প্রচ্ছদ রচনা : নাজনীন হক মিমি

প্রচ্ছদ রচনা

কবি বেলাল চৌধুরীর

স্নেহের পরশ

নাজনীন হক মিমি

 

এই বছরের শরৎকালটা মেঘে ঢাকা- এখনও প্রায়ই অন্ধকার হয়ে ঝুপঝাপ বৃষ্টি পড়ছে। গতকাল ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জ গিয়েছিলাম। শব্দঘর-এর নীল প্রচ্ছদের শরৎ সংখ্যাটি কোলের ওপর রেখে ভাবছিলাম একটি প্রবন্ধের কিছু অংশ পড়া বাকি, পথে যেতে যেতে সেটি শেষ  করব। কিন্তু গাড়ি উত্তরা ছাড়িয়ে আশুলিয়া যাওয়ার পর ধীরে ধীরে চারদিকের কংক্রিটের স্তূপের দৃশ্য কমতে শুরু হলো। বছরপাঁচেক আগে যে পরিমাণ কৃষিজমি ছিল তেমনটি  আর নেই। বিক্ষিপ্ত বাড়ি-ঘর, ইটের ভাটা, খাল বিলের ভরাট চলছে আরও বুঝা যাচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে এগুলোও অপরিকল্পিত শহরে পরিণত হয়ে উঠবে। কিন্তু অবিন্যস্ত দৃশ্যপটের মাঝে বাংলার চিরায়ত ঘাসফুল মাথা উঁচু করে জানান দিচ্ছে সময়টা শরৎকাল। আকাশটা শরৎকালের মতো নীল শুভ্র নয়, কিন্তু আমার চোখ কাশফুল খুঁজে যাচ্ছে, বিস্তীর্ণ দিগন্তে মিলিয়ে আছে খালের পাশে নীচু জমিতে সারি সারি কাশ ফুল।

কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থাকলে অনেক কথা মনে পড়ে যায়। শুধু সেগুলো শব্দের পর শব্দে সাজিয়ে বলা বা লেখা বড় কঠিন কাজ। শব্দঘর-এর পক্ষে একজন সুহৃদ সকালে ফোন করে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কবি বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে তো অনেক সময় কাটিয়েছেন, ওনার ওপরে কিছু লিখতে পারবেন? কবি বেলাল চৌধুরী সম্পর্কে কিছু কথা লিখা আমার জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু সাহিত্যের তাত্ত্বিক আলোচনা করা আমার জন্য খুব কঠিন। সাহিত্য যদি জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় বা প্রতিচ্ছবি হয় তবে পথ চলতে চলতে কত যে মিষ্টি ঘটনা ঘটে যায়, আর এই সত্যিকারের ছোট ছোট ঘটনাবহুল সময়গুলোর দিকে পিছন ফিরে তাকালে মনে হবে কখনও সাদা কালো, কখনও রঙিন ছবির মতো কতই না অপরূপ দৃশ্য রয়েছে, তার অন্তত কিছু লিখে রাখা যায়।

বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৯১ সালে। তারপর তাঁকে যে কতবার দেখেছি তা গুণে বলা সম্ভব নয়। হক ভাই চলে যাওয়ার পর এত মন খারাপ ছিল সেসময় বেলাল ভাইকে ফোন করেছিলাম। বেলাল ভাইয়ের শরীরটা গত দুই বছর ধরে তেমন ভালো নেই। কিন্তু ফোনে উনি আমার কথা শুনে খুশি হলেন, তারিকের কথা জিজ্ঞাসা করলেন, কিন্তু আমার মনে হলো ওনার কণ্ঠস্বর বহু দূর থেকে ভেসে আসছে। এতটাই ক্লান্ত কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। তাই বেশি কথা না বলে ফোন রেখে দিলেন। অথচ কতদিন বেলাল ভাই আমাকে কত গল্প শুনিয়েছেন। অবিরল বলে যাওয়ার ক্ষমতা তাঁর মধ্যে দেখেছি।

ভারত বাংলাদেশে বেলাল চৌধুরী এক কিংবদন্তি নাম। তিনি ষাট দশক থেকে একেবারে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরায় এক অতি পরিচিত নাম। কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘জাত বোহেমিয়ান, সীমান্তভেদী কবি’। কবি বেলাল চৌধুরী লিখেছেন- অসংখ্য কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদ, পত্রিকার কলাম, কৃত্তিবাস ও ভারত বিচিত্রার মতো পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। কবি ও গদ্যকার বেলাল চৌধুরীর সাত সাগরের ফেনায় মিশে প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। এই বইটি বহু কীর্তিমান ব্যক্তিত্বের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধুর ক্যানভাস। কবি জীবনানন্দ দাশ, আবু সয়ীদ আইয়ুব, কলকাতার কালপুরুষ কমলকুমার মজুমদার, কথাশিল্পী শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়সহ আরও অনেকের সম্পর্কে তাঁর বিচিত্র কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। ষাটের দশকের কলকাতায় তিনি ছিলেন অসংখ্য লেখকের ঘরের মানুষ, নিবিড় বন্ধুত্বের মূলে ছিল তাঁর নির্মল হাসি আর চরিত্র। তিনি জীবনে রাষ্ট্রীয় একুশ পদকসহ অসংখ্য সংগঠনের পুরস্কার লাভ করেছেন। তথাপি বেলাল ভাই জীবনে অনেক লোভনীয় সুযোগ প্রত্যাখ্যান করে আজ পর্যন্ত এক নির্লোভ জীবনযাপন করে যাচ্ছেন।

১৯৯১ সালের দিকে আমাদের একটা ছোট অফিস রুম ছিল। সোনারগাঁও রোডের ইস্টার্ন প্লাজার আট তলায়। সেখানে প্রায়ই বেলাল ভাই আসতেন। উনি অত্যন্ত আত্মনির্ভরশীল একজন মানুষ। আর তেমনি এত বড়মাপের মানুষ আমি খুব কম দেখেছি, কখনও কোনো কাজের প্রয়োজনে নিজে এসে করে ফেলতেন। ১৯৯৯ সালের দিকে মাঝে মাঝে তাঁর শরীর খারাপ হওয়ায় তারিক বলতো আপনার কষ্ট করে আসার প্রয়োজন নেই, অফিসের আক্তারকে দিয়ে লেখাগুলো আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব। উনি এত সচেতন ছিলেন যে কখনও আক্তারকে কষ্ট দিতে পছন্দ করতেন না। নিজে এসে পাশে বসতেন এবং সকল সংশোধন যতœসহকারে করতেন। এইভাবে তিনি বেশ কয়েক বছর নিজের কাজ নিজেই করে গেছেন।

দৈনিক জনকণ্ঠে বল্লাল সেনের কলামে বেলাল চৌধুরীর রোজনামায় ‘শরৎ বন্দনা’য় শরৎকালের একটি বর্ণনা রয়েছে তার সাথে এই বছরের শরতের এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। কিন্তু আমার শুধু মনে হয় বেলাল ভাই শরতের আকাশ আর কাশফুলের মতো শুভ্র, তাঁর মনের ভিতরে যেমন কোনো জটিলতা, কুটিলতা নেই। আর সেই জন্য তিনি অত্যন্ত সুদর্শনও।

বেলাল ভাইয়ের সাথে আগরতলার ভ্রমণ কোনোদিন আমি ভুলতে পারবো না। জাতীয় কবিতা পরিষদ-এর ২০০১ সালের কবিতা উৎসব অনুষ্ঠানে ভারতের ত্রিপুরা থেকে আমন্ত্রিত অতিথি কবিদের মধ্যে ত্রিপুরার তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী কবি অনিল সরকারও ঢাকায় এসেছিলেন। জাতীয় কবিতা পরিষদের বর্তমান সভাপতি কবি ড. মুহাম্মদ সামাদের ফুলার রোডের বাসায় দুপুরে খাওয়ার আয়োজন হয়েছিল। রীমা ভাবি অত্যন্ত যতœ করে অনেক রকম রান্না করেছিলেন। সেই বছর ভারতের তরুণ কবি মন্দাক্রান্তা সেন কবিতা উৎসবে এসেছিলেন। অনেক কবি সেই দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার আমন্ত্রণে একত্রিত হয়েছিলেন।

আমার মনে আছে, ত্রিপুরার কবি অনিলদা খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সামাদ ভাই তাঁকে ভিতরের ঘরে এনে শোয়ার অনুরোধ করেন। আর তখনই আমরা তাঁর সঙ্গে গল্প শুরু করি। তিনি ত্রিপুরার বর্ণনা করছিলেন, আমি সাহস করে বলে ফেললাম আমি তো কবি নই, কিন্তু আমি আর আমার ছেলে দিব্য ত্রিপুরায় একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে কবিদের সঙ্গে যেতে চাই। আমি ভেবেছিলাম উনি সম্মতি দিবেন না, অন্য কোনো সময় আসতে বলবেন। কিন্তু উনি অত্যন্ত খুশি হয়ে বললেন, ‘এই বছরে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা করবো। উদ্বোধনের সময় কবি বেলাল চৌধুরী, কবি তারিক সুজাত আসবেন, তুমি তোমার ছেলেকে নিয়ে আসবে।’

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০১ সালে সকালবেলায় আমরা ঢাকা থেকে একটা সাদা গাড়ি করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে ত্রিপুরার দিকে রওয়ানা দিলাম। ড্রাইভার জহির খুব দক্ষ ও বুদ্ধিমান ছিল। তাকে দূরের রাস্তায় ভরসা করা যায়। তারিক সামনে বসেছিল, আমি, দিব্য আর বেলাল ভাই পিছনে বসেছিলাম। আমি অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ত্রিপুরা ভ্রমণ সম্পর্কে পড়েছিলাম। ত্রিপুরার রাজবাড়ি সম্পর্কেও আমার আগ্রহের কথা বেলাল ভাইকে খুব আস্তে করে জানালাম। তারিক মাঝে মাঝে আমার অতি উৎসাহের জন্য বিরক্ত হয়ে পড়ে, পরে অবশ্য কিছু বলে না। বেলাল ভাই আমাকে আশ্বস্ত করলেন, তুমি কোনো চিন্তা করো না আমি তোমাকে সব দেখার ব্যবস্থা করবো। আর এটাও বললেন, আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাবো।

পথে বেলাল ভাই কুমিল্লা শহর সম্পর্কে অনেক গল্প করলেন। বেলাল ভাই  কৈশোরে কুমিল্লায় লেখাপড়া করতেন। সেই সময় কুমিল্লা শহরটি অত্যন্ত আধুনিক ছিল। এখানে অবিভক্ত ভারতের অনেক লেখক থাকতেন, আবার অনেকে নিয়মিত আসাযাওয়া করতেন। তাঁদের অনেকের সঙ্গে বেলাল ভাইয়ের ঘনিষ্ঠতা ছিল।

পথে যেতে যেতে উনি দিব্য’র দিকে বারবার মনোযোগ দিচ্ছেন ওর কোনো কষ্ট হয় কিনা। দুপুরের মধ্যেই আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া পার হয়ে আখাউড়া সীমান্তে পৌঁছালাম। উভয় সীমান্তেই কবি অনিল সরকার বলে রেখেছিলেন, সহজেই সীমান্তের কাগজপত্রের অফিসিয়াল কাজগুলো তারিক সেরে ফেললো, আমি আর দিব্য সেইবার প্রথম ত্রিপুরায় গিয়েছিলাম।

পায়ে হেঁটে নোম্যানস্ ল্যান্ডটি পার হওয়ার সময় বেলাল ভাই দিব্যকে বুঝালেন এই জায়গাটি দিয়ে হেঁটে যেতে হবে এবং স্থানটি কোনো দেশের নয়। ভারতের সীমান্তে কবি অনিল সরকার আমাদের অভ্যর্থনার জন্য ফুলসহ কিছু তরুণ কবিদের পাঠিয়েছিলেন সেই সঙ্গে পুলিশ স্কট করা গাড়ি। আমি তো অভিভূত! বেলাল ভাই হেসে বলেছিলেন, এটা তোমাদের জন্য আমি তো অনেকবার এসেছি।

ত্রিপুরা পৌঁছে হোটেলে খাওয়াদাওয়া সারার পর আমি আর দিব্য একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ঘরে চলে গেলাম। তারিক আর বেলাল ভাই কবিদের সঙ্গে দেখা করার জন্য বেরিয়ে পড়লেন।

ঘণ্টাখানেক পরে বেলাল ভাই আর তারিক ফিরে এলেন। ততক্ষণে প্রায় পড়ন্ত বিকেল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আমি বললাম, দিব্য আর আমি তৈরি আছি তাড়াতাড়ি ঘুরতে চলো। বেলাল ভাই হেসে ফেললেন। বললেন, শহরে সাংঘাতিক একটি ঘটনা ঘটে গেছে, কোথাও আর এখন যাওয়া যাবে না।

কিছুক্ষণ আগে উগ্রপন্থীরা একজন সংসদ সদস্য মধুসূদন শাহকে তাঁর নিজ বাসভবনের নিকটে হত্যা করে চলে গেছে। শহরে সান্ধ্য আইন জারি হয়ে যেতে পারে। তারিক জানালো ওরা শুনে এসেছে, শহরে ব্ল্যাক ক্যাট (কালো মুখোশধারী সৈন্য) নামতে পারে। আমি খুবই হতাশ হয়ে পড়লাম। কিন্তু সেইসঙ্গে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো। ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা বাহিনির সশস্ত্র সৈন্যরা জিপ গাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, শহরটা থমথমে দেখে আমার মনের মধ্যে কেমন বিষণœতা সৃষ্টি হলো। বেলাল ভাই বললেন, তুমি চিন্তা করো না আমরা একটা অন্যরকম কিছু ব্যবস্থা করবো। আমি আর দিব্য ঘরে গিয়ে টিভি খুলে ত্রিপুরার পরিস্থিতি দেখা শুরু করলাম। তারিক বেলাল ভাইয়ের রুমে বসেছিল। কিছুক্ষণ পরে তারিক এসে আমাকে জানালো, এক অদ্ভুত পরিকল্পনার কথা। বেলাল ভাই অনিলদার সঙ্গে কথা বলে ঠিক করছেন, এই সান্ধ্য আইনের মধ্যেই পুলিশ পাহারা দিয়ে আমাদেরকে রুদ্রসাগরের মাঝে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত নীড়মহল দেখাতে নিয়ে যাবেন। আর তারপরের দিন সকালে আমরা কলকাতায় চলে যাবো দুদিনের জন্য। আর দুদিন পর এখানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তখন আবার ত্রিপুরায় ফিরে আসবো।

বেলাল ভাই আগেও রুদ্রসাগর এবং ত্রিপুরার আরও অনেক জায়গায় গেছেন। গাড়িতে আমাদের সঙ্গে ত্রিপুরাবাসী কবি চন্দ্রকান্ত মূঢ়া সিং ছিলেন আর সেইসঙ্গে একজন অস্ত্রধারী পুলিশ, স্পেশাল পাস লাগানো একটি জিপ গাড়ি।

আমি, তারিক, দিব্য আর কবি চন্দ্রকান্ত মূঢ়া সিংসহ রুদ্রসাগর ভ্রমণ আমার কাছে চিরদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। আগরতলা থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে রুদ্রসাগরের অবস্থান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ত্রিপুরায় অনেকবার এসেছিলেন। তাঁর জন্য ত্রিপুরার মহারাজ বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য ত্রিপুরার অদূরে একটি বড় দিঘির সন্নিকটে নীড়মহল প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন।

কবি চন্দ্রকান্ত মূঢ়া সিং করবরক ভাষার একজন বিশিষ্ট কবি। তিনি অত্যন্ত যত্ন করে আমাদের পথের বর্ণনা দিলেন। দেড় ঘণ্টা পরে রুদ্রসাগরে পৌঁছলাম। সেখানে সংস্কার কাজ চলছিল, তবুও আমি সেই শ্বেতপাথরের প্রাসাদ, দিঘি আর চারিদিকের সবুজ শ্যামলীর ভিতর দিয়ে শতবর্ষ পূর্বের রবীন্দ্রনাথের পদধ্বনি অনুভব করছিলাম। চন্দ্রদা আমাদের নিয়ে এরপরে নৌকা ভ্রমণ করেছিলেন রুদ্রসাগরে, মাঝির গলায় সহজাত ভাটিয়ালি গানটি আমার এখনও কানে বাজে।

পরের দিন আবার অনিলদার তত্ত্বাবধানে প্রহরীসহ জিপ গাড়ি করে ত্রিপুরা এয়ারপোর্টে যাই কলকাতায় যাওয়ার জন্য। ত্রিপুরা থেকে কলকাতার বিমান যাত্রা প্রায় ১ ঘণ্টা ২৫ মিনিটের মতো, দিব্য কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। বেলাল ভাই, তারিক ওর জন্য খুব চিন্তিত ছিল। তারিক ক্যামাক স্ট্রিটে ভিকটেরাস্ হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করেছিল। সেখানে পৌঁছানোমাত্র বেলাল ভাই আমাকে বললেন, দিব্যকে একটু বিশ্রাম করাও আর পারলে একবার মৌরীকে ফোন করে জানিয়ে দিও আমরা কলকাতায় এসেছি।

বেলাল ভাইয়ের মেয়ে মৌরী অল্পবয়সে মা হারিয়ে, সংসারের সকলের প্রতি যেমন যতœশীল হয়েছিল তেমনি বাবার প্রতি তার অনেক চিন্তা এখন পর্যন্ত দেখে যাচ্ছি।

বিকালে বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে কলকাতায় পার্ক সার্কাসের ৪ নম্বর ব্রিজের কাছে ডা. ভূমেন্দ্র গুহের চেম্বারে গিয়েছিলাম। খ্যাতিমান জীবনানন্দ গবেষক কবি ডা. ভূমেন্দ্র গুহের সঙ্গে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। উনি বেলাল ভাইকে দেখে কী যে খুশি হয়েছিলেন, মনে হলো তারুণ্যের বন্ধুত্বের সেই স্মৃতিবিজড়িত সময়ের দুই বন্ধু আবার পুরনো সময়টা ফিরে পেয়েছে।

রাতে কবি জয়দেব বসুর বাড়িতে আবার আমরা একত্রিত হয়েছিলাম। সেই সময় জয়দেবের স্ত্রী সেবন্তী ছিল শিলিগুঁড়িতে। আমি খিচুড়িসহ আরও কিছু ব্যঞ্জন রান্না করেছিলাম। কবি বীথি চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর মেয়ে মোহর এসেছিল। বেলাল ভাই শুধু আমাদের জন্য আর জয়দেবের অনুরোধে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে ছেড়ে অরিন্দমের সঙ্গে আমাদের আড্ডায় চলে আসেন। বরাবরের মতোই তিনি হয়ে রইলেন আড্ডার মধ্যমণি। তিনি ভুমেন্দ্র গুহ সম্পর্কে অনেক মজার মজার গল্প করেছিলেন। তিনি শল্যচিকিৎসক হিসাবে যেমন পরিচিত, তেমনি কবি জীবনানন্দ দাশের সাহিত্য বিশ্লেষক হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

গত ২০শে ডিসেম্বর ২০১৫ ডা. ভূমেন্দ্র গুহ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কবি জয়দেব বসুও আজ আমাদের মাঝে নেই।

এরপরের দিন বিকেলে আমরা আবার ফিরে যাই ত্রিপুরাতে। ত্রিপুরাতে অধীর আগ্রহে কবি অনিল সরকার অপেক্ষা করছিলেন। আজ তিনিও প্রয়াত। আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি তাঁকে। তিনি অত্যন্ত সাধারণের মধ্য থেকে অসাধারণ মানুষ ছিলেন। সন্ধ্যায় বেলাল ভাই বললেন, অনিল দার বাসায় রাতে দাওয়াত আছে। অনিলদা, তাঁর স্ত্রী এবং ছেলে আমাদের এত সুন্দর করে খাইয়েছিলেন তা কোনোদিন ভুলতে পারবো না। ত্রিপুরা ভ্রমণে বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে কত খুঁটিনাটি ঘটনা আছে তা সব নাইবা বললাম।

কিন্তু একটি ঘটনা না বললেই নয়, ত্রিপুরাতে বসেই দিব্য সাড়ে ছয় বছর বয়সে প্রথম কবিতাটি ‘যুদ্ধের সমাজ’ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলেছিল। বেলাল ভাই কী খুশি হয়েছিলেন যে তিনি তাঁর রোজনামা কলামে দিব্য’র ‘যুদ্ধের সমাজ’ কবিতাটি নিয়ে লিখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দিব্যকে এত স্নেহ করতেন যে, দিব্য’র ছোট কবিতার বই ‘কবিতার ছায়া’র ভূমিকাটিও তিনি লিখেছেন।

বেলাল ভাই তারিকের তিনটি কবিতার বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন। আর আমার তো ওনার কাছে ঋণের শেষ নেই। যখন থেকে আমি ডেইলি স্টার-এর মঙ্গলবারের লাইফস্টাইল-এর ‘ইন্টেরিয়র’ বিষয়ক কলাম লেখা শুরু করি, তখন তিনি আমাকে সব সময় উৎসাহ দিতেন। ২০০৯ সালে যখন ইন্টেরিয়র ডিজাইন বিষয়ক গ্রন্থ Homes of Bangladesh-এর ফাইনাল প্রুফ চলছিল তখন তিনি তারিককে ‘প্রকাশনা সংস্থা’ করার জন্য সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন এই বইটি ‘জার্নিম্যান’ থেকে বের হওয়া উচিত।

বেলাল ভাইয়ের চরিত্রের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে তিনি মানুষকে সম্মান করতে জানেন, তিনি মানুষের দোষ না ধরে তার গুণ সম্পর্কে বলেন। আর এই কারণে তাঁর ‘রোজনামা’ কত বিষয় নিয়ে যে লিখেছেন, তা যে কাউকে অভিভূত করবে। তিনি ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের রাজনৈতিক সততা-নিষ্ঠার কথা উল্লেখ করেছেন। ‘বঙ্গবন্ধুর নান্দনিকতা’ সম্পর্কেও কলাম লিখেছেন।

কবি, সংগ্রামী, মাতৃরূপিণী বেগম সুফিয়া কামালের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘তার কাছে ঋণী নয় কে?’ ‘বাংলাদেশের কবি সমাজের কাছে মাতৃসম এই নারীর ঋণ অপরিশোধ্য। তাঁর কবিতা দিয়েই বিচার করতে হবে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের স্নেহধন্যা কবি বেগম সুফিয়া কামালের কবিতা। এমন সাহসী, বিচক্ষণ, বিচার ও বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন বিদূষী সর্বদেশে সর্বকালেই বিরল।’

প্রতিভা বসুর কথা উল্লেখ করেছেন পরম শ্রদ্ধার সাথে। ‘প্রতিভা বসু বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী। কলকাতার এক নার্সিং হোমে তাঁর মৃত্যু হলেও আসলে তিনি ছিলেন ঢাকারই মাইয়া। জীবনের শুরুতে পরিচিত ছিল রানু সোম হিসাবে। এত স্নেহশীল ছিলেন যে, একবার যিনি, তা তিনি যেই হোন, তাঁর সংস্পর্শে গেছেন তাঁর পক্ষে তাঁকে বিস্মৃত হওয়া খুবই কঠিন।’

কবি বেলাল চৌধুরী তাঁর ‘শামসুর রাহমান যখন রোগশয্যায়’ লেখায় কবি শামসুর রাহমানকে শ্রদ্ধাভরে যেভাবে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করেছেন, অসুস্থতার কথা যেভাবে বলেছেন, সেটি উল্লেখযোগ্য এক সময়ের প্রতিচ্ছবি।

নীলিমা ইব্রাহিমের প্রতি শ্রদ্ধাভরে বলেছেন ‘জাতির মুক্তবিবেক চলে গেছেন’। শহীদ জননী মহীয়সী জাহানারা ইমাম-এর দৃপ্ত প্রতিবাদী স্বভাবের কথা বলেছেন। তাঁর অগ্রজ, সমকালীন এবং অনুজ কারও কথাই বাদ দেননি। কাউকে উপেক্ষার চোখে কখনও দেখেননি। ছোট বড় সকলের সাফল্যের কথা তিনি সুন্দর করে বর্ণনা করেছেন।

সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ভাষার প্রচার-প্রসার ও বিনিময়ের বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের কথাও উল্লেখ করেছেন। ব্রিটিশ কাউন্সিল, ইউএসআইএস, গ্যেটে ইনস্টিটিউট, ভারতীয় তথ্যকেন্দ্র, অলিয়সঁ ফ্রঁসেস-এর কথা উল্লেখ করেছেন। ৮০-র দশকে গ্যেটে ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক বাঙালির বন্ধু পিটার জেভিটাসের কথা বেলাল ভাই তাঁর কলামে খুবই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। একবার নোবেল বিজয়ী গুন্টার গ্রাস ঢাকায় এসেছিলেন, বেলাল ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গুন্টার গ্রাসকে সঙ্গে নিয়ে রিকশায় ঘুরে ঘুরে তিনি পুরনো বন্ধুকে চিনিয়েছেন নিজের শহর।

দেশের সংকটেও তিনি কখনও নিশ্চুপ থাকেননি। তাঁর কলামে লিখেছেন, ‘দেশব্যাপী মৌলবাদের দাপট’। আরও লিখেছেন, ‘নিষ্ঠুর, নির্দয় আগস্ট’। দুঃখভারাক্রান্ত আগস্টের কথা লিখেছেন, ‘আজ থেকে একত্রিশ বছর আগে ১৫ই আগস্ট তারিখে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। সেই থেকে মাসটি আমাদের কাছে তার মাহাত্ম্য হারিয়েছে। এ বছর যেন তারই পরম্পরা ধরে আমাদের বাংলাদেশের গৌরব রবি ক্রান্তদর্শী শামসুর রাহমান অস্তমিত হলেন।’

তার কলামে ‘প্রেসক্লাবে কবিদের বসন্ত উদ্যাপন’ লেখাটি থেকে আমরা একটি সুন্দর সময়কে দেখতে পাই। ‘কবি সাংবাদিক হাসান হাফিজুর রহমান নিজের কবিতা পাঠের সঙ্গে জানালেন আমাদের এই কবিতাপত্রের একটি চমৎকার নিজস্ব সেøাগান রয়েছে ‘আর কোনো নবী না আসিলেও যমুনার বানের লাহান কবি আসিতে থাকিবে এবং আসিবে।’ আমি বেলাল ভাইয়ের ‘রোজনামা’য় এতটাই বিমুগ্ধ তাঁর লেখার কিছু অংশ সংকলিত না করে পারলাম না। আজকের প্রজন্মের সাহিত্যপ্রেমী যে কেউ তাঁর এই ধারাবাহিক কলামগুলো পড়ে গেলে অনেক তথ্যহীনতা থেকে মুক্ত হতে পারবেন।

কবি বেলাল চৌধুরী অনুবাদক হিসাবে পরিচিত হয়েছিলেন অনেক পূর্বেই। তাঁর অনুবাদে বোর্হেসের ‘প্রতীক্ষা’ অথবা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মৃত্যুর কড়ানাড়া উপন্যাসের (প্রথম প্রকাশ ১৯৯৮) ‘এক মেঘলা মঙ্গলবার ভাঙছিল ক্রমশ’ অংশটি অনেক নন্দিত।

১৯৮৭ সালের জাতীয় কবিতা পরিষদের জন্মলগ্ন থেকে তিনি এখনও একনিষ্ঠভাবে এই সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন। জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর এই সম্পৃক্ততা দেশের সমস্ত কবি, লেখক ও সাহিত্যপ্রেমী মানুষ চিরকাল মনে রাখবে।

আমার জীবনে বেলাল ভাইয়ের সাথে ত্রিপুরা আর কলকাতা ভ্রমণ যেমন আনন্দঘন ছিল তেমনি আরও একটি ভ্রমণ সারাজীবন মনে থাকবেÑ ‘শান্তিনিকেতন’ ভ্রমণ।

বেলাল ভাইয়ের কাছে শান্তিনিকেতন হচ্ছে নিজের গ্রামের বাড়ি যাওয়ার মতো। গত ২০১৩ সালে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তাঁর স্মরণে প্রথম যে সাহিত্য সম্মেলন হয় সেখানে ঢাকা থেকে আমন্ত্রণ পান কবি বেলাল চৌধুরী, ড. মুহাম্মদ সামাদ, তারিক সুজাত, সৈয়দ আল ফারুক এবং সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। আমিও তারিকের সঙ্গে যাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করায় ভারতের ‘আবৃত্তিলোক’-এর সৌমিত্র মিত্র দা ও মালবিকা মিত্র আমাকে আমন্ত্রণ করেছিলেন।

কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে বেলাল ভাইয়ের যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাতো আমরা সবাই জানি। বেলাল ভাইয়ের সাথে তাঁর ছিল এক নিবিড় সম্পর্ক। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আত্মজীবনীর বড় অংশ জুড়ে রয়েছেন কবি বেলাল চৌধুরী। বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম পরিচয়টি একটি অসাধারণ মজার ঘটনা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর স্মৃতিকথায়, বেলাল ভাইকে তিনি ‘ছদ্মবেশী রাজকুমার’ বলেছিলেন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধায় ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বিশ্বভারতী এবং আবৃত্তিলোক শান্তিনিকতনে একটি কবিতা উৎসবের আয়োজন করে। ঐ অনুষ্ঠানে আমিও অনেক কিছু দেখেছিলাম। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার প্রকাশের জন্য দেশের সীমানা, দূরত্ব, স্থান কোনো কিছুই বাধা হয় না। শুধু প্রগাঢ় ভালোবাসা মানুষকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় টেনে নিয়ে যায়। আর সেই কারণে সুনীলদা’কে তারিকরা যতবার জাতীয় কবিতা উৎসবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন উনি শত ব্যস্ততার মাঝেও ঢাকায় এসে উপস্থিত হয়েছেন। কখনও কখনও স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়কেও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন।

২০১৩ সালে অকস্মাৎ অল্প কয়েকদিনের অসুস্থতায় রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক বাংলা ভাষার দিকপাল কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে সমস্ত বাংলা ভাষাভাষী মানুষ যেমন কষ্ট পেয়েছে, বেলাল ভাই আর তারিক খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন। কবি সুনীল দা বেলাল ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর তিনি তারিককেও অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ওনার মৃত্যুর কয়েকদিন আগে বেলাল ভাই আর তারিক কলকাতায় গিয়েছিল। সুনীলদা’র সঙ্গে দেখা করতে গেলে স্বাতী বৌদি নিজের হাতে ওঁদেরকে খাবার তৈরি করে আপ্যায়ন করেছিলেন।

শান্তিনিকেতন উৎসবে যাওয়ার জন্য আমরা ঢাকা থেকে কলকাতায় নেমে সোজা হাওড়া স্টেশনে চলে যাই। আর সেখানে চটজলদি দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে বোলপুরের ট্রেনে উঠলাম। আমাদের বন্ধু অরিন্দম বরাবরের মতো দৌড়ঝাপ করে আমাদেরকে ট্রেনে তুলে দিলো।

আমরা শান্তিনিকেতন পৌঁছে শুনেছিলাম, স্বাতী বৌদি শান্তিনিকেতনে চলে এসেছেন। বেলাল ভাই সব সময় খুব সকালে উঠেন। উনি সকালে উঠেই হেঁটে হেঁটে তারিককে সঙ্গে নিয়ে স্বাতী বৌদির সঙ্গে দেখা করে আসলেন। এরপরে উৎসব কমিটির গাড়ি ্এলে বেলাল ভাই আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে আবার বের হলেন।

বেলাল ভাইয়ের কাছে শান্তিনিকেতনের অলিগলি সবই খুব পরিচিত। ওনার আর তারিকের সঙ্গে আমি প্রথম শান্তিনিকেতনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাসায় যাই। স্বাতী বৌদি ছিলেন। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িটি গাছে গাছে ভরা। মাধবীলতা ঘেরা নিবিড় এক শান্তির নীড়। ইতোমধ্যে শিলিগুঁড়ি থেকে সেবন্তি চলে এসেছিল। কবি সেবন্তি ঘোষ আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বেলাল ভাই হেসে আমাকে বললো, তোমার বন্ধু চলে এসেছে। এখন ও তোমাকে শান্তিনিকেতন দেখাবে।

দুই দফা কবিতাপাঠের সেশন, সকাল আর সন্ধ্যায়। ইতোমধ্যে ঢাকা থেকে আমাদের সংস্কৃতি-বিষয়ক মন্ত্রী বিশিষ্ট অভিনেতা, আবৃত্তিশিল্পী আসাদুজ্জামান নূর একটি সেশনে এসে যোগ দিয়েছিলেন।

কবিতা সেশনের ফাঁকে ফাঁকে সেবন্তীর সঙ্গে শান্তিনিকতনের অনেক জায়গায় বেড়ালাম। কিন্তু দ্বিতীয় দিন বিকালের দিকে বেলাল ভাইসহ আরও কয়েকজন শান্তিনিকেতন থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে খোয়াই বনভূমির কাছে নদীর পাশে মেলা দেখতে যাই। এই নদীর পাশেই সাঁওতালদের গ্রাম। মেলাটি ছিল সত্যিকারে একটি মেলা, নেই কোনো ধরনের দোকানপাট, সকলেই তাদের পণ্য দিয়ে গাছতলায় বসেছিল পাটির উপরে।

আদিবাসীরা তাঁদের হাতে বানানো খেলনা, খেস শাড়ি, ওড়না নিয়ে বসেছিল আর ছিল ডোকরার গয়না। আর আমরা কিছু কেনাকাটা করলাম, আমাদের সঙ্গে ছিল আমাদের বন্ধু অরিন্দম, সংগীতশিল্পী ইন্দ্রানী ভট্টাচার্য।

মেলায় কেনাকাটার পালা শেষ হতে হতে প্রায় পড়ন্ত বিকেল, আমাদের সবার একটু একটু খিদে পেয়েছিল। খোয়াই নদীর পাশে একটা ছোট চায়ের দোকানে বসলাম। তারিক আর অরিন্দম চায়ের দোকানের ভিতরে ঢুকে দেখে এল ওদের কাছে দেশি পাউরুটি আর ডিম আছে। তারিক দোকানদারকে বললো, মজা করে কাঁচামরিচ দিয়ে ঝাল করে পাউরুটির সঙ্গে ডিম ভেজে দিতে। আমি ভাবলাম বেলাল ভাই কি খাবেন? আমি জানি উনি জীবনে অনেক পথ হেঁটেছেন, সব কিছুর সঙ্গে অভ্যস্ত। কিন্তু বয়সের কারণে অনেকেই সংযমী হয়ে পড়েন। কিন্তু ওনার মধ্যে এরকম কোনো দুর্বলতা ছিল না। উনি মহাউৎসাহে আমাদের সঙ্গে চায়ের দোকানে বেঞ্চে বসে পাউরুটিটি ডিম ভাজা খেলেন।

সুনীলদা’র স্মরণে কবিতার আয়োজনের শেষ রাতের খাওয়াদাওয়া আয়োজনটি খুবই সুন্দর ছিল। সুনীলদা’র প্রিয় গানগুলো গাওয়া হয়েছিল। শেষ দিনের অনুষ্ঠানে অনেক কবি, সাহিত্যিক উপস্থিত ছিলেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বাদল বসু, কবি শ্রীজাত, কবি পিনাকী ঠাকুর, শঙ্করলাল ভট্টাচার্য, ইন্দ্রানী ভট্টাচার্য, স্বাতী বৌদি, সৌমিত্র মিত্র, মালবিকা মিত্রসহ আরও অনেকে। সবশেষে মজার একটি ঘটনা ঘটলো। বেলাল ভাই হঠাৎ একটু অসুস্থ বোধ করায় তাঁকে গেস্ট হাউজের রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু পরে উৎসবের শেষে আমরা বেশ কয়েকজন তাঁকে দেখতে রুমে যাই। উনি আর কি ঘুমাবেন? সৌমিত্র মিত্রদা এমন সব মজার মজার পুরনো দিনের গল্প শুরু করলেন যে আমরা সবাই হেসে সারাÑ এর ফলে বেলাল ভাইয়ের ঘুম গেল উবে, সুনীলদার নানা উৎসবমুখর অনুষ্ঠানের নানারকম প্রাঞ্জল স্মৃতির কথা হয়েছিল।

কবি বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে কত জ্ঞানী-গুণী মানুষ যে ভ্রমণ করেছেন তার কথা শুধু তিনিই বলতে পারবেন। আমার মনে হয়, এপার বাংলা থেকে ওপার বাংলায় তার অধিক কেউ পথ হাঁটেনি। তিনি এককালের জীবন্ত সাক্ষী। পুরাতন ঢাকা শহর থেকে কলকাতার অলিগলির কোথায় মন্দির, কোথায় মসজিদ, কোথায় পান্থশালা সবই তার মুখস্ত। তিনি জানেন কোন বাড়ি থেকে কোন বিখ্যাত লোক কীভাবে সাধারণের ভিতর থেকে অসাধারণ হয়ে উঠেছেন।

কবি, উপন্যাসিক, গল্পকার, ছোটগল্প কে কোথায় লিখছেন, কোথায় কার লেখা ছাপা হচ্ছে, সবকিছুই তাঁর দৃষ্টিগোচরে। বেলাল ভাই সকলের লেখার বিশ্লেষণ এত সুন্দর ও সাবলীলভাবে বর্ণনা করেছেন তা বোধ হয় অনেক পরে বাংলা সাহিত্যের জন্য একটি সামগ্রিক চিত্ররূপ হয়ে থাকবে।

কলকাতা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়ার সময় আমি আর বেলাল ভাই একটি ট্যাক্সিতে ছিলাম। সেদিনটা উনি খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাকে অনেক মজার গল্প শুনিয়েছিলেন। ইফ্ফাত আরা দেওয়ান, সুনীল দা ও স্বাতী বৌদির কথা, আরও বলেছিলেন ওনার নিজের পরিবারের কথা।

অনেকেই মনে করেন, কবি, সাহিত্যিকদের বুঝি পরিবারের প্রতি টান নেই। কবি বেলাল চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে যেমন কবিদের সঙ্গে বেলাল ভাই, পরিবারে মেঝদা, একান্তে পরিবারে স্নেহশীল পিতা। মৌরী এবং প্রতীকের বিয়ের সময় আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল যখন উনি আমাকে বলেছিলেন, মিমি আমি শুধু দেখেছি শিক্ষিকার মেয়ে ও শিক্ষকের ছেলের সঙ্গে আমার পরিবারের সম্পর্ক হতে পারে।

কবি, গদ্যকার বেলাল চৌধুরী মানুষের সংবেদনশীল মনের দিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। সেই জন্য তার হাত আর ঘরভর্তি আজও অনেক বই। বাড়ি গাড়ির ঐশ্বর্যের আড়ম্বর নেই।

আমার বাবা যখন আমাদের ছেড়ে ২০০৬ সালে চলে গেলেন তখন তিনি আমাদের মালিবাগের বাড়িতে দৌঁড়ে এসেছিলেন। দৈনিক জনকণ্ঠে তার কলামে ‘মৃত্যুর মিছিল’-এ আমার বাবা-চাচাদের কথা এত সুন্দর করে উল্লেখ করেছেন যে, আমি যতবার পড়ি ততবারই আমার চোখ জলে ভিজে যায়।

আমি ব্যক্তিগতভাবে গত দুই বছর তাঁর কাছে তেমনভাবে যেতে পারিনি। আমার মা অসুস্থ হওয়ায়, অফিস শেষে পড়িমরি করে বাড়ি চলে আসি। তবু এটা কোনো অজুহাত নয়, বেলাল ভাইয়ের কাছে আমার ঋণের শেষ নেই। উনি আমাকে আর তারিককে কত সময় যে কত কাজে উৎসাহ, উপদেশ দিয়েছেন তা বলে শেষ করা যাবে না। বেলাল ভাইয়ের স্নেহের পরশে আমরা ধন্যÑ তাঁর সুস্বাস্থ্য ও সাবলীল লেখনীর দীর্ঘায়ু কামনা করি।  এ মহান কবির জন্মদিনে তাঁকে প্রণতি জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares