প্রচ্ছদ রচনা : শামসুর রাহমানের কবিতার পুনর্পাঠ

প্রচ্ছদ রচনা

 

কবি শামসুর রাহমানের জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য

শামসুর রাহমানের কবিতার পুনর্পাঠ

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

 

এ দেশে হায়েনা, নেকড়ের পাল,

গোখরো,শকুন, জিন কি বেতাল

জটলা পাকায় রাস্তার ধারে।

জ্যান্ত মানুষ ঘুমায় ভাগাড়ে।

 

অথচ তোমার চুল খুলে দাও তুমি।

 

এ দেশে কতো যে ফাঁকির অছিলা,

কালো বাজারের অপরূপ লীলা।

আত্মহত্যা গুম খুন আর

ফটকা বাজার- সব একাকার।

 

এখনো খোঁপায় ফুল গুঁজে দাও তুমি।

 

মড়ক-মারীর কান্নার রোল

সারা দেশটার পাল্টায় ভোল।

হা-ভাতে ছোঁড়ারা হুজুরের দোরে

সোনালি আমের মরশুমে ঘোরে।

 

এখনো তোমার বাহু মেলে দাও তুমি।

 

এ দেশে আ’মরি যখন তখন

বারো ভূতে খায় বেশ্যার ধন।

পান নাকো হুঁকো জ্ঞানীগুনীজন,

প্রভুরা রাখেন ঠাগেদের মন।

 

এখনো গানের সুরে ভেসে যাও তুমি।

 

এ দেশে নেতারা হাওদায় চড়ে

শিকার গাঁথেন বাক্যের শরে,

আসলের চেয়ে মেকিটাই দামী।

বিচিত্র দেশ, কৃতজ্ঞ আমি

 

এখনো যে মেয়ে হাসি জ্বেলে দাও তুমি।

 

[ রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩)]

 

সম্পাদক সমীপেষু

 

আমরা বাগান চাই আমরা ক’জন অকপট

শান্তিবাদী ক্লান্ত নাগরিক এমন বাগান চাই

যেখানে ফুলের কাছে সহজে পারবো যেতে, ঘাসে

চিৎ হয়ে শুয়ে দিব্যি পা দুটো নড়াবো অকারণ

মাঝে মাঝে। কী কী ফুল থাকবে বাগানে তার সুদীর্ঘ তালিকা

বলো তো পাঠাতে পারি পৌ র সমিতির কাছে। ভদ্রমহোদয়,

 

আমরা বাগান চাই, আমরা ক’জন হতচ্ছাড়া,

যারা মাঝরাস্তা দিয়ে ভাগ্যের ছ্যাকড়া গাড়ি হাঁকাতে হাঁকাতে

বড়ো বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি সম্প্রতি, আমারাই

শহরে বাগান চাই লিরিকের প্রসন্নতা-ছাওয়া;

এবং বিশে^ষ কারো আছে আজো চাওয়ার সাহস।

 

চেতনপুরে ফুলের চারায় ধরলো নতুন কলি;

ছেঁড়া জামায়, জুতোর গর্তে করছি স্বপ্ন জড়ো।

স্বপ্ন-আভায় স্বর্গ হলো চেনা ময়লা গলি,

হিংসুটে সব মত্ত পথিক সরো তোমরা সরো।

আমরা কিছু দুর্বিনীত বাগান বাগান বলে

কান করেছি ঝলাপালা মানী-গুণীর বটে।

ফুলবাগানের অলীক মালী শুনছি সে কোন্ ছলে

মস্ত বাগান সাজিয়ে দেবে, দৈব কতই ঘটে!

 

শিল্পকর্মে আস্থা ছিল বলেই ক্ষুধার দাঁতে

দীর্ণ হয়ে ক্লিন্ন প্রাণে পোড়াই আতশবাজি।

ঘুমাক তারা ঘুমাক সুখে নিদ্রা এলে রাতে,

ঝুলিয়ে কাঁধে মরা পাখি আমরা ঘুরতে রাজি।

 

এমন বাগান চাই যেখানে গেলেই নির্বিবাদে

লতাপাতা জড়ানো ঘোড়ার মূর্তি দেখে অচিরাৎ

ভুলবো দুঃসহ সুখ, বস্তুত বাগানে এসে কোনো কোনোদিন-

বুধবার,শুক্রবার, কিংবা রবিবার, হোক না যে কোনোদিন;

খুঁজবো অদৃশ্য আরোহীকে লোহার ঘেড়ার পিঠে!

দেখবো বেঞ্চিতে বসে অচেনা কে লোক চুরুটটা

ফুঁকে ফুঁকে ইতস্তত স্মৃতির খেলামাকুচি ছড়াচ্ছে প্রচুর।

হয়তো মাথায় ছিট লোকটার, শাগালের ভবঘুরে যেন,

বুঝি নিঃসঙ্গতা কালো সহোদর তার!

 

আমাদের রমণীর মুখে ফুলের স্তবকগুলি

মেলুক আরক্ত ডানা, আমাদের  শিশুদের মুখে

দয়ালু বাতাস দিক চুমু ঘন-ঘন, ফুলবাগানের ডাল

মাতাল কবিকে দিক কবিতার পঙ্ক্তি উপহার।

এবং সেসব ডালে বিষ পিঁপড়েরা কখনো সদলবলে

বাঁধতে না পরে যেন বাসা; যদি বাঁধে

তাহলে কী করে যাবো বাগানের পথে? কী করে  ছেলেরা ডাল

বেয়ে বেয়ে কেবলি হারিয়ে যাবে পাতার জঙ্গলে?

 

ভদ্রমহোদয়! বারো মাস তের পার্বণ-কাতর

লাজুক আত্মাকে বসতিতে যথাযথ

রাখার প্রয়াসে নিত্য উচাটন আমরা কখনো

গুহাকে করিনি ঘর, রাখিনি পানীয় করোটিতে,

আঁকিনি স্বর্গের নক্সা বাঘছালে, তুকতাক মন্ত্রের প্রাচীন

কোনো পুঁথি ছিল না সম্মুখে খোলা সর্বক্ষণ। হল্দে

পুঁথির  তুলোট পাতা আকাক্সক্ষার শবটাকে কখনো পারে কি

দিতে চাপা? একদিন লক্ষ্যে পৌঁছে যাবো নিরাপদে

আমরা তেমন কেউ নই; দূরে ও নিকটে

প্রকৃতই লক্ষ্য কিছু আছে কি না সেও তো জানি না।

 

নানান ফুলের গাছে সুশীতল জল দেবো বলে

দু’বেলা অসীম ধৈর্যে ঝারি হাতে সবাই প্রস্তুত,

অথচ বাগানই নেই, কোথাও বাগান নেই আজ।

 

[ বিধ্বস্ত নীলিমা (১৯৬৭) ]

 

এ শহর

 

এ-শহর টুরিস্টের কাছে পাতে শীর্ণ হাত যখন তখন,

এ-শহর তালিমার জামা পরে, নগ্ন হাঁটে খোঁড়ায় ভীষণ।

এ-শহর রেস খেলে, তাড়ি গেলে হাঁড়ি হাঁড়ি,ছায়ার গহ্বরে

পা মেলে রগড়া করে আত্মার উকুন বাছে, ঝাড়ে ছারপোকা।

কখনো-বা গাঁট কাটে, পুলিশ দেখলে

মারে কাট। টকটকে চাঁদের মতন চোখ তাকায়ে চৌদিকে,

এ-শহর বেজায় প্রলাপ বকে, আওড়ায় শ্লোক,

গলা ছেড়ে গান গায়, ক্ষিপ্র কারখানায়

ঝরায় মাথার ঘাম পায়ে।

ভাবে দোলনার কথা কখনো সখনো,

দ্যাখে সরু বারান্দায় নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির রূপ।

 

এ-শহর জ্যৈষ্ঠে পুড়ে এবং শ্রাবণে ভিজে টানে

ঠেলাগাড়ি, রাত্রি এলে শরীরকে উৎসব করার

বাসনায় জ¦লে সাত তাড়াতাড়ি যায় বেশ্যালয়ে।

এ-শহর শাদা হাসপাতালের ওয়ার্ডে কেবলি

এ-পাশ ও-পাশ করে, এ-শহর সিফিলিসে ভোগে,

এ-শহর পীরের দুয়ারে ধর্না দেয়, বুকে-হাতে

ঝোলায় তাবিজ-তাগা, রাত্রিদিন করে রক্ত-বমি,

এ-শহর কখনো হয় না ক্লান্ত শবানুগমনে।

এ-শহর দারুণ দুক্ষোভে ছেঁড়ে চুল, ঠোকে মাথা

কালো কারাগারের দেয়ালে,

এ-শহর ক্ষুধাকেও নিঃসঙ্গ বাস্তব জেনে ধুলায় গড়ায়;

এ-শহর পল্টনের মাঠে ছোটে, পোস্টারের উল্কি-ছাওয়া মনে

এল গ্রেকো ছবি হয়ে ছোঁয় যেন উদার নীলিমা,

এ-শহর প্রত্যহ লড়াই করে বহুরূপী নেকড়ের সাথে।

 

[ নিজ বাসভূমে (১৯৭০) ]

 

গেরিলা

 

দেখতে কেমন তুমি? কী রকম পোশাক-আশাক

প’রে করো চলাফেরা? মাথায় আছে কি জটাজাল?

পেছনে দেখতে পারো জ্যোতিশ্চক্র সন্তের মতন?

টুপিতে পালক গুঁজে অথবা জবর জং, ঢোলা

পাজামা-কামিজ গায়ে মগডালে একা শিস দাও

পাখির মতোই কিংবা চা-খানায় বসো ছায়াচ্ছন্ন?

 

দেখতে কেমন তুমি?- অনেকেই প্রশ্ন করে, খোঁজে

কুলুজি তোমার আতিপাতি। তোমার সন্ধানে ঘোরে

ঝানু গুপ্তচর, সৈন্য, পাড়ায় পাড়ায়। তন্নতন্ন

করে খোঁজে প্রতি ঘর। পারলে নীলিমা চিরে বের

করতো তোমাকে ওরা, দিতো ডুব গহন পাতালে।

তুমি আর ভবিষ্যৎ যাচ্ছে হাত ধরে পরস্পর।

 

সর্বত্র তোমার পদধ্বনি শুনি, দুঃখ-তাড়ানিয়া;

তুমি তো আমার ভাই, হে নতুন, সন্তান আমার।

 

[ বন্দী শিবির থেকে (১৯৭২) ]

 

 

উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ

(আবদুর রাজ্জাক খান বন্ধুবরেষু)

 

শেষ-হয়ে-আসা অক্টোবরে

শীতের দুপুরে নিউ ইয়র্কের অরচার্ড স্ট্রিটে ঘুরে ঘুরে

একটি দোকান দেখি মায়াপুরী, দোকানি ওয়াল্ট ডিজ্নির

আশ্চর্য ডবল, বলা যায়। দিলেন পরিয়ে গায়ে

স্মিত হেসে সহজ নৈপুন্যে নীল একটি ব্লেজার । ব্লেজারের

বুকে জাগে অরণ্যের গহন শ্যামলপ্রসূ, সরোবর-উদ্ভূত অমর্ত্য

দূরায়নী তান।

 

সুনীল ব্লেজার ঝুলে আছে

আলনায়, কাঠের হ্যাঙ্গারে একা আমার পুরনো ম্লান ঘরে

মালার্মের কবিতার স্তবকের মতো নিরিবিলি,

অথচ সঙ্গীতময় সর্বক্ষণ অস্তিত্বের পরতে পরতে।

নানান সামগ্রী ঘরে থরে থরে, কিছু এলোমেলো; সামগ্রীর ভিড়ে

সুনীল ব্লেজার যেন গদ্য-লেখকের মাঝে

বড় একা একজন কবি।

 

ব্লেজারের দিকে চোখ যায়

যখন তখন, দেখি সে আছে নিভৃত অহঙ্কারে,

থাকার আনন্দে আছে,নিজের মতন

আছে; বলে সান্দ্র স্বরে.‘এই যে এখানে আছি, এই

থাকা জানি নিজেই তাৎপর্যময় খুব।’ এ-মুহূর্তে

যদি ছুঁই তাকে, তবে মর্মরিত হবে সে এখন, উঠবে জেগে

স্বপ্ন-সুদূরতা থেকে।

 

কখনো ব্লেজার কৌতূহলে

দ্রুত জেনে নিতে চায় তরুণ রবীন্দ্রনাথ কাদম্বরী দেবীকে কখনো

তীব্র চুমো খেয়েছেন কি না জোড়াসাঁকোর ডাগার অভিজাত

পূর্ণিমায়,

নব্য কবিসঙ্ঘ কী পুরাণ নিয়ত নির্মাণ করে মেধায় কিরণে আর

শীতার্ত পোল্যান্ড আজ ধর্মঘটে রুদ্ধ কি না কিংবা কোন্

জলাভূমিতে গর্জায়

গেরিলার স্টেনগান,হৃদয়ের মগ্নশিলা, আর্ত চাঁদ

ইত্যাদিও জানা চাই তার।

 

ভোরবেলা ঘন

কুয়াশার তাঁবুতে আচ্ছন্ন চোখ কিছুটা আটকে গেল তার

মনে হয় যেন সে উঠেছে জেগে সুদূর বিদেশে

যেখানে এখন কেউ কারো চেনা নয়, কেউ কারো

ভাষা ব্যবহার আদৌ বোঝে না; দেখে সে

উদ্ভট উটের পেঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ,

হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।

 

কোথায় পাগলাঘণ্টি বাজে

ক্রমাগত, এলোমেলো পদধ্বনি সবখানে। হামলাকারীরা।

ট্রাম্পেট বাজিয়ে ঘোরে শহরে ও গ্রামে

এবং ক্রন্দনরত পুলিশের গলায় শুকায় বেল ফুল।

দশদিকে কত একাডেমিতে নিশীথে

গোরখোদকেরা গর্ত খোঁড়ে অবিরত, মানুষের মুখগুলি

অতি দ্রুত হয়ে যাচ্ছে শিম্পাঞ্জীর মুখ।

 

গালিবের জোব্বা

দিল্লির সূর্যাস্ত যেন, রবীন্দ্রনাথের আলখাল্লা অনুপম,

মৌলানা রুমীর খিরকা, বোদলেয়ারের মখমলী

কালো কোট দুলে ওঠে আমার সুনীল ব্লেজারের কাছাকাছি।

কিছু অসন্তোষ গাঁথা সুতোয়, বিশদ কারুকাজে:

ইতিহাসবিদ্বেষী ব্লেজার পুণ্য নীল পদ্ম অকস্মাৎ,

অবাধ স্বাতন্ত্র্য চায় ব্যাপক নির্মুখতায় আজ।

 

নষ্ট হয়ে যাবে

ভেবে মাঝে মাঝে আঁৎকে ওঠে, টুপির মতন ফাঁকা

ভবিষ্যৎ কল্পনায়  মূর্ত হয় কখনো কখনো,

কবরের অবরুদ্ধ গুহা তাকে চেটেপুটে খাবে

কোনোদিন, ভাবে সে এবং নীল পাখী হয়ে দূরে

সিমেট্রির মিশকালো সাইপ্রেস ছেড়ে পলাশের রক্তাভায়

বসে গান গায়।

 

[ উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ (১৯৮২) ]

 

 

শোভাযাত্রা

 

হেমন্ত বিকেলে আমি বেশ্যাদের শোভাযাত্রা দেখে

আরো বেশি কৌতূহলী হই জীবনের রূপায়ণে।

নিশীথ কন্যারা এই পড়ন্ত বেলায় হেঁটে যায়,

ওদের শরীর নগ্ন হাওয়া বিষণ্ন অক্ষর লেখে।

 

খুব কাছ থেকে দেখি গণিকার নগর ভ্রমণ;

স্বেদচিহ্ন দেখি না কোথাও আপাতত, কী কৌশলে

লুকিয়ে রেখেছে ওরা পৃথিবীতে জীবন-যাপন

করার নির্বেদ আর পাতালের জন্মান্ধ পীড়ন।

 

সমাজপতিরা দ্রুত ব্যাঙ্কনোট গুণে স্ননাহার

সেরে চুলে সুদূর আলালী টেরি কেটে ফুরফুরে

পাঞ্জাবির অন্তরালে সীল মাছের মতন দেহ

ঢেকে দূর থেকে করে ব্যবহার বাইনাকুলার।

 

বেশ্যাদের শেভাযাত্রা আস্তেসুস্থে একটি সফেদ

ঘোড়ার নেতৃত্বে চলে, ক্রমশ এগোতে থাকে। দূরে

অমৃতের ভাণ্ডে মাছি ওড়ে, ক’জন ধাঙড়া ঢোল

বাজায় সূর্যাস্ত পান করে, সমস্ত শরীরে জমে স্বেদ।

 

সুন্দর সুন্দর বলে ওরা সেই শোভাযাত্রাটিকে

মাদলো রঙিন চোখে জানায়  স্বাগত। দেয় পেতে

আসন উঠোনে, তাম্বুলের রঙ আনে আচরণে,

অবৈধ সৌন্দর্য চর্চা করে ক্ষণস্থয়ী অলৌকিকে।

 

অকস্মাৎ কারো মনে পড়ে ওপ্টেনের ঘ্রাণ আর

কেউ বনশিউলীর গন্ধ মনে করে দীর্ঘশ্বাস

ফেলে, এরা কেউ সাড়ে তিন হাত সোঁদা নির্জনতা

পারে না, পারে না বুঝি চন্দন কাঠের সত্তাসার।

 

নিবিড় গোধূলিপায়ী বেশ্যাদের শোভাযাত্রা গাছে,

ফুটপাতে, দোকানের উল্লোল শো-কেসে রেখে যায়

নোনা মায়া, শোভাযাত্রা শবদাহ-স্মৃতিসম্বলিত

কার্পাস তুলোর মতো উড়ে যায় কবিতার কাছে।

 

[ ইচ্ছে হয় একটু দাঁড়াই (১৯৮৫) ]

 

 

হরিনাথ সরকার বলছেন

 

আমার বসতবাড়ি, পুঁইমাচা,উঠোন,ইঁদারা

আমার দু’চোখ থেকে ওরা

মুছে দিতে চায়; ভরদুপুরে পুকুরে নিত্যদিন

জুড়িয়েছি শরীর, এ পথে হেঁটে গিয়েছি বিকেলে হাটে,প্রাণ

ভরে কথা বলে কাটিয়েছি কত কাল

কাশেম মহিম আর মজিদের সঙ্গে। কোনোদিন

শুনেছি বাউল গান, ভেসে গেছি মুর্শিদি, কীর্তনে। ওরা আজ

আমার স্মৃতিকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে

হো হো হেসে ওঠে,

ওদের পায়ের নিচে আমার স্বপ্নেরা বড় আর্তনাদ করে।

 

তুলসীতলায় সাঁঝে দীপহীন স্তব্ধতা শীতল

দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে, নটমন্দিরের ছাই

হাওয়ায়, হৃদয়ে ওড়ে! সন্ধ্যার আহ্নিকে

এখন বসে না মন। সাতপুরুষের ভিটে ছেড়ে

সোমত্ত মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে বেড়াই সারাক্ষণ

আঁদাড়ে-পাঁদাড়ে একমুঠো চিড়েগুড় খেয়ে, অতি

সন্তপর্ণে ছায়া হয়ে হেঁটে যাই, ভিখিরির মতো পুঁজিহীন

একটু আশ্রয় খুঁজি সদাশয় গেরস্তের কাছে।

 

ও হরি, হে আল্লাহ, বলো প্রভু দয়াময়

আমার দেশের মাটি, ধূলিকণা , আলো-হাওয়া, জল

কেন আজ এমন নিষিদ্ধ হবে আমারই সংসারে?

তোমার দুনিয়া, দীনবন্ধু, সমকালে

কেন এত ছোট মনে হয়?

তবে কি আমাকে শেষে, হায়,

নিজে চোখ দেখে যেতে হবে আত্মজার লুন্ঠিত সম্ভ্রম আর

নিঃশব্দে সাজাতে হবে আমার নিজেরই গুপ্ত চিতা?

 

[ আকাশ আসবে নেমে (১৯৯৪) ]

 

 

বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়

 

সারারাত নূর হোসেনের চোখে এক ফোঁটা ঘুমও

শিশিরের মতো

জমেনি, বরং তার শিরায় শিরায়

জ¦লেছে আতশবাজি সারারাত, কী এক ভীষণ

বিস্ফোরণ সারারাত জাগিয়ে রেখেছে

ওকে, ওর বুকে ঘন ঘন হরিণের লাফ,

কখনো অত্যন্ত ক্ষিপ্র জাগুয়ার তাকে

প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে জ্বলজ্বলে

চোখে খর তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে,

এতটুকু ঘুমোতে দেয়নি।

 

কাল রাত ঢাকা ছিল প্রেতের নগরী,

সবাই ফিরেছে ঘরে সাত তাড়াতাড়ি। চতুর্দিকে

নিস্তব্ধতা ওত পেতে থাকে,

ছায়ার ভেতরে ছায়া,আতঙ্কে একটি

কৃষ্ণাঙ্গ চাদরে মুড়ে দিয়েছে শহরটিকে আপাদমস্তক।

মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক নৈঃশব্দ্যকে

আরো বেশি তীব্র করে তোলে

প্রহরে প্রহরে, নূর হোসেনের চোখ

খোলা পথ ওর

মোহন নগ্নতা নিয়ে আমন্ত্রণ জানায় দুর্বার। অন্ধকার

ঘরে চোখ দুটো অগ্নিঘেরা

জানালা, কব্জিতে তার দপ্দপ্ করে ভবিষ্যৎ।

 

এমন সকাল তার জীবনে আসেনি কোনোদিন,

মনে হয়  ওর; জানালার কাছে পাখি

এ-রকম সুর

দেয়নি ঝরিয়ে এর আগে, ডালিমের

গাছে পাতাগুলি আগে এমন সতেজ

কখনো হয়নি মনে। জীবনানন্দের

কবিতার মায়াবী আঙ্গুল

তার মনে বিলি কেটে দেয়। অপরূপ সূর্যোদয়,

কেমন আলাদা,

সবার অলক্ষ্যে নূর হোসেনের প্রশস্ত ললাটে

আাঁকা হয়ে যায়,

যেন সে নির্ভীক যোদ্ধা, যাচ্ছে রণাঙ্গনে।

 

উদোম শরীরে নেমে আসে রাজপথে, বুকে-পিঠে

রৌদ্রের অক্ষরে লেখা অনন্য শ্লোগান,

বীরের মুদ্রয় হাঁটে মিছিলের পুরোভাগে এবং হঠাৎ

শহর টহলদার ঝাঁক ঝাঁক বন্দুকের সীসা

নূর হোসেনের বুক নয় বাংলাদেশের হৃদয়

ফুটো করে দেয়; বাংলাদেশ

বনপোড়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে, তার

বুক থেকে অবিরল রক্ত ঝরতে থাকে, ঝরতে থাকে।

 

[ বুক তার বাংলাদেশের হৃদয় (১৯৮৮) ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares