সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

সাহিত্য সাধনায় খুলনা (১৮৮২-১৯৮২) – বিভূতিভূষণ মণ্ডল

September 20th, 2016 7:57 am
সাহিত্য সাধনায় খুলনা  (১৮৮২-১৯৮২) – বিভূতিভূষণ মণ্ডল

প্রবন্ধ

সাহিত্য সাধনায় খুলনা

(১৮৮২-১৯৮২)

বিভূতিভূষণ মণ্ডল

 

ভৌগোলিক সীমারেখার খুলনা জেলায় (বৃহত্তর অর্থে-খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ) প্রথম কবে সাহিত্যের উন্মেষ ঘটেছিল সে কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে কাগজে কলমে সাহিত্য রচনার পূর্বে মানুষ মুখে মুখে যেসব ছড়া, ধাঁধা, গৎ, গান বা বিভিন্ন কিস্সা কাহিনি রচনা করত তার প্রামাণ্য নিদর্শন যে খুলনাতেও রয়েছে সাহিত্য-ইতিহাস গবেষকেরা তা প্রমাণ করেছেন। এই নিরীখে খুলনা জেলার সাহিত্য-নিদর্শন অনুসন্ধান করতে গেলে প্রথমদিকে যেগুলোর নাম পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে- গাজী-কালু-চম্পাবতীর কিসসা, দক্ষিণারায়ের মঙ্গলকাব্য কাহিনি, বনবিবি-বনদুর্গার মাহাত্ম্য কাহিনি প্রভৃতি। মুহম্মদ আবূ তালিবের ভাষায় : ‘বাংলা বাণীর মন্দাকিনী স্রোত যিনি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন, সেই মীন বা মৎসেন্দ্রনাথ ছিলেন সাগরিকা খুলনা জেলার সাক্ষাৎ ভগিনী চন্দ্রদ্বীপের বাসিন্দা। তাই খুলনা জেলাতেও সে স্রোতের ধারা প্রবাহিত হয়নি এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। মধ্যযুগের একমাত্র ইতিহাসনির্ভর কাব্যগ্রন্থ ভাস্কর পরাভব বা মহারাষ্ট্র পুরাণ (১৭৫১)-এর রচয়িতা গঙ্গারাম দত্ত নড়াইল মহকুমার বাসিন্দা বলে গবেষকদের ধারণা। তখন নড়াইল খুলনা জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাই গঙ্গারামকে খুলনার সন্তান বলেই ধরে নেওয়া যায়।’

খুলনা জেলার সাহিত্যাঙ্গন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই খুলনার সাথে সাহিত্যিকদের সম্পর্কের যোগসূত্রটি নিরূপণ করা দরকার। প্রথমত খুলনা কোনো কোনো বরেণ্য সাহিত্যিকের পুণ্য জন্মভূমি, দ্বিতীয়ত, কারও কারও কর্মভূমি এবং তৃতীয়ত, কেউ কেউ অন্য স্থান থেকে এসে খুলনাতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন। এভাবেই খুলনা তাঁদের জীবন ও সাহিত্যকর্মকে প্রভাবিত করেছে। কর্মজীবনে চাকরি নিয়ে খুলনা মহকুমার ম্যাজিষ্ট্রেট হয়ে এসেছিলেন সাহিত্য-সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪)। তাঁর হাতেই বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) রচিত হয় এই খুলনার মাটিতেই। তাঁর চন্দ্রশেখর উপন্যাসের আভাস ছিল বর্তমান বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার ‘মোরেল-রহিমুল্লাহ’ ঐতিহাসিক সংঘর্ষের পরিবর্তিত রূপ। বঙ্কিম-জীবনী লেখক পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, মোরেল-রহিমুল্লাহ সংঘর্ষের প্রধান নায়ক বিশ বৎসর বয়স্ক ডেনিশ যুবক হেলি বা হিলিকে বঙ্কিমচন্দ্র ‘লরেন্স ফস্টর’ রূপে চিত্রিত করেছেন এবং ভাগ্য বিড়ম্বিতা রহিমুল্লাহ-ঘরণী ভগী বিবিকে শৌবলিনীরূপে অঙ্কিত করে মোরেল-রহিমুল্লাহ কাহিনিকে অমর করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকু-লা (১৮৬৬) উপন্যাসের আবহ বর্ণিত হয়েছে সুন্দরবনের ছায়া অবলম্বনে। শেকড়ের উৎস সন্ধান করতে গেলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) পূর্ব-পুরুষের বাসস্থান ছিল খুলনার পিঠাভোগ গ্রামে। আরও নানাবিধ আত্মীয়তার সূত্রে খুলনার সাথে তাঁর একটি সম্পর্ক রয়েছেই। তিনি তাঁর ‘নামঞ্জুর গল্প’ (১৩৩২)-তে লেখেন ‘খুলনা জেলায় পিসিমার আদি শ্বশুর বাড়ি’। সে যাই হোক, খুলনা জেলা কবিগুরুর রচনাতেও রেখাপাত করেছে। এরকম আরও বহু বিখ্যাত লেখকের রচনাতে খুলনার উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়।

খুলনা জেলার সাহিত্যাঙ্গনে প্রথম  যার নাম উচ্চারণ করতে হয় তিনি কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার (১৮৩৪-১৯০৭)। তাঁর জন্ম বর্তমান দীঘলিয়া থানার সেনহাটী গ্রামে। তাঁর সম্ভাবশতক (১৮৬১) কাব্যটি বাংলার গীতা হিসেবে খ্যাত। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে মোহভোগ (১৮৭১), রাসের ইতিবৃত্ত (১৮৬৮), কৈবল্যতত্ত্ব, শিববিবাহ, নীতিস্তবক, শিবপঞ্চাশৎ, প্রভৃতি। মুনসী খয়রাতুল্লাহ (১৮৪২-১৯৩৬) ছিলেন মধুসূদন প্রভাবিত কবি। তিনি কার্ব্বালা তরঙ্গকাব্য (১৯০৭), তারিফে রসুল, খোদা হাফেজ প্রভৃতি কাব্য রচনা করেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের জ্ঞাতিভ্রাতুষ্পুত্রী মানকুমারী বসু (১৮৬৩-১৯৪৩) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান মহিলা কবি। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ প্রিয়প্রসঙ্গ (১৮৮৪), বাঙ্গালী রমণীদের গৃহধর্ম (১৮৯০), কুসুমাঞ্জলি (১৮৯৩), কণকাঞ্জলি (১৮৯৬), বীরকুমার বধ (১৯০৪), শুভসাধনা (১৯১১), বিভূতি (১৯২৪), সোনার সাথী (১৯২৭) প্রভৃতি। যশোহর-খুলনার ইতিহাস (১ম খণ্ড-১৯১৪, ২য় খণ্ড-১৯২২) গ্রন্থ প্রণেতা সতীশচন্দ্র মিত্র (১৮৭২- ১৯৩১) সাহিত্য সাধনায়ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। মা (১৮৯৬), প্রতাপসিংহ (১৯০৪), উচ্ছ্বাস (১৯০৮), হরিদাস ঠাকুর (১৯২৪), সপ্ত গোস্বামী (১৯২৭) তাঁর সাহিত্যকর্ম। তিনি ‘কাব্যসিন্ধু’ ও ‘কবিরঞ্জন’ উপাধি লাভ করেন। আব্দুল গফুর সিদ্দিকী (১৮৭২-১৯৫৯) বসিরহাট থেকে এসে খুলনার বাসিন্দা হন। তাঁর গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে শহীদ তিতুমীর (১৯১৬), মুসলমান ও বঙ্গসাহিত্য (১৯২২), বিষাদ-সিন্ধুর ঐতিহাসিক পটভূমি, প্রভৃতি। বহুমাত্রিক লেখক বিধুভূষণ বসুর (১৮৭৫-১৯৭২) জন্ম বর্তমান বাগেরহাট জেলার কাঁঠাল গ্রামে। তিনি গল্প-কবিতা-উপন্যাস-নাটকসহ- লক্ষ্মীমেয়ে, চারুচন্দ্র, অমৃতগরল, সুভদ্রা, পাপিষ্ঠা, গোধন, প্রখরা, ফুলের কলি, কামিনী কাঞ্চন, বিয়ের বাতাস, পরিণাম, নষ্টোদ্ধার, বনমালা প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন। বনমালা কাব্যখানি রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা অর্জন করে। খানবাহাদুর আহছানউল্লা (১৮৭৩-১৯৬৫) ইসলামের ইতিহাস ও মূল্যবোধ নিয়ে বহুসংখ্যক গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলোর মধ্যে বঙ্গভাষা ও মুসলমান সাহিত্য (১৯৩১), আল-ইসালাম (১৯৩০), শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমান (১৯৩১), ইসলামের রবি হযরত মোহাম্মদ (১৯৫২), তরীকত শিক্ষা (১৯৩১), ছুফি (১৯৪৭), সৃষ্টিতত্ত্ব্ (১৯৪৯) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ‘মুসলিম সমাজের শরৎচন্দ্র’ খ্যাত কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬) জন্মগ্রহণ করেণ গদাইপুর গ্রামে। তাঁর আব্দুল্লাহ (১৯৩৩) একটি কালজয়ী উপন্যাস। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থ- আঁখিজল, লতিকা, প্রবন্ধমালা, নবীকাহিনী প্রভৃতি। নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (১৮৯২-১৯৬১) সেনহাটী গ্রামের সন্তান। তাঁর নাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিরাজ-উদ-দৌলা, রক্তকমল (১৯২৯), ঝড়ের রাতে (১৯৩১), দেশের দাবী (১৯৪৩), স্বামী-স্ত্রী (১৯৩৭), রাষ্ট্রবিপ্লব (১৯৪৪), ধানীপান্না, এই স্বাধীনতা ইত্যাদি।

কাজী আকরম হোসেন (১৮৯৬- ১৯৬৩)-এর গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে- ইসলামের ইতিহাস (১৯২৪), নওরোজ (১৯৩৮), পল্লীবাণী (১৯৪৩), আমরা বাঙ্গালী (১৯৪৫), যুগবাণী (১৯৪৩), মসনবী রুমি (১৯৪৮), করীমা-ই-সাদী (১৯৪৮), দীওয়ান-ই-হাফিজ (১৯৬১) প্রভৃতি। কবি ইসমাইল হোসেন (১৮৯৮-?) দৌলতপুরে জন্মগ্রহণ করেন। দৃষ্টিহীনতার কারণে তিনি ‘অন্ধকবি’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে মরণ বরণ, মায়ার বাঁধন, যুগের আলো, ঈদের সওদা, দরদী, স্বাস্থ্যগাঁথা, মরুর দুলাল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ডা. আবুল কাসেম (১৯০২-১৯৮৭) খুলনার সাহিত্যাঙ্গনের অন্যতম প্রধান বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তিনি বহুসংখ্যক গ্রন্থ প্রণেতা। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মানসী (১৯২৯), হযরত মোহাম্মদ (১৯৩১), মহর্ষি মহসিন (১৯৩৭), ঈশা খাঁ স্বর্ণময়ী (১৯৩০), আমার ভূ-প্রদক্ষিণ (১৯৩০), ভারত ভ্রমণ (১৯৩৭), দূর দূরান্তরে (১৯৬২), পঞ্চনদের দেশে (১৯৬৮), বিজ্ঞানের জন্মরহস্য প্রভৃতি। রবীন্দ্রনাথ, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, মাওলানা আকরম খাঁ, অধ্যাপক ধীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ আবুল কাসেমের সাহিত্য প্রতিভার সমাদর করেছেন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি সিকান্দার আবু জাফরের (১৯১৯-১৯৭৫) জন্ম তেঁতুলিয়া গ্রামে। তিনি মূলত কবি হলেও নাটক, ছোটগল্প, উপন্যাস, রচনাতেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। জয়ের পথে (১৯৪২) পূরবী (১৯৪৪), নতুন সকাল (১৯৪৫), শকুন্তলা উপাখ্যান (১৯৫৮), প্রসন্ন প্রহর (১৯৬৫), বৈরী-বৃষ্টিতে (১৯৬৫), তিমিরান্তিক (১৯৬৫), সিরাজ-উদ-দৌলা (১৯৬৫), মহাকবি আলাওল (১৯৬৫), কবিতা- ১৩৭২ (১৯৬৮), বৃশ্চিকলগ্ন (১৯৭১), সিংহের নাটক প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তিনি নাটকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৬) লাভ করেন। গাজী শামছুর রহমান (১৯২১-১৯৯৮) খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার মালতিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি সাহিত্য সাধনায় ব্রতী হন। কর্মজীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি আইন-আদালতের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে তাঁর রচনার শিরোনাম ও বিষয়বস্তুতে সে প্রভাব পড়েছে। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্য, নাটক প্রভৃতিসহ তাঁর গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে- আইনের চোখে, আইনের আলোকে, আইনের অন্ধকারে, আইনের ফাঁকে, একপুরুষ দুইস্ত্রী, রাহেলার মামলা, নয়া শপথ, কলরোল, ঝলক, নবীদের কথা, কালি কলম মন প্রভৃতি। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৩) এবং একুশে পদক (১৯৮৫) লাভ করেন। বাংলাদেশের শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের অন্যতম পুরোধা নীলিমা ইব্রাহিমের (১৯২১-২০০২) পৈতৃক নিবাস বর্তমান বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট থানার মূলঘর গ্রামে। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলি- আমি বীরাঙ্গনা বলছি, বিশ শতকের মেয়ে, একপথ দুইবাঁক, কেয়াবন সঞ্চারিণী, বহ্নি-বলয়, দু’য়ে দু’য়ে চার, যে আরণ্যে আলো নেই, রোদজ্বলা বিকেল ছাড়াও রয়েছে বাংলার কবি মধুসূদন, শরৎ-প্রতিভা প্রভৃতি সমালোচনামূলক গ্রন্থ। প্রবন্ধ গবেষণার জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৯)সহ বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হন। সুন্দরবনের ইতিহাস (১৯৭৬) গ্রন্থের লেখক এ এফ এম আব্দুল জলিল (১৯১৬-১৯৭৮) প্রবন্ধ রচনায়ও পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর প্রবন্ধ-গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ইউরোপিয় সভ্যতায় ইসলামের দান (১৯৪৭), পারস্য সাহিত্য (১৯৪৯), মুসলিম সংস্কৃতি (১৯৪৯), মুসলিম আইন ও সমাজ ব্যবস্থা (১৯৪৯), আমার কথা (১৯৭০), আইয়ুব আমলের ভূত (১৯৭০) প্রভৃতি। তিনি বাংলা একাডেমির স্পেশাল এওয়ার্ড (১৯৬৮) লাভ করেন।

রূপসা থানার দেয়াড়া বেলফুলিয়া গ্রামের সন্তান কবি আবুল হোসেনের (১৯২২- ২০১৪) কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে নববসন্ত, বিরস সংলাপ’, হাওয়া তোমার কী দুঃসাহস, দুঃস্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্ন, প্রভৃতি।

পুলিশি চাকরি যে সাহিত্য সাধনার অন্তরায় নয় তাঁর উজ্জ্বল উদাহরণ বেদূঈন সামাদ (১৯২৬-২০০১)। ১৯৪৬ সালে চাকরি নিয়ে তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে বাংলাদেশে এসে চিরদিনের জন্যে থেকে যান এবং খুলনায় ডেরা বাঁধেন। তাঁর প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বেলাশেষে (১৯৫৬) তাঁর অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নিষ্পত্তি (১৯৫৮), দুই নদী এক ঢেউ (১৯৫৯), অভিযান (১৯৬০), ধুমনগরী (১৯৬৪), ফুল ও কুঁড়ি (১৯৬৬), শুনি সেই পদধ্বনি (১৯৭০), প্রতিশোধ (১৯৭৫) প্রভৃতি।

খালিশপুরের গোয়ালখালী গ্রামে জন্মগ্রহণকারী মুহম্মদ আবূ তালিব (১৯২৮-২০০৭) মূলত লোকসাহিত্য- বিশারদ। তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- বাংলা সাহিত্যের ধারা, বাংলা সাহিত্যের একটি হারানো ধারা, লালন শাহও লালন গীতিকা, ফকির নেতা মজনু শাহ, উত্তরবঙ্গে সাহিত্য সাধনা, লোক সাহিত্য প্রভৃতি। কবি আবুবকর সিদ্দিকের (১৯৩৪-) জন্ম বাগেরহাটের গোটাপাড়া গ্রামে। ধবল দুধের স্বরগ্রাম (১৯৬৯) তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। অন্যান্য কাব্যের মধ্যে রয়েছে বিনিদ্রকালের ভেলা, হে লোক সভ্যতা, মানুষ তোমার বিক্ষত দিন, হেমন্তের সোনালতা, শ্যামল যাযাবর, কংকালে অলংকার দিও প্রভৃতি। জলরাক্ষস ও খরাদাহ তাঁর দু’টি বিখ্যাত উপন্যাস। চরবিনাশ কাল, মরে বাঁচার স্বাধীনতা, ছায়া প্রধান অঘ্রান তাঁর গল্পগ্রন্থ। ১৯৮৮ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

আনিস সিদ্দিকীর (১৯৩৪-১৯৮৫) জন্ম আশাশুনি থানার দরগাহপুর গ্রামে। সব মিলিয়ে তিনি ৩২ খানার মতো গ্রন্থ রচনা করেন। যখন আমি রাণী ছিলাম, বিতাড়িত রাজা ফারুক, মুক্তি সংগ্রামে নাসের, যমুনার তীরে তীরে, ঢাকার ঐতিহাসিক ট্রাজেডি, প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। তিনি ‘একুশে পদক’-এ সম্মানিত হন। দু’পার বাংলার অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের (১৯৩৯-) জন্ম বর্ধমানে হলেও তিনি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে খুলনার ফুলতলায় এসে বসবাস শুরু করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে- সাগর পারের পাখিরা, পাষাণ বেদী, আত্মজা ও একটি করবী গাছ (১৯৬৭), জীবন ঘষে আগুণ (১৯৭৩), নামহীন গোত্রহীন (১৯৭৫), পাতালে হাসপাতালে (১৯৮১), কথা সাহিত্যের কথকতা (১৯৮১) আগুনপাখি প্রভৃতি। বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭০) সহ তিনি বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ‘আলোকিত মানুষ চাই-’ আন্দোলনের পথিকৃৎ আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের (১৯৪০-) পৈতৃক নিবাস বাগেরহাটের কামারগাতি গ্রামে। নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, দুর্বলতায় রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য প্রবন্ধ, বন্ধ দরোজায় ধাক্কা, মৃত্যুময় ও চিরহরিত, রোদনরূপসী, খরযৌবনে বন্দী, দুঃস্বপ্নের গল্প, যুদ্ধযাত্রা, তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। তিনি ফিলিপাইনের ‘ম্যাগসেসেস’ পুরস্কার লাভ করেন। কথাসাহিত্যিক এহসান চৌধুরীর (১৯৪০-) জন্ম খুলনায়। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ নূপুরের মন (১৯৬৮), চেনা মিছিল (১৯৬৯), রক্ত ঝরার দিন (১৯৭৩), অন্তিম প্রার্থনা (১৯৭৪), ফেরারী দিন (১৯৭৬), চিড়িয়াখানার জীবজন্তু (১৯৮১) প্রভৃতি। কবি মোহাম্মদ রফিকের (১৯৪৩) জন্ম বাগেরহাটের বৈটপুর গ্রামে, বাংলাদেশের আধুনিক কবিদের মধ্যে অন্যতম তিনি। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ বৈশাখী পূর্ণিমা (১৯৭০), ধুলোর সংসারে এই মাটি (১৯৭৬), কীর্তিনাশা (১৯৭৯) প্রভৃতি। তিনি বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত। মূলত নাট্যকার ও যাত্রাপালাকার পরিতোষ ব্রহ্মচারীর (১৯৪৩-২০০০) রচনার মধ্য ক্লিওপেট্রা, বনবাসে রাম, আবার দরিয়া ডাকে, ফেরারী নায়ক, দস্যু ফুলনদেবী, ‘মহুয়া’, শিরি-ফরহাদ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। কবিকিশোর আজমল হোসেনের (?-১৯৭২) জন্ম রামপালের ফয়লা গ্রামে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো তাঁরও অকাল প্রয়াণ ঘটে। তিনি স্বল্পায়ু জীবনে ১০ খানার মতো গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ছায়াবীথি, সন্ধ্যাতারা, শ্যামলী, উজান গাঙের বাঁকে, বাংলা আমার, রক্তলেখা, ঝড়ের রাতে প্রভৃতি। খুলনা সাহিত্য সংসদের পুরস্কার লাভ করেন তিনি। শিশু সাহিত্যিক হালিমা খাতুনের জন্ম বাগেরহাটে। সোনা পুতুলের বিয়ে, হরিণের চশমা, পাখির ছানা, পশুপাখির ছড়া, কাঁঠাল খাবো, বাচ্চা হাতির কা- প্রভৃতি তাঁর শিশুতোষ রচনা। খুলনার আঞ্চলিক ইতিহার রচনার অন্যতম পথিকৃৎ খগেন্দ্রনাথ বসু কবিতা রচনায়ও আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রভাবতী’ সে সময়ে যথেষ্ট সমাদর লাভ করেছিল। তিনি ‘কাব্যবিনোদ’ ও ‘সাহিত্যভূষণ’ উপাধিপ্রাপ্ত হন। বাগেরহাটের ভূপেশচন্দ্র আইচের দু’টি সুখপাঠ্য গ্রন্থ হে ঋষি প্রণাম ও মঞ্জুশ্রী বাড়ি নেই। মীর মশাররফ হোসেনের প্রভাবান্বিত বাগেরহাটের মেছেরদ্দী কবিরাজ তারাসুন্দরী, বিষাদতরঙ্গ, বেহুলা প্রভৃতি কাহিনি রচনার মাধ্যমে সেকালে যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করেছিলেন। নিশিকান্ত বসুরায়ও সেকালে পথের শেষে, বঙ্গে বর্গী প্রভৃতি মঞ্চসফল নাটক রচনা করে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভে সমর্থ হয়েছিলেন। এছাড়া রতন ঘোষ অহল্যার রাত্রি, আব্দুল হাকিম মগের মুল্লুক নাটক লিখে বেশ সাড়া ফেলেছিলেন। অধুনা বিস্মৃত মহিলাসুন্দরী মজুমদার, মোসাম্মৎ রেজিয়া খাতুন, আব্দুল খালেক একসময় কবি হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি ও পরিচিতি লাভ করেছিলেন।

 

তথ্যসূত্র :

১. খুলনা জেলা ও তার সাহিত্যাঙ্গন- মুহম্মদ আবূ তালিব, সুন্দরবন-৭৯, খুলনা সমিতির স্মারকপত্র।

২. বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান, ১৯৯৭।

৩. সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব খুলনা- যশোর- কুষ্টিয়া- কাজী শওকত শাহী, যশোর, ২০০৩।

৪. ইতিহাস ও ঐতিহ্যে খুলনার দৌলতপুর (সম্পাদিত), ২০০৩।

 

বিভূতিভূষণ মণ্ডল : প্রাবন্ধিক, গবেষক। প্রভাষক (ইংরেজি বিভাগ), শহীদ আবুল কাশেম কলেজ, খুলনা