বইকথা

হোসেনউদ্দীন হোসেনের বনভূমি ও অন্যান্য গল্প

মাসুদুল হক

 

হোসেনউদ্দীন হোসেনের গল্প চরিত্রপ্রধান ও ঘটনার চমৎকারিত্বে ভরা। তার গল্পে বাস্তব ঘটনা, সমাজসমালোচনা ও বক্তব্যধর্মিতা থাকলেও কাহিনি নির্মাণ প্রক্রিয়ায় লোকবাংলার জাদুবাস্তবতার এক নিজস্ব আঙ্গিক নির্মিত হয়েছে। হোসেনউদ্দীন হোসেন তার গল্পে তার চেনাজগতের চারপাশের মানুষের সন্ধান করেছেন। একটি বা দুটি চরিত্র ফুটিয়ে তোলার জন্যেই যেন ছোটগল্পের আধার গ্রহণ করেন তিনি। আর সেখানে আমাদের শাশ্বত ধারার নারী-পুরুষ গ্রামীণ জীবনযাত্রার মধ্যে বেঁচে থাকার আবহমান সংগ্রামে লিপ্ত। সামাজিক বিবর্তনের মধ্যে তার গল্পের পুরুষ চরিত্র আধুনিক মননদীপ্ত হয়েও নিসর্গ আর প্রকৃতিমগ্ন। ‘বনভূমি গল্পের পুরুষ চরিত্র কামাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও দারুণভাবে প্রকৃতিবাদী আর গ্রামীণজীবনবোধে উদ্দীপ্ত। ‘বনভূমি’ গল্প বর্ণনায় গল্পকার হোসেনউদ্দীন হোসেন কবিমানসিকতা দিয়ে নিসর্গ তুলে ধরেন এভাবে :

‘বনভূমির অন্তঃপ্রদেশ থেকে শিরশির করে হাওয়া আসছে। বৃক্ষের পাতাগুলো থেকে ভেসে আসছে মর্মর ধ্বনি। অপূর্ব সংগীতের মতো মনে হচ্ছে সব। নীরব প্রকৃতি এখন যেন একটা গানের আসর। উত্তরের হাওয়া মাতলামো করছে না আর। শিরশির করে দক্ষিণের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে। আমি এখন যেখানে বসে আছি, তারই একটু দক্ষিণ দিকেই পুরানো একটা বকুল গাছ। গাছের সম্পূর্ণ ছায়া আমার মাথার ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। গাছের শাখায় দিব্যি আনন্দে কয়েকটা ছোটপাখি নেচে বেড়াচ্ছে। বকুলের মুকুল ঝরে পড়ছে আমার গায়। বাতাসে মৌ গন্ধ। ভাবছি, বসে শুধু ভাবছি আমি। কেন এখানে এলাম। কার আকর্ষণে আমি এখানে বসে আছি!’

গল্পের নায়ক কামাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বলতে গেলে ব্যবহারিক জীবনে সফল। সেই অর্থে চরিত্রটির মনন বাস্তববাদকে সমর্থন করে। অবশ্যি বাস্তববাদীর পক্ষে রোমান্টিক হতে বাধা নেই। এই সূত্রকেই ধরে গল্পকার হোসেনউদ্দীন হোসেন কামাল চরিত্রটিকে রহস্যময় ও অনন্য করে তুলেছেন। যদিও আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় গল্পের নায়িকা দিলারা বানু এক রহস্যময়ী চরিত্র। তবে গল্পটি গভীর পাঠে শেষপর্যন্ত এই উপলব্ধি আসে যে দিলারা বানু রহস্যময়ী হলেও তার চেয়েও বড় রহস্যময় কামাল চরিত্র। গল্পকার এ দুটি চরিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে গল্পে রহস্যের ভেতর রহস্য সঞ্চার করেছেন। যেমনটি ঘটে জাদুবাস্তবতার গল্পে।

গল্পে একটি দিঘির প্রয়োগ বার বার এসেছে। যাকে আমরা আধুনিক গল্পে ব্যবহৃত প্রতীক হিসেবেও চিহ্নত করতে পারি। দিঘি প্রসঙ্গে গল্পকারের বর্ণনা লক্ষণীয় :

‘গভীর দৃষ্টিতে আমি সৌম্য-শান্ত দিঘির দিকে তাকালাম। দিঘির নিতল কালো জলে আবার সৌম্যের মূর্তি জেগে উঠলো। কালো কালো দুটি ভাবময় চোখ ভেসে উঠলো স্বচ্ছ জলে আরশিতে। গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম আমি। কত গভীর বেদনাময় এ চোখ দুটো আমার। নিজের কাছে নিজের চোখ দুটো এত অপরূপ মোহময় আর কখনো কোনোদিন হয়ে ওঠেনি।’

গল্পটিতে মানবিক আবেগ, স্মৃতিকাতরতা, বিরহচেতনা কাজ করলেও এর প্রধান উপজীব্য নিঃসঙ্গতা। গল্পকার কামাল চরিত্রের ভিত নির্মাণ করেছেন নিঃসঙ্গতাকে কেন্দ্র করে। নিঃসঙ্গতাবোধ মানুষকে পীড়িত করে। মানুষ সঙ্গ চায়। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজন, সমাজ আমাদের সঙ্গদান করে। আসলে এ হলো একটা অবলম্বন, যাকে আশ্রয় করে আমরা বাঁচি। কিন্তু কখনও ব্যক্তিচরিত্রের বিশেষ গঠন, সামাজিক পরিবেশ, অবস্থাচক্র মানুষকে আশ্রয়হীন করে; একাকিত্ব তখন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। এমনই একাকিত্বের নিঃসঙ্গতাকে অসাধারণ রূপ দিয়ে কামাল চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন গল্পকার হোসেনউদ্দীন হোসেন তার ‘বনভূমি’ গল্পে।

নারী মানবী হয়েও আমাদের কাছে রহস্যময়ী। তার বাচন, স্বভাব, চরিত্র আর জীবন কবি-সাহিত্যিকদের অনুসন্ধানের বিষয়। নারীর এই গুণগুলো অনুসন্ধানে সৃষ্টি হয়েছে অমর সাহিত্যসম্ভার। নারী শরীরের গন্ধ লিবিডো চেতনার এক অনিবার্য উপাদান। এই উপাদান নিয়েও কবি-সাহিত্যিকদের রহস্যের শেষ নেই। চলছে নিরন্তর সৃষ্টি। হোসেনউদ্দীন হোসেনও ‘বনভূমি’ গল্পে এ-ধরনের নিরীক্ষা চালিয়েছেন। দৃষ্টান্ত :

‘আজও বসে বসে ওর শরীরের গন্ধ অনুভব করছি। একটা আশ্চর্য রকমের মাদক গন্ধ। আমার নাকের ভেতর দিয়ে মগজের খোড়লে ঢুকছে। সেই গন্ধে চোখ বুজে আসছে আমার। মাঝে-মধ্যে চোখ খুলে দেখছি ওর উজ্জ্বল শরীর। এই অরণ্য ওর সারা শরীরে লাবণ্য ঢেলে দিয়েছে। আশ্চর্য সুষমাময় হয়ে উঠেছে ওর দেহকান্তি। একটা রূপের হিল্লোল খেলে বেড়াচ্ছে। উদাস চোখে চারদিকের বন্যপ্রকৃতি দেখছে সে। আমি ওর হাঁটুর দিকে তাকালাম। বেখেয়ালে শাড়িটা হাঁটু পর্যন্ত উঠে গেছে। পা দুখানা মসৃণ পদ্ম পাপড়ির মতো… আমিও আমার দৃষ্টিটা আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিলাম।’

দরিদ্র মানুষের দাম্পত্যজীবন আর ইলিশের মর্মগাথা নিয়ে জাদুবাস্তবতার ভিয়ানে নির্মিত হয়েছে ‘ইলিশ’ গল্পটি। জমসের আর নজিমন চরিত্র দুটি কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই গল্পটি। গ্রামীণ হাট, হাটের আবহ, ইলিশ মাছ ও তার কেনাবেচা নিয়ে গল্পের বিস্তার। ধান-পাটের দাম দিয়ে তুলনা হচ্ছে ইলিশ মাছের। এখন সংবাদপত্রেও দেখা যায়, একমণ ধানে জুটছে একটি মাত্র ইলিশ। এমন বাস্তবতাকে সামনে রেখে হোসেনউদ্দীন হোসেন ‘ইলিশ’ গল্পে লেখেন :

‘জমসের ওল বেচে মেছো হাটে গিয়ে ঢুকলো।

হেটোলে লোকেরা ধানপাট বিক্রি করে মেছো দোকানে গিয়ে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজন নিকেরি চাঙারির উপরে ইলিশ মাছ সাজিয়ে রেখেছে। রূপোর মতো চকচক করেছে ইলিশ। বাতাসে ভাসছে টাটকা গন্ধ। চাঙারির চারপাশে মাছির মতো ভিড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে তারা। দরদাম যতই বাড়ুক না কেন, ইলিশের প্রতি ঝোঁক। পকেটে সদ্যধান-পাট বেচা টাকা। বছরের এইতো একটা কেনাবেচার মরশুম। এরপরে হাতে কোনো টাকা থাকবে না। ইলিশ খাওয়াও নসিবে জুটবে না। দরদাম হু হু করে বাড়ছে। গেল বছরে যে মালের দর ছিল দু’টাকা, বছর ফুরাতেই তার দাম তিন গুণ বেড়েছে।’

হোসেনউদ্দীন হোসেনের সাহিত্যসৃষ্টির পেছনে অন্যতম ভাবপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে দরিদ্র মানুষের প্রতি তীব্র সহানুভূতিবোধ, দুঃখী দুর্গত মানুষের সঙ্গে একাত্মতা এবং কখনও দুঃখ দূরীকণের প্রয়াস। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি গল্পের মধ্যে সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। দৃষ্টান্ত লক্ষ করা যাক ‘ইলিশ’ গল্পে :

‘কোনো মালের প্রতি সরকার নিয়ন্ত্রণ নেই। এক টাকার মাল বিশ টাকা হলেও সরকারের মাথা ব্যথা নেই। চাষাভূষারা কিনতে পারুক আর না পারুক, তাতে কিছু যায় আসে না। তারা তো কোন কিছু উৎপাদন করে না, রং তাদের কাজ হলো ট্যাকসো ধার্য করা এবং ট্যাকসো আদায় করা। এতে নিজেদের মাইনে বাড়ছে, গাড়ি বাড়ি হচ্ছে, বউ মাগিদের দেহ সোনা দানায় ভরে উঠছে। ফুর্তিফাত্তার আসর জমছে, শালা-জমসের আর নজিমন নিতান্তই গ্রামীণ মানুষ। অল্পতেই তুষ্ট। সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতেই ঘটে যায় মহাহাঙ্গামা। আবার দুদিন পরে সব ঠিকঠাক। লোকায়ত জীবনে এটাই বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই গল্পকার এই গল্পে দাম্পত্যজীবনের নানাঅনুষঙ্গ তুলে ধরেছে। সেই অর্থে গল্পটি আমাদের লোকসংস্কৃতির অনন্য দলিল হয়ে ওঠে। গল্পে ইলিশকে কেন্দ্র করে লোকসংস্কৃতিভিত্তিক জীবনপ্রবাহ লক্ষ করা যাক :

‘রান্না ঘরে গিয়ে উনুন থেকে ছাই তুলে আনলো নজিমন। বটি নিয়ে উঠোনে বসলো মাছ কুটতে। ঘরের দাওয়া থেকে একটা কাঠের পিঁড়ি হাতে নিয়ে নজিমনের সামনাসামনি বসলো জমসের। একটা কাগজের বিড়ি ধরায়ে সুখটান দিতে দিতে জমসের বললো, দেখেছিস, মাছের কী টাটকা গন্ধ। নাড়িভুড়ি কানকো দিয়ে পুঁইশাক রানবি আর ওল দিয়ে রানবি তাজা মাছ। শালা ইলিশের গন্ধে উঠোনটা বুরবুর করছে। সামনের হাটে এর চেয়ে বড় একটা কেনবো- দেখি, সংসারটা এবার দাঁড় করাতে পারি কী না?

কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কোনো ব্যতিব্যস্ততা নেই। পাকা গিন্নির মতো রান্না কতে লাগলো নজিমন। ওল রান্না করে পুঁইশাক চড়িয়ে দিল কড়াইয়ের ভেতরে। মালসার পানির উপরে ইলিশের তেল ভাসছে। সেই তেল হাতের তালুর উপরে তুলে কড়াইয়ের ভেতরে ছিটিয়ে দিতে লাগলো। তেলের মধ্যেও রয়েছে প্রাণমাতানো গন্ধ। রান্নাঘরের বাতাসেও ভাসছে ইলিশের গন্ধ। মনের ভেতরে একটা তৃপ্তি। রান্না করারও একটা আনন্দে মনটা পুলকিত হয়ে উঠেছে নজিমনের। বহুকাল পরে বউয়ের কাছে বসে টুকটাক সাহায্য করছে জমসের। মাঝে মধ্যে চুলোর ভেতরে দু একটা চেলা কাঠ ঢুকিয়ে দিচ্ছে।’

লোকজীবনে একটা ইলিশ মাছ কেনার সামর্থ ব্যক্তিকে করে তুলতে পারে গর্বিত। সে ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারে মর্যাদাবান। আত্মতৃপ্তিতে ভরে উঠতে পারে তার দেহ-মন। লোকজীবনে ব্যক্তি-চরিত্রের এমন সূক্ষ্ম দিকটিও উপেক্ষিত হয়নি, বাদ পড়েনি হোসেনউদ্দীন হোসেনের কলম থেকে। দৃষ্টান্ত :

‘মাছটা হাতে করে হেলেদুলে নবাবের মতো হেঁটে যেতে লাগলো জমসের। চালচলনে বড়লোকী ভাবটা ফুটে বেরোচ্ছে। এতদিন মনটা ছিল কাঙাল কাঙাল। সেই কাঙাল কাঙাল ভাবটা মন থেকে জোর করে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হেঁটে যেতে লাগল মাথাটা উঁচু করে হাটের মধ্য বহুক্ষণ হেঁটে বেড়ালো। অবশেষে একটা চা-এর দোকানে ঢুকলো জমসের। অনেকদিন চা-পান করেনি। বেঞ্চির পরে বসে মাছটা বাম হাঁটুর উপর রাখলো। দেখুক। হাটুরে লোকজন দেখুক। জমসেও ইলিশ মাছ কিনতে পারে।’

আসলে বিশ্লেষণের তীক্ষ্ণতায় জীবনের সহজ রস এবং নিসর্গপ্রকৃতির স্বতঃস্ফূরিত সৌন্দর্য্য ও ধ্বংসলীলাকে তুলে আনতে চান গল্পকার হোসেনউদ্দীন হোসেন তার গল্পে।

‘ইলিশ’ গল্পে লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান ও উপকরণের নাম উঠে এসেছে। যেমন চাঙারি, চুনোমাছ, তিঁতপুঁটি, কুঁচো চিংড়ি, পঁচা ঝুরোমাছ, খোত, থোলে প্রভৃতি।

হোসেনউদ্দীন হোসেনের গল্প মানেই সমাজকে গভীরভাবে দেখা। মানুষ তার অস্তিত্ব, তার পরিবেশ, প্রতিবেশ, অর্থনৈতিক পরিমণ্ডল ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক পরিস্থিতি তার গল্পে মূর্ত হয়ে ওঠে অবলীলায়। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিনির্ভর মানুষের জীবনযাপনের বিবর্তন প্রক্রিয়া নিগূঢ় বাস্তবতা নিয়ে উপস্থিত হয় তার ছোটগল্পে। এমনি ধারার একটি গল্প ‘বিবিজান চলে যাচ্ছে’।

শমসের আলী আর বিবিজান- এই দম্পতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এ গল্প। শমসেরের অভাবের সংসার। জমিতে কাজ করে আর তার স্ত্রী বিবিজান ছাগল প্রতিপালন করে। পাঁচ বছর আগে এনজিও থেকে আলু উৎপাদনের উদ্দেশ্যে পাঁচ হাজার টাকা লোন দিয়েছিল শমসের আলী। কিন্তু জমিতে আলু উৎপাদন হলেও পচন রোগে ক্ষেতেই আলু পচে যায়। এনজিও-র টাকা সুদে-আসলে দশগুণ বেড়ে চলে। এনজিও-র টাকা পরিশোধের নোটিশ জারি হয়। শমসের আলী দেনার দায়ে হাবুডুবু খেতে থাকে। এক পর্যায়ে সে তার স্ত্রী বিবিজানর পোষা ছাগলগুলো বিক্রি করে এনজিও-র লোন পরিশোধের চিন্তা করে। সেই থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব। গল্পে চমৎকারভাবে সে দ্বন্দ্বের বর্ণনা করেছেন গল্পকার :

‘সেই রাতে ঘরে ফেরেনি বিবিজান। পাশের বাড়িতেই রাত কাটিয়েছিল। সেই থেকেই দুজনেই আলাদা। ছাগলের ঘরে বাঁশের মাচান তৈরি করে শোয়ার আস্তানা করে নিয়েছে বিবিজান। পাড়ার এক বুড়িকেও রাতের বেলা নিজের আস্তানায় শোয়ার সঙ্গ করে নিয়েছে। দু’জনে একই বাড়িতে অবস্থান করলেও কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না। এখন এমন একটা অবস্থার উপক্রম হয়েছে যে, বিবিজান রাতের বেলা নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে মাথা সিঁধানে একটা ধারালো দা নিয়ে শুয়ে থাকে। বাইরে রাতের বেলা ছাগল-ঘরের পাশে একটু খুটখুট আওয়াজ কানে ঢুকলেই হয়, ‘ছাগল চোর-ছাগল চোর’ বলে চেঁচিয়ে পাড়াটা মাত করে তোলে বিবিজান। লোকজন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে শমসের আলীর বাড়ির উঠানে। প্রায়শ রাতের বেলা ঘটছে এরকম ঘটনা। গ্রামের লোকজনেরা আজকাল অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ছাগল চোর হিসেবে তারা বিবিজানের কথায় সন্দেহ করে শমসের আলীকে।

আহাদ আলী গ্রামে হালে মাতাব্বর হয়ে উঠেছে। বিবিজান তার বাড়িতে গিয়ে ঘনঘন উঠবসা করছে। উঠতি জোয়ানজোয়ান যুবকদের নিয়ে একদিন সন্ধ্যে বেলা সে শমসের আলীর বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ালো। আঙ্গুল উঁচিয়ে বললো, রাতের বেলা যদি কোনো রকম দুর্ঘটনা ঘটে-দায়ী হবা তুমি।

শমসের আলী জানতো, আমার দোষটা কি?

আরো উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল আহাদ আলী, বুঝলে বেশি ফ্যাচ ফ্যাচ করবা না। দেমাক দেখায়ে চলে গিয়েছিল আহাদ আলী গং।

জসিম মোড়লও একদিন হুশিয়ারি দিয়ে গেল। শমসের, তুমি না কি তোমার বউডারে মারতি ধরতি গিয়েলে?

– কেডা বললো আপনার?

– তোমার বউয়ের কাছ থেকে শোনা।

-মিছে কথা- একেবারে বানানো কথা।

– বানানো হোক কিংবা আস হোক, এটা তোমার বউ-এর কথা। নারী নির্যাতনের মামলায় আসামি হয়ে যাবা, জসিম মোড়ল আর একটা গুঁতো মারা কথা বললো, ছ’মাস তো বউ-এর কাছে শোওনি, ইসলামি শরিয়তে বউ তালাক হয়ে যাচ্ছে। জসিম মোড়লের কথা শুনে ‘থ’ মেরে গিয়েছিল শমসের আলী। মাথাটা ঘুল্লি মেরে উঠলো। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো।’

এমন পরিস্থিতির মধ্যে হঠাৎ গ্রামে আসে কিছু দালাল। যারা গ্রামবাসীকে শ্রমিক হিসেবে ভারতে নিয়ে যাচ্ছে। এমনই এক মহিলা দালাল ছবেদ আলীর বউ। পাঁচ বছর আগে উধাও হয়ে গিয়েছিল। মাসখানেক হলো ফিরে এসেছে। পরনে দামি শাড়ি। গায়ে সোনার গয়না। একগাঁদা টাকা নিয়ে এসেছে। সেই টাকা দিয়ে জমি কিনে বাড়ি করছে। আবার ওপারে চলে যাবে বউটা। এই নারীকে কেন্দ্র করে গ্রামের অভাবী মহিলারা স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। সেই স্বপ্নের অংশীদার হয় বিবিজান। এক্ষেত্রে মনে হয় সমাজজিজ্ঞাসার সঙ্গে জীবনজিজ্ঞাসার সত্যই তো কোনো বিরোধ নেই। জীবনকে লেখকরা কত ভাবেই না দেখাতে পারেন! এ গল্পে এসেও আমরা খুঁজে পাই সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনবিজ্ঞাসা। বিবিজান তার জীবনজিজ্ঞাসায় অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আনতে সেই মহিলার হাতে ধরে মুম্বাই চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করে। গল্পকার জীবনজিজ্ঞাসার সেই স্বপ্নের জালকে মনোবিজ্ঞানীর মতো করে তুলে আনেন এভাবে :

‘ওপারে গেলেই সুখ। কোথায় কত দূরে মুম্বাই শহর। সেই শহরে নাকি সুখ আর সুখ। বিশাল বিশাল অট্টালিকা। নানা রং তামাশার মানুষ। খেয়ে সুখ। শুয়ে সুখ। বসে সুখ। রংবেরঙের গাড়ি। সেই গাড়িতে চলে মেয়েরা পুরুষের সঙ্গে সমুদ্রে হাওয়া খেয়ে বেড়ায়। এদেশের জীবনযাপন এবং ওদেশের জীবনযাপন এক রকম নয়। সে দেশে না গেলে কিছুই বুঝতে পারবা না।’

মানুষ জীবনজিজ্ঞাসায় শেষপর্যন্ত বাস্তবতার কাছে এসে দাঁড়ায়। শমসের আলী বাস্তবতার কারণেই জমিতে শ্রমিকের কাজ করে। বিবিজান ছাগল পোষে। অন্যরা যে যার মতো করে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালায়। সবাই শেষপর্যন্ত বাস্তবতার হাতে বন্দি। গল্পকারও বাস্তবতাকেই মেনে নেন। বাস্তব ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন আমরা সংবাদে পাঠ করি বাংলাদেশের শ্রমিকেরা ভারতে কাজ কছে- তা মেনে নিই। মেনে নিই বাংলাদেশের নারীরা ভারতে গণিকার পেশায় নিয়োজিত হলে। এ সবই জীবনবাস্তবতা। গল্পকার হোসেনউদ্দীন হোসেনও তার পর্যবেক্ষণশীল মনন দিয়ে ‘বিবিজান চলে যাচ্ছে’ গল্পে বাস্তব ঘটনাকে অসাধারণ দক্ষতা দিয়ে অধিবাস্তব ঘটনায় রূপান্তর করছেন। গল্পের শেষে সে দৃষ্টান্ত লক্ষ করা যাক :

‘কালিঝুলি মাখা ল্যাম্পটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো শমসের আলী। ঘরের ছেঁচেই দাঁড়িয়ে আকাশ দেখলো সে। জীবনটা দূরের নিভু নিভু নক্ষত্রের মতো মনে হলো ওর। নিভে যাচ্ছে শমসের আলী। একটু হেঁটে বিবিজানের ছাগলের ঘরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো সে। চুনার গন্ধ ভাসছে। বিবি ছাগলের ঘরে শুয়ে অনাগত দিনের সুখ স্বপন দেখছে। আজ হোক, কাল হোক সে মুম্বাই শহর চলে যাচ্ছে। ঘুমের মধ্যে ডুবে দেখছে সে মুম্বাই শহর। এপারে সুখ নেই-ওপারে সুখ।

অপলক চোখে ছাগলের দিকে বোবার মতো তাকিয়ে রইল সে।

অন্তর বেদনায় ফেঁটে যেতে লাগলো শমসের আলীর।’

নিম্নবিত্ত মানুষের বেঁচে থাকার নানাসঙ্কট দেখা যায়। সে সঙ্কটগুলোর প্রায়ই সবই অর্থনৈতিক। কোথাও জমি, কোথাও ভিটা, কোথাও শ্রমের মূল্য- সব জায়গায় অধিকারের জন্য লড়তে হয় নিম্নবিত্ত মানুষকে। সবাই পারে না অধিকারের জন্য লড়তে। চাই সাহস আর কণ্ঠস্বর। পু্িষ্টর অভাবে এই মানুষগুলো সাহস আর কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলে। তারপরও এদের মধ্যে থেকে দুই একজন উঠে দাঁড়ায়। হোসেনউদ্দীন হোসেনের ‘সম্পত্তি’ গল্পে এরকম উঠে দাঁড়ানো একজন মানুষ হামজের। নিম্নবিত্ত মানুষের প্রতিনিধি হামজের। সুদখোর মহাজন শাসিত সমাজে নিম্নবিত্ত মানুষের একমাত্র কণ্ঠস্বর হামজের। হামজে সুদের শোষণপ্রক্রিয়াকে তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আটকে দিতে পারলেও শেষ পর্যন্ত মহাজনদের কূটকৌশলে আটকে যায়। মহাজনেরা চক্রান্ত করে হামজেরদের পৈতৃক ভিটেবাড়ির ভাইয়ের অংশ কিনে নেয়। এর মধ্য তার মনোবল ভেঙে যায়। পৈতৃক ভিটেবাড়ির সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে একজন নিম্নবিত্ত হামজেরের নৈতিক মনোবলকে ভেঙে দেবার এক অসাধারণ আলেখ্য এই ‘সম্পত্তি’ গল্পটি। যেখানে নূর আলী, জবক্ষার, করিম বকস, জয়নাল প্রমুখ মহাজনরূপী খলনায়ক উপস্থিত। গল্পের চেতনবিন্দু হিসেবে উঠে এসেছে উঠে এসেছে জমসেরের বউ দোলেনা আর জমসেরের ভাই লিচু মোড়লের বউয়ের মধ্যকার বিবাদ। বিবাদের ঘটনা সামান্য। কিন্তু সেই সামান্য ঘটনাকে অসামান্য জটিল করে তোলে মহাজনেরা। অবশ্য ঘটনা, গল্প আর চরিত্র নির্মাণের কৃতিত্ব গল্পকারকে দিতেই হবে। গল্পকার এই গল্পে একদিকে জমসেরের মনের ভিতরকার ভাবনার রূপায়ণ করেছেন এভাবে :

‘শরীরটা থরথর করে কয়েকবার কেঁপে উঠলো। যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। কিছুদূর গিয়ে অথর্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল সে। নিজেকে মনে হলো, সে যেন মুর্দা হয়ে যাচ্ছে।’ অন্যদিকে জমসেরের মনের চাপকে বাহ্যজগতে বস্তুগতভাবে দেখান এভাবে : ‘পরদিন জয়নাল মহাজন তার দশটা লাঙল এনে হামজেরের উঠোনে চাষ দিতে লাগল।’

এ যেন শুধু বস্তুগত সম্পত্তির উপর হস্তক্ষেপ নয়, হামজেরের নৈতিক মনোবলের উপরও মহাজনদের আক্রমণ। গল্পকারের গল্প লেখার মুনশিয়ানার কারণেই আমাদের মনে এই ধরনের চেতনা সৃষ্টি হয়।

একজন কসাইয়ের চরিত্রকে কেন্দ্র করে লেখা গল্প ‘কসাই’। আমাদের অভিজ্ঞতায় যে কসাইকে জানি, সে কসাই মাংস বিক্রেতা। পশু জবাই করে মাংস বিক্রি করাই তার কাজ। অবশ্য মাংস কাটা, হাড়গোড়কে সজ্জিত করা, পশুর দেহ থেকে চামড়া আলাদা করে নেয়া, গলা কেটে রক্ত ঝরানো- এই দৃশ্যগুলোর সঙ্গে সাহস ও ভয়ের দুই রকম প্রকাশ রয়েছে। কসাইয়ের সাহসের ভূমিকা আর এ দৃশ্য দেখা অন্য ব্যক্তির ভয়ের ভূমিকা। এর বাইরেও ঐ কসাই চরিত্রটিরও রয়েছে মনোজগৎ, ব্যক্তিচেতনা ও মানবিক অনুভূতি। এমনটি আমরা খুব একটা ভাবি না। তবে ভাবি কসাই চরিত্রে তার কর্মের প্রভাব থাকতেই পারে। অর্থাৎ তার আচরণ কসাইয়ের মতোই হবে তার পরিবার ও সমাজের কাছে। সে ভাবনাটা অমূলক নয়। গল্পকার হোসেনউদ্দীন হোসেন কসাই চরিত্রের ব্যক্তিগত জীবনকে উন্মোচিত করেছেন ‘কসাই’ গল্পে। এখানে তিনি নবিছদ্দি কসাই তার দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরার দাম্পত্য জীবনকে তুলে এনেছেন। এই দাম্পত্য জীবনে রয়েছে অন্য দশটা নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনের মতোই চিত্র। রয়েছে প্রেম, কাম, হিংসা, জেদ, ক্রোধ আর বিদ্বেষের চেতনা। আমাদের চেনা-জানা কসাইকেই গল্পকার জীবনজিজ্ঞাসার প্রেক্ষাপটে গল্পের কসাইয়ে পরিণত করেছেন। সত্য ঘটনা আর বাস্তবতার মোড়কে নির্মিত এই কসাই চরিত্রটি শেষ পর্যন্ত গল্পের কসাই চরিত্রে থাকে নি। হয়ে উঠেছে একজন রক্তমাংসের মানুষ। অন্য দশটা মানুষের মতো তার হৃদয়ে প্রেম রয়েছে, রয়েছে কাম আর নেশার আসক্তি। অন্য দশটা মানুষ যেভাবে মনোযোগে ভোগে হোসেনউদ্দীন হোসেনের এই কসাই চরিত্র নবিছদ্দিও মনোযোগে ভোগে। গল্পকার সার্থকভাবে কসাইকে মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। পেরেছেন মানুষ হিসেবে কসাই চরিত্রে মনোরোগের উপস্থিতি দেখাতে। গল্পকার গল্পটি শেষ করেন এভাবে :

‘সারাদিন আজ অসীম এক উত্তেজনায় উন্মাদের মতো ছুটে বেড়ালো নবিছদ্দি। কোথায়ও এক ঠাঁইয়ে বসে থাকতে পারেনি সে। ভাবনাগুলো যেন তাকে ক্ষিপ্ত কুকুরের মতো কামড়িয়েছে। শহরের অলিগলি উদ্ভ্রান্তের মতো টহল দিয়ে বেড়িয়েছে। ভাটিখানায় গিয়ে ধেনো মদের বোতলে চুমুক দিয়েছে। কিন্তু তাতে আরো আগুন জলে উঠেছে মাথায়।

সারা রাত এইভাবে পথে পথে কাটিয়ে শেষ রাতের দিকে বাড়ির পথে হেঁটে গেছে নবিছদ্দি। মাথায় তার রক্ত টগবগ করছে। আস্তে আস্তে রাত শেষ হয়ে আসছিল। রাতের অন্ধকার হয়ে আসছিল ফিকে। বড় বড় ধাপ ফেলে জোরে জোরে হাঁটতে লাগলো নবিছদ্দি।

ভোর হবার আগেই বাড়িতে গিয়ে পৌঁছাবে সে।

এতকাল সে গরু জবাই করে এসেছে। আর সে একটা মানুষ জবাই করবে। জোরে আরো জোরে অন্ধকার লম্বা লম্বা করে পা ফেলতে লাগলো নবিছদ্দি। শালি, আজ রাতে তোকে ঠিক জবাই করবই। তা যদি না করি, আমি কসাই নই।’

এখানেই গল্পের শেষ। সত্যিই কি নবিছদ্দি তার স্ত্রী হাজেরাকে জবাই করতে পারবে? নাকি এ তার মনোরোগের বহিঃপ্রকাশ? নাকি না পাবার অবচেতন স্তরের এক প্রকাশগত আচরণ মাত্র! এ ধরনের অনেক প্রশ্নই উঠতে পারে এই গল্পের নবিছদ্দি চরিত্রটি নিয়ে। আমাদের ভেবে দেখা দরকার নবিছদ্দি কসাই, এটা তার পেশা। তার চেয়ে বড় কথা সে মানুষ। অন্য দশটা মানুষের মতোই রয়েছে মানবিক অনুভূতি। কাজেই অন্য মানুষ যদি তার স্ত্রীকে জবাই করতে চায় তাকে কসাই হতে হয় না। এটা তার মনোগত’ সহজেই মনোগত বিকৃতি হিসেবেই উপলব্ধি করতে পারব। হোসেনউদ্দীন হোসেন সার্থকভাবে সে প্রসঙ্গেকে তুলে এনছেন এই গল্পে।

‘কসাই’ গল্পটির সমধারার আর একটি গল্প ‘একটা মৃত ধানগাছের চারার আর্তনাদ’। যেখানে বৃদ্ধ হাতেম মোল্লা, স্ত্রী নেই সংসারে। কিন্তু তার মনে প্রবল মানসিক বিকৃতি। নারীদেহের প্রতি তীব্র লোভ; বয়সের ভারও তার মধ্যে ‘লিবিযো-চেতনা’র কমতি ঘটাতে পারেনি। দৃষ্টান্ত :

‘নামাজে দাঁড়িয়েই মনটা তার বিষণ্ণ হয়ে উঠলো। মনে হলো, সবকিছু মিথ্যে। চোখ বুজে মনে মনে কয়েকদিন আগে দেখে আসা সেই মেয়েমানুষটার দেহের আকৃতি মনে করার চেষ্টা করলো সে। লিচুর কোয়ার মতো ড্যাবড্যাবে চোখ। ফেটে পড়া স্বাস্থ্য। ভাবতে গিয়েই মাথার ভেতরে একটা গোলমাল পাকিয়ে উঠলো। নিকেটা করতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত করতে পারেনি। দেখা দিয়েছে নানারকম ঝুটঝামেলা। বিষয়টা চিন্তা করে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো হাতেম মোল্লা। শালা-

রুকুতে গেল হাতেম মোল্লা। তড়বড় করে আওড়ালো সোবহানা রাব্বি আলা আজিম- আমার মহান পালনকর্তা পবিত্র। মাথাটা ক্রমান্বয়ে গরম হচ্ছে। কতবার সে রুকুতে গেল আর কতবার সে সেজদায় মাথা রাখলো, একটুও খেয়াল করতে পারলো না। উদভ্রান্তের মতো বারবার ওঠাবসা করলো।

প্রার্থনায় বসে সে হাত জোড় করে বললো, ইয়া মাবুদ, দীলের আশা পূরণ করে দাও। আমি তোমার ঘরে একটা খাসি ছাগল দেব। ইয়া রহিম, তুমি এই বান্দার প্রার্থনা কবুল করে নাও।’

এই বৃদ্ধ হাতেম মোল্লা ‘কসাই’ গল্পের কসাই নবিছদ্দিকেও হার হানিয়েছে কসাইপনায়। মানসিক উন্মাদনার তাড়নায় পুত্রবধূকে আঘাত করে গর্ভের সন্তান নষ্ট করে দেয়। এই সংকট আমরা নবিছদ্দির মধ্যেও দেখেছি। কিন্তু নবিছদ্দি শুধু মনে- যাতনাকে চিন্তাতেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল- স্ত্রীকে জবাই করার চিন্তায়। কিন্তু হাতেম মোল্লা কসাই না হয়েও তার ছেলের সন্তানকে গর্ভাবস্থায় মেরে ফেলে। একি বিকৃতি নয়? গল্পকার গল্পটিকে শেষ করে আনেন ‘রূপসাংকেতিক’ উপলব্ধি দিয়ে- ‘একটা মৃত ধানগাছের চারার আর্তনাদে বাড়িটা ঝনঝন করে ভেঙে পড়ছে’- মৃত বাচ্চাটিকে ‘একটি মৃত ধানগাছের চারা’ প্রতীক হিসেবে দেখানোর মধ্য দিয়ে। লেখক অবশ্য এর মধ্য দিয়ে কৃষিতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার রূপ ও প্রতীক প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন এই গল্পে।

হোসেনউদ্দীন হোসেনের গল্পে সমাজ, সময় ও সংকট প্রকাশের ভাবনা লক্ষণীয়। ‘একজন মারা গেছে’ গল্পে আমরা দেখতে পাই ফুলতলী গ্রামের হামিদ শহরে এসে ভালো ছাত্র থেকে ক্রমান্বয়ে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে কীভাবে কেরানি হয়ে ওঠে এবং একটা পর্যায় সংসার আর কেরানির চাকরিতে হতাশাগ্রস্ত হয়ে গ্রামে ফিরে আসে। গল্পকার এসব নিয়ে হামিদের ভেতরকার দুই সত্তার উপলব্ধিকে নিপুণভাবে তুলে ধরেন গল্পে। দৃষ্টান্ত :

‘নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন করলো হামিদ, তোমার কী স্বপ্ন ছিল হামিদ? ভেতর থেকে আরেকজন হামিদ নড়েচড়ে উঠে দাঁড়ালো। স্বপ্নের কথা বলছো?

হ্যাঁ, স্বপ্নের কথা বলছি।

দুই হামিদ পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন, পাল্টা প্রশ্ন করতে লাগলো।

এক হামিদ বললো, আমার স্বপ্ন ছিলা একটা খরগোশ ধরা।

আর এক হামিদ বললো, সেই খরগোশটা ধরতে পেরেছো কি?

হামিদ জবাব দিল, জাল ফেলেছিলাম, সেই জালেই আমি আটকে গিয়েছিলাম। খরগোশটা ধরতে পারিনি। আর এক হামিদ বুঝতে পারলো না। বোকার মতো চেয়ে রইল।

হামিদ বললো, বুঝতে পারছো না।

আর এক হামিদ আবার মাথা ঝাঁকালো, না বুঝতে পারছি না।

হামিদ বললো, পলিটিকসের খরগোশ ছিল সেটা। ভার্সিটিতে কয়েক মাস ক্লাস করেই বুঝে ফেললাম, ভালো একজন ছাত্র হিসেবে আমার একটু যশ হয়েছে। সবারই দৃষ্টিতে পড়ে গেলাম। ছাত্র রাজনীতিতেই সেই আমার প্রথম হাতে খড়ি। কয়েক মাসের মধ্যে পলিটিকসের প্রতি আমার নেশা ধরে গেল। মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দিই। আমার বক্তৃতা শুনে অনেকে হাত তালি দেয়। দেশের গণমান্য ব্যক্তিরা আমাকে নিপুণভাবে কাজে লাগতে লাগলো। আফিমখোর যেমন আফিম খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকে, আমিও তেমন রাজনীতির আফিম খেয়ে বুঁদ হয় থাকি। বড়ো বড়ো নেতাদের ঘেরাটোপে পড়ে বই পুস্তকের সঙ্গে বিচ্ছেদও ঘটিয়ে ফেলেছি। ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে বুঝে ফেলেছি আমার ভাণ্ড শূন্য। রাজনীতির নেশা আমাকে দেউলে করে দিয়েছে। অনার্সে পাস করার কথা ছিল। কোনোরকম টেনে টেনে থার্ড ক্লাস পেলাম। আমাকে নিয়ে বাপ যে স্বপ্ন দেখতো, জজ ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার, সেই স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। তারপর আর কে দুর্ঘটনা। বাপ আমার কৃতিত্বের কথা শুনে ঝিম মেরে গেলেন। রাজনীতির নেশা আমি তখনো ছাড়িনি। নেতাগিরি করতে গিয়েই বুঝতে পারলাম নেতা হওয়া সহজ ব্যাপার নয়। একটা ধাক্কা খেয়েই আমাকে ওপথ বাধ্য হয়ে ছেড়ে দিতে হয়েছে। আমার আর একটা ইচ্ছে ছিল, অফিসার হব। এখানে ওখানে চাকরির জন্য বহুকাল আমি ছুটে বেড়িয়েছি। কত অফিসে যে ইন্টরভিউ দিয়েছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। হব হব করেই কোনোকিছু হওয়াতে পারিনি। একদিন দেখলাম চাকরির বয়সও আমার শেষ। অবশেষে বাপের এক খণ্ড জমি বেচে দিয়ে, পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে একটা কেরানির চাকরি পাই। দশটা পাঁচটা অফিস করে শরীরের মাংস একেবারে শুকিয়ে ফেলেছি। যে ঘুষের বিরুদ্ধে একদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বড়ো বড়ো বুলি ঝেড়েছি, সেই ঘূষের টাকার জন্য কত যে কি করি, তা বুঝাতে পারব না। কথাগুলো একটানা বলেই বড় একটা শ্বাস ছাড়লো হামিদ।

আর এক হামিদ ওর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। চোখের কোণে কালো কালি পড়েছে হামিদের। গালের চামড়া কুঁচকে গিয়েছে। যৌবনে যে হামিদ স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য্যে দেখতে অপরূপ ছিল, সেই হামিদ হয়ে গেছে বিচ্ছিরি কদাকার। মাথায় উসকোখুশকা চুল। থুতনিতে ছাগুলে দাড়ি। ময়লা পাজামা আর ময়লা পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে উলিরপুর বাসস্ট্যান্ড।’

সময়কে ধারণ করে মানবসমাজে প্রতিষ্ঠা পাবার যে নিরন্তর চেষ্টা, সেই চেষ্টায় হামিদ পরাজিত। হামিদ বেঁচে থেকেও তার অস্তিত্বের কাছে সে মৃত। ‘দিব্য চোখে সে দেখতে পায় সে হামিদ আজ নেই। হামিদ নামে এই পৃথিবীতে যে একজন মানুষ ছিল সে এখন নেই। অনেকে আগেই মারা গেছে সে।’ মানবজীবনের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই চিরন্তন বিরোধ এ গল্পে এক পরম সত্যের সন্ধান দিয়েছে।

অনুসন্ধান এবং অতৃপ্তিই ছোটগল্পের জন্ম দিয়েছে। ছোটগল্পের এই অতৃপ্তি ও অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে নিয়ত ঘটে যাওয়া পরকীয়া প্রেম নিয়ে এক অসাধারণ গল্প লেখেছেন হোসেনউদ্দীন হোসেন। ‘মনপবনে টান’ গল্পে আপাদমস্তক বোরকায় ঢাকা শাকিলা বানু তার প্রবাসী স্বামীকে ছেড়ে কীভাবে সদ্য যুবক হওয়া কিশোর হাবীবকে নিয়ে উধাও হয়ে যায়- তারই বর্ণনা উঠে এসেছে এ গল্পে। গল্পকারের কৃতিত্ব এখানে যে তিনি পাঠককে অনুসন্ধিৎসু করে তুলতে পেরেছেন। সেই সঙ্গে শাকিলা বানুর অতৃপ্ত কামচেতনার একটা মানবিক পরিণতি রচনা করেছেন।

মানুষের প্রতি মানুষের সদর্থক আচরণকে আমরা মানবিক আচরণ হিসেবে চিহ্নিত করি। কিন্তু একটা বনের পশু যদি মানুষের প্রতি সদর্থক আচরণ করে? তাকে শুধু প্রভুভক্তি হিসেবেই আমরা মূল্যায়ন করে বিয়য়টির নিষ্পত্তি টানার চেষ্টা করি। কিন্তু এ মূল্যায়নই কি যথেষ্ট? ‘পশু’ গল্পের ভেতর দিয়ে হোসেনউদ্দীন হোসেন এ বিষয়টিকে আমাদের বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। এ গল্পে একজন বাজিকরের জীবন উঠে এসেছে। ‘বাজারে বাজারে সে ভেল্কি খেলা দেখিয়ে বেড়াতো। ভানুমতির খেল। বাম হাতে ডুগডুগি। ডান হাতে মরা মানুষের মাথার খুলি। আর ছিল কয়েকখানা তাস। এতেই গুলজার হয়ে উঠতো আসর। বাম হাতে ডুগডুগিতে তাল বেতাল ঘা ঠুকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, গেরুয়া একটা চাদর বিছিয়ে, একনাগাড়ে চেঁচাতো ইদু- এই ভেল্কির খেল, ভানুমতির খেল, সাহেব লোক দেখুন, ছ্যামড়া-ছ্যামড়িরা দেখুন, চাচা লোক দেখুন, ভাই-বেরাদাররা দেখুন, তাজ্জব, তাজ্জব কা খেল দেখুন, মরা মানুষের মাথার খুলির কেরামতি দেখুন, তিন তাসের কসরত দেখুন।’ এই বাজিকর ইদু বিয়ে করে সংসারে থিতু হতে চেয়েছিল। ময়নাকে বিয়ে করে সুখের সংসার পাতে। সেই সংসারে হঠাৎ করে জুটে যায় একটা বানরের বাচ্চা। ছ’মাসের মধ্যেই বাচ্চাটি বড়সড় নাদুস-নুদস হয়ে ওঠে। ভালোই চলছিল সংসার। এভাবে চলতে চলতে এক পর্যায় ময়না বিপথগামী হয়ে ওঠে। স্বামীকে ছেড়ে পরপুরুষের সঙ্গে রাত কাটাতে যায়। বয়সের ভারে ক্লান্ত ইদু-র পৌরুষে ঘা লাগে। ময়নাকে পথে ফিরিয়ে আনতে না পেরে এক পর্যায় বাজিকরের জাতিগত নেশায় পালিয়ে যায় অন্যত্র। দুর্বল-ক্লান্ত ইদু আর সঙ্গী বানর। এরপর চলে দুটি প্রাণের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। ইদু বিস্ময় নিয়ে উপলব্ধি করে সবই তাকে ছেড়ে গেলেও বানরটি যায় না। মৃত্যু পর্যন্ত বানরটি বাজিকর ইদু’র সঙ্গী হয়ে থাকে। পিতার মতো ইদুকে আগলে রাখে। এক সময় ইদু মারা যায়। কিন্তু বানরটি বসে বসে ইদুর মৃতদেহ পাহারা দেয়। লেখক বাজিকর ইদু’র প্রতি এই বানরটির ভেতরকার ভালোবাসা, আস্থা, ভক্তি আর আবেগকে রূপদক্ষ শিল্পীর মতো তুলে ধরেছেন। সঙ্গে অসাধারণ দক্ষতায় ব্যঙ্গ করেছেন মনুষ্যসমাজকে যারা প্রকৃত পশু। দৃষ্টান্ত :

‘ধুঁকে ধুঁকে একদিন মারা গেল ইদু। সময়টা এক শীতার্ত রাত্রি। সারা রাত হাত-পা ছুঁড়েছে। বানরটি ওর অবস্থা দেখে ছুটে বেড়িয়েছে। চিৎকার করে বিপদের সঙ্কেত জানিয়ে পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত কেউ আসেনি। ভোর রাতে হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে একেবারে ঠান্ডা নিস্তেজ হয়ে গেল ইদু। শোকে কাতর হয়ে ইদুর মৃত্যুদেহের কাছে ঝিম মেরে বসে রইলো বানরটি। সে আজ লাফালো না। রাস্তার এপারে ওপারে গিয়ে ছুটে বেড়ালো না। বসে বসে মৃতদেহ পাহারা দিতে লাগলো।

একজন পান বিড়ির দোকানদার এসে ইদুর গেরুয়া কাপড়টা দিয়ে ইদুকে আপাদমস্তক ঢেকে দিয়ে গেল। দুই একজন পথচারী মৃত দেহ সৎকারের উদ্দেশ্যে শূন্য থালার দিকে ছুঁড়ে দিতে লাগলো সিঁকি আধুলি। ঝন ঝন করে শব্দ হতে লাগলো। বানরটি হ্যাঁ করে মৃতদেহের পাশে বসে হতভম্ব হয়ে দেখতে লাগলো সেই দৃশ্য। রাস্তার ওপরে ঠনঠন করে পয়সা পড়ছে। ও একবারও অন্যান্য দিনের মতো পয়সাগুলো কুড়াতে গেল না।’

বাংলাদেশে অসংখ্য হাওর-বাঁওড় আর বিল রয়েছে। এই বিলের জীবন নিয়ে রচিত গল্প ‘বিল’। যেখানে একজন সমাজসচেতন শিক্ষিত মধ্যবয়সী মানুষ আজহার নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছে। আজহারের স্ত্রী তামান্না আমেরিকাতে এক ইহুদির সঙ্গে ঘরকন্না করছে। একমাত্র পুত্রটিকেও তামান্না সেই ইহুদির পুত্র হিসেবেই বড় করে তুলছে। এই রকম পরিস্থিতে আজহার বিলের মধ্যে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মাছচাষ ও কৃষিকাজ করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালাচ্ছে। এই সংগ্রামে এসে বাঁধ সাধে দুর্বৃত্তরা। সংগ্রামী আজাহার দৃর্বৃত্তদের চাঁদা না দিয়ে গ্রহণ করে তাদেরকে শায়েস্তা করার পথ। বাঁধে দ্বন্দ্ব। রাত দুপুরে গুলিবিদ্ধ হয় আজাহার। মোটামুটি এই হচ্ছে ‘বিল’ গল্পটির কাহিনি। কিন্তু কাহিনি ছাড়িয়ে গল্পটির আবেদন আরও মানবিক আর স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে আজাহার আর ফরির মার মানবিক সংবেদনায়। লেখকের হাতে আজাহার আর ফরির মা হয়ে উঠেছে জীবন্ত। মানুষের বেঁচে থাকার মৌল প্রেরণা যে প্রেম, এ গল্পে এসে তাই পরিণতি পায় লেখকের হাতে। শেষপর্যন্ত গল্পটি হয়ে ওঠে নিখুঁত প্রেমের গল্প। বিবেচনার জন্য গল্পের শেষটুকু তুলে ধরছি :

‘দুই চোখের কোয়া বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো আজহারের। বুকের ভেতর একটা কান্না উথলে উঠছে। ফরির মারও চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। মনে হলো, সবকিছু শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। ফরির মার চোখের দিকে তাকিয়ে বুকের উপরে রাখা হাতটা শেষ অবলম্বনের মতো হাতের মুঠোয় পুরে আরো জোরে চেপে ধরলো সে। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে কী যেন ভাবতে লাগলো আজহার। ভাবতে ভাবতে তন্দ্রার মধ্যে ডুবে যায় সে। তন্দ্রার গভীরে ডুবতে ডুবতে বিলের স্বপ্ন দেখতে লাগলো আজহার।

বিলের কিনারে হাজার হাজার পাখি উড়ে এসে বসছে। কয়েকজন বন্দুকধারীর গুলির আওয়াজে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যাচ্ছে পাখি। ঝাঁক ঝাঁক হাঁস দেখে সে। হাঁসগুলো ভেসে যাচ্ছে বিলে। একবার পাখি দেখে আজহার, আর একবার হাঁস দেখে সে। হাঁস নয়। হাঁসের মতো ফরির মাকে বিলের পানিতে ভেসে যেতে দেখ আজহার। রূপালি মাছ হয়ে ভেসে যাচ্ছে ফরির মা।

মাছের পেছনে পেছনে আজহারও ছুটে যেতে লাগলো।

ধরা-ছোঁয়ার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে মাছটা। মাছ নয়। পাখি।

পাখি হয়ে ফরির মা আকাশে উড়ে যাচ্ছে।’

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে একজন পতিতা সাবেরার বেঁচে থাকার প্রচেষ্টাকে উপজীব্য করে লেখা গল্প ‘পাথরের মূর্তি’। যে গল্পে গল্পকার হোসেনউদ্দীন হোসেন মানবচরিত্রের আপাত অসংগতির মধ্যে সংগতির সন্ধান করেছে না। গল্পটির কাহিনি হচ্ছে বাঁচার জন্য পতিতা সাবেরার অন্ধকার ঘরে হঠাৎ করে বহু মানুষ এসে আশ্রয় নেয়। এই মানুষগুলোর বাঁচার জন্য আর্তনাদ, জীবনোপলব্ধি আর আচরণ সাবেরা চরিত্রের মনোজগতের এক পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়। সাবেরার মনোজতে ধরা দেয় মানুষের চরিত্রের অসংগতি। মূলত এই অসংগতির মধ্যে সংগতির সন্ধানই গল্পটিকে করে তুলেছে অসাধারণ। গল্প পাঠে মানবচরিত্রের এই অসংগতি শেষপর্যন্ত আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়।   দৃষ্টান্ত :

‘ঘরের মধ্যে একটা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। থরথর করে কাঁপতে লাগলো সাবেরা। এক সময় বুটের শব্দও বাতাসে মিলিয়ে গেল। শত্রুরা নদী পার হয়ে দূরে আরো দূরে গিয়ে অবস্থান নিল।

শত্রুরা শহর ছেড়ে চলে যেতেই ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা লোকগুলো বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠলো। খাঁচায় আবদ্ধ পাখিরা যেমন ঝটপট করে, ঠিক তেমনিভাবে লোকগুলো ছটফট করলেও বাইরে বেরিয়ে আসার শক্তি ও সাহস কারোর ছিল না।

সাবেরা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে গিয়ে দরোজা খুলে দিল।

কয়েকজন লোক বুনো জন্তুর মতো হুড়মুড় করে বেরিয়ো যাওয়ার জন্যে ঠেলাঠেলি করতে লাগলো। সাবেরা মাথা নিচু করে দরোজার গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল।

সবার শেষে বেরোলো সেই লোকটি। যে সারা রাত সাবেরার চরণ আকড়ে ধরে তেষ্টায় বুক ফাটিয়েছে।

লোকটি দরোজার কাছে এসে চোখ দুটো মেলে একবার সাবেরাকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলো। মুতূর্তেই চোখ দুটো লাল হয়ে উঠলো লোকটার।

সাবেরা লোকটিকে চিনতে পারলো।

শহরের সবচেয়ে বড় যে মসজিদ, সেই মসজিদের বড় ইমাম, বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা, ইসলামি সমাজসংস্কারক, মওলানা খায়রুল বসার আল জাফরী। এই লোকটিই তো ধর্মীয় জিগির তুলে এই শহরের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে এক বছর আগে পতিতা পল্লীতে অগ্নি সংযোগের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

এখন তারই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে সাবেরা।

মাওলানার চেহারাটা মুহূর্তেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো। তিনি ওয়াকওয়াক করে গলা টেনে কয়েকবার থুথু ফেললেন। তারপর লম্বালম্বা পা ফেলে রাস্তায় নামলেন।

দোরগোড়ায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো সাবেরা।

যেন সে পাথরের মূর্তি হয়ে গেছে।’

হোসেনউদ্দীন হোসেনের সৃষ্ট মানুষগুলো অসাধারণ না হলেও জীবন্ত। এই মানুষগুলোকে তিনি প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করে চেষ্টা করেছেন তাদের ভেতরকার মানবিক-সত্তা ও অস্তিত্বকে প্রকাশ করাতে। চেয়েছেন দারিদ্র্য, অভাব-অনটন, প্রেম-কাম-রিরংসা, হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে। এই তার শিল্পীস্বভাব, এই তার ছোটগল্পের চরিত্রলক্ষণ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares