কবিতা

মাকিদ হায়দার

বিবি হীরামন

[কবি ইসলাম রফিক, প্রীতিভাজনেষু]

 

কম বেশি সকলেই চেনে-জানে আমাকে

সালাম আদাব নিয়মিত দেন

পৌঢ়, পৌঢ়াসহ

উঠতি বয়সের হাসি খুশি, ওরা সকলেই।

 

সেই সব হাসি খুশিদের কেউ, কেউ

সময় যাপন করে

পার্কের  শেষ বেঞ্চের ঝোপের আড়ালে

যদি কখনও আমাকে দেখে ফেলে

তখুনি জানতে চায়

লালু ভাই,

ভালো আছেন নিশ্চয়ই!

 

সেদিন উত্তরার পার্কের একটি বেঞ্চে

সবেমাত্র পা তুলে বসেছি, তখুনি

একজোড়া হাসি খুশি, মোবাইল হাতে

জানালো আমাকে,

 

আপনাকে আজ দারুণ দেখলাম,

প্রিন্টের শার্ট, সানগ্লাসে মানিয়েছে খুব

হাতে জবাফুল।

 

দারুণ সরল কথা লিখেছেন ফেসবুকে।

 

যদি না চাই, অথবা বান্ধবী

হোক সে অন্ধ-অথবা খঞ্জ,

তিনি যেন শুধু সইতে পারেন

রবিঠাকুরের বিরহের গান।

 

হাসি খুশি আরও জানালো,

আজ সারাদিন ভেবেছি  আপনার উদারতার কথা

সেই সঙ্গে আপনার ইচ্ছেটাকে সম্মান দিতে

এসেছি আমরা

উত্তরার এই নির্জন পার্কে

 

এমনও শুনেছি,

আপনি সময় কাটিয়েছিলেন

সাতাশ, আটাশ বছর, এই পার্কের বেঞ্চে,

ঘাসে, শুয়ে বসে।

অথচ আপনাকে চিনলো না কেউ

জানলো না আপনার গোপন প্রতিভা,

 

গত রাতে শুনলাম আপনি নাকি একজন গদ্যপদ্য লেখক,

খুব নামকরা কবি,

আরও জানলাম

সাতান্ন, আটান্ন পেরিয়ে নাকি পড়েছেন উনষাটে আজ,

আপনাকে জানাতে এসেছি

জন্মদিনের শুভেচ্ছা, স্বাগতম।

 

লালু ভাই আর কেউ নয়- এই গদ্যপদ্য লেখকের নাম।

 

হাসি আর খুশির কথা শুনে রেগে গেলাম

দারুণভাবে, দুষ্টু মোবাইল কোম্পানির উপর,

 

হারামজাদারা আবারও পারলো না-

লালুর বয়স যখন ছিল আঠারো উনিশ

তখন কেন ঐ

দুষ্ট কোম্পানিগুলো বানালো না

লাল, নীল, দামি মোবাইল,

তবু আমি কিনতাম

দাম যদি হতো কয়েকশ কোটি।

 

সেই দিন রাগে অভিমানে নিজেই ঢেলেছি

নিজের কানের ভেতর গরম সরষের তেল,

সেই দিন থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে হয়েছি বধির।

 

কেউ যেন কোনোদিন আমাকে এসে বলতে না পারে,

 

বিবি হীরামন

আজও কাঁদে আপনার শোকে।

 

 

সৈয়দ আলী ইমাম

সিন্দুক

 

সিন্দুক রয়ে গেছে,

বসানো রয়েছে আজও ছয় ফুট প্রশস্ত দেয়ালে

দু’শো বছরের সেই ভগ্নপ্রায় প্রাচীন বাড়িতে।

হীরা, পান্না, নীলা, পোখরাজ,

চন্দ্রহার, বাজুবন্ধ, সোনার মেখলা,

রূপার ঘুঙুর আর নীলাভ কানের ফুল,

মুকুতা বসানো দুল,

কিছু টাকা কড়ি,

সিন্দুকের ডালা খুলে

প্রতিদিন ব্যবহার করতেন যিনি

আবার দিতেন তালা

কোথায় এখন তিনি

আজকাল দেখি না তো তাঁকে।

দরজা, জানালা খোলা

বিশাল কামরা পড়ে আছে।

কেউ নেই ধারে কাছে।

সিন্দুকের ডালা

সেটা ও রয়েছে খোলা

বহুকাল থেকে

 

 

স্বদেশ রায়

অমৃত পাত্র

 

আফ্রিকার জঙ্গলে একটি এনাকোন্ডা আমাকে

টুপ করে গিলে ফেলে, মুহূর্তে পাঠিয়ে দেয়

তার পেটের ভিতর গভীরতর উষ্ণতায়।

এনাকোন্ডার পাকস্থলীর উষ্ণতায় গলে যেতে যেতে

আমি অনেক তরল ও ম- হয়ে যাই-

তারপর এনাকোন্ডা আমাকে ফেলে রেখে যায়

জঙ্গলের উর্বর মাটিতে। জুলু দম্পতি আমাকে

তুলে নিয়ে তাদের বাড়ির আঙিনায় একটি গর্তে

মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। কয়েকদিন পরে

আমি দেখতে পাই আমার ওপরে একটি চারাগাছ

তর তর করে বেড়ে উঠছে, হাওয়ায় নাড়াচ্ছে তার পাতা

এরপরে বাতাস যায় বদলে, সে বাতাসে গাছটির

পাতা ওঠে শির শির করে, তার পাতার কোলে

আসে কুড়ি। আমারও শরীরে শিরশিরানি জাগে

যে সকালে পাতাকে ছাড়িয়ে একটি লাল ফুল

আলো করে ধরে আঙিনা। এরপরে প্রতিদিন আসতে

থাকে ফুল-আরও ফুল সব শেষে মগডালে আসে

সব থেকে বড় ফুলটি। এদিন গাছটির সঙ্গে আমিও

ছিলাম রোমাঞ্চিত। সূর্যের আলো সেদিন আফ্রিকার

জঙ্গলকেও করেছিল লাল, ওই আবীর রঙের মধ্যে

দাঁড়িয়ে জুলু দম্পতির কিশোরী মেয়েটি হাত দেয় বাড়িয়ে

তার হাতের ছোঁয়ায়, আমি ও গাছটি একই সাথে

শিহরিত হই। নরম সে হাতে মগডালের ফুলটি কত

আলগোছে ছিঁড়ে নেয়, তার পরে পাশে দাঁড়ানো

লোহার মতো কালো শরীরের জুলু কিশোরের হাতে তুলে

দেয় ওই ফুল। কিশোরটির পুরু ঠোঁট পেরিয়ে বের হয়ে

শরৎ আকাশের মেঘের থেকেও সাদা  হাসি

আর আমি তখন ভাবি, আহারে, এনাকোন্ডাটি কি বোকা!

 

 

জাফর সাদেক

অতিথি এলে খুশি হতাম

 

‘একবার ভাত নিলে গেরস্থের অমঙ্গল হয়- বাবা’

এই কয়েকটি বাক্যে অতিথির প্রতি ছিল জোছনা ঢলের মতো ভালোবাসার আকুলতা

 

 

আমাদের সবারই একসময় মুরগি ধরার কৌশল রপ্ত করতে হয়েছিল

মোরগ-মুরগিদল ঘরছাড়া হতো সেই কাকডাকা ভোরে

আর বালিশের নীচে চাপ দেয়া পাজামা-পিরানপরা অতিথিরা আসতো

বা স্বচ্ছন্দ ছিল যেকোনো সময়

 

 

লালঝুঁটি, চুম্বনপ্রবণ তেজি মোরগগুলো ছিল অতিথির জন্য প্রথম বরাদ্দ

আমি কিন্তু মোরগ ধরতাম না ইচ্ছে করেই…

ধরতাম ডিম দেয়া বা উঠতি বয়েসী ভারি লাজুক মুরগিগুলো

 

 

বিকেল বেলা ছি-বুড়ি খেলতে যেয়ে কানে কানে মিনিকে বলতাম-

মুরগি ধরার যত গোপন উত্তাপ

আর ওর অভিমানী অভিযোগ শোনার জন্যে ব্যাকুল অপেক্ষা করতাম

‘জানিস না মুরগিরা মেয়ে, ওদের ধরবি আদরে কিন্তু কাটবি না’

এই কথা বলে মিনির দুচোখ হতো একদিঘি জল

ওর এই তমসা নেমে আসা অদ্ভুত শ্রাবণ-আকাশ দেখার জন্যেই

অতিথি এলে খুব বেশি খুশি হতাম

 

 

গোলাম কিবরিয়া পিনু

গুলমোহরের লোভ

 

মানুষের এত লোভ কেন?

যে স্থানে প্রবেশ করলে বহির্গমনপথ

খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায়

সেও পথেও মানুষ হাঁটে!

গুলমোহরের লোভে

পরস্পরবিরোধী ও অসংলগ্ন হয়ে ওঠে-

গোলাপের জলে নিজে গোসল করার পরও

সেই জলে নিজের কাপড়-চোপড়ও

ধৌত করতে চায়!

মানুষ ভুলে যায় তার ধারণ ক্ষমতা!

মানুষই নিজের কারণে

লোভাতুর হয়ে ওঠে-

কামান বন্দুক থেকে

অগ্নিময় পিণ্ড নিক্ষেপ করতে থাকে

নিজেরই গোলাঘরে!

মানুষ নিজেকে চালাক-চতুর ভেবে

অসম্ভবের মাঠ-জঙ্গলে গিয়ে-

নিজের হারানো গরু খুঁজতে খুঁজতে

নিজেই হারিয়ে যায়!

 

 

সৌভিক রেজা

শুকনো পাতার ছবি-৪

 

আলোকপ্রাপ্তিতার কথা যে-মতো ইচ্ছে বলে

যায়। নজরুল বলেছিলেন মসজিদের পাশে

তাঁকে কবর দেবার কথা। গভীর গহ্বরে

একই রূপ একই চেহারা। ডালগুলো সব ঝড়ে-ভাঙা।

নিশ্চিন্তে ঘুমোও মেয়ে তুলোর বালিশে মাথা

রেখে। পুণ্যশক্তি আর সূর্যশক্তি। অন্ধকারের কথাও

কেউ বলুক! পাহাড় থেকে যাদের আগুন আনবার কথা

তারা জলধ্বনিতে হারিয়ে গেলেন। অন্ধকারে ঝাঁপ দেবার আগে

নাম জিজ্ঞাসা করলে উত্তর আসে :

শব্দহীন নাম আমার!

 

 

বিশ্বজিৎ মণ্ডল

আজনবি

 

কতদিন ভেবেছি, তোর শহর ছেড়ে চলে যাব  একাকী, অভিমানী গন্ধর্বের মতো

ফুলগুলো ছড়িয়ে রেখেছিস…

অবিবেচক বালিকার হাতে

এই তো দ্যাখ, হাতে তুলে নিয়েছি দীর্ঘ একতারা

সুচারু হাতে লেখা মেঘলা পর্যটন

যা আজ থেকে আমি উদাত্ত বাউল

তোর বৈষ্ণবী আঁচল ধরে টেনে নামাই

নক্ষত্রের আলপথে

তারপর চল তোকে নিয়ে পালাই

আজনবি কোন শহরে

 

 

শামীম আহমেদ

বায়োস্কোপের ফিতে!

 

আমাকে আবার আজ পুরনো আমায় ঘিরে ধরছে

ধোঁয়া ওঠা স্মৃতিজুড়ে ভেসে ভেসে উড়ে আসে

রোদে ছোঁয়া বালিকার দীর্ঘ চুলের ঢল

ক্লান্ত হেঁশেলে জ্বলে দীপ্ত উনুন

মেঠোপথে ধুলো মেখে হেঁটে চলা জীবন যেন

না বলেও কত কিছু জানান দিয়ে যায়!

 

সাইকেলের চাকায় দ্যাখো বায়োস্কোপের ফিতে আর

রঙিন স্বপ্নগুলো পাদুকার চিহ্ন রেখে হারিয়ে যায়

বোধোদয় হয়

মুছে যাওয়া ছায়াগুলো তাই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে

দেবদারু গাছের মতো দ্বিপ্রহরে!

 

সন্ধ্যা হলে কাঁপে উঠোনের রোদ

টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে ভালো লাগা স্বপ্নগুলো আর

কিশোরীর টোলপড়া গালে দেবশিশু মানচিত্র আঁকে।

 

কারা যেন হেঁটে যায় দূর-দূরান্তরে

ছায়া নিয়ে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর

সূর্য ডুবে যায়, ঘুমঘরে জোছনা ওঠে!

 

যুবতীর শীৎকারে মনে হয়

সবটুকু স্মৃতি আজ বাগানবাড়ি

নর্তকীর নূপুর হয়ে বাজে দীর্ঘশ্বাস

বাকিটুকু স্মৃতি হয়ে থেকে যায়।

 

ক্লান্তিকর নীহারিকা ঢেলে দিলে লুডুর ছকে

সাজিয়ে গুটি সব এই নির্ঘুম রাতে

মনে হয় আমাকে আবার আজ পুরনো আমায় ঘিরে ধরছে

 

 

 

অচিন্ত্য চয়ন

বৃষ্টির দৃশ্যে অজানা গল্প

 

চোখের সীমানায় আকাশ- দৃশ্যকালে সোনালি স্বপ্ন।

মুদ্রিত স্বপ্নের ডাকনাম বৃষ্টি- শুধু আমার মুখে,

অজানা দৃশ্যের গল্প।

বেলকুনির রঙিন ছায়া ভিজে যাওয়া কিশোরীর বুক,

অতল দৃশ্য-শরীরের ঢেউয়ে ভেসে বেড়ায় আঙুল,

আঙুলের ভাঁজে মুদ্রিত হয় বৃষ্টির অজানা গল্প…

পাঠ শেষ না হতেই শেষ হয়ে যায় তোমার ছুটি,

থাকো ঘুমের আড়ালে-হাতে অস্ত্রবাদ্য বাজাও,

বুকে উচ্ছেদের সুর।

গল্প পাঠের মনোযোগ কখনওই কম ছিল না,

সত্য উচ্চারণে বয়ান দেয় পাঠের ভগ্নাংশ-

‘যৌবনে শিশির থাকলে, থাকবে মেঘেদের বৃষ্টি’

জেনে রাখা ভালো- তোমার আকাশেই এসব মেঘের জন্ম

চোখের সীমানায় আকাশ- দৃশ্যকালে সোনালি স্বপ্ন।

 

 

খান নূরুজ্জামান

প্রাকৃত শস্যের খামার

 

যাও, ঘোরো দ্বারে দ্বারে ভিখিরি স্বভাব

নাও- করুণার ঘ্রাণ, উচ্ছিষ্টের স্বাদ।

আমি যাবো না। আমি তো মাটির পটুয়া

সময়ের পেটে ফেলে ফসলের রং

নির্মিতির ওমে লিখি অন্নের সুনাম।

 

আমার মা বসে আছেন ছোনের দাওয়ায়

আউশের গরম ভাত হাতে পাখার বাতাস

আমার রুচিতে পদ্মার ইলিশ, লাউয়ের ডগা

সজনে, শিম, লাল ডাঁটার প্রকার।

 

আমার ক্যানভাসে মেঘ, রোদের প্রভাব

মানুষে, পাখিতে মুখে অবিরত গান

উঠোনে উঠোনে জ্বলে বীরের টোটেম

বিনাশে, বিকাশে বুকে সাহসের টান।

 

আমার গানে সুর দেয় মাঠের সবুজ

নিসর্গের কণ্ঠে বেঁধে মেলোডির তার

শিকড়ের দিকে রাখা নির্ঘুম দোতারা

প্রাণের বিপুলে  প্রাকৃত শস্যের খামার।

 

 

চয়নিকা সাথী

দ্বৈরথ

 

তুই থাকলে বেশ হতো

 

প্রেমের কান্তি শরীরে মেখে সাজিয়ে নিতাম মন,

পূর্ণ হতো বেঁচে থাকার সব আয়োজন।

 

নেই, তাতে ক্ষতি কি?

 

যেমন আছি এমনি করেই যাবে সকল দিন

হোক না যতই দৃষ্টি ধূসর প্রেম অমলিন।

 

একলা পথের ভয়? না, না।

 

ভয় পেলে কি জয়ী হতাম সকল বাঁধার পথে?

ভরসা আছে মৃৎজীবনের আমাদের দ্বৈরথে…

 

 

 

সচিত্রকরণ : মোস্তাফিজ কারিগর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares