প্রবন্ধ

সাবিত্রী উপাখ্যান : পন্থা ও পরিণাম

শহীদ ইকবাল

 

উপন্যাসরচনায় কথক থাকেন। কথক কখনও-কখনও সর্বজ্ঞ (Omniscient observer) কখনওবা নন, কথকই চরিত্রকে দিয়ে বলায়-‘আমি লেখক। আমি সর্বজ্ঞ’। এ সূত্রে কাহিনিও কখনও ঘটনাপ্রধান হয়, কখনওবা চরিত্রপ্রধান। সাবিত্রী উপাখ্যান নিশ্চয়ই চরিত্রপ্রধান, কথকও সর্বজ্ঞ- ওই লেখকই তা বলেছেন। লেখক বলে চলেন ‘সাবিত্রী-কথা’। সাবিত্রী আখ্যান-কেন্দ্রে (pivotal point in the monologue, as the direction of thought turns from unworthy or unsuitable considerations or feelings to worthy or suitable ones)। তাকে ঘিরে আছে পুরুষময় কিছু পুরুষ- আর তাদের নিয়ন্ত্রিত (oppressors- oppressed distinction), স্বশাসিত সমাজ- `exploitation refers to social relations where an ‘actor or character of actors uses others for their own end and because of a fundamentally asymmetric power relatioship between them’ শ্রেণি-পরিচয়, বর্ণ-পরিচয় মিলিয়ে সমাজের মর্যাদাও তাদের মতো করেই গড়া, তাদের হাতেই তৈরি। আলো-অন্ধকারও সৃষ্টি করেন তারাই। সমাজ ও স্বকাল ওই চরিত্রটিকে সুখ-অসুখ, আঘাত-অপবাদ, আলো-অন্ধকার গড়িয়ে মিশেল করে। মর্ত্যরে বিচিত্র স্বাদ-আহ্লাদ ক্রিয়াশীল হয়। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও। সাবিত্রীর পরিবেষ্টনে অনেক পুরুষ। মনের বাইরে শরীর-দেহ যাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেরূপ সংবাদও তৈরি হয়, এলাকায় এলাকায়- অঞ্চলে অঞ্চলে, তল্লাটে তল্লাটে। বিপর্যস্ততা অথবা সমর্পণের শর্ত-সীমানাও সেভাবে ঠিক হয়- ওই ‘মানুষ’টির জীবনে। নারীও মানুষ- সেটি বিধৃত অঞ্চলে বা গ্রামে ঠিক চলনসই নয়। রিচ্যুয়ালে তা নেই। সমাজেও নেই। শুধু তার শরীর প্রত্নসম্পন্ন। কারণ, ওতে ইন্দ্রিয়সুখ মেটাতে পারে পুরুষ-সম্প্রদায়। এই পুরুষরূপী সমাজ, আদিম সমাজ, আলোহীন সমাজ, ইতিহাসে-ঐতিহ্যে ভরা সমাজ গড়ে ওঠে সাবিত্রীকে কেন্দ্র করে। হাসান আজিজুল হকের উপন্যাস সাবিত্রী উপাখ্যান। সাবিত্রীই প্রধান, তাকে ঘিরেই ক্ষরিত উপনিবেশ-উত্তর সমাজ নির্মিত। প্রসঙ্গত, এখানে চলতি অনেক তত্ত্বের ভেতর দিয়ে এই উপন্যাসটি দেখা যায়। যদিও তত্ত্ব ভারাক্রান্ত করা নয়, বরং বক্ষ্যমাণ কাহিনিই বলে দেবে কোন তত্ত্বটি এতে পরিগৃহীত হয়েছে। তাই যে দৃষ্টিকোণেই এ পাঠ হোক সাবিত্রী-কাহিনিই সর্ব-অনুষঙ্গের অকুস্থল। আর সে লক্ষ্যেই তার ডিকনস্ট্রাকশন তত্ত্ব ধারণায় ‘ডেথ অব অথারে’র পরিণাম ও পন্থা নির্ধারণ হতে পারে।

 

১.২

উপন্যাসে কাহিনি-ভূগোলে নির্ধারিত নিয়মমাফিক প্রথা, প্রচল রূপ ওই চরিত্রকে নিয়েই আশা-উচ্চাশা সংকীর্ণ সংকুচিত পথনির্দেশ করে। সে প্রথার নাম- সমর্পিত, অনুশাসনমান্য ও স্বীকৃত তাবৎ- যা প্রথানুবর্তী সকলই। কী নিশ্চুপ ছায়াবৃত তখন ওইসব গ্রামের নাম [শ্রীকৃষ্ণপুর, চৈতন্যপুর, বেলগ্রাম, ধানকুঞ্জি]। কিন্তু খুব কঠোর অনুশাসনের শক্ত তারে সবটুকু বাঁধা, ছিঁড়তে গেলেই গড়ে ওঠে প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ। সাবিত্রী সেখানে নিষ্পাপ, নির্বিবাদী, অবুঝ-প্রতিক্রিয়াহীন -কিন্তু কাহিনির এক পর্যায়ে সে পরিবর্তিত হয়ে ওঠে, পরিবর্তনে রূপান্তরের দাগ ওঠে মনে- তখন সে বিরক্ত ও  অশান্ত [শহরের তথাকথিত ভদ্রলোকী চাল নেই বলে ঠিক বিব্রতকর বলা যায় না], পরে পেটানো প্রতিরোধে গড়া। সেটি গড়ে ওঠা চাই-ই যেন, বিশেষত হাসান আজিজুল হকের উপন্যাসে। হাসান আজিজুল হকের ভাষাও তাই বলে। কারণ, সে রূপই তাঁর উপন্যাসের প্রত্যাশা। ক্রিস্টোফার কডওয়েল, গিওর্গী লুকাস প্রমুখ বলেন, প্রতিরোধটুকু চাই- যা সমাজ পরিবর্তন কিংবা শ্রেণি-কাঠামোর বৃত্তে গড়া। উৎপাদন-সম্পর্কের সূত্রও সেখানেই। চেনা যায় তখন, স্বরূপ-অন্বেষণ ঘটে সে প্রকারে। পার্থক্য বোঝা যায়। ছোট-বড়, উঁচু-নীচু সমাজে-মর্যাদায়- আর সেখানেই শক্তি ও ক্ষমতায়নও সংযুক্ত। রাষ্ট্রের আইন-শাসন-বিচারও সে মাফিক। হাসান আজিজুল হক সবটুকু গেঁথে ফেলেন। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ওপর বিস্তর অসঙ্গতির বিস্তার রচনা করেন। ব্যক্তি-মানুষের কার্যকারণের অভিপ্রায়ে। বিবেচনাবোধের আলোকসম্পাতে, নিমিত্ত তাঁর কা-জ্ঞানের দর্শন। কিন্তু সাবিত্রী কী একা পারে? সাবিত্রীর বিপরীতে যে চরিত্রগুলো আছে সেগুলোর ছাঁচ আছে। এক নিয়মে ঠিক গড়া নয়। লেখক যে ওদের প্রতিপক্ষ করে গড়েছেন তাও নয়। নিরেট মন্দও নয়, ভালোও নয়। ঠিক উপন্যাসের চরিত্র যেমনটা তেমনই। উপন্যাস তো শুধু কাহিনি নয় বা চরিত্র নির্মাণও নয়- এতে সমাজ-দর্শন থাকে, কাল পেরিয়ে তা যুগান্তরের বার্তা বহন করে প্রজন্মান্তরের অভিমুখে। সমালোচকগণ তাই বলেন। আর ‘ডেথ অব অথার’ কথাটা তো আরও সত্য। সেটি কালগুণে-দিনগুণে পাঠকের কাছে কত ব্যাখ্যা নেবে- তার সীমাসংখ্যা নেই। সে প্রশ্নটুকু ওই লেখকের ভাষ্যে বিবৃত ও অর্জিতও। যা হোক, এখানে প্রতিজিজ্ঞাসা যে, সাবিত্রী তো প্রতিকূলতায় থাকে। আহারে-বিহারে- চলনে-বলনে কিংবা করায়-চলায়, কখনওবা নিজেই নিজের শত্রু, প্রতিপক্ষও। ‘আপনা মাঁসে হরিণা বৈরি’- বিপদেই থাকে। পরে তো ইচ্ছাবিরুদ্ধ আপত্তিকর পরিবেশে সর্ব ধর্ষণের পর ধর্ষণে প্রাণহীন ‘মরায়’ পরিণত করে তোলে সবকিছু- পরিবেশকেও। সব যেন উঠে-পড়ে লাগে-‘কুলাঙ্গারের দল’। সব ‘পুরুষ’শক্তিতে বাধা। পুরুষের চোখে নারী। আবার নারীর চোখেও নারী। কী যে অমানিসা! চতুর্দিকে ঘোরাল অন্ধকারময়- আঁধার। এ লক্ষ্যে প্রস্তুুত লোকেশান। তাই তো তা বাস্তববাদী উপন্যাস। তবে তার উল্টোপীঠে তো রাজনীতিও আছে। জীবনের গভীরতম ও অপ্রত্যাশিত সত্য চকিত উদ্ভাসনে সত্যসন্ধ। নির্মিত ওই উপনিবেশের গ্যাড়াকল। উপনিবেশিতের মন। শাসকের থানা-আইন-পুলিশ সে লক্ষ্যেই ক্রিয়াকর। তবে এও প্রশ্ন, বাস্তববাদ কোনো উপন্যাসের পূর্ণ সত্য নয়। রাজনীতিকও নয়। আবার উভয়েই সম্ভবপরতার সত্যে নিহিত। সাবিত্রী উপাখ্যান সে লক্ষ্যেই পাঠযোগ্য বিবেচ্য।

১.৩

সাবিত্রী ‘কুলটা’। মনে আসে, রোহিনী- বিনোদিনী-কিরণময়ী-কুসুম-জমিলা-সখিনা-জারুনার মা-ফুলজান-সাবিত্রী জীবনের ধারাপাতের ধারা। কতোটা এগিয়েছে সমাজ? নারীর মূল্য সমাজে কেমন? হাসান আজিজুল হক ধরে নেন এ পরিবর্তন ধারা সমাজসূত্রে কতটা! আদৌ কী স্বীয়-মন অধিকৃত নারী মানুষ গণ্য হয়েছে। উল্লিখিত চরিত্রই তো সময়। পুরুষ রক্তচক্ষুতে তা কতটা শোধন হয়েছে। আঘাতে কী উন্মত্ত নয়? সবাই মিলে শকুনের দলের মতো শোষকের ভাগাড়ে একপঙ্ক্তিতে বসে দেহ শুকতে থাকে কেন? উঠে দাঁড়ালেই যেন তিলক এঁটে দেবে। ওসব আবার সবার সম্মুখেই বয়ে বেড়াতে হয়, প্রাণধারা বহে যতকাল! আর চুপকথার নানা ব্যঙ্গও তো আছে। সাবিত্রী উপাখ্যানে ‘কালচার অব সাইলেন্স’ অনেক কথা বলে। ব্রাজিলিয়ান তাত্ত্বিক ফ্রেইরির ‘সাইলেন্স তত্ত্ব’ : `the system of dominant social relations creates a ‘culture of silence’ that instills a negative, silenced and supressed self-image into the oppressed’। সেটিই ঘরে-বাইরে সাপের ফোঁসফাঁস ধ্বনি করে। হুল ফোটানোর চেষ্টায় তৎপর থাকে। নির্মম সব ভয়াবহ প্রতিকূলতায় সাবিত্রী [‘supressed self-image’] দাঁড়াবে কেমন করে? প্রতিবাদ করবে না? স্ব-অপমানের শোধ নেবে না কিংবা ফিরিয়ে আনবে না তার পুনরুদ্ধার করা মান-অপমান-সম্ভ্রমসমূহ- যেটা পরবর্তী সময়ে নারীরা সেই ‘অনুকরণীয় ক্রিয়া’র পথ ধরে চলতে পারবে কিংবা মুক্তি পাবে, পূর্ণ-প্রাণে শ্বাস ফিরে পাবে, আস্থার আশ্বাসে বাঁচবে- অন্তত কিছুটা হলেও, সব বিপর্যয় সত্ত্বেও। বা নিতে পারবে নিজের আনন্দের ভার! তারই উত্তর পেতে চান লেখক। সেইটিই লেখকের দর্শন বা বার্তা। আর এমন ভাবনার মধ্যে পাঠক চিনে নেন বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল সমাজ। ভঙ্গুর আধা-সামন্ত সমাজের বস্তাপচাবাসী জীবনের সারার্থ। সাবিত্রী উপাখ্যানের ভেতরে সবটুকু ধরে ফেলার অবকাশ আছে। চেনা যায়, ওরা কারা! কীরূপে কোন পর্যায়ে প্রোথিত বিষবৃক্ষের শেকড়। ভূমি-প্রান্ত-শোষণ বা প্রতিরোধের সংস্কৃতি কীরূপে স্বচ্ছ আলোকময় জীবনসজ্জার দর্পণে পেতে পারে ছায়া-কায়ার প্রতিরূপ, কীরূপে উত্তর-উপনিবেশ সংস্কৃতি পূর্ণতর দাঁড়াতে পারে, নিজের সবটুকু নিয়ে- নিজস্বতা ধরে সমুন্নত করে ইত্যাদি। ভেতরের ভাঙ্গন তাতে বুঝি পেরুনোর পথ বাতলে দেয়, মনের পাড় ভাঙার শব্দ তাতে সমস্বরে উঠে আসে- আর শক্ত প্রতিরোধের জন্য, ঝড়ো হাওয়ার বিপরীতে নতুন অভিমুখের প্রসার ও প্রয়াসে গড়ে ওঠে সাবিত্রী নামের এই সন্নধ্য পথে- তাই ওর প্রতিপাদ্য এই দর্শনের উপাখ্যানরূপে। খুব অনিমেষ বার্তা নিয়ে এটি সমাগত। আগামীর ও একালের জন্য। বিন্দুমাত্র পরাজয় নয়, আবার সহজ জয়ও নয়, অনেককালের একক হাতের প্রতিবন্ধকতা পেরুনোর, অতিক্রমণের সম্ভাব্য অভিপ্রায় পুনর্গঠিত। গল্প যদি ঘটনাকে চায়, সে ঘটনা সাবিত্রী উপাখ্যানের হাতেই নির্মম। নির্ধারিত দর্শনে সেই চরিত্রায়ণ- ওই সকল প্রথান্ধকারের বিরুদ্ধে, সেইটিই তো মেসেজ!

 

২.১

লেখকের শামুক উপন্যাসের মতো এ ঘটনাটিও থার্টিজের, ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের। মেলে আদালতের সাক্ষ্য। অনেকের সাক্ষ্য। তাই-ই প্লট-অনুসৃত কৌশল। খুব সন্তর্পণে কথক গেঁথে ফেলেন সচিত্র ঘটনা-রজ্জু। সেটি সাবিত্রীর মন, মুহূর্ত, বেদনা, স্বপ্ন-আনন্দ-কষ্ট-গ্লানি একদিকে যেমন দুর্মর করে তোলে তেমনি অন্যদিকে বটা-সবুর-দুর্গার পাশব -পৌরুষ প্রবৃত্তিত্রাস আচরণীয় সমাজের নির্গলিত তাপে সুদূরের আকাক্সক্ষা নিয়ে বিনির্মিত। এটি নিছক কাহিনি নয়। ‘নেচার অব মিনিং’ রূপে ন্যারেটিভ। কার? পুনরুক্তি করি ‘supressed self-image’র। তাই সে একাকী। একা। ‘সাবিত্রীর চারপাশে সব একা। কেমন থেমে আছে। সাবিও একা হয়ে গেল।’ কথাশিল্পীই তার প্রবক্তা। তখন প্রবক্তার দৃষ্টিকোণে, সাবিত্রীকে ঘিরে নির্ধারিত সমাজ ও সমাজের দ্বন্দ্ব কিংবা সাংস্কৃতিক অভিঘাতসমূহ আর মূল্যবোধের গভীরতর টানাপড়েন তৈরি হওয়া। তাইতো সাবিত্রী খুব সাধারণ, ব্রাহ্মণ কিন্তু শরীর-সোহাগী আর অভূতপূর্ব শারীরিক গড়ন। সুশ্রী, সৌন্দর্যময় প্রত্যঙ্গ। নিপুণও। মনোলোভা ও আকর্ষণীয় অন্যের [অপর/ পুরুষ/ ‘বল’শালী পুরুষ/ ‘ক্ষমতা’শালী পুরুষ] কাছে। বর্ণনার ভেতরেই কথক সে ইঙ্গিতটুকু গেথে দেন। গভীরে পুঁতে দেন তা- যা আখ্যানের চলৎশক্তি। সেটি সোজা, সরল একমুখো। বৃত্তাকার নয়। নিশিবালা বা হাড়িদিদির প্রশ্রয়-চ্যুত হলে ‘একাকী হওয়া’ সাবিত্রী নিজেকে নিরপেক্ষরূপে সমর্পণ করে, মান্য করে স্বপ্নময় পুরুষ-স্বামীকে [দুকড়ি চট্টোপাধ্যায়]। এক অর্থে, তা যে শৃঙ্খল- সেটি কথক বিবেচনায় নেয় কিন্তু কথক-নিঃসৃত চরিত্র তা ঠিক বোঝে না, বোঝার শক্তি নেয় না- কারণ এ সমাজে তা যুক্তিসিদ্ধ নয়। সে লক্ষ্যেই আখ্যান-বর্ণিত ও বিধৃত। সে নিঙরানো সম্বল অনন্তটুকু দ্বিধাহীন দিয়ে দেয়। যেকোনো মূল্যে তা স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছে- তার ধর্মমূল্যে। তাতেই অলক্ষুণে নিয়তি নির্বন্ধে বাঁধা পড়ে। ‘অনেক চেষ্টায় দশটা টাকা জোগাড় করিয়া লোক মারফত পাঠাইলাম। বন্ধক অনন্ত ছাড়াইয়া লইও। কাহাকেও এসব কথা বলিও না। পৌষ মাসে বাড়ি আসিব’-তবে সবকিছু সঠিক ফলে নাই। অনন্ত ছাড়ানো যায়নি, সাবিত্রীকে পাওয়া যায় নি। ঠিক, যে পর্যায়ে কথক অনিমেষ সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন, তা সুরক্ষা হয়নি। দুকড়ির দৃষ্টি ফ্যাকাশে হয়েছে নলিন কেওটের মধ্যস্থতায়। ভূমিকা নেয়, তিনজন। উল্লিখিত সময়টা সুনির্দিষ্ট, ১৯৩৮ সালের ৮ নভেম্বর। তারপর বিস্তৃত ঘটনারাশি জড়ায়, স্তূপীকৃত হয় ছিন্ন ও কণ্টকীকৃত বিকট সব চিন্তাজালে। সাবিত্রীর জবানীতে মেলে : ‘তেলা, বটকৃষ্ণ ও সবুর আমাকে মাটিছাড়া করিয়া লইয়া চলিল।’ তার পর সময় বয়ে চলে। ‘তরতাজা, ছটফটে, জ্যান্ত খাবার’ অজয় পারের জঙ্গল অভিমুখে চলতে শুরু করলে একের পর এক যুক্ততার অশনি দানা ধারাবাহিকভাবে স্ফটিকস্বচ্ছতা পায় : ‘দুর্গাপদ, সবুর, নলিন কেওট, বটকৃষ্ণ চক্রবর্তী, ধান্যগ্রামের সৈয়দ, বগুড়ার হুদা, বগুড়ার ধানকুঞ্জির মওলা বখ্শ এবং অন্যান্য’ কেউ বিযুক্ত নয়। সাবিত্রীর বর্ণিত শরীরের সবটুকু পাশবপিণ্ডে পরিণত। এ পরিণতি ওই ‘supressed self-image’ গড়ায়। তবে এর পেছনের সমাজসত্যটি কী? কিংবা তার দার্শনিক ব্যাখ্যা? কথক তো শুধুই কাহিনি বলেন না। সাবিত্রী উপাখ্যান ফলে শুধু সাবিত্রীর আখ্যান নয়, সমাজ-দর্শন ও ভূমি-মানুষের ইতিহাসে পরিণতির ইঙ্গিত কিংবা তার দ্বান্দ্বিক পুনর্গঠনে আর্থ-সাংস্কৃতিক কাঠামোর রূপ বা আরও নির্বাচিত-মনস্তত্ত্বে তা এই ভূমি-মাতৃকার বীজাঙ্কুরে প্রতীকী সাবিত্রীর টোটেম-ট্যাবুর প্রত্নমায়ার প্রপঞ্চ- যা এক জনপদের চিরন্তন রিচ্যুয়ালে অনুষ্ঠিত। এভাবে পরখ করলে, সাত বছরের সাবিত্রী যখন ষোল-সতেরয় পৌঁছয়- তখন অপহরণের কাল, বলাৎকার, ছিন্ন-ভিন্ন শরীর বা মান-অপমান ও আঘাতের পর আঘাত নিয়ে বিচ্যুতিপ্রাপ্ত সমস্ত সামাজিক সম্পর্কের সত্তা শূন্যতায় এক অবসেশন নিয়ে দাঁড়ায় নিজের শর্তে, পেতে চায় অনির্বাণ অনলমুখো প্রতিরোধের শক্তি। তাতে কথক মনোলগ এক অভিপ্রায়ে থমকে দাঁড়ায় এবং বিবৃত করে :

সারা মুখে তার আঁকিবুঁকি, সেখানে কিছু জল আছে, কিছু কাজল আছে, কিছু সিঁদূর আছে, বলা যায় না। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সাবিত্রী, তিনদিকে তারা তিনজন, তিনটে ষণ্ডা শুয়োর। একমাত্র সাবিত্রীরই মাথা উঁচু, বাকিরা মাথা নামিয়ে আছে।…দুর্গাপদরা ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে। সাবিত্রীর দিকে চেয়ে দেখারও সাহস পায় না তারা। তাদের শিশ্নগুলি একেবারে গর্তে ঢুকে পড়েছে। নিরেট তালাবদ্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তারা! (পৃ. ৪২)

এতে কাহিনির জন্য কথকের নান্দনিক স্তরান্তরও আছে, আছে অতিক্রমের উদ্ভাস এবং অভিপ্রেত পর্যায়ও। যেহেতু সে ‘does not belong merely to the individual, rather it is shared by all’- তাই সাবিত্রীকে কার্যত এক পরিবেশে অনুস্যূত রেখে, সূক্ষ্মতর তরঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার অভিমুখ তৈরি হয়। কী করে আত্মঅবমান ক্ষয়িষ্ণু অভিমুখ পাচ্ছে, একের পর এক খানা-খন্দ, নদী-জলাশয়, বন-জঙ্গল, ভূমি সমতল-অবতল পেরিয়ে শুষ্ক জীবন পাওয়া- তাকে নিরানন্দ গ্রহণ-বর্জন, কঠিন-নম্র পাদভারে নিরীক্ষণ, ভার ক্রমশ ভারাক্রান্ত- অতঃপর আরও অতিশয় তীব্র ও কঠোর ধর্ষিতা-জীবনের পারাবার- তার পীঠে আরও অন্য গল্পের রচনাক্ষেত্র। সেখানে নারী শুধুই এক শরীরে, পণ্যে, সবটুকু নিভন্ত- শুধুই বেঁচে থাকা যতোক্ষণ শরীরের তাপটুকু একের পর এক পুরুষ গ্রাসাচ্ছাদন করতে না পারে। এ এক চরম ধারাবিবরণী- রাত্রি-দিনের চলতিক্রমে। হাসান আজিজুল হক (কথক) স্থান-বিবরণী দেন, পরিবেশ তুলে ধরেন, শত্রু-মিত্র, পাপ-পুণ্য, ভয়-নির্ভয়ের চাঞ্চল্যের পারিপাট্যে। সেই পটভূমে কর্কশ জটাজালের ক্ষয়িষ্ণু বেদনাভারে পালাক্রমে  ধর্ষিতার ওপর ধর্ষণক্রিয়া সুযোগ ও পরিবেশের যোগানে সংশ্লিষ্ট করা চলে। আমবাগান, খড়ের গাদা- একটু আড়াল হলেই দুগ্গা বা তেলার ও তৎ-স্যাঙ্গাতরা কাম চরিতার্থ করে। আর বটা তো কিছুটা পথ উন্মুক্ত পেলেই ‘পণ্য’টি সুরক্ষার নামে শারীরিক দলন-মর্দনে আরক্ত- ওতেই শান্তি (কারণ ওর বেশি শারীরিক সামর্থ্য নেই), আর সবুর ধর্ষক-ধারায় মেয়েটিকে হাতে পেলেই স্থান-কাল (একরাত-দুরাত) খুঁজে নিয়ে, সব্বাইকে একরকমে মানিয়ে- নিজের কাম ও উদ্দীপনাকে চরিতার্থ করার যাবতীয় ব্যবস্থায় দৃঢ়তর। তারপর প্রয়োজনহীন সাবিত্রীকে অন্যের কাছে ছুঁড়ে ফেলা। সেটিরও বিবরণ পরিবেশের ভরাটচিহ্নের বর্ণনা। ন্যারেটর ‘I-for-the-other’ নিয়ে সর্বরকম বয়ানে সংযুক্ত, তাতে বিপরীত লক্ষণসমূহও যেন লক্ষ্যচ্যূত নয়। ভয়, আশঙ্কা, দ্বিধা নিয়ে মনস্তত্ত্বের স্তর সেখানে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, থানা-পুলিশ-ইউনিয়ন বোর্ড বিস্তর রাজদণ্ডের মানদণ্ডে দৃশ্যমান। আখ্যানে বিচিত্র বিভঙ্গে তরঙ্গের দোলায় অবধারিত। এবং এর পরিবেষ্টনও নির্ধারিত ‘চরিত্র’কে ঘিরে- যেহেতু নায়করূপে তার অধিষ্ঠান। শৈলীও তাই নির্দেশিত। উপন্যাসটির নামও সেই ’pivotal point’-এ- বস্তুত অকুস্থলেই তার বিবেকোচিত দর্শন। তাই এখানে কথক-অনুসৃত সাবিত্রী এক ’architectonic’ মডেল- মানবমনের তিনটি উপাদানের প্রতিষ্ঠায় যা সম্পন্ন বলে মনে হয় :

‘I-for-myself’, ‘I-for-the-other’ and ‘other for me’. The ‘I-for-myself’ is an unreliable source of identity and Bakhtin argues that it is the I-for-the-other through which human beings develop a sense of identity because it serves as an amalgamation of the way in which others view me. Conversely, other-for-me describes the way in which others incorporate my perceptions of them into their own identities. Identity, as Bakhtin describes it here, does not belong merely to the individual, rather it is shared by all.

এ সম্পৃক্ততা সত্তা-তত্ত্বের। কিন্তু সাবিত্রী ‘supressed self-image’ হলে তার ‘পলিফোনিক’ বার্তা অবশ্যই ফ্যাকাশে ও ধূসর। সেটি সবটুকু প্রতিরোধ নিয়েই নিরেট মানুষ-স্বরূপে উপাখ্যানে প্রতিষ্ঠিত। প্রকাশিত বার্তায় তার সে অভিপ্রায় ইঙ্গিত করেন লেখক। তাই তার  ‘infinite capablity, worth and the hidden soul’  তো অস্বীকার করা যায় না! কারণ, ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত সমাজে গ্রামগুলো অবিকশিত। গ্রামের প্রজা-মনস্তত্ত্ব ভূস্বামী- বর্জিত অস্তাচলগামী আলোর পরিত্যক্ত অপক্ষমতার আস্ফালন ও বিকারগ্রস্ততায় ভাঁড়ামিতে পূর্ণ। স্থানীয় সরকার প্রশাসন সমাজস্তরের মূলীভূত সংস্কার ও প্রথাগত মূল্যবোধে ব্যক্তিসত্তাকে অস্বীকার করে তার বিপরীতে সামন্ত-অপসৃত সংস্কার চাপিয়ে দেয় বৈষম্যগ্রস্ত সমাজের ওপর। সেখানে বৈষম্য বাড়ে, পুরুষের বিপরীতে নারী তুচ্ছ পণ্যে পরিণত হয়, বলদর্পী মুষ্টিমেয় মানুষের ভোগের সামগ্রীতে পর্যবসিত করে, আশা আর স্বপ্ন বিক্রি হয়ে যায় যে কোনো মূল্যে। নামসর্বস্ব (শিবানী/ সাবিত্রী)। ‘আমি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। খোঁজ নিতে এসেছি, গভ্মেন্টকে জানাতে হবে কাকে নিয়ে তুমি এসেছ’- এ রাজদ- সাবিত্রীকে রক্ষা করতে পারে না। বরং সরকার ব্যবস্থার খবরদারি একপ্রকার ত্রাস তৈরি করে। সাবিত্রীর সমস্যা নিরসন বা নিরাপত্তার বাইরে এঁটে দেয় ধর্মীয় পোশাক। সেটি ভঙ্গুর সমাজে প্রকাশ্য হলে পুরুষতন্ত্র আরও শক্তি পায়, ভেতরে- বাইরে গুঞ্জন বাড়ে- আরও কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে সাবিত্রীর ‘আই-আদার’ সম্পর্ক। পরিত্রাণ নয়, বরং ধর্ষিত-লাঞ্ছিত-নিপীড়িত- মর্যাদাহীন সাবিত্রী ততোধিক সমস্যায় অধিকৃত হয়। তাতে জন্মপাপও নিষ্কৃতিহীন, অস্তিত্বহীনতার (unauthentic)  চূড়ান্ত প্রকাশ :

গাঁয়ে গাঁয়ে হিঁদু ভদ্দরলোকেরা লোকের মনে বিষ ছড়াচ্ছে। তোমরা তো মাথামোটা নেড়েজাত, শুধু জানো হোঁকামো করতে আর লাঠি আনতে। গভর্মেন্টের টোটা বন্দুক দেখেছ? এলাকায় হিঁদু-মোসলমান দাঙ্গা হয়ে যেতে পারে। ভদ্দরলোকেরা তাই চায়। ওরা শুধু ফন্দি-ফিকির খুঁজছে। ভালো একটা ফিকির বানিয়ে দিয়েছিস।

বোর্ড প্রেসিডেন্ট সৈয়দ, বেলাত, হুদাসমেত এক ছোবলের ইতিবৃত্ত কলকাতা-বগুড়া রোডম্যাপে যুক্ত হলে সেখানে সাপ-বেজি প্রতীকী সারার্থ শিল্পের কাঠামোতে আর অব্যর্থ থাকে না। কার্যত, বেজির যা অনুধাবনের শক্তি আছে- মানুষের নেই। বিশ শতকের পৃথিবীতে এ অভিপ্রায় নির্ধারিত আছে জার্মান লেখক ফ্রাঞ্জ কাফকার উক্তিতে : ‘Enclosed in my own four walls, I found myself as an immigrant imprisoned in a foreign country, … I saw my family as strange aliens whose foreign customs, rites and very language defied comprehension,… though I did not want it, they forced me to participate in their bizarre rituals, … I could not resist.’  একইভাবে ক্যেমু (Albert Camus) বিশ্বযুদ্ধ-আক্রান্ত পৃথিবীতে দ্য স্ট্র্যঞ্জার (১৯৪২) লিখে বলেন ‘I only meant that the hero of my book is condemned because he does not play the game’ সময়সূত্রে সাবিত্রী উপাখ্যানের সমসাময়িক এ বৈশ্বিক পৃথিবীর ‘ব্যক্তি’র  `Enclosed in my own four walls’  অপরিচিত কিছু নয়। হাসান আজিজুল হক এই ব্যক্তিকেই এগিয়ে নেন, তাঁর কালের দৃষ্টিতে। এজন্য ব্যক্তি-বিরুদ্ধ চরিত্রটির বিপরীতে দাঁড়ানো সমাজ-রাষ্ট্র ও আইন-বিচার ‘রক্ষক যেখানে ভক্ষক’ সে প্রত্যয়টি নির্ধারিত দৃষ্টিকোণে  (point of view) প্রতিষ্ঠা করেন। এজন্য তিনি প্রতীকী স্যটায়ার ও বিদ্রƒপকে তাৎপর্যময় অভিব্যঞ্জনা দেন : ‘মরা সোসাইটিতে একটা তৈরি করা শুকনো গাছে যে অজগরটাকে জড়িয়ে রাখা হয়েছিল, সেটি এখন কু-লী পাকিয়ে চিড়িয়াখানার সরীসৃপ-লেখা ঘরটার কাচের ঘরের মধ্য থেকে ছাড়া পেয়ে এগিয়ে আসছে।’ এই নিস্পন্দ সাবিত্রীর প্রতিপক্ষ। কে তাকে রক্ষা করবে? কথক বলেন :

একমাত্র পুলিশই তাদের চরিত্র কোনোদিন বদলায়নি, নীতিরক্ষা করছে খুবই বিশ্বস্ততার সঙ্গে। সে হলো রক্ষকের ভক্ষক নীতি। পুরো ঔপনিবেশিক আমল জুড়ে তৈরি হয়েছে এই ঐতিহ্য, এখনও একই রকম বজায় আছে। গুরুদাসের বিবরণ  থেকে জানা যায়, সাবিত্রী নিখোঁজ হবার মাসচারেকের মাথায় চোত মাসের শেষদিকে গুরুদাসের অভিযোগের ভিত্তিতে আর তারই সাহায্যে কলকাতার দুর্গাপদ দাঁ (তেলা) ধরা পড়ে। এই কথার পরেই গুরুদাসের সাক্ষ্য পরের বাক্যেই রয়েছে, কদিন পরেই সে ছাড়া পায়। এই মূল আসামি টি ফের গ্রেফতার হয় বোধহয় সাবিত্রীর খোঁজ মেলার পরে। আমরা জানতে চাইছি উনুনের ওপর জলভর্তি হাঁড়ি আস্তে আস্তে গরম হয়ে ফুটতে শুরু করেছিল কবে থেকে? কত ডিগ্রি তাপ উঠল শেষ পর্যন্ত। সাঁইত্রিশ সালের পৌষ থেকে আটত্রিশের আশ্বিন-কার্তিক পর্যন্ত ন-দশ মাস ধরে যে সময়টায় সাবিত্রী নিখোঁজ ছিল সেই সময়টায় অসন্তোষ কতোটা ধুঁইয়ে উঠেছিল? জল কি শেষ পর্যন্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করেছিল?

সাবিত্রী তখন ব্যক্তি শুধু নয়, তাকে ঘিরে সমাজ-রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততায় তৈরি। বেরিয়ে পড়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং আরও সম্প্রসারণে শ্রেণিমর্যাদায় জমিদার-মহাজন বনাম প্রজাদ্বন্দ্ব, তৃতীয় দশকের উপনিবেশিক শাসনের আওতায় জাতীয়তাবাদ থেকে সাম্প্রদায়িকতার উদ্গীরণ এবং এর কার্যকারণ প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে উপন্যাসের উপাখ্যানে। তাতে সাবিত্রীই কেন্দ্র। কিন্তু ওই টগবগ করে ফোটা পানির গতিবিধি নিরূপিত হয়। কথক তার বাস্তব গুরুত্ব নির্ধারণ করেন। ফলে সাবিত্রী কাহিনি আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। পায় আরও শ্লেষাত্মক অনুরণন। যা এ উপন্যাসের শিল্পে যুক্ত করে নতুন মাত্রা। আর সে লক্ষ্যেই তৈরি হয় উপন্যাসের ভাষা। কলকাতা থেকে বগুড়া, অঞ্চলভিত্তিক সংস্কৃতি- ওই আঞ্চলিক ভাষায়।

 

২.২

`What is character but the ditermination of incident? What is incident but the illustration of character? What is either a picture or a novel that is not of character? What else do we sick in it and find in it? It is an incident for a woman to stand up with her hand resting on a table and look out at you in a certain way; or if it be not an incident I think it will be hard to say what it is.’-এ রকম অভিপ্রায়ে সাবিত্রী মুখোমুখি হলে, সে পেয়ে যায় নির্ধারিত শ্রেণিস্তরের ভাষা। সেটি কথকের। এবং কথক এমন ‘ইনসিডেন্ট’ তৈরি করেন যা জটিল-কঠিন (নিশ্চয়ই তা বাস্তব অনুসৃত এবং লেখকের দৃষ্টিকোণে)। কেন? এই প্রক্রিয়াটিকে শৈল্পিক সম্পূর্ণতা দানে লেখক/কথকÑ একপ্রকার রীতির আশ্রয় নেন। তা তেমন? `narrative analaysis in which the chahacter’s thoughts are filtered through the mind of the narrator with more or less interpretive commentary’ কিংবা  `the more direct and dramatic interior monologue.’  হাসান আজিজুল হক ন্যারেটর- তিনি সাবিত্রীর পুরো অংশটুকু বলার সুযোগ পাননি (যেখানে জীবনের সম্ভাব্য রূপ অরূপময়), সেখানে  `chahacter’s thoughts are filtered’, জানি না সে এতবার ধর্ষিত হয়েও কোনোবার তার শরীরে অন্য কিছু ঘটেনি- তার কারণ বোধ করি জানার প্রয়োজন পড়ে না, শিল্পের গতি হয়তো সেদিকটা আহরণ করেনি। একইভাবে যখন অনেক হতে পারা না-পারার প্রশ্ন তোলা হয় তখন যা প্রত্যক্ষ তাই লেখক বলেন, নিজের কথনে। সেটুকুই তৈরি করে সাবিত্রীকে। বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিম থেকে আজ পর্যন্ত যে নারীচরিত্র আমাদের মন ও মনন অধিকার করেছে- সাবিত্রী সে ক্ষেত্রটুকু পাবে কি-না- এমন প্রশ্নে ১৯৩৮ সালের ঘটনাটি কী করে আমাদের হয়ে উঠলো, তার পরিবেশ-প্রণয়ন হলো কীভাবে, কোন ভাষ্যে তা প্রণীত হলো- সে পঠনটির জরুরি প্রয়োজন হয়। চরিত্রের ‘মিমেটিক’ স্বরূপটিও তাতে দরকার হয়ে পড়ে। এজন্য `the uses of irony in narrative art range from a simple effect such as the effects of extraordinary complexity; and the control of irony is a principal function of point of view’- ধারণাটি প্রতিষ্ঠা পেতে দেখা যায় । আবার পড়ে নিই সাবিত্রী উপাখ্যানের কিছু অংশ :

হাসি শোনা গেল একটা আর কী আশ্চর্য এই অন্ধকারের মধ্যেও শাদা দাঁত দেখা গেল হুদার। বাঃ দোস্তোর হয়্যা গেল! এখন চলো বিবিজান ওই ঘরোত যাই। আমরা দুই বন্ধু- যা পাই ভাগ কর‌্যা লিই, সবুরের বিবিজানেও আমার ভাগ আছে। আসো, একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে হুদা সাবিত্রীকে বিছানা থেকে নামিয়ে ফেলল। অন্ধকারের মধ্যেই টানতে টানতে তাকে পাশের ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। শাড়ি লুটিয়ে পড়েছে মেঝেতে। হয়তো নিচের অংশটা খুলেই পড়েছে। একবার হুদার পায়ে বোধ হয় জড়িয়েও গেল। পাশের ঘরে ঢুকে সেখানকার খাটটাতে সাবিত্রীকে ফেলে দিল হুদা। কোনো কোনো জন্তু কামে বা ক্রোধে উন্মত্ত হলে ভয়ানক গন্ধ ছাড়তে পারে। সাবিত্রী টের পায় একটা উৎকট দুর্গন্ধে ঘরটা পূর্ণ হয়ে গেল।

আয়রনিটা অনুধাবনযোগ্য। এরূপ অসংখ্য স্যাটায়ার ও পরিহাসসূচক অর্থতা দিয়ে আয়রনির সৌধ সাজানো হয়। এর লক্ষ্য সাবিত্রীর ‘মিমেটিক ভিউ’। যেখান থেকে প্লটের চূড়ান্ত লক্ষণ উঠে আসে।

এই ‘মিমেটিক ভিউ’-এর জন্য প্রকরণে আয়রনির সংযোগ অনিবার্য। যেটি চরিত্রের ‘ডিসপ্যারিটি অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ দ্বারা নির্ধারিত। সাবিত্রী উপাখ্যানের সম্পূর্ণ কথক-বিবরণী `employ this disparity to make effects of various kinds’- এখানে নারীবাদী ডিসকোর্স কিংবা ডিকনস্ট্রাকটিভ তত্ত্ব কথনের ভেতরেই অভিপ্রায় খুঁজে পায়। সে বিবরণীটি পাওয়া যায় সাক্ষ্য-বিবরণীতে। সাবিত্রী উপাখ্যানের বড় অবলম্বন এই সাক্ষ্যগুলো। সাক্ষ্যের ভেতরেই নির্ণীত আখ্যানের বেগ ও অভিপ্রেত গতিপথ। প্রকরণে কথকের এ অবলম্বন খুলে দিয়ে মিমেটিক রমণীর নির্মম ইতিবৃত্ত দানা বাধে। এই নির্মমতার কারণ তো বর্ধমানের প্রত্যন্ত গ্রাম ও গ্রামীণ কৃষ্টির ভেতরে আটকানো। স্বামী দুকড়ি থেকে শুরু করে দুর্বৃত্ত দুগ্গা ও তার স্যাঙ্গাত সকলেই নারীর রমণভোগ পালাক্রমে যাপন করেছে- নিকৃষ্ট ও অমানবিক পন্থায়। এইটিই আখ্যানের `principal function’। এখানে সে প্রতিরোধী নয় কিন্তু `unspoken speech’ আছে-  যা ততোধিক নতুন পাঠ তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। তবে সাক্ষ্য-বিবরণী উপন্যাসের কাহিনিকে বাঁচিয়েছে এ কারণে যে, একই চরিত্রের পুনরাবৃত্তি বা বলাৎকারের পৌনঃপুনিক অবরুদ্ধ ভাষা পাঠকের মননে আঘাতের এতটুকু অবসর পায়নি। সে ক্ষেত্রে প্রকৃতি ও পরিবেশের সূক্ষ্ম বিবরণী অনিবার্য সম্বল হয়েছে- যা পুরো আখ্যানকে অনুপুঙ্খ সহানুভূতি দিয়েছে। প্রসঙ্গত, এখানে সহানুভূতি কথাটি সহজঅর্থে নয়, পাঠকের প্রতি শিল্পের এক ধরনের দায়বদ্ধতার চ্যালেঞ্জ থেকেই নির্ধারণীয়।

 

৩.

শামুক, আগুনপাখির পরে সাবিত্রী উপাখ্যান হাসান আজিজুল হককে যে অন্য উচ্চতা দিয়েছে- তা বলতে দ্বিধা হয় না। তবে তার সঙ্গত স্বরূপ কী? উপন্যাসে ক্রমিক কথক বিবরণীটি আদালতের সাক্ষ্যকে অবলম্বন করে যে রিমার্কেবল [`clear distinction between the narrator and the author’]  পরিবেশ প্রস্তুত করেছে- আর তার এমন উচ্চতার সমার্থক বিবেচনা করলে, স্বজ্ঞার দর্শনটিই প্রতিষ্ঠিত হয়। চরিত্র-প্রধান হওয়ায় চরিত্রই এর ঘটনাদর্শন। তাতে করে সে নিমিত্ত কথকের অভিপ্রায় সুনির্দিষ্ট পরিবেশে দার্ঢ্যময়। আলো-ছায়া বা অন্ধকারের বিপ্রতীপ বলয়, আলোর প্রতিসরণ, ‘সন্ত’ সাবিত্রীর কিম্ভূত পরিবেষ্টন- সবই এক চমৎকার নান্দনিক প্রজেকশান। এটি তুল্যমূল্য কথা নয়, সাবিত্রী উপাখ্যান সাবিত্রীর ঘোরে কাটলেও শ্রীকেষ্টপুর থেকে বগুড়ার জনপদের নিখুঁত নৃ-ইতিহাস বা প্রত্নচোখে সংস্কার-মূল্যবোধের অর্বাচীনতা চিনে ফেলতে সক্ষম হয়। সেখানে কিছু একরকম পুরুষচোখ দিয়ে পুরনারীর চোখও মেলে। কিন্তু সর্বৈব সমাজের চোখই সংবাদপ্রবণ হয়েছে। কথকের প্রশ্নও সেখানেই। এই প্রশ্নটিই উপন্যাসকারের চলতি সমাজের সংক্ষোভ ও মেসেজ। প্রসঙ্গত, বলতেই হয় সে কারণেই হাসান আজিজুল হক একুশ শতকে বসে প্রায় শতবর্ষ পূর্বের এ অঞ্চলের সংস্কৃতি ও সমাজদ্বন্দ্বের স্বরূপকে চিনিয়ে দেন- সাবিত্রী তার অবলম্বন। কারণ, এ চরিত্রটি তো এখনও সমাজবিচ্যুত কেউ নয়!

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares