অনূদিত উপন্যাস : অনুবাদ- মশিউল আলম

অনূদিত উপন্যাস

ধা রা বা হি ক : দ্বি তী য়  প র্ব

চৌদ্দ কিস্তি

ভূতলবাসীর কড়চা

ফিওদর মিখাইলোভিচ দস্তইয়েফ্স্কি

মূল রুশ থেকে অনুবাদ মশিউল আলম

 

ওর এমন তর্ক করা দেখে আমি ক্রমেই ক্ষেপে উঠছিলাম; আপত্তি জানিয়ে বললাম, ‘বাড়িওয়ালির কাছে মেয়েটার দেনা ছিল। তাই সে যক্ষায় ভোগা সত্ত্বেও শেষ দিন পর্যন্ত বাড়িওয়ালির কাজ করে গেছে। চারপাশে গাড়িওয়ালাগুলো সৈন্যদের সঙ্গে কথা বলছিল, গল্পটা ওদেরকে বলছিল। মনে হয় ওরা মেয়েটার পরিচিত ছিল। ওরা হাসাহাসি করছিল। আর শুঁড়িখানায় গিয়ে মেয়েটার স্মরণে মদ টানার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।’ (আমি এখানেও অনেক কিছু অতিরঞ্জিত করে বলছিলাম)।

নীরবতা। গভীর নীরবতা। এমনকি, মেয়েটা একটু নড়াচড়াও করল না।

‘মরলে তো হাসপাতালে মরাই ভালো, কী বলো?’

‘তফাতটা কী?…’ বিরক্ত হয়ে মেয়েটা বলল, ‘কিন্তু আমার হয়েছেটা কী যে মরব?’

‘এখনই মরবে একথা তো বলছি না, কিন্তু পরে?’

‘পরের ব্যাপার তো পরে…’

‘মোটেও না! এখন তোমার বয়স কম, দেখতে ভালো, তরতাজা আছো- এ জন্যই এখন তোমার এরকম কদর। কিন্তু জীবন থেকে আর একটা বছর চলে যাওয়ার পরেই এই তুমি আর এ রকম থাকবে না, মলিন হয়ে যাবে।’

‘এক বছর পরেই?’

‘যত যা-ই তুমি কর না কেন, এক বছর পরে তোমার দাম কমে যাবে,’ আত্মতৃপ্তির সঙ্গে বলে চললাম, ‘এই বাড়ি থেকে তোমাকে যেতে হবে অন্য কোনো বাড়িতে, যেটা হবে এই বাড়ির চেয়ে একটু নিচের স্তরের। তারও এক বছর পর তুমি যাবে তৃতীয় কোনো বাড়িতে, আরও নিচের স্তরে; আর বছর সাতেক পরে তোমার জায়গা হবে গিয়ে বাজারে, একদম বেসমেন্টে। সেটাও খারাপ হবে না। আসল দুর্দশা আরম্ভ হবে এইসবের উপরে যদি একটা অসুখ বাঁধিয়ে বসো; ধরো, বুক-ধড়ফরানি, বা ধরো ঠান্ডাই লেগে গেল, বা কিছু-একটা হলো। এ রকম জীবনে একবার একটা অসুখ হলে সহজে সারতে চায় না। তোমারও যদি হয়, বোধ হয় আর সারবে না। মারা যাবে তুমি।’

‘ঠিক আছে, মরব,’ ভীষণ কুপিত হয়ে ছটফট করে উঠে বলল মেয়েটা।

‘না, দুঃখ হয়।’

‘কার জন্য?’

‘জীবনটা নিয়েই দুঃখ হয়।’

নীরবতা।

‘তোমার ঝেনিখ ছিল, তাই না?’

‘আপনার তাতে কী?’

‘আরে, আমি তো তোমাকে জোর করছি না। আমার কী এসে যায়? তুমি রেগে যাচ্ছ কেন? তোমার নিজেরই হয়তো অনেক ঝামেলা ছিল। তাতে আমার কী? এমনিই বলছিলাম, আমার দুঃখ হচ্ছে।’

‘কার জন্য?’

‘তোমার জন্য।’

‘রাখেন…’ বিড়বিড় করে বলল মেয়েটা, এত আস্তে যে প্রায় শোনাই গেল না। সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরে রাগ জমে উঠল। এটা কী! আমি ওর সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলার চেষ্টা করছি, আর ও কিনা…

‘কী ভাবো তুমি? ভালো রাস্তায় চলছ, তাই না?’

‘কিছুই ভাবি না আমি।’

‘ভাবো না যে, এটাও তো খারাপ। সময় থাকতে সজাগ হও। সময় তো আছে, বয়সটা তোমার এখনও তো কমই, দেখতেও ভালোই; কাউকে তো ভালোবাসতে পারো, বিয়ে করতে পারো, সুখী হতে পারো…’

‘যারা বিয়ে করেছে, সবাই তো সুখী হয়নি,’ আগের মতোই কর্কশভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে বলল মেয়েটা।

‘নিশ্চয়ই, বিয়ে করে সবাই সুখী হয় না। কিন্তু তবু সেটা তো এখানকার চেয়ে ভালো। হাজার গুণ ভালো। ভালোবাসা থাকলে তো সুখী হওয়া ছাড়াই বাঁচা যায়। দুঃখের মধ্যেও জীবন ভালোভাবেই চলে। পৃথিবীতে জীবনযাপন করাটাই তো একটা ভালো ব্যাপার, কীভাবে জীবন চলছে সেটা যদি না-ও দেখি। কিন্তু এখানে…দুর্গন্ধ ছাড়া এখানে আর আছেটা কী? থুহ্!’

ঘৃণাভরে আমি ওর দিকে ঘুরে তাকালাম; ঠান্ডা মাথায় আর ভাবতে পারছিলাম না। যা বলছিলাম তা নিজেই অনুভব করতে শুরু করেছিলাম, ফলে উত্তেজিত হয়ে উঠছিলাম। আমি আমার সেই নিভৃত কোণে যেসব ছোট ছোট ভাবনা সযতেœ লালন করতাম সেগুলো তুলে ধরার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলাম। হঠাৎ করে আমার ভেতরে কিছু-একটা জ্বলে উঠল, কী-একটা লক্ষ্যের ‘আবির্ভাব ঘটল’।

‘আমি যে এখানে এসেছি, তুমি এই ব্যাপারটা ধরো না। তোমার জন্য আমি কোনো দৃষ্টান্ত নই। আমি হয়তো তোমার চেয়েও খারাপ। আর তা ছাড়া, আমি যখন এখানে এসে ঢুকেছি তখন মাতাল ছিলাম,’ নিজের সাফাই গাওয়ার জন্য আমি ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।

‘উপরন্তু, কোনো পুরুষই আসলে কোনো মেয়ের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে না। দুটা দুই ব্যাপার; আমি হয়তো নিজেকে নোংরা আর জঘন্য করে তুলেছি, কিন্তু আমি কারো দাস নই; এসেছি, চলে গেলাম, নেই আমি। নিজেকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ভিতর থেকে সব বের করে দিলাম, ব্যাস, আমি আর সেই আমি নই। আমি আর সেই আমি নই। কিন্তু তুমি এটা তো মানবে যে তুমি একদম শুরু থেকেই একটা দাসি। হ্যাঁ, একটা দাসি। তুমি তো সবকিছু দিয়ে দিচ্ছ, নিজের সমস্ত ইচ্ছা বিসর্জন দিচ্ছ। পরে হয়তো তোমার ইচ্ছা করবে এই শিকল ভেঙে বেরিয়ে যেতে, কিন্তু সেটা হচ্ছে না : এই শিকল তোমাকে আরও শক্ত করে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলবে। এরকমই এই অভিশপ্ত শিকল। আমি এই শিকল চিনি। অন্য কোনো শিকলের কথা আমি বলছি না। তুমি হয়তো আমাকে বুঝতে পারবে না, কিন্তু বলো তো: এই যে তুমি, হয়তো ইতিমধ্যেই বাড়িওয়ালির কাছে দেনাগ্রস্ত? তাহলে দেখতেই পাচ্ছ!’ আরও বললাম আমি, যদিও মেয়েটা উত্তরে কিছুই বলল না, শুধু চুপচাপ, ওর সমস্ত সত্তা দিয়ে শুনে গেল; ‘এই হলো তোমার শিকল, আর কখনোই বের হতে পারবে না এই শিকল থেকে। এটাই শিকলের কাজ। শয়তানের কাছে আত্মা বন্ধক রাখার মতো…

‘…উপরন্তু এই আমি…তুমি কী করে জানবে, হয়তো আমিও তোমার মতোই এক অভাগা, আর তাই ইচ্ছা করেই নোংরা কাদায় গড়াগড়ি করছি, এটাও সেই মনোকষ্ট থেকে। মানুষ তো মদ খায় মনের দুঃখে: হ্যাঁ, আমারও সেই দশা, দুঃখে পড়ে এসেছি এখানে। কিন্তু তুমি আমাকে বলো, এখানে ভালোটা কী আছে? এই যে তুমি আর আমি এখানে একসঙ্গে…এলাম, কিন্তু এতক্ষণ ধরে কেউ একটা কথাও বললাম না, অনেক পরেই কেবল তুমি, একটা বন্য প্রাণীর মতো তাকালে আমার দিকে; আমিও একইভাবে তাকালাম তোমার দিকে। এইভাবে মানুষ মানুষকে ভালোবাসে? এইভাবে মানুষ মানুষের কাছাকাছি হয়? এটা কী, জান? এটা হলো একটা জঘন্য ব্যাপার!’

‘হ্যাঁ,’ তীব্রভাবে, ঝট করে, ছটফট করে উঠে সায় দিল মেয়েটা। ওর এই ‘হ্যাঁ’ বলার ক্ষিপ্রতা আমাকে অবাক করে দিল। এর মানে, এইমাত্র যখন সে আমার দিকে তাকিয়েছিল, তখন ওর মাথায়ও কাজ করছিল একই চিন্তা? অর্থাৎ সেও কিছু চিন্তা করতে পারে?…‘আরেশ্ শালা! এটা তো কৌতূহলোদ্দীপক, এ মেয়ের চিন্তা তো আমারই মতো!,’ মনে মনে বললাম আমি, বলতে বলতে প্রায় হাত কচলাতে যাচ্ছিলাম। ‘কী কা-, কী করে আমি এরকম একটা কচি মনের কথা বুঝতে পারছিলাম না?’

আমাকে সবচেয়ে বেশি টানছিল এই সমস্ত কিছুর মধ্যেকার খেলাটা।

মেয়েটা মাথা ঘুরিয়ে আমার কাছে এগিয়ে এল, অন্ধকারে আমার মনে হলো, সে যেন তার মাথাটা এক হাতের ওপর ঠেস দিয়ে রাখল। হয়তো বা সে ওইভাবে আমাকে দেখছিল। ওর চোখদুটো দেখতে পাচ্ছিলাম না বলে আমার যে কী খারাপ লাগছিল! আমি ওর গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।

‘কেন তুমি এখানে এসেছিলে?’ এক ধরনের ক্ষমতা প্রকাশ করে আমি বললাম।

‘এমনিই…’

‘বাবার বাড়িতেই যদি থাকতে, কী ভালোই না থাকতে। গরম, যা-ইচ্ছা-আই করার স্বাধীনতা; নিজের বাসা।’

‘আর যদি সেটা এখানকার চেয়েও খারাপ হতো?’

‘না, ঠিক সুরটা ধরতে হবে,’ এই ভাবনা ঝলক দিয়ে উঠল আমার মনে, ‘সেন্টিমেন্টাল হয়ে সম্ভবত বেশি দূর এগোনো যাবে না।’

কিন্তু এরকম ভাবনা শুধু এক ঝলক দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। কসম খেয়ে বলছি, মেয়েটার প্রতি সত্যিই বেশ আগ্রহ জেগে উঠেছিল। উপরন্তু কেমন জানি দুর্বল আর মনের দিক থেকে খানিক কাহিল হয়ে পড়েছিলাম। আর কে না জানে, অনুভূতির সঙ্গে দুষ্টামি খুব সহজেই আসে।

‘কে বলতে পারে!’ তড়বড় করে বললাম আমি, ‘কত কিছুই তো হয়। আমি নিশ্চিত, কেউ তোমার ওপর অন্যায় করেছে, আর যারা অন্যায় করেছে, তোমার কাছে তারা তোমার চেয়ে বেশি অপরাধী। আমি তো তোমার কাহিনির কিছুই জানি না, কিন্তু তোমার মতো একটা মেয়ে, তোমার মতো একটা মেয়ে, সত্যি সত্যি নিজে থেকে এখানে আসতে চাইবে না…’

‘কেমন মেয়ে আমি?’ বিড় বিড় করে বলল মেয়েটি, এত নিচুস্বরে যে শোনা যায় কি যায় না। কিন্তু আমি শুনতে পেলাম।

‘গোল্লায় যাক সব!’ মনে মনে বললাম আমি, ‘আমি মেয়েটার প্রশংসা করছি। এটা জঘন্য। আবার, এটা ভালোও হতে পারে…।’ মেয়েটার চুপ করে রইল।

‘শোনো, লিজা, আমি এখন নিজের কথা বলব। ছেলেবেলায় আমার যদি একটা পরিবার থাকত, তাহলে আমি এখন যেরকম, তখনও সেরকম হতে পারতাম। আমি প্রায়ই এ নিয়ে চিন্তা করি। পরিবারে যত খারাপ কিছুই ঘটুক না কেন, তবু তারা বাবা-মা, শত্রু তো নয়, পর তো নয়। বছরে অন্তত একটা বার তারা তোমার প্রতি ভালোবাসা দেখাবে। তুমি তো জানই যে তুমি তাদেরই। আমি বড়ো হয়েছি কোনো পরিবার ছাড়াই। সেই কারণেই হয়েছি এরকম…কোনো আবেগ-অনুভূতি নেই।’

আমি আবার থেকে অপেক্ষা করতে লাগলাম, মেয়েটা কিছু বলে কি না।

‘মনে হয় কিছু বুঝতে পারছে না,’ মনে মনে বললাম আমি, ‘এটা হাস্যকর, এইসব নীতিকথা।’

‘আমি যদি বাবা হতাম, আর আমার যদি একটা মেয়ে থাকত, আমি হয়তো, মনে তো হয়, অনেকগুলো ছেলের চেয়ে একটা মেয়েই বেশি, আমি হয়তো মেয়েটাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতাম, সত্যি!’ বাঁকাসুরে বললাম আমি, ওকে একদম বিভ্রান্ত করে দেওয়ার জন্য। স্বীকার করছি, কথাগুলো বলতে বলতে আমি লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিলাম।

‘এরকম কেন?’ মেয়েটা জিগ্যেস করল।

আহ! এর মানে, মেয়েটা আমার কথ শুনছে!

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares