সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

আমি ও আমার চলচ্চিত্র মূল: জি. অরবিন্দন – দাউদ আল হাফিজ

September 20th, 2016 7:59 am
আমি ও আমার চলচ্চিত্র  মূল: জি. অরবিন্দন –  দাউদ আল হাফিজ

অনুবাদ প্রবন্ধ

আমি ও আমার চলচ্চিত্র

মূল: জি. অরবিন্দন

অনুবাদ : দাউদ আল হাফিজ

 

ছেলেবেলার প্রভাবের কথা কিছু বলি। বাবা এম.এন. গোবিন্দন নায়ার ছিলেন খ্যাতনামা লেখক। আমার এক কাকা ছিলেন কার্টুনিস্ট। কেরালায় যারা লেখক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন তাদের মধ্যে আমার বাবাও ছিলেন। এক মেসোমশাইও ছিলেন লেখক। তো এই রকম সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে আমি বেড়ে উঠি। রাবার ও কফির জন্য বিখ্যাত কোট্টায়ম শহরে আমি বড় হয়ে উঠি। এতদঞ্চলের প্রথম কলেজ ও প্রথম ছাপাখানা এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখান থেকেই প্রকাশিত হয় মালয়ালম মনোরমা নামক ম্যাগাজিন।

ছোট হলেও আমাদের পরিবারের বন্ধুবান্ধব চারদিকে ছড়িয়েছিল। স্কেচ-প্যাড নিয়ে আমি বন্ধুদের সঙ্গে সপ্তাহান্তে দূরপ্রান্তে চলে যেতাম। যখন স্কেচ করতে শুরু করি, তখন আমার বয়স বোধকরি ১০/১২ হবে। স্কেচে খুব একটা দক্ষ ছিলাম নাÑ বিশেষ করে আমার এক বন্ধুর তুলনায়। সে এখন পেশায় ডাক্তার, ভারতের বাইরে থাকে। আমরা প্রকৃতি আর জীবজন্তুর স্কেচ করতাম। অবশ্য, পেইন্টার হিসেবে আমার উত্থান সম্ভব হতো বলে মনে হয় না। কেননা, আমার রঙের বোধ ততটা সূক্ষ্ম ছিল না। সে-সময় ক্লাসিক্ল মিউজিক ও কর্ণাটকের কণ্ঠসংগীতের প্রতিও আমি আকৃষ্ট হই। আমার শিক্ষক কোট্টায়ম ছেড়ে চলে যাওয়ায় আমার সাংগীতিক দীক্ষাও দুর্ভাগ্যবশত প্রলম্বিত হয়নি। আজ বুঝতে পারি, সংগীত ও চিত্রকলার প্রতি আমার সে-আগ্রহের যথাযথ বিকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছি।

আমার ছোটবেলায় চলচ্চিত্রের দ্বার বড় একটা খুলে যায়নি। বাড়ির কাছেই খোলা চত্বরে বাবা আমাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। তিনি পৌর কর্পোরেশনের সদস্য হওয়ায় আমরা নিখর্চায় টিকেট পেতাম। এভাবে প্রধানত তামিল ছবিÑ একই ছবি বহুবার দেখেছি। এই ছবিগুলির নাচ ও সংগীত আমাকে খুব টানতো। বিখ্যাত তামিল অভিনেতা চিন্নাপ্পা তো আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন। তিনি একই ছবিতে পাঁচ-পাঁচটি ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাকে একই সঙ্গে গাইতে, বেহালা বাজাতে ও প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা তো রীতিমতো ম্যাজিকের মতো মনে হতো। পাশাপাশি অনেকগুলি কাজে একই ব্যক্তির অংশ নেবার চিন্তাটি তখন আমাকে বেশ উত্তেজিত করে রেখেছিল।

প্রস্তুতিপর্ব প্রসঙ্গে ত্রিবান্দ্রুমে আমার কলেজ জীবনের কথা এসে পড়ে। আমি থাকতাম হোস্টেলে। তখন যাদের সাহচর্য পেয়েছি তারা অনেকেই বয়সে আমার চেয়ে বড় ছিলেন। সকলেই গুণী ব্যক্তিÑ চিত্রকর, লেখক কিংবা কবি। থিয়েটার করবার মানসে প্রতি রবিবার সকালে বেশ কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে মিশেছি। একদিকে ক্লাসÑ উদ্ভিদবিদ্যার পাঠ; অনদিকে শিল্পকলার স্পন্দমান বিস্তৃত বিশ্ব। এ-এক অসীম সম্ভাবনাময় ও বিচিত্রদৃক আবহÑ যে-আবহ আমাকে এড়হব রিঃয ঃযব ডরহফ-এর ন্যায় পশ্চিমা ছবির সঙ্গে পরিচিত করে তোলে এবং ১৯৫৫ সালের দিকে আকিরা কুরোসাওয়ার রাশোমন-এর সঙ্গে। তখন কখনও ভাবিনি পরিণামে চলচ্চিত্রকার হবো। তবে এই লক্ষ্যে পৌঁছুনোর প্রয়াসে কখনও মন্দ কিছু পাইনি। চলচ্চিত্রে কারিগরি দিক সম্বন্ধে আরও কিছু জানার আকাক্সক্ষায় ব্রিটিশ ম্যাগাজিন গড়ারবমড়বৎ-এ প্রাপ্ত সমস্ত ঠিকানায় লিখতাম। অবশ্য, কখনই কোনো উত্তর পাইনি। তবে অনুৎসাহী হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। খানিকটা চাতকপাখির মতোই চিঠিপত্র লিখেছিলাম। তখন কোনো ফিল্ম ইনসটিটিউট ছিল না। ফলে জানতাম না কোন পথে গেলে ব্যবহারিক শিক্ষাটা পাবো। মাদ্রাজ গিয়ে কোন চলচ্চিত্রকারের শিক্ষানবিস হওয়ার ব্যাপারটা তৃপ্তিদায়ক মনে হয়নি। ফলে ফিল্ড অফিসার হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দিই। কর্মসূত্রে ক্ষেতেখামারে গিয়ে কৃষকদেরকে বৈজ্ঞানিক চাষাবাদের বিভিন্ন উপায় বাতলে দিতাম। ২০ বছর আমি এই চাকরি করি। বস্তুত, এ আমার জন্য এক পুরস্কারদায়ী অভিজ্ঞতাÑ কেননা চাকরি সূত্রেই আমি বিস্তর ভ্রমণ করছিলাম, আবিষ্কার করছিলাম প্রকৃতির বদান্যতা আর ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছিলাম বনে-জঙ্গলে পাহাড়ে-পর্বতে। কেরালাকে এভাবেই আমি নিবিড়ভাবে চিনতে পেরেছিলাম।

ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবলে আজ বুঝতে পারি বাবার কারণেই চলচ্চিত্রকার হওয়ার পেছনে আমার কিছুটা আকর্ষণ ছিল। বাবা একসময় ছবি পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন। বাবার স্কুলজীবনের বন্ধু রমানাথন ছিলেন মাদ্রাজের সুপরিচিত চলচ্চিত্র পরিচালক। রমানাথন ছবি তৈরি করেন; আর আইনজীবী বাবা মাঝে-মধ্যে লেখালেখি করে নিজের সৃজনশীলতা প্রকাশ করতেন। বাবা-মা হতে পারেননি আমি হয়ত তা-ই হতে চেয়েছিলাম। যখন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে জড়িত হই, অনুমান করি, তখন থেকেই এই লক্ষ্য অর্জনে ঐকান্তিকভাবে সচেষ্ট ছিলাম। ত্রিবান্দ্রুমে আদুরগোপাল কৃষ্ণন চলচ্চিত্র সংসদ শুরু করেন; আমরা করি কোট্টায়মে। আদুর প্রামাণ্যচিত্র শুরু করলে আমি প্রায়ই ত্রিবান্দ্রুমে তার কাছে যেতাম। এমনকি তার একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে শিল্প নির্দেশক হওয়ার কথা ছিল আমার।

আমার প্রথম চলচ্চিত্র বন্ধুদের কারণে সম্ভব হয়ে ওঠে। আমি তখন রাবার বোর্ডের আঞ্চলিক কর্মকর্তা, সবে বদলি হয়ে কালিকটে এসেছি। এমটি বাসুদেবন নায়ারের মতো লেখকেরা আমার বাসায় সান্ধ্য-আড্ডা দিতে আসতো। আমার এক ব্যাঙ্কার বন্ধু জানালো, চেষ্টা করলে ব্যাঙ্ক থেকে অর্থঋণ পেতে পারি। এদিকে সুপরিচিত লেখক তিকোদিয়ানর হাতে স্বাধীনতা আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় লেখা একটি চিত্রনাট্যও ছিল। ব্যাঙ্কঋণ না-পাওয়ায় আরেক বন্ধু করুণাকরণ অর্থসংগ্রহের দায়ভার নিলেন। চিত্রনাট্যটি খানিকটা বদলে ফেললাম। এক বেকার যুবক ও তার স্বাধীনতা-সংগ্রামী বাবাকে নিয়েই কাহিনি। এরই ফল উত্তরায়নাম (১৯৭৪)। আমার সহজাত বুদ্ধি ও মন যা বলছিল সেটার উপর নির্ভর করেই ছবিটির শুটিং শেষ করি। ক্যামেরা লেন্স কিংবা ক্যামেরা স্থাপনা বিষয়ে তখন আমার তেমন একটা জ্ঞান ছিল না; তবু বেশ মসৃণভাবে শুটিং এগিয়ে গেল। ছবির প্রযুক্তি তেমন একটা অন্তরায় মনে হয়নি। আমার কল্পনায় যেমনটি ছিল তেমন ছবিই ফুটে উঠছিল।

পরবর্তী চলচ্চিত্র কাঞ্চন সীতা (১৯৭৭)। এর কিছু পূর্ব থেকেই আমি থিয়েটার করতে শুরু করি। ছবিটি বহুল আদৃত একটি মালয়ালম নাটক থেকে নেয়া। প্রযোজক রবি এই নাটকটির স্বত্বাধিকারী। তিনিই নাটকটি নিয়ে ছবি বানানোর কথা বলেছিলেন। অভিনয়ে অন্ধ্র প্রদেশের যাযাবর উপজাতির লোকদের কাজে লাগাই। কেরালার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে এরা ধন্বন্তরী ফেরি করে বেড়াতো। এদের মুখাবয়ব আমাকে বেশ নাড়া দেয়। জানতে পারি, এরা রামবংশের উত্তরসূরি। এদের আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি বেশ পরখ করে দেখলাম। ছবিতে রামের ভূমিকায় নিয়েছিলাম সেই রামদাসের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ করি। ছবির গ্রন্থিমোচনের (denouement) জন্য একটি ফ্ল্যাশ ফরওয়ার্ড আছে, যেখানে রাম নদীতে গেলে দেবতা-কর্তৃক স্বর্গে নীত হয়। একে আত্মহত্যাই বলতে হয়, কেননা স্ত্রী সীতার সঙ্গ থেকে সে বিচ্ছিন্ন এবং ইতোমধ্যে সন্তানেরাও বেশ বড় হয়ে উঠেছে। রাজ্যের রাজা হলেও সে নিঃসঙ্গ। মহাকাব্যে আছে, রাম নদীতে গিয়ে অদৃশ্য হলো। আমি মহাকাব্যের পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠি। আমাদের বাড়িতে ফি বছর মাসব্যাপী রামায়ণ পাঠ হতো। মা আমাকে মালয়ালম রামায়ণ পড়ে শোনাতো। ফি বছর বর্ষান্ত পর্যন্ত অর্থাৎ পুরো সেপ্টেম্বর মাস ধরে রামায়ণ পাঠ চলতো।

দুঃখের বিষয়, উপজাতির লোকদের অভিনয়ে নামানো বেশ বিতর্কের সৃষ্টি করে। এই লোকদের যেমন চিরায়ত দেহসৌষ্ঠব, তেমনি আছে অভিনয়কুশলতা। তবু আমাকে শাস্তি পেতে হয়। আরও মর্মঘাতী ব্যাপার হলো, বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার আমার এই কাজকে ব্লাসফেমি বলে দাবি করলেন। মহাকাব্যকে দুর্বোধ্য করে তোলা আমার ইচ্ছা ছিল না। কেন আমাকে ধর্মদ্রোহী বলা হলো জানি না। আমি নিরীশ্বর নই। আবার সেই ঈশ্বরেও বিশ্বাস করিনে যে স্বর্গে বসে আমাদের সকলকে তত্ত্বাবধান করে। সোজা কথায়, আমি বিশ্বাস করি আধ্যাত্মিকতায়, অতীন্দ্রিয়বাদেÑ যে-সব প্রপঞ্চ আমার কাছে বাস্তব বলেই মনে হয়।

আমার পরবর্তী ছবি থাম্পু (১৯৭৮) অনেকটা প্রামাণ্যচিত্র। বেশ কয়েকজন খ-কালীন সার্কাসকর্মীকে আমি চিনতাম, এদের বিষয়ে কিছু লেখালেখিও করেছি। বড় প্রদর্শনী থেকে বাদ যাওয়া দু’চারজন সার্কাসকর্মীর সাক্ষাৎকারও নিই। গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে এরা সার্কাস দেখাতো। ছবিটির শুটিং শুরু হয় একটি গ্রামে, যেখানে আগে কখনও সার্কাস আসেনি। এমনকি গ্রামের লোকেরা ক্যামেরা-বস্তুটিও আগে কখনও দেখেনি। প্রথমদিকে তারা আমাদের ব্যাপারে বেশ কৌতূহল দেখাচ্ছিল। পরে শীঘ্রই এ-সবে অভ্যস্ত হয়ে উঠলে আর ভ্রƒক্ষেপ করেনি। ফলে কাজের জন্য কোনো লুকানো ক্যামেরাও আর ব্যবহার করতে হয়নি।

থাম্পুতে অনেকের ধারণা, আমি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার দ্বন্দ্বের রূপায়ণ করেছি হিপ্পি-মতো এক যুবকের মাধ্যমে যে পৈতৃক বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চায়। সেটি উত্তরায়নাম-এও ছিল। এ কেরালার খুবই প্রাসঙ্গিক সামাজিক অবস্থা। এখান থেকে বহুলোক বাইরে, যেমন মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুর কাজ করতে যায়। এতে প্রভূত অর্থাগম হলেও সন্তান-সন্তুতির সঙ্গে পরিবারের সংযোগ ঢিলে হয়ে যায়। ফলে অবহেলিত প্রজন্ম বিচ্ছিন্নতার দুর্ভাগ্য নিয়েই বেড়ে ওঠে। তারা সনাতন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চায়।

আমার ছবি অরিদাথু (১৯৮৬), বলা হয়ে থাকে, থাম্পুর মতো এপিসোডিক ও ইম্প্রেশানিস্টিক। ছবির এপিসোডিক গঠন নিয়ে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, যা চিন্তা ও চরিত্রায়ণের বিকাশকে ত্বরান্বিত করে। কার্টুনিস্ট হিসেবে আমার অতীত জীবনের প্রভাবও হতে পারে এটি। সংবাদপত্রে ১৪ বছর সাপ্তাহিক কার্টুন সিরিয়াল করেছি, যার নাম ছিল Small men and a Big World। এই সিরিয়ালে প্রতিটি কার্টুন চরিত্র বেকার গ্রাজুয়েটের আকৃতিতে উপস্থাপিত হতো, যেন-বা সে বিরাট কোনো ব্যবসায়ী কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত কোনো রাজনীতিক হতে পারতো।

আমার ছবিতে, বিশেষ করে ইস্থাপ্পন (১৯৭৯)-এ, অতীন্দ্রিয় উপাদান প্রাধান্য পেয়েছে। জীবনের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন স্টেফেনের মতো এমন অনেককে আমি জেনেছি। এদের সত্য ঘটনা আমাদের জানা নেইÑ যতখানি জানি তা লোক-বর্ণিত নানাগল্প ও ঘটনার সমাহার। বাস্তবে তারা কী আমরা জানি না; জানি না তারা সৎ কি কপট, অতীন্দ্রয়বাদী নাকি উন্মাদ। সে-কারণেই শেষ দৃশ্য সমুদ্রসৈকত দিয়ে শুরু করা হয়। পরেই সেখানে তাকে ঘুমাতে দেখা যায়। হেঁয়ালির মতো সেখানে সে পড়ে থাকে।

সচরাচর, আমার ছবিতে দলে দলে ছেলেমেয়ে এসে জোটে। যেন জীবন্ত ক্ষুদে শয়তানের দল। আমি নাকি দলভিন্ন ব্যক্তি কারও প্রতি তেমন মনোযোগ দিইনি এমন অভিযোগও ওঠে আমার বিরুদ্ধে। আমার কুমাত্তি ছবিতে তো মাত্র একটি শিশু। অন্যত্র শিশুদের দলে দলে দেখিয়েছি। কেননা, গ্রামে গ্রামে তারা এভাবেই চলাফেরা করে থাকে। চলার পথে কেউ একজন পড়ে গেলে অন্যেরা তার জন্য অপেক্ষা করে। এরপর তারা বেগে ছুটে পালায় যেমন হঠাৎ ঝাপসা কিছু অপসৃত হয়।

কুমাত্তির মতো ছোটদের ছবি আমি আরও বানাতে চাই। কিন্তু অর্থ কোথায়? কুমাত্তি তৈরি করতে গিয়ে আমি প্রচুর আনন্দ পেয়েছি। বাচ্চাদের চুপ করাতে গিয়ে বাবা-মা যেসব কিম্ভুতকিমাকার, নীচ ও ভয়ঙ্করের গল্প শোনায় তা নিয়েই ছবিটি নির্মিত। সেই কল্পচিত্র আমাদের সকলের মধ্যেই রয়ে গেছে। কিন্তু কেরালায়, বহুগল্পে তাকে জুজু নামের দয়ার্দ্র লোক বলে বর্ণনা করা হয়েছে। অবশ্যি, অন্যসব গল্পে, দৈত্য বলে বর্ণিত, যে-দৈত্য ছেলেমেয়ে ধরে নিয়ে যায়। ছবিটি আমার খুব প্রিয়। দেশের বহু লোক ছবিটি দেখতে পায়নি ভেবে আমি খুবই দুঃখ পাই।

আমি কেন, আবদার ওঠে, আধ্যাত্মিক ও অতীন্দ্রিয় অনুভূতির রূপায়ণ করি না, যেমন করেছি ইস্থাপ্পন-এর একটি দৃশ্যে, যেখানে দূর বন থেকে অলৌকিক আলো ছড়িয়ে পড়ে। আধ্যাত্মিক ও অতীন্দ্রিয় অনুভূতি নিয়ে কথাবার্তা বলা খুবই কঠিন কাজ। এসব বিষয়ে জোরেসোরে কিছু করতে গেলেই সব মাটি হয়ে যায়। অযৌক্তিকে আমাদের বিশ্বাস, আমাদের গুপ্তজ্ঞান রক্ষা করা আমাদেরই উচিৎ। অযৌক্তিক, আমার মতে, খুবই সম্ভব। কেবল নির্দিষ্ট কোনো মুহূর্তেই আমরা যৌক্তিকভাবে চিন্তা করে থাকি। বোধকরি, সত্তার অন্তর্গত কোথাও এমন অনেক জায়গা পড়ে থাকে যেখানটাতে আমরা একই অসম্ভবেও বিশ্বাস করে থাকি। ফলে এসব নিয়ে আমার পক্ষে কোনো ছবি নির্মাণ করা সম্ভব বলে মনে করি না। বরং অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এদিকটাও খানিকটা ছুঁয়ে যাওয়া সম্ভব। এই যে অযৌক্তিকে আমার বিশ্বাস তা আমার বিজ্ঞানবিশ্বাসেরই অংশ মাত্র। বিজ্ঞান নিয়ে আমি কখনও কৌতুক করিনি। কেননা আমি বিশ্বাস করি, ভুল হাতে পড়লে বিজ্ঞান খুবই বিপজ্জনক হবে। অনেক বড় বিপর্যয়ই হবে এর পরিণতি।

‘লোভ’কে মানুষের অবশ্যম্ভাবী পতন হিসেবে চিহ্নিত করেছি, যদিও আমার ছবিতে নোংরা, অশুভ উপাদান সরাসরি আসেনি। বেণু নামে এক চক্রান্তকারী আছে অরিদাথু ছবিতে। ছবিটির সব চরিত্রই ক্যারিকেচারÑ হোক সে জমিদার কিংবা অতি সাধারণ গ্রামীণ শ্রমিক। আমি বিশ্বাস করি না যে জীবন সাদা ও কালো। উপরন্তু, সেখানে ধূসর এলাকাও রয়েছে।

একইরকম মানসিক অসুস্থতা নিয়ে তৈরি পক্কুভেয়িল (১৯৮১) ও চিদাম্বরম (১৯৮৫)। ফলে ছবি দুটি পরম্পরের পরিপূরক হিসেবে ধরা যায়। সাংগীতিক ছন্দে বিন্যস্ত গঠনশৈলী আছে পুক্কুভেয়িল-এ, অন্যদিকে চিদাম্বরম-এ আছে নিরেট গল্প। সান্ধ্য রং-উজ্জ্বল রক্তিমাভ বাদামি থেকে ফিকে হলুদ হয়ে ফের বাদামিÑ এমন রঙের প্রেক্ষাপটে আনবার মানসে প্রধানত সন্ধ্যাবেলায় পক্কুভেয়িল-এর শুটিং করি। এতে আছে স্বাপ্নিক বৈশিষ্ট্য। আমার দেখা স্বপ্ন একসময় ঘুম থেকে জেগেই লিখে রাখতাম; আমার এক মনোবিজ্ঞানী বন্ধুর সঙ্গে সে-সব স্বপ্ন নিয়ে আলোচনাও করতাম। তো, এভাবেই ছবিটি শুরু করি, এটি একান্তই ব্যক্তিক, নিরীক্ষাধর্মী ছবি, যা কোনোভাবেই নাটকের জন্য যুৎসই ছিল না। যারা ছবিটি দেখেছে, বহুবার দেখেছে সেইসব লোকের কাছ থেকে, সুদূর আমেরিকা থেকেও, অনেক চিঠিপত্র পেয়েছি। এই ছবিটি আমার কাছে বিশিষ্ট হয়ে আছে এই কারণে যে, এই ছবি থেকে খরচের পয়সাও ওঠেনি। ছবিটি অন্যের অর্থে নির্মিত বলে আমার খুব খারাপ লাগে। এটিরও প্রযোজক ছিলেন রবি। রবির সঙ্গে আর কোনো ছবি আমি বানাইনি, যদিও সম্প্রতি দূরদর্শন জাতীয় কার্যক্রমে ছবিটি দেখানোর ফলে লগ্নীকৃত অর্থটা ফেরৎ এসেছে।

চিদাম্বরম ছবির গল্পটি, সি.ভি. শ্রীরমণের লেখা, আমাকে আকৃষ্ট করে। অন্যদিকে, কেন আমরা একত্রে কাজ করি না এই মর্মে স্মিতা পাতিলের দীর্ঘদিনের অনুযোগও ছিল। প্রকৃতিরাজ্যে কৃত্রিমতার হস্তক্ষেপ নিয়েই কাহিনি। আর প্রকৃতির প্রতি আমার মমত্ববোধ ইতোমধ্যে বিদিত। আর তাই, এ-ছবিটিতে একটি দৃশ্য আছে, যেখানে স্মিতা একটি সংকর গোলাপের বাগিচায় প্রবেশ করতে গেলে তার স্বামী তাকে বাধা দেয়।

অভিনেতা-অভিনেত্রীকে একটি নির্দিষ্ট ধারার নির্দেশনাই আমি সচরাচর দিয়েছি। চিদাম্বরম-এ স্মিতা ও গোপীর কথা বলি। আমাদের সম্পর্ক এতটাই সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল যে প্রায়শই তেমন নির্দেশনার প্রয়োজনই পড়েনি। এতখানি সমঝোতা ছিল আমাদের মধ্যে।

এবার উন্নি (১৯৮৯) নির্মাণ প্রসঙ্গে কিছু বলা দরকার। বিল রথম্যান ও কিটি মরগ্যান তাদের ছাত্রছাত্রী নিয়ে আমেরিকা থেকে আমাদের চলচ্চিত্র উৎসবে প্রায়ই আসতেন। ভিডিও-তে একটি ছোট্ট চলচ্চিত্র করার ইচ্ছে তাদের। সেটি তারা আমেরিকা নিয়ে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শনী করবেন্ একবার তারা ত্রিবান্দ্রুম চলচ্চিত্র উৎসবেও এলেন। তারা এতটা দৃঢ়সংকল্প আমি ভাবিনি। অর্থ ও কলাকুশলীসহ খুব শীঘ্রই আসছেন বলে তারা হঠাৎই একদিন লিখে জানালেন। কলাকুশলী বলতে তারা সেসব ছাত্রছাত্রীদেরকেই বুঝিয়েছিলেন। আর পিছপা হবার উপায় ছিল না। ছবিটি কেবল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রদর্শনীর জন্য, বাইরের জন্য নয়। বিল রথম্যান তাত্ত্বিক শিক্ষক। তার ধরনধারণ আমার সঙ্গে মেলেনিÑ না চিত্রনাট্যে, না কাজে। ছবিটি আগাগোড়া তার চিত্রনাট্য অনুসারে তৈরি। চিত্রনাট্য ও চরিত্রায়ণ সম্পর্কে মাঝে-মধ্যেই আমি তাকে জিজ্ঞেস করে নিতাম। বিলের চিত্রনাট্য পুনেতে দেখা কিছু মানুষকে নিয়ে। উন্নি এক বালক গাইড। তারও কিছু মার্কিন পর্যটকের মধ্যে বিকশিত সম্পর্কই এর ভিত্তি। ছবিটির কাহিনি আমার কাছে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।

আমার পরবর্তী ছবি মরোত্তম (১৯৮৯)-এর অর্থ যোগান দেয় দূরদর্শন, যদিও ছবিটি দূরদর্শনে প্রদর্শিত হয়নি। কেন হয়নি আমি জানি নাÑ হতে পারে সেই আমলাতান্ত্রিক ঝামেলা। তারা, বোধকরি, অচিরেই কোনো টেলিফিল্ম উৎসব করে মরোত্তম ছবিটি দেখানোর ব্যবস্থা করতে পারে। ছবিটির ভিত্তি একটি একাঙ্ক নাটিকা। কলাকুশলী ও তাদের ভূমিকা নিয়েই কাহিনি।

অভিনেতার নিজ চরিত্র ও রূপায়ণযোগ্য ভূমিকার মধ্যে একধরনের দ্বি-বিভাজন, বৈপরীত্য উপস্থিত। অভিনেতা এখানে নিহত হয়। তার বৈপরীত্যগুলো তিনটি বিচিত্র দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থিত করা হয়।

চলচ্চিত্র নিয়ে আমার কাজ, সেই মধ্য-সত্তরের দশক থেকে। স্বীকার্য যে, সমান্তাল সিনেমায় ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। পরিবেশক পাওয়া এখন আর ততখানি কঠিন নয়। আমার যা দুঃখ তা কেবল নবীনদের নিয়ে। আজ ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে বেরিয়ে এসে স্নাতকেরা তাদের তেজস্বিতা প্রকাশ করবার মতো তেমন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না। অর্থসংগ্রহে অতি দুষ্কর সংগ্রামের মুখে পড়তে হয়; প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের শুধুই কষ্টের দিন। এসি সুকুমারন ও কে আর মোহানন, আমার মতে, এই দুই সম্ভাবনাময় উঠতি চলচ্চিত্রকারকে সহায়তা করা দরকার।

প্রামাণ্যচিত্র। সেসবও বেশকিছু নির্মাণ করেছি। প্রামাণ্যচিত্র, আমার কাছে, কাহিনিচিত্রের মতো অতখানি সৃজনশীল নয়। জে কৃষ্ণমূর্তিকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রটি একমাত্র ব্যতিক্রম। এ ছিল এক চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতা; আমার স্পন্সর কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব। কেবল মনি কাউল, আমার মতে, এই মাধ্যমে একটু ভিন্ন কিছু করতে পেরেছেন। কাশ্মির পর্যটন বিভাগ প্রযোজতি তার Before ¸ Ezes ছবিটি বেশ চিত্তাকর্ষক। তাছাড়া, সৎভাবে কোনো রাজনৈতিক প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করাও আজকাল প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ফলে রাজনৈতিক সচেতনতা-বর্ধনেই বা এর কতটুকু ভূমিকা থাকছে? অনেক বেশি সীমাবদ্ধতা এদিকে। আনন্দ পট্টবর্ধনের পক্ষেই হয়ত এটা সম্ভব, কেননা তিনি চারদিক লড়তে পারেন; সে-সাহস তার আছে।

কেউ কেউ আমার পরবর্তী ছবি বাস্তুহারাকে যথেষ্ট উচ্চাকাক্সক্ষী হিসেবে ধরেন। দ্বিতীয় ছবি হিসেবে ১৯৭৫ সালেই এটি তৈরি করতে চেয়েছিলাম। এ-গল্পটিও চিদাম্বরম-এর লেখক শ্রীরমণের। বাংলা কেরলা ও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ এই তিনটি এলাকায় শুটিংয়ের অর্থসংস্থান হয়নি বলেই তখন ছবিটি নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। বাস্তুচ্যুত এক বিধবাকে নিয়ে এই ছবিÑ বিধবার স্বামীর এক ভাইপোর মুখে বর্ণিত। সে সরকারি জুনিয়র কর্মকর্তা। ১৯৭১ সাল। তার কাজ বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের আন্দামানে পুনর্বাসন করা। এই দূর-দ্বীপপুঞ্জের স্বপ্নে সবাই বিভোর, ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তার অভিবাসীদের কাছে যেমন স্বপ্নের দেশ আমেরিকা। বিধবাটিও সেখানে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে চায়। কিন্তু দুটি শর্ত বাধা হয়ে দাঁড়ায় : অভিবাসীদের হতে হবে নিম্নবর্ণের, এবং কৃষক পরিবারের। অচলাবস্থা হলেও স্বামী-সন্তান-সন্তুতিদের ছেড়ে শরণার্থীদের চলে যেতে হবে। বেচারা ভাইপো আইন মানতে বাধ্য। সে তাই অনুশোচনায় বিধবার অতীত স্মৃতিচারণ করে।

আমার সমগ্র চলচ্চিত্রকর্ম থেকে এটি ভিন্ন। কেননা, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিক পরিস্থিতি, ছবিটিতে, একাকার হয়ে যায়। গল্পের লেখক এক সময় পুনর্বাসন কর্মকর্তা হিসেবে বাংলায় কাজ করেছিলেন। বাস্তবজীবনের কাহিনি নিয়েই এই চিত্রনাট্য; ফলে এর প্রামাণ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। শরণার্থীদের বাস্তুচ্যুতি কেবল শারীরিক নয়, একই সঙ্গে আবেগিক। এছাড়া, স্থাবর সম্পত্তি হারিয়ে যেকোনো শরণার্থী তার মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলে। শরণার্থীদের গল্প সর্বজনীনÑযেমন সত্য পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধতাড়িত মানুষের ক্ষেত্রে, তেমনি সত্য সাম্প্রতিক উপসাগর প্রত্যাগতদের বেলাতেও। কেবল সহজাত ব্যবসায়িক বুদ্ধিসম্পন্নরাই সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে, যেমন আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে বসতিস্থাপনকারীরা আজ বিত্তশালী। অন্যদিকে, পৌরাণিক ‘সব পেয়েছির দেশে’ প্রবেশের সংগ্রামে যারা হেরে যায়, সবদিকেই তাদের দ্বার রুদ্ধ।