সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

ফেরদৌসী মজুমদার : বাংলাদেশ-থিয়েটারের কিংবদন্তি

September 20th, 2016 8:12 am
ফেরদৌসী মজুমদার :  বাংলাদেশ-থিয়েটারের কিংবদন্তি

সংস্কৃতি

ফেরদৌসী মজুমদার :

বাংলাদেশ-থিয়েটারের কিংবদন্তি

অপূর্ব কুমার কুণ্ডু

 

মহাকাব্য শাহনামার রচয়িতা যে ইরানের মহাকবি ফেরদৌসী- এ কথা কমবেশি সবার জানা। কিন্তু যেটি অল্প জানা, তা হলো মহাকবির প্রকৃত নাম মোহাম্মদ আবুল কাশেম। ‘ফেরদৌসী’ তাঁর উপাধি। রাজদরবারে প্রথম সাক্ষাতে কবির স্বরচিত কবিতার আবৃত্তি শুনে মুগ্ধ গজনির সুলতান মাহমুদ কবিকে উপাধি দিলেন ‘ফেরদৌসী’। যার অর্থ স্বর্গীয় সুষমা। বাংলাদেশের আলো-আঁধারি রহস্যে ঘেরা রঙ্গমঞ্চে তেমনই সুষমায় বিকশিত এবং প্রকাশিত অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। মঞ্চ-দূরদর্শন-বেতার- চলচ্চিত্র-সাহিত্য শিক্ষা প্রভৃতি মাধ্যমে ফেরদৌসী মজুমদারের বলিষ্ঠ উপস্থিতি  কি ধূমকেতুর আলোর রোশনাই ছড়িয়ে বিলীন হয়ে যাওয়া নাকি ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে চিরন্তন জ্বলে থাকা! প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাওয়াটা কি শুধুমাত্রই অভিনীত চরিত্রে রূপদান নাকি যা কিছু বিশ্বাস, যা বলবার তা বলার জন্যে শিল্পকে আঁকড়ে দিনের পর দিন সত্তার আত্মা অনুসন্ধান! ৭৩ বছরের এই চলমান যাপিতজীবনে ৫৮টা বছর তো শিল্পমাধ্যমে শিল্পসৃজনে নিবেদিত থাকা মুখের কথা নয়। তবু তিনি পারলেন, পারছেন এবং এই মুহূর্তেও অপরকে পারার সাহস জোগাচ্ছেন। অভিনয়, নির্দেশনা, রচনা, শিক্ষকতা, সংসার, সুস্থতা-অসুস্থতা কোনো কিছুকেই উপেক্ষা না করে সংকটে সম্ভাবনায়, ভালো-মন্দয়, বিপদে-সম্পদে, চেতনে-অচেতনে শিল্পসৃজনের বুকভরা ব্যথা নিয়ে যিনি দৃপ্তপ্রত্যয়ে উচ্চারণ করেন : আমার প্রার্থনা আমার কণ্ঠ যেন থেমে না যায়, পা দু’টো যেন সচল থাকে, আমি যতদিন বাঁচব যেন নাটকের হয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে জীবনের কথা বলতে পারি- তিনি, তিনি তো আর কেউ নন, তিনি শুধুই তিনি, তিনি লিজেন্ডÑ অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার।

লিজেন্ড তথা কিংবদন্তি কিংবা স্বল্পস্থায়ী, মূল্যায়নের পরিমাপের প্রশ্নে সৈয়দ জামিল আহমেদের স্থির সিদ্ধান্ত : আপনাকে ফেরদৌসী মজুমদারের কাজগুলো দেখতে হবে। সব কাজ আপনি দেখতে পারবেন এমন না। তবে যারা তাঁর সাথে একত্রে কাজ করেছেন, কাজ দেখেছেন তাদের মতামত নেবেন। দেখা, শোনা এবং পড়ার মধ্যে দিয়ে ফেরদৌসী মজুমদারের করণীয় কাজের যে বৈশিষ্ট্যগুলো আপনি পাবেন সেখানেই মূলত তাঁর অস্তিত্ব।

আভিজাত্যের অস্তিত্ব মানুষের হাতে থাকে না, থাকে মনে। ফলে হা-হুতাশ কিংবা নেই নেই ভাব কোনো দিনই ছুঁতে পারেনি ফেরদৌসী মজুমদারকে। তথাপি গবেষক বিপ্লব বালা, সম্পাদক হাসান শাহরিয়ারের নেওয়া সাক্ষাৎকার এবং থিয়েটার আর্ট ইউনিটের নাট্যকর্মী সাইফ সুমনের অনুলিখনে থিয়েটারওয়ালা জানুয়ারি-মার্চ, ২০০৬ সংখ্যা থেকে জানা যায়, উতলা প্রশ্নের বিবাগী উত্তর। মামুন ভাই ছাড়া আমাদের দেশের আর কোনো ডিরেক্টার কি আছেন যার নির্দেশনায় কাজ করেননি বলে আপনি অতৃপ্ত? প্রতি উত্তরে তিনি বলেন, ওভাবে ভাবিনি। তবে জামিল আহমেদের নির্দেশনায় কাজ করার ইচ্ছা ছিল। আমি ওর বিষাদ সিন্ধু দেখেছিলাম। খুব ভালো লেগেছিল। তখন আমার মনে হয়েছিল ওর সাথে একটা কাজ করতে পারলে ভালো হতো।

ভালো হতো কি মন্দ হতো সেটা আমরা জানতে পারতাম যদি তেমনটা ঘটতো। তবে যেটি ঘটেছে তা হলো ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউট এবং ঢাকাস্থ ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় প্রযোজিত, ব্রিটিশ নির্দেশক ডেবোরা ওয়ার্নার নির্দেশিত টেম্পেস্ট নাটকের মঞ্চায়নে- এরিয়েলের চরিত্রে অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। মঞ্চ, আলো এবং পোশাকে জামিল আহমেদ। এরিয়েল চরিত্রটি বায়বীয়, বাতাসেই তার অবস্থান যদিও সীমিত পরিসরে মর্ত্যরে মাটিতে নামলে মানবিক অনুভূতি তার মধ্যে প্রকাশ পায়। ফেরদৌসী মজুমদারের অভিনয় এবং জামিল আহমেদের আলোক প্রক্ষেপণ আজও চিত্রপরিচালক তানভীর মোকাম্মেলের দৃষ্টিতে প্রজ্বলমান। তাঁর দৃষ্টিতে, অতি দ্রুত গতি দেখাতে সিনেমাটোগ্রাফিতে যেমন স্লো-মোশন দেখানো হয়, এরিয়েলের সদা-ধাবমান দ্রুতগতির রূপটি, ফেরদৌসী মজুমদারের অতি ধীরলয়ের মুভমেন্ট এবং জামিল আহমেদের দ্রুতলয়ের আলোর মুভমেন্টের মাধ্যমে বৈপরীত্যের মাঝে আসলটি ফুটিয়ে তোলার কুশলী ছাপ প্রতীয়মান হয়।

প্রতীয়মান সত্য সীমিত পরিসরে হলেও একত্রে উভয়ের কাজ করা হয়েছে। তাই অভিজ্ঞতার আলোকে ফেরদৌসী মজুমদারের অস্তিত্বের মূল্যায়নে সৈয়দ জামিল আহমেদকে দৃষ্টিভঙ্গি জানার ব্যাপারে প্রশ্ন করাই যায়। প্রশ্নের উত্তরে তাঁর তেজোদীপ্ত সিদ্ধান্ত :

Printদেখুন আজকের জাতীয় নাট্যশালার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের আলোকে মূল্যায়নপত্র তৈরি করলে তা অসম্পূর্ণ হবে। আপনাকে বুঝতে হবে, মহিলা সমিতি, গাইড হাউজ কিংবা অন্যান্য হলে সংলাপ উচ্চারিত হলে তা প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। একোসটিক ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা নেই। পুরো মঞ্চ আলোকিত করবার মতো আলোক প্রক্ষেপণ স্থান এবং যন্ত্রপাতি নেই। ভালো মঞ্চে ন্যূনতম শর্ত ৩৫ ফুট প্রসার, ৫০ ফুট গভীর, ১৬ ফুট উচ্চতা সেসব কিছু নেই। ভালোভাবে মেকআপ দেয়ার জন্যে আয়নার তিন ধারে বৈদ্যুতিক আলো লাগাবার ব্যবস্থা নেই। এই নেই এর মধ্যেও অভিনেত্রী হয়ে ফেরদৌসী মজুমদার যখন মঞ্চে প্রবেশ করেন, দর্শকদের সবার দৃষ্টি নিজের ওপর নিবদ্ধ করান, প্রথম সারি থেকে শেষ সারির দর্শককে পর্যন্ত সংলাপ প্রক্ষেপণের গাঁথুনিতে বাঁধতে পারেন, শীতাতপ সুবিধা ছাড়াই দেড় দুই ঘণ্টার জোরালো বাচিক-আঙ্গিক সাত্ত্বিক অভিনয়ে চরিত্রকে পুরোপুরি মেক বিলিভ করতে সক্ষম হন, তিনি যে এগুলো কীভাবে পারেন, সেটি আমার কাছে সত্যি বিস্ময়।

বিস্ময় বললেই সব বলা হয়ে যায় না। ন্যূনতম একটা ব্যাখ্যা দাবি করে। সেক্ষেত্রে ওপার বাংলার অভিনেতা গৌতম হালদারের বক্তব্য নাটকীয় এবং সুনির্দিষ্ট। গৌতম হালদার সেই গৌতম হালদার যিনি একক অভিনয়ে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য মঞ্চে উপস্থাপন করেন। সেই গৌতম হালদার যিনি গত ২৯ আগস্ট এই মঞ্চে ঢাকা থিয়েটারের আমন্ত্রণে একটিমাত্র চেয়ারে বসে টানা পঞ্চান্ন মিনিট একক অভিনয়ে প্রেমচাঁদ মুন্সির বড়ভাই সাহেব অবলম্বনে বড়দা নাটক উপস্থাপনা করেন। যদিও একটিমাত্র চেয়ারে বসে অভিনয় করার মতো করে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা চলাকালীন ফেরদৌসী মজুমদার হুইল চেয়ারে বসে অখণ্ড কোকিলারা নাটকের খণ্ডিত অংশ উপস্থাপন করেছিলেন কিন্তু সেটি গৌতম হালদার দেখেননি। তিনি দেখেছেন কলকাতার একাডেমিতে বসে নাট্যোৎসবে কোকিলারা এবং পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের রঙ্গমঞ্চে অভিনীত প্রথম একক অভিনয়ে অভিনীত নাটক কোকিলারা কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলে আলোচনার ঝড় তোলে এবং আনন্দবাজারের মতো ঐতিহ্যবাহী এবং পাঠকপ্রিয় পত্রিকার অর্ধেক পৃষ্ঠাজুড়ে গবেষক-লেখক-সমালোচক পবিত্র সরকারের পর্যালোচনা ‘ফেরদৌসীর কোকিলারা দেখবার মতো’- শিরোনামে লেখা ছাপা হয়। এসবেরই আলোকে গৌতম হালদারের বিশ্লেষণ :

Printদেখ অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার মঞ্চে কী করেন। চূড়ান্ত ইমোশন তৈরি করেন। যে কারণে দর্শক আবেগে আপ্লুত হন। ইমোশন তৈরির জন্যে তিনি নিজেই মোশন তথা গতিশীলতাপ্রাপ্ত হন। এই মোশন তার মধ্যে কীভাবে আসে? না, আসে একারণে যে তিনি তার করণীয় কাজটাকে যতদূর পর্যন্ত ভালোবাসা যায় তার সবদিকের সবটুকু আষ্টেপৃষ্ঠে ভালোবাসেন। এই ভালোবাসা কিন্তু কথার কথা না। ধর তুমি একটি অভিনয়ের অফার নিয়ে তার হাতে ব্ল্যাঙ্ক চেক এগিয়ে দাও। তিনি যদি দেখেন অভিনয়ের সম্ভাব্য চরিত্র তাঁর বিশ্বাসের পরিপন্থি, চরিত্রের নীতিগত অবস্থান দোদুল্যমান, ভাব ও আদর্শগত দিক দিয়ে দর্শকদের মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থি তবে তিনি কালক্ষেপণ না করেই তোমাকে তোমার ব্ল্যাঙ্ক চেক ব্ল্যাঙ্ক রেখেই ফেরত দেবেন এবং সবিনয়ে তোমার অফার তিনি তোমাকেই ফেরত দেবেন।

ফেরত দিতে পারাটা যদি হয় দৃঢ়তার তবে কেড়ে নেওয়াটা হতে পারে যে কত ভেঙে পড়ার তার চূড়ান্ত সাক্ষী  নির্দেশক নাসিরউদ্দিন ইউসুফ :

মঞ্চে মঞ্চস্থ হচ্ছে ‘এখন দুঃসময়’। বন্যার বানের তোড় সর্বগ্রাসী হয়ে গ্রাস করছে সব কিছু। বুকের সন্তানকে বানের তোড়ের হাত থেকে বাঁচাতে মরিয়া মা জরিনারূপী অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। হঠাৎ তোড়ের আঘাতে কোল ছিটকে সন্তান পানিতে ভেসে যায়। তখন মরিয়া মা জরিনা দেখে মঞ্চের আলো একে একে সব নিভে যায়। অন্ধকার, চারদিকে অন্ধকার। অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার সন্তান হারানোর আকুতি নাভিমূল থেকে একটা চিৎকার দেন।

সেই চিৎকারের স্মৃতি রোমন্থনের মুহূর্তেও নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বিচলিত এবং শিহরিত। তাঁর অবিচল সিদ্ধান্ত :

Print

ফেরদৌসী আপার সেই বিলাপ প্রক্ষেপণ এতো হৃদয়স্পর্শী, এতই মর্মস্পর্শী, এতো বেশি মনে আঘাত-প্রতিঘাত করে যে, দর্শক হিসেবে তার সাথে একাত্ম না হয়ে পারা যায় না। চমকে না উঠে পারা যায় না এবং চমৎকৃত না হয়ে পারা যায় না।

চমৎকৃত নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বিটিভির সেটে ‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’ টিভি নাটকের প্রযোজক হিসেবে। নাটকটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে পল্লীরমণী হিসেবে অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। সংলাপ তাঁর শুধু মুখস্থ না বরং আত্মস্থ। দৃশ্যায়ন কেমন, পোশাক কেমন, গয়না কী পরবেন, শাড়ির রং যেমন ব্লাউজের রং-ও কি তেমন হবে ইত্যাদি নানান ডিটেইল তিনি আমার কাছ থেকে বারংবার জিজ্ঞাসা করে জেনে নিয়েছেন। চরিত্রের রূপায়ণে তিনি তার মতো ভেবেছেন, আমার সাথে ভাবনাবিনিময় করেছেন। কখনও সহমত হয়েছি কখনও দ্বিমত হয়েছি। আমি প্রযোজক, আমাকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে তিনি আমার কথাই শেষপর্যন্ত শুনে, তাঁর অভিজ্ঞতার মিশেলে চরিত্রকে বিনির্মাণ করেছেন। মাথা নুইয়ে স্বগোতক্তি ভঙ্গিমায় নাসিরউদ্দিন ইউসুফের আত্মকথন, এই যে নির্দেশনা গ্রহণ করার ক্ষমতা এতটা অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদারের বড় গুণ। তিনি হয়ত ভাবতে পারতেন আমি বড় শিল্পী, ইউসুফ আমার চেয়ে অনেক ছোট, তাঁর সব কথা আমি কেন মানবো? না, তা তিনি করেননি। তাঁর জনপ্রিয়তা, তার মাথায় চেপে বসেনি। তাঁর নাম-যশ-প্রতিপত্তি তাঁর মাথায় চেপে বসেনি। যে কারণে আমাদের দেশের মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটকের ধারাবাহিকতায় তিনি একজন বড় মাপের অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর কর্মের স্বাক্ষর ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

সক্ষমতার দৃশ্যে অক্ষমতা প্রকাশের যেকোনো মানে হয় না সে শিক্ষা শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী পেলেন টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘সংশপ্তক’-এ অভিনয় করতে গিয়ে। হুরমতি চরিত্রে ফেরদৌসী মজুমদার, লিয়াকত আলী লাকী জমিদারের তাঁবেদার। ত্রিশের দশকের গ্রাম বাংলার পটভূমিতে জমিদারের শোষণ, নায়েবের কূটচালে সমাজচ্যুত হুরমতি প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন অন্যায় অবিচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে। ফলে আরও বেশি নিষ্পেষণের আঘাত আসে হুরমতির ওপর। দৃশ্যটা এমন, রান্নাঘরে রান্নারত হুরমতিকে বের করে চুলের ঝুঁটি ধরে টেনেহিঁচড়ে ক্ষেতের আল দিয়ে মিয়া বাড়ির দরবারে নিয়ে আসতে হবে। এই জঘন্য কাজটা সুনিপুণভাবে করতে হবে অভিনেতা লিয়াকত আলী লাকীকে। ক্যামেরা রোলিং, থ্রি টু ওয়ান, দৃশ্যায়ন শুরু। রান্নাঘর থেকে সফলভাবে টেনে বের করার দৃশ্য ওকে ক্ষেতের আল দিয়ে টানার দৃশ্যের আগমুহূর্তে সুযোগ পেয়ে সহশিল্পী লিয়াকত আলী লাকীকে চুপি চুপি বলছেন অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার : চুলের ঝুঁটি ধরে টানবি, আমি যাব না অথচ টানের জোরে যেতে বাধ্য হবো, এরকম ক্ষেত্রে এত হালকা করে টানলে হয়! তোর যেভাবে খুশি, যত জোরে পারিস আমাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যা।

Print

ফেরদৌসী মজুমদারের কথায় সাহস পেলেন লিয়াকত আলী লাকী। বাস্তবের আদলে অভিনয়টা করলেন। প্রচারের পর সংশপ্তক নাটকের একটি অন্যতম দৃশ্য হিসেবে আলোচিত এবং প্রশংসিত হলো। লিয়াকত আলী লাকী উপলব্ধিতে পৌঁছালেন, ফেরদৌসী মজুমদার অভিনয়ের ক্ষেত্রে কম্প্রোমাইজে রাজি নন এবং একমাত্র নিজের সফলতা তাঁর চাওয়া নয়।

চাওয়া না পাওয়ার প্রসঙ্গ। শেক্সপিয়রে অবগাহন করা, বার্নাড’শ-এ নিমগ্ন হওয়া, কবর নাটকের রচয়িতা তথা আধুনিক নাটকের প্রবক্তা মুনীর চৌধুরীর প্রস্তাব আজকের ফেরদৌসী মজুমদার তথা সেদিনের বোন ফেরদৌসীর ওপর। তুই নাটক করবি। প্রতি উত্তর, আমি আবার কী নাটক করবো। কেন বাড়িতে যত লোক আসে, তারা চলে যাবার পর তুইতো তাদের নকল করে দেখাস। এটাইতো অভিনয়, এটাই নাটক। উত্তর, কিন্তু আব্বা যদি বকেন। আব্বা শুনলে তো মেরেই ফেলবে। আব্বাকে নিয়ে ভাবিস না। আব্বাকে সামলানোর দায়িত্ব আমার। নাট্যকার শওকত ওসমান। নাটক ডাক্তার আবদুল্লাহ্র কারখানা। প্রথম মঞ্চায়ন হবে ইকবাল হলে। তোর চরিত্র রোবটের। হাতপা টান টান করে তুই শুধু কথা বলবি। ১৯৬০ সাল। মুনীর চৌধুরীর হাতে হাত ধরে, স্বাধীন বাংলাদেশ পেল যে লিজেন্ড অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদারকে, সে-সময়ের সে মঞ্চায়নের মধ্যে দিয়েই মঞ্চাভিনয় জীবনের পথ চলার হাতে হাতখড়ি।

হাতখড়ি হয় সেøটে চক ঘষে কিংবা কাগজে পেন্সিল টেনে তার অর্থতো এই নয় যে ওই হাতে লাঠি তথা দ- উঠবে না। তবে ১৯৬৩ সালে পাবলিক লাইব্রেরি মঞ্চে (আজকের নাটমন্ডল) মুনীর চৌধুরীর দ- এবং দ-ধর একাঙ্কিকা দুটিতে অভিনীত চরিত্রে স্বামীর ভূমিকায় তখনকার বাংলা বিভাগের শিক্ষক রফিকুল ইসলাম, চোরের ভূমিকায় মুনীর চৌধুরী এবং স্ত্রী চরিত্রে ফেরদৌসী মজুমদার। স্বামীর কোটের পকেটে প্রাপ্ত ডায়েরির সুবাদে সন্দেহ, স্ত্রী বুঝি অন্য কারও সাথে প্রেম করছে। অন্যদিকে স্বামীর ব্রিফকেস থেকে প্রাপ্ত যুবতী মেয়ের ছবি দেখে স্ত্রীর সন্দেহ স্বামী বুঝি ওই যুবতীর প্রতি আসক্ত। কথা নিয়ে কথা কাটাকাটি, ঝগড়া থেকে ক্লান্তি, অতঃপর ঘুম। মাঝরাতে লাঠি বাড়িয়ে চোর মালামাল নিয়ে লাপাত্তা। ডায়েরিটা দাঁতের ডাক্তারের ফেলে যাওয়া, তা কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে ভাবনায় স্ত্রী ভাবিত আর যুবতীর ছবিটা ছাড়া এডভোকেট স্বামী কীভাবে কোর্টে আইনি প্রমাণে সাক্ষ্য উপস্থাপন করবেন তা নিয়ে ভাবিত। অহেতুক সন্দেহের অবসানে স্বামী স্ত্রী উপলব্ধি করে, তারাই পৃথিবীর সেরা জুটি। তখনকার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছেলেমেয়েদের একটু স্বাধীনভাবে কথা বলা, দুদ-পথ চলা যেখানে নিয়ন্ত্রিত সেখানে এই ত্রিরত্নের অভিনয় দেখা মুক্তাঙ্গনে বুক ভরে বাতাস নেবার মতো। ফেরদৌসী মজুমদারের চরিত্রাভিনয়ে পুরো ক্যাম্পাসের তারুণ্য যে প্রাণবন্ত সেকথা আজও বন্ধু, ক্লাসমেট, লেখক রশীদ হায়দারের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

এক, ফেরদৌসী মজুমদার যখন মঞ্চের অভিনীত চরিত্র তখন তিনি শিল্পলোকের এক বাস্তব বাসিন্দা। দুই, শিল্প ও সংস্কৃতিচর্চা তার কাছে আরাধনা।

আরাধনা ছাড়া যে আরাধ্য লাভ হবে না। এ ব্যাপারে বরাবরই আপসহীন ছিলেন বাবা আবদুল হালিম চৌধুরী। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার কারণে প্রশাসনিক কাজে তিনি যেমন কঠোর ঠিক তেমনি কঠোর চৌদ্দ ছেলেমেয়েকে মানুষ করে গড়ে তোলার প্রশ্নে। কার স্কুলের সময় কখন, কে কখন কোথায় ঘুরতে যায়, কার সাথে মেশে, কী করে, বাড়ি ফিরতে দেরি কেন, পড়ায় মনোযোগ নাকি গভীর ফাঁকি, পড়া গড় গড় করে মিন মিন করে নাকি ছন্দে ছন্দে পড়ে, জুতা খুলতে খুলতে কোনটা পালায় আবার মার খাওয়ার চেয়ে সম্মানের হানি কোনটার মনে বিশেষ দাগ ফেলায় এরকম সহস্র সচেতন বৈশিষ্ট্যের পিতাকে আজীবন শ্রদ্ধা করে চলেছেন চৌদ্দর মধ্যে ওপর থেকে নিচ অভিমুখী এগারোতম সন্তান ফেরদৌসী মজুমদার। বাবার কাছ থেকে শিখেছেন, অনুকূল কিংবা প্রতিকূল অবস্থা যেমনই হোক মিথ্যার আশ্রয় না নেওয়া। সবসময় নিজের সক্ষমতার অর্থ বোঝার চেষ্টা, নিজেকে রক্ষা করে চলা এবং কোনো অবস্থায় নিজেকে অপমান না করা।

ফেরদৌসী মজুমদারের মা আফিয়া বেগম কোনো বিদ্যালয়ে পড়েননি। তথাপি চৌদ্দ ছেলেমেয়ের সকলেই কমবেশি প্রতিষ্ঠিত- কবীর চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী, ফেরদৌসী মজুমদারের মতো রত্ন ধারণ করলেন রত্নগর্ভা। ২৯ আগস্ট জাতীয় নাট্যশালার মঞ্চে ঢাকা থিয়েটারের আমন্ত্রণে সেলিম আল দীন নাট্যোৎসবে গৌতম হালদার পরিবেশন করেন প্রেমচাঁদ মুন্সীর বড়দা। বড়ভাই ছোটভাইকে বলে, ভাই তুমি হয়ত সামনের বছর পাস করে আমার ক্লাসে আসবে। তারপর হয়ত আমাকে ফেলে ম্যাট্রিক, অনার্স, মাস্টার্স শেষ করে এমফিল, পিএইচডি; তিনটি ডিগ্রি নেবে। কিন্তু তুমি যত ডিগ্রি আর সার্টিফিকেট নাও না কেন, আমি যে তোমার বড়দা, পাঁচ বছরের বড়, সে বড় থাকবো আজীবন। আমাদের মা কোনো স্কুলে পড়াশুনা করেনি। কিন্তু তিনি তার জীবন অভিজ্ঞতায় এমন জ্ঞান রাখেন, যা দিয়ে তোমাকে আমাকে শোধরাবার এবং শেখাবার ক্ষমতা রাখবেন আজীবন। ভাই আমার, অহঙ্কার ভালো না। অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদারের মা আফিয়া বেগম তেমনি নিরহঙ্কারী, জীবন বোধে শিক্ষিত, শেখাবার এবং শোধরাবার মতো স্বর্ণগর্ভা মমতাময়ী মা।

Printমায়ের ব্যাকুলতা নিয়ে সন্তানের প্রতি ধ্রুপদী ঘরানার চিঠি লেখা, দীর্ঘ কবিতা হৃদয়ে আত্মস্থ করা, কথায় কথায় প্রসঙ্গের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ শ্লোক কাটা, আজীবন সমস্ত সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে স্বামীর সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত সত্য জেনে নির্ভর করা, স্বামীর কাছ থেকে পড়া শিখে সাহিত্যের অতলে ডুব দেওয়া, প্রচণ্ডধী শক্তিসম্পন্না এবং সর্বাবস্থায় ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার সহনশীল এবং সরল মনের ভাবনা নিয়ে পথ চলার মানুষ যিনি মা আফিয়া বেগম তিনি এবং স্বামী মিলে যে ফল-পুষ্পশোভিত বাগান গড়বেন এটাইতো স্বাভাবিক কথা।

সাহিত্যিকেরা সত্যদ্রষ্টা এবং ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। মুনীর চৌধুরী কলম ধরলেন। অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার জোহরা হয়ে রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকে আকুতি জানালেন, যুদ্ধ মানবতার শত্রু, যুদ্ধ সর্বগ্রাসী, যুদ্ধ সব জ্বালিয়ে দেয় পুড়িয়ে দেয়, যুদ্ধ নয় শান্তি চাই, মানবাত্মার মুক্তি চাই। তবুও রক্তাক্ত প্রান্তরের মধ্যে দিয়েই এগিয়ে যেতে হলো আমাদের। নিপীড়করা নিপীড়িতদের আর্তনাদ শুনলো না।

ঢাকা টেলিভিশনের অনুষ্ঠান অধ্যক্ষ কলিম শরাফীর কথা মানলেন মুনীর চৌধুরী। মুনীর চৌধুরীর কথা রাখলেন ফেরদৌসী মজুমদার। ঢাকা টেলিভিশনের জন্যে মুনীর চৌধুরী প্রথম নাটক লিখলেন একতালা দোতালা। প্রাণবন্ত অভিনয় করলেন ফেরদৌসী মজুমদার। মঞ্চের মতোই টেলিভিশন মাধ্যমেও বড় ভাইয়ের মাধ্যমে বোনের হাতেখড়ি।

হাতেখড়ির পর বিপদে সম্পদে, দুঃসময় সুসময়ে পরস্পর একে অপরকে আগলে রাখতে, শিল্প সংগ্রামের কঠিন পথ পাড়ি দিতে, একটা অর্থবহ জীবন গড়ে তোলার দৃপ্ত প্রত্যয় নিয়ে, শিল্পসঙ্গীর পাশাপাশি জীবনসঙ্গী হতে ফেরদৌসী আবার হাতে হাত রাখলেন শিল্পবন্ধু, সুহৃদ, অভিনেতা রামেন্দু মজুমদারের।

Printঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা এবং আরবি বিভাগ থেকে ডাবল এমএ কোর্স সম্পন্ন করে নয়াদিল্লির নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেলোশিপ লাভ করলেন। করাচির নজরুল ইন্সটিটিউটে অধ্যাপক মুজিবর রহমান খানের নির্দেশনায়, মুনীর চৌধুরীর রচনায় ‘জমা খরচ ও ইজা’ নাটকে অভিনয় করলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আবৃত্তি করলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ের আনন্দে বিভোর হলেন। ১৮ ডিসেম্বর রামেন্দু মজুমদারের মতো বলিষ্ঠ মানুষকে ভেঙে পড়তে দেখে অশনিসংকেতে আঁতকে উঠলেন। নেই, মুনীর ভাই নেই… আমার মুনীর ভাই নেই।

’৭১-এর ফেব্রুয়ারি, নাট্যদল থিয়েটারের প্রতিষ্ঠা। কলকাতায় ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী মেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রযোজিত ‘কেউ কিছু বলতে পারে না’ নাটকে ফেরদৌসী মজুমদার অভিনীত চরিত্র রিজিয়া। ১৯৭৩-এর ১৮ জুন নবজন্ম। ফেরদৌসী মজুমদারের কোলজুড়ে এল ত্রপা মজুমদার। সেদিন ফেরদৌসী মজুমদারের সকল অপূর্ণতা যেন কানায় কানায় ভরে উঠলো। ত্রপার ঢলঢলে কচি মুখখানার দিকে চেয়ে মা ফেরদৌসী মজুমদারের স্থির সিদ্ধান্ত, ত্রপার অপেক্ষায় আমার এতদিনের উতলা, বিনিদ্ররজনী, বিষণ্ন দিন সে-তো ওকেই না পেয়ে। আজীবন রবীন্দ্রনাথকে জীবন দেবতা জ্ঞানে আঁকড়ে ধরা ফেরদৌসী মজুমদার, কচি ত্রপার গালে হাত বুলাতে বুলাতে গুণগুণিয়ে যেন গেয়ে উঠলেন রবীন্দ্রনাথের গাওয়া গানের কলি :

ইচ্ছে হয়ে ছিলি মনের মাঝারে

ছিলি আমার পুতুল খেলায়

প্রভাতে শিব পুজোর বেলায়

তোরে আমি ভেঙেছি আর গড়েছি।

 

আবদুল্লাহ আল-মামুন লিখলেন নাটক সুবচন নির্বাসনে। নীতিবান পিতার কাছ থেকে বড় সন্তান খোকন শিখেছে, সততাই মহৎ গুণ। কথাটা আঁকড়ে ধরতে যেয়ে চাকরি জুটলো না, কপালে জুটলো কয়েদখানা। দ্বিতীয় পুত্র তপনকে শিখিয়েছেন, লেখাপড়া করে যেই গাড়ি ঘোড়া চড়ে সেই। লেখাপড়া ঠিকই শিখল তপন কিন্তু গাড়ি জুটলো না। গাড়ি যখন জুটাতে গেল তখন নীতিভ্রষ্টরা নীতির দোহাই দিয়ে তপনকে কয়েদখানায় ভরলো। কন্যা রানু পিতার কাছ থেকে শিখেছিল, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে কিন্তু বাস্তবিক সংসারের গুণ ধরে রাখতে যেয়ে দোষে দুষ্ট হলো। স্বামীর চাকরি বাঁচাতে স্বামীর নির্দেশে অফিসের বসের সামনে নিজেকে মেলে ধরতে না পারার অপরাধে রানু স্বামীর বাড়ি থেকে হলো নির্বাসিত। অতএব দোদুল্যমান জটিল সময়ে সুবচন নির্বাসনে। থিয়েটারের প্রথম নিয়মিত প্রযোজনা হিসেবে সুবচন নির্বাসনে দিয়ে যেমন যাত্রা শুরু ঠিক তেমনি বাংলাদেশের প্রথম সর্বত্রই নাটকটি মঞ্চায়ন একটি মাইলফলক। নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের যখন পত্রিকায় নাট্য সমালোচনা লিখতে যেয়ে প্রশ্ন তুললেন, আসলেই এই সুবচন, সুবচন কিনা। তখন রানু চরিত্রের অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার তুলে ধরলেন তার অভিনীত চরিত্রে প্রতি বিশ্বস্ততার কথা :

মেয়েদের কাছে সংসার একটা বড় ব্যাপার হওয়াই উচিত। আমার মা বলতেন, রানধে বেটি কি চুল বান্ধে না। আমি দুটো এমএ পাস করেছি। ফরাসী ভাষা শিখছি। শিক্ষকতা করছি। নাটক করছি। মা কুমিল্লার, বাবা নোয়াখালীর, জন্মেছি বরিশালে, বেড়ে উঠেছি আশৈশব ঢাকার সেন্ট্রাল রোডে। তবু গ্রাম থেকে মানুষ বেড়াতে এলে সময় ধরে ধরে নোয়াখালীর ভাষার বিশুদ্ধতা অক্ষুণ্ন রেখে উচ্চারণ শিখছি। মেয়ে ত্রপাকে মানুষ করছি। ওর বাবার অফিসে যাবার সব আয়োজন সম্পন্ন করছি। কই একদিনের জন্যেও তো সংসারটাকে অবহেলা করিনি। আর অবহেলার প্রমাণ আসে কেন? সংসার কি আমি, আমরা ছাড়া আলাদা কিছু। সংসার সুখের হয় রমণীর গুণেÑ কথাটা সুবচন ভাবতে আপত্তি কোথায়। আমি যদি মনোযোগ দিয়ে রাঁধতে না শিখি তবে আমি মনোযোগ দিয়ে স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করতে পারবো তা কল্পনায়ও ভাবি না।

Printকল্পনার ডানায় ভর করে শিক্ষা-রুচি-অভিজাত্য-ক্ষমতার মিশেলে মঞ্চে চরিত্রের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন ফেরদৌসী মজুমদার। সর্বগ্রাসী বন্যার তোড়ে মানবতা এবং দানবিকতার টানা-পড়েনের মাঝে এখন দুঃসময় নাটকে তিনি জরিনা। দুই বোন নাটকের বড় বোন। সৈয়দ শামসুল হকের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকের মাতবরের বিদ্রোহী কন্যা। ওথেলো নাটকে প্রথমে এমিলিয়া এবং পরবর্তী সময়ে ডেসডিমনা। অরক্ষিত মতিঝিল নাটকের নূপুর। কালজয়ী ম্যাকবেথ নাটকের লেডী ম্যাকবেথ। দারিদ্র্য শেষপর্যন্ত কীভাবে মানুষকে দাসে রূপান্তর করে সে প্রেক্ষাপটে লেখা এখনও ক্রীতদাস নাটকের কান্দুনি। ঘরে-বাইরে নাটকের বিমলা। থিয়েটারের পালাবদল প্রযোজনার ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র। বিবিসাব নাটকে মরিয়ম। ক্ষমতার সিংহাসনে আরোহণের উদ্দেশ্যে ক্ষমতাধররা কীভাবে নব প্রজন্মকে পায়ের তলার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছে তারই আলোকে লেখা নাটক তোমরাইতে রঞ্জুর মা। প্যাটরিয়ট চলচ্চিত্রে অভিনেতা মেল গিবসন যেমন আমেরিকান রাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জনের প্রতিভূ ঠিক তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশে ভুল সময়ে ভুল পথে মানুষের হাতে পড়ে তারুণ্যদীপ্ত সন্তানরা যখন বিপথগামী ঠিক তখন তোমরাই নাটকের শেষ মুহূর্তে রঞ্জুর মা-রূপী অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার তখন একই সাথে অভিভাবক, অভিনেত্রী এবং গা ভাসানো স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিদ্রোহী…।

সুধীবৃন্দ, একটু অপেক্ষা করুন। আপনাদের কাছে আমার একটা মিনতি আছে। আমার রঞ্জুকে আপনারা দেখলেন। এবার আপনারা আপনাদের রঞ্জুদের দিকে তাকান। হ্যামিলনের বাঁশি বাজছে।

ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। বনে যাচ্ছে সময়ের ক্রীতদাস। যারা যেভাবে পারছে ওদেরকে ব্যবহার করছে। ক্ষমতায় যারা আছে তারা একভাবে, যারা ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করছে তারা আরেকভাবে।

আরেকভাবে হোক কিংবা প্রচলিতভাবে হোক বন্দিদশা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে টেম্পেস্ট নাটকে এরিয়েল। নারী জীবনে চাপিয়ে দেওয়া নিয়তির বিপরীতে বজ্রদৃঢ় অবস্থান নিয়ে মঞ্চে দুই ঘণ্টা এককভাবে দাঁড়িয়ে তিন নারীর তিন পরিণতি নিয়ে কোকিলারা নাটকের কোকিলারা। আঙ্গিক, বাচিক, সাত্ত্বিক সত্তা নিয়ে অভিনয় করে যদি বক্তব্য বলা যায় তবে দেখা যাক মুখ দিয়ে কথা না বলেও বক্তব্য বলা যায় কিনা।

জার্মান নাট্যকারের লেখা নাটক রিকোয়েস্ট কনসার্ট অবলম্বনে আবদুল্লাহ আল-মামুন রচনা করলেন সংলাপবিহীন নাটক একা। এক শিক্ষক ঘরের চার দেওয়ালের নিঃসঙ্গতার চাপ সহ্য করতে না পেরে বাঁচার জন্যেই বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। বাতাসে গুঞ্জন যখন এমন, অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদারের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে অনুরাগী কেউ কেউ বেছে নিতে পারে এই সহজ সমাধান, সাথে সাথে দুই তিনটি শো শেষে দর্শকদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে দলে আলোচনা করে ফেরদৌসী মজুমদার স্বমহিমায় নাটকের শেষে অভিবাদন জানিয়ে বলতেন, জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া কিন্তু সমাধান না, মৃত্যু কোনো সমাধান না।

সমাধান কিছুতেই এটা না যে বাবা-মা বৃদ্ধ হয়েছে বলে তাদের দূর দূর করে খেদিয়ে দাও কিংবা বাতিল বলে উপেক্ষা করো। তবু স্পর্ধা নাটকে তেমনটিই করে বসে বাবা-মায়ের প্রতি তাদের একমাত্র পুত্র এবং পুত্রবধূ। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বাবা, তার স্ত্রীর সহমর্মিতায় কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায় তা নিয়েই স্পর্ধা। মায়ের চরিত্রে মমতাময়ী কিন্তু প্রয়োজনে খড়গধারী অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। অভিনয়ের ঝুলিতে নাটক এখানে এখন, দ্যাশের মানুষ, আন্তিগোনে, কৃষ্ণকান্তের উইল, যুদ্ধ এবং যুদ্ধ, মেরাজ ফকিরের মা, মেহেরজান আরেকবার, ছয় বেহারার পালকি, গোলাপ বাগান, মাধবী, মুক্তি, বারামখানা, মুক্তধারাসহ আরও কত নাটক।

নাটকের অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদারের প্রিয় চলচ্চিত্র অপুর সংসার। সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী, অপরাজিতা এবং অপুর সংসার এই ট্রিলজির মধ্যে অপুর সংসার কেন এত প্রিয় সেটি ভাববার বিষয়। ভালো লাগার কারণ গভীরে। অপূর্ব কুমার রায় তথা অপু পথের পাঁচালীতে আত্মার আত্মা বোন দুর্গাকে হারিয়ে একা, নিঃসঙ্গ। অপরাজিতাতে যেয়ে মা এবং বাবাকে হারিয়ে আরও নিঃসঙ্গ। অপুর সংসার-এ অপু যখন লক্ষ্মী বৌকে একান্ত আপন ভেবে পরিপূর্ণ নির্ভর করে স্ত্রীকে আপন করে বাঁচতে চাইলো তখন নিয়তির ছোবলে স্ত্রী-শূন্য অপু আজীবনের মতো একা হয়ে গেল। নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব যখন শিল্পে উত্তীর্ণ হলো তখনই তা অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদারকে বিমোহিত করলো। যে কারণে অভিনয় জীবনের মধ্য লগ্নে নির্দেশক আবদুল্লাহ আল-মামুনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে একা না করে থাকতে পারেননি ঠিক তেমনি এই পরিণত বয়সে এসে নির্দেশক ত্রপা মজুমদারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তি না করে থাকতে পারেননি। ঘরে বসে মায়ের কাছে মেয়ের আবদার, মা, তুমি জন্মেছো অভিনয় করার জন্য। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাকালীনও হুইল চেয়ারে বসে কোকিলারা করলে। আজও মা তোমাকে তাই করতে হবে। প্রয়োজনে তুমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অভিনয় করবে।

রিহার্সালে পৌঁছাতে সামান্য বিলম্ব হলে নিদের্শক-সত্তায় ত্রপা মজুমদারের কড়া অনুশাসন। দেখ মা, তুমি আমার মা হয়েছো বলে আলাদা প্রিভিলেজ পাবে এমনটা ভেবো না। তুমি দীর্ঘ দিনের থিয়েটার কর্মী। তোমাকে দেখে দলীয় কর্মীরা শেখে। তুমি যদি দেরি করে আসো তবে অন্যরা কী করবে। আশা করি একই ভুল তুমি দু’বার করবে না। মেয়ের পারফরমেন্স দেখে মা ফেরদৌসী মজুমদারের অভিব্যক্তি, আমি আর কি অভিনেত্রী, এ তো আমাকে ছাড়িয়ে যায়।

Printছাড়িয়ে যাওয়া অভিনয় মুক্তি নাটকে অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদারের। সুস্থ স্বাভাবিকতা পক্ষান্তরে পাগলামো, সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি আবার মুহূর্তে ক্ষীণ দৃষ্টি, বুকভরা অভিমান শেষেই তীব্রভাবাবেগে মুখোমুখি শাসন, মুষড়ে যাওয়া কিন্তু ভেঙে না পড়া, উচ্ছ্বাসে ফুলে ওটা মুহূর্তেই নৈরাশ্যের কুয়াশায় নিজেকে আড়াল করা প্রভৃতি ফুটিয়ে তোলায় মা-রূপী ফেরদৌসী মজুমদারের যে অভিনয়, তা কি ভোলা যায়। অপরদিকে নির্দেশক নায়লা আজাদ নূপুরের নির্দেশনায় মুক্তধারা নাটকে, মানবিকতাকে দানবিক শক্তি দিয়ে থামাতে গেলে কতটা দানবিক হতে হয় সত্তায় এবং অবয়বে তার প্রকাশ যন্ত্ররাজ বিভূতি চরিত্রে ফেরদৌসী মজুমদারের অভিনয়ে। বাস্তবিকই তারুণ্যদীপ্ত নির্দেশক আজাদ আবুল কালামের মূল্যায়ন সুনির্দিষ্ট :

ফেরদৌসী ম্যাডাম এই মুহূর্তেও সম্ভাবনাময়। সম্ভাবনার কথা বলা হয় তাদেরকে যারা যোগ্য এবং যাদের বেড়ে ওঠার লম্বা সময় হাতে আছে। কিন্তু ফেরদৌসী ম্যাডামকে সম্ভাবনাময় বলার অর্থ হলো, আজ এই মুহূর্তে তিনি যদি নতুন কোনো চরিত্র নিয়ে মঞ্চে ওঠেন তবে অতীতের অভিনয়ের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়ার সক্ষমতা রাখেন তা সে যত অসুস্থতা তার থাকুক না কেন। আমার লেখা টিভি নাটক ক্ষণিকালয়ের প্রতি এপিসোডে তিনি হয়তো মাত্র মিনিট দুই তিনেকের জন্যে আসেন। ওই দুই তিন মিনিটটাই হৃদয়কে ভরিয়ে দেয়।

হৃদয় ভরলে উচ্ছ্বাসের অভিব্যক্তি যে কী বলে বোঝাবার নয়। ফেরদৌসী মজুমদারের জীবন এবং কর্মের মূল্যায়ন নিয়ে গ্রন্থ সংকলন ‘পথিকৃৎ নাট্যজন’-এর সম্পাদক, অভিনেত্রী সারা যাকের-এর মূল্যায়ন, স্বাধীনতাউত্তরকালে মঞ্চে ফেরদৌসী মজুমদারের ভূমিকা কিংবদন্তিতুল্য। আমাদের টেলিভিশন নাটকের স্বর্ণযুগে তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠতম নাট্যশিল্পীর আসনে। জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে টিভি নাটকে ফেরদৌসী মজুমদারের সাথে একত্রে কাজ করেছিলেন অভিনেত্রী শিমুল ইউসুফ। তাঁর বিশ্বাস, তাঁর মঞ্চাভিনয়ের মূলে জননীরূপা ফেরদৌসী মজুমদার। কারণ তার অভিনয়ে আকৃষ্ট হয়েই তিনি মঞ্চে এসেছিলেন। তার একান্ত দাবি, তিনি যেন আত্মজীবনী লেখেন কারণ পঞ্চাশ বছর পর হোক কি একশ বছর পর হোক, মঞ্চে ফেরদৌসী মজুমদারকে নিয়ে নাটক উপস্থাপিত হবে। সেই ভাবীকালের নাটকের স্বার্থে আত্মজীবনী থাকাটা খুবই জরুরি। আবদুল্লাহ আল-মামুনের প্রযোজনায় টিভি নাটক ‘চিরকুমার সভা’য় ফেরদৌসী মজুমদার যেখানে মেজবোন, অভিনেত্রী লাকী ইনাম সেখানে ছোট বোন। লাকী ইনামের অভিনয় জীবনের অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস ফেরদৌসী মজুমদার। ফেরদৌসী মজুমদার মঞ্চে আসা মানেই মঞ্চ কাঁপিয়ে দেওয়া। লাকী ইনামের চেষ্টা ফেরদৌসী মজুমদারের মতো শিল্পী হওয়া। জহির রায়হানের বরফ গলা নদী টিভি নাটকে এবং পরবর্তী সময়ে থিয়েটারে দুই বোন নাটকে ফেরদৌসী মজুমদারের সহশিল্পী মিতা চৌধুরী। অভিনয়ের শুরুর লগ্নে অভিনয়, কস্টিউম, সেট, লাইট, মিউজিক প্রভৃতির ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যাপার ছিল না। শেখাটা হতো পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং ভাবের আদান প্রদানে। এক্ষেত্রে অভিনয় শিক্ষার বিষয়ে ফেরদৌসী মজুমদার আমার শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেছেন। শিক্ষক হিসেবে অগ্রণী স্কুলে ফেরদৌসী মজুমদারকে ক্লাসে পেয়েছেন প্রজ্ঞা লাবণী। ক্লাসে সবাই যেদিন পড়া পারতো সেদিন তিনি রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ থেকে গল্প পাঠ করতেন, কবিতা থেকে কবিতা আবৃত্তি করতেন। প্রজ্ঞা লাবণীর উচ্চারণে ভুল থাকলে তা শুধরে দিয়ে, শুদ্ধ পড়ার ব্যাপারে সঠিক নির্দেশনা দিয়ে যে উপকার তিনি করেছেন তার সুফল প্রজ্ঞা লাবণী আজও পেয়ে চলেছেন। থিয়েটারের হয়ে দুই বোন নাটকের নির্দেশক এবং বড় বোন শর্মিলা চরিত্রে ফেরদৌসী মজুমদার। ছোট বোন ঊর্মিমালা চরিত্রে আফরোজা বানু। আফরোজা বানুর সিদ্ধান্ত, ফেরদৌসী মজুমদারের পাশে দাঁড়িয়ে ছোট বোন ঊর্মিমালার চরিত্রে অভিনয় করেছি আমি। এ প্রাপ্তি আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় পাওয়া। তাঁর হাত ধরেই আমার অভিনয়ে আগমন, আজ দর্শকদের কাছে আমার যেটুকু পরিচিতি, তার সূচনা করে দিয়েছেন আমার শিক্ষক গুরু ফেরদৌসী মজুমদার।

ফেরদৌসী মজুমদারকে প্রথম দেখার কথা ইলা মজুমদার বলে গেছেন আবদুল্লাহ আল-মামুন পরিচালিত ‘জীবন ও অভিনয়’ তথ্যচিত্রে। উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের প্রভাতী শাখায় ইংরেজি পড়াচ্ছেন ফেরদৌসী মজুমদার আর সমাজবিজ্ঞান পড়াচ্ছেন তিনি। এক সরস্বতী পূজার শেষে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকের খ-িত অংশ অভিনয় শেষে ফেরদৌসী মজুমদার যখন তার গায়ের চাদর খুলে জড়িয়ে দিচ্ছেন ইলা মজুমদারের গায়ে তখন জীবনের প্রথম দেখাতে পরস্পরের বিস্ময় এবং উপলব্ধি ইলা মজুমদার শীতের সকালে ঠক ঠক করে কাঁপছেন। অপরিচিত থেকে পরম আত্মীয়তা প্রসঙ্গে ইলা মজুমদার লিখছেন :

শুধু আমার নয়, ফেরদৌসী আমার পরিবারের সবার বড় আপনজন। উৎকৃষ্ট ফল ফলারি, নানারকম খাবার দাবারের বোঝা দু’হাতে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে তিনতলার সিঁড়ি বেয়ে উচ্ছল আবেগে যখন ‘দিদি’ বলে এসে ঘরের মধ্যে হাত পা ছড়িয়ে বসত- তখন আমার নিঃশব্দ বাড়িখানা ঝলমল করে উঠত। থাকত না বেশিক্ষণ, কিন্তু ভরিয়ে দিয়ে যেত সবার প্রাণ হাসি, আনন্দ, ভালোবাসায়। ও চলে গেলে আমার স্বামী শ্রী বারীন মজুমদার স্বগতোক্তির মতো বলতেন, একেবারে আনন্দময়ী মা।

মা, মেয়ে কত নাটকেই না অভিনয় করা হলো তথাপি ৬০-এর দশকে রেডিও পাকিস্তান ঢাকায় নাটকের প্রোগ্রাম অর্গানাইজার হিসেবে আতিকুল হক চৌধুরী প্রযোজিত সারেং রেডিও নাটকে ফেরদৌসী মজুমদারের প্রথম অভিনীত নাটকের সুবাদে গর্ববোধ আজও তার মধ্যে বর্তমান। তারই প্রযোজিত রেডিও নাটক দক্ষিণের জানালা, পথের দাবি, নেপথ্যের নায়িকা; টিভি নাটকের মধ্যে দক্ষিণের জানালা, কী পাইনি, শঙ্খনীল কারাগার, চোখের বালি, সুন্দর সর্বনাশ সবতাতেই বিস্ময় এবং মুগ্ধতা। আতিকুল হক চৌধুরী অভিজ্ঞতার আলোকে তিনটি স্বীকৃতি দিতে ব্যাকুল।

এক. নাটকে তাঁর কথা বলার ভঙ্গি ও ঢং একান্তই ঘরোয়া- যেন জীবন থেকে নেয়া।

দুই. অভিনয়কে তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেছেন বলেই অনেক কিছু বর্জন করে আজ অনেক কিছু অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।

তিন. তিনি কিংবা তার সহকর্মী প্রযোজক কোনোদিন দেখেনি রিহার্সালে ফেরদৌসী মজুমদার কোনোদিন দেরি করে এসেছেন।

দেরি করে না আসাটা যেখানে তৃপ্তির সেখানে ফেরদৌসী মজুমদারকে প্রতিভায় এবং সাধনায় আমাদের দেশের তৃপ্তি মিত্র বলে ডাকতে ব্যাকুল রবীন্দ্রনাথে অবগাহন করা নির্দেশক আতাউর রহমান। ১৯৯৪ সালে মঞ্চে একা নাটকটি দেখে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় নাটকের সমালোচনা লিখতে যেয়ে লিখলেন, এক ঘণ্টা ব্যাপ্তির একা নাটকে ফেরদৌসী মজুমদারের সংলাপহীন সমৃদ্ধ একক অভিনয় আশাতীতভাবে উত্তীর্ণ। পূর্ণাঙ্গ কোকিলারা নাটকের ফেরদৌসী মজুমদারের অভিনয় যদি এদেশের দর্শক অনেকদিন মনে রাখে তবে একা নাটকে তাঁর সংলাপবিহীন আঙ্গিক অভিনয়ও এদেশের দর্শক হৃদয়ে ধারণ করবে। এ ধরনের দুরূহ কাজের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা ফেরদৌসী মজুমদারের পক্ষেই সম্ভব।

Printসম্ভাবনাকে মাথায় রেখেই থিয়েটার দল গঠনের আগেই থিয়েটার পত্রিকা সম্পাদনায় রামেন্দু মজুমদার যখন সম্পাদক তখন সহ-সম্পাদক আসাদুজ্জামান নূর। নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের আলী যাকেরের মাধ্যমে নাগরিকের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ঘটেছে মাত্র। সম্প্রদায়ের অন্যান্য পরিচিত সদস্যরা আমন্ত্রণ জানালেন নাগরিক দলে যোগ দেবার জন্য। তখনও ‘থিয়েটার’ নাট্যদল কাজ শুরু করেনি। শুধু পত্রিকাটি প্রকাশিত হচ্ছে। আসাদুজ্জামান নূর বিষয়টি যখন রামেন্দু মজুমদারকে জানালেন সেখানে তখন ফেরদৌসী মজুমদারও উপস্থিত। রামেন্দু মজুমদার আসাদুজ্জামান নূরকে কাছ থেকে ছাড়তে না চাইলে সাথে সাথে ফেরদৌসী মজুমদারের প্রতিবাদ, তুমি কবে দলে  কাজ শুরু করবে, তার জন্যে ও বসে থাকবে নাকি? একটা দল কাজ শুরু করেছে, সেখানে ও কাজ করুক না। ক্ষতি কী? মা যেমন সংকটকালে সন্তানকে অভয়ারূপে অভয় দেন, ফেরদৌসী মজুমদারের অভয় পেয়ে আসাদুজ্জামান নূর উচ্ছ্বাসের সাথে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে যোগ দেন এবং ফেরদৌসী মজুমদারের উদার মুক্ত মনের কথা, হৃদয় গহিনে সযত্নে লুকিয়ে রাখেন।

হৃদয়ে লুকানো কথা আবেগের উচ্ছ্বাসে গভীর রাতে কবি বেলাল চৌধুরী এবং অভিনেতা পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মুখে খুলে ধরেন সুনীল-সমরেশ সমসাময়িক সাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বলেন, বন্ধু অজিতেশ বেঁচে থাকলে বলতাম ফেরদৌসীকে সাথে নিয়ে ওথেলো করতে। মৃত শেক্সপিয়র বেঁচে উঠে মুগ্ধ হবেন তোমাদের অভিনয় দেখে। তবে দেখতে বসে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় ম্যাকবেথ নাটকে লেডি ম্যাকবেথরূপী ফেরদৌসী মজুমদারের প্রথম মঞ্চ প্রবেশের দৃশ্যটিতে পলকহীন বিমুগ্ধ দর্শক হয়ে গেছিলেন, সে স্মৃতি এখনও টাটকা। পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্থির সিদ্ধান্ত, অভিনয়ের প্রতি গভীর মমতা, নির্দেশকের সঙ্গে অতুলনীয় মানসিক যোগাযোগ, কঠোর অনুশীলন, সহশিল্পীদের প্রতি আস্থা-বিশ্বাস এবং অর্জন সুলভ মনোসংযোগের কারণে নতুন প্রজন্মের কাছে ফেরদৌসী মজুমদার নিজেই অনুকরণীয় এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

Printপ্রাতিষ্ঠানিক কিংবা একাডেমিক কথা না বরং শ্রেণিসংগ্রামে ও সাম্যে বিশ্বাসী নাট্যকার-নির্দেশক-অভিনেতা মামুনুর রশীদের মূল্যায়ন প্রাণবন্ত, আন্তরিকতাপূর্ণ কিন্তু নতুন কিছু আবিষ্কারে গভীর নিমগ্ন। গণমানুষের জীবন বোঝার জন্য শুধু ভাসা ভাসা দেখা নয়, জীবনের গভীর অণ্বেষণও প্রয়োজন। তাঁর জন্যে যে বিশেষ ধরনের নান্দনিক বোধ ও শিক্ষার প্রয়োজন তা সৌভাগ্যক্রমে যেন কোনো এক উত্তরাধিকারসূত্রে ফেরদৌসী মজুমদার পেয়েও গেছেন। না হলে লেডি ম্যাকবেথের চরিত্র আর এখনও ক্রীতদাসের কান্দুনি চরিত্র একই দেহের মধ্যে ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়তো।

পড়া, লেখা, প্রবন্ধ উপস্থাপনে জীবনের একটা বড় সময় ধরে নিবেদিতপ্রাণ নাট্যগবেষক, সমালোচক, প্রাবন্ধিক মফিদুল হক যে স্মৃতি ভুলতে পারেন না তা হলো, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে মাতবর-কন্যা হিসেবে নাটকের একেবারে শেষাশেষি ফেরদৌসী মজুমদারের সবেগে প্রবেশ এবং বাকি সময়জুড়ে দর্শককুলকে মন্ত্রমুগ্ধ রেখে গোটা নাটক হাতের মুঠোয় পুরে তাঁর নিথর দেহে প্রস্থান। মফিদুল হকের আত্ম আবিষ্কার, ফেরদৌসী মজুমদার জীবনভর যে সাধনা করে চলেছেন, সিদ্ধির যে স্তরে নিজেকে উন্নত করেছেন তার দহনে, শ্রম, ত্যাগ ও নিষ্ঠা সবটাই থাকে আড়ালে, আমরা দেখি কেবল পুষ্পিত বিকাশ, দেখি শিল্পের রূপচ্ছটা, দেখি নিজেদেরকেই আরও নিবিড়ভাবে।

নিবিড়ভাবে নিজের কথা নিজে বলে আনন্দ পান কথা সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। মামুনুর রশীদের পরে তিনি যে সংশপ্তক উপন্যাসের টিভি নাট্যরূপ দিয়েছিলেন এবং হুরমতি চরিত্রে ফেরদৌসী মজুমদার অভিনয় করেছিলেন সেটাই তার শেষ কথা না। যতদূরে যাই, অকূল দরিয়া, আলতা প্রভৃতি তাঁর লেখা টিভি নাটকে ফেরদৌসী মজুমদারের অভিনয় আজও তাঁর গর্বের।

Printমঞ্চে অনেক কিছু দেখা এবং না দেখার জন্যে বাংলাদেশের নাট্যযাত্রার প্রথম লগ্ন থেকে আজও যিনি পর্দা সরবরাহ এবং পর্দা সজ্জায় অবদান রেখে চলেছেন সেই অশোক মুখার্জীর মূল্যায়ন, ফেরদৌসী মজুমদার কখনওই আয়োজনের আড়ম্বরকে বড় করে দেখেননি কিন্তু অভিনীত চরিত্রকে সুনিপুণভাবে উপস্থাপনা করতে চরিত্রের প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্যবোধ করেননি। কার্পণ্য না করে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বিভিন্ন নাট্যদলের টিকিট, পোস্টার, প্রথম মঞ্চায়নের তারিখ, নাটকের ব্রোশিউর, নাট্যদলের প্রকাশনা প্রভৃতির তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে, সংরক্ষণের মধ্যে দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাইব্রেরি গড়ে তুলে নাট্যদলগুলোর প্রয়োজনে এবং গবেষকদের গবেষণা সহযোগিতায় সহযোগিতা করে বিরল দৃষ্টান্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন বাবুল বিশ্বাস। জীবন ও অভিনয় তথ্যচিত্রে তার মূল্যায়ন ও সংরক্ষিত হবার দাবি রাখে। বাবুল বিশ্বাসের স্থির সিদ্ধান্ত, ফেরদৌসী মজুমদারের মতো ব্যক্তিত্ব বছরে বছরে জন্মান না, শত অব্দে কালেভদ্রে আসেন।

কালেভদ্রেই অভিনেত্রীরা লেখালেখি করেন। বেশিরভাগই তা আত্মজীবনী, নইলে উত্তরসূরিকে নিয়ে মূল্যায়ন। কিন্তু ফেরদৌসী মজুমদারের লিখিত এবং প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পাঁচ। বিপদের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু নীতিকথা আঁকড়ে ‘ফড়িং আর পিঁপড়ে’, চেষ্টা ও সাধনার জোরে দারিদ্র্যকে জয় করার আদলে হ্যানসেল ও গ্রেটলের কাহিনির পুনর্কথন ‘শোভন আর বোচন’, বুদ্ধি থাকলে উপায় হয় নীতি কথার আদলে সুইডেনের লোককাহিনি অবলম্বনে পাথরের সুপ নামের তিনটি শিশুতোষ গ্রন্থ। ভাগ্য-বিড়ম্বিত গৃহকর্মী এক কিশোরীর জীবনালেখ্য নূরী কাহিনী। নিজেরা চৌদ্দ ভাইবোন, উৎসদাতা বাবা-মা, সময় ফেলে আসা শৈশব-কৈশোর প্রভৃতির মিশেলে বাংলা সাহিত্যের এক মস্ত উপকরণ ফেরদৌসী মজুমদারের আত্মজীবনীর প্রারম্ভভাগ ‘মনে পড়ে’। মনে পড়ে বইটি এক নিমিষে পড়ে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপলব্ধি, ফেরদৌসী আমাদের অতি প্রিয় মানুষ। আমাদের পরিবারের সবাই তার ভক্ত। তাঁর অভিনয় আমরা অবাক বিস্ময় আর প্রশংসা মেখে উপভোগ করি। তার স্মৃতিকথা আমাদের আকর্ষণ করারই কথা। কিন্তু ফেরদৌসী এত সুন্দরভাবে স্মৃতিচারণ করতে পারে এটা জানা ছিল না। তার লেখার সাবলীলতায় চমৎকৃত না হয়ে পারবে না কেউ। তরতর করে গল্প বলার ঢঙে কঠিন কঠিন সামাজিক জটিলতাকে কৌতুকভরা উপাখ্যানের মতো বলে গেছে ফেরদৌসী।

ফেরদৌসী মজুমদার যে নীতিগত বিশ্বাসের প্রশ্নে কতটা অবিচল তা বোঝা যায় নাট্যকার নির্দেশক অভিনেতা আবদুল্লাহ আল-মামুনের লিখিত কথায়। তিনি লিখেছেন, ‘আমার বানিয়ে বানিয়ে সংলাপ বলার প্রবণতা আছে। নিজের লেখা নাটকেও এবং অন্য নাট্যকারের নাটকেও। ফেরদৌসী সমর্থন করেননি। সমর্থন করে হোক কিংবা না করে হোক স্বাভাবিকভাবেই কোন নাট্যকার তোমার প্রিয় প্রশ্নে একজন ঢাকা থিয়েটারের কর্মী বলতেই পারে, সেলিম আল দীন। আরণ্যকের নাট্যকর্মী বলতে পারে, মামুনুর রশীদ। থিয়েটার আর্ট ইউনিটের নাট্যকর্মী বলতে পারে, এস এম সোলায়মান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক বিভাগের ছাত্র বলতে পারে, সাঈদ আহমেদ, কবীর চৌধুরী, জিয়া হায়দার। থিয়েটার দলের নাট্যকর্মী বলতে পারে আবদুল্লাহ আল-মামুন কিংবা সৈয়দ শামসুল হক। কিন্তু ফেরদৌসী মজুমদার যে নাট্যকারের সব থেকে বেশি নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে, যে নাট্যকার নির্দেশকের প্রতি ফেরদৌসী মজুমদার সব থেকে বেশি কৃতজ্ঞ সেই আবদুল্লাহ আল-মামুনই যখন পরিচালনা করেছেন তথ্যচিত্র জীবন ও অভিনয় তখনও আবদুল্লাহ আল-মামুনের উপস্থিতিতে এবং প্রশ্নের উত্তরে অবিচল ফেরদৌসী মজুমদার। প্রশ্ন : আপনি কার নাটকে অভিনয় করে সব থেকে বেশি তৃপ্তি পেয়েছেন? উত্তর : আমি সবার নাটকে অভিনয় করেছি তৃপ্তি নিয়ে, তবে সব থেকে বেশি তৃপ্তি পাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটকে অভিনয় করে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মোৎসবে বর্তমানে শিক্ষকতায় নিয়োজিত সানবীমস বিদ্যালয়ের অষ্টম এবং নবম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ফেরদৌসী মজুমদার নির্দেশনা দিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক মুকুট। ছোট থেকে মানুষ বড় হয়, কিন্তু বড় হয়ে ছোটকে সাদরে গ্রহণ না করে বরং দূরত্ব তৈরি করে কৃত্রিম ভারিক্কি ভাব ধরাটা কিছু মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। সেখানে ব্যতিক্রম নির্দেশক ফেরদৌসী মজুমদার। শিশু-কিশোরদের ছোট ভেবে তাদের শক্তিকে ছোট করে না দেখে ছোটদের দিয়ে একটি বড় কাজ করে দেখালেন তিনি। তিনি এর আগে দুই বোন, কৃষ্ণকান্তের উইল, চিঠি, তাহারা তখন, মেহেরজান আরেকবার প্রভৃতি নাটকে নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু নির্দেশনাকে তিনি কখনওই অভিনয় করার চেয়ে বেশি উপভোগ করেননি। যে কারণে নাট্যকার-অভিনেতা-নির্দেশক মনোজ মিত্রের সাথে জাতীয় দৈনিকের বিশেষ আয়োজনে কথা বলেছেন ফেরদৌসী মজুমদার তখন মনোজ মিত্রের উত্তর ফেরদৌসী মজুমদারের মনে ধরে। মনোজ মিত্র বলছেন, আমার কাছে নাটক লেখা আনন্দের, অভিনয় করা তৃপ্তির, নির্দেশনা দেওয়া ক্লান্তির।

Printক্লান্তিহীন অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার তাঁর করণীয় কাজের মধ্যে দিয়ে যেমন অর্জন করলেন একুশে পদক, প্রথম জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার, সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অব মেরিট, শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার, উইলিয়াম কেরি পদক, ঋষিজ পদক, অন্যদিন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম পারফরমেন্স অ্যাওয়ার্ড, মুনীর চৌধুরী সম্মাননা, মেরিল-প্রথম আলো তারকা জরিপ ২০০৬ আজীবন সম্মাননা তেমনি দেশ ছাড়িয়ে অভিনয় করলেন ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর- একবার এবং বারংবার।

বারবার বহু চরিত্রে বহু রজনী অভিনয় করে পার করা অভিনেত্রীকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার হাতে তুলে দেবার পর প্রথম আলোয় সুমন্ত আসলামের লেখার শিরোনাম হলো ‘নাটকের নক্ষত্র ফেরদৌসী মজুমদার’। অভিনয়ের আকর্ষণে মানুষকে ধরে রাখতে পারেন বলেই তো তিনি নক্ষত্র। আবার মুনীর চৌধুরী সম্মাননা পুরস্কার নিতে এসে ওপার বাংলার নাট্যকার মনোজ মিত্র এবং এপার বাংলার অভিনেত্রীর একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়ে সমকালে প্রকাশিত বর্তমান লেখকের লেখার শিরোনাম হলো, ডাকলে আসবো ডাকলে যেও। অর্থাৎ দু’জনই দু’দেশের সাংস্কৃতিক অ্যাম্বাসাডর। সাংস্কৃতিক অ্যাম্বাসাডরের সক্ষমতা প্রমাণিত কেননা ১৯৯৮ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এবং প্যারিসে ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে সসম্মানে আমন্ত্রিত ফেরদৌসী মজুমদার। সক্ষমতার পরিধি মেপে তাই প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী লিখলেন, ফেরদৌসীর অভিনয় গুণকে আমি খুব উচ্চ মূল্যায়ন করি। আমার মনে হয় দুই বাংলা মিলে তার মতো দক্ষ, তার মতো নিবেদিতচিত্ত, তার মতো নানাধরনের ভূমিকায় এত সুন্দর অভিনয় করার মতো মানুষ খুব বেশি নেই।

নেই অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদী স্বশরীরে আজ আর আমাদের মাঝে। তবু হুরমতি চরিত্রে ফেরদৌসী মজুমদার এবং কানকাটা রমজান চরিত্রে হুমায়ুন ফরীদির অভিনয় সবার স্মৃতিতে টাটকা। হুমায়ুন ফরীদির লেখা, নির্দেশিত এবং সীমিত পরিসরে অভিনীত নাটক যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তঃহল প্রতিযোগিতায় তাঁর প্রথমবর্ষে প্রথম হয়েছিল সেটিও কমবেশি সবার জানা। ফলে যখন হুমায়ুন ফরীদির কাছে দিকনির্দেশনা চাওয়া হলো কানন দেবীর জীবনী অবলম্বনে অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদারের চরিত্র উপযোগী নাটক লেখবার তখন উত্তর আনন্দের, উচ্ছ্বাসের এবং সুনির্দিষ্ট। বললেন :

কানন দেবীর আত্মজীবনী ‘সবারে আমি নমি’ বারবার পড়। ফেরদৌসী মজুমদারের জীবনের দর্শন খুঁজে বের কর। আমার তো ধারণা তিনি, সহস্র প্রতিকূলের যাত্রী। সে যা হোক কানন দেবী এবং ফেরদৌসী মজুমদারের জীবনদর্শনে যখন তুমি খুঁজে মিল পাবে তখনই লিখতে বসবে, তার আগে না। আর এই, শোন, মঞ্চে কানন দেবীর মৃত্যু দেখাবে না। কানন দেবীরা ধ্রুবতারা। তারা কখনও ঝরে পড়ে না। অনেক বলেছি এবার যেতে পার।

যেতে যেতে ভাবি টেম্পেস্ট নাটকে ফেরদৌসী মজুমদার যেখানে এরিয়েল, আলী যাকের সেখানে প্রস্পারো। ম্যাকবেথ নাটকে ফেরদৌসী মজুমদার যেখানে লেডি ম্যাকবেথ, আলী যাকের সেখানে ম্যাকবেথ। সহশিল্পীর এই সম্পর্ক তো জনম জনমের। জীবন ও অভিনয় তথ্যচিত্রে আলী যাকের তো বলেছেন, যত শিল্পীর সাথে আমি অভিনয় করেছি তার মধ্যে সহশিল্পী হিসেবে সব থেকে বেশি সহযোগিতা যার কাছ থেকে পেয়েছি তিনি অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। অতএব আজ অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদারকে নিয়ে লিখতে যেয়ে একটা চমৎকার শিরোনামের জন্যে আলী যাকেরের মতো সহযোগী আর কে হতে পারেন। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। কানন দেবীকে যেমন বলা হতো, ‘দ্য ফাস্ট লেডি অফ বেঙ্গলি স্ক্রিন : কানন দেবী’, এরকম একটা শিরোনাম যদি দেন। অভিনেতা-নাট্যকার- নির্দেশক আলী যাকের লম্বা চওড়া মানুষ। ছেলে মানুষির মতো কাগজের ওপর উপুড় হয়ে অল্প সময়ে দ্রুত পৃষ্ঠা উল্টিয়ে বললেন, লেখ, দ্য ফার্স্ট লেডি অফ বাংলাদেশি থিয়েটার : ফেরদৌসী মজুমদার।

শাবানা আজমীর মতো অভিনেত্রী মেঘলা আকাশ চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে এসে সহশিল্পী হিসেবে ফেরদৌসী মজুমদারকে পেয়ে তাঁর সক্ষমতা দেখে দেশে ফিরেছেন। আর সব্যসাচী লেখক, সৈয়দ শামসুল হক লন্ডনে বসে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকটি লিখে রামেন্দু মজুমদারের হাতে তুলে দিয়েছেন। জীবন ও অভিনয় তথ্যচিত্রে কৃতজ্ঞচিত্তে নাট্যকার বলে চলেছেন, ফেরদৌসী মজুমদার এবং আবদুল্লাহ আল-মামুনের অভিনয়ের কারণে কাব্যনাট্য মাধ্যমটি বাংলাদেশের মঞ্চে একটি স্থায়ী অবস্থান করে নিয়েছে।

স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী, শিল্প এবং শিল্পীর চিরস্থায়ী অস্তিত্বের সিদ্ধান্ত নেয় মহাকাল। তবু অšে¦ষণ এবং শিল্প নির্মাণে ফেরদৌসী মজুমদার এক বিস্ময়, এক প্রেরণার স্থান। তাঁর জন্মের এই শুভক্ষণে সব্যসাচী কবি সৈয়দ শামসুল হকের হৃদয়ের আরাধ্য সনেটের মধ্যে দিয়েই ‘দ্য ফার্স্ট লেডি অফ বাংলাদেশি থিয়েটার : ফেরদৌসী মজুমদার’ এর প্রতি সনম্র অভিবাদন,

নাটকেই আমাদের স্বপ্নকথা হয় প্রতি সন্ধ্যায় বর্ণিত।

অভিনয় প্রতিভায় সেই স্বপ্ন এঁকে যিনি দেন চিত্তপটে :

এমন প্রতিভা যাঁর, নাটকের সাধনায় তিনিই প্রকৃত।

প্রকৃত এমন এক নাট্যজন ফেরদৌসী, জন্মদিনে তাঁর

বাংলার অক্ষরে রাখি মাতৃমঞ্চভূমে এই সনেট আমার॥

 

সহায়ক গ্রন্থ

১.       সারা যাকের (সম্পাদক), পথিকৃৎ নাট্যজন (ঢাকা : সোনারং, ২০০৭)

২.       রামেন্দু মজুমদার (সম্পাদক), নাট্য-পরিক্রমা : চারদশকের বাংলাদেশ (ঢাকা : নবযুগ প্রকাশনী, ২০১৩)

৩.      আবদুল্লাহ আল-মামুন, নির্বাচিত নাটক (সম্পাদক- রামেন্দু মজুমদার, ঢাকা : নালন্দা, ২০০৯)

৪.       সুকুমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের নাট্যচর্চা ও নাটকের ধারা (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৮৮)

৫.      হাসান শাহরিয়ার (সম্পাদক), থিয়েটারওয়ালা (ঢাকা : জানুয়ারি-মার্চ ২০০৬ সংখ্যা)

৬.      রুদ্র প্রসাদ সেনগুপ্ত, পশ্চিমের নাটক ইবসেন থেকে আল্বী (কলকাতা : অপেরা, ১৪১১)

৭.       ডক্টর গীতা সেন গুপ্ত, বিশ্বরঙ্গালয় ও নাটক (ঢাকা : নবনী প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ ১৯৭৫)

৮.      ফেরদৌসী মজুমদার, পাথরের সুপ (ঢাকা : সাহিত্য প্রকাশ, ২০০৪)

৯.       ফেরদৌসী মজুমদার, শোভন আর বোচন (ঢাকা : সাহিত্য প্রকাশ, ২০০৩)

১০.     ফেরদৌসী মজুমদার, নূরী কাহিনী (ঢাকা : সাহিত্য প্রকাশ, ২০১০)

১১.     ফেরদৌসী মজুমদার, মনে পড়ে (ঢাকা : সাহিত্য প্রকাশ, ২০০৬)

১২.     ফেরদৌসী মজুমদার, ফড়িং আর পিঁপড়ে (ঢাকা : সাহিত্য প্রকাশ, ২০০৪)

১৩.     ত্রপা মজুমদার (সম্পাদক), ফেরদৌসী মজুমদার : অভিনেতার রঙ্গমঞ্চ (ঢাকা, থিয়েটার, ২০১৩)