গল্প : শাহাবুদ্দীন নাগরী

গল্প

আলোছায়া স্টুডিও

শাহাবুদ্দীন নাগরী

 

গিয়াসউদ্দিনের বুকের ভেতরটা চিন্চিন্ করে।

অন্যদিনের মতো আজও সকাল ন’টায় দোকানের শাটার তুলেছিল ও। ফুটফরমাসখাটা হারুন ছেলেটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল আগে থেকেই। চোখ দেখে মনে হয়েছিল ও বোধহয় রাতে ঘুমোয়নি। কেমন মলিনমুখে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। আজ হারুনকে চাবি দেয়নি ও। নিজেই তালা খুলে শাটার তুলেছিল। হারুন পুরোনো গামছাটা দিয়ে কাউন্টারের ধুলো মুছতে মুছতে বলেছিল,

‘দাদা, আপনে বসেন, আমি চা নিয়া আসি।’

চোখ দিয়ে টপ্টপ্ করে পানি পড়ছিল ওর। আড়াল করছিল হাত দিয়ে। গিয়াসউদ্দিনের চোখ এড়ায়নি সেটা। তারও চোখ দু’টো ঝাপসা হয়ে উঠছিল। তাই মুখটা ঘুরিয়ে নিয়েছিল পাশে।

উপজেলার মূল সড়কের একপাশে সরকারি কলেজ, আর বিপরীত পাশে একসারি টিনশেডের  দোকান। সেই দোকানেরই একটা প্রায় ত্রিশ বছর আগে ভাড়া নিয়েছিল গিয়াসউদ্দিনের বাবা রমিজউদ্দিন। গিয়াসউদ্দিন তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ে।

দোকানের জন্য বায়নাপত্র করে এসে রমিজউদ্দিন স্ত্রীকে বলেছিল,

‘ব্যবসাটা মন্দ হবি না গিয়াসের মা। কলেজের সামনে তো, ছবি তুলি শেষ করতি পারব না।’

মাথার ঘোমটাটা আরেকটু সামনে টেনে নিয়ে ওর মা মরিয়ম বানু বলেছিল,

‘চৌদ্দ পুরুষের কিষিকাজ ছেইড়ে দিতি আপনার খারাপ লাগবি না?’

‘ও-তো বর্গা দিয়া দিলাম। যা পাই সিটাই লাভ। সবাই কলো, আমি যা করতি যাইতিছি, সেটাতি ম্যালা লাভ। স্কুল-কলেজের ছেলেমেইয়েরা সেই জিলা সদরে ছবি তুলতি যায়। ঘরের কাছে স্টুডিও পালি কি আর সদরে যাবি ওরা ?’

‘যা মনে লয় আপনি করেন। আপনার বুদ্ধিসুদ্ধি তো কম দিখিনি কুনুদিন।’

মা-বাবার এই কথোপকথন আড়াল থেকে শুনেছিল গিয়াসউদ্দিন। সব কথা শুনে ও বুঝেছিল কলেজের উল্টোদিকে ওর বাবা ছবি তোলার একটা দোকান খুলতে যাচ্ছে। তখন গিয়াসউদ্দিনের এসব ব্যবসায় বোঝার বয়স হয়নি, ও কোনদিন ওর ছবিও তোলেনি। বড়দের অনেকের ছবি সে দেখেছিল, তখন ও অবাক হয়ে ভাবতো, মানুষ ছবি উঠায় কীভাবে? এখন নিজেদের দোকান হচ্ছে, ও অনেক ছবি তুলবে আর জমিয়ে রাখবে ওদের কাঠের আলমারিতে।

পরে স্কুলে আসা-যাওয়া করার সময় ও দেখেছে, মিস্ত্রিরা দিনরাত কাজ করছে দোকানটা সাজাবার জন্য, আর ওর বাবা ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ তদারকি করছে।

দশ-বারো দিনেই রেডি হয়ে গিয়েছিল দোকানটা। পাশে রহমত চাচা খুলেছিল ষ্টেশনারি আর বইয়ের দোকান। খাতা-পেন্সিল-কলম থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের বই-পুস্তক তুলেছিল দোকানটায়। নাম দিয়েছিল ‘রহমত এন্ড সন্স স্টেশনারি’।

ওর বাবা ওদের দোকানটার নাম রেখেছিল ‘আলোছায়া স্টুডিও’।

দোকানের ওপর বড় বড় লাইট দিয়ে সাইনবোর্ডটা যেদিন লাগানো হয়েছিল, গিয়াসউদ্দিনের মনে আছে, সেদিন দোকানে মিলাদ পড়িয়েছিল ওর বাবা। সেই মিলাদে কলেজের প্রিন্সিপ্যাল, স্কুলের হেডমাস্টার থেকে শুরু করে এলাকার ময়মুরুব্বি এবং গণ্যমান্য লোকজন উপস্থিত হয়েছিল। নতুন দোকান বলে লাইট লাগানো হয়েছিল সাজসজ্জার জন্য। লাইটের আলোগুলো দোকানের একপাশ থেকে অন্যপাশে জ্বলতে জ্বলতে যেতো। সামনের দিকে ছিল কাউন্টার, আর ছবি তোলার জন্য বোর্ড দিয়ে আলাদা করা পেছনের ঘরে ঢুকতে হতো একটা দরজা দিয়ে। দরজার উপরে রঙিন কাগজ দিয়ে বানানো ‘স্বাগতম’ লেখাটা আটকে দিয়েছিল ওর বাবা। ছাতা, লাইট, টুল, স্ক্রিন রাখা ঘরটার পাশে আর একটা ছোট ঘর ছিল। ঐ ঘরের দরজার উপরে লেখা ছিল ‘ডার্করুম’। ওখানে নাকি অন্ধকারে নেগেটিভ-পজিটিভ কাজ করা হবে, তারপর প্রিন্ট করা হবে ছবি।

স্টুডিও মানে ঠিক কি তখনও বুঝত না গিয়াসউদ্দিন। বাবার কাছে জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি ওর। তাই শেষ পর্যন্ত রহমত চাচার কাছেই জানতে চেয়েছিল,

‘আচ্ছা চাচা, বাবায় যে দোকানের নাম রাখলি আলোছায়া স্টুডিও, আপনি কি কতি পারেন স্টুডিও মানে কি? আর আলোছায়া দিলো ক্যান?’

হেসেছিল রহমত চাচা।

‘স্টুডিও মানে হলি গিয়ে ছবি তোলার দোকান। আর আলোছায়া মানে আলোর কেরামতি। আলো বানাও, আবার আলো আটকাইয়া ছায়া বানাও। ছবি হলি গিয়ে আলোছায়ার খেলা। বুঝতি পারলা বাবা ?’

গিয়াসউদ্দিন কিছুটা বুঝতে পেরেছিল ‘আলোছায়া স্টুডিও’ নামের মহিমা। তার বাবা যে একটা যথার্থ নাম দিয়েছে সেজন্য খুশি হয়েছিল সে। দোকানটা চালুর আগে কোলকাতা থেকে সাইনবোর্ড বানিয়ে এনেছিল ওর বাবা, বেশ খরচ হয়েছিল সেজন্য। তখন এধরনের সাইনবোর্ড বাংলাদেশে তৈরি হ’ত না। রমিজউদ্দিন বলেছিল, এটাকে কোলকাতার লোকেরা স্ক্রিন-প্রিন্ট বলে। হয়তো তাই রাস্তা দিয়ে যাবার সময় সবাই একবার হলেও ঝক্ঝকে সাইনবোর্ডটার দিকে তাকাত। ঢাকা থেকে দু’টো ক্যামেরা কেনা হয়েছিল। একটা ইয়াশিকা, আর একটা ক্যানন। ইয়াশিকাটা ছিল একটু বড় ক্যামেরা, ফিল্ম ঢুকিয়ে দিলে এক রোলে শাদা-কালো বারোটা ছবি পাওয়া যেত, আর ক্যানন ক্যামেরাটা কেনা হয়েছিল রঙিন ছবি তোলার জন্য। এক রোলে ছবি উঠত ছত্রিশটা। ফুজিকালার-কোডাক ফিল্ম ব্যবহার করতে হ’ত। রঙিন ছবির রেট বেশি ছিল বলে শাদা-কালো ছবি বেশি চলত। রঙিন ছবির চাহিদা বাড়ানোর জন্য রমিজউদ্দিন দু’টো ব্যাক-স্ক্রিন বানিয়েছিল। গ্রাম-বাংলার সবুজ প্রান্তর আর নদী ছিল স্ক্রিনগুলোয়। যাদের হাতে টাকা-পয়সা থাকত তারা সখ করে ঐ স্ক্রিনের সামনে বসে ছবি তুলত। বিভিন্ন সাইজে ছবি ডেলিভারি দিতে হ’ত রমিজউদ্দিনকে। তবে শাদা-কালো ছবি বেশি তুলত সবাই, পাসপোর্ট সাইজের ছবির চাহিদা ছিল সবসময়। স্কুল-কলেজের জন্য ছবি লাগত, চাকুরির আবেদনের জন্য ছবি লাগত, ব্যবসায়-বাণিজ্যসহ আরও নানা কাজে ছবি লাগত বলে সারাদিন দোকানে ব্যস্ত থাকতে হ’ত রমিজউদ্দিনকে। দুপুরে ভাত খাওয়ার সময়ও পেত না। বাড়ি থেকে আনা ভাত জুড়িয়ে যেত।

বালক গিয়াসউদ্দিনকে তখন দোকানে বসতে দেয়নি রমিজউদ্দিন। বলেছিল,

‘আগে লেখাপড়া শ্যাষ করো, তারপর বসতি পারো।’

কিন্তু ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর আর পড়েনি গিয়াসউদ্দিন, পড়াশোনা করতে নাকি ভালো লাগত না। তাছাড়া ডিগ্রি পড়তে হলে জেলা সদরে গিয়ে পড়তে হ’ত বলে রমিজউদ্দিনও চাপাচাপি করে নি। গিয়াসউদ্দিন স্টুডিও’তে বাবাকে সাহায্য করতে শুরু করেছিল। ছবি তোলার জন্য লাইট, ছাতা আর ক্যামেরা সে বাবার কাছে বুঝতে চেষ্টা করেছিল বেশ অনেকদিন। ডার্করুমে বাবার পাশে বসে ছবি ডেভলপ করা দেখত সে। বিভিন্ন সাইজের ছবি তৈরি করার কৌশল অল্প দিনেই রপ্ত করে নিয়েছিল গিয়াসউদ্দিনও। সে বুঝত, বাবার বয়স হচ্ছে, দোকানের হাল তাকেই ধরতে হবে একদিন। তাই সে বাবার প্রত্যেকটা কাজ মনোযোগ দিয়ে দেখত, কখনও কখনও প্রিন্টের নানা ডিজাইন সে নিজে নিজে বের করত। রমিজউদ্দিন খুশি হ’ত ছেলের এই আগ্রহ দেখে। গ্রাহকের রুচি পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করে দোকানের ডেকরেশন পাল্টেছে নিয়মিত । খরচ হয়েছে, কিন্তু তা উঠেও এসেছে স্বল্প সময়ের ভেতর।

পাঁচ-ছয় বছর বাবার সহকারি হিসেবে কাজ করেছিল গিয়াসউদ্দিন। ততদিনে ভালো ফটোগ্রাফার হয়ে উঠেছিল সে। শুধু স্টুডিওর তোলা ছবিতে ব্যবসায় সীমাবদ্ধ রাখেনি ওরা। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিয়ে, গায়ে-হলুদ, বনভোজন, খেলাধূলা, রাজনৈতিক জনসভার ছবি ইত্যাদির অর্ডার পেলে গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে বেরিয়ে যেত গিয়াসউদ্দিন। এসব অর্ডারে রঙিন ছবিই তুলতে হ’ত বেশি। ভালো টাকা হাতে আসত। সে যে পারবে এরকম একটা নিশ্চয়তা বাবার ভেতর তৈরি করে একদিন সত্যি সত্যি বাবাকে স্টুডিও’র কাজ থেকে অবসর দিয়েছিল সে। বয়স্ক মানুষটা আর কত পরিশ্রম করবে ?

‘সারাজীবন তো শুধু কামই করলেন, এইবার একটু রেস্ট করেন, আমি চালায়া নিতি পারবো।’

ছেলের এই কথায় খুশিই হয়েছিল রমিজউদ্দিন, তাই একদিন মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে ক্যাশ কাউন্টারের চাবিটা তুলে দিয়েছিল ছেলের হাতে। বলেছিল,

‘মন দিয়া কাম করবা, ফাঁকি দিবা না, লোকজনরে ঘুরাইবানা। দেখবা আল্লাহ্র বরকত তোমার সঙ্গে সঙ্গে থাকবি।’

বাবার কথা একদিনের জন্যও ভুলে যায়নি গিয়াসউদ্দিন। বরং বইপত্র পড়ে কীভাবে আরও ভালো ছবি তোলা যায়, গ্রাহককে আরও বেশি খুশি করা যায় এসব নিয়ে প্রতিনিয়ত ভাবত এবং সেভাবে নিত্যনতুন প্রিন্ট ডেলিভারি দিয়ে ব্যবসাটাকে সে আরো রমরমা করে তুলেছিল। প্রতিদিন গড়ে ত্রিশ-চল্লিশটা ছবি তুলতে হ’ত স্টুডিওতে, রাত দশটা পর্যন্ত কাজ করে সবকিছু গুছিয়ে দোকান বন্ধ করত সে।

এই ‘আলোছায়া স্টুডিওতে বহু-বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে ওর। কত ছেলে-মেয়ে, ছাত্র-ছাত্রী, লোকজন সুন্দর ছবির জন্য নানান অঙ্গভঙ্গি করত লাইট জ্বলে উঠলে। হাসতে বললে দাঁত কেলিয়ে হাসত কেউ, কেউ দিত মুচকি হাসি। সোজা হয়ে বসতে বললে এমনভাবে শিরদাঁড়া সোজা করে বসত যে থুতনিটা হাত দিয়ে ধরে উপরে বা নিচে নামানো যেত না। মেয়েরা দল বেঁধে ছবি তুলতে আসত প্রায়সময়। দু’জনের বসার টুলে পাঁচজন চাপাচাপি করে বসে বলত,

‘ভাইজান, এমুন ছবি তুলিবেন, য্যান সবাইরে মুটা আর ফর্সা লাগে।’

কিন্তু ক্যামেরা যে চিকন মানুষকে মোটা আর কালো মানুষকে ফর্সা করতে পারে না এটা স্কুলপড়–য়া মেয়েগুলোকে বোঝাতে পারত না।

স্টুডিওতে চিরুনি, ব্রাশ, আয়না, পাউডার, লিপস্টিক, টাই, গলার মালা, কপালের টিপ, চুলের ব্যান্ড সবকিছুর ব্যবস্থা রেখেছিল গিয়াসউদ্দিন। একটা কালো রঙের কোটও জেলা সদরের পুরাতন কাপড়ের বাজার থেকে অল্পদামে জোগাড় করেছিল। অনেকে টাই-কোট পরে ছবি তুলতে চাইত, চাওয়াটা যাতে অপূর্ণ না থাকে তারই আগাম ব্যবস্থা ছিল ওর।

এই দোকানেই গিয়াসউদ্দিন প্রথম দেখেছিল রানুকে। তিন বান্ধবী এসেছিল ছবি তুলতে। প্রত্যেকের পাসপোর্ট সাইজ ছবি এবং তিনজনের একটা গ্রুপ ছবি তুলেছিল। আশপাশের মেয়ে হলে গিয়াসউদ্দিন চিনত, কিন্তু কখনও দেখেনি ওদের। হয়ত দূরের কোনো ইউনিয়নের মেয়ে হতে পারে ভেবে গিয়াসউদ্দিন জিজ্ঞেস করেছিল,

‘আপনাগের আগে কখনও দেখিছি বলি মনে হচ্চে না। বাড়ি কুনহানে কন্ দেহি ?’

বেশ ভারিক্কি একটা ভাব নিয়ে রানুই বলেছিল,

‘বাড়ির খবর নিতিছেন যে ? ছবি তুলতি আইছি ছবি তুলি দ্যান। ঘরবাড়ির খবরের কী দরকার ?’

একটু অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল গিয়াসউদ্দিন। মেয়েটা যে এমন ঠোঁটকাটা জবাব দেবে ভাবতে পারেনি ও। কিন্তু পুরুষ মানুষ বলে কথা, সহজে হার মানে না। কথাটা হজম করে নিয়ে ও বলেছিল,

‘মানুষের সঙ্গে পরিচয় থাকাডা তো খারাপ না আপা। আর আমি তো চোর-ডাকাইত না যে রাইত দুপুরে আপনাগের বাসাবাড়িত হানা দি সোনা-দানা লুট করবো।’

‘চোর-ডাকাত না বুঝতি পারলাম, কিন্তু হতি কতক্ষণ ?’

‘তাইলে তো আপা আলোছায়া স্টুডিওতে লাল বাতি জ্বলি যাবে।’

রানুর সঙ্গি একজন বান্ধবী বলেছিল,

‘ভাইজান, আমরা রসুলপুরে থাকি। এই কলেজে ভর্তি হতি আইছি।’

রসুলপুর সাত-আট কিলোমিটার দূরে। ঐ এলাকার মানুষজনকে না চেনারই কথা গিয়াসউদ্দিনের। মুখগুলো তাই অচেনা ছিল ওর কাছে।

‘আপনারা কি সিখান থেইকে আসি আসি কিলাশ করিবেন ?’

এই প্রশ্নের কোন জবাব দেয় নি ওরা। হুড়হুড় করে ঢুকে পড়েছিল স্টুডিওর ভেতর। যেন ভীষণ তাড়া ছিল ওদের।

ক্যামেরার লেন্সের ভিতর দিয়ে চোখটা ওর রানুর মুখের ওপর পড়েছিল। কেমন একটা মায়াবতী চেহারা, পরিচ্ছন্ন মুখ, কোনো কপটতা বা ভান-ভনিতা ছিল না। কতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে ক্যামেরার ভেতর দিয়ে তাকিয়েছিল মনে নেই গিয়াসউদ্দিনের, বাস্তবে ফিরে এসেছিল মেয়েটির মৃদু ধমকে।

‘ভাইজানের চক্ষু কি ক্যামেরায় আটকায়া গেইছে ?’

চোখ যে আটকে গিয়েছিল সেটা ভুল ছিল না। তাইতো ছয় মাসের মাথায় রসুলপুরের জামসেদ মাতব্বরের মেয়ে রুনা আফরোজ ওরফে রানুকে সে বউ করে ঘরে তুলে এনেছিল। বিয়েতে দশ রোল রঙিন ছবি তুলেছিল গিয়াসউদ্দিনের বন্ধু জামাল আলোছায়া স্টুডিও’র ক্যামেরা দিয়ে। চারদিন দোকান বন্ধ রাখতে হয়েছিল তখন। গিয়াসউদ্দিনের আজ মনে হয় সবই যেন গতকালের ঘটনা।

স্টুডিও’র  দেয়ালে আটকানো ঘড়িটার দিকে চোখ যায় গিয়াসউদ্দিনের। ছয়টা বাজি বাজি করছে। রাস্তার দিকে তাকায় ও, এই সন্ধ্যেবেলাতেও মফস্বলের উপজেলা সদরে মানুষজনের কমতি নেই। আগের চেয়ে ইঞ্জিনের গাড়ি বেড়েছে অনেক। রিকশা-ভ্যান আর ব্যাটারির অটো-রিকশা ধুলো উড়িয়ে ছুটে যাচ্ছে এদিক-সেদিক। আজকের সন্ধ্যেটা খুব বিষণœ মনে হচ্ছে গিয়াসউদ্দিনের, মনে হচ্ছ সবাই যেন ওকে ছেড়ে দূরে চলে গেছে। আগে যে দোকানটায় তার বাবা ব্যস্ততার সাথে কাজ করেছে, বাবার কাছ থেকে দায়িত্ব নেবার পর নিজেও একটু আড্ডা দেয়ার ফুরসৎ পায়নি, আজ দশ বছর হয় সে ব্যবসায় মরানদীর মাটি জমতে শুরু করেছে। গত দু’বছর মাসের দোকান-ভাড়া আর বিদ্যুৎ খরচটাও জোগাতে পারেনি ছবি তুলে।

রমিজউদ্দিন দেখেছে এসব, গিয়াসউদ্দিন যে মনমরা হয়ে রাতে বাড়ি ফেরে সেটা তার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। গিয়াসউদ্দিন বাবাকে অনেক কিছু খুলে বলত না প্রথম প্রথম, কিন্তু সংসারের সবকিছুতে ক্রমান্বয়ে মান কমে যেতে দেখে রমিজউদ্দিন আন্দাজ করে নিয়েছিল ব্যবসায়ে ভাঁটা পড়ছে। গিয়াসউদ্দিন দেখছিল কীভাবে একটা সচল ব্যবসা প্রযুক্তির কল্যাণে হারাতে শুরু করল তার জৌলুস এবং একসময় তা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল রেলের পুরাতন বাতিল ইঞ্জিনগুলোর মতো। বাবাকে সে তার থেকে কিছু ছিঁটেফোঁটা বলেছিল, না বললেও পারত। বাবার হাতে গড়া ব্যবসার এমন চরম পরিণতি হবে তা বলে সে বাবাকে কষ্ট দিতে চায়নি।

পরিণতির শুরুটা মোবাইল ফোন দিয়ে। এ যেন ছিল আলাদীনের যাদুর চেরাগ। গ্রামে বসে আমেরিকায় কথা বলা যায়, এ যে কল্পনারও অতীত ছিল মানুষের কাছে। আস্তে আস্তে সব মানুষের হাতে হাতে চলে এল ফোন। গিয়াসউদ্দিনও কিনেছিল একটা, রানুকেও একটা কিনে দিয়েছিল। দোকানে পেপার-কেমিক্যালস্-ফিল্মের প্রয়োজন পড়লে জেলা সদরে মোবাইলে ফোন করে দিত, হোল-সেলাররা লোক পাঠিয়ে তার দোকানে মালামাল দিয়ে যেত। শহরে যাবার ঝক্কি-ঝামেলা কমে যাওয়াও একপ্রকার খুশিই হয়েছিল গিয়াসউদ্দিন। কিন্তু হঠাৎ করে একসময় চোখে পড়ল ওর, মানুষের হাতে নতুন ধরনের ফোন। টেপাটেপি করতে হয় না, ফোনের ওপর আঙুলের ঘষা দিয়ে কানে নিলেই কথা বলা যায়। প্রথম প্রথম গ্রামের দু’চারজন কিনেছিল এই ঘষাঘষি ফোন। ওর স্কুলের দোস্ত আমিন একদিন সে ধরনের একটি ফোন নিয়ে এসেছিল ওর দোকানে, ও প্রথমে বুঝতে পারেনি।

‘দোস্ত, হাতে কী তোমার?’

আমিনের কাছে জানতে চেয়েছিল গিয়াসউদ্দিন।

গ্রামের জোতদারের ছেলে আমিন, নিজেও অঢেল টাকাপয়সার মালিক, টনকে টন ধান কিনে চাউল ব্যবসায়ীদের কাছে সাপ্লাইয়ের ব্যবসায় করে। সব নগদ লেনদেন, সবসময় ওর হাতে কাঁচা টাকার গন্ধ লেগে থাকে।

‘আর কী কবো কও? শহরে গিয়া দেখি এই আজব মোবাইল ফোন মানুষের হাতে। কলো, এটা নাকি স্মার্টফোন, ফোনের মতো কথা কতি পারবা, আবার ফটো-ভিডিও সবই তুলতি পারবা।’

বলেই একটা ছবি তুলেছিল গিয়াসউদ্দিনের। ফ্লাশবাতির আলো জ্বলে উঠেছিল ঐ ফোনে। তারপর ফোনের ওপর আঙুল ঘষে ঘষে ওকে দেখিয়েছিল ওর ছবিটা।

সেদিন আমিন আরও বলেছিল,

‘তোমার এহানে তো হবি না, শহরে নিয়া বড় স্টুডিওতে মোবাইল ফোনটা দিলে এই ছবি প্রিন্টও করি দিতি পারবি। মিথ্যা কোছিনা দোস্ত, এক্কেরে সত্যিকার কথা।’

সেই স্মার্টফোন একসময় এলাকার ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে সব মানুষের হাতে হাতে উঠে আসে। গিয়াসউদ্দিন তখন থেকে দেখতে শুরু করেছে, স্টুডিওতে মানুষের আসা কমে যাচ্ছে। এখানে-ওখানে, রাস্তাঘাটে, পুকুরপাড়ে, নদীর ঘাটে মানুষজন সুযোগ পেলেই ছবি তুলছে। আসলে মোবাইল স্মার্টফোন শুধু ফোন নয়, যেন একটা জলজ্যান্ত ডিজিটাল ক্যামেরা। আসল ডিজিটাল ক্যামেরা তাদের উপজেলায় বেশ কয়েকটা আছে। অনেক ছবি তোলা যায়। স্মার্টফোনেও ফিল্ম লাগে না বলে শত শত ছবি তুলতে কোন খরচ হয় না। কিন্তু সমস্যা হয় এখানে ছবি প্রিন্ট করা নিয়ে। ডিজিটাল স্টুডিও না হলে এসব ছবি প্রিন্ট করা যায় না। ফলে গিয়াসউদ্দিন খুব একটা আতঙ্কিত হয়নি ব্যবসা নিয়ে। কিন্তু যেদিন এমপি সাহেব সাড়ম্বরে আলো ঝল্মলে ‘জালাল ডিজিটাল ফটো এন্ড স্টুডিও’ উদ্বোধন করল চৌরাস্তার মোড়ে, সেদিন সত্যি সত্যি ঘাবড়ে গিয়েছিল গিয়াসউদ্দিন। কাচ দিয়ে ঘেরা বিশাল এয়ার-কন্ডিশন্ড স্টুডিও, দামি ডিজিটাল প্রিন্টার, কম্পিউটার নিয়ে ডিজিটাল স্টুডিও ঘোষণা দিয়েছিল- ‘দশ মিনিটে রঙিন ছবি ডেলিভারি দেওয়া হয়’, সেদিন সে আলোছায়া স্টুডিও’র শেষ পরিণতি বুঝে গিয়েছিল। মোবাইল ফোন থেকে ছবি প্রিন্ট করার সুবিধাও ছিলো এই স্টুডিও’তে। তার এখানে কে আসবে তাহলে? আর এমপি সাহেব ধনী মানুষ, তার সঙ্গে পাল্লা দেয়া কি সহজ?

চার-পাঁচ বছর আগের ঘটনা এসব। কলেজের একেবারে মুখোমুখি দোকান হবার পরও ছাত্র-ছাত্রীরা দশ মিনিটে রঙিন ছবি পাবার আশায় ভিড় জমাতে শুরু করে চৌরাস্তার মোড়ে আধুনিক ডিজিটাল স্টুডিওতে। এমপি সাহেব রাজনীতির মানুষ হলেও ব্যবসায় বুঝতেন ভালো। তাই তার স্টুডিও উদ্বোধন করেন ২০% মূল্যছাড়ের সুযোগ দিয়ে। তাছাড়া, পাসপোর্ট সাইজ ছবি তোলার ক্ষেত্রে পাঁচটা ছবি তোলার অপশন দিয়েছিলেন তিনি। ছবি তোলা হলে গ্রাহকের সামনেই ফটোগ্রাফার ছবিগুলোকে কম্পিউটারে ট্রান্সফার করে যে ছবিটা গ্রাহকের পছন্দ হবে সেটির প্রিন্ট অর্ডার নেবে। নতুন যুগের ছেলেমেয়েরা সবসময় ভালো সুযোগ-সুবিধা খোঁজে। এই সুবিধা ওরা নেবে না কেন ? তাছাড়া, আলো ঝল্মলে কাচ দিয়ে ঘেরা ডিজিটাল স্টুডিও বয়স্ক মানুষদেরও মন জয় করে নিয়েছিল। মানুষ দুই কারণে ছবি তোলে, একটি প্রয়োজন, অপরটি সখ। ডিজিটাল সুবিধা এবং কম সময়ে ছবি সরবরাহ, প্রযুক্তির এই আগ্রাসন মানুষের প্রয়োজন এবং সখের সাধ পূর্ণ করছিল আনন্দের সাথে। টাকা দিয়েই যখন ছবি তুলতে হবে তখন আর মান্ধাতা আমলের পুরোনো ডার্করুমে কেন?

গিয়াসউদ্দিন তার স্টুডিও’তে তোলা ছবির পজিটিভ সংরক্ষণ করত বলে এমপি সাহেবের ব্যবসায় চালু হয়ে যাবার পরও লোকজন তাকে একেবারে বাতিল করে দেয়নি। প্রয়োজন হলেই ছুটে আসত অনেকেই। কেউ ছবির সিরিয়াল নম্বর আনতে ভুলে গেলে বা হারিয়ে ফেললে গিয়াসউদ্দিন তার পুরোনো খাতা খুলে খুঁজে খুঁজে বের করতা আগে তোলা ছবির সিরিয়াল নম্বর। কষ্টকর কাজ ছিল সেটা। তারপরও গ্রাহকের চাহিদামতো ছবি প্রিন্ট করে দিত। নুতন ছবি তোলা যে একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তা নয়। পসারটা ধরে রাখার জন্য বিশেষ বিশেষ দিবসে সেও চালু করেছিল ডিসকাউন্ট। ঈদ-পার্বণে তিনজন ছবি তুলতে এলে একজনকে ফ্রি দেবার সুবিধাও সে দিয়েছিল। দশ ইঞ্চি বাই আট ইঞ্চি ছবি কেউ প্রিন্ট করালে চার কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি ফ্রি করে দেয়ার নিয়মও কয়েক বছর চালু রেখেছিল সে।

তার এইসব ডিসকাউন্ট-ফ্রি দেখে রহমত চাচা একদিন অবসরে তার দোকানে বসে চা খেতে খেতে বলেছিল,

‘গিয়াসউদ্দিন, ইরামভাবে পাল্লা দি কি টিকতি পারবা? তার চায়া আমি কই কি, কষ্ট করি হলিও একটা ডিজিটাল ক্যামেরা আর প্রিন্টার কিনার ব্যবস্থা করো। এই দোকানটারে কাচ-কুচ দিয়া সাজায়া আলোছায়া ডিজিটাল স্টুডিও বানাও।’

প্রায় হতাশভাবে গিয়াসউদ্দিন বলেছিল,

‘চাচা, ঢাকায় তো গিছিলাম। স্টুডিওর কারবারিগের সাথে বসি কতাবার্তাও কয়েছি। একটা প্রিন্টারের দাম চায় তিরিশ লাখ টাকা। তারপর কম্পিউটার, ফটো-পেপার, ডিজিটাল ক্যামেরা, সাজ-সরঞ্জাম সব মিলায়া আরো পাঁচ লক্ষ টাকা। ওরা কলো, যদি নেন, তাইলে একমাসের ট্রেনিং ফ্রি করায়া দিব। কিন্তু চাচা, এই চল্লিশ লাখ টাকা কি আমরার বাপ-পুতের আছে? আমরা কি এমপি সাবের লাহান ধনী মানুষ?’

একটু চিন্তা করে রহমত চাচা বলেছিল,

‘তুমি যদি সিদিক যাতি মনস্থির করো, তয় ব্যাংক থাইকা লোন নিবার কথা ভাবতি পারো। তোমার বাপের এই স্টুডিও’র একটা সুনাম আছে, ব্যাংকওয়ালারা সেটাও বিবেচনা করি দেখতি পারে।’

ব্যাংকের ঋণ নেয়ার কথা গিয়াসউদ্দিন যে ভাবেনি তা কিন্তু নয়। ও পথটাও মাড়িয়েছে সে। ব্যাংক চায় বন্ধক, কিন্তু বন্ধক দেয়ার মতো সম্পত্তি কোথায় ওদের ? দোকান বন্ধক দিয়ে যে ঋণ নেবে সেটাও তো হবে না। কারণ দোকানটা ওদের নয়। এই জায়গা এবং সারিবদ্ধ দোকানগুলোর এখন মালিক উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাই আরশাদ আলী। আরশাদ আলীর বাবার সাথে এই দোকানঘরের বায়নাপত্র করেছিল রমিজউদ্দিন। আরশাদ আলীর বাবা মারা গেলে তার ছেলেমেয়েরা সহায়-সম্পত্তি ভাগ করে নেয়। আরশাদ আলী এই জমি এবং দোকানগুলো পায়। বছর বছর ভাড়া বাড়ানো ছাড়া আরশাদ আলী স্থাপনাগুলোর কোনো সংস্কার করেনি। যা কিছু নতুন মনে হয় সেগুলো ভাড়াটিয়াদেরই করা।

সেই আরশাদ আলী একদিন হেলতে-দুলতে এসে বলেছিল,

‘গিয়াস, ব্যবসায় যে মার খাতি খাতি ডুবি যাবার মত অবস্থা তোমার। কী করতি হবি, ভাবলা-টাবলা কিছু ? ঘরের টাকা সাফ করলি হবি?’

গিয়াসউদ্দিন একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলেছিল,

‘ভাবতেছিনা মনে কইরো না। আমাগের তো আর লাখ লাখ টাকা নাই যে স্টুডিও’র ব্যবসা বাদ দি হাসপাতাল বানায়া নিতি পারি। আমরা দিন আনি দিন খাই, এখন তো ভাই দিনেরটাও কামাতি পারি না।’

‘তাইলে আর কী করবা কও ? চাবি বুঝায়া দিবা?’

গিয়াসউদ্দিন ভাবছিল, আসলে এই কথাটা বলার জন্যই বিশাল বপু শরীর নিয়ে আরশাদ আলী আলোছায়া স্টুডিও’তে এসেছিল। তার কানেও এসেছে, দোকানগুলো ভেঙে ফেলে আরশাদ আলী নাকি একটা মোবাইল ফোন কোম্পানিকে ভাড়া দেবে। জমির মালিককে পাকা দালানও বানিয়ে দিতে হবে না, কোম্পানি নিজের চাহিদা এবং পছন্দমতো বিল্ডিং বানিয়ে নেবে। বেশ মোটা অংকের ভাড়াও পাবে মাসে মাসে। এমন সুযোগ কে হাতছাড়া করতে চায়? আরশাদ আলীর জায়গায় যদি গিয়াসউদ্দিন থাকত, তবে কি সে একই কথা বলত না? মানুষ চায় লাভ, লাভের টাকা। যে যেভাবে পারছে কামিয়ে নিচ্ছে। সাধারণ ভদ্রতাটুকু এখন মানুষ করে না। ভদ্রতা নাকি সেকেলে জিনিস, ও নিয়ে চললে পেটের ভাতও নাকি হবে না।

আশ্বিনে বৃষ্টি হলেও কয়েকদিন বৃষ্টি হয়নি।

এখন কি বৃষ্টি হচ্ছে? একটু শীত শীত লাগছে মনে হয় গিয়াসউদ্দিনের।

ঘুমটা ওর ভেঙে যায় মোবাইল ফোনটা বারবার বেজে ওঠায়। কয়েকটা কল ও ধরতে পারেনি। হাত বাড়িয়ে ফোনটা কানের কাছে নিতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে একটা অচেনা কণ্ঠস্বর। কিন্তু কণ্ঠটা আমুদে। শীতল মৃদুমন্দ বাতাসে সে বুঝি ঘুমিয়েই পড়েছিল।

আমুদে কন্ঠের মানুষটি ফোনের ওপাশ থেকে বলেন,

‘কী ব্যাপার গিয়াসউদ্দিন সাহেব? কোথায় ছিলেন এই ভরদুপুরে?’

‘কে? কে কতিছেন ভাই?’ বলে শরীর ঝাড়া দিয়ে উঠে বসে গিয়াসউদ্দিন।

এখন কি ভরদুপুর?

‘চিনতে পারছেন না? আপনার চল্লিশ লাখ টাকার টি-টি আমরা গতকালই পেয়েছি।’

কান থেকে ফোনটা নামিয়ে এবার কলার আইডি’র দিকে চোখ ফেলে সে। ঢাকার ‘ডিজিটাল স্টুডিও প্ল্যানার্স হাউসে’র প্রধান নির্বাহী সৌমেন দত্তের ফোন। জিহবায় কামড় দিতে দিতে থেমে যায় গিয়াসউদ্দিন।

‘কেমন আছেন দাদা?’

‘এইতো ভালোই। আজকেই আমরা আপনার রিকুইজিশন অনুযায়ী ডিজিটাল স্টুডিও’র সবকিছু কাভার্ড ভ্যানে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমাদের ইঞ্জিনিয়ারও সাথে যাবে। আপনার স্টুডিও সেটআপ করে ও ফিরবে।’

‘আজই  পাঠাচ্ছেন?’

‘জ্বি আজ রাতেই।’

‘সেটআপ করতে কতোদিন লাগতে পারে?’

‘এই ধরুন গিয়ে পাঁচ-সাত দিন।’

‘আর ট্রেনিং?’

‘এটাও আমরা দিয়ে দেবো। আপনি একজন ভালো অপারেটর রাখবেন, ফটোগ্রাফি সম্পর্কে যার ভালো জ্ঞান আছে। আপনাকে তো পাল্লা দিতে হবে সাহেব। এবং এম-পি সাহেবের সঙ্গে।’

ফোনটা রেখে দেন সৌমেন দত্ত।

বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টগুলো মুহূর্তে উধাও হয়ে যায় গিয়াসউদ্দিনের। রহমত চাচার কথাই ঠিক হ’ল। ব্যাংক কোনো বন্ধক ছাড়াই পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ঋণ দিয়েছে ওকে। ম্যানেজারটা ভালো, নিজেই উদ্যোগী হয়ে এই ঋণ পাশ করিয়ে এনেছেন। এক কাপ চা’ও খাওয়াতে হয়নি তাকে। এমন বিরল মানুষগুলো কেন যে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে না, সেজন্য দুঃখ হয় ওর।

টাকা পেয়েই ডিজিটাল স্টুডিওর সাজ-সরঞ্জাম কেনার জন্য ঢাকায় টি-টি করেছিল কাল। ওরা সময় চাচ্ছিল কয়েকদিন, কিন্তু আজই যে সব পাঠিয়ে দেবে তা ভাবতে পারেনি গিয়াসউদ্দিন ।

‘বাবা, আপনের স্বপ্নপূরণ হতিছে বাবা’….বলে আনন্দে চীৎকার দিয়ে ওঠে সে। তার চিৎকারে চমকে ওঠে হারুন। দৌড়ে এসে পাশে দাঁড়ায় ।

‘কী কতিছেন দাদা, কী হয়েছে?’ বলে মৃদু ধাক্কা দেয় গিয়াসউদ্দিনের শরীরে।

গিয়াসউদ্দিন হকচকিয়ে ওঠে। চোখ রগড়ে রাস্তার দিকে তাকায়। সে কি তবে আসলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল এই সন্ধ্যেবেলায়? স্বপ্ন দেখছিলো সে?

আহা! স্বপ্ন মানুষকে কতো আনন্দ দেয়, কষ্ট মুছে দেয়, চিন্তা নিভিয়ে দেয়।

তার ইচ্ছে হয় বলতে,

‘মানুষের জীবনটা ক্যান্ স্বপ্নের লাকান হয় না রে হারুন।’

রাত বাড়ছে বোধহয়। দেয়ালঘড়ির বড় কাঁটাটা আটটায় এসে দাঁড়িয়েছে।

বুকের ভেতরটা আবার চিন্চিন্ করে গিয়াসউদ্দিনের ।

কাউন্টার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে। তিরিশ বছরে এই চারশ বর্গফুটের স্টুডিওতে একটা একটা করে কতোকিছু জমেছে। ছাদের নিচে একটা ফল্স-সিলিং করেছিল ওর বাবা জায়গা সংকুলানের জন্য। সেখানে থাকত পুরোনো এ্যালবাম, প্রিন্টেড ছবি, পজেটিভ, ফটোফ্রেম, ভাঙা টুল-চেয়ার-ছাতা, লাইট-স্ট্যান্ড, ক্যালেন্ডার। আরও কত খুচরো খুচরো জিনিস। সব যেন সিনেমার ছবির মত সরে সরে যাচ্ছে পেছন দিকে। কাউন্টারের পেছনের দেয়ালে তাকায় ও। তার বাবার একটা প্রমাণসাইজ ছবি সে ফ্রেমে বাঁধিয়ে আটকে রেখেছিল দেয়ালে। ছবিটা রমিজউদ্দিনের চল্লিশ বছর বয়সের। টগবগে একটা মানুষের তারুণ্য ঠাসা আছে মুখটায়। চোখজোড়া জ্বল্জ্বল্ করছে, ভালো করে তাকালে বোঝা যায়, ঐ চোখের ভেতরে শুধু স্বপ্নের ওড়াউড়ি। এতো স্বপ্ন ছিল বলেই রমিজউদ্দিন বাপ-দাদার কৃষিকাজের পেশা ফেলে মফস্বলে একটা স্টুডিও খোলার দুঃসাহস দেখাতে পেরেছিল। সফল ব্যবসায়ীও হয়েছিল সে, কেউ বলতে পারেনিÑ‘আকামটা না করলি হতো না রমিজউদ্দিন?’

গিয়াসউদ্দিন ছবিটা দেয়াল থেকে নামায়। বাবার ঠোঁট বরাবর কাচের ওপর একটা চুমু খায় সে। তারপর ছবিটাকে বুকের সাথে ঠেসে ধরে হু-হু করে কেঁদে ওঠে, আর বিলাপ করে বলতে থাকে, ‘আমারে মাফ করি দ্যান বাবা, আপনার স্বপ্নরে আমি টানি নিতি পারলাম না। আমারে আপনে ক্ষমা করি দ্যান।’

হারুন এসে জড়িয়ে ধরে গিয়াসউদ্দিনকে, তারপর সেও হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। ওদের সারাদিনের আটকে থাকা কান্না যেন বন্যার পানির মতো চোখ বেয়ে নেমে আসে। এই শেষ প্রহরে এসে কান্না আড়াল করার কোনো প্রয়োজন নেই আর। কাউন্টারের ওপরে রাখা এতদিনের মূলধন খোলা ক্যামেরাগুলোর লেন্সের ওপর টপ্টপ্ করে পড়তে থাকে ওদের চোখের পানি।

মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতেই সচকিত হয় গিয়াসউদ্দিন।

ফোনটা কানে নিতেই বুঝতে পারে আরশাদ আলী’র ফোন।

‘গিয়াস, গুছানি-গাছানি শ্যাষ হলি কও, চাবিটা নিতি আসি। নাকি তুমি দিতি আসবা?’

এবার যেন সত্যি সত্যিই বুঝতে পারে গিয়াসউদ্দিন আলোছায়া স্টুডিও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কাল এ দোকানের শাটার আর খুলবে না কেউ। বাতির সুইচটা অফ করার সঙ্গে সঙ্গে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে তার বাবার স্বপ্নের ‘আলোছায়া স্টুডিও’।

একটু সময় নিয়ে সুস্থির হয় গিয়াসউদ্দিন। রফিক ওর ভ্যান নিয়ে এসেছে। ক’দিন থেকে ও-ই টানছে দোকানের জিনিসপত্র। সব জিনিসই প্রায় সরিয়ে নেয়া হয়েছে। অবশিষ্ট মালামাল হারুন দ্রুত তুলে দেয় ভ্যানে। ভ্যানকে বাড়ির দিকে পাঠিয়ে দিয়ে গিয়াসউদ্দিন চাবিটা হারুনকে দিয়ে বলে,

‘এই বাতি আমি অফ করতি পারবো নারে হারুন। তুই সব শ্যাষ করি চাবিটা আরশাদকে দি বাড়ি যা। আমি যাই।’

বলেই বাবার ছবিটা ডানহাত দিয়ে শক্ত করে ধরে হন্হন্ করে রাস্তায় নেমে যায়, যেন আর পেছনে তাকাবার প্রয়োজন নেই ওর। বাকরুদ্ধ হারুন মেইন সুইচটা উপর দিকে ঠেলে তুলে দেয়। আলোছায়ার দৃশ্যপট ধপ্ করে মুছে যায় চারপাশ থেকে, শুধু অন্ধকার গ্রাস করে চারশ’ বর্গফুটের ‘আলোছায়া স্টুডিও’। সেই অন্ধকারে হারুন নিজেকেও আর দেখতে পায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares