লিটল ম্যাগ

পরাগ : বিষয়বৈচিত্র্যে ব্যতিক্রমী শিল্প-সাহিত্যের কাগজ

মুনতাসীর মারুফ

 

‘চেতনার উন্মীলনে পুষ্পিত সৌরভ’- স্লোগান নিয়ে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন পরাগ। এর অমর একুশে বইমেলা ২০১৬ সংখ্যাটিকে সম্পাদক দাবি করেছেন- ‘অন্য সংখ্যাগুলোর চেয়ে কিছুটা হলেও ভিন্ন।’ পরাগ-এর নিয়মিত পাঠকেরা এই দাবির যৌক্তিকতা সম্পর্কে হয়তো আরও ভালো বলতে পারবেন, তবে বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য আর প্রথাগত লিটলম্যাগের চেয়ে ব্যতিক্রমধর্মী কিছু আয়োজনে ভিন্নতার স্বাদ লিটল ম্যাগটির নবীন পাঠকরাও পাবেন- সেটি বলা যায়।

প্রবন্ধ, গল্প, কবিতার পাশাপাশি এই ছোট কাগজটিতে রয়েছে একটি সাক্ষাৎকার অংশ। এতে সম্ভাবনাময় পাঁচ গল্পকার মনি অধিকারী, তানবীরা তালুকদার, জাবেদ ইমন, রনি অধিকারী, কুমার অরবিন্দ-কে পাঠকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন শফিক হাসান। প্রায় একই রকম প্রশ্ন করা হয়েছিল পাঁচ গল্পকারকেই। গল্পকারের পঠনপাঠন, জীবনবোধ ও জীবনদর্শনভেদে উত্তর এসেছে ভিন্ন ভিন্ন। ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে তাদের গল্প-ভাবনা, পটভূমি, লেখার প্রেরণা, পাঠকের উপর তাদের লেখনীর প্রভাব, গল্পপাঠের প্রাসঙ্গিকতা, গল্পের ভবিষ্যৎ, বিশ্বসাহিত্যে বাংলা গল্পের অবস্থান- এই বিষয়গুলোই গুরুত্ব পেয়েছে বেশি, যার ফলাফল, সাক্ষাৎকারগুলো লেখকের ব্যক্তিগত তথ্যাবলী ছাপিয়ে হয়ে উঠেছে সাহিত্য-মনস্ক পাঠকের চিন্তার খোরাকও।

এ সংখ্যার বড় আকর্ষণ দশটি তথ্যবহুল ও ভাবনায় নাড়া-দেয়া প্রবন্ধ। ড. আনোয়ারুল করীম তার ‘রবীন্দ্রনাথের জীবন দেবতা ও বাউলের মনের মানুষ প্রসঙ্গ’ শীর্ষক গবেষণামূলক প্রবন্ধে উদাহরণসহ তুলে ধরেছেন রবীন্দ্র-লালনের মধ্যকার অলিখিত এক ধরনের সাযুজ্য, যেখানে প্রাবন্ধিকের উপলব্ধি- ‘রবীন্দ্র প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ সাধিত হয়েছে বাউল গানের প্রত্যক্ষ প্রভাবে’। বাণিজ্যের এই যুগে সাহিত্য-বাণিজ্যের স্বরূপ সন্ধান করেছেন রতনতনু ঘোষ তাঁর ‘সাহিত্যে বাণিজ্যায়ন’ প্রবন্ধে। সৌমিত্র শেখর ‘চৌদ্দ এপ্রিল মানেই পহেলা বৈশাখ?’ প্রবন্ধে এপার-ওপার বাংলার সাহিত্য ও সংবাদপত্রের ভাষা নির্বিশেষে সাংস্কৃতিক বিভাজনের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের সাহিত্য-কর্মের বিশেষত্ব ও তার মৌলবাদবিরোধী কঠোর অবস্থানের চিত্র ফুটে উঠেছে সৈয়দ শিশির – এর ‘হুমায়ুন আজাদ : সময় ও দেশের প্রতিভূ’ প্রবন্ধে। আনোয়ার কামাল-এর ‘আক্রান্ত মুক্তচিন্তা : আমরা নির্বাক’ প্রবন্ধটিও মৌলবাদবিরোধী একটি লেখা। বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল কবি বিনয় মজুমদারের কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করেছেন বীরেন মুখার্জী- ‘বিনয়ের কবিতায় জীবনানন্দের প্রভাব।’ বাংলা কবিতার আরেক দিকপাল মহাদেব সাহার কবিতা বিশ্লেষণ করেছেন দীনা আফরোজ- ‘মহাদেব সাহার কবিতা : মাটি ও মানুষের রোজনামচা’। শামসুল আরেফীন-এর ‘ইতিহাসের বিচারে ঈদ উৎসব’ প্রবন্ধে সেই ৭৫০ খ্রিস্টাব্দের পাল আমল থেকে শুরু করে যুগে যুগে, কালে কালে বিভিন্ন বংশ ও রাজার আমলে ঈদোৎসব পালনের রীতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায়। সিলেটের বিখ্যাত, প্রথিতযশা ব্যক্তিদের নিয়ে ‘আমাদের কীর্তিমান পুরুষেরা’ লিখেছেন মো. মোজাম্মেল আলী। ‘গণমাধ্যম’ শীর্ষক অংশে প্রকাশিত হলেও সৌমিত্র দেবের ‘ডিজিটাল রিপোর্টিং-এ লিঙ্গীয় সমতা’ও একটি প্রবন্ধই, যেখানে ডিজিটাল সাংবাদিকতা বা অনলাইন সাংবাদিকতায় নারীর ভূমিকা বা অংশগ্রহণের সমকালীন বাস্তবতা তুলে ধরেছেন প্রাবন্ধিক।

অজ্ঞাত পরিচয় যুবতীর মৃতদেহ নিয়ে গ্রাম্য অসভ্য বিনোদন আর সেই মৃত যুবতীর মাঝে সদ্য মেয়ে-হারা এক মায়ের নিজ সন্তানকে খুঁজে ফেরার মর্মস্পশী গল্প- ‘মতিজানের মেয়ে’ লিখেছেন রফিকুর রশীদ। দীলতাজ রহমান-এর ‘স্বার্থপর’ গল্পে ফুটে উঠেছে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার চিত্র, যেখানে গ্রামের সম্পত্তি আগলে রাখার জন্য বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও জীবিত একমাত্র ভাই দ্বিতীয় বিয়ে করে মৃত ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীকে, তার কোল থেকে সন্তানকে কেড়ে নিয়ে ভরে শহুরে স্ত্রীর শূন্য কোল। আপন মায়ের মৃত্যুর পরই কেবল অন্যের মুখে আসল পরিচয় জানতে পারে সেই সন্তান। নূর কামরুন নাহার-এর ‘শরীর’ গল্পটি নারীদেহের প্রতি পুরুষের লোভী কুদৃষ্টির বাস্তবানুগ চিত্রায়ন, যে গল্পের শেষে বাস্তবতার ঠোকরে জর্জরিত নারীর খেদোক্তি- ‘তারা সবাই শরীর কামনা করেছে। তাদের কাছে মন এক বায়বীয় অদৃশ্য বুদবুদ মাত্র। দৃশ্যমান শরীর গ্রহণেই তারা বিশ্বাসী। অবশেষে আমি আমার মনটাকে ছেটে ফেলে দিয়েছি। এখন আমার ভেতর মনের আর কোনো অস্তিত্ব নেই, আছে শুধু এই শরীর।’ দেবদাস ভট্টাচার্য্য-এর ‘ঋতুর বর্ষা বসন্ত’ বিবাহিত দুই কর্মজীবী নর-নারীর সম্পর্কের গল্প – ‘সেটি প্রেমের কিংবা ভালোবাসার নয়, আবেগের কিংবা বন্ধুত্বের নয়, দাম্পত্যেরও নয়। অথবা হয়তো সব কিছুর। দুজনের কেউই জানে না। কিন্তু তারা পরস্পর জড়িয়ে পড়ে।’ আফরোজা পারভীনের ‘মধ্যরাতের ক্রন্দন’ গল্পে আমরা দেখতে পাই বাবার মৃত্যুর পর মা-মেয়ের জীবন সংগ্রামের চিত্র। গল্পের শেষে সেই মায়ের মৃত্যুতে মেয়ের কথিত প্রেমিকের সম্পত্তি-লোভী স্বরূপ প্রকাশিত হয়, শুরু হয় মেয়ের একাকী সংগ্রামের জীবন। ‘তিন টুকরো প্রেম’ পিয়াস মজিদের একটি নিরীক্ষাধর্মী গল্প বলেই মনে হয়েছে, যেখানে গল্পকার গল্পের আঙ্গিক ও গঠনে ভিন্নতা আনতে চেয়েছেন। গৃহকর্মী মায়ের সন্তান-বাৎসল্য ফুটে উঠেছে ইরানী বিশ্বাস-এর ‘মাতৃত্ব’ গল্পে। শহীদুল ইসলাম তনয়ের ‘গন্ধ’ গল্পটিকে পরাবাস্তব গল্প বলা যেতে পারে, যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র হায়দার আলী অন্যের মিথ্যা কথা বুঝতে পারে। মিথ্যা কথা বলা হলে সে গন্ধ পায়, সেই গন্ধে বমি করে, ‘বেশি মিছা কথা শুনলে ফিট অইয়া যায়’। জসীম আল ফাহিম-এর ‘তরমুজ আলীর রসবোধ’ একটি রম্য ধাঁচের গল্প। আরও গল্প লিখেছেন রণজিৎ সরকার- ‘সহযাত্রী।’

এছাড়া দক্ষিণ ভারতের মালয়ালম ভাষার প্রখ্যাত লেখক এন. এস. মাধবনের লেখা গল্পের ইংরেজি অনুবাদকৃত ও দ্য লিটিল ম্যাগাজিন এ প্রকাশিত গল্প অগগঅ-এর বঙ্গানুবাদ করেছেন মনোজিৎকুমার দাস। ষাট দশকে ভারতের নক্সালিস্ট মুভমেন্টের পটভূমিতে লেখা এ গল্পে সারাসাম্মা নামের এক নারীর কাহিনী ‘আম্মা’ গল্পে বিশেষ আদলে বিধৃত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মান সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ‘পল সেলান’-এর কবিতার ইংরেজি অনুবাদ (এ. এস. ক্লাইন এবং মাইকেল হামবুর্গকৃত) থেকে বঙ্গানুবাদ করেছেন মাইবম সাধন।

লিটল ম্যাগাজিনটিতে কবি ও কবিতাকে বেশ প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। আলাদাভাবে স্থান পেয়েছে সরকার আমিন-এর কবিতার পাণ্ডুলিপি- ‘আমার বেশ জ্বর কিন্তু আমি প্রেমে জর্জরিত আছি’। এই পাণ্ডুলিপিতে রয়েছে তেইশটি কবিতা। গুচ্ছ কবিতা লিখেছেন সানাউল হক খান, আমিনুর রহমান সুলতান, পরিতোষ হালদার, নাহিদা আশরাফী, তানভীর আহমেদ হৃদয় এবং আলফা পারভীন। এছাড়াও নবীন-প্রবীণ মিলিয়ে আরও একাশিজন কবির কবিতা স্থান পেয়েছে পরাগ-এ, যাদের মধ্যে কাজী রোজী, কেজি মোস্তফা, আসলাম সানী, রেজাউদ্দিন স্টালিন, শিহাব শাহরিয়ার, ওবায়েদ আকাশ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

লিটল ম্যাগাজিনের প্রথাগত বৈশিষ্ট্য থেকে কিছুটা ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে ‘আলোকিতজন’ অংশটি, যেখানে বীমা ব্যক্তিত্ব নাসির এ চৌধুরীর জীবনী আলোচনা করেছেন পরাগ-এর সম্পাদক সালাম মাহমুদ। বই আলোচেনা বিভাগে আনোয়ার কামাল ও নওরোজ সিদ্দিকী সোহাগ সম্পাদিত ‘শত প্রেমের কবিতা’ নিয়ে আলোচনা করেছেন আফরোজা নাসরিন। শফিক হাসান-এর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ প্রতিদিন একটি খুন-এর পাঁচটি ছোটগল্প নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করেছেন অমৃতা ইশরাত।

আশা করব, বিষয়বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ও সুখপাঠ্য এই ছোট কাগজটি সংশ্লিষ্টদের নিরলস প্রচেষ্টায় নিয়মিত প্রকাশিত হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares