প্রবন্ধ

আনিসুল হকের কবিতা :

নির্মাণকলায় বহুমাত্রিকতা

আবিদ আনোয়ার

 

আনিসুল হক কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও সাংবাদিক হিসেবে বেশি পরিচিতি অর্জন করলেও গত শতাব্দীর আশির দশকের সর্বোত্তম বৈচিত্র্যবিলাসী কবিও তিনিই। দশকের গণ্ডি পেরিয়ে আবহমান বাংলা কবিতার ভাণ্ডারে স্থান পাবার যোগ্য তাঁর কবিতা।

আনিসুল  হকের প্রথম পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে, আয়ুর চেয়ে বড় সাধ তার আকাশ দেখার, আমি আছি আমার অনলে, নক্ষত্রের পানে চেয়ে বেদনার পানে, এবং  জলরংপদ্য নিয়ে আমার এ-লেখায় মূলত তাঁর কবিতার নির্মাণকলার বৈশিষ্ট্য নিরূপণের চেষ্টা করেছি। কবিতার আলোচনায় বিযয়বস্তুকে কম গুরুত্ব দিয়ে থাকি, এর কারণ আমি বহুবার বহু লেখায় উল্লেখ করেছি : বিষয়বস্তুনির্ভর আলোচনায় কারও কাব্যকৃতির মূল্যায়ন করা যায় না। কারণ ফুল নিয়ে যেমন রচিত হতে পারে একটি নিকৃষ্ট কবিতা, তেমনি মল নিয়ে রচিত হতে পারে একটি উৎকৃষ্টমানের কবিতা। কারও কাব্যকৃতির মূল্যায়নের নির্বিকল্প মানদ- তাঁর নির্মাণকলা। তবে, নির্মাণকলাবিষয়ক আলোচনায় প্রবেশের আগে কবির মানসলোকের কিঞ্চিৎ পরিচয় তুলে ধরাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, যেখানে বিষয়বস্তুর প্রসঙ্গও প্রকারান্তরে কিছুটা এসে যায়।

কবি হিসেবে আনিসুল হকের প্রবেশকালটি উত্তাল ছিল এরশাদ আমলে স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে। কাব্যজগতে প্রবেশলগ্নে প্রেমের কবিতা বেশি লিখলেও এবং খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে গ্রন্থের কবিতার একটি পঙক্তিতে ‘আমার কবিতারা আসলে কিছু নয় তোমাকে চাইবার অস্ত্র’ বলে প্রেমের প্রতি পক্ষপাতমূলক সরল স্বীকারোক্তি থাকলেও তৎকালীন রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা,  দুঃশাসনের প্রতি ঘৃণা ও তা থেকে উত্তরণের আকাক্সক্ষা মূর্ত হয়েছে তাঁর কবিতায়। প্রমাণ হিসেবে একই কবিতার নিম্নোদ্ধৃত পঙক্তিগুলো লক্ষণীয় :

আমার কবিতারা মূলত ভিক্ষুক, যদিও সশস্ত্র, জঙ্গি

মার্সিডিজে তুমি যখন বাহুডোরে অপর বুর্জোয়া পুরুষের

তখন ব্যর্থতা পোড়ায় কস্তুরী, পোড়ায় সজীবতা বাগানের

তোমাকে পাবো কই, এ পোড়া দেশটাতে? তুমি কি ফার্স্টলেডি টিভিতে?

তোমাকে পাবো কই নষ্ট নগরের অসম সামাজিক আচারে?

 

এই কবিতায় প্রেমের পাত্রীটির নাম  কখনও ‘সুষমা’, কখনও ‘দিবা’ বা ‘শাহানা’র উল্লেখ থাকলেও এবং মার্সিডিজে অন্য বুর্জোয়ার বাহুলগ্ন এক নারীর প্রতিমা চিত্রিত হলেও  অন্য অনেক অনুষঙ্গে মনে হয় এটি কেবল নারীপ্রেম নয়;  দেশমাতৃকার হারিয়ে-যাওয়া লাবণ্য, সুসময় এবং ঐতিহ্যকে ফিরে পাওয়ার কিংবা কবিতাশিল্পের ‘সুষমা’কে ফিরে পাওয়ার আকাঙক্ষা প্রচ্ছন্নভাবে কবিমানসে ক্রিয়াশীল ছিল। পাঠকের বোধে এই বিষয়গত বহুমাত্রিকতা এবং এর সঙ্গে সুখপাঠ্য ৭-মাত্রার মাত্রাবৃত্তীয় চালের মুগ্ধতা সঞ্চারিত করতে পারার কারণেই কবিতাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বলেছি, প্রথম কাব্যগ্রন্থ খোলা চিঠি সুন্দরের কাছের কবিতাগুলোতে আত্মজৈবনিক প্রেম-বিরহ ও নান্দনিকতার প্রাধান্য থাকলেও সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর দ্রোহ উচ্চারিত হয়েছে বহু কবিতায়। প্রমাণস্বরপ উল্লেখ করা যায় : ‘লংমার্চ’  কবিতায় রাজধানীর দিকে ধেয়ে-আসা বন্যার পানির সমান্তরাল রূপক হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে গণমানুষের বিদ্রোহের কথা : ‘একটি লাইটপোস্ট’ কবিতায় আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান ও এরশাদের শাসনামলের বহু চিত্র অঙ্কিত হয়েছে বহু বিচিত্র ভাষায়, যেমন : ‘দূর হ আইয়ুবশাহী’,‘বুলেটবিদ্ধ নূর হোসেন/হেঁটে  যায় অবলীলায় সূর্যের দিকে’, ‘চেপে-বসা নৃপতির ভুল সিংহাসন’; ‘মিছিলও বিষণ্ন হয়’  কবিতায় ‘মাথাভরা অবিন্যস্ত বেয়াদব চুল যেন  বিদ্রোহী পতাকা’, ‘বুকের পকেটে রাখে হৃদপিণ্ডের মতন ছোট-তাজা ককটেল-বোমা’; ‘আগুন’ কবিতায় ‘দেখো এই নাগরিক স্ট্রিটে পোড়ে জলপাই ট্রাক’; ‘বেয়াদবদের জন্য’ কবিতায় ‘পুলিশের প্রতীকে সে ঢিল ছোড়ে উর্দিপরা সামরিক শাসকের প্রতি’, ‘তারা সরব সচল মিছিলে মিছিলে/কী রকম অনুপ্রাস অন্ত্যমিলে তাদের উদ্বাহু স্লোগানে স্লোগানে’; এরশাদিয় সামরিক স্বৈরশাসনের পতনের আকাক্সক্ষায় তিনি মানুষকে আশার বাণী শুনিয়েছেন ‘মানুষ জাগবে ফের’ নামের একটি সিরিজ কবিতায় যাতে রয়েছে ১০টি টুকরো; এর প্রতিটিতেই প্রকাশ পেয়েছে দুঃশাসনের চিত্র এবং আসন্ন বিপ্লব ও বিজয়ের আশাবাদ। ‘ক্লাসনোট থেকে’  শিরোনামের একটি কবিতায় শহরের বর্জ্যপদার্থের একটি তালিকা লিখে পাদটীকায় লেখা হয়েছে ‘একনায়ক সামরিক শাসকদের নাম বর্জ্যপদার্থসমূহের এই তালিকার শীর্ষে থাকবে’। সমাজভাবনা তথা জনজীবনের সাথে তাঁর কবিতা সম্পৃক্ত থাক এমন অঙ্গীকার প্রকাশ করেছেন তিনি ‘জনতা আমাকে নাও’ নামের একটি কবিতায় এ-রকম ভাষায় :

‘জনতা আমাকে নাও, নির্জনতা আমাকে নিও না

যে আতর বুকে রেখে নিভৃতি খুঁজতে হয়

সে সুবাস প্রিয়তমা আমাকে দিও না।’

এই সামাজিক অঙ্গীকার বেশ থিতিয়ে আসে তাঁর পরবর্তী কাব্যচর্চায়। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ থেকে অন্তর্লোকে ডুব দিয়ে তিনি বেশি নিবিষ্ট হন প্রেম-বিরহ, নান্দনিকতা ও সাহিত্য-ঐতিহ্য ব্যবহার করে আত্মজৈবনিক কবিতা রচনায়। তবে, মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে সর্বদাই এসেছে তাঁর রচনাকর্মে। দ্বিতীয় গ্রন্থের ‘প্রথম পাঠ’ নামের ৯-টুকরোবিশিষ্ট’ একটি সিরিজ কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের নানাপ্রসঙ্গ ঘুরেফিরে এসেছে নস্টালজিক ভাবনায়; ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন অপরিণত বয়সের এক কিশোরমাত্র। তাঁর বর্তমান লেখালেখিতেও মুক্তিযুদ্ধের যেসব প্রসঙ্গ ঘুরফিরে আসে, এই সিরিজ কবিতার দুই-নম্বর  টুকরোয় এবিষয়ে তাঁর  স্বীকারোক্তি :

‘এই যে এখন লিখি সাদা

খাতাজুড়ে বর্ণের মিছিল

শব্দের ভেতর থেকে উঠে

আসে সেইসব দিন।’

তাঁর বহু কবিতায় সাহিত্য-ঐতিহ্যের ব্যবহার দেখে স্পষ্টতই বোঝা যায় চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগ, রবীন্দ্র ও নজরুল-যুগ এবং আধুনিককালের কবিতার নিবিড় পাঠ তাঁর মনন-মেধাকে সমৃদ্ধ করেছে, যা তাঁর নিজস্ব সৃষ্টিশীলতারও ভিত্তি  নির্মাণ করেছে। বিষয়-বৈচিত্র্য ও নির্মাণকলা উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর বৈদগ্ধ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়।

 

নির্মাণকলা

কবিতার নির্মাণকলাবিষয়ক আলোচনায় প্রথমেই আসে ছন্দ-প্রকরণের বিষয়টি, এর পর  প্রতিতুলনাজাত রূপকল্পের বিশিষ্টতা। কবি আনিসুল হক তাঁর একটি সংকলনের ভূমিকায় লিখেছেন :

‘ব্রাহ্মমুহূর্তে হাতে এল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঞ্চয়িতা; তাতে দেখি ‘ক্যামেলিয়া’, ‘বাঁশি’-এসব কবিতায় যাকে বলে ছন্দ, যাকে বলে অন্ত্যমিল, তা নেই। সেই কুয়াশামাখা ভোরে, আমার কৈশোরের বারান্দায় এসে পড়ল রবির কিরণ। আমি ভাবতে বসে গেলাম, আচ্ছা, মিল ছাড়া গদ্য লেখা, তা কবিতা হলো কী করে! আমাকে জানতে হবে।’

এই কৌতূহল থেকেই তিনি রবীন্দ্র-নজরুল এবং তাঁদের পূর্ব ও উত্তরসূরিদের কবিতার ব্যাপক পঠন-পাঠনের মাধ্যমে আয়ত্ত করেন কবিতার বিচিত্র নির্মাণকলা। ফলে, তাঁর কবিতা ধারণ করেছে আবহমান বাংলা কবিতার প্রায় সব প্রাকরণিক বৈশিষ্ট্য, যার অনেকটাজুড়ে আছে মধ্যযুগীয় কবিতার প্রকরণও। তাঁর ভাষ্যমতে রবীন্দ্রনাথের গদ্য কবিতা দেখে কবিতার রচনাশৈলী শেখার আগ্রহ জাগলেও এই কবি গদ্যরীতির চর্চা করেছেন খুবই অল্প,  কারণ তিনি বুঝে নিয়েছেন রবীন্দ্রোত্তরকালেও বড় কবিদের সবাই বৃত্তীয় ছন্দে কবিতা লিখেই বরেণ্য হয়ে উঠেছেন। অনেকে গদ্যরীতির কবিতা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথের চেয়েও কম। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত একটিও  লেখেননি।

সব ছন্দেই পারদর্শী কবি আনিসুল হক সঙ্গত কারণেই নন্দিত কবিদের মতো অধিকাংশ কবিতাই লিখেছেন বৃত্তীয় ছন্দে এবং অল্প কিছু কবিতা গদ্যরীতিতে। বৃত্তীয় ছন্দে লেখা তাঁর কবিতারও একটি বৈশিষ্ট্য গদ্যসুলভ আটপৌরে ভাষাভঙ্গির ব্যবহার, যা শুরু হয়েছিল গত শতাব্দীর তিরিশের দশকের কবিদের হাতে, বিশেষ করে জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর হাতে। অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখা আনিসুল হকের অনেক কবিতাকে অসচেতন, ছন্দ-অনভিজ্ঞ  পাঠকের কাছে মনে হতে পারে এগুলো গদ্যরীতির রচনা। কিন্তু তিনি অতি-আটপৌরে ভাষাভঙ্গি ব্যবহার করেও ছন্দরক্ষায় নিবিষ্ট থেকেছেনÑএর কয়েকটি উদাহরণ :

মিটুনকে মনে নেই, ওই যে ছেলেটি মিছিলের মধ্যভাগে ফোটাতো স্লোগান।

আবার কখনো তাকে দেখা যেত নির্জনতা বুকে

দাঁড়িয়ে একাকী মাঠে, চারদিকে পোড়া ঘাস,

নীলিমা পুড়ছে সাথে, কী ভীষণ সুনীল প্রদাহ।

[মিটুনকে মনে নেই, খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে]

 

কবিতাকে ভালোবাসি বলে ভালোবাসি কবিতার বোদ্ধা পাঠক ও নিপুণ নির্মাতা

তাই তো তাদের শ্রদ্ধা করি যারা বোঝে কবিতার গোপন অলিন্দ

সে কারণে ভালোবাসি বখাটেকে, বাউণ্ডেলদের ভাবি একান্ত আপন

[বেয়াদবদের জন্য, খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে]

 

অনেক কবিতা টানাগদ্যের মতো সাজালেও তার গহনে আছে অক্ষরবৃত্তীয় দোলা, যা ছন্দ-শিক্ষিত পাঠকের দৃষ্টি ও শ্রুতি এড়াবে না। একটি উদাহরণ :

একেই কুয়ারা বলি, এই দেখো স্তন। কিন্তু যদি খ্যাও মারো,  জালে উঠে আসে

আঁশ, শুধু আঁশ। ফুসফুস নাই এ দেহে ফুলকো আছে, জলের সংসার। কতজন

যৌবনচঞ্চল যুবা, শরীরে নতুন জল, তার তোড়ে ভেসে ভেসে এসেছিলো কাছে।

স্বীকার করবো আজ, আমারই সে দোষ।

[মৎস্যকন্যা, জলরংপদ্য]

 

টানাগদ্যে সাজানো এই কবিতার পঙক্তিগুলোকে যথানিয়মে বহু পঙক্তিতে বিন্যস্ত করলেই নিটোল অক্ষরবৃত্তীয় মুক্তকের আঙ্গিক দৃশ্যমান হবে, যেমন :

একেই কুয়ারা বলি, এই দেখো স্তন।

কিন্তু যদি খ্যাও মারো,

জালে উঠে আসে আঁশ, শুধু আঁশ।

ফুসফুস নাই এ দেহে ফুলকো আছে, জলের সংসার।

কতজন যৌবনচঞ্চল যুবা, শরীরে নতুন জল,

তার তোড়ে ভেসে ভেসে এসেছিলো কাছে।

স্বীকার করবো আজ, আমারই সে দোষ।

আটপৌরে ভাষাভঙ্গি ব্যবহার করেও ছন্দরক্ষায় এই কবি কতটা নিবিষ্টতার পরিচয় দিয়েছেন এর একটি জরিপ করা যাক। একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে আমি এই জরিপকর্মটি  সম্পন্ন করছি এবং একে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। আনিসুল  হকের সহযাত্রী আশির দশকের অধিকাংশ কবি কেবল গদ্যরীতিতে বায়বীয় বাক্যের ধুম্র্রজাল সৃষ্টি করে এগুলোকেই কবিতা বলে চালিয়ে দিচ্ছেন।  কেউ প্রশ্ন তুললে নিজেদের  অজ্ঞতাকে চতুরতার সঙ্গে ধামাচাপা দিতে প্রায়শ বলে ও লিখে থাকেন : এটাই কবিতার আধুনিকতম নির্মাণকলা! তাঁদেরই সহযাত্রী মেধাবী কবি আনিসুল  হকের কবিতার বিশ্লেষণ থেকে তাঁরা যদি সামান্যতম শিক্ষাও লাভ করেন, তবে আমার এ-প্রচেষ্টা সার্থক হয়েছে মনে করব। আনিসুল হক কোনো প্রবীণ কবি নন। অতএব, তাঁরা বলার সুযোগ পাবেন না, ছন্দ তো বিগত দিনের বিষয়!

আনিসুল হকের প্রথম গ্রন্থে প্রকৃত গদ্য কবিতার সংখ্যা মাত্র ২ (‘মরে যেতে সাধ হয়’, ‘ক্লাসনোট থেকে’); অক্ষরবৃত্ত ছন্দে মাত্রাবিন্যাসে সামান্য স্বাধীনতা ভোগ করলে যেসব কট্টর ছান্দসিক তাকে পতন বা অতিরেক বলে গণ্য করেন তা-ও বহু বড় কবিদের রচনায় ব্যবহৃত হতে-হতে এখন গ্রহণযোগ্য উঠেছে; আনিসুল হকের প্রথম গ্রন্থে এমন কবিতার  সংখ্যাও মাত্র ২ (‘আবুল হাসান’, ‘অকপট পঙক্তিমালা’)। বাকি সবগুলোই নিটোল বৃত্তীয় ছন্দে রচিত। এই গ্রন্থে অক্ষরবৃত্তে রচিত কবিতার সংখ্যা ২৮, স্বরবৃত্তীয় রচনা ৬টি এবং মাত্রাবৃত্তীয় রচনা ২টি (১টি ৬-মাত্রায় ও ১টি ৭-মাত্রায় বিন্যস্ত)। অক্ষরবৃত্তীয় রচনার মধ্যে একটি বাদে সবগুলোতেই রয়েছে অসমপার্বিক পঙক্তিবিন্যাস যাকে মুক্তক অক্ষরবৃত্ত বলা হয়। যে একটিতে সমপার্বিক পঙক্তিবিন্যাস রয়েছে সেটি ১৮-মাত্রায় রচিত অন্ত্যমিলবিশিষ্ট চতৃর্দশপদী বা সনেট।  এছাড়াও, অন্ত্যমিল ব্যবহৃত  হয়েছে আরও বেশকিছু কবিতায়।

দ্বিতীয় গ্রন্থেও  প্রকৃত গদ্য কবিতার সংখ্যা এক (‘ঈর্র্ষা’)। এই গ্রন্থে কবি আনিসুল হক তাঁর অক্ষরবৃত্তীয় রচনায় ১০-মাত্রার ১০ পঙক্তিবিশিষ্ট প্রচুর কবিতা লিখেছেন, যা আমাদের কবিতায় অত্যন্ত বিরল।  একই আঙ্গিকে বিন্যস্ত কিছু কবিতায় পঙক্তির সংখ্যা ৯ (‘অন্ধকার’, ‘মাতাযোনি’,); আবার, ১০-মাত্রার পঙক্তিবিশিষ্ট ‘প্রথম পাঠ’ নামের একটি সিরিজ কবিতায় এক নম্বরটি দীর্ঘ কবিতা। সিরিজের অন্য টুকরোগুলোতে পঙক্তির সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন। একটিমাত্র কবিতা ‘আয়ান ঘোষের জার্নাল’ ১৪-মাত্রার আদি পয়ারে রচিত এবং বাকি অক্ষরবৃত্তীয় কবিতাগুলোর পঙক্তি মুক্তকের নিয়মে বিন্যস্ত। এই গ্রন্থের কবিতাগুলোয় মাত্রাবৃত্তীয় রচনার প্রতি তাঁর ঝোঁক লক্ষণীয় : ৬-মাত্রার মাত্রাবৃত্তে রচিত কবিতার সংখ্যা ৬টি; ১টি (‘তিন কন্যা’) ৭-মাত্রার চালে বিন্যস্ত; ৫-মাত্রার প্রাধান্যসহ একটি কবিতা (‘দুইটি ছায়া’) স্বরমাত্রিক ছন্দে রচিত (‘আমলকী’ সিরিজের প্রথম টুকরোটিও তা-ই); লক্ষণীয় যে, এই গ্রন্থে স্বরবৃত্তীয় কোনো রচনা নেই। দ্বিতীয় গ্রন্থের কবিতাগুলোর ১৮টিতে অন্ত্যমিল রয়েছে কক, কখকখ, কখখক প্রকৃতির;  এর সামান্য কয়েকটিতে মিলগুলো বিক্ষিপ্ত প্রকৃতির।

আমি আছি আমার অনলে এই কবির তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। এতেও প্রকৃত গদ্যকবিতার সংখ্যা ২ (‘যে জীবন গণিতের’, ‘ফুটনোট’)। ‘ঘণ্টা নাড়ে কান্নার ইস্কুল’ নামের একটি কবিতার প্রথম তিন পঙক্তি গদ্যরীতিতে শুরু করলেও বাকিটা ১০-মাত্রার সমপার্বিক পঙক্তিবিশিষ্ট অক্ষরবৃত্তীয় রচনা। নিটোল অক্ষরবৃত্তে রচিত কবিতার সংখ্যা ২৭; মাত্রাবৃত্তীয় রচনা ২টি (গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘জলে ধুয়ে যায় জলরং ছবি’ এবং ‘বিষাদের তুই’ ৬-মাত্রায় বিন্যস্ত; শেষোক্ত কবিতার প্রথম পঙক্তিতে ‘পার্থিব প্রতিমা’ মধ্যখণ্ডটি দুরূহ এবং অনেক পাঠকের দৃষ্টিগ্রাহ্য না-ও হতে পারে এবং ছন্দ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে);  ১টি কবিতা ৭-মাত্রার মাত্রাবৃত্তে রচিত ‘আবার ভুলে যাবো’; অন্য একটি কবিতা ‘নেই’-তে রয়েছে ৫-মাত্রার প্রাধান্যসহ স্বরমাত্রিক চাল। তৃতীয় গ্রন্থের এই কবিতাগুলোর কয়েকটিতে অন্ত্যমিলও রক্ষিত  হয়েছে।

কবিতায় ছন্দ ও ক্ষেত্রবিশেষে অন্ত্যমিল রক্ষায় আনিসুল হক কতটা নিবিষ্ট তার  সর্বোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তাঁর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ নক্ষত্রের পানে চেয়ে বেদনার পানে যাতে একটিও গদ্যরীতির রচনা নেই এবং সবগুলোতেই পূর্বাপর  অন্ত্যমিল রক্ষিত হয়েছে। এই গ্রন্থের কবিতাগুলো শিরোনামহীন, শুধু ক্রমিক নম্বরযুক্ত। ২ থেকে ৩২ নম্বরযুক্ত রচনাগুলোকে আলাদা কবিতা হিসেবে গণ্য করার চেয়ে একই কবিতার টুকরো বলাই শ্রেয় কারণ  এতে বর্ণিত হয়েছে একটি বিয়োগান্ত প্রেমকাহিনি। প্রতাপশালী বাবার মেয়ে তুলি নামের এক সুন্দরী তরুণীর প্রেমে পড়ার অপরাধে এই কাহিনিকাব্যের নায়ক আবদুস সবুর নামের এক তরুণ কবিকে পিটিয়ে মেরেছে পুলিশ, নায়িকার বাবার প্ররোচনায়। ১ নম্বরযুক্ত টুকরোটিকে যদিও আপাতদৃষ্টিতে আলাদা কবিতা বলে মনে হয়, এটিও প্রকারান্তরে এই কাহিনির অংশ বলেই ধরে নেয়া যায়। কারণ এতে বিধৃত হয়েছে জোছনারাতে বাঁশঝাড়ে কিছু শালিকছানার আকস্মিক মৃত্যুতে মা-শালিকের আহাজারি, যা সবুরের মায়ের পুত্রশোকের একটি সমান্তরাল রূপক হিসেবে গণ্য করা যায় সহজেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে ১৮-মাত্রার পয়ার (অক্ষরবৃত্ত); কিছু কিছু টুকরোয় ব্যবহৃত হয়েছে ১৪-মাত্রার আদিপয়ার, প্রায় অপ্রচলিত ১০-মাত্রার  পয়ার, ৬-মাত্রার মাত্রাবৃত্ত, ৭-মাত্রার মাত্রাবৃত্ত; কয়েকটির স্তবক বিন্যস্ত হয়েছে এসব ছন্দ ও আঙ্গিকের মিশ্রণে। ১ নম্বর টুকরোটি বিন্যস্ত হয়েছে মধ্যযুগের সুখপাঠ্য ত্রিপদীর আঙ্গিকে :

বাঁশপাতা কাঁপে আর                            কাঁপে ছায়া অন্ধকার

তারাদের ভিড়ে,

চোখের পাতারা স্থির                             হিমসাদা করোটির

ভেতরে গভীরে

 

পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘জলরংপদ্য’তে প্রকৃত গদ্যকবিতা মাত্র ১টি (‘কেন পদ্য লিখি, এই প্রশ্নের উত্তরে’)। বইটিতে যদিও টানাগদ্যের আকারে কিছু কবিতা সাজিয়েছেন এই কবি (‘মৎস্যকন্যা’, ‘সমুদ্রে সন্ধ্যাগুলি তার বড় একা’, ‘কাঠের পালঙ্কে তার দিনরাত্রি’), প্রকৃতপক্ষে এগুলো অক্ষরবৃত্তীয় রচনা। যথানিয়মে ভেঙে ভিন্ন ভিন্ন পঙতিতে সাজালেই এগুলো অক্ষরবৃত্তীয় মুক্তকের আঙ্গিক পাবে। প্রথমটির অক্ষরবৃত্তীয় বিন্যাস আগেই দেখিয়েছি। উল্লেখিত বাকি দু’টির অংশবিশেষ এভাবে সাজিয়ে দেখানো যায় :

একদা আমাকে তুমি বলেছিলে গল্প নগরের।

সন্ধ্যা হলে যে-দিগন্তে জ্বলে ওঠে বাতি

বহুকাল থেকে আমি তাকিয়ে সেদিকে…

(সমুদ্রে সন্ধ্যাগুলি তার বড় একা)

 

পাষাণ-প্রাসাদে আছে বাতায়ন,

চোখে পড়ে আকাশে উঠছে চাঁদ।

চাঁদ আজ গুঁড়ো-গুঁড়ো তরঙ্গে-ফেনায়;

মাছের মেয়েরা আজ ছুটে যাচ্ছে

ঢেউপাহাড়ের চূড়ায়-পাতালে…

(কাঠের পালঙ্কে তার দিনরাত্রি)

 

পঞ্চম গ্রন্থের বাকি কবিতাগুলোর ২০টিও নিটোল অক্ষরবৃত্তীয় রচনা যার মধ্যে ৬টি ১৮-মাত্রার,২টি ৮/৮/৬ মাত্রার মধ্যযুগীয় ত্রিপদীর আকারে সাজানো (যদিও একটিতে ‘আমি অপেক্ষা করিনি’, ‘কেন অপেক্ষা করিনি’  এবং ‘হাসে ভুসুকু হরিণী’ এমন বাড়তি পঙক্তি জুড়ে দেওয়া হয়েছে), ২টি ১৪-মাত্রার আদি পয়ারছন্দে রচিত এবং ২টিতে রয়েছে ১০-মাত্রার চাল, অন্যগুলো অসমপার্বিক মুক্তক অক্ষরবৃত্ত; ৫টি কবিতা নিটোল ৬-মাত্রার মাত্রাবৃত্তে, ২টি নিটোল ৫-মাত্রার মাত্রাবৃত্তে (একটিতে অতিপর্বসহ), ১টি ৭-মাত্রার মাত্রাবৃত্তে রচিত। ‘যুক্তরাষ্ট্রে হেমন্ত’ নামের একটি কবিতা মধ্যযুগীয় ত্রিপদী পয়ারের আঙ্গিকে শুরু করে দ্বিতীয় স্তবকে ৭-মাত্রার মাত্রাবৃত্ত, তৃতীয় স্তবকে আবারও ত্রিপদী পয়ারের পর শেষ করা হয়েছে মৃক্তক অক্ষরবৃত্তে। এই বইতে স্বরমাত্রিক কবিতার সংখ্যা ৩ এবং স্বরবৃত্তীয় কবিতার সংখ্যা ২। অন্ত্যমিলও রক্ষিত হয়েছে বেশকিছু কবিতায়।

আনিসুল হকের কবিতার ছন্দবিষয়ক আলোচনায় একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। ৭-মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দ এবং অক্ষরবৃত্তীয় ১০-মাত্রার চাল আমাদের কবিতায় খুবই কম। লক্ষযোগ্য হারে আনিসুল হক তাঁর কবিতায় এই দুই ছন্দ ব্যবহার করেছেন। তাঁর রচনায় মধ্যযুগীয় ত্রিপদী আঙ্গিকের ব্যবহার বিষয়েও একই কথা প্রযোজ্য।

তিনটি কবিতায়, আমি নিশ্চিত, মুদ্রণপ্রমাদের কারণে ছন্দ-প্রকরণ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে কারণ আনিসুল হকের মতো ছন্দ-সচেতন কবির অসাবধানতার ফসল এগুলো হতে পারে না। ৭-মাত্রার মাত্রাবৃত্তে রচিত ‘খোলা  চিঠি সুন্দরের কাছে’  কবিতায় একটি পর্ব ‘কেবল  অসুস্থতা’ ৮-মাত্রার; ‘তাই আজ দেখি’ এবং ‘এই তো সেদিন’ ৬-মাত্রার। ‘তাই’ শব্দটির পর ‘তো’ বাদ  পড়েছে  এবং ‘সেদিন’ থেকে ‘ও’ বা ‘ই’  বাদ  পড়েছে মুদ্রণপ্রমাদের কারণে; ‘কেবল অসুস্থতা’য় ‘তা’ যুক্ত হয়েছে মুদ্রণপ্রমাদের কারণেই। অন্য একটি কবিতা ‘আবার ভুলে যাবো’র তৃতীয় পঙক্তিতে ‘লেবাস পরে’ পর্বটি হবে ‘লেবাস পরে পরে’ কারণ এটিও ৭-মাত্রার পর্বে বিন্যস্ত একটি কবিতা। আরেকটি নক্ষত্রের পানে চেয়ে বেদনার পানে গ্রন্থের ১১ নম্বরযুক্ত টুকরোটি। এটি পূর্বাপর ৬-মাত্রার মাত্রাবৃত্তে রচিত কিন্তু দ্বিতীয় স্তবকের ‘দুটি যুবক’ পর্বটিতে ১ মাত্রা কম আছে; এর সমাধান ‘দুইটি যুবক’। দ্বিতীয় মুদ্রণের সুযোগ এলে এগুলো শুধরে নেওয়ার পরামর্শ রইল কারণ মাত্রাবৃত্ত ছন্দে সামান্যতম বিপত্তিও কানে ঠেকে।

 

রূপকল্প

ছন্দ ও আঙ্গিকের বিবেচনায় আনিসুল হক-এর কবিতা যেমন বৈচিত্র্যমুখী, তেমনি প্রতিতুলনাজাত রূপকল্প: উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক, সমাসোক্তি, অন্যাসক্ত  এবং এসবের সমন্বয়ে সৃষ্ট চিত্র ও চিত্রকল্প সৃষ্টিতেও এই কবি সিদ্ধহস্ত। কবিতার ‘প্রসাদগুণ’ বলতে আমরা যা বুঝি তা কেবল ছন্দব্যহারের নৈপুণ্যে নয়, প্রতিতুলনাজাত অলঙ্কারও এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করে। এ-লেখায় ইতোমধ্যে যেসব কবিতাংশ উদ্ধৃত হয়েছে তাতেই সচেতন পাঠক আনিসুল হকের কবিতায় প্রসাদগুণের সাক্ষাৎ পেয়েছেন বলে আমার ধারণা। তবুও আরও সামান্য কিছু কবিতাংশের উদ্ধৃতি প্রাসঙ্গিক মনে করছি এই কবির কাব্য-কুশলতার প্রতি কেবল পাঠকের আগ্রহকে উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। উল্লেখ্য যে, উপমা-উৎপ্রেক্ষার ব্যবহারে ‘মতো’, ‘যেন’র ব্যবহার একান্ত অনিবার্য না-হলে তিনি তা এড়িয়ে গেছেন এবং অভিন্নার্থক উপমা-উৎপেক্ষা ব্যবহার করেছেন বেশি। প্রতিতুলনাজাত অলঙ্কার হিসেবে উপমা-উৎপেক্ষার চেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন রূপক, সমাসোক্তি ও অন্যাসক্তকে। বেশকিছু চিত্র ও চিত্রকল্প বিপ্রতীপতায় সমৃদ্ধ,  যা আধুনিককালে কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে মনে করা হয়। নিম্নোক্ত উদ্ধৃতিগুলোয় প্রকাশকালের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়েছে বলে পাঠক ক্রমান্বয়ে অধিকতর শিল্পঋদ্ধ অলঙ্কারসমৃদ্ধ পঙক্তির সাক্ষাৎ পাবেন বলে মনে করি। কোনো কোনো উদ্ধৃতির সঙ্গে তৃতীয় বন্ধনীর ভেতরে যুক্ত হয়েছে আমার নিজের কিছু মন্তব্য :

‘তুই কি আমার দুঃখ হবি?…

তুই কি আমার শুষ্ক চোখে অশ্রু হবি?..

নিজের ঠোঁট কামড়ে-ধরা রোদন হবি?’;

‘গোলাপের মত ফোটে লেলিহান শিখা

কতটা সৌন্দর্য তার কতটা দাহিকা’;

‘সব ব্যারিকেড ভেঙে জলের যোদ্ধারা করে দখল ক্যান্টনমেন্ট

অসহায় পড়ে থাকে গোলন্দাজ ট্যাংক…

অবশেষে বঙ্গভবনের সর্বোচ্চ চূড়ায় নির্ভীক উড়তে থাকে পানির পতাকা’;

‘চাঁদের সাথে ঠোঁট বাঁকিয়ে গাল ফুলিয়ে কইবো কথা/

 

‘আমার পায়ে  শিকড় আছে মাটির বুকে গভীর করে প্রোথিত তা’; ‘নেতা মানে অ্যামিবা সে ভোল পাল্টায় ভীষণ দ্রুত…রাজা মানে কাঠের ঘুঁটি, পুঁজিবাদের স্বার্থে তিনি নড়েন-চড়েন’ [দাবার ঘুঁটির রাজা আর আমাদের সরকারপ্রধানদের সমান্তরাল রূপক]; ‘আমি বড় ভুলে যাই, ঔদাস্যে নিহত করি তরুণ গোলাপ’; ‘আমি কাকাতাড়–য়ার মতো হেড়েমাথা একাকী মানুষ’; ‘সলতে যেমন জ্বলতে থাকে স্ববাহিত কেরোসিনে/কলজে থেকে দুঃখ এনে আমিও তেমন জ্বলছি একা’; ‘আলোকেরা উড়ে যায় অলৌকিক পাখির মতন’; ‘ব্যালকনির রেলিং ধরে আমি ঔদাস্য নিক্ষেপ করি নীলিমার  দিকে’; ‘অন্ধকারের বুকে ভর দিয়ে যায়/শীতল শরীর ধাতব সরীসৃপ’ [একাধারে সমাসোক্তি ও অন্যাসক্তবাহী রেলগাড়ির চিত্র]; ‘মড়া বিড়ালের ফুলে-ওঠা দেহ জন্মদিনের কেকে’ [বিপতীপতায় সমৃদ্ধ চিত্রকল্প]; ‘মহামারি এসে শিশুর কপালে রেখে যায় হিমচুমো/আমরা তবুও আলিঙ্গনেতে মাতি’ [বিপ্রতীপতায় সমৃদ্ধ চিত্র]; ‘অক্ষম গাভীর মতো পড়ে থাকে লোহার কামান/সে নেই কোথাও তবে কার জন্যে যুদ্ধে যাওয়া আর’; ‘মোমের চোখের মতো ধূসর অতীত; ‘বাবুইয়ের জানা আছে স্থাপত্যের কলা/আবাসিক প্লট তার বৃক্ষের চূড়ায়/সেখানে কৌশলী ঠোঁটে বোনে তারা/চারুময় কারুকলা কুশল কুটির’; ‘সাদা পোশাকের নার্স/অলৌকিক আঙুলে তোমার/ঝরে যাচ্ছে জোছনা আর ছায়া আর স্নেহ’, ‘এ ঘরে যে জল-কাদা, এ ঘরে যে ঊর্ণাজালে ঝোলে দীর্ঘশ্বাস’; ‘সং ও মুখোশেরা আসবে রাজপথে কাঁপাবে আলোকিত মঞ্চ/অন্ধকার-চেরা রোদের পতাকারা রইবে গৃহকোণে অসহায়’ [রূপকাশ্রিত চিত্রকল্প যাতে বিধৃত হয়েছে এমন এক সামাজিক অসঙ্গতির কথা যেখানে অযোগ্য-অক্ষমেরাই আছে ক্ষমতা ও প্রচারের শীর্ষে, আর যোগ্য ব্যক্তিরা ঘৃণায়-অভিমানে গৃহকোণে অবরুদ্ধ]; ‘রিকশা যেন ছইনৌকা জল কেটে চলেছে নাইয়র’ [বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতায় ঢাকা নগরীর চিত্র]; ‘গায়ে হলুদের দিনে/বাঙালি বধূরা  পিনে/আলো-কাড়া শাড়ি/তেমন রঙিন পাতা/ মাঠেপথে আগামাথা/ উৎসবের বাড়ি’ [সমান্তÍরাল রূপকবাহী চিত্র, যুক্তরাষ্ট্রে হেমন্তকালে পাতাঝরার প্রাক্কালে প্রকৃতি যে অপরূপ রূপে সজ্জিত হয় তা যারা প্রত্যক্ষ করেছেন তারা এই প্রতিতুলনায় শিহরিত হবেন মর্মে মর্মে]; ‘রাস্তাটা যেন কালো অজগর গর্জায় হিসহিস/পেঁচিয়ে  ধরেছে তিনটি শিশুকে উগড়ে উঠছে বিষ’ [নগরীর রাস্তায় দুর্ঘটনার শিকার শিশুদের চিত্র]।

বাংলা কবিতার যারা নিবিড় পাঠক তাঁরা স্বীকার করবেন এমন শিল্পঋদ্ধ, সান্দ্র উচ্চারণের কবির নির্মাণশৈলী কেবল দশকের মাপকাঠিতে নয়,আবহমান বাংলা কবিতার নিরিখেই  অতি মূল্যবান। কিন্তু পরিতাপের বিষয়  আনিসুল হক গল্প-উপন্যাস  ও নাটক রচনায় অতিমাত্রায় নিবিষ্ট হওয়ার কারণে আজকাল কবিতাচর্চা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares