তোমরা যাকে বল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তোমার ছবি অনেকবারই দেখেছে। তোমায় খুব সুন্দর বলেছে। তাতে আমি গর্বিত হয়েছি। ভাবতাম, ছেলে ছাড়া ভালো বন্ধু হয় না। একটি সুন্দরী, প্রখর বুদ্ধিমতী, হাসিখুশি টমবয় আমার ভুল ভেঙে দিয়েছিল বলে আমার কোনো আফসোস নেই (হাসি)।

– আমরা এবার ক’দিন আছি। তোমার বউয়ের সঙ্গে খুব গল্প করবো। তোমার জ্বালাতন সইছে বেচারি এত বছর ধরে। বউকে কষ্ট দিও না কিন্তু।

– না, না, তুমি চিন্তা করো না। বউটা আমার ভালো। আমি লোকটাও কি খুব খারাপ, নাঈম? কিছুদিন আগে বউকে ইন্ডিয়া নিয়ে গিয়েছিলাম, বেড়াতে। কৈশোর থেকে ইন্ডিয়া যেতে চাইতাম, সুযোগ ঘটলো বিয়ের এত বছর পর। গরিব দেশের গরিব নাগরিক। তোমার কথা খুব মনে পড়ল কিন্তু তুমি তো আমেরিকায়। পরের বার কলকাতা আর বম্বে যাবো। বম্বেতে উঠব তোমাদের মেরিন ড্রাইভের পৈতৃক বাড়িতে। নাসিরুদ্দিন শাহ্, শাবানা আজমি, ওম পুরি, সত্যদেব দুবে, ইব্রাহিম আলকাজির শিষ্যরা আসে না তোমাদের বাসায় আড্ডা দিতে? এঁদের আড্ডায় দু’দিন বসতে পারলে খুব ভালো লাগবে। আমি এঁদের পুরোনো ভক্ত। জিমি কেমন আছে, নাঈম?

– জিমিকেও মনে রেখেছো? (হাসি) আমেরিকার কোথায় যেন settle করেছে। করিমের সঙ্গে যোগাযোগ আছে বোধ হয়।

– জিমি বদমাশ যতোই স্মার্ট হোক, আমার প্যাশন ও পাবে কোথায়? তাই না নাঈম? (আদুরে ভঙ্গিতে) জিমির চেয়ে বেশি মনে করো না তুমি আমাকে?

– ইশ বয়ে গেছে আমার তোমার গোমড়া বাঙাল মুখটা মনে করতে। (হেসে কুটিকুটি) এখনও জিমির প্রতি রাগ? কোনোদিন পাত্তাই দিইনি ওকে। পনের বছর আগের মতোই আবেগপ্রবণ আছো দেখছি।

– (হেসে) রাগ না, ওকে rival না ভাবলে আমার ভালো লাগে না। আবেগপ্রবণ! তুমি চাইলে এখনো মার্ককে তলোয়ার নিয়ে তাড়া করে তোমায় ঘোড়ায় তুলতে পারি।

– থাক, থাক। এই বয়সে আর কিশোর প্রেমিক সাজতে হবে না। কিশোরগঞ্জের লোক চিরকিশোর থাকে, তুমি বলতে।

– মনে রেখেছো তাহলে? এ জন্যই তুমি এত ভালো বন্ধু ছিলে। তোমার সঙ্গে প্রাণ খুলে কত কথা বলতাম। মার্ক আর তুমি যদি রাম আর সীতা হও, আমি তোমাদের অনুগত লক্ষ্মণ। যখনই ঢাকায় আসবে, আমায় খবর দেবে। আমি আমার উর্মিলাকে নিয়ে তোমাদের দু’জনের সঙ্গে ঢাকা শহর চষে বেড়াব। রামায়ণের উর্মিলা উপেক্ষিত হলেও আমার উর্মিলা মোটেও তা নয়। মার্মেইডের কথা ওর সঙ্গে আমি কখনও তুলি না। আমি লয়েল স্বামী। নাঈম, আমার বউকে কিন্তু বলে দিও আমি কত ভালো ছিলাম। চার্ম, শিভ্যালরি সবই এক সময় আমার মধ্যে ছিল। হু।

– সে আর বলতে। চার্ম এত বেশি ছিল যে মার্মেইডকে সাত বছর ভালোবেসেও আমার জন্য অনেক অবশিষ্ট রেখেছিলে। (হঠাৎ মিষ্টি হেসে) কেমন লাগছে বুড়ো হতে, পোগো সাহেব?

– (বিষণ্ন কণ্ঠে) বুড়ো তো আমি আঠারো বছর বয়স থেকেই। সেই যে সাহিত্যের জগতে হাঁটি হাঁটি পা রাখলাম আর ইউরোপিয় বিষাদ চিনলাম, তার থেকে আর রেহাই পেলাম কবে? আমার বামপন্থি রাজনৈতিক বন্ধুরা আমায় চেষ্টা করেও তেজি, কর্মঠ তরুণ বানাতে পারল না। আমি নিঃসঙ্গ, অতীতবিধুর প্রাণীই রয়ে গেলাম। লেখালেখির হাতটা মন্দ ছিল না, তোমরাই বলতে। সেই কাজটাও উদাসীনতা আর আলসেমির কারণে ভালো করে করা হলো না। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর ক্রিকেট খেলা নিয়ে মাতামাতি, এ দুটি কাজই চালিয়ে যেতে পারলাম। বই-পত্রিকা, আড্ডা আর ক্রিকেট না থাকলে কবেই মারা পড়তাম। তুমিও জানতে না, একদা আমি বেয়াড়া রকম ভালো ছাত্র ছিলাম। বুদ্ধদেব বসুর কথা ধার করেই বললাম। তুমি হয়তো অনুমান করতে। উন্নতমানের কেরানি হিসেবে জীবন তো হাসিমুখে পারই করে দিচ্ছিলাম। হঠাৎ চল্লিশ পার করে মনের জোর যেন হারিয়ে ফেলেছি। মাঝে মাঝে কষ্ট লাগে। একদা সম্মানজনক চাকরি পেয়েছি আর ছেড়েছি। মাসুল দিচ্ছি এখন। তাছাড়া তোমরা ইংরেজিতে যাকে ড্রাইভ বলো, তা আমার কখনও ছিল না। ছিল না জেদ। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। Bang করে জীবন শুরু করেছি, whimper করতে করতে শেষ করছি।

– মন্দ বলোনি। মার্মেইডকে কেন হারালে তারও একটা ব্যাখ্যা যেন পাচ্ছি। জেদ নেই, ড্রাইভ নেই। পুরোদস্তুর হতাশাবাদী।

– আর ব্যাখ্যা! মার্মেইড আর তার আব্বার আস্থা আমি কখনও হারাইনি, কিন্তু আমার career নিয়ে পাগলামিটা তার আম্মা ক্ষমা করতে পারেননি। কোনো মা তার মেয়েকে এমন বৈষয়িক বুদ্ধিহীন লোকের কাছে তুলে দেন, তুমিই বলো! কাজেই বিয়ে আমাদের হয়নি। ওকে পাবো না এ কথা অবচেতনে বুঝতে পেরে অবর্ণনীয় এক বিষাদে ভুগতাম। কখনও আবার ভাবতাম, অলৌকিকভাবে ওকে আমি পেয়ে যাবো, সব ঠিক হয়ে যাবে। চিরকাল কল্পনায় বাস করেছি, বাস্তব চিনিনি। ভয়াবহ বাস্তবের কথা ভুলে থাকতেই যেন আমি তোমার বন্ধুত্বের দিকে হাত বাড়াই। ওকে ভুলে তোমাকে নিয়ে মাতামাতি করেছি, এ কথা ঠিক না। তোমার উন্নত বুদ্ধিমত্তা, তোমার সুস্থির সহৃদয়তা আমাকে সাহায্য করেছে ক্রাইসিস সামাল দিতে। বিষণ্নতার কথা বলছিলাম। বুঝলে নাঈম, তরুণরা যখন তারুণ্য উপভোগ করে, আমি তখন আচ্ছন্ন থেকেছি জরা আর মৃত্যুর চিন্তায়। ‘অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়, আরো এক বিপন্ন বিস্ময়ে’ হতবাক হয়ে, brooding করেই যেন পার করে দিলাম আমার তারুণ্য। তাতে অর্থময়তা যোগ হয়েছিল অবশ্য মার্মেইডের কারণেই। কিন্তু সে বেচারিও শেষতক আমার হলো না। ওকে অবশ্যি ভালোবেসেছি great passion নিয়ে। মেয়ে হয়েও বেচারি তাল মেলাতে পারতো না আমার প্রবল আবেগের সঙ্গে। (হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টে) আসলে নাঈম, আমার উচিত ছিল আমার দাদার জীনবটা পাওয়া। তেমন জটিলতা নেই, চাকরি-বাকরির ঝামেলা নেই। আরাম-আয়েশে আশি বছর পার করা যেতো। তোমার মতো হাই-প্রফাইল, এলিগ্যান্ট একটি বউও জুটে যেতো। হেসো না, আমার দাদি কিন্তু বেজায় সুন্দরী ছিলেন। তোমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তোমায় ঘাবড়ে দিতে পারতাম। আমার জীবনের প্রথম দুই বান্ধবীর একজন তিনি, অন্যজন আমার নানি। ইনি উল্টো, দেখতে নেলসন ম্যান্ডেলার বোন। তবে আরবি, ফার্সিতে সুপণ্ডিত, হামদ আর নাত গাইতেন চমৎকার। দেখতেও মন্দ ছিল না। আমার শৈশবের মজবুত ইসলামি শিক্ষা তাঁরই হাতে।

– তোমার এই দিকটা আমার ভালো লাগতো। বুঝতাম সাহিত্য তোমায় লিবারেল মানুষ বানিয়েছে। কিন্তু ধর্মের প্রতি তোমার শ্রদ্ধা ছিল- ইসলামের প্রতি, অন্য ধর্মের প্রতিও। মায়া-মমতাও অনেক ছিল তোমার। এখানেও মেয়েরা তোমার কাছে হার মানবে। (হেসে) থাক, আহ্লাদে আটখানা হতে হবে না। দোষও তোমার কম ছিল না, সে সব আর বললাম না। (হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে) আচ্ছা পোগো, নিজের জীবনকে যে তুমি তখনো ব্যর্থ বলতে, এখনও বলো, এর জন্য কি মেয়েদের দায়ী করবে তুমি?

– মোটেও না। নিজেকে ছাড়া কাউকে দোষ দিই না আমি। মার্মেইড আমায় দুঃখের চেয়ে সুখ অনেক বেশি দিয়েছে, বন্ধু হিসেবে তুমিও ছিলে পজিটিভ মানুষ। আমার বিবিও উদার, পজিটিভ, প্রেরণাদাত্রী। এরপরও নিজের ব্যর্থতার জন্য নারীকে কি করে দায়ী করি? নারীকে আমি শুধু ভালোবাসিনি, শ্রদ্ধাও করেছি। পেডেস্টেলে বসিয়ে ওয়ার্শিপ করেছি। তাদের পরিবারকে সম্মান করেছি। আমার কোনো আফসোস নেই। আবার জন্মালেও এভাবেই বাঁচতাম। শুধু মনের মতো একটি পেশা চাইতাম। প্রাণভরে লেখালেখি করতাম। এসব কথা আর না নাঈম। তোমার মনটা খারাপ করতে চাই না। তোমার কথা মনে পড়ত খুব, চিঠি লিখে জ্বালাতে ইচ্ছা করত। তোমার পেছনে লাগা এক সময় আমার প্রিয় কাজ ছিল। শেষতক চিঠি লেখা হয়ে উঠতো না বোধহয় মার্কের ভয়ে (হাসি)।

– ভয়ে, না? আলসে বুড়ো, সময়মতো কোনো কাজ কখনও করতে পেরেছো তুমি? আবার আমার কাছে চিঠি!

– পোগোকে আর যাই বলো বুড়ো বলে গাল দিও না। জানো তো শার্ল বোদলেয়ার কী বলেছিলেন? ইচ্ছেমতো যে বাল্যকালকে পুনরুদ্ধার করতে পারে সেই তো প্রতিভাবান। এই হিসেবে আমিও প্রতিভাবান। কেরানির জীবন পার করলে কী হবে, চিত্ত আমার এখনো কিশোরের।

– সত্যি? চিরকিশোর মশাই, কিশোরীদের সঙ্গে ভাব করতে ইচ্ছে করে নাতো? আর শোনো, কথায় কথায় কেরানি কেরানি করো না তো।

– তোমার মতো বন্ধুকে কি করে ভুলি? বন্ধুত্বের বেলায় ওল্ড ইজ সত্যি সত্যি গোল্ড। নাঈম, তোমার কথা বলো। নিজের কথা তো তোমার লাই পেয়ে অনেক বললাম। বয়স হওয়ার এই এক দোষ। কথা বলতে খুব ভালো লাগে। অবাক কা-, কৈশোরে শৈশবে ছিলাম ইন্ট্রোভার্ট। অবশ্য এখনও সবার সামনে মুখ খুলি না।

– আমার আর কি কথা। দিন চলে যাচ্ছে। তুমি যখন জ্বালাতে আমায়, তখন শুধু একটি এম.এ ডিগ্রি ছিল আমার সাংবাদিকতায়। পরে একটি পিএইচডিও পেয়েছি। বিষয় ছিল মুসলিম জার্নালিজম ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া। তুমি এই খবর শুনে খুশি হবে জানতাম। (বিনীত হাসি) আর কি বলবো বলো?

– ভক্ত জোটেনি? আমার মতো জ্বালায়নি আর কেউ?

– (ছদ্মগাম্ভীর্য) নো কমেন্টস। (হাসি) হাড়ে হাড়ে বদমাশ তুমি। তোমারও একটি কচি সংস্করণ দরকার। তাড়াতাড়ি বাচ্চা নাও।

– প্রশংসার জন্য ধন্যবাদ। নাঈম, তোমার মুখের ইংরেজিটা বেজায় ভালো ছিল। আমি বিশ বছর বয়স থেকে এলিয়টভক্ত হয়েও তোমার সঙ্গে তাল রাখতে হিমশিম খেতাম। বম্বের সঙ্গে ঢাকা পারবে কেন, তাই না?

– সে তো ঠিক। তোমার ইংরেজির কিন্তু সাহিত্যগুণ ছিল। তোমার কথাবার্তা পোয়েটিক ছিল (মিষ্টি হাসি)।

– বাঘিনীর মুখে আমার এতো প্রশংসা। আপসোস এই, চল্লিশ পেরিয়ে এমন সুন্দর সব কথা শুনতে হলো। পনের বছর আগে তো শুধু বকাই শুনতাম।

– বকাই শুনতে, না? অকৃতজ্ঞ বদমাশ। আড়ালে তোমার কতো প্রশংসা করেছি। তোমার কি আর সে সবের খোঁজ নেওয়ার সময় ছিল? আমায় দেখলেই ছুটতে কানে কবিতা ঢালতে। ‘আমি ভুবন ভ্রমিয়া শেষে এসেছি নতুন দেশে/ওগো বিদেশিনী…।’ এখনও আমার কান লাল হয়ে আছে। এতো কবিতা তাতে ঢালতে! (হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে) পোগো, তুমি এখনো হতাশ কেন? তারুণ্য পার করেও বিষণ্ন কেন?

– (হঠাৎ চশমা খুলে শান্তভাবে মুখটা দেখিয়ে) দেখো, দিস ইজ এ সাফারার্স ফেইস। রবীন্দ্রনাথের একটি কথা একটু ঘুরিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, বিধাতা একটুখানি সংবেদনশীল মন যাহাকে দিয়াছেন, বক্ষে তাহার বেদনা অপার। আমাদের শামসুর রাহমানকে নিয়ে আকৈশোর আমি কতো গর্ব করেছি, তুমি তো জানো। তিনি কি বলেছেন শোনো- ‘আমার হৃৎপিণ্ডে শুনি দ্রিমিকি দ্রিমিকি দ্রাক দ্রাক/ দুঃখ শুধু বাজায় নিপুণ তার ঢাক।’ আমার প্রিয় মার্কিনি কবি ফ্রস্টের ‘I shall be telling this with a sigh/Somewhere ages and ages hence’ মনে করো। জীবনে চলতে গিয়ে পোগোরা সেই পথ দিয়ে হাঁটে, যা ‘less travelled b ‘  অতএব, চল্লিশ পার করে sigh তে ফেলতেই হবে। তরুণ হিসেবেই যেন তা জানতাম। জীবনে প্রাপ্তি শুধু জ্ঞানী বুজুর্গের স্নেহ, শিশুর ভালোবাসা আর নারীর প্রেম। তৃতীয়টার মূল্য সবচেয়ে চড়া। এতো মূল্য দিতে হয় প্রেমের জন্য! আবার এ ছাড়া জীবনও অর্থহীন লাগে।

– যখন তরুণ ছিলে, বুদ্ধিমান মানুষ হয়েও, কষ্ট লালন করেও কাউকে বুঝতে দিতে না। সবকিছুতে হাসতে, হইচই করতে। এখন তোমার চোখের কোণে দুঃখের ছাপ দেখে আমার কষ্ট হয়। (একটু চুপ থেকে) তবু ভালো লাগে যে, তুমি বিটার নও মোটেও। অন্যের প্রতি তোমার সহানুভূতি, শুভেচ্ছার কোনো ঘাটতি দেখি না। আসলে অন্যের প্রশংসা করার ব্যাপারে তোমার মতো উদার লোক কমই দেখেছি। শুধু আমার প্রশংসা কম করতে। (মুখ টিপে হাসি) আজকে একটু প্রশংসা করো না। করো না।

– (হেসে ফেলে) করছি বাবা, করছি। (সোজা হয়ে বসে) তোমাকে নিয়ে যে আমার কিছু সুন্দর স্মৃতি আছে, তার সেরাটি আজ সুযোগ পেয়ে তোমায় মনে করাই। এই ঘটনাটি আমার আজীবন মনে থাকবে। ভিড়ের মার্কেটে নিয়ে গেছো আমায় তুমি, সঙ্গে আমাদের মুরুব্বি ডক্টর ফোরম্যানের বিবি। আমি মার্কেটের দিকে হতাশ হয়ে তাকিয়ে মুখ কালো করো বললাম, ‘এর ভিতর ঢুকবে তুমি? আমার ভালো লাগছে না।’ ‘কেন?’ তুমি অবাক হয়ে জানতে চাইলে। ‘সবাই তোমার দিকে হাঁ করে তাকাবে, তোমাকে ধাক্কা দেবে। আমার সহ্য হবে না।’ কথা শেষ করেই বিস্মিত হয়ে দেখি, তুমি অপলক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। চোখ একটু ছলছলই করছে হয়তো। এর কদিন পরই তোমাদের ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা। তুখোড় স্মার্ট বম্বের বিদুষী ময়মনসিংহের বাঙালের বিস্মিত ও একটু অপ্রস্তুত মুখের দিকে ছলছল চোখে মুগ্ধ হয়ে মায়া ভরে তাকিয়ে। আমার আপাত রিডিকুলাস একটি উক্তি এমন সাবলাইম একটি মুহূর্তের জন্ম দেবে ভাবিনি। আমি যেন এক পলকে বুঝে ফেললাম, তোমার প্রতি আমার বন্ধুসুলভ স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা বৃথা যায়নি।

– (গর্বিত ও আনন্দিত মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে) অবশ্যই বৃথা গেছে, বোকা হাবারাম।

– হাঃ হাঃ হাঃ। যাক বৃথা। ময়মনসিংহের বাঙাল আফসোস করে না। কলজে লাইফ সাইজের চেয়ে বড়ো, বুঝেছো? এই বাঙাল সহজে কারো জন্য মনের দুয়ার খোলে না, খুললে আজীবন তাকে ভোলে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares