প্রবন্ধ

শিল্প-সাহিত্যে ন্যারাটিভ, বিমূর্ত ও আধুনিক ভাবনা

জুলফিয়া ইসলাম

 

শিল্প-সাহিত্য হচ্ছে সমুদ্রের তরঙ্গের মতো। যুগের সাথে সাথে অফুরন্ত বহে চলা ঢেউগুলো বিবর্তিত হয়ে এর আকৃতি-প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটে। তাই ‘বিশুদ্ধ শিল্প’ বলার ধারণাটাই অবাস্তব বিবেচিত হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। শিল্প সম্পূর্ণ বিমূর্ত অবস্থায় বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। বিমূর্ত ছোঁয়ার পাশাপাশি ছন্দ ভাঙতে থাকে। আবার ছন্দের আবর্তে ফিরেও আসা যায়। বাস্তবের পাশাপাশি বিমূর্ত, সরলও নয় আবার দুর্বোধ্য ভাবলেও ভুল হবে। কোনো লেখকের নাম যখন বিশেষণ হয়ে দাঁড়ায় তখন আসলে অর্থ কী হয়? এদিক থেকে দেখলে এটাই কোনো লেখকের সাফল্যের শেষতম পর্যায়। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কোনো বাস্তব কাহিনি শুনে আমরা বলি ‘শেক্স্পিয়ারিয়ান’ বাংলায় ‘রাবিন্দ্রিক’, বাঙালিরাই ব্যবহার করে। কাফকা হলো ‘কাফকায়েস্ক’ পৃথিবীর এমন কোন ইংরেজি ডিকশনারি নেই যেখানে এই শব্দ অনুপস্থিত। আধুনিক পৃথিবীর অগণন সর্বাধুনিক মানুষ যাঁরা জীবনযাপনের দুর্বিষহ ভারে, সমাজের অন্যায় অবিচার ও খামখেয়ালিপনার চক্করে বেঁচে থাকার ঘানি টানতে টানতে নিজেদের পোকার মতো কিছু বলেই ভাবে, তাদেরই একজন এখানে সত্যিকারের, বাস্তবের একটি পোকায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। এখান থেকেই বিশ্ব সাহিত্যে জাদু বাস্তবতার (magic  realism) প্রথম ঝড় শুরু। কাফকার রূপান্তর গল্পের এই লাইনটি পড়েই জাদু-বাস্তবতার প্রধান নাম গ্যাব্রিয়েল মার্কেসের অসংখ্য জাদু-বাস্তবতাময় লেখনীর শুরু। আর তারও আগে হোরহে লুইস বোরহেসের বিখ্যাত  `The congress’  গল্পের চোখ ধাঁধাঁনো জাদু-বাস্তব কাহিনির প্রারম্ভ।

এটা চিরন্তন সত্য, অধিকাংশ লেখকের সৃজনীশক্তিকে সমকালীন লেখকরা ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না। যেমনটি পারেন নাই জীবনানন্দকে। সাহিত্যের নানা ধারার সাথে যারা পরিচিত তারা বুঝতে পারবেন সাহিত্যে চলমান ধারার পাশাপাশি ফ্যান্টাসি ও বাস্তবতা কীভাবে মিলেমিশে একাকার হতে পারে। যেমন, ফ্রানৎস কাফকা তার ‘রূপান্তর’ গল্পটি সম্পর্কে ডায়রিতে লিখে গেছেন, ‘এই গল্পটি কোনো স্বপ্ন নয়। এটি রিয়েলিস্ট আবহের মধ্যে ছুঁড়ে মারা একটি এক্সপ্রেশনিস্ট বোমা। স্বপ্ন হিসেবে এর ব্যাখ্যা করা ভুল।’

প্রত্যেক বড়মাপের কবি সাহিত্যিকের ভাষাকে সমৃদ্ধ করে রাখার জন্য কিছু অবদান থাকে। জীবনানন্দ দাশই প্রথম বাংলায় বিমূর্ত কাব্যরীতির প্রবর্তন করেন। এইসব কবিতা শুধু উপভোগের বিষয় নয়। বিমূর্ত কাব্যরীতির মাঝেও অনেক তথ্য খুঁজে পেতে পারি। যেমন, ‘ব্যবহৃত হতে হতে শুয়োরের মাংস হয়ে যায়’। এটা হলো ‘জীবনানন্দীয় ধারা’  জীবনানন্দের কবিতার প্রতি অতিরিক্ত মুগ্ধ হয়ে অনেক কবি ভাবতে শুরু করেছিলেন এবার তো কবিতায় ইচ্ছেমতো শব্দ ব্যবহার করা যাবে। বিশেষ্য বিশেষণের বালাই না থাকলেও চলবে। কিন্তু জীবনানন্দের কবিতা এমনটি কখনও বলেনি। পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তার কবিতায় কাহিনির আভাস আছে। আছে চরিত্রেরও ছড়াছড়ি, বিন্যাস। বিমূর্ত শিল্পে কাহিনি থাকে, চলমান বক্তব্যও থাকে। কারণ শিল্পমাত্রই মনোরম কিছু। এখানে কাঠিন্য বলে কিছু নেই। ভাষা কঠিন হোক বা সরল হোক সেটা পাঠকের কাছে হৃদয়গ্রাহী হতে হবে। লেখকের জটিল বর্ণনা থেকে পাঠক যদি পাঠ উদ্ধার না করতে পারেন তাহলে সেটা পাঠকের দীনতা। আবার অত্যন্ত সাবলীল ভাষার অন্তর্নিহিত ভাবকে উদ্ধার করতে না পারলে সেটাও পাঠকেরই দীনতা। কেননা যুক্তি যদি কঠিন হয় তাহলে তার প্রকাশও হবে ভাষার কাঠিন্যে, আপাত সেটা নরম মনে হলেও। কারণ বিশেষ চিন্তা ছাড়া কোনো দিনই শিল্প সৃষ্টি হয় না। শিল্পীর ভাবনা ছাড়া কোনো শিল্প গড়ে উঠতে পারে না। শিল্পীর শিল্প তো হৃদয় স্পর্শ করবেই। না হলে শিল্প হবে কী করে?

যেমন পৃথিবীর গদ্যসাহিত্যে ন্যারাটিভ নামে একটি স্টাইল ছিল। সে স্টাইল পরিবর্তিত হয়ে যায় যখন ফ্রানৎস কাফকার স্বীকৃতি মেলে। সে সময়টিতে বাস্তবতা বাদ দিয়ে বিমূর্ত ভাবটিই প্রধান হয়ে ফুটে ওঠে এবং এর প্রভাব চিত্রশিল্পেও পড়ে।

যুদ্ধকালীন নারকীয় বাস্তবতার পর লেখক শিল্পীরা বাস্তবতাকে বিসর্জন দিয়ে বিমূর্ততার দিকে ঝুঁকে পড়েন। অনেকে ভেবে থাকেন বিমূর্ত শিল্পে কোন বক্তব্য নেই। কথাটা ঠিক নয়। প্রমথ চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় রবীন্দ্রনাথ সাধুগদ্য একেবারে পরিত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু কবিতায় দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি সাধু ও চলিত মিশ্রণ রেখেছিলেন। জীবনানন্দের পাণ্ডুলিপি দেখেই বোঝা গিয়েছিল তিনি একটি বিশেষ ধরণের নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীসময়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী কিংবা অরুণকুমার সরকার প্রমুখ জীবনানন্দ দাশের কাব্যরীতির সংস্পর্শে নতুনভাবে কিছু লেখার ভাবনা চিন্তা করেছেন।

শিল্পে বিমূর্তধারা কিছুটা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। সরাসরি বোঝা যায় না। অথচ ভাষায় সরলতা পরিলক্ষিত হয়। এর প্রধান কারণ হচ্ছে বিমূর্ততার প্রয়াস কাঠিন্য দিয়ে হতে চায় না। প্রতীকী অবলম্বন করে সরাসরি মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হয় তার দীনতাÑ অলস নপুংশক থাকার ভয়াবহ পরিণতি। তাই একসময় ফ্রানৎস কাফকার জন্মস্থান চেকোশ্লোভাকিয়াতেই তাঁর রচনা নিষিদ্ধ ছিল। রাশিয়াতে দস্তয়োভস্কিকে অনেকদিন সুনজরে রাখা হয় নি।

শিল্পের আর এক শক্তিশালী মাধ্যম সঙ্গীত বিশেষ করে যন্ত্রনির্ভর সঙ্গীত বিমূর্ত হয়ে টিকে থাকতে পারে দীর্ঘদিন। সঙ্গীত এমন একটি সার্বজনীন মাধ্যম যাকে উপেক্ষার কোনো অবকাশই নেই।

বাংলা ভাষায় আমরা যারা কথা বলি তারা অদ্ভুতভাবে রাজনৈতিক দুটি ভিন্ন বলয়ের বাসিন্দা। এই দুই বাংলার কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে যদি আলোচনা করা হয় তবে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন লেখার ওপর অনেকাংশে প্রভাব ফেলেছে। এজন্য এদেশের কবিতা কিছুটা সোজাসুজি। যেটা পশ্চিমবাংলায় প্রযোজ্য নয়। তাদের কবিতায় শব্দের নিখুঁত গাঁথুনিটা আছে। অর্থের প্রাধান্য তেমন নাই। এর মধ্যে যদিও মাদকতা রয়েছে তবুও দেশে চলমান রাজনীতি যদি অস্থিতিশীল হয় তখন শব্দে ধ্বনিমাধুর্য খুঁজলে সেটা অশ্লীল মনে হয়। কবিতা লিখে কখনও সমাজ পরিবর্তন হয় না। কিংবা কবি কোনো স্বপ্নদ্রষ্টাও নন। তবুও এই পৃথিবীর বিশুদ্ধীকরণে কবি নীরব থাকতে পারেন না। এটাই হলো আধুনিকতা। আর তাই আধুনিক বিশ্বে অন্য কবিতার পাশাপাশি বাংলা কবিতায়ও আধুনিকতার প্রাপ্তি ঘটেছে। প্রাচীন কবিদের শব্দচর্চার উন্নত স্তরেও মিশে আছে দিন-রাত্রি, স্বপ্ন ও জাগরণের বাস্তব রূঢ়তা।

উপন্যাস-এর প্রাথমিক যাত্রারম্ভ বাস্তব জগৎ থেকে। বাস্তব জগতই উপন্যাসের বিষয়ীভূত অনুভবের উৎস। শ্রেণি বিন্যস্ত সমাজে প্রত্যেক মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্যে এতো বেশি পার্থক্য থাকে যে, উপন্যাস কালক্রমিক না হয়ে পারে না। অর্থাৎ গতিশীল প্রত্যক্ষ বাস্তব উপন্যাসে প্রতিফলিত হবে। উপন্যাসের চরিত্রের ক্রিয়া ও অনুভূতি বহির্জগত থেকে বিচার করাই শ্রেয়। উপন্যাস সেই কারণেই বাস্তবাশ্রয়ী। জগতের বিভিন্ন কোণ থেকে নায়কের কতগুলি পরিপ্রেক্ষিত সমষ্টি।

সুতরাং যে সমাজের মানুষের অভিজ্ঞতা কম সে সমাজে একটি পরিপূর্ণ উপন্যাস সৃষ্টি হতে পারে না। উপন্যাস সে সমাজে পরিপুষ্ট হবে যে সমাজের মানুষের অভিজ্ঞতা বেশি।

উপন্যাসের জন্মবৃত্তান্ত খুঁজতে গেলে দেখা যায় উপন্যাসের সর্বপ্রধান উপজীবিকা হচ্ছে ব্যক্তি। সমাজের বিরুদ্ধে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে ব্যক্তির যে সংগ্রাম তারই কাহিনি উপন্যাসে লিপিবদ্ধ করা হয়। ধনতান্ত্রিক সমাজে যখন মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে বিরোধ ঘনীভূত হলো তখন উপন্যাস প্রবেশাধিকার পেল শিল্পের মহাসভায়।

সমাজ ও সামাজিক মানুষই হলো উপন্যাসের উপাদান। আর তাই সমাজের উন্নততর অবস্থার রূপান্তরের ফলে উপন্যাসের উপাদান আরও উন্নত হবে। অতএব যে সমাজে গার্হস্থ্য জীবনের বাইরে কোনো জীবন নাই সেই সমাজে তেমন উন্নত উপন্যাস সৃষ্টি হতে পারে না।

‘সৃজনী শিল্পের আত্মা এমন একটি জটিল বস্তু যাতে থাকে সংগীত, চিত্র এবং কাব্যিকগুণের এক বিচিত্র এবং অনির্দিষ্ট সমাবেশ।’ কথাটি বলেছিলেন আলবার্ট শোয়াইজার, ইউরোপিয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের গুরু এবং পথিকৃৎ বাখ (Bach) সম্বন্ধে। নিজের নিজের অভিব্যক্তির স্বাভাবিক মাধ্যম ছাড়াও একটি অতিরিক্ত মাধ্যমের প্রয়োজন। এটি অনেক মনীষীই গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। যারা কবি তারা জানেন অন্ত্যমিল মানে দুই পংক্তির শুধু শেষ অক্ষরের মিল নয়, পুরো শব্দটির ধ্বনিগত মিল থাকা আবশ্যিক তো বটেই, অন্য অক্ষরগুলির বর্গ-গত মিল থাকলেও ভালো হয়। মাঝখানে একটি অকারণ মিলের জন্য ভুল শব্দ থেকে বিরত থাকাই ভালো।

আমার মনে হয় সামান্যকে সৃষ্টি করতে গিয়ে অসামান্যকে ত্যাগ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। নতুন Movement  চালাবার খাতিরে যে গাছের ডালে বসে আছে তার মূলোচ্ছেদ কর্তব্য নয়। যারা সুলভ নয়, যা সহজে আয়ত্ত করা যায় না- তার দিকে কেউ সহজে অগ্রসর হতে চায় না। সস্তার যুগে সকলেই সহজে ও অনায়াসলভ্য মেওয়া চায়- কেউ সবুর করতে চায় না।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares