নাটক

মনোজ মিত্রের নাট্যত্রয়ী :

নাটকে মানুষ, মানুষের নাটক

এস.এম. ফয়সাল হোসেন

 

সাহিত্য ও শিল্পকলার মাধ্যমগুলোর মধ্যে নাটক অন্যতম। বাংলা নাটকে প্রায় অর্ধশতাব্দী জুড়ে যে কজন নাট্যকার অবিভক্ত বঙ্গদেশের নাট্যজগৎকে ঋদ্ধ করে চলেছেন, মনোজ মিত্র (১৯৩৮) তাঁদের মধ্যে স্তম্ভপ্রতিম। মনোজ মিত্র নাট্যজগতে নাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতা এই ত্রিবিধ গুণে গুণান্বিত। আধুনিক বাংলা নাটকের ধারায় বিজন ভট্টাচার্য (১৯১৭-১৯৭৮) ও উৎপল দত্তের (১৯২৯-১৯৯৩) সঙ্গে তাঁর নাম সমভাবে উচ্চারিত। বিজন ভট্টাচার্য প্রধানত গ্রামীণ মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে নাটকে স্থান দিয়েছেন। উৎপল দত্ত রাজনৈতিক নাট্যকার হিসেবে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। আর মনোজ মিত্র স্মরণীয় হয়ে আছেন সমকালীন সমস্যামূলক নাটক রচনার জন্য। মনোজ মিত্র সমাজসচেতন শিল্পী। সমকালীন সাধারণ মানুষের অন্তর-বাহির, জীবনসংগ্রাম, আনন্দ-বেদনা, শাসন-শোষণ ও বাদ-প্রতিবাদের চিত্র তাঁর নাটকগুলোতে স্থান পেয়েছে। তাঁর নাটকগুলো শুধু বিষয়ের বৈচিত্র্যেই আলোচিত নয়, এখানে স্থাপিত হয়েছে সমাজ-বাস্তবতার সঙ্গে ব্যক্তি-মানসের মেলবন্ধন। মনোজ মিত্রের প্রতিটি নাটকেই রয়েছে আলাদা মেজাজ, আলাদা ধরন এবং তা নানাভাবে, নানা রঙে বর্ণিল।১ তাঁর নাটকগুলো কখনও হাসির আড়ালে অশ্রু, কখনও কবিতায়  ঘেরা কাব্যময়, কখনও রহস্য রোমান্সে উদ্ভাসিত। মনোজ মিত্র রোমান্সকে অতিক্রম করে সাধারণ মানুষ ও তাদের দুঃখ-দুর্দশাকে তুলে ধরেছেন। একই সমান্তরালে তিনি সযতেœ শোষিত মানুষদের প্রতিবাদী রূপটিকেও ফুটিয়ে তুলেছেন। এ প্রসঙ্গে ‘কৃষ্টি’ (১৯৮৫) পত্রিকায় মনোজ মিত্রের উক্তিটি স্মরণযোগ্য। তিনি বলেন :

আমি এই মুহূর্তে একটি বিষয়কেই অধিকার দিয়ে লিখতে চাই, সেটা হলো দীন মানুষ, দুর্বল মানুষ, অবহেলিত এবং পর্যুদস্ত মানুষ তার হীনতা, তার দুর্বলতা, তার ভয়, দ্বিধা, সংশয় কাটিয়ে মানুষের মতো উঠে দাঁড়াচ্ছে। এদেশের যে কোন ঘটনার মধ্যেই আমি এই মানুষকে খুঁজি, মানুষের এই সংগ্রামকেই ধরতে চাই।২

মনোজ মিত্রের নাটক রচনার হাতেখড়ি মৃত্যুর চোখে জল (১৯৫৯) দিয়ে। তিনি নাট্য জীবনে দীর্ঘ, স্বল্প, পূর্ণাঙ্গ, একাঙ্ক ইত্যাদি মিলিয়ে আনুমানিক প্রায় পচাঁত্তরটিরও বেশি নাটক রচনা করেছেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোÑ চাক ভাঙা মধু (১৯৬৯), নৈশ্যভোজ (১৯৭৬), সাজানো বাগান (১৯৭৭), গল্প হেকিম সাহেব (১৯৯৩), কেনারাম-বেচারাম (১৯৭৯), শিবের অসাধ্যি (১৯৭৫), পরবাস (১৯৭০), শোভাযাত্রা (১৯৯০), যা নেই ভারতে (২০০৫) ইত্যাদি। তবে তাঁর চাক ভাঙা মধু, নৈশ্যভোজ ও সাজানো বাগান পাঠকসমাজে অধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এ সূত্রে আমাদের আলোচনাও এই তিনটি নাটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।

শ্রেণিবিভক্ত মানবসমাজে দ্বন্দ্ব একটি চিরকালীন বিষয়। এই দ্বন্দ্বের পথ ধরেই আসে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, বিপ্লব- বিদ্রোহ। এই অনুষঙ্গেই মানুষ অন্যায়-অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে, বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এমনই পটভূমিতে মনোজ মিত্র রচনা করেছেন তাঁর চাক ভাঙ্গা মধু। এ নাটকে তিনি শোষিত মানুষের বলিষ্ঠ জীবনযন্ত্রণা ও নির্মম বেদনার ছবি টুকরো টুকরো করে এঁকেছেন। সমাজে মহাজনের নির্দয় বঞ্চনায় একেবারে নিঃস্ব একটি গ্রাম। এ গ্রামের অভাবী মানুষগুলো দুর্দশায় পতিত। শোষক শ্রেণির করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে যায় এই অসহায় মানুষগুলোর সহায় সম্পদ। দুবেলা অন্ন জোটে না তাদের মুখে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় হাহাকার করতে থাকে এই শোষিতরা। চাক ভাঙা মধু নাটকে আমরা দেখি মহাজন অঘোর ঘোষের কারণে ওঝাঁ পরিবারে নেমে আসে অন্নাভাব। মাতলা ওঝাঁর মেয়ে বাদামি গর্ভাবস্থায় ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে পারে না। এ কারণে সে পেটের সন্তানের মৃত্যু কামনা করে। বাদামি বলে :

এনেছো কিছু? জোগাড় করতি পারলে কিছু? পারোনি? কিচ্ছু পাওনি, না? আজ তিন দিনের মধ্যি তুমি এট্টা দানাও জোটাতি পারলে না, মরুক, কোন রাক্কোস এয়েছে প্যাটে-মরুক।৩

এ নাটকে উল্লেখযোগ্য চরিত্র- জটা, মাতলা ও বাদামি। এরা সবাই হতদরিদ্র। তাদের মাথার উপরে ছাদ নেই, পরনের কাপড় নেই, দুবেলা পেট পুরে খাওয়ার যে অধিকার এদের প্রাপ্য, তা থেকে এরা নিষ্ঠুরভাবে বঞ্চিত। সমাজে এই নি¤œশ্রেণির মানুষগুলো ক্ষুধার যন্ত্রণায় কতটা অসহনীয় জীবনযাপন করেছে, তা মনোজ মিত্রের নাটকেই শৈল্পিকভাবে ফুটে উঠেছে। নাটকে দেখি, তারা ভয়ংকর ক্ষুধায় মাতলার হাতে ধরা পড়া গোখরো সাপটিকে তিনজনই পুড়িয়ে খেতে চায়। বাদামি বলে : ‘খাবা না? কুনোদিন মুখে তুলিনি, কিন্তুক শ্বশুর বাড়ি শুনিচি আগুনে ঝলসে নিলি …।’ অথচ তাদের এ অবস্থার কথা কখনওই তারা চিন্তা করে নি। মহাজন অঘোর ঘোষের অত্যাচারেই তাদের এ পরিণতি।

শুধু সাধারণ মানুষগুলোয় ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর নয়,পশুপাখিরাও  সমানভাবে এ যন্ত্রণা ভোগ করছে। মনোজ  মিত্রের নৈশভোজ নাটকে আমরা দেখতে পাই, জঙ্গলে জোরে জোরে শেয়াল ডাকছে, খাবারের সন্ধান করছে সব নিশাচার প্রাণী। এক টুকরো খাবারের আশায় অন্ধকারের মধ্যে তারা ছোটাছুটি করছে। তাদের চলার শব্দে, লালায়িত প্রশ্বাসে, শিকারের উন্মাদনায় সচকিত করে তুলেছে চারিদিক। জঙ্গলের মধ্যে কু-ুবাবুদের মস্ত বড় কাঁঠাল গাছ। ক্ষুধায় কাতর হয়ে সেই গাছের তলায় এক জোড়া শিয়াল হুয়া ও হুক্কা কাঁঠালের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছেÑকখন কাঁঠাল পড়বে। তারা ভাবছে :

পড় … পড় … পড় … পড় … পড় … পড় কাঁঠাল কিন্তু পড়ছে না। শেয়াল দুটি বারবার লালা মুছে ফেলে দফায় দফায় ভজনা করছে … পড় পড় করে।৪

চেয়ে থাকতে থাকতে চোখে ছানি পড়ে যায় তবু কাঁঠাল আর পড়ে না। ক্ষুধার তাড়নায় হন্যে হয়ে ওঠে তারা। যেমনটি এক সময় তার ঠাকুরদার হয়েছিল। একটি ক্যাঁকড়া মাছ খাওয়ার জন্য ঠাকুরদা সব সময় ডোবার ধারে হুয়া-হুক্কার মতো ওঠ ওঠ করত। কিন্তু ক্যাঁকড়া মাছ আর ওঠে না। একটু খাবারের আশায় হন্যে হয়ে ওঠে। খাবার মেলে না। এক সময় খাদ্যের অভাবে ঠাকুরদা মারা যায়। এই ঠাকুরদার মতোই একই দশা হয় হুয়া ও হুক্কারও। তারা বেঁচে থাকার জন্য রসাল খাবার কাঁঠালের কথা ভুলে প্রোটিনের খোঁজ করতে থাকে। তারা নৈশ্যভোজের উত্তেজনায় গান ধরে :

খোঁজ খোঁজ ভোজ খোঁজ

চাই প্রোটিন হেভি ভোজ

কোথা মিলে কাঁহা ভোজ

কাঁহা-কাঁহা-কাঁহা-কাঁহা৫

যুগ যুগ ধরে বাদামি, মাতলা, জটা, বাঞ্ছারাম, গুপি, পদ্ম, নয়নতারা’র মতো সমাজের অনেক সাধারণ মানুষ শোষক শ্রেণির অত্যাচারে তাদের সবকিছু হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

শোষিত শ্রেণির উপর শোষক শ্রেণির নির্মম অত্যাচার-অবিচারে গড়ে ওঠে শোষক শ্রেণির আধিপত্য। তারা কখনওই ক্ষমতার আধিপত্য ছেড়ে দেয় না।৬ ক্ষমতাকে ধরে রাখার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে। চাক ভাঙা মধু তে মহাজন অঘোর ঘোষকে সাপে কাটলে অধুনা পুজিবাদী শঙ্কর পিতাকে বাঁচানোর জন্য ছদ্মবেশ ধারণ করে। শঙ্কর বাদামিকে সর্পমন্ত্রের রেট জানতে চায়। শুধু এখানেই শেষ নয়, নিজের পিতাকে বাঁচানোর জন্য নিম্ন শ্রেণির প্রতিনিধি মাতলার ঘরের পিড়েতে পর্যন্ত বসে পড়ে। আবার তাদের পক্ষ নিয়ে দাক্ষায়ণীকে বলে : ‘ভাবছি পিসি, এদের এত ঋণ যে কি করে মেটাবো।’ এমনকি শঙ্কর বাদামিকে প্রতিশ্রুতি দেয় তার বাবাকে বাঁচিয়ে তুললে তাদের আর অভাব থাকবে না। সে এও বলে বাদামিকে স্বামীর ঘরে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। এভাবে ওঝা পরিবারকে বুঝিয়ে অঘোর ঘোষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে। অথচ জীবন ফিরে পেয়েই অঘোর ঘোষের মধ্যে সেই পুরাতন শোষণের রীতি ফুটে ওঠে। সে মাতলাকে বলে : ‘দে! আমার সুদ দে!’ সে বেহারা দিয়ে মাতলাকে মারার নির্দেশও দেয়। এটাই শোষক শ্রেণির বাস্তব চিত্র। এভাবে জমিদার, জোতদার, মহাজনদের অত্যাচারে গ্রামবাংলার নিরীহ কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর মানুষগুলোর অসহায় অবস্থা সৃষ্টি হয়।

সমাজে মহাজন-জোতদার বা উচ্চশ্রেণির লোভ লালসার চিত্র তুলে ধরেছেন মনোজ মিত্র তাঁর নাটকে। এই শোষক শ্রেণির লোভ কখনও জমিজমাকে ঘিরে, কখনও অর্থ নিয়ে, কখনও বা নারীর ভরা যৌবনকে ভোগ করার উদগ্র লালসাকে কেন্দ্র করে। বাংলা সাহিত্যের অনেক সাহিত্যিকের রচনায় এই লোভ-লালসার চিত্র মেলে। এক্ষেত্রে আমরা স্মরণ করতে পারি, মীর মশাররফ হোসেনের (১৮৪৭-১৯১২) জমিদার দর্পণ (১৮৭৩) নাটকটি। যেখানে অত্যাচারী জমিদার হায়ওয়ান আলীর কুদৃষ্টি ছিল দরিদ্র কৃষক আবু মোল্লার স্ত্রী নুরন্নেহারের প্রতি। চাক ভাঙা মধু নাটকেও মহাজন অঘোর ঘোষের ঐ একই উদগ্র লালসার শিকার হয় বাদামি। ছেলের সামনে অঘোর ঘোষ বাদামির প্রতি তৃষ্ণাতুর লালসায় উচ্চারণ করে : ‘দে দে! তুই আমারে মধু দিবি।’ শুধু বাদামি নয় অঘোর ঘোষ দাক্ষায়ণীর বৈধব্যের সুযোগ নিয়ে তার যৌবনকে ভোগ করে। নৈশ্যভোজ নাটকে আমরা চক্রধর বাবুর দরিদ্র চামার তুষ্টুর ভিটে বাড়ির উপর লোভ করতে দেখি। জোতদার চক্রধর কৌশল করে তুষ্টুকে কাঁঠাল চুরির অপবাদ দিয়ে তার জমিজমা লিখে নিতে চায়। তুষ্টু যদি জমিজমা লিখে দেয়, তবেই তার মুক্তি। নইলে তার উপর চলে অমানসিক নিপীড়ন। চক্রধর বলে : ‘খুব হেনস্তা করব … হাটে নে গে সবার মাঝে ন্যাংটো করে গায়ে চোক্তা লাগাবো- বেইজুত করবো।’ স্বার্থসিদ্ধির জন্য দরিদ্র মানুষগুলোর প্রতি কঠোর হতে এতটুকু সংকোচ নেই এদের। তুষ্টুর পক্ষ নিয়ে ঢ্যাঙা কথা বললে এই চক্রধর বাবু ঢ্যাঙাকে উদ্দেশ্য করে বলে :

আমার যতই থাক, আর তোমার যতই না থাক, ওটা আমার চাই। দুধারে আমার জমি … মাঝখানে শেকুল কাঁটার মতো তোমাদের ঐ চামার পাড়াটা বিঁধে রয়েছে। ওটা উচ্ছেদ করতে না পারলে জমিটা আমার একটানা হবে না … তার কোনো বাজারদর ও উঠবে না।… আজকাল কতো কল কারখানা গড়ে উঠেছে … জমির মূল্য হু হু হু করে বেড়ে উঠেছে। এক এক করে তাই চামারপুরী সাফ করতে লেগেছি। আজ তোমারে ধরেছি তুষ্টু। তোমার পালা …৭

মহাজন চক্রধর বাবুর এ কথা শুনে আমাদের মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাহিনী (১৩০২) কাব্যগ্রন্থের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার কথা। কবিতায় উপেন নামক এক প্রজার জমি, বাগান বাড়ানোর জন্য কেড়ে নিয়েছিল জমিদার। রবীন্দ্রনাথের এই চিন্তার প্রতিফলন ঘটে নৈশ্যভোজ নাটকে। সময়ের ব্যবধান অনেক অথচ শোষক ও শোষিতের সম্পর্কের কোনো উন্নতি হয় নি।৮ শুধু চক্রধর নয়, তার অপর দুই ভাইও তাদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তুষ্টুর সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করেছে। অনেক অনুনয়-বিনয় করেও রক্ষা পায়নি তুষ্টু।

মনোজ মিত্রের নাট্য প্রতিভার মধ্যাহ্ন পর্বের ফসল সাজানো বাগান। এ নাটকে জমিদার ন’কড়ির লোভ বাঞ্ছারামের সাজানো বাগানের প্রতি। শুধু ন’কড়ি নয়, ন’কড়ির আগে তার পিতা ছ’কড়ি দত্তেরও প্রবল আকর্ষণ ছিল এই বাগানের প্রতি। বলা যায় পিতার অসম্পূর্ণ কাজ এখন পুত্র ন’কড়ি সম্পন্ন করছে। তথাকথিত শোষক শ্রেণির এটাই জন্মগত চরিত্র। তাই ন’কড়ি বাগান পাবার জন্য কুট কৌশলের আশ্রয় নেয়। সে বাঞ্ছারামকে বলে :

প্রতিমাসে পয়লা তারিখে দুখানা করে বড় পাত্তি দেবো … যতদিন জীবিত আছো মাসে মাসে দুশো করে দিয়ে যাবো। আমার শুধু একটা কন্ডিশন। তুমি গত হলে এই ভিটে মাটি বাগান-টাগান সব আমার।৯

সাধারণ শ্রেণির প্রতিনিধি বাঞ্ছারাম বৃদ্ধ বয়সে একটু সুখে শান্তিতে থাকার জন্য ন‘কড়ির শর্তে রাজি হয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়। কিন্তু এই চুক্তির অন্তরালে রয়েছে এক হীনচক্রান্ত যা বাঞ্ছারাম জানে না। ন’কড়ি বাঞ্ছারামের সর্বস্ব গ্রাস করতে চায়। কোনো রকমে প্রাণে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আহার যোগাবার শর্তে বাঞ্ছারামের মৃত্যুর পর তার সব কিছু কেড়ে নেবে এই কুটচক্রান্তকারী ন’কড়ি।

মজার বিষয় হলো এই যে, সমাজের সাধারণ মানুষগুলোর মাঝেও লোভের চিত্তবৈভব দেখা যায়। তবে শোষক শ্রেণির লোভ লালসা থেকে নি¤œশ্রেণির মানুষগুলোর লোভের ব্যবধান দুস্তর। তারা কখনও সুন্দর, গোছালো সংসার চায় না, চায় না কোনো বিত্তবৈভব। তারা চায় কোনো মতে দুবেলা দুমুঠো খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে, কোনো রকমে সংসারকে টিকিয়ে রাখতে। আর এই বেঁচে থাকার জন্য তারা পরস্পরের মধ্যে এক বন্ধনের মাধ্যমে এই বৈভবকে সৃষ্টি করতে চায়। নাটকে দেখি, নয়নতারা ছকুর কাছে সাহায্য চেয়েছে তার পঙ্গু ভাইকে সুস্থ করে তোলার জন্য। নয়নতারা বলে :

দেবা? কটা টাকা আমারে দেবা ছকুদা? ভাইডারে চিকিচ্ছে করাতে পারি। এতখানি বয়স হলো, এখনো দু’পায়ে ভর দে দাঁড়াতি পারে না … সত্যি দেবা তো!১০

আবার এমনিভাবে পদ্ম ও বাদামি উভয়ে চায় তার সন্তান পৃথিবীর মুক্ত আলো বাতাসের মাঝে বেঁচে থাকুক। মাতলা, জটা, ছকু, তুষ্টু, গুপি, চোর, বাঞ্ছারাম এরা সকলেই চায় সাধারণভাবে বেঁচে থাকতে। তাদের চাওয়া-পাওয়ার এই আকাক্সক্ষা অতি স্বাভাবিক।

তৎকালীন সমাজে মহাজন-জমিদার পাশাপাশি আর একশ্রেণির শোষক আছে, যারা মধ্যস্বত্বভাগী নামে পরিচিত। এরা সমাজে মধ্যবিত্ত পর্যায়ে অবস্থান করে। এই মধ্যবিত্তরা সর্বদায় উচ্চবিত্তের গাঁ ঘেঁষাঘেঁষি করে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে। মনোজ মিত্রের নৈশ্যভোজ এ মাস্তান বাবলা ও রফি চরিত্রে সেই মনোবৃত্তি সুস্পষ্ট। বাবলা পেশাদার খুনি। সে খুনের রাজনীতি করে। সে জানে যে পার্টির লাশ বেশি, সে পার্টি জিতবে নির্বাচনে। তাই বাবলার সহচর পলাশ বলে : ‘আজকাল নোমিনেশন দেওয়া হচ্ছে কে কটা লাশ জোগাড় করতে পারে তার ভিত্তিতে।’ এই মধ্যস্বত্বভোগী মাস্তানরা নিরীহ মানুষগুলোর লাশ নিয়ে শোকমিছিল করে। তারা শোকমিছিলের নামে টাকা আত্মাসাৎ করে। বাবলা বলে : ‘আমি দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি … মড়াটা দুহাত বাড়িয়ে আগামী কয়েক ঘণ্টা রাশ রাশ ক্যাশ টেনে আনছে।’ শোষিত শ্রেণির উপর এই শাসকশ্রেণি এতটাই অত্যাচার করে যে মৃত্যুর পরেও নিরীহ মানুষগুলোর লাশ নিয়ে টানাহেঁচড়া করে। এই শোষকদের অত্যাচার কতটা বীভৎস তা রফি মাস্তানের কথায় বোঝা যায়। তুষ্টুর লাশ নিয়ে সে বলে : ‘যেমন করে উদ্বোধনে নেতারা ফিতে কাটে, তেমনি করে ঐ শোষিতের গলার দড়িটা কুচ করে কেটে দেবে।’ মরা মানুষ নিয়ে ব্যবসা করতেও তাদের বাধে না। নাটকে বাবলা সুযোগ বুঝে তুষ্টুর লাশকে টাকার লোভে বিক্রি করে। সে কৌশলে কু-ু বাবুদের তিন ভায়ের কাছে তুষ্টুর লাশকে ভাগ করে দেয়। যা আমাদের মর্মাহত করে। এখানেও বাবলা বলে :

ফাস্ট দিবি বড় ভাইকে … সে টিপ ছাপ নিয়ে ছেড়ে দেবে ছোট ভাইকে … ছোট ভাই সারাদিন মিছিল লড়াবে … ছেড়ে দেবে মেজ ভাইকে … মেজ ভাই যা পারে করবে।১১

সাজানো  বাগান এ জমিদার ন’কড়ির সহচর মোক্তার চরিত্রে এই মধ্যস্বত্বভোগীর বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। নাটকে দরিদ্র বাঞ্ছারামের বহু কষ্টের তৈরি বাগান করায়ত্ত করতে চায় ন’কড়ি জমিদার। সে কৌশলে চুক্তির মাধ্যমে বাঞ্ছারামকে মাসোহারা দিয়ে বাগানটাকে নিজের করে নেয়। অবশ্য বাঞ্ছারামকে দেয়া মাসোহারা থেকে মোক্তার কিছু অংশ অর্থ নিজের পকেটে ঢোকায়। জমিদার ন’কড়ি সব জেনেও চুপ করে থাকে। এটাই সমাজ অর্থনীতির স্বরূপ। শুধু মোক্তার নয়, নাটকে মধ্যবিত্তÑগণৎকার, ডাক্তার, সহচর বাহিনী সকলেই বিত্তবানদের অনুসরণ করে। প্রয়োজনমতো বিত্তবানদের অর্থের বিনিময়ে কাজ করে দেয়। সে কাজ যদি অন্যায়ও হয় বা কারোর ক্ষতিও হয় তাতেও তাদের কোন যায় আসে না। ওরা চায় শুধু টাকা আর টাকা। টাকাই ওদের কাছে সব।

সমাজে এই মহাজন, জোতদার, জমিদারের অত্যাচারে মানুষের অবস্থা যখন সংকীর্ণ তখনই সাধারণ মানুষ অত্যাচারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে। কারণ প্রত্যেক যুগেই অত্যাচারী শোষকগোষ্ঠী যখন সমাজ বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়েছে তখন তার বিরুদ্ধে বঞ্চিত গণমানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করেছে।১২ সাধারণ মানুষেরা বুঝতে শিখেছে, সামাজের অগ্রগতির পথে যে নীতি বাধা দেয় তার বিরুদ্ধে অবশ্যই প্রতিবাদ করতে হবে।১৩ বাংলা নাটকে মাইকেল, দীনবন্ধুমিত্র সচেতন প্রয়াসে যে প্রতিবাদের বীজ বাংলা নাটকে রোপণ করেছিল তা ক্রমশ পরবর্তী নাট্যকারদের মধ্যে নানাঅনুষঙ্গে অঙ্কুরোদ্্গম ঘটেছে। মনোজ মিত্রের নাটকে এই প্রতিবাদ শৈল্পিকভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের আদি যুগের নাটকেও এই প্রতিবাদ দেখা যায়। উমেশচন্দ্র মিত্রের বিধবা বিবাহ নাটক (১৮৫৬), তারকচন্দ্র চূঁড়ামণির সপতœী নাটক (১৮৫৮), রামচন্দের বাল্য বিবাহ(১২৮১) প্রভৃতি নাটকে কখনও সাধারণভাবে, কখনও হাস্যরসের আড়ালে বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ প্রভৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর শোনা যায়। রামনারায়ণের নাটকে সামাজঘটিত নানা অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখা যায়। স্লোগান না দিয়ে, মিছিল না করে যে প্রতিবাদ করা যায় তা আমরা দেখি দীনবন্ধুর নীল দর্পণ নাটকে। গিরিশচন্দ্র ঘোষের জনা (১৮৯৫) এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পাষাণী (১৯০০) নাটকে দর্শক মনোরঞ্জনের সমস্ত উপাদান যেমন ছিল, তেমনি ছিল প্রতিবাদ। রবীন্দ্রনাথের নাটকেও এই প্রতিবাদ উপেক্ষণীয় নয়। তাঁর মুক্তধারা (১৩২৯) নাটকে স্বাধিকার প্রমত্ত রাজশক্তির বিরুদ্ধে, রক্তকরবী (১৩৩১) নাটকে যন্ত্রসভ্যতার নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখা যায়। এরপর গণনাট্যের সময়ে প্রতিবাদ আরও জোরালো হয়।১৪ গণনাট্যের আদর্শে বহু নাটকে সমকালীন সামাজিক-অর্থনৈতিক শোষণ, কালোবাজারি, মহাজনি প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ ঝলসে ওঠে। আর প্রতিবাদের এই স্পষ্টধারা আমরা মনোজ মিত্রের নাটকে দেখি। বাংলা নাটকে প্রতিবাদী এই কণ্ঠস্বরকে আরও ব্যতিক্রমী ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে তোলেন মনোজ মিত্র। প্রতিবাদীই যেন তাঁর নাটকের অন্য নাম। তিনি নিজেই বলেছেন :

ইহ জীবনের জরুরী সমস্যা আমাদের নাটক যেমন তুলে ধরেছে, এমন আর কেউ ধরেনি। উৎপীড়ন, অনাচার, অবিচার, ভ-ামির চারপাশের মত শয়তানির মুখোশ ছিঁড়েছে আমাদের নাটক, অক্লান্তভাবে, নির্মমভাবে এবং ব্যতিক্রমহীনভাবে। আমাদের নাটকের অন্য নাম প্রতিবাদ, আক্রমণ।১৫

চাক ভাঙা মধু নাটকে অত্যাচারী শোষক সুদখোর মহাজনের বিরুদ্ধে শোষিত উৎপীড়িত গণমানুষের তীব্র ঘৃণা, ক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং সবশেষে চরম প্রতিশোধ লক্ষ করা যায়। নাটকে বাদামি চরিত্রের মাধ্যমে প্রতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়েছে। সে নিজের সতীত্ব রক্ষার জন্য, বাবাকে মহাজনের হাত থেকে মুক্ত তথা গ্রামবাসীকে সুষ্ঠু জীবনে ফেরাবার জন্য কচ্ছপ ধরা সড়কি নিয়ে গর্জন করে ছোটে অঘোরের দিকে। বাদামির আঘাতে আঘাতে বধ হয় অসুর অঘোর। আর গ্রামবাসী বিক্ষুব্ধ জনতা চতুর্দিক থেকে চিৎকার করে বলতে থাকে ‘মার মার শালারে মার মার’। গ্রামের হতদরিদ্র নিপীড়িত সাধারণ মানুষের মধ্যে এই উল্লাস গণজাগরণের উল্লাস, প্রতিবাদ-প্রতিশোধের উল্লাস।১৬ এর মধ্যে গণনাট্যের আদর্শ ছাপই লক্ষ করা যায়।

সাজানো বাগান নাটকে প্রতিবাদ রয়েছে। নাটকে বাঞ্ছারাম এক বৃদ্ধ চাষি, অশীতিপর লোলচর্ম বৃদ্ধ। সে হাঁটতে পারে না। তবু তার সাজানো বাগানটাকে রক্ষা করতে সচেষ্ট। জমিদার ছ’কড়ি মরেও বাগানের লোভ ছাড়তে পারেনি, ভূত হয়ে বাঞ্ছারামের পিছনে লেগেছে। কিন্তু এতে সে ভীত নয়। অশক্ত, দুর্বল অবস্থায়ও গুপিকে সে বলেছে ‘তুই আমারে ছেড়ে দে। শালারে আজ মেরে পাটলাশ করে দেব।’ এখানেই সে প্রতিবাদী, আত্মরক্ষায় প্রত্যয়ী পুরুষ। সমাজের শোষকশ্রেণি প্রশাসনিক সাহায্যে, অর্থবলে, যুবকদের বিপথে চালিত করে যত সংঘটিত হয়েছে, মেহনতি শ্রমজীবী মানুষও তত সতর্ক হয়েছে।১৭ তাই বাঞ্ছারাম লাঠি ঠুকতে ঠুকতে ন’কড়ি দত্তের বাড়ি এসেছে তার প্রাপ্য টাকার তাগাদায়। সে এখন মাটি ছেড়ে অনেকটা উঠে দাঁড়িয়েছে। এতদিন যে অত্যাচার অবিচার ন’কড়ি করে আসছিল আজ তার পরিবর্তন হয়েছে। এতকাল জমিদাররা রক্তচোষার মতো দরিদ্র শ্রেণির কাছ থেকে অর্থ নিয়েছে, আজ সেই জমিদারকে অর্থ দিতে হচ্ছে প্রজাকে। তাই ন’কড়িকে বাঞ্ছারাম বলেছে :

টাকাটা দেবেন কত্তা! হে, হে, কী অনাচার! কী অনাচার! চেরটাকাল আপুনারাই লোকের দরজায় টাকা তাগাদায় গেছেনÑ নোকে দিয়েছেÑ আপুনারা নিয়েছেন- আজ আপুনারা দেবেন আমরা- নেবো!১৮

চিরকাল খেটে খাওয়া, সবদিক থেকে মার খাওয়া বাঞ্ছারা আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। সংগ্রামী হয়ে উঠেছে শোষকশ্রেণির বিরুদ্ধে। বাঞ্ছারাম জীবন-মৃত্যুর দ্বন্দ্বে, শোষিত শ্রেণির অন্যায় অত্যাচারের মধ্য থেকে বেরিয়ে এসেছে মুক্ত জীবনের পটভূমিতে। বাঞ্ছারামের মধ্যে যে প্রতিবাদী চেতনা লুকায়িত ছিল আজ তা প্রকাশিত হয়েছে। গুপির নবজাতক শিশুর কান্না তার জীবনে বয়ে এনেছে এক নতুন প্রভাত। তাই বাঞ্ছারাম ন’কড়িকে বলে ‘এট্টা কথা বলি কত্তা আমি মরতে পারবো না। আজ্ঞে বাচ্চাটার পরে বড্ড মায়া পড়ে গেছে।’ দেশলাইয়ের একটি কাঠির জ¦লন্ত আগুনের মতো জ্বলে উঠেছে বাঞ্ছারাম। বাঞ্ছারামের মতো অনেক কাঠি আছে এই সমাজ বাক্সে। তারা এখন সকলে একত্রে জ্বলে উঠেছে।১৯ তাদের তেজঃশক্তি এখন অপরিমেয়। সেই তেজঃশক্তির ভয়ে ছ’কড়ি (ভূত) অদৃশ্য হয়ে যায় এবং আতঙ্কে মারা যায় শোষক ন’কড়ি দত্ত।

অতি দরিদ্র নিপীড়িত মানুষের তীব্র প্রতিবাদ দেখা যায় নৈশ্যভোজ নাটকে। এখানে নাট্যকার চৌকিদার ঢ্যাঙার মধ্যে প্রতিবাদী মানসিকতার চিত্র দেখাতে চেয়েছেন। ঢ্যাঙার মধ্যে সর্বহারাদের সংগঠিত হবার বীজ সঞ্চার করেছেন। সেও কুণ্ডু বাবুদের অত্যাচারের শিকার হলেও সে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। তাই বড় কু-ু তুষ্টুর লাশ নামাতে বললে ঢ্যাঙা বলে :

চাউকিদার, চাউকিদার বলো। গাছে লাশ ঝুলছে। আইনত ও লাশের দায় এখন চাউকিদারের। যে ঐ লাশের গায়ে হাত দেবে চাউকিদারের লাঠি তার মাথায় পড়বে। … সে যেই হোক …।২০

নাটকে তিনজন মহাজনই একত্র হয় তুষ্টুর ভিটেবাড়িসহ তাদের স্বার্থ হাছিল করার জন্য। চক্রধর ঢ্যাঙাকে লাশ গাছ থেকে নামিয়ে দিতে বললে সে আবারও বিদ্রোহী হয়ে বলে ‘বড্ড অস। অ্যা! গরিবের মড়ায় বড্ড অস? অস একেবারে মাটো করে ছেড়ে দেব।’ তারা ভাবে ঢ্যাঙা নেশার ঘোরে এভাবে বকছে। কিন্তু ঢ্যাঙা সত্যিই বিপ্লবী হয়ে ওঠে। নাট্যকার এখানে দেখাতে চান সাধারণ মানুষ সারাজীবন শোষক শ্রেণি কর্তৃক শোষিত হলেও এক সময় প্রতিবাদী হতে বাধ্য হয়। তাই ঢ্যাঙা লাঠি তুলে সবাইকে তাড়িয়ে দিয়ে বলে :

কী করবি? রুটি দেয়া বন্ধ করবি? খাবো না তোর রুটি। দিস তো চারখানা রুটি এই বিশাল দেহটারে। যা খাবো না।২১

মনোজ মিত্রের সৃষ্ট সাধারণ মানুষগুলো নানা অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, বাদ-প্রতিবাদের মধ্য দিয়েও তাদের মঝে সহমর্মিতা ও বন্ধনের দৃশ্য দেখা যায়। তাদের এই বন্ধন সর্বদায় ছিল প্রজ¦লিত। চাক ভাঙা মধুতে মাতলা চরিত্রে সেই মানবীয় গুণ দেখতে পায়। মাতলা একজন রক্ত মাংসের মানুষ। সে শিশুর মনের মতো সরল। সমাজে একেবারে অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ হলেও মানবিক সুখ-দুঃখ, মায়া-মমতা ইত্যাদি তাঁর পুরোমাত্রায় ছিল। এ জন্য মাতলা বাদামির গর্ভস্থ ছেলেকে বাঁচাবার জন্য নিষ্ঠুর মহাজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিতে দ্বিধা করে না। মাতলার জবানিতে : ‘… ঠিক তারে পৃথিবীর আলো বাতাস দেখায়ে দেবো আমি সে যখন দেখতি এয়েছে, তারে ফেরাবো না …’। শুধু এখানেই শেষ নয়, ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পারায় বাদামি যখন ছটফট করে, তখন জটা বাদামিকে বাচ্চা নষ্ট করার কথা বললে মাতলা জটার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। ক্রন্দনরত বাদামিকে সান্ত¡না দিয়ে মাতলা বলে : ‘ভয় পাস আঁ? ওরে না,না, মারবো না … ভূমিষ্ঠ হবার আগে তোর ছেলেরে মারতি পারি আমি।’ শত অভাব-অনটনের মাঝেও একটি অনাগত শিশুকে পৃথিবীর মুখ দেখাতে মাতলার যে সচেষ্ট প্রয়াস তা আমাদেরকে বিস্মিত করে।

নিম্নশ্রেণির মানুষেরা পরস্পরের সঙ্গে গভীর বন্ধনে আবদ্ধ। একজনের বিপদে আর একজন এগিয়ে আসে। মনোজ মিত্রের নৈশ্যভোজ নাটকে ঢ্যাঙা চরিত্রে আমরা সেই বন্ধন দেখতে পাই। এখানে ধার্মিক চামার তুষ্টু তার কন্যা নয়নতারার চুরির ফল ফেরত দিতে গিয়ে চোর অপবাদ সাব্যস্ত হয়। সমাজে উচ্চশ্রেণি চক্রধর নিম্নশ্রেণি তুষ্টুর সততাকে কোথায় সাধুবাদ জানাবে, তা না করে কৌশলে তুষ্টুর ভিটে বাড়ি করায়ত্ত করতে চায়। জমি লিখে দিলেই চোরের অপবাদ থেকে তার মুক্তি। চক্রধর যখন তুষ্টুর উপর এই অবিচার করে চলেছে তখন পাহারাদার ঢ্যাঙা বাবুর চক্রধরকে যা বলেছে তা মানবিকতারই বহিঃপ্রকাশ। ঢ্যাঙা বলে : ‘হ্যাঁ বড় জ্যাঠা আপনার তো কতই আছে …।’

সাজানো বাগান নাটকে এ মানবিকতা আরও বেশি পরিস্ফুট হয়েছে বাঞ্ছারাম চরিত্রে। এখানে চোর, পদ্ম, গোপি সমাজের একেবারে সাধারণ মানুষ। যাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন বাঞ্ছারামের সাজানো বাগান। চোরের জীবনজীবিকা নির্বাহ হয় বাঞ্ছারামের বাগানের ফল চুরি করে। অন্যদিকে গোপি ও পদ্মও পরোক্ষভাবে এই বাগানের উপর নির্ভরশীল। অথচ ন’কড়ির কুট-কৌশলে সেই বাগান বাঞ্ছারামের অবর্তমানে ন’কড়ি হয়ে যাবে। তাই বাঞ্ছারাম জীবন-মৃত্যুর দ্বন্দ্বের মাঝ থেকে বেরিয়ে এসেছে, এই মানুষ গুলোকে সুষ্ঠু সুন্দর মুক্তজীবনে প্রবেশ করানোর জন্য। এই হতদরিদ্র বৃদ্ধ বাঞ্ছারামের এই মহানুভবতায় আমরা অভিভূত হই। সে জমিদার ন’কড়িকে উদ্দেশ্য করে বলে : ‘এট্টা কথা বলি কত্তা আমি মরতি পারব না।’ তার বেঁচে থাকার মাঝেই এই মানুষগুলো সমাজে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে পারবে।

মনোজ মিত্রের তিনটি নাটক আলোচনা শেষে বলা যায়, তিনি তাঁর নাটকের মধ্য দিয়ে সমাজের অন্তর্মূলে প্রবেশ করে মানবজীবনের বাস্তব সত্যগুলোকে শৈল্পিক নিরীক্ষায় উপস্থাপন করেছেন। তিনি নাটকে অত্যাচারিত, শোষিত মানুষগুলোর জীবন জীবিকা যেমন তুলে ধরেছেন তেমনি এ শোষণের যাঁতাকল থেকে মানুষের মুক্তির উপায়ও নির্দেশ করেছেন। মনোজ মিত্রের নাটকে শেষপর্যন্ত শোষণ-নির্যাতন পদদলিত হয়ে শোষিতের জয় ঘোষিত হয়েছে, প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সত্য ও ন্যায়।

 

তথ্যনির্দেশ

১.            ড. সঞ্জয় পাল, বাংলা নাটকে গণ আন্দোলন নির্বাচিত চিরায়ত নাটক, (কলকাতা : বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ, ১৪১৮), পৃ. ১৪০

২.            সচ্চিদানন্দ চৌধুরী (সম্পা.), সোনারপুর কৃষ্টি সংসদের মুখপত্র, (কলকাতা), ১৯৮৫, পৃ. ৬

৩.           মনোজ মিত্র, নাটক সমগ্র, ১ম খণ্ড, (কলকাতা : মিত্র এন্ড ঘোষ, ১৯৯৪), পৃ. ৫

৪.            পূর্বোক্ত, পৃ. ২৪৯

৫.            পূর্বোক্ত, পৃ. ২৫০

৬.           রবীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কালজয়ী বাংলা নাটক পুনর্বিচার, (কলকাতা : দিয়া পাবলিকেশন, ২০০৫), পৃ. ১৭৯

৭.            মনোজ মিত্র, নাটক সমগ্র, ১ম খণ্ড, (কলকাতা : মিত্র এন্ড ঘোষ, ১৯৯৪), পৃ. ২৬১

৮.           ড. সঞ্জয় পাল, বাংলা নাটকে গণ আন্দোলন নির্বাচিত চিরায়ত নাটক, (কলকাতা : বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ, ১৪১৮), পৃ. ১৪৮

৯.            মনোজ মিত্র, নাটক সমগ্র, ২য় খণ্ড, (কলকাতা : মিত্র এন্ড ঘোষ, ২০০৮), পৃ. ১০

১০.         মনোজ মিত্র, নাটক সমগ্র, ১ম খণ্ড, (কলকাতা : মিত্র এন্ড ঘোষ, ১৯৯৪), পৃ. ২৫৩

১১.         পূর্বোক্ত, পৃ. ২৮৬

১২.          মো: জাকিরুল হক, দুই বাংলার নাটকে প্রতিবাদী চেতনা, (ঢাকা : বাংলা একাডেমি, ২০০৭), পৃ. ১

১৩.        ড. অজিত কুমার ঘোষ, বাংলা নাটকের ইতিহাস, ২য় সংস্করণ, (কলকাতা : দে’জ পাবলিশিং, ২০১০), পৃ. ৩৬৯

১৪.         দেবব্রত বিশ্বাস (সম্পা.), বাংলা নাটকে প্রতিবাদের ভাষা, (কলকাতা : একুশ শতক, ২০১৪), পৃ. ৩৯০

১৫.         মনোজ মিত্র, নাটক সমগ্র, ২য় খণ্ড, (কলকাতা : মিত্র এন্ড ঘোষ, ২০০৮), পৃ. ভূমিকা- ২

১৬.        মো: জাকিরুল হক, দুই বাংলার নাটকে প্রতিবাদী চেতনা, (ঢাকা : বাংলা একাডেমি, ২০০৭), পৃ. ৩৫১

১৭.          নৃপেন্দ্র সাহা (সম্পা.), মনোজ মিত্রের সাজানো বাগান এক সর্বজনীন বিশ্বজনীন নাটক, (কলকাতা : কোডেক্স), পৃ. ১৬২

১৮.        মনোজ মিত্র, নাটক সমগ্র, ২য় খণ্ড, (কলকাতা : মিত্র এন্ড ঘোষ, ২০০৮), পৃ. ৩১

১৯.         নৃপেন্দ্র সাহা (সম্পা.), মনোজ মিত্রের সাজানো বাগান এক সর্বজনীন বিশ্বজনীন নাটক, (কলকাতা : কোডেক্স), পৃ. ১৬৪

২০.         মনোজ মিত্র, নাটক সমগ্র, ১ম খণ্ড, (কলকাতা : মিত্র এন্ড ঘোষ, ১৯৯৪), পৃ. ২৬৮

২১.          পূর্বোক্ত, পৃ. ২৮৭

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares