প্রচ্ছদ রচনা : জুলফিকার মতিন

 

প্রচ্ছদ রচনা

এই সময়ের প্রধান কবি শামসুর রাহমান :

তাঁর আত্মার চিৎকার

জুলফিকার মতিন

 

বাংলা কবিতা-জগতে শামসুর রাহমানের স্থায়িত্ব নিয়ে, বোধ করি, কারোরই কোন সংশয় অবশিষ্ট নেই। তবে এই স্থায়িত্ব নির্ধারণের জন্য আলোচনা-সমালোচনার ক্ষেত্রে যে ধরন-ধারণ অনুসৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে কথা বলাটা একবারে অনায্য নাও হতে পারে। শিল্প-সাহিত্য আলোচনা-সমালোচনার কিছু রীতিসিদ্ধ পদ্ধতিও ইতিমধ্যেই গড়ে উঠেছে। বাংলা সাহিত্যে ছিল না জন্যই, বোধ হয়, সংস্কৃত অলঙ্কারশাস্ত্রের দ্বারস্থ আমরা যেমন হয়েছি, তেমনই ঔপনিবেশিকতার কারণে ইংরেজি সাহিত্য থেকে তার নতুন চেহারা-চরিত্র বিনির্মাণেও কোনো পশ্চাৎপদতা ছিল না বলে তাদের লিটারেরি ক্রিটিসিজমের মানদ- আত্মস্থ করতে আমাদের কোনো দ্বিধা জাগেনি। সংস্কৃত অলঙ্কারবাদীদের কথাটা ছিল অনেকটা সোজা-সাপটা। নারী-শরীর প্রসাধিত করার মতোই কবিতাতেও যেন তার অন্যথা না হয়। আর শুধু কবিতা কেন, শিল্প-সাহিত্যের সবটাই তো শব্দের সমাহার। কাজেই সেটাকে যাদুময় করে তুলতে না পরলে বাজারে গিয়ে আলু-পটল কেনার ভাষার সাথে তার পার্থক্যই বা থাকল কোথায়? সুতরাং সেটা যদি না থাকে তবে ব্যবহার করতে করতে সাবান যেমন নিঃশেষিত হয়ে যায়, ভাষাও সে ভাবেই এসে ঠেকবে তলানিতে। কাজেই তাকে সাজাতে হবে মণি-মুক্তো-হেম অলঙ্কারে। তার হীরকদ্যুতি যেন অন্ধকারে জ্বলতে তাকে অহর্নিশ। কিংবা তাকে শুধু মাত্র বাচ্যার্থের ভেতর বন্দি করে রাখলে চলবে না। তার সীমা অতিক্রম করতে থাকবে অভিধেয়ার্থকে খুঁজে-পেতে। ধ্বনিবাদীরা এ ভাবেই চেয়েছেন এক রহস্যময় জগৎ খুলে দিতে। আবার কখনও ধ্যেয় করে তোলা হয়েছে বিশেষ রীতিকে। রূপক-প্রতীক-চিত্রকল্প-বাকপ্রতিমা কিংবা অনুপ্রাস-উপমা- কোনোটাই বা পাওয়া যায় না সেখানে! আর এসব তো করা হয়েছে আসলে রসের ভাণ্ডারটাই যাতে হয় পরিপূর্ণ। তবে আমার বিবেচনাতে বিপদ সেখানে নয়, সমস্যা হলো, তা জুটছে আপদ হয়ে। আর আপদ বিপদের গল্পটা না বললে, জিনিসটা পরিষ্কার করা যাবে না, বোধ করি। সেটা হলো, কথাটা কতটা সত্য, নিশ্চয় করে বলতে পারব না, তবে যা শুনেছি, তা হলো এই। একবার বঙ্কিমচন্দ্র পরীক্ষা দিচ্ছিলেন মৌখিক। হতে পারে সেটা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেসির। ওসব হতে গেলে তো পরীক্ষা দিতেই হবে! সেখানে এক ইংরেজ সাহেব না কি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বিপদ কি, আর আপদ কি? বঙ্কিমচন্দ্র তার উত্তরে এ রকম বলেছিলেন, রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটলে, সেটা হয় বিপদ, আর আপনি ইংরেজ সাহেব বাংলা শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করছেন, এটা হলো আপদ। এখন এই সংস্কৃত সাহিত্য-সমালোচনারীতি পাঠকদের জন্য কতটা আপদের সৃষ্টি করেছে, তা বয়ান করার জন্যই এই কথাগুলোর অবতারণা।

পাশাপাশি পাশ্চাত্য সাহিত্য-সমালোচনা রীতির খোল-নলচেটাও দেখা যাক। তারা বলেছেন সাবজেক্টিভিটি আর অবজেক্টিভিটির কথা। এতে কি কিছুটা মজা পাওয়া যাচ্ছে না! কবি নিজের কথাটাই বলেন। অন্যের জবানিতে অনেক কথা বললেও তা তার নিজেরই হয়ে যায়। প্রকৃতিগতভাবে দুটো জিনিস আলাদা হতে পারে, কিন্তু যে প্রাবৃত্তিক বিষয়গুলো তার অন্তর্গত বুননে থাকে, তা তো সার্বজনীন। সুতরাং সেখানে একটা ভেদরেখা তৈরি করে অতিরিক্ত জটিলতা আনা কি আদৌ আবশ্যক? এ ছাড়া, রিয়ালিজম, রোমান্টিসিজম, ম্যাজিক রিয়ালিজম, এসব তো আাছেই,- এক্সপ্রেসনিজম, ইমপ্রেস- নিজম, সুররিয়ালিজম, এক্সিসটেন- সিয়ালিম, ডাডাইজম, মার্ক্সিজম ইত্যাদি করতে করতে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়েছে পোস্ট মডার্নিজমে। ইদানীং আরও আরও অনেক তত্ত্বের রপ্তানি, তারাও যেমন উদগ্রীব হয়ে করছে, আমরাও যুগোপযোগী হবার নিরন্তর সাধনায় তা নিতে কার্পণ্য করছি না। বরং তা হয়ে দাঁড়াচ্ছে গর্বের ও গৌরবের। ভূখণ্ডগত সাম্রাজ্যবাদ চলে গেছে, সুতরাং তাদের ভাষায় এটা হলো পোস্ট কলোনিয়াল যুগ। বিশ্বপুঁজির দাসানুদাস হয়েও আমরা তাই আনন্দে বগল বাজাচ্ছি। একদিকে আমরা যেমন নিচ্ছি মুক্তবাজার অর্থনীতির সবক, একই সাথে হয়ে পড়েছি তাত্ত্বিক আগ্রাসনেরও শিকার। এরফলে  পাঠকের জন্য যেটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা হলো স্বতঃস্ফুর্ততা বলে কিছু থাকছে না। কবিতাই বলি আর শিল্প-সাহিত্যই বলি, তারও একটা ভার্জিনিটি আছে। তাতে বাঁধাগ্রস্ততা আনাটাই হচ্ছে এ সবের মূল কাজ। সেট করে দেয়া একটা ফরম্যাটের ভেতর রসানুভূতির আনন্দটাই করে দেয়া হচ্ছে বিনষ্ট। মানুষ তো আগে ভাষা আয়ত্ত করে, ব্যাকরণ-এ লেখা হয় তার নিয়ম কানুন। একজন নিরক্ষরও ভাষার ব্যবহার করে থাকে স্বচ্ছন্দে। শিল্প-সাহিত্যের রস উপভোগের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সে রকম নয় কি?  শিল্প বিচারের রীতিনীতি শিখে তার পর তার স্বাদ নিতে হবে, আসলেই মনে হয় এটা একটা বাহুল্য বিষয়।

বিপদ বোধ করি আরেকটা আছে। শিল্প-সাহিত্যের আলোচনা-সমালোচনা করাটা অনেকের কাছেই পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের একটা বিরাট অছিলা। বিভিন্ন বিজ্ঞজনের মন্তব্য-মতামতাদি কোটেশন আকারে নিয়ে এসে নিজের পাঠ-পরিধির বিপুলতা তুলে না ধরলে যেন কিছুতেই তারা শান্তি পান না। তাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই পাঠক শিল্প-সাহিত্যের অর্থ বুঝে যাবে, সেটা মনে হয় তাদের অসহ্য। কাজেই তাদের চোখ দিয়ে শিল্প-সাহিত্যের আকাশ দেখার লাইসেন্স না পেলে কি চলে? পাঠকদের এতটা মূর্খ ভাবার সত্যিই কোন কারণ আছে?

প্রসঙ্গত একটা কথা বোধ হয় স্পষ্ট করেই বলা যায়, তা হলো, সব কিছুকেই গড়পরতা দেখার প্রবণতা। যেমন নর-নারীর কিংবা যৌন কোনো বিষয় এলেই ফ্রয়েড সাহেবকে টেনে নিয়ে আসা। মানবসমাজের ধারাবাহিকতাকে প্রবহমান রাখার জন্য অন্যান্য প্রাণীর মতই প্রজননই তার প্রক্রিয়া। বিপরীত লিঙ্গদ্বয়ের মিলনই এর প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। অন্যান্য প্রাণীদের এ জন্য ব্রিডিং পিরিয়ড থাকলেও নরনারীর একটা বাড়তি সুবিধা হলো যখন-তখনই ও কাজে লিপ্ত হবার ক্ষমতা। এ জন্য যেটাকে আমরা কামবাসনা বলি, তার অন্ধিসন্ধিরও কোন যেন শেষ নেই। এই সম্পর্কটার ওপরে সমাজে-পরিবারে ক্রমে ক্রমে একটা নৈতিক ভিত্তিও দাঁড়িয়ে গেছে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ পর্যন্ত তার একটা ধরন আমরা লক্ষ্য করি। পরবর্র্তী সময়ে পুরুষতান্ত্রিকতা শুরু হলে তার মাত্রারও বদল হতে থাকে। বিবাহ প্রথার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়াটা বর্তমানে তার একটা, বলা যেতে পারে, চূড়ান্ত পর্যায়। এর ভেতর দিয়ে কাকে বিবাহ করা যাবে আর না যাবে কিংবা কার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত আর অনুচিত, তার একটি সামাজিক অনুশাসনও কঠোরভাবেই পালন করা হয়ে থাকে। কার্যত তা আমাদের প্রবৃত্তিকেও বদলে দিয়েছে। এবং বলা যায়, অসচেতনভাবেই আমরা তা অনুসরণও করে থাকি। কাজেই, আমাদের যৌনতারও যেমন একটি বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে, অনুরূপ ভাবে কালে কালে তার বিবর্তিত চেহারা তৈরিরও কোনো শেষ নেই। সামাজিক মানুষ হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতাকেও একটি কালের ক্যানভাসেই সীমাবদ্ধ করে রাখি। আর তার ব্যত্যয় হলেই সেটাকে ফ্রয়েডিয় বলে বগল বাজাতে হবে, এটা কি কোনো কাজের কথা হয়? কিন্তু সর্বত্রই তাই তো হচ্ছে। আর ফ্রয়েড সাহেবকে সাক্ষী মেনে তার যথার্থতা প্রমাণেও কোনো কার্পণ্য করছি না। তবে এটাও তো সত্যি যে যৌন সম্পর্কের একটা স্টান্ডার্ডকে সামনে রেখেই তিনি তাঁর তত্ত্বকে নিয়ে এসেছেন।

আবার মার্কসেরও ঐ একই অবস্থা। শোষণই বলি আর নির্যাতনই বলি, ব্যক্তিগত সম্পদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবার পর, নানা মাত্রায় তার আকার-প্রকার পরিদৃষ্ট হয়ে আসছে। সম্পদ বণ্টনের বিষমতাও ঘটছে ঐ একই কারণে। তাঁর একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন, সেটাকে অযৌক্তিক বলারও কিছু নাই। তবে এটাও ঠিক, তাঁর ঐ ব্যাখ্যা আসার আগেও যেটাকে শ্রেণিসংগ্রাম বলা হয়, পৃথিবীতে তাও হয়েছে সংঘটিত। অর্থাৎ হ্যাভ ও হ্যাভ নটের লড়াই নতুন কিছু নয়। অত্যাচারিত ও শোষিত মানুষ দুর্বল ও অসংগঠিত হলেও দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার ঘটনা তো ঘটেছে। তখন তারা বিকল্পহীন ভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যেভাবেই দেখুন না কেন, মানবাধিকার একটি মৌলিক জিনিস। এই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও মানব সমাজে নানা সময়ে নানাভাবে এসেছে। অর্থনীতির কথাটা বলা হলেও আসলে তো তা সম্পদেরই পরিপূরক। এবং তা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু সমস্যা হলো এটাকে করে তোলা হয়েছে কেতাবি। সেখানে তৈরিও করা হয়েছে মার্কসের পারসোনালিটি কাল্ট। এই সঙ্গে এটাও পরিহাসের যে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার বাস্তবতার সাথে কোনো সম্পর্ক না রেখেই এই তত্ত্বটাকে ফ্যাসান হিসেবে প্রদর্শন করা হচ্ছে যত্রতত্র।

আমার এ সব কথাকে বাগাড়ম্বর বলেই বোধ হতে পারে। বিশেষ করে শামসুর রাহমানকে নিয়ে কিছু বলার সময় কেন এই প্রশ্নগুলোকে উত্থাপন করছি, আপত্তি উঠতে পারে সেখানেও। কেন না, এই সমস্যা তো শুধু তাঁকে নিয়ে নয়। তবে তাঁকে উপলক্ষ্য করে প্রসঙ্গটি অবতারণা করার অর্থ হলো, তিনি বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। বাংলা কবিতার ইতিহাসচর্চায় পালা বদলের তিনটি সুস্পষ্ট রূপ লক্ষ্য করা যায়। যেহেতু কবিতা লেখাটা কিংবা সাহিত্য করাটা কোন প্রতিযোগিতার বিষয় নয়, প্রত্যেকের প্রত্যেক সৃষ্টিই মৌলিক ও স্বতন্ত্র, এ কারণে অলিম্পিকের হানড্রেড মিটার স্পিণ্টের মতো স্থান নির্ধারণের কোন ব্যাপারও এখানে নেই। কিন্তু বাস্তব বিষয় হলো, সব কবিই সমান ভাবে পঠিত হন না। প্রাতিষ্ঠানিকতার জন্য কিংবা রাজনীতি ও অন্যবিধ কারণেও অনেককেই সামনে ধরে রাখা হয়। অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগে, বিশেষ করে, নতুন একটি প্রযুক্তির দাপট শুরু হয়েছে, আমরা যাকে বলি মিডিয়া। তাকে তো আসলে শাসন করছে পুঁজি। কাকে লেখক বানাতে হবে আর কাকে লেখক বানানো যাবে না, তার সবক যে তারা দিচ্ছেন না, তাও নয়। আর পুঁজি ব্যবহারের প্রধান লক্ষ্য মুনাফা। সুতরাং মুনাফাটা কি সে বেশি আসবে, সে হিসেবটা তো আছেই। বর্তমানে তার ধরনও বদলে গেছে। প্রিন্ট মিডিয়াই আর এখন একমাত্র  মিডিয়া নয়। এক সময় তো লেখ্যরীতির প্রবর্তন হবার পর হাতে লিখে পুথি সংরক্ষণ করা হত। তারপর মুদ্রণ যন্ত্র আবিস্কারের পর তার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হলেও সীমাবদ্ধতা তারও ছিল। গ্রন্থ প্রকাশও এমন কোন সহজ ব্যাপার ছিল না। আপনারাই বলুন, না হলেও লেখা শুরু করার পর প্রায় দেড় যুগের মতো সময় লেগেছিল শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের, কেন? তাঁর তো প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছিল ১৯৪৯ সালে নলিনী কিশোর গুহ সম্পাদিত সোনার বাংলা পত্রিকাতে। তার পর কেটে যায় প্রায় ১১ বছর। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ- প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে। অনেকেই স্টান্টবাজি খুঁজে পেয়েছিলেন নামকরণের মধ্য দিয়ে। যা হোক সেটা তো ভিন্ন প্রসঙ্গ। এই দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর যা সব লেখালেখি, তা তো পত্রপত্রিকার পাতাতেই। আর পত্র-পত্রিকা, যেখানে গল্প-কবিতা ছাপা হতো, তার সংখ্যাই বা কত কম ছিল। কাব্য সংকলনও প্রকাশিত হতো না যত্রতত্র। বিভাগোত্তর কালে ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে নব উদ্দীপনার সূত্রপাত ঘটে। নতুন দেশ। পূর্ববঙ্গ তার একটি প্রদেশ। ঢাকা তার রাজধানী। কলিকাতাকেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যচর্চাতে যারা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন তাদের অনেকেই  এসে স্থিত হতে থাকেন এখানে। তখনকার দিনের বিখ্যাত সাহিত্য পত্র-পত্রিকা যেমন মাসিক সওগাত কিংবা মাসিক মোহাম্মদীরও স্থানান্তর ঘটে। সুফিয়া কামাল, ফররুখ আহমেদ, আবদুল কাদির কিংবা আহসান হাবীবের মত কবিরা- শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দিন, কাজী আফসার উদ্দিন ও শামসুদ্দিন আবুল কালামের মতো কথাশিল্পীরাও বসবাস শুরু করেন। দেশ বিভাগ(১৯৪৭)-এর দুবছরের মধ্যেই একটি উচ্চাভিলাষী কাব্য সংকলন প্রকাশের দুঃসাহসও লক্ষ্য করা যায়। তখনকার হিসেবে তেমন প্রতিষ্ঠিত কবিদের ছাড়াই অপেক্ষাকৃত তের জন তরুণের একাধিক করে কবিতা সংকলিত হয় এতে। নাম দেয়া হয় ‘নতুন কবিতা’। এটি সম্পাদনা করেছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী ও আবদুর রশীদ খান। শামসুর রাহমানের কবিতাও অন্তর্ভুক্ত ছিল তাতে। এর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন পাঠকের দৃষ্টিসীমার মধ্যে। আর এই সংকলনের ভেতর দিয়ে, বলা যায়, কবি হিসাবে তাঁর প্রথম প্রতিষ্ঠা। এর পর তো ঘটে একুশে ফেব্রুয়ারির বিস্ফোরণ। তার পরের বছরেই  এই আত্মত্যাগের অগ্নিঝরা আন্দোলনের স্মারক হিসেবে প্রকাশিত হয় হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারি। তাতেও ছিল শামসুর রাহমানের কবিতা। এটি অবশ্য শুধু কাব্যসংকলন ছিল না। তাঁর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের আগের আরও দুটো প্রকাশিত কাব্য সংকলেনের উল্লেখ করাটা, বোধ করি বাহুল্য হবে না। কেন না, ‘নতুন কবিতা’ তো ছিল নির্বাচিত কবিদের। আর ও দুটো কাব্যসংকলনকে মোটমুটিভাবে প্রতিনিধিত্বমূলক করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তার একটি ছিল মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ও আবু হেনা মোস্তফা কামাল সম্পাদিত ‘পূর্ববাংলার কবিতা (১৯৫৬)। অন্যটি আবদুর রশীদ খান ও মোহাম্মদ মামুন সম্পাদিত ‘প্রেমের কবিতা’। এ সব সংকলন যে,  পাঠকদের চোখ এড়িয়ে যায়নি, সে কথাও বোধ করি বলা যেতে পারে। বলা বাহুল্য এগুলিতেও ছিল শামসুর রাহমানের কবিতা। আর এখন? প্রকাশ-মাধ্যমের সংখ্যাবৃদ্ধির কারণে সব লেখা সব পাঠকের সামনে আসে না। কাজেই সব কবিই যে সার্বজনীন ভাবে সমান গুরুত্ব পান কিংবা পঠিত হন, তাও নয়। তার পরও ধারাবাহিকতার পর্যায় বিবেচনা করলে একটি প্রতীকী ব্যাপার এসে যায়। সেই হিসেবে মাইকেল একটি স্তর, রবীন্দ্রনাথ আরেকটি। তৃতীয় স্তরে যার কথাটি আসে, তিনি জীবনানান্দ। বলা যায়, গত পঞ্চাশ বছর ধরে তাঁর এই ভাবমূর্তি তৈরি হয়ে চলেছে। এর মধ্যেই শামসুর রাহমানও এসে গেছেন। এখন এই প্রশ্ন করাই যেতে পারে, তিনি কি নতুন স্তরের সূচনা করেছেন, কিংবা তা করতে সক্ষম হয়েছেন?

এই প্রশ্নের জবাবটা, বোধকরি, সরাসরি দেয়া যায় না। এ বিষয়ে কোন সরল সমীকরণ করাটাও যথার্থ হবে না। কেননা, এটা ঠিক যে জীবনানন্দও বাংলা ভাষার কবি। শামসুর রাহমানও। কিন্তু কথা হলো, জীবনানন্দ বেঁচে-বর্তে থেকে, জীবনের প্রায় অর্ধ শতাব্দী পার করে, প্রৌঢ় বয়সে বাংলাদেশের ভাগ দেখেছেন। আর শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রে এই ঘটনাটা ঘটেছে যৌবনে প্রবেশ করার পর। জীবনানন্দ তাঁর মৃত্যু-পূর্ববর্তী কাল যে দেশে কাটিয়েছেন, সেটা বাংলাভাষী অঞ্চল হলেও সাংবিধানিক ভাবে তা তাঁর জন্মভূমি ছিল না। শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রে অবশ্য তা হয়নি। তিনি জন্মভূমিতেই থাকতে পেরেছিলেন। যে রাজনীতির জন্য এই ভাগাভাগি হয়েছিল, আপাতঃদৃষ্টিতে তো বটেই, কার্যতও তাতে দুজনের কারও কোন দায় ছিল না। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগ পাকিস্তান ইস্যুতে নির্বাচন করেছিল। ইলেকটরাল কলেজ ছিল সেপারেট। জীবনানন্দের সেখানে ভোট দেবার সুযোগ ছিল না। আর শামসুর রাহমানের তো ভোটাধিকার প্রাপ্তির বয়সই হয়নি। কিন্তু কোনো দায় না থাকলেও ভোগ তো করতে হয়েছে দায়ভার। দুজনকে হতে হয়েছিল দুই রাষ্ট্রের অধিবাসী। যতই বলা হোক, ‘নানান বরণ গাভীরে তার একই বরণ দুধ, জগৎ ভরমিয়া দেখলাম আমি একই মায়ের পুত’-কিন্তু রাষ্ট্র যখন আলাদা হয়ে যায়, আলাদা হয়ে যায় তার ভাষাও। তার দর্শন., তার ফোকাস,- সভরেইনটি বলে একটা কথা আছে না? ধর্মীয় ভাগাভাগিটাই এখানে ছিল প্রধান। সাংবিধানিক ভাবে যাই থাক, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে তাদের কালচারটাই হয়ে উঠবে মুখ্য- এতে আর আশ্চর্যের কি আছে? আর পাকিস্তানে আইনমন্ত্রী ‘হিন্দু’ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল হলেও সেটাকে তো বানাতে হবে ‘ইসলামিক রিপাবলিক’। পূর্ববঙ্গের মুসলমানেরা এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রায়শ্চিত্ত করলেও, শামসুর রাহমান নিজে তার অংশীদার হলেও, বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতটা আর এক থাকেনি দুদেশেরই বাঙালিদের জন্য। একটি দেশ, শত সীমাবদ্ধতা নিয়েও গড়ে উঠতে সচেষ্ট ছিল একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে। আর অন্য দেশে? চলেছে সামরিকতন্ত্র আর সামরিক শাসন। কাজেই, জীবনযাপন থেকে শুরু করে উৎপাদন ব্যবস্থা- সর্বত্রই তৈরি হয়েছে ভিন্নতা। চাওয়া-পাওয়ার মাত্রাও গেছে বদলে। আর ভাষা- যা জীবনের প্রকাশিত রূপেরই প্রতিচ্ছবি, তা কি থাকতে পারে এক রকম?

ব্যক্তি অনুভূতি কিংবা সমাজ-মানসের গড় কিংবা রাজনৈতিক ও অন্যান্য উচ্চাভিলাষ, তাও ভিন্ন হতে বাধ্য। আবার  সমাজ অনুশাসনের শৃংখলা কিংবা নৈতিকতা-অনৈতিকতার বোধ প্রাবৃত্তিক ফরম্যাটটাকেও করে দেয় ভিন্ন। এজন্য সাধারণ ভাবে নরনারীর সম্পর্ক ও কামবাসনার তীব্রতা যতই থাক, তার ডাইমেনসনও হয়ে যেতে পারে আলাদা। কাজেই ভিন্ন ভাষায় লেখা না হলেও- ভাষাগত কোনো পার্থক্য না থাকলেও, হৃদয়ানুভূতির প্রকাশ কিংবা অভিজ্ঞতার রূপায়ণ যে একই রকম হবে, তার আশা করাই তো অন্যায়। যদিও আমরা জানি, মানবিক প্রবৃত্তিগুলো, যেমন প্রেম- ভালবাসা-মায়া-মমতা-সেবাপরায়ণতা কিংবা ঘৃণা-জিঘাংসা- অসুয়াবৃত্তিগুলো, মানুষের লাল রক্তের মতই সার্বজনীন, কিন্তু তার প্রকাশের ক্ষেত্রমূহও এ রকম বাস্তব কারণেই আলাদা হয়ে যায়। এটা যে আরও কত স্পষ্ট, তা তো বোঝা যায় পশ্চিমবঙ্গের শক্তি চট্টোপাধ্যায় কিংবা শংখ ঘোষ, যদিও তাঁদের কবিতা নিয়ে আমরা অনেকেই বেশ গদগদ, সেই সব কবিতার সাথে এখানকার সৈয়দ শামসুল হক কিংবা হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতা পাশপাশি রাখলে। সানাউল হক কিংবা বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের কথা নাই বা বললাম। শামসুর রাহমানের সাথে জীবনানন্দের এ ধরনের তুলনা অবশ্য সরাসরি করা যায় না। জীবনানন্দ বেঁচে থাকতেই তিনি কবিতা লেখা শুরু করলেও কবি হিসেবে তাঁর পূর্ণতা এসেছে পরে। শামসুর রাহমানের, বিশেষ করে তাঁর প্রথম দিকের কবিতায় জীবনানন্দের প্রভাবের কথাটিও অনেকে বলে থাকেন। এ রকম প্রভাবও, আমার মনে হয়, পূর্ববর্তী অনেক কবিরই পরবর্তী কবিদের ওপর থাকে। রবীন্দ্র অনুসারী কবি বলতে যেমন আমরা সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে কালিদাস রায়, যতীন্দ্রমোহন বাগচীসহ অনেকইে বুঝে থাকি, কিংবা নজরুল অনুসারীর কবি বলতে যেমন বেনজীর আহমদ, মঈনুদ্দিন, আবদুল কাদির, শাহাদৎ হোসেন প্রমুখদের বলি, এখানে বিষয়টা অবশ্যই সে রকম নয়। ভাষা এক- ভৌগলিক অবস্থানও কোনো পৃথক কিছু নয়- ঐতিহ্য- ইতিহাসের ধারাবাহিকতাতেও অবগাহন একই সাথে। সুতরাং বিষয় ও ভাবে কিংবা চিত্রকল্প সৃষ্টিতে সমিলতা আসতেই পারে। তবে মোদ্দা কথা হলো,  ইংরেজি ভাষার সাহিত্যের ক্ষেত্রে যেমন দেখা যায় বৃটিশদের রচনা থেকে আমেরিকানদের রচনা আলাদা, অষ্ট্রেলিয়ানদের যেমন আলাদা, এমন কি বংশগতভাবে অ-ইংরেজি ভাষীদের লেখা যেমন আলাদা, তেমনই বাংলাদেশের লেখকেরাও পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের চেয়ে স্বতন্ত্র জগৎ নির্মাণ করে চলেছেন। এই হিসেবে জীবনানন্দ পর্যন্তও বাংলা কবিতার একটা পর্যায় যেমন সৃষ্টি হয়েছে, শামসুর রাহমানে এসে তার পালাবদলের বেলাতেও কোন অন্যথা নেই। কাজেই, ও ভাবে মিল খুঁজে কিংবা তুলনামূলক বয়ান সৃষ্টি না করে সাহিত্যের সার্বজনীনতার বিষয়টিকেই কেবল মুখ্য করা যেতে পারে। তার কারণ, সাহিত্যই বলি আর কবিতাই বলি, তা যে দেশেরই হোক আর যে ভাষারই হোক, তাতে মানবীয় প্রবৃত্তিজাত বিষয়টিই শেষ পর্যন্ত দেশ ও কালের সীমা অতিক্রম করে যায়। তাতে যে সৌন্দর্যের দ্যুতি স্ফুরিত হয়, তা কোন বিশেষ গ-ীর মধ্যে সীমাবদ্ধও থাকে না। শেষাবধি তা হয়ে ওঠে মানবজাতিরই মানসসম্পদ। কবে লেখা হয়েছে রামায়ণ-মহাভারত কিংবা ইলিয়াড-ওডেসি? বিশেষ কালের কিংবা বিশেষ স্থানের হলেও, এই এত দিন পরে এসেও তার রস উপভোগের কোনো ব্যত্যয় হয় কি? হেলেন কিংবা দ্রৌপদীকে কি মনে হয় তারা অনাত্মীয়?

কথাগুলো বলছি এজন্যই যে শামসুর রাহমানকে নিয়েও অনেক লেখালেখি হয়েছে। সে সব লেখালেখিতে তাত্ত্বিক আগ্রাসনও, বোধ করি, এমন কিছ’ কম হয়নি। কথাটা আবারও বলছি এ কারণে যে দীর্ঘদিন আমরা বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিলাম। কালে কালে ভারতবর্ষে বহিরাগতরা এসেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতারও অধিকারী হয়েছে। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে ইসলাম ধর্মের অনুসারী বিভিন্ন জাতির মুসলমানের কথাটা বিশেষ ভাবে বলা যায়। তবে সিন্ধুদেশে মুহম্মদ বিন কাসিমের মুসলিম বিজয়ের পর  কোন দীর্ঘস্থায়ী শাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ভারতবর্ষের সম্পদের একটা আকর্ষণ ছিল। সুলতান মাহমুদও, জনশ্রুতি মোতাবেক সতের বার ভারত লুণ্ঠন করেন। কিন্তু কোন স্থায়ী অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপার তাঁরও ছিল না। দ্বাদশ শতাব্দীতে মহম্মদ ঘোরীই, বলা যায়, ভারতকর্ষে তাঁর অধিকৃত অঞ্চল শাসনের জন্য শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর ‘ক্রীতদাস’  কুতুব উদ্দিন আইবেককে ভার দিয়েছিলেন দিল্লি ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকা শাসনের। ঘোরির মৃত্যু হলে কুতুব উদ্দিন শাসন কার্যে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন সার্বভৌমত্বের। এ ভাবে দিল্লি থেকে মুসলিম শাসনের শুরু হলেও, শাসন কার্যে পরিবারতন্ত্রের পরিবর্তন হলেও, ধীরে ধীরে আসমুদ্র হিমাচলই তাদের শাসনভুক্ত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বৃটিশ অধিকার শুরু না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক ক্ষমতারও অধিকারী ছিল তারাই। প্রায় সাতশ বছরের এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন জাতির ভাগ্যান্বেষণে আসা বহিরাগত মুসলমানেরা আর ফিরে যায়নি। এ ভাবে তারা যেমন রূপান্তরিত হতে থাকে এ দেশের স্থায়ী অধিবাসীতে, অনুরূপ ভাবে স্থানীয় অধিবাসীদের ধর্মান্তর প্রক্রিয়াও চলতে থাকে। এই প্রক্রিয়াতে, হয়ত কিছু, সামাজিক সমস্যাও রয়েছে, তা হল আরব-ইরান থেকে আসার অহেতুক জাত্যাভিমানের অহমিকা। তবে সেটা তো ভিন্ন জিনিস। কিন্তু বৃটিশদের ব্যাপারটা তেমন ছিল না। কখনই তারা এ দেশকে নিজেদের মনে করেনি। এ কারণেই তাদের শাসন ছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসন। তাদের অধীনে ভারতবর্ষ ছিল পরাধীন। আর তাদের এই সাম্রাজ্যবাদ ছিল ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি উপজাত। এটি আসলে ছিল নতুন ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থা, যার সাথে এ দেশের অধিবাসীদের পূর্ব পরিচয় ছিল না। একটি কৃষিভিত্তিক দেশে পুঁজি সংগঠনের ক্ষেত্রে এই মৌলিক পরিবর্তন যে নতুন সামাজিক শ্রেণি জন্ম দিতে থাকে, তার ফলাফল তো ভিন্ন রকম হবেই। সুতরাং  এ কথা স্বীকার করে নিতে কোন দ্বিধা থাকা উচিত নয় যে তাদের এই ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার অবস্যুট থেকেই আমাদের দেশে যে উৎপাদন ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে, তারই ধারাবাহিকতা এখনও আমরা বহন করে চলেছি। আমাদের যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, আইন-আদালতের অর্থাৎ জীবনযাপনের রাষ্ট্রীয় সব ধরনের কার্যক্রমেই তারই আদল প্রতিফলিত। ইউরোপিয় রেঁনেসা থেকে আহরিত কিছু আদর্শবাদও আমরা পেয়েছি। মৌলিক অধিকার- মানবাধিকার- এগুলো তো আছেই- ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং আরও যত স্বাধীনতার লাইসেন্স আছে, সবই সেখান থেকে নেয়া। শিল্প-সাহিত্যের নতুন আদল, তার বিচার-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ-বাদ নেই এ সবও। আমার এত কথা বলার উদ্দেশ্য, সেখানে তাত্ত্বিক আগ্রাসনও এ ভাবেই এসেছে। এবং এই আসাটা অব্যহতও রয়েছে। কেন না, আমাদের দেশটা এখন ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিরই সম্প্রসারিত রূপ- বিশ্বপুঁজির দ্বারা শৃংখলিত। এই কাজটা তো করা হচ্ছে স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই। না হলে যে ইউরোপিয় রোমাণ্টিকতাকে রবীন্দ্রনাথ দেশীয় ছাঁচে ফেলে নিজেদের করে দিয়েছিলেন, তাকেই অস্বীকার করার নামে প্রথম মহাযুদ্ধ পারবর্তীকালে, যাদের আমরা তিরিশের কবি বলে মালা পরিয়ে রেখেছি, তারা- ভাবখানা এই যে ‘আন্তর্জাতিক’ হয়ে পড়লেন। ঠিকই আছে, সাহিত্যেরও নেই কোন দেশ ও কালের সীমা, তার সার্বজনীন মর্মটাকে আত্মস্থ করাও একটা বড় কাজ। কিন্তু পাশ্চাত্যের ইনডাস্ট্রিয়াল সোসাইটির ভাইসেসগুলো থেকে যা সৃষ্টি হয়েছে, আমাদের এখানে যা একবারেই অনুপস্থিত, গ্রহণ করতে হবে কি তা সমাদরে? এই যে সুররিয়ালিজম, এক্সিসটেনসিয়ালিজম কিংবা ডাডাইজম- নিহিলিজম, যে সম্পর্কে আগেও কিছু বলেছি, তা, বলতে পারেন, আমাদের জন্য কোন অর্থে পজিটিভ? ঔপনিবেশিকতা তো নতুন ফর্মে এখনও আছে, সেটাকেই ঔপনিবেশিকরা উত্তর ঔপনিবেশিকতা বলে পোস্ট মডার্নিজমের স্লোগান তুলেছে, তারই বা বাস্তবতা কি? আমাদের দেশের একটা বড় অংশের মানুষ, প্রতীকি অর্থেও বলা যেতে পারে, এখনও মাটির সানকিতে ভাত খায়, সে দেশের রাজধানী ঢাকা শহরে বসে নিউইয়র্ক কিংবা প্যারিসের হৃদস্পন্দন কল্পনা করা যেতে পারে, কিন্তু তার বাস্তব ভিত্তি কোথায়?  তাই শামসুর রাহমানকে যখন আমরা নাগরিক কবি বলি, তার অন্তর্বয়ন কি হতে পারে? আসলেই তো তাঁকে নাগরিক কবি বলাও হয়েছে। এটা ঠিক যে মধ্যযুগ পর্যন্ত রাজার বসবাস রাজধানীকে ঘিরে পল্লীজীবনকেন্দ্রিক জীবন যাত্রাতে ছেদ পড়ত। রাস্তাঘাট, বিপণীবিতান, সুরম্য অট্টালিকা, পোষাক-পরিচ্ছদের আড়ম্বর, ঢাল-তলোয়ারের মহড়া, নাট্যশালা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন, বিলাসী জীবনযাপনের ব্যবস্থা, এমন কি নৃত্য-গীত পটিয়সী গণিকাদের প্রলুব্ধকর কামকলা- এ সবই ছিল তখনকার প্রচলিত অর্থে সাধারণ মানুষের আয়ত্তাতীত। তাই বলে তা যে নগর জীবনের চালচিত্র, তা তো নয়। ইউরোপের বেলাতেও তা যে অন্য রকম ছিল, বলা যাবে না তাও ঠিক। শিল্পজাত পণ্য উৎপাদনের সূত্রে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণই সেখানে সূচনা করে নগরায়নের। নানা শ্রেণির পেশাজীবী মানুষের ঘটতে থাকে আবির্ভাব। ভাঙতে থাকে পারিবারিক বন্ধন। সামাজিক শৃংখলাও হয়ে যেতে থাকে নড়বড়ে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে যায় হৃস্পন্দনের দ্রুততা। আমাদের দেশেও ইউরোপিয় বিশেষ করে ইংরেজ বণিকদের ব্যবসা-ঘাঁটি ও প্রশাসনিক কেন্দ্রস্থলগুলিতে একই ব্যাপার ঘটে। কিন্তু নগরায়নের স্পিরিট কার্যকর হয় না যথার্থভাবে। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট সংগ্রহ করলেই যেমন লোকে শিক্ষিত হয় না,- ধোপদরস্ত কাপড়চোপড় পরলেই যেমন ভদ্রলোক হওয়া যায় না, ব্যাপারটা অনেকটা সে রকমই। কাজেই পুরো ব্যাপারটাই যেন না শহর, না গ্রাম- এ রকম একটা আধা খেচড়া অবস্থা। শহরে জীবনযাত্রার উপকরণ বেড়েছে, প্রযুক্তিগত পারফেকশনও। কর্মসংস্থানের তাগিদ থেকে ধেয়ে আসছে লোকে। কিন্তু নাগরিক কতটুকু হচ্ছে, সমাজতত্ত্ববিদগণ নিশ্চয়ই তার একটা পরিমাপ করতে পারবেন। নির্দিষ্ট করে ঢাকা শহরের কথাই বলি, শামসুর রাহমানও সারা জীবন এই ঢাকা শহরেই কাটিয়েছেন, কিন্তু শুদ্ধমাত্র এখানে বসবাসকারী মানুষজনের জীবনযাত্রার ছবি, তাদের আনন্দ-বেদনা, দুঃখ উল্লাসের চালচিত্র, পচা নর্দমার দুর্গন্ধের কথাও বলা,Ñ এ সবই কি কেবল তাঁকে নাগরিক কবি বলতে অনুপ্রাণিত করবে? আমাকে ভুল বোঝার কোন অবকাশ নেই। কেন না, আমি জানি, একজনের নাগরিক কবি হওয়া, না হওয়া দিয়ে তার উৎকর্ষের বিচার হয় না। যে বিষয় নিয়েই তিনি কবিতা লিখুন, সেই বিষয়ের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তাতে কতটুকু ধরা পড়েছে, রস সৃষ্টিতে তা কতটুকু উপভোগ্য হয়েছে, সেটাই মূল। আমার বিবেচনায়, তাঁর এ জাতীয় কবিতায় যা এসেছে, তা জীবনযাত্রার ট্রানসফরমেশনের একটা রূপ। আমাদের জীবন ভাঙচুড়ের এটাও একটা ঐতিহাসিক পর্যায়। আমরা এটাকেও অস্বীকার করতে পারি না। কাজেই তাঁকেও অবমূল্যায়িত করার কোনো সুযোগ নাই।

আরেকটি বিষয় হল, মানুষের সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের নানা পর্যায় রয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তির পরিচর্যা ও নান্দনিক অনুভূতির সমবায় এই পর্যায়গুলিকে করে তুলেছে আলাদা আলাদা। ভৌগলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক কারণে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দেহগঠন থেকে তারতম্য ঘটেছে সাংস্কৃতিক উপাদানেরও। তবে এগুলির কোনটাই কোন স্থায়ী বিষয় নয়। বাংলা ভাষার বিকাশ, বাঙালি জনগোষ্ঠী ও তার রাষ্ট্র ব্যবস্থাও এর অন্তর্ভুক্ত। ভাষিক জনগোষ্ঠী হিসেবে শুধু বাঙালি নয়, পৃথিবীর অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য। এই স্পিরিটকে আমরা সাধারণভাবে বলি জাতীয়তাবাদ। গত ন্যূনধিক তিনশ বছর ধরে সারা পৃথিবীব্যাপীই এসেছে এই জোয়ার। মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ থেকে শোষণমুক্তির স্লোগানও জাতিবর্ণধর্ম নির্বিশেষে সর্বহারা মানুষকে এখনও পর্যন্ত এর বাইরে নিয়ে যেতে পারেনি। বরং রাশিয়া-চীনসহ বিভিন্ন দেশে এর প্রয়োগ ঘটেছে জাতিগত ভাবেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে হিটলার জাতীয়বাদের যে ভয়াবহ রূপ দেখিয়েছেন, তাও এটাকে বিনাশ করতে পারে নাই। আর এটাও বলা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয়তাবাদের সাথে বাঙালীর আবেগগত সম্পর্কেরও কোন তুলনা নাই। এই ইতিহাসটাও আমরা সবাই জানি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত(১৯৪৭) হবার পর বাঙালি পুঁজি বিকাশের একটা প্রশ্ন অনিবার্য ভাবেই এসে যায়। তখন নিজেদেরকে একতাবদ্ধ করার জন্য নিজস্ব সংস্কৃতির দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আর ভাষাই ছিল এই সংস্কৃতির মূল উপাদান।  সুতরাং ভাষাকে কেন্দ্র করেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা। তা হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণের হাতিয়ার। ধর্মীয় অসাম্প্রদায়িকতা থেকে নিজেকে কেবল বাঙালি বলে ভাবা নয়, ধর্মব্যাখ্যার রাজৗনতিক ব্যবহার ও তার  অপপ্রয়োগ কাটিয়ে চিন্তার মুক্তি ঘটানোটাও সেখানে কাজ করে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে। শামসুর রাহমানের তো তখন, বলা যায়, যৌবনকালের শুরু। বাঙালী জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি হিসেবে তাতে তাঁর সংযোগ স্থাপন করাটাও তাই অস্বাভাবিক বলে ভাবার কোন কারণ নেই। তা ছাড়া, এমনিতেও, একজন কবি তার লেখার উপাদান সংগ্রহ করেন তার নিজস্ব জগৎ থেকে। জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক চেতনা, ঐতিহ্য নির্ভরতা, সামাজিক অনুশাসন ও নৈতিক দর্শন ও একই সাথে পারিবারিক উত্তরাধিকারÑ সবই তার মানস জগতে হয়ে থাকে বিমূর্ত। মিথোলজিকাল উপাদান যেমন সেখানে খেলা করে আলোছায়ার মতো, যুগধর্মের প্রভাবও কার্যকরী হয় সমান ভাবে। সমকালিনতা দ্বারা গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানের এক কাটাকুটি খেলা নিরন্তর তাকে করে রাখে আচ্ছন্ন। এটা সত্য সব কবিরই জন্য। শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। সমষ্টিগত মানুষের এক জন হিসেবে লালিত-পালিত হয়েছেন একটা বিশেষ জনগোষ্ঠীতে। তার প্রবহমান সংস্কৃতিতে তাকে অবগাহন করতে হয়েছে। তার অধিকারচ্যুতি তঁকে যে ভাবে পীড়িত করেছে, তার স্বপ্ন ও উচ্চাভিলাষও তাঁকে উদ্দীপ্ত করেছে সমান ভাবে। অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম যেমন তাঁকে আলোড়িত করেছে, ভাষা-সংস্কৃতির বিকাশ নিরুপদ্রব রাখার বাসনাও থেমে থাকেনি তার সঙ্গে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটিও হয়ে উঠেছে জরুরি। তিনি বন্দি শিবিরে থাকলেও তাঁর মনের এই অনির্বাণ শিখা প্রজ্বলিত থেকেছে সর্বদা। একটি স্বাধীন দেশের মানুষ হওয়া যে কারও জন্যেই বড় সৌভাগ্য। শামসুর রাহমানও অধিকারী হয়েছেন সেই সৌভাগ্যের। তাঁর আরও সৌভাগ্য যে সশস্ত্র মুক্তিঙুদ্ধের ভেতর দিয়ে তিনি অভ্যূদয় দেখেছেন এই দেশের। আবার যে আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য এত রক্তগঙ্গার প্রবাহ, তার অবমূল্যায়ন তাঁকে করেছে আহত। মৌলবাদী আক্রমণের শিকার হওয়াটাও যেন হয়েছে তাঁর নিয়তি। উদ্ভট উটের পিঠে স্বদেশ যেন না চড়ে- তিনি তাও তো চেয়েছেন। এখন কথা হল, কি রয়েছে তাঁর এই দায়বদ্ধতার পেছনে। বলতে হবে অবশ্যই তা দেশপ্রেম। একটি দেশকে নিজের বলে ভাবা। আর প্রত্যেকেই দেশকে নিজের বলে ভাবে বলেই, এটা এখন জনগণের। কনসেপ্ট হিসেবে জাতীয়বাদের মতো এই বিষয়টাও নতুন। বলা যেতে পারে জাতীয়তাবাদেরই পরিপূরক। জাতির জন্য দেশ দরকার। সেই দেশের প্রতি যদি প্রেম না থাকে, তবে সেই দেশই বা টিঁকে থাকে কি করে? বৃটিশ ঔপনিবেশিকতার শুরুতে অন্যান্য আইডিয়ার সাথে এটিও আহরিত হয়েছে। তাদের কাছে দেশ অবশ্য ফাদারস ল্যান্ড অর্থাৎ পিতৃভূমি। আমরা বলি মাদারস ল্যা- – মানে মাতৃভূমি। বামাশক্তির এই দেশে এটাই স্বাভাবিক।   এক সময় তো বিষয়টা এ রকম ছিল না। রাজা-বাদশাহেরা যখন তলোয়ার ঘুরিয়ে রাষ্ট্র বানাতো, তখন তাকে নিজের বলে ভাবা যেত কি? আর ভাবলেও তা কি নিজের হত? জনশ্রুতি আছে যে পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজদ্দৌলার সৈন্যরা ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধ করছে, আর বাংলার কৃষকেরা তা দাঁড়িয়ে দেখছে। দেশের সঙ্গে ইমোশনাল অ্যাটাচমেণ্ট থাকলে, তা কি সম্ভব? সিরাজদ্দৌলাই বলি আর মীর কাসিমই বলি কিংবা টিপু সুলতানের কথা নিয়ে আসি, আসলে এঁরা তো জাতীয় বীর হয়েছেন দেশপ্রেমের দীক্ষা গ্রহণের কালে। কবি-লেখকেরাই তাদের তা বানিয়েছেন। নজরুল যদি অমন করে না বলতেন :

বৃথাই গেল সিরাজ টিপু মীর কাসিমের প্রাণ বলিদান

চণ্ডী নিলি যোগমায়া রূপ বললে সবাই বিধির বিধান

হঠাৎ কখন উঠল ক্ষেপে বিদ্রোহিনী ঝাঁসির রাণী

ক্ষ্যাপা মেয়ের অভিমানেও এলি না তুই মা ভবানী।

(আনন্দময়ীর আগমণে)

– তবে কি প্রতীকী অর্থে তাদের জাতীয় বীর বলে ধারণ করা সম্ভব হত? এই কবিতা লিখে তিনি জেলে পর্যন্ত গিয়েছিলেন। শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের নাটক বা এই রকম আরও আরও লেখাই তো জাতীয় জীবনকে করে তুলেছে প্রমূর্ত। শামসুর রাহমানও ঐ একই কাজ করেছেন। তবে একই সঙ্গে এটিও একটি স্পর্শকাতর বিষয় যে এই দেশপ্রেমকে কি আমরা অটুঁট রাখতে পারব? পাকিস্তানি আমলে যে পরিপ্রেক্ষিত জনগোষ্ঠীকে মুক্তির আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছিল কিংবা সামরিক শাসন ও সামরিকতন্ত্রের সময়ে দেশের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য হয়ে পড়েছিল বিপর্যস্ত কিংবা যে ভাবে পশ্চাৎমুখিতা জনমানসের ওপর চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চলছিল, যা প্রকারান্তরে উজ্জীবিত করে রাখত দেশপ্রেমকেই। কিন্তু বিশ্বপুঁজির প্রত্যক্ষ মদদে ভোগবাদী সমাজ যেভাবে সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে, তাতে করে দেশপ্রেমের আবেগটাকে কি ভাবে ধরে রাখা যাবে, এটা একটা বড় সমস্যা। অন্যদিকে বঙালি জনগোষ্ঠীর মাইগ্রেসান অর্থাৎ অ-বাংলাভাষী দেশে বসবাসের ব্যাপারটাও থেমে নেই। তাই ভবিষ্যৎকালে কবি হিসেবে শামসুর রাহমান ইতিহাসের উপকরণ হয়ে থাকবেন কি না, তা নিয়ে ভাবাটা কি  একেবারেই অযৌক্তিক?

তদুপরি প্রত্যেক ভাষারই একটা সামাজিক উপযোগিতা আছে। এই সামাজিক উপযোগিতা তৈরি হয় সেই ভাষায় যে মানুষেরা কথা বলে, তাদের অর্থনৈতিক সামর্থ. শিল্প-পণ্য উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, রাজনৈতিক গুরুত্ব ও জ্ঞান-বিজ্ঞান- শিল্প-সাহিত্য- দর্শনের বিস্তারের ওপর ভিত্তি  করে। এক সময় যে ইংরেজি ভাষা ইংলিশ চ্যানেল পার হত না, সেই ইংরেজি ভাষা এখন দাপট দেখাচ্ছে পৃথিবীময়।  বলা হতো, মহারাণি ভিক্টোরিয়ার রাজত্বে সূর্য অস্ত যায় না, তার অর্থ এটাও ছিল যে সূর্যালোকের মতোই ইংরেজি ভাষাও সে সব জায়গায় প্রচারিত হত। এখন তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অধিকাংশ ধনী দেশ, যাদের ভাষা ইংরেজি, যাদের কাছে তাবৎ দরিদ্রই বলি আর, সম্মান দেখিয়ে উন্নয়নশীল বলি, এ রকম প্রায় সব দেশকেই ভিক্ষা করে খেতে হয়। আর ভিক্ষা করতে হলে তাদের ভাষাও তো শিখতে হবে। এ ভাবেই তারা গড়ে তুলেছে এক ভাষিক সা¤্রাজ্য। এটাও যে একটা শোষণমূলক ব্যবস্থা, তা কি বলে দেয়ার কোন ব্যাপার আছে? বাংলা ভাষা তবু তো একটা রাষ্ট্রের ভাষা। এটা সম্ভব হয়েছে বাঙালি একটি ভাষাভিত্তিক জাতি বলেই। পাশের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের কথা ভাবুন। অনেক গল্প-কবিতা উপন্যাস, সন্দেহ নেই, সেখানে লেখা হচ্ছে। কিন্তু কত দিন? অবাঙালি পুঁজির অনুপ্রবেশ সেখানে যে ভাবে ঘটছে, তাতে সেখানের বাঙালিরা তাদের মেরুদ- সোজা রাখতে পারবে কি না, সেটা তো প্রায় ফেট অ্যাকোমপ্লির মতো ব্যাপার। যা হোক, শামসুর রাহমান সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে এ সব লেখা, অনেকের কাছেই বোধ হতে পারে, অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু এগুলো তো সামগ্রিক ব্যাপার। ভাষা যদি জীবন্ত না থাকে, তবে কেই বা তার কবি আর কেই বা তার লেখক, সে হিসাব নেবে কে? সুতরাং এক জন কবিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, শামসুর রাহমানকেই বাঁচিয়ে রাখার জন্য ভাষা-পরিচর্যার ভিত্তিটাকেও নিখাদ করে তোলাটা প্রয়োজনীয় নয় কি?

কাজেই, এ সব আলোচনা-পর্যালোচনা থেকে শামসুর রাহমানের কবিতার বিষয় কিংবা উপাদান-উপকরণ সম্পর্কে যাই বলি না কেন, তার বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রচলিত তাত্ত্বিক আদর্শ অনুসরণ  কোন কাজের কথা নয়। কোন বিশেষ বিশেষণের মধ্যে বন্দী করে দেয়াটা তাঁর সামগ্রিক পরিচয়কেই করে তোলে বাঁধাগ্রস্ত। এটা ঠিক যে একজন কবি তাঁর ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তুলবেন, জীবনের সমকালীন প্রসঙ্গগুলিও তাতে বিমূর্ত হবে, সমাজের প্রতি-মানুষের প্রতি-জাতির প্রতি তাঁর যে দায়বদ্ধতা, তাকেও তিনি অস্বীকার করবেন না, রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে প্রেম-ভালবাসা-ঘৃণা-জিঘাংসা প্রভৃতি মানবিক প্রবৃত্তিগুলোর রূপায়নও সেখানে অনুচ্চারিত থাকবে না- এক কথায় জীবনের বস্তুসত্তা ও ভাবসত্তা, দুয়েরই সমীকরণ ঘটবে সেখানে। কাল তার অবলম্বন, তাকে অতিক্রম করে যাওয়াটাই তার কবিত্ব। সেখানে তার আত্মার স্ফূর্তি যেমন থাকবে,ক্ষরণও একই ভাবে হবে পরিদৃশ্যমান। শামসুর রাহমানের কবিতাতে তা কি ভাবে আছে, আসলে তাই দেখার বিষয়। আর একটি কথাও প্রাসঙ্গিক যে কবিতার নানা বিষয় কিংবা তা প্রকাশের রীতি তো  একটি বস্তুগ্রাহ্য অবলম্বন। যেমন তিনি প্রেমের কবিতা লিখেছেন কি না? নরনারীর সম্পর্কের বিচিত্র মাত্রা- অনুরাগ কিংবা বিরাগের, কি ভাবে ফুটে উঠেছে তাতে; তাদের জীবনের আদিম প্রবৃত্তি- যৌনতাকেই বা কি ভাবে দেখেছেন? মিলন কিংবা বিরহ,- কোনটা পেয়েছে স্থায়ী ভাব? নরনারীর পরস্পরের বিশ্বস্ততা কিংবা বিশ্বাসঘাতকতা- কোনটাকে তাঁর মানসিক প্রবণতায় উঠেছে প্রধান হয়ে? মানবেতর প্রাণীদের  কতটুকু স্থান রয়েছে সেখানে। প্রবৃত্তিগত এই বিষয়গুলি তো আছেই। এর সঙ্গে প্রকৃতির রূপায়ণই বা তাঁর জীবন চেতনার সঙ্গে কি ভাবে মিলেছে? সমভূমির এই দেশ বাংলাদেশ,- তার বিস্তৃত শস্যক্ষেত, জোৎস্নাপ্লাবিত রজনী, মেঘভাঙা চাঁদের লুকোচুরি, প্রবাহিত নদীর স্রোতে কিংবা মৃতনদীর জলের শীর্ণ ধারা ও বালুময় চর, আকাশ জোড়া বৃষ্টি, জলসিক্ত পুষ্পের মাধুরী, ফসল কাটা রিক্ত মাঠ, বন্যার তোড়ে ভেসে যাওয়া ঘরবাড়ি- গবাদি পশু- এ সব যা আমদের নিত্যদিনের সঙ্গী। তার পর তো রয়েছে আমাদের জীবন সংগ্রামের স্বেদসিক্ত চালচিত্র। ব্যক্তিক ও সমবায়ী জীবনের ঊল্লাস কিংবা হতাশা। প্রাপ্তি কিংবা অপ্রাপ্তির বেদনা। সামাজিক ও রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা ও উচ্চাভিলাষ। ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর রক্তঝরা পথ অতিক্রমের ভাষ্য। আর তার প্রকাশই বা ঘটেছে কি ভাবে? যে ভাষায় আমরা মনোভাব প্রকাশ করি, বাক্য তার ন্যূনতম একক। শব্দ তার উপকরণ। এই শব্দ ব্যবহার কিংবা বাক্য বিন্যাস- তাতে অভিনবত্ব কতটুকু আছে, কিংবা তৈরি করেছেন কতটা মৌলিকত্ব, আর তা করে পাঠকের কাছে অসাধারণত্ব ফুটে উঠেছে কিভাবে?

শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রে একটা কথা তো বলাই যায়, তা হল একই বৃত্তে তিনি ঘুরপাক খাননি। আমাদের অধিকাংশ কবি, যারা আমাদের খুবই প্রিয়- যাদের কথা আমরা প্রায়শই উচ্চারণ করে থাকি- যাদের কবি প্রতিভার সত্যি সত্যি বিকল্পও নেই, তারা যে বৃত্ত রচনা করে বিখ্যাত হয়েছেন, হয়ত সেই খ্যাতির কারণ বিবেচনা করে তার বাইরে যাননি, পাছে হারিয়ে ফেলেন পাঠকপ্রিয়তা। অথবা তার বাইরে যা লিখেছেন, তা শুধু লেখার জন্যই লেখা।  প্রথমেই যে দুএকটি গ্রন্থ লিখে বিখ্যাত হয়েছেন, কেবল মাত্র সেখানেই রয়েছে তার মৌলিকত্ব। আমার মনে হয়, বিশেষভাবে লোকজ ঐতিহ্য নিয়ে যারা লিখেছেন, অন্য আর যাই লিখুন, তাদের খ্যাতিটাও নির্দিষ্ট থাকে সেখানে। কিন্তু গত পঞ্চাশ বছরের বাংলা কবিতায় শামসুর রাহমানই, বোধ হয়, এক মাত্র কবি, যিনি সময়ের সাথে সাথে, তার মর্মবাণীকে আত্মস্থ করে টেনে নিয়ে গেছেন তাঁর কাব্যরথকে। কবিতাকে পরিয়েছেন পরিচ্ছেদ। সমাজের চাহিদা, যা পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে নিয়ত পরিবর্তনশীল, সেই পরিবর্তশীলতাকে স্বচ্ছন্দে ধারণ করেছেন। আবার একই সাথে প্রতিক্রিয়াশীলতাকে প্রতিহত করারও কথা উচ্চারণ করেছেন মানবমুক্তির সার্বজনীনতার কথা ভেবে।

তবে আর একটি বিষয় হলো, সমকালীন দায়বদ্ধতাকে সর্বকালীন দায়বদ্ধতাতে রূপান্তরিত করতে না পারলে ঘটনাটা কেবল মাত্র ঐতিহাসিক বলেই পরিগণিত হয়। নজরুলের প্রসঙ্গটি একটি কেস স্টাডি হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা কিংবা তৎকালীন সামজিক, বিশেষ করে ধর্মীয় কুসংস্কার মানবিকতাকে যে ভাবে পাশবদ্ধ করে রেখেছিল, তারই শৃংখল ভাঙাটা ছিল, তাঁর কবিকর্মের প্রধান লক্ষ্য। বৃটিশ রাজত্ব এখন আর নেই। মানবিকতার বিষয়টিও যে ভাবে যৌক্তিক হয়ে সমাজজীবনে যুক্ত হয়েছে, তাতে সেই পরিপ্রেক্ষিতও আর থাকছে না। সুতরাং নজরুলের যে কাব্যিক অর্জন, এখনকার প্রজন্মের কাছে তার তাৎপর্য কি ভাবে ধরা পড়তে পারে? এই প্রশ্নটাও এখন আমাদের সামনে যে আসছে, তাই বা অস্বীকার করা যায় কি ভাবে? শামসুর রাহমান সম্পর্কেও তো বলা যেতে পারে, বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রাম তথা আত্মপ্রতিষ্ঠার যে ভাবদ্যোতনা তাঁর কাব্যে রয়েছে, বাঙালি জাতির বিকাশ ও একই সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্প্রসারণ যদি অব্যাহত না থাকে, তবে তার কবিকর্মের সজীবতা কি একই রকম থাকবে? কাজেই এক অর্থে তাঁর কবি হিসেবে বেঁচে থাকাটাও নির্ভর করছে বাঙালি জাতিরই টিঁকে থাকার ওপর। কথাটা বলছি, এ জন্যই যে বহু ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সেই ভাষভাষী মানুষেরাও হারিয়ে গেছে ধরাপৃষ্ঠ থেকে। বাংলাভাষা কিংবা বাঙালি জাতি সম্পর্কে এতটা নেতিবাদী কথা বলাটা, আমি নিজেও সমর্থন করি না। বাস্তব অবস্থা কি দাঁড়াবে, অনেক কিছুই নির্ভর করে নানা ফ্যাক্টরের ওপর। বাংলাভাষী হয়েও পশ্চিম বঙ্গের অধিবাসীরা যে রাজনৈতিক ফরম্যাটের মধ্যে রয়েছে, তাতে আশংকা জাগাটাও কি অমূলক? কিংবা বাঙালিরা যখন অ-বাংলাভাষী দেশের নাগরিক হচ্ছে, তখন নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতিকে তারাই বা ধরে রাখতে পারবে কতটুকু? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-অষ্ট্রেলিয়ায় কিংবা অন্যত্রও বাঙালিরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে উৎসব করে বলে শুনেছি, তবে, সে সব দেশের মানবাধিকার যতই প্রবল হোক, ভিন্ন সংস্কৃতির সংখ্যাগরিষ্ঠ  সেটা কত দিন সহ্য করবে, বিশ্বাস করি যে মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতির প্রতিষ্ঠা ঘটেছে, তার স্পিরিটটা হারিয়ে যাবে না কখনও। এ ছাড়া, আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাও বলে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে বাঙালিরা টিঁকিয়ে রেখেছে নিজেদের অস্তিত্ব।

আমার এত কথা বলার প্রয়োজন পড়ত না, যদি না শামসুর রাহমান হতেন আমাদের এই সময়ের প্রধান কবি। মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলেরা তো আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন। জীবনানন্দের কথাটি একটু অন্য ভাবে বলা যায়। তাঁর মৃত্যুর পর যত দিন যাচ্ছে, ততই যেন তিনি জীবন্ত হয়ে উঠছেন। সময়ের প্রত্যাশা মিটিয়েছেন বলেই তাঁরা যে জীবন্ত থাকছেন, তা তো নয়। তার কারণ সময় তো প্রবাহিত হয় নিরন্তর। তার মর্মবাণীতে ঘটে রূপান্তর। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এই পালাবদল একান্ত ভাবেই অনিবার্য। সুতরাং তাদের এই বেঁচে থাকার ভিত্তি  নিশ্চয়ই শুধু দেশ ও কালের চাহিদা পূরণ নয়। সময়ের দাবি মেটানো নয়। শাশ্বত সৌন্দর্যেরও একটা ব্যাপার এখানে আছে, যার রসউপভোগের তৃষ্ণা মানুষের চিরকালীন। তাঁদর কাব্যে তা আছে বলেই মানুষ এখনও তাঁদের কাছে যায়। বস্তুতঃ এটাই তাঁদের অমরতার কারণ। আমার কথা হল, শামসুর রাহমানের কাব্যেও এই অমরতার কারণটিই শনাক্ত করতে হবে।

এবং সেটি যদি বিবেচনার মধ্যে আনতে হয়, তবে তিনি বহির্জগতের মুখোমুখি তাঁর অন্তর্জগৎ-কে কি ভাবে দাঁড় করিয়েছেন,তা দেখার বিকল্প কি কিছু আছে? আর এর অর্থ হল, তাঁর আত্মাকে তিনি  প্রকাশিত করেছেন কিভাবে? তাঁর প্রথম যৌবনেÑ ‘নতুন কবিতা’-র কালে অতৃপ্ত আত্মার খেদ প্রকাশ পেয়েছিল এ ভাবে :

‘আমাদের  পৃথিবীতে শান্তি পলাতক’। সেই অতৃপ্তিবোধ দূর করার বিনীত বাসনা থেকেই, অনেক বছর পরে , ফিরিয়ে নিতে বলেন ‘ঘাতক কাঁটা’। এ কথা তো যে ঠিক যে, খুব সাধারণ মানুষও তার বস্তুসত্তাকে ভাবসত্তা দিয়ে আবীর মাখাতে চায়। আগে এক জায়গাতে মাটির সানকির কথা বলেছি না? সেই মাটির সানকি কেনার সময় নানা রকম ডিজাইনের ভেতর থেকে পছন্দ করে নেবারও একটা ব্যপার থাকে। এর ভেতর দিয়ে আসলে  তার ভাবসত্তারই প্রকাশ। আর এক জন কবি তো স্পর্শকাতর অনুভূতিশীল মানুষ। নান্দনিকতাই বলি সৌন্দর্যবোধই বলি, তার পরিচর্যা তো চলে ভাবসত্তারই ঊন্মীলন ঘটাতে। শামসুর রাহমানেও আমরা তাই দেখেছি। এটাকেই সনাক্ত করা যায় তাঁর আত্মার চিৎকার বলে। আর আমার বিশ্বাস, তাঁর স্থায়িত্বই বলি, অমরতাই বলি, তার কারণটিও খুঁজে পেতে হবে এখান থেকেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares