সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

উপন্যাস বাদ্যি – মঈন আহমেদ

September 20th, 2016 7:52 am
উপন্যাস  বাদ্যি  – মঈন আহমেদ

উপন্যাস

বাদ্যি

মঈন আহমেদ

 

তম তো জড়িয়ে এল, মা।

শুকতারা কর্মব্যস্ততায় শিশু পদ্মাবতীর কোমল হৃদয়ের আকুতির কোন প্রত্যুত্তর করলেন না। অধিশ্রয়ণী থেকে একটি অঙ্গার লৌহের আংটায় তুলে গো-ঘৃত সিক্ত পলতায় অগ্নি সংযোগে প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করলেন। উদগ্র ধূম্রসম্বলিত প্রদীপ করতলে নিয়ে সদাশিব, শ্রী কৃষ্ণ আর অর্ধনারীশ্বরের পাদমূলে স্থাপন করলেন।

পদ্মাবতী স্খলিত পাদবিক্ষেপে শুকতারাকে অনুসরণ করে দেবগণের সম্মুখে এসে দাঁড়াল। পদ্মাবতী জানে তার জননী এখনি সাষ্টাঙ্গে দেবগণকে প্রণাম জানাবেন। সে পূর্বেই মায়ের অনুকরণে নিজেকে দেবতাদের সম্মুখে পতিত করল।

পদ্মাবতীর পিতা বহির বাটে আছেন। কন্যার এই আচার দৃশ্য অবলোকন থেকে বঞ্চিত হলেন। দুহিতার হেন আচার তার দৃষ্টিগোচর হলে কন্যার প্রতি প্রেমের মাত্রায় আর একটি আস্তরণ যুক্ত করত। শুকতারা প্রণাম সমাপনান্তে উপবিষ্ট হওয়ার পরও যখন পদ্মাবতী প্রণামাসন ভঙ্গ করল না তখন তিনি আলতো স্পর্শে পদ্মাবতীর দুবাহু-ধরে তাকে তুলে নিলেন। পদ্মাবতীর কপালের সিন্দুরচূর্ণ অনেকটা ঝরে পড়েছে মাটিতে। দীর্ঘক্ষণ সাষ্টাঙ্গাবস্থানের হেতু মৃত্তিকার ঘর্ষণে তার কপালটা ফাগে রক্তিম হয়ে উঠেছে। শুকতারা কন্যার রঞ্জিত অবয়ব আলোকনে বিহ্বল কণ্ঠে বললেন,

অদ্ভুত! কোন্ দেবী রে মা তুই!

অতঃপর স্নেহার্দ কোমল বক্ষে মেয়েকে টেনে নিলেন।

 

পদ্মাবতী সিন্দুর পরে এয়োতি চিহ্ন রূপে। আদতে তার বোধে নাই সিন্দুরের মর্ম। শৈশবে তাকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়েছিল। বালুকা-মাটি নিয়ে খেলার বয়সে পরিণয়াচারটিও তার কাছে এক প্রকার খেলারই অংশ বলে মনে হয়েছে।

তার স্মৃতিতে আছে রক্তজবা আর শ্বেতকাঞ্চন কুসুমের সংমিশ্রণে গ্রথিত মাল্য স্কন্ধ থেকে বক্ষ বেয়ে অঞ্জলি উপচে ক্রোড় জুড়ে ছিল। কপোল আর কপালে চর্চিত চন্দনের অস্বস্তি নাকি ঘ্রাণ, কিছুই স্মৃতিতে নেই। তখন তার বয়স কত ছিল। জীবনে কত পার্বণের উৎসবে মেতেছিল সে। ক’টা বর্ষা-বসন্ত গড়িয়েছিল- বলতে পারবে না পদ্মাবতী। শুধু মনে পড়ে বাবা কতক মন্ত্র আবৃত্তি করিয়েছিলেন। স্মৃতির প্রকোষ্ঠ উন্মোচিত হয়ে কদাচিৎ বেরিয়ে আসে একটি পুরুষের পরনের খুঁট ধরে হুতাগ্নির চারিপার্শ্বে আবর্তনের দৃশ্য। আর, নিশির গভীর প্রহরে দম বন্ধ হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে ঘুম ভেঙে সে বুঝতে পারছিল তার দুটি দ্বিতীয়ার চন্দ্রন্যায় কোমল ওষ্ঠযুগল কারও মুখ গহ্বরের ভিতরে থেকে ক্রমশ অবশ হয়ে পড়ছে। প্রত্যুষে সজাগ হয়েই মায়ের কাছে অনুযোগ করে সে বলে দিয়েছিল কীর্তনীয়ার রাত্রির কীর্তি,

মা, এইভাবে কেউ আদর করে, বল? তুমি তো অল্প অধর ছোঁয়াও। আমার কত ভাল লাগে।

পরিণত বয়সে সে সব কথা মনে পড়লে পদ্মাবতী লজ্জত হয়।

এইটুকুই পদ্মাবতীর বৈবাহিক জীবনের অভিজ্ঞতা। এর পর সেই পুরুষটা কোথায় চলে গেল! সে তো ভাল করে চেয়ে দেখার সুযোগও পায়নি তার পতিদেবতাকে। কিন্তু সধবা-বেশ নিতে মায়ের দেওয়া সিন্দুর কপালে দিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

সীমন্তের সিমান্তে সিন্দুর না আঁকলে পতির অমঙ্গল হয়। তিন বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার পর অনেকবারই ভেবেছে সে, সিন্দুর না আঁকলে কি হয়! সিন্দুর না পরার সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সাহস সঞ্জাত হয়নি। পদ্মাবতী ভেবে দেখেছে, অন্যান্য আভরণের সাথে সীমন্ত প্রসাধনী মন্দ লাগে না।

শুকতারা সর্বদাই সিন্দুর রঞ্জিত থাকেন। সেই শিক্ষাই পদ্মাবতীর মধ্যে প্রতিফলিত। এতদব্যতীত তার জ্ঞানে আছে পতির অমঙ্গলের ভীতি। আদি ব্রাহ্মণের বংশে জন্ম পদ্মাবতীর। সুতরাং, হঠকারিতা করা যাবে না! এই সাবধান বাণী মায়ের কাছ থেকে নিতুই পেয়ে এসেছে সে। এই বাণীর শিকড় তার মর্মমূলের গভীরে প্রোথিত। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান পদ্মাবতীর কোনো সহোদর-সহোদরা নেই। বৈদান্তিক জনক মন্দিরের মন্ত্রপাঠপূর্বক ধুপ, চুঁয়া দিয়ে পুজো করেন। কাঁসার ঘণ্টা বাজিয়ে উষা লগ্নে, মধ্যাহ্নে ও সন্ধ্যায় আরতি করেন। পদ্মাবতী বাবার কাছাকাছি থাকে অত্র সময়কালে। তার রপ্ত হয়ে গেছে পুজা পার্বণের সকল মন্ত্র-আচার। পিতা একটি একটি করে পূজার মন্ত্রবাক্যসমূহ আত্মগত করিয়ে দিয়েছেন পদ্মাবতীকে। পদ্মাবতী এই স্তোত্রগুলো গুনগুন করে আবৃত্তি করে। এভাবেই মহাকালের পল-ক্ষণ-দণ্ড-যাম বেয়ে একেক দিবস পেরিয়ে রাত্রি হরণ হচ্ছিল।

অর্ধনারীশ্বর দেব-এর রূপ পদ্মাবতীকে অবাক বিস্ময়ে ভাবায়। আর হরি মুরারি! যেন প্রেমের বলয় নির্মাণ করে রেখেছেন। সদাশিবের দশভুজ দৃষ্টে পদ্মাবতীর কল্পলোকে উদয় হয় তারও যদি আরও দুটি বাহু হত তাহলে অতিরিক্ত ভুজদ্বয় কি কাজে ব্যাপৃত থাকত! তার বর্তমান বাহুদ্বয় যে এখনও কোমল কমল সদৃশ। তার পেলব অঙ্গের মদির ঘ্রাণে মাঝে মাঝে নিজেই বিভোর হয়। এই ঘ্রাণ আস্বাদনের কেউ নেই। সখী শ্রাবন্তী যেন কি কি বলতে চেষ্টা করেছিল, স্পষ্ট  বুঝে উঠতে পারেনি রোহিণী পদ্মাবতী। শ্রীঅঙ্গের এই অপরূপ রূপ কোনো পৌরুষের কাছে লুণ্ঠিত হয়নি। কিভাবে বুঝবে সে? শুকতারা তাকে বুঝিয়ে দেননি বা কোন আভাষও দেননি কখনও, কেবলই সিন্দুর পরতে শিখিয়েছেন। অর্ধনারীশ্বর দেবের ঊর্ধ্ব ললাটে সিন্দুর অঙ্কিত থাকায় পদ্মাবতীও সিন্দুর পরতে অনুপ্রাণিত হয়।

 

২.

সমতট বঙ্গের মহা প্রতাপশালী মহামতী আদিশূরের পুত্রলাভ হচ্ছিল না। তিনি একজন শাস্ত্রজ্ঞ, ধর্মনিষ্ঠ, প্রজারঞ্জক, আর্যজাতির মান-মর্যাদার প্রতিপোষক, মহাবীর্যবান বাহুবল সম্পন্ন অধিরাজ। হেন অধিপতি নির্বংশ হয়ে যাবেন এটা তার শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি বিশেষ চিন্তিত ছিলেন। বংশ রক্ষাহেতু সহধর্মিণীর সঙ্গে এক যামিনী যাপনকালে পরামর্শে লিপ্ত হন এবং যজ্ঞানুষ্ঠানের ভাবনা পোষণ করেন। পুত্রেষ্টি যাগকামনার হোতা সংগ্রহের সময়ে তিনি পূর্ণরূপে জ্ঞাত হলেন যে, প্রাজ্ঞ ব্রাহ্মণসকল এতদাঞ্চলে নেই। যারা নিতান্তই নির্বীর্য্য, শাস্ত্রে যাদের অধিকার নামমাত্র অথবা কেবল বংশানুক্রম রক্ষার্থে নিজেদের গৌরবান্বিত করতে অথবা বঙ্গের গৌরব নিধন করতেই ব্যস্ত, কেবল তাদেরই সন্ধান পাওয়া গেল। এদের দ্বারা অন্তত যজ্ঞানুষ্ঠান সম্ভব নয়। বঙ্গের ব্রাহ্মণকুলসকলে আচারভ্রষ্ট, বেদবিরহিত এবং যাগযজ্ঞে অকর্মণ্য অনুভূত হলে তিনি কনৌজরাজ বীরসিংহকে নিজের প্রয়োজন অবহিত করে পত্রাঙ্কনে ইচ্ছা জ্ঞাপন করেন।

বীরসিংহ পত্রপাঠে মহিমান্বিত হয়ে অনতিবিলম্বে শাণ্ডিল্য গোত্রের ভট্টনারায়ণ, ভরদ্বাজ গোত্রের শ্রীহর্ষ, কাশ্যপ গোত্রের দক্ষ, বাৎস্য গোত্রের ছান্দড় ও সাবর্ণ গোত্রের বেদগর্ভ, এই পঞ্চব্রাহ্মণকে নির্দিষ্ট করেন এবং তাঁদের সাথে মকরন্দ ঘোষ, দশরথ বসু, বিরাট গুহ, কালিদাস মিত্র ও পুরষোত্তম এই পঞ্চকায়স্থকে স্থির করে জয়স্কন্ধাবার বিক্রমণিপুরের উদ্দেশে যাত্রা করিয়ে দেন।

কানাকুঞ্জ মহীপতির প্রেরিত পঞ্চব্রাহ্মণ ভৃত্যসহ এক দিবাভাগের মধ্য প্রহরে বৃষারোহণে রাজপ্রাসাদের দ্বারপ্রান্তে এসে উপস্থিত হলেন। মহাফটকের সম্মুখে প্রহরারত ভুজে ভল্ল ও কটিতে ডকবুস নিয়ে দণ্ডায়মান দ্বারপাল অভ্যন্তরে গিয়ে আদিশূরের সমীপে পঞ্চদ্বিজজনের আগমন সংবাদ দিয়ে তাঁদের ভূষণ-আচরণের বিস্তারিত বর্ণনা নিবেদন করে। মহামতি বৃষারোহণ এবম্বিধ তাম্বুল চর্বণের বর্ণনায় অতিশয় বিমর্ষ হয়ে তখনই সাক্ষাৎ করতে আগ্রহী হলেন না।

কিঞ্চিত বিলম্ব হবে- দ্বারপালের নিকট এই সংবাদ শ্রবণে দ্বিজগণ অপমানিত বোধ করলেন। তাঁরা ক্রোধান্বিত হয়ে নিজেদের তপোবল ও আত্ম-মহিমা প্রকাশার্থে মহীপের জন্য আনীত মহিমময় অর্ঘ্যবারি একটি শুষ্ক বৃক্ষোপরি নিক্ষেপ করেন। বিগত যৌবন শুষ্ক স্কন্ধ তদ্দণ্ডেই অঙ্কুর নির্গত করে সজীবাকার ধারণ করে।

এই ঐন্দ্রজালিক ঐশ্বর্যমহিমা-সংবাদ দৌবারিকগণ কর্তৃক মহীপের কাছে অনতিবিলম্বে পৌঁছাল। মহামতী তাঁর অবিমৃশ্যকারিতা অবধারণ করে তৎক্ষণাৎ স্বয়ং উপস্থিত হয়ে অববুদ্ধ দ্বিজন্মা ব্রাহ্মণ পঞ্চকের সকাশে স্তুতিবাদে সন্তোষিত করেন। তদ্দর্শনে উদার চিত্ত ব্রাহ্মণগণ সন্তুষ্ট হয়ে মহাধিপকে আশীর্বাদ করলে সসম্মানে বিপ্রপঞ্চদের নিয়ে মহামতী অন্তঃপুরে প্রবেশ করেন এবং সমোচিত যতœ সহযোগে আপ্যায়নের হৃষ্টপুষ্ট ব্যবস্থা করেন।

পঞ্চব্রাহ্মণগণ কেউই আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন না এবম্বিধ এঁদের বয়সের তারতম্যও ছিল লক্ষণীয়। শ্রীহর্ষদেব সর্বাপেক্ষা প্রবীণ, তাঁর  ৯০ বৎসর এবং সর্বকনিষ্ঠ ৩০ বৎসর ছিল ছান্দড়ের।

যজ্ঞানুষ্ঠানের জন্য শুভ কোষ্ঠী অনুসারে পুন্যাহের অপেক্ষা করতে হল। এরই অবকাশে পঞ্চব্রাক্ষণদের রাজার নৈকট্য লাভের সুযোগ ঘটে। তাঁদের জ্ঞানগর্ভ মাহাত্ম্যকথনে আদিশূর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। শ্রীহর্ষ অতি প্রবীণ এবং প্রকৃত জ্ঞানের অধিকারী। তিনি আর্যজাতির এই হরিৎ বঙ্গে অনাগমনের হেতু এবং ভারতবর্ষের অন্যান্যঞ্চলে অনার্য-অসুর দানবদের পরাহত করার ইতিহাস সবিস্তারে রাজার নিকট বর্ণনা করার প্রয়াস পান।

একদিবস মহামতী সভাসদবৃন্দের উপস্থিতিতেই বিজ্ঞ প্রবীণ শ্রীহর্ষকে উদ্দেশ্য করে বঙ্গ দেশে ব্রাহ্মণগণের বেহাল অবস্থার কথা উল্লেখ করেন। শ্রীহর্ষ প্রত্যুত্তরে স্মরণ করিয়ে দেন,

মহামতী নিরক্ষর ব্রাহ্মণগণের কিবা করার আছে! অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন না হলে মহাজ্ঞান আহরণ করা যায় না। জ্ঞান চর্চা ব্যতীত বেদবিজ্ঞ কীরূপে হবেন! অপরদিকে বৌদ্ধমতের পরাক্রমে এই সকল ব্রাহ্মণ নির্বীর্য্য হয়ে পড়েছেন। বৌদ্ধিক জ্ঞানের সাথে তর্ক সংগ্রামে পরাস্ত হয়ে অন্দরমহলে উপাসনাসনে জপ করা ছাড়া উপায় কী? তাতেই গতি শ্লথ ও প্রতাপ মলিন হয়ে পড়েছে।

মহামতী এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন। শুধালেন,

আপনারা বিজ্ঞজন। অত্রাঞ্চলে কিছুকাল অবস্থান করে এই রাঢ়ীয়-বঙ্গ ব্রাহ্মণকুলকে পুনর্বার উদ্দীপিত করিয়ে দিন।

নৃপতির এইরূপ মনোবাঞ্ছা শ্রবণমাত্র পঞ্চব্রাহ্মণদের অবয়বে বিশেষ চিন্তার রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠল। ললাটপট্ট কুঞ্চিত হল, ললামের চন্দন স্বেদে বিগলিত হল, তবে মুখে কেউ রা করলেন না। সকলে নিথর অবাঙমুখে উপবেশনে স্থির রইলেন। বিচক্ষণ নৃপতি অপ্রসন্ন পরিবেষ্টন লক্ষ্য করলেন তদন্তর সেইক্ষণে পুনরায় অগ্রসর হতে সমীচীন বোধ করলেন না।

অগ্রহায়ণের পূর্ণচন্দ্র তিথির প্রাক্কালে শুভক্ষণ উপস্থিত হলে মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠান আয়োজনে সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রচ- প্রতাপশালী পঞ্চদ্বিজগণ একত্রিত হয়ে নিজেদের মধ্যে সংকল্প করলেন। সেই মতে তিনটি অশ্ব হুতি হুতের সিদ্ধান্ত হল। পূর্বাপর পূর্ণ ব্রহ্মতেজোময় ভট্টনারায়ণ সর্বসম্মতিক্রমে অষ্টাদশ প্রহরব্যাপী যজ্ঞানুষ্ঠানের হোতা নির্বাচিত ছিলেন।

বিশাল স্থণ্ডিল আলোকনে অত্র অঞ্চলের ব্রাহ্মণকুল সকলে স্থম্ভিত। যথাসময়ে অনুষ্ঠান আরম্ভ হল। নীলাম্বর ব্যাপ্ত আদত আজ্য ঘৃত ধূম্র ধুম কুণ্ডলী পাকাল। উল্লসিত প্রাণময় হর্ষধ্বনি বিমোহিত করে দিল উপস্থিত অতিথিবৃন্দের। পঞ্চদ্বিজের প্রতাপের মহিমা ইতোমধ্যে প্রচারিত হওয়ায় সকলেই উৎসুকচিত্তে অপেক্ষায় ছিলেন। অধিপতি স্বয়ং সহধর্মিণীসহ অত্র প্রাণগতিক অনুষ্ঠানের ক্রিয়াকলাপ প্রত্যক্ষ করলেন এবং প্রার্থনায় বিশেষ পরিপ্লুত হলেন।

প্রজাবৎসল দানশৌ- কপর্দকহীন দরিদ্রের মধ্যে প্রচুর বিত্ত বিতরণ করলেন। ভোজনের জন্য পরিবেশিত গো-ঘৃত সহযোগে অভগ্ন কণার গরম তণ্ডুলের সাথে সুসিদ্ধ হরিণের মাংস, জীমূতবাহন ইলিশের তপ্ত ডিম আর চিতলের কোল ভাজা সম্ভ্রান্ত সকলের রসনা যেমতি তৃপ্ত করল তদরূপ অন্ত্যজদের পাঁঠার মাংস এবং রুহিৎ মৎসের ঝোল, মিষ্টান্নখণ্ড, দধি এবং দুগ্ধযোগে মধুযুক্ত চরু সকলের পরিতোষ ঘটাতে বিলম্ব ঘটাল না। দ্বি দিবস-রজনী বিপুল বিপুল পাত্রসমূহ অবশ্রয়ণের পর তপ্ত অঙ্গারের উত্তাপে অগ্রহায়ণের ঈষৎ শীতভাব অনেকটাই দূরীভূত হল। এই যজ্ঞের প্রচার বঙ্গ-বরেন্দ্র-রাঢ় উপচিয়ে  গৌড়ে যথেষ্ট প্রসিদ্ধি অর্জন করল।

নৃপতি এতটাই মুগ্ধ হলেন যে, গণ্যমান্য ব্রাহ্মণদের উপস্থিতিতে হর্ষবিদ চতুর্দ্বিজ বেষ্টিত ভট্টনারায়ণকে সবিশেষ মান দানে ভূষিত করলেন এবং পঞ্চদ্বিজের অনুকূলে পঞ্চ গ্রাম দান পূর্বক অত্র গ্রামগুলোতে তাদেরকে বসতি স্থাপন করে বসবাসের অনুরোধ পুনর্বার ব্যক্ত করলেন। মহারাজের এই পুনঃপুন অনুরোধে পঞ্চদ্বিজ একাধারে সম্মানিত এবম্বিধ তন্নিমিত্ত বিব্রত বোধ করলেও আতিথেয়তার আতিশয্যে আকীর্ণ হয়ে প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের অভাবে অবশেষে মন্দ্রভাবে প্রতিশ্রুত হতে বাধ্য হন। তবে তাঁরা একবার নিজের জন্মভূমি ঘুরে আসার অনুজ্ঞা প্রার্থনা করলেন।

পঞ্চদ্বিজগণ কনৌজ ফিরে যাওয়ার প্রাক্কালে মহামতী আদিশূর কানাকুঞ্জ অধিপতি রাজসিংহের সম্মানে উপঢৌকন প্রেরণকে সংগত মনে করলেন। নানাবিধ উপকরণের মধ্যে বাংলার ঐতিহ্য দানাবাধা খেজুররসের গুড় কতক মটকি পূর্ণ করে বৃষ-শকটে বোঝাই করে দিলেন। ব্রহ্মপুত্র নদের উৎস হিমালয়ের পাদদেশের অত্যন্ত গভীর তলানি থেকে প্রাপ্ত একটি বৃহদাকার পবিত্র শালগ্রাম শিলা উপহার দিলেন। যার ঈষৎ নীল স্বর্ণাভ চিত্রিত গাত্র বিকিরিত ছটা নিশির তিমিরে ঠাকুর-দেবতার পদপল্লব আলোকিত করে। আরও বিচিত্র উপহার সামগ্রীর মধ্যে চাঙাড়ি ভর্তি গুয়া আর সজীব হরিৎ তাম্বুলপত্র অন্যতম ছিল। পরিধানের জন্য বিশেষ উপঢৌকন হিসেবে ছিল রাত্রির শেষ প্রহর থেকে রবির উদয়রাগ অবধি ব্রহ্মপুত্র নদের জলে প্রক্রিয়াজাত জল-তলে তাঁতে বুনে শেষ করা বিশেষ কতক রঙিন বস্ত্র খণ্ড।

ত্রিহস্ত প্রস্থ এবং দশ হস্ত দৈর্ঘ্যরে একেকটি বস্ত্রখ-কে অনায়াসে একটি হস্ত মুঠোয় লুকিয়ে রাখা যেত। কার্পাস বস্ত্রসমূহ এতটাই সূক্ষ্মতার সাথে বোনা হত যে দৃষ্টির সম্মুখে কয়েকটা আস্তরণেও অপর প্রান্তের বস্তু অন্তরাল হত না। অত্র অঞ্চলের বিখ্যাত এই বস্ত্র পরিধানে রাজসিংহের প্রিয়দর্শিনী প্রিয়তমা মহিষী অত্যন্ত প্রীত হয়েছিলেন।

 

পঞ্চব্রাহ্মণগণ কনৌজ প্রত্যাবর্তন করলে ‘কৌল্য বিসর্জিত হয়েছে’ মর্মে তাঁদের স্বীকার করতে তৎস্থানের জ্ঞাতি ব্রাহ্মণগণ অস্বীকৃতি জানালেন। এই বিভ্রাট-সংবাদ কনৌজ রাজের সংকাশে পৌঁছালে পঞ্চব্রাহ্মণগণ দেশ ত্যাগ করে আদিশূরের বিক্রমণিপুরে চলে যেতে আদিষ্ট হন। তদনন্তর এই পঞ্চদ্বিজগণ সপরিবারে কনৌজ রাজ্য ত্যাগে চিরতরে উদ্বাসিত হয়ে বিক্রমণিপুরে প্রত্যাগমন করেন। কানাকুঞ্জ থেকে বহিস্কৃত হয়ে পঞ্চব্রাহ্মণগণ তাদের পঞ্চকায়স্থ পরিকরদের পরিবারসহ যখন এই হরিৎ বঙ্গে উপস্থিত হন তখন তাদের মধ্যে অবস্থিত জন্মভূমি পরিত্যাগ করার ঘনীভূত বেদনা পরিস্রাবণে অনেকটাই স্বস্ত্যয়ন অনুভব করেন। তারা অনুপ দেশের খালবিল অতিক্রান্ত করে মধ্য অগ্রহায়ণের প্রভাতে গঙ্গার পূর্ব তটে ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম অববাহিকার পাড় ঘেঁষে বিস্তীর্ণ সমতটে আদিশূরের রাজভবনের সম্মুখে উপস্থিত হন।

বনানীর শাখে শাখে টুনটুনির দল নৃত্য করে তাদের স্বাগত জানায়। একজোড়া খঞ্জন-খঞ্জনিকা তাদের বিচিত্র রং-এর পালক শোভিত পুচ্ছ নাচিয়ে গুঞ্জন করে অভিবাদন জানায়। প্রভাতের স্বর্ণকিরণ সমস্ত শরীরে মেখে ধরিত্রীর ঊর্ধ্বমুখী তপ্ত বায়ুর ওপর চক্রাকারে পাক খেতে খেতে স্বর্ণাভ ডানার একগুচ্ছ চিল নিজেদের পাখনা বিস্তৃত করে স্বাগতিকদের অভ্যর্থনা জ্ঞাপনে মত্ত। এই ফুল ফল শস্য জল আর সবুজ বনানী ঘেরা শীতল ভূমি দেখে তাদের চক্ষু স্থিত হয়ে যায়। তাদের হৃদয়কে প্রশান্ত করে দেয় বিস্তীর্ণ প্রান্তরে স্বর্ণবর্ণ পরিপক্ক তণ্ডুল কণার ক্ষেত জুড়ে বাতাসের ঢেউ।

ব্রাহ্মণগণ মহারাজের আনুকূল্যে ভেটরূপে প্রাপ্ত পঞ্চ গ্রামে বিভক্ত হয়ে নব্য বসতি স্থাপন করেন। ভট্টনারায়ণ পঞ্চকোটি গ্রাম, শ্রীহর্ষ কঙ্কগ্রাম, দক্ষ কামকোটি গ্রাম, ছান্দড় হরিকোটি গ্রাম ও বেদগর্ভ বটগ্রামে বংশবিস্তার, যুগপৎ বংশ রক্ষার্থে দিনাতিপাত আরম্ভ করেন। গ্রামগুলোতে বসবাসরত নির্বীর্য্য ব্রাহ্মণগণের অধ্যাপক রূপে পঞ্চব্রাহ্মণগণ প্রতিষ্ঠা পান এবং অর্পিত দায়িত্ব নিয়ে অধ্যাপনায় রত থাকেন। পঞ্চব্রাহ্মণগণের সংস্পর্শে থেকে পঞ্চকায়স্থগণও বিপত্তির মুখে পতিত হয়ে সপরিবারে এই বঙ্গে চলে আসেন। তাদের জন্য আদিশূর প্রদত্ত গ্রামগুলোর প্রান্তে নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসের সুব্যবস্থা করে দেন।

এই ব্রাহ্মণগণের যথাক্রমে শ্রী শ্রীহর্ষের চার জন, শ্রী ভট্টনারায়ণের ষোল জন, শ্রী দক্ষের ষোল জন, শ্রী বেদগর্ভের বার জন এবং শ্রী ছান্দড়ের আট জন পুত্র ছিলেন।

দেশান্তরের পরে পঞ্চব্রাহ্মণগণ প্রারম্ভে নিজেদের পরিবারের কন্যাদের একে অপরকে সম্প্রদান করতে থাকেন। কিন্তু অধিককাল আর এই বন্ধন স্থায়ী হল না। প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে কুলীন দুহিতাগণ অত্র বংশের ভার্যা রূপে প্রবেশাধিকার পেলেন। বাৎস্যগোত্রের ছান্দড় বংশের জ্যেষ্ঠ পুত্র কাঞ্জিলাল পিতার সমর্থনেই প্রথমে এক কুলীন কামিনীর সাথে ঘর বাঁধেন। তৎপরে একাধিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কাঞ্জিলাল এবং কামিনীর একমাত্র সুপুত্রই হচ্ছেন পদ্মাবতীর পিতামহ।

 

আদিশূরের কন্যা লক্ষ্মীদেবীকে সেন বংশীয় রাজা বিজয় সেন বিবাহ করেন। বিজয় সেনের দুইজন স্ত্রী ছিলেন। রাজার জ্যেষ্ঠার প্রতি বিরাগ আর কনিষ্ঠার প্রতি অনুরাগ ছিল। জ্যৈষ্ঠা মহিষী সেই দুঃখে পতিবশ কামনায় এক যজ্ঞ করেন। যজ্ঞে চরু ওঠে। কনিষ্ঠ মহিষী হিংসাবশে সেই চরু চুরি করে ব্রহ্মপুত্র নদে নিক্ষেপ করেন। চরুর আকর্ষণী শক্তি প্রভাবে রাণীর বশীভূত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ মানবদেহ পরিগ্রহপূর্বক রাজ্ঞীর শয়নকক্ষে আগমন করেন। তাঁর বরপ্রভাবেই মহিষী লক্ষ্মীদেবীর গর্ভে পুত্র বল্লালের জন্ম হয়।

মহামতি আদিশূরের রাজত্বের প্রায় শতবর্ষাধিককাল অতিক্রম করে রাজা বল্লাল সেন সিংহাসনে আরোহণ করেন। ততক্ষণে পঞ্চগ্রাম বিভক্ত হয়েছে কতক খণ্ডে। জীবিকার সন্ধানে বাৎস্য গোত্রের অনেকেই ইতিউতি প্রস্থান করেছেন কিন্তু পদ্মাবতীর পিতামহ অত্রগ্রামে থাকতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন।

যতদিন আদিশূর জীবিত ছিলেন ততদিন যজ্ঞ পুরোহিতগণ রাজপরিবারের অতিথি হয়েই থাকলেন। মহামহিমময় রাজার ইন্দ্রপতনের অব্যবহিত পরেই তাঁদের মর্যাদা ম্লান হতে থাকে। যজ্ঞের বরপুত্র আদিশূরের একমাত্র পুত্র ভুশুর কখনই অমর্যাদা করেননি কিন্তু ব্রাহ্মণগণ নিজেদের ক্লিষ্ট অনুভবে আক্রান্ত হন। নিজেদের মধ্যে জীবন যাপনে ছন্দের পতন হয় এবং  আনুকূল্যের কোন প্রকার অভাব না থাকা সত্ত্বেও নানা গোলযোগের সূত্রপাত ঘটতে থাকে।

ছান্দড় অর্ধশতবর্ষাধিক প্রবীণ বটবৃক্ষের নিবিড় ছায়ায় একটি বেদীমূল স্থাপন করেন। তথায় তিনি একটি বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অভূতপূর্ব এই শিল্প সৃষ্টিতে শিল্পী ছান্দড় নিজেকে ধন্য মনে করতেন। ছান্দড়ের জ্ঞানলব্ধ অর্ধনারী-অর্ধদেব সম্বন্বিত এই শিল্পকর্ম মহাসত্ত্ব নৃপতি আদিশূরকে অভিভূত করে। তিনি প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন যে, অত্রস্থানে অতিসত্বর পোড়ামাটির ইষ্টক দিয়ে দৃষ্টিনন্দন একটি শিখরযুক্ত ভদ্রদেউল নির্মাণ করে দেবেন। রাজন্যের পৃষ্ঠপোষকতা সত্ত্বেও পরে সেটা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সেই অবধি অত্রস্থানে পাষাণদেব-এর সেবা যত্নই হয়ে আসছে। অদূরেই একটি দশভুজবিশিষ্ট সদাশিব মূর্তি স্থাপিত। তার পার্শ্বেই কৃষ্ণবর্ণ হরিকৃষ্ণ দুহস্তে বংশী ধরে হাস্যরত অবস্থায় প্রেম বিতরণে তৎপর। কষ্টি শিলার এই বিগ্রহটি সুদূর কনৌজ থেকে স্বয়ং বহন করে নিয়ে এসেছিলেন যজ্ঞবিশারদ ছান্দড়।

সদাশিবের দশভুজে যথাক্রমে মূল, কৃপাণ, টঙ্ক, ব্রজ, অঙ্কুশ, ঘণ্টা, পাশ, অক্ষমালা এবং অভয়মুদ্রা রচিত। বিগ্রহের মস্তকোপরি জটা-মণ্ডিত-মুকুট। ললাটে ত্রিনয়নের এক নয়ন এবং আকর্ণ বিস্তৃত অপর দুই নয়ন। ঊর্ধ্বে চালচিত্রের এক পার্শ্বে কিন্নর অন্য পার্শ্বে কিন্নরী। পাদপীঠের একাংশে ধূসর পাথরের পদ্মাসনে উপবিষ্ট প্রসন্ন নত দৃষ্টি, কণ্ঠে দোদুল্যমান মাল্য নিয়ে সদাই তিনি সুগম্ভীর ধ্যানে মগ্ন।

ছান্দড় অত্যন্ত ধীমান ছিলেন। তিনি যেমন ছিলেন বেদ বিশারদ তদ্রুপই ছিলেন গান্ধর্ব সংগীতে পারঙ্গম। বংশীতে বন্দনায় তার এতটাই দক্ষতা ছিল যে, একদা মহামতী আদিশূরের শ্রীমতি তাঁর মুরলীর ললিত মূর্ছনায় মূর্ছা যান। বংশানুক্রমে পদ্মাবতীর বাবা অবধি এই বংশীবাদন নিত্ত হয়ে আসছে। পিতার সুষির সুরের সাথে পদ্মাবতীর কোমল হস্তে মন্দিরার লয় বেজে ওঠে অক্লেশে।

 

৩.

হরিকোটি গ্রামের দক্ষিণ দিকে কালিগঙ্গা হ্রদ। কালিগঙ্গা প্রবাহিণীর উত্তর অববাহিকার কোল ঘেঁষে পদ্মাবতীদের আবাসস্থল। অত্রগ্রামে আরও বিংশাধিক ব্রাহ্মণ পরিবারের নিবাস। প্রত্যেকটি পরিবার ন্যূন পক্ষে দশজন সদস্য সম্বলিত। কিন্তু বাসুদেবের পরিবারের সদস্য সংখ্যা চতুষ্টয়। স্ত্রী শুকতারা, কন্যা পদ্মাবতী আর পুত্রতুল্য শিক্ষার্থী জয়দেবকে নিয়ে তার সংসার।

দুই হস্ত পুরু দেয়াল ঘেরা চতুর্ভুজ, আয়তক্ষেত্র, পঞ্চভুজ কুটিরগুলো। মাটির চাকতি কেটে এনে থরে থরে একের উপর এক সাজিয়ে ষষ্ঠবাহু ঊর্ধ্ব দেয়াল তুলে দাঁড় করান কুটিরে কুটিরে গ্রামগুলো সজ্জিত। দারুময় পাটাতনের উপর অত্যন্ত পরিপাটি করে দেওয়া তালপাতার ছাউনি আর মাটির ভিত তপ্ত ঔদ, মেঘবারি আর হিমবায়ু থেকে তাদের সংবেদ্য শ্যাম ত্বককে রক্ষা করে।

সার্ধশত বৎসর পূর্বে গ্রামবাসীর আরাধনার জন্য ছান্দড় যে উপাসনালয় নির্মাণ করেছিলেন বংশানুক্রমে তত্রেই পদ্মাবতীর জনক বাসুদেব স্বয়ং পুরোহিতের আসনে অধিষ্ঠিত। তিনি উপনিষদ থেকে শ্লোক-স্তোত্র পাঠ করেন, পূজা অর্চনা করেন, নিয়মিত অর্ঘ্য নিবেদন করেন আর ভগবান সমীপে প্রার্থনা করেন গ্রামবাসী, ব্রাহ্মণকুল আর রাজন্যবর্গের মঙ্গলার্থে। সকলেরই অতিশয় প্রিয়, মান্যবর তিনি।

বাসুদেব তার কন্যাকে প্রাণাধিক ভালবাসেন। এইরূপ মমতা মনোভব সচরাচর ব্রাহ্মণকুলদের সদ্যজাত প্রবৃত্তির প্রতিকূলে। পিতার স্নেহ-আতিশয্যে পদ্মাবতী অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। বেদ উপনিষদের শ্লোক গুচ্ছ গুচ্ছ তার স্মৃতিতে অনুরণিত। পতিব্রতা মাতার অফুরন্ত আদরও পেয়েছে সে। নিবিষ্ট চিত্তে পতির সেবা করা শুকতারা নিজ আচরণ দিয়ে ত্রি বৎসর পূর্ব থেকে সতত রোহিণী পদ্মাবতীকে শিক্ষা দিয়ে আসছেন।

 

ছান্দড়পুত্র কাঞ্চিলাল দীর্ঘ বয়ঃক্রম ৪০ বৎসর অতিক্রম করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যৌবনে বিবাহে আসক্তি ছিল না। যোগীধর্ম পালনে  তিনি নিবিষ্ট ছিলেন। জীবনের মধ্য সময়ে এসে হঠাৎই মত পরিবর্তন করেন এবং কামিনীর পাণি গ্রহণ করতে সম্মতি প্রদান করেন। কামিনী তখন যৌবনের উষালগ্নোত্তীর্ণ। সুতরাং, তাদের সংসার ধর্ম পালন করতে এবং কামকর্ম চরিতার্থ করতে কোন ক্লেশ অনুভূত হল না। পরপর দুইটি কন্যাশিশুকে কামিনী গর্ভে ধারণ করেন। কাঞ্জিলাল আর অপেক্ষা না করে পুত্রের পিতৃত্ব লোভে পুনর্বার বিবাহ করেন। ইত্যবসরে কামিনী পুনরায় গুর্বিণী হন এবং ঘনঘোর বরিষার মধ্যদিবসে এক পুত্র-শিশুর জন্ম দিয়ে গর্বিত জননীর আসনে অধিষ্ঠিত হন।

বিজয়দেব নামক এই পুত্রশিশু পিতামহ ছান্দড়ের মতোই জ্ঞানপিপাসু ছিলেন। তার দুইজন স্ত্রী ছিলেন। জ্যেষ্ঠা স্ত্রীর গর্ভে এক পুত্র ও তিন কন্যা এবং কনিষ্ঠার গর্ভে চার কন্যা জন্ম গ্রহণ করেন। বিজয়দেবের একমাত্র পুত্র চন্দ্রদেবের স্ত্রীর গর্ভের তিনজন পুত্রসন্তানের জ্যেষ্ঠপুত্র সূর্যদেবের সুযোগ্যপুত্র বাসুদেব। এইভাবে বংশলতিকার পঞ্চমস্তরের নিম্নে এসে পদ্মাবতীর বাবা অবস্থান করছেন। চিত্রিণী নারীজাত শুকতারা তার সহধর্মিণী। স্ত্রীর পর পর দুইটি গর্ভপাতের পর দীর্ঘ দশাব্দ আঞ্জাকাল ধৈর্য্য ধরে অতিবাহিত করার পর দেবত্রয়ের আশীর্বাদে পদ্মাবতীর জন্ম হয়। কন্যা-শিশুকে পেয়ে বাসুদেব আহ্লাদে বিভোর। জগৎ অধিপতির উপাসক নতমস্তকে অর্ধনারীশ্বরকেও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

শুকতারার ক্রোড়জুড়ে থাকে শিশু পদ্মাবতী। শুকতারা গর্ভবতী অবস্থায় মিনতি করে ভগবানের কাছে অঙ্গীকার করেছিলেন যে ক্রোড়ে কন্যা এলে তিনি মেয়েকে তাঁরই সেবায় রেখে সোমত্ত করে তুলবেন।

শিশুর পদ্মকমল মুখ দেখে বাসুদেবের প্রাণ জুড়িয়ে যায়। পদ্ম কুসুমের ন্যায় তুলতুলে শিশু দৃষ্টে নির্মল আনন্দ অনভূত হয় তার। তিনি কর্ণের স্ত্রীর নামানুকরণে শিশুর নামকরণ করেন পদ্মাবতী। পুত্র সন্তান না হোক কন্যা তার কুল রক্ষা করবে। পদ্মাবতীকে পরতে পরতে তিনি গড়ে তুলবেন। নিজের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বাসুদেব পরবর্তীকালে তার হৃদয়ের মণি পদ্মাবতীকে শিক্ষা-দীক্ষায়, শিল্পে-কর্মে পারদর্শী করে তুলবেন। শুকতারাও পূর্ণ সমর্থন করেন পতিদেবকে। সহযোগী হয়ে লালন করেন পদ্মাবতী নাম্নী তাদের দেবশিশুকে। পদ্মাবতী দিনে দিনে বড় হতে থাকে। একসময় জননীর উষ্ণ ক্রোড় ছেড়ে অঙ্গনজুড়ে প্রথমে জানুগতি তদন্তর দাপিয়ে বেড়াতে থাকে। অর্ধস্ফুট প্রগল্ভতায় সারা দিনমান ব্যতিব্যস্ত। এক এক করে পদ্মাবতীর ছয়টি জন্মতিথি অতিক্রান্ত হয়ে যায়। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রকার জ্ঞান আয়ত্ত করেছে সে।

একদিবস জ্ঞানাহরণের অদম্য ইচ্ছাক্রান্ত শিশুপদ্মাবতী বিক্ষুব্ধ, শুষ্ক হৃদয়ে শেষ বসন্তের খরতাপদগ্ধ মধ্যপ্রহরে কালীগঙ্গার প্রান্তে হিজল তমালের ছায়াতলে এসে উপস্থিত হল। ইষৎ গাঢ় রুধির আভাযুক্ত লম্বমান ছড়ার ফুলগুলো ঝরে হিজলের ছায়াতল আবৃত করে রেখেছে। দৃশ্য দেখে মনে হয় পদ্মাবতীর আগমন বার্তা পূর্ব থেকেই জ্ঞাত। তাই স্বাগত জানাতে অথবা নিরঞ্জনার মান ভাঙাতে হিজল কুসুমসমূহের এই প্রস্তুতি। কুহু কুহু কুজনে মুখরিত পত্রপল্লবে পরমা প্রকৃতি। অভিমানী পদ্মাবতী সন্তর্পণে বৃন্তচ্যুত পুষ্পশয্যায় নিজের দেহকে গড়িয়ে দিল। সুরভি সৌরভে চতুঃপার্শ্ব প্রমোদিত।

মায়ের সাথে অভিমান করে দ্রুত পদক্ষেপে সে গৃহ থেকে নির্গত হয়ে হিজল-তলায় এসেছে। পদ্মাবতী নিজ হস্তে শিলাখণ্ডে হরিদ্রাচূর্ণ করতে চেয়েছিল। শুকতারা তাকে হরিদ্রা পেষণে নিবৃত্ত করেছেন। অত্যন্ত সপ্তর্পণে, নিষ্ঠা আর শৈলীর সাথে এই কর্ম সম্পাদন করতে হয়। হরিদ্রা পেষণের পর খর ঔদে শুষ্ক করে এর সাথে চুয়া-চন্দন-ফাগ মিশিয়ে সিন্দুর প্রসাধনী তৈরি করতে হয়। শিশু পদ্মাবতীর পক্ষে এই নিপুণ কর্মের সুষ্ঠ পরিণতি দেওয়া সম্ভব নয়। শুকতারার হেন আপত্তি পদ্মাবতীর কাছে নির্দয় নিষাদের ন্যায় প্রতীয়মান হয়েছে। নিরঞ্জন মনটা তাই একটু বিষিয়ে গিয়েছিল। হিজলের পুষ্পশয্যা ভারাক্রান্ত মনকে পুনর্বার আহলাদিত করে তুলল, পার্শ্বের কালিগঙ্গার সলিলধারা সনাতন নর্তনে হিল্লোলিত।

এইস্য নিদাঘ দিবসের মধ্যবেলায় বহির্দেশ থেকে দুজন পান্থ বাসুদেবের কুঞ্জে এসে উপস্থিত হলেন।

 

৪.

খর গ্রীষ্মের মধ্যপ্রহর। ব্রাহ্মণদ্বয় হট্টাঙ্গনে পল্লীবাসীর পরামর্শে অর্ধনারীশ্বরের বেদীমূলে উপস্থিত হয়েছেন। সাতিশয় শিব-পরায়ণ বাসুদেবের ঠিকানা খুঁজে পেতে তেমন ক্লেশবোধ হয়নি। এক ক্রোশ ব্যবধান থেকে মহীরুহ দৃষ্টি গোচর হয়। নারিকেল বৃক্ষের সারিবদ্ধ সুশৃঙ্খল মস্তক দোলানো দ-ায়মান অবস্থান বাসুদেবের সীমানা চিহ্নিত করতে সহায়তা করে। পথশ্রম কিঞ্চিৎ তথাপি উভয়েরই বিশ্রাম প্রয়োজন। অবয়বে ক্ষুধার যন্ত্রণা স্পষ্ট পরিস্ফুটিত। জলপানের ত্বরিত ব্যবস্থা করে স্নানের জন্য কামিনীর ছায়ায় শান বাঁধানো কৌপ আর শীতল জলে ভরা ঘটকি দেখিয়ে দিলেন বাসুদেব।

পান্থদ্বিজদ্বয়ের আহারাদির ব্যবস্থা করতে শুকতারা ইতোমধ্যে মনোনিবেশ করেছেন। সফেন তপ্ত গুয়াথুলি ধানের ভাত, সাথে কাঁটাবর্জিত শোলমাছের ঝোল, নবচূত-এর সংমিশ্রণে কুষ্মা–কলার নিরামিষ আর কটুতেলে মোচা ভাজার আয়োজন অল্প সময়ের ব্যবধানে করাটা যথেষ্ট বিবেচিত হল। নিস্তন্দ্র এবং ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর ব্রাহ্মণদ্বয় স্নানান্তে গৃহে প্রবেশ করলে মোত্রা পাতির পাটি বিছিয়ে সদ্য রন্ধিত আহারসমূহ পরিবেশন করা হল। পরম তোষে উভয়ে আহারভোগ সম্পাদন করলেন এবং অনতিবিলম্বে গাম্ভারী দারময় পালঙ্কের কোমল শয্যায় শয়ান করে প্রশান্তির গভীর নিদ্রায় সংবিষ্ট হলেন।

পদ্মাবতী আড়াল থেকে সমস্ত নিরিখ করল। একজন সুদর্শন চঞ্চল যুবাপুরুষ অপরজন মধ্যবয়সী শ্মশ্রুমণ্ডিত মুগ্ধভাষী প্রৌঢ়। উভয়েরই স্কন্ধ থেকে বক্ষে উপবীত দোলায়মান। এক্ষণে এর অতিরিক্ত পদ্মাবতীর লোচনাবদ্ধ হল না। প্রগল্ভা পদ্মাবতী হঠাৎই স্বভাববিরুদ্ধ সন্তর্পণ আচরণে প্রখর ইন্দ্রিয়সমূহ সজাগ রাখল।

উভয় ব্রাহ্মণই উপনয়নের সফলতায় উপবীত ধারণ করেছেন। বাসুদেব এই তথ্যে অত্যন্ত প্রীত হলেন। প্রদোষকালে গ্রামের কতিপয় ব্রাহ্মণ মন্দিরালয়ে উপস্থিত হলেন। অন্যান্য সন্ধ্যা-আহ্নিকের চেয়ে অদ্য সন্ধ্যার আয়োজন সমধিক প্রাঞ্জল। অতিথিদ্বয়ের সাক্ষাতের মানসে অদ্য দ্বিজ সমাগম পূর্বাধিক। বাসুদেব স্বয়ং ভজন গাইলেন না বিধায় শিশু পদ্মাবতীও মন্দিরায় লয় তুলল না।

গুণগীতি গাইল বয়োকনিষ্ঠ অতিথি ব্রাহ্মণ অভীক কীর্ত্তনিয়া। হার্দ সুরের মাদকতাপূর্ণ কণ্ঠ। মনোহরণ করা সুরে উচ্চগ্রামে কীর্ত্তনিয়ার নাথ সঙ্গীত আবাল-বৃদ্ধ সকলের কর্ণকুহরে অনুরণন তুলল। কীর্ত্তনিয়ার কণ্ঠ নিঃসৃত শ্রুতিমুধুর গীতে নিঃশব্দ শ্রুয়মান শ্রোতৃমণ্ডলী আকণ্ঠ নিমজ্জিত হলেন।

সুদর্শন কীর্ত্তনিয়ার মোহনীয় সঙ্গীতে সকলে উচ্ছ্বসিত। অতিথিদের গ্রামবাসী সজ্জন-সকলে বারংবার অত্র পল্লীতে কিছুকাল অধিষ্ঠানের অনুরোধ করেন। সদানন্দ আর কীর্ত্তনিয়া এই আন্তরিক অনুরোধ থেকে নিষ্কৃতি লাভের সুযোগ সন্ধান না করে কতক দিবস অত্র পল্লীতে অবস্থানের সম্মতি দিলেন। এমনিতেই পান্থদ্বয় জ্ঞানাহরণ এবং এতদাঞ্চল পরিব্রাজনের উদ্দেশ্য নিয়েই গৃহ ত্যাগ করেছিলেন।

পক্ষকালের ব্যবধানে পদ্মাবতীর কোমল হৃদয় কীর্ত্তনিয়ার রূপ, জ্ঞান-গরিমার হিল্লোলে সন্তরণে মত্ত। বাসুদেব কন্যার এহেন আচরণে কুণ্ঠাবোধ না করে বরং প্রশয় প্রদান করলেন। পদ্মাবতীর অনুসন্ধিৎসু অন্তঃকরণ কীর্ত্তনিয়াকে বিশেষ আন্দোলিত করল। পিতার সান্নিধ্য ব্যতিরেকে সজীব শ্যাম যুবা ব্রাহ্মণের সন্নিকটেই অধিক সময় অতিবাহিত হতে থাকল। সঙ্গীতে আসক্ত-প্রাণ পদ্মাবতী অভীক কীর্ত্তনিয়ার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে ভজন গায় আর অম্নান বদনে নিরলস মন্দিরা বাজায়। কীর্ত্তনিয়া যখন কালোয়াতি করে তখন তপ্ত প্রহরেও প্রাণে শীতলতা অনুভূত হয়। সেই ক্ষণে পদ্মাবতীর মন্দিরা আর বাজে না। তার সকল ইন্দ্রিয় নিস্তেজ হয়ে শ্রবণেন্দ্রিয় প্রখর হয়ে ওঠে। জ্ঞানাহরণের বিষয়ের তো অন্ত নাই। জ্ঞানপিপাসু চিত্ত অনেক তথ্য-উপাত্তের সন্ধান করে।

পদ্মাবতীর আগ্রহে কীর্ত্তনিয়া তার শৈশবের কথা, পিতা-মাতার পরিচয়, জন্মভূমির বৃত্তান্ত  দেয়-

বহুকাল পূর্বে ৫৬০ শকাব্দে মিথিলাধিপতি শীলাদিত্য ভারতীয় রাজন্য ও পণ্ডিতবর্গের সমক্ষে বৌদ্ধবাদ খণ্ডন করার নিমিত্তে বিশেষ এক যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করেন। কলির আমলে লোকসকল বৌদ্ধদোষে দূষিত হয়ে তেজঃপরাক্রমহীন হয়। রাজন্যগণ আর্যধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধধর্মে আসক্ত হন। সর্বত্র সভাসদ দ্বিজসকল পাণ্ডিত্য গৌরবে বৌদ্ধবাদে মনোনিবেশ করেন। তখন রাজা বলভদ্র গঙ্গা, যমুনা ও স্বরস্বতী নদীত্রয়ের সঙ্গমস্থল, অতিশয় শ্রেষ্ঠ প্রয়াগে তেজস্বান ভাস্কর ক্ষেত্রে বহুদান প্রদানের মানসে যজ্ঞ আয়োজন করেন। তত্রে বৌদ্ধ ভূপালগণকে আমন্ত্রণ জানান। নানা দেশের নৃপতি সকল রাজা বলভদ্র কর্তৃক নিমন্ত্রিত হয়ে যজ্ঞ উপলক্ষে তৎস্থানে সমাগত হন। গৌড়দেশ, ত্রিপুরাদেশ ও বঙ্গদেশের ভূপতিগণ সমবেত হয়ে সকলে যজ্ঞের রক্ষণার্থে যজ্ঞমণ্ডপে নিযুক্ত হন।

ত্রিপুরাধিপতি তথায় দ্বিজকৃত যজ্ঞ, মন্ত্রবলে অত্যদ্ভুত জলদাকর্ষণ এবং অপরাপর নানাবিধ অত্যাশ্বর্য্য ঘটনা সন্দর্শন করেন। তিনি বেদ-গীত শ্রবণ করে নিজে সনাতন ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন এবম্বিধ নিজ রাজ্যে যজ্ঞ করবার অভিলাষ পোষণ করেন। বৌদ্ধমত ত্যাগ করে কি উপায়ে সনাতন আর্য ধর্মের দেবতার সেবা করা যায় তার উপায় নির্ণয় করতে বিশেষ চিন্তাযুক্ত হন। যজ্ঞাবসানে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ত্রিপুরেশ্বর সাধুমত শুনে বৌদ্ধমত পরিত্যাগ করে তৎস্থানেই আর্য ধর্ম গ্রহণ করেন। উৎকৃষ্ট জাতিত্ব লাভের নিমিত্তে তিনি যথাবিধি প্রায়শ্চিত্ত করেন। এক বৎসরকাল ব্রহ্মচর্যানুষ্ঠান, বিভিন্ন প্রকারের ব্রত পালন অতঃপর পঞ্চতপে সিদ্ধ হয়ে বিশুদ্ধচিত্তাধিকারী তপস্বীগণের প্রসাদে ক্ষত্রিয়ত্ব লাভ করেন।

রাজাধিরাজ শ্রীহর্ষবর্ধন হৃষ্টচিত্তে আর্য ধর্ম বিশদ প্রচারের উদ্দেশ্যে দৈবশক্তিমান বিপ্রগণকে সাদরে গৌড়-বঙ্গ-রাঢ়- সমতটের যত্রতত্র প্রেরণ করেন। অতঃপর ত্রিপুরাধিপতি স্বদেশ প্রত্যাগমনকালে ধর্ম উপদেশার্থে ধার্মিক যশস্বী ও শাস্ত্রজ্ঞ পাঁচজন ব্রাহ্মণকে সঙ্গী করেন। তাঁরা অতিশয় উচ্চমার্গের বেদ বিশারদ ছিলেন। বৎসগোত্রোৎপন্ন শ্রীনন্দ, বাৎস্যগোত্রোৎপন্ন আনন্দ, ভরদ্বাজগোত্রীয় গোবিন্দ, কৃষ্ণাত্রেয়গোত্রীয় শ্রীপতি এবং পরাশরগ্রোত্রীয় পুরুষোত্তম এই পঞ্চ বৈদিক ব্রাহ্মণ যথাক্রমে রামঘট্ট, ভূধর, নিমানন্দ, বটেশ্বর ও দেবীকচ্ছ নামক স্থান থেকে আগত। অত্র পঞ্চ ঋষি পূর্বকালে দুষ্কর তপস্যা করে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তদন্তর নগর থেকে বৌদ্ধসমাজকে বহিষ্কৃত করে ত্রিপুরা রাজ্যে শীঘ্রই সনাতন ধর্ম প্রচলন করেন। মনু নদীর পূর্বভাগে জয়পর্বতের পাদদেশে নব্য জয়স্কন্ধাবার জয়পুরের দেওপানী নামক স্থানে আশ্রম স্থাপন করে পঞ্চব্রাহ্মণগণ হোম, ভজন, বেদগীতি, ধ্যান ও আর্য ধর্ম প্রচারে নিবিষ্ট হয়ে পরম সুখে কাল হরণ করতে থাকেন। তৎকালে তাঁরা অনাবৃষ্টিবারণার্থ এক যজ্ঞানুষ্ঠান করে আর্যধর্মের প্রতিপত্তি অধিকতর সুদৃঢ় করতে সমর্থ হন। এই ঋষিদের আগমনের সময় থেকেই পূর্বদেশের বৌদ্ধধর্ম বিলোপ ত্বরান্বিত হতে থাকে এবং সনাতন আর্যধর্মের নবজীবন প্রতিষ্ঠা পায়।

ত্রিপুরা রাজ্য অতি প্রাচীন। কাছাড়ের সমতলভাগ, শ্রীহট্ট পুরাকালে ত্রিপুরার প্রত্যন্ত ভূমির অন্তর্গত ছিল। নদীর শিলচরের দক্ষিণে রুক্সিনী তীরে রাজঘাট নামক স্থানে ত্রিপুরার রাজধানী ছিল। ভূবন থেকে কৈলাসহর পর্যন্ত ভূভাগে বিস্তীর্ণ জনপদ। পর্বতমালা সন্নিকটে থাকায় নগর গ্রাম সমতল ভূমি দ্রুত জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে ঘোর অরণ্যে পরিণত হয়।

কুকি, লুসাই, প্রভৃতি পার্বত্য শ্রেণীর জাতিগণ ঘন ঘন আক্রমণ ও লুণ্ঠনে জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলছিল। পার্বত্য জাতির এহেন দৌরাত্ম্য থেকে প্রজা সকলকে রক্ষার্থে ভূবন থেকে রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। বীরঢোল বাজিয়ে কৈলাসহরের নিকটবর্তী জয়পুরের উপত্যকাভূমিতে ত্রিপুরার রাজধানী স্থান্তরিত করা হয়।

কৈলাসহর অধিবাসী কাছার জাতিত্বে কীর্ত্তনিয়ার জন্ম্। মাতা মৃন্ময়ী হিড়িম্বার গর্ভে কাছাড়ের নৃপতির একজন বিশিষ্ট মন্ত্রী জয়বর্ধন হিড়িম্ব’র ঔরসজাত সন্তান। আদি ব্রাহ্মণ পিতার সুযোগ্য জ্যেষ্ঠ পুত্র কীর্ত্তনিয়া প্রতাপশালী গুরু রামাচন্দ্র যজ্ঞেশ্বরের শিষ্যত্ব লাভ করে। সদানন্দও একই গুরুর দীক্ষায় দিক্ষিত। গুরুর স্বর্গলাভ হলে জ্ঞানপিপাসু সদানন্দ ও কীর্ত্তনিয়া তীর্থ পরিব্রাজনের উদ্দেশ্যে স্বভূমি থেকে নির্গত হয়।

অবাক বিস্ময়ে এই সকল বিবরণ জ্ঞাত হয়ে বাসুদেবের কোমল হৃদয় কীর্ত্তনিয়ার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে। অভিভূত বাসুদেব শুকতারাকে তার মানস অভিহিত করেন। শুকতারা পতিদেবতার ইচ্ছায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেন। বললেন,

পদ্মাবতীকে বিয়ে দেওয়া যাবে না।

এ কেমন অলক্ষণে কথা?

অলক্ষণে নয়। তোমার স্মৃতির বিস্মৃতি বরং আমাকে অবাক করছে।

যেমতি?

তোমার কী স্মৃতিভ্রম হয়েছে! আমি পদ্মাবতীকে ভগবানের দাসী বানানোর অঙ্গীকার করেছিলাম।

না, ভ্রম হয় নাই। পদ্মাবতী তো বাটিতে থেকেই ভগবানের সেবা করছে, সোমত্ত না হওয়া অবধি বাটিতেই থাকবে। এখনই তো তাকে আর বিদায় করে দিচ্ছি না। শ্বশুর বাটে যাবার বয়সও তার হয়নি। তারপর রাজ্যের অনুনয় বাসুদেবের কণ্ঠে বিগলিত হয়ে উচ্চারিত হল, ভীষণ সুতহিবুক ছেলে কীর্ত্তনিয়া!

বাসুদেব এই যুবক মানব আর শিশু মানবীকে নিয়ে জৈবিক স্বপ্নের জাল বুনতে থাকেন। বিভোর পিতা স্বপ্ন পূরণের আশা পোষণপূর্বক বয়োজ্যেষ্ঠ সদানন্দের যথাযথ মাধ্যমে কীর্ত্তনিয়ার সমীপে নন্দিনীর জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কীর্ত্তনিয়া শিশু পদ্মাবতীকে ইতোমধ্যে অন্তরমহলে গ্রহণ করেছিল। গৃহকর্তার প্রস্তাবে কীর্ত্তনিয়ার অন্তঃকরণে পুনর্বার প্রণয়বাসনার উদ্রেক করল। পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মানস তার নেই। প্রপঞ্চ সংসার সুখের চাইতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মুক্ত চিত্তে বিচরণ তার কাছে অধিকতর উপভোগ্য, বিবেচিত। দ্বিধান্বিত কীর্ত্তনিয়া চিন্তিত হল। কাছাড়ি জাতিত্বে কুমারীরা অল্প বয়সে বিবাহ করে না। কন্যাকাল অতিক্রম না হওয়া অবধি কোন পিতা মাতা নিজেদের দায়গ্রস্ত মনে করেন না। পদ্মাবতী নিতান্তই শিশু। তাই কীর্ত্তনিয়ার রুচি এবং অহংবোধ বিপত্তি উৎপন্ন করছিল।

রবিরাগ আগত দিনের বার্তাবাহক। এই প্রেক্ষিত বিবেচনায় ষষ্ট বর্ষীয়া পদ্মাবতীকে দেখলে তার সমাগত যৌবনের দ্যুতি অনুমিত হয়। পদ্মাবতীর আয়ত দৈহিক গড়ন, কাঞ্চন বর্ণের লোমবিহীন মসৃণ কোমল ত্বকে যখন গৌধুলীর স্বর্ণকিরণ পড়ে তখন তার রূপ দেখে জীবন্ত সুবর্ণ মুদ্রার ন্যায় সকলেরই তাকে নিজ অধিকারে রাখতে ইচ্ছা করে। ক্ষুদ্র নাসারন্ধ্রের টিকলো নাকোপরি শষ্প শীর্ষে শিশিরের মতো স্বেদ-বিন্দু দেখলে সোহাগ করতে বাসনা জাগে। ভবিষ্যতের অপ্সরাকে নিজের অধিকারে নেওয়ার পল্লবিত মনস্কাম কীর্ত্তনিয়াকে দ্বিধান্বিত করে তোলে। তার উপায়ান্তর না পেয়ে বিক্ষিপ্ত মনোভাব আর ঘটনাচক্রের আবর্তন অবশেষে পদ্মাবতীকে জীবন সঙ্গিনী করতে তাকে উদ্বুদ্ধ করে।

বাসুদেব কীর্ত্তনিয়ার সম্মতি সংবাদে অত্যন্ত প্রীত হলেন। গণের ব্রাহ্মণগণ সানন্দে এই ব্রাহ্ম পরিণয়ের বিধিবদ্ধ প্রস্তাবটির পক্ষে রায় দিলেন। তত্রে কাল বিলম্ব না করে অল্প কয়েক দিবসের প্রস্তুতিতে বাসুদেব  গ্রামবাসী ব্রাহ্মণদের নিমন্ত্রণ করে শুভক্ষণে শুভ দৃষ্টি বিনিময়ের আয়োজন করেন।

পদ্মাবতীর সমতল বক্ষ কুঞ্জীবদ্ধ করে দশহস্ত দীর্ঘায়িত নব অভ্রনীল পাটাম্বর পরিয়ে তার বর্ধিষ্ণু দেহকে আবৃত্ত করে দেওয়া হয়। শিরোভূষণে কাঞ্চন নির্মিত মটুক, কটিতে মেখলা, কর্ণাভরণে দীর্ঘ পাশা, নাসার মধ্যপ্রাচীরের অগ্রভাগে ঝুলন্ত নোলক, হাতে বালা, গ্রৈবেয়কে মণিহার-ললন্তিকা আর রক্তজবা-শ্বেতকাঞ্চনের পুষ্পমাল্য, পদপল্লবদ্বয়ে লাক্ষারসে শোণ রঙ অংকিত, পরিপাটি কুন্তলগুচ্ছে যুথী আর পঞ্চমুখীর আভরণে শোভিত। চতুঃসম চন্দনের ঘ্রাণে পঞ্চেন্দ্রিয় বিমোহিত। নববধূকে মর্ত্যরে অপ্সরাই দৃষ্ট হচ্ছিল।

যথেষ্ট আড়ম্বরপূর্ণ পরিণয়পূর্ব আনন্দ অনুষ্ঠান মঞ্চায়িত হল। বাসুদেবের কাছে বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত মূল্যবান ভেটসমূহ বর্তমান ছিল। স্বর্ণ মুদ্রা, রজত মুদ্রা, টঙ্কা, কড়ি যথেষ্টই সঞ্চিত ছিল। এ কারণে রাজকীয় আয়োজনের ব্যয় সংকুলান সহজতর হল। আদিব্রাহ্মণকন্যার আনন্দানুষ্ঠানে সকলের জন্য মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা ছিল। অহর্নিশ আহারাদির সুব্যবস্থা করলেন বাসুদেব। রূপশালী ধানের ঢেঁকি ছাটা অভগ্ন কণার ধুম্রায়িত সফেন ভাত, সুসিদ্ধ-সুস্বাদু সৌরভময় সুন্দরবনের চিত্রা হরিণের মাংস, আদ্যরস সিক্ত সরিষার তেলে কৈ মাছ আর লাল মরিচের গুঁড়া মাথায় প্রবেশ করিয়ে বড় বড় চিংড়ি, মাছ ভাজা ভক্ষণে সকলের রসনা তৃপ্ত হল। দুগ্ধ সহযোগে অন্নপক্ক পায়েস, ছানাবড়া, খীরখ-, দই-ঘোলের উন্মুখ বাঙ্গালীরা এই মনোজ্ঞ আয়োজনের মাধ্যমে অভিষিক্ত হলেন।

দুহিতার যজ্ঞ পুরোহিত বিবেচিত হন বাসুদেব স্বয়ং। তিনি মন্ত্র আবৃত্তিপূর্বক স্থাপিত হোমকু-ের চতুর্পার্শ্বে পদ্মাবতীকে প্রদক্ষিণ করিয়ে সানন্দচিত্তে অগণিত গণ্যমান্যের উপস্থিতিতে কীর্ত্তনিয়ার করপুষ্টে কন্যা সম্প্রদান করেন।

সাজপোশাকে পরিবৃত অবুঝ পদ্মাবতী মহানন্দে হ্রস্ব, দীর্ঘ ও প্লুত উচ্চারণে শ্লোক-স্তুতি পাঠ করে নিজেকে সপ্তপাকে গ্রন্থিত করে ফেলল।

পরিণয়ানুষ্ঠানের সমাপ্তি লগ্নে আকাশজুড়ে বৈশাখী মেঘ কৃষ্ণাবরণে নক্ষত্রখচিত অম্বর আছন্ন করল। শুকতারা এবং বাসুদেব দেবতার গতিক পরিদৃষ্টে ইন্দ্র সকাশে কৃতজ্ঞতা জানালেন- প্রভু তোমার দয়ায় উৎসব নির্বিঘ্নে সমাপন হল। এক্ষণে ধরিত্রী সিক্ত কর, জনকল্যাণের হেতু তোমার অর্ঘ্যবারি বর্ষণ কর।

ঝড়-বৃষ্টি হল না রাত্রিতে। গভীর তিমির অবগুণ্ঠনে গুমড়ে থাকলেন বৃষ্টিদেবতা। কেবল মেঘমন্দ্র আর অম্বর বিদীর্ণ করে একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে বজ্রের রেখা আলো বিকিরণ করল। হাঁসফাঁস করে পদ্মাবতীর একসময় নিদ্রা ভঙ্গ হয়েছিল, কিন্তু ঘুমের আবেশে বোধের চেতনা লুপ্তপ্রায়। নববধূটি পুনরায় নিদ্রাপতিত হলে অগত্যা পরম মমতায় কীর্ত্তনিয়া তাকে বক্ষে আরও নিবিড় করে নেয়।

কুহু যামিনী গত হলে প্রত্যুষে সজাগ হয়ে সকলে প্রকৃতির ভয়াবহ বিরূপ মূর্তির সম্মুখীন হলেন। দিগন্ত বিস্তৃত অম্বরীষ ঘন-ঘটায় বিরল সাজে নিথর। কৃষ্ণমেঘাচ্ছন্ন ধরিত্রীর বুকে অরুণ কিরণ না থাকায় ধূসর অন্ধকারে নিমজ্জিত ধরাতল।

জয়দেব পর্যাপ্ত পাটের ডুরি তৈরী করে রেখেছে। সে কী সারারাত্রি নিদ্রা যায়নি? স্নেহ বৎসল বাসুদেব জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিলেন তাকে, পরক্ষণে আর এই অমূলক প্রশ্নের অবতারণা করলেন না। তিনি এই জয়দেবকে শিশুকাল থেকে পেয়েছেন। পদ্মাবতীর অষ্টাব্দ জ্যেষ্ঠ জয়দেবের মেধা, মনন, সমস্ত আচরণ, কর্মাদি বাসুদেবকে শ্রদ্ধা আর ভালবেসে আবর্তিত। দেবকুলে নিবেদিত প্রাণ জয়দেব যদি…! এমনি বিরল ক্ষণে অনেক কিছুই ভেবেছেন বাসুদেব। অদ্য এই ভাব পুনর্বার চৈতন্যে উদয় হলে তড়িৎ মস্তিষ্ক থেকে নিষ্ক্রান্ত করে দিলেন।

বায়ুর বেগ ক্ষণে ক্ষণে প্রবল হচ্ছিল। প্রভঞ্জনার প্রমত্ত বেগবান বায়ু দেবালয়ের ক্ষতি সাধন করতে পারে ভেবে বাসুদেব অর্ধনারীশ্বর, মুরলীধর আর সদাশিব দেবত্রয়কে পৃথক পৃথক দেবদেউলের নাদনার সাথে কাছি দিয়ে গ্রন্থন করে দিলেন। বয়োজ্যেষ্ঠ ব্রাহ্মণ অতিথি সদানন্দ সহযোগিতা করলেন। সদানন্দের নিপুণ কৌশলে বাসুদেব চমকিত। কীর্ত্তনিয়া এই কর্মে বিন্দুমাত্র মনোনিবেশ করল না। সে একাগ্রচিত্তে করতাল হস্তে ভজনে মগ্ন। পদ্মাবতীও মন্দিরা বাজিয়ে কীর্ত্তনিয়ার কণ্ঠে কণ্ঠ রেখে উচ্চগ্রামে সুর মেলাচ্ছে–

শ্রীরামের প্রীতে তাই মুখে বল হরি…

বাসুদেব বারংবার পদ্মাবতীর এই প্রেক্ষণীয় যোগিনী অবয়বে তুষ্টিপ্রদ নেত্রপাত করলেন।

অধিক সময় পাওয়া গেল না, দুএক ফোঁটা বারি বর্ষণের সাথে প্রচণ্ডে শব্দে করকাপাত আরম্ভ হল। সকলে ততক্ষণাৎ কুঠির অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। ডিমিপারা অজস্র শিলা কয়েক মুহূর্তের অবকাশে শ্যামল ভূতল অবধাত আস্তরণে আবৃত করল। পদ্মাবতী বৈশাখীর এই চিত্তাকর্ষক রূপ ইতোপূর্বে দেখেনি। মোহিত হয়ে নয়নাভিরাম দৃশ্য অবলোকন করল।

সারা দিনমান অবিরাম ঝর ঝর বর্ষণে পদ্মাবতীর ধুলা-মাটি খেলার মানস-হৃদয় ওষ্ঠাগত। বৃষ্টি এই নববধূকে আর গৃহভ্যন্তরে বন্দী রাখতে পারল না। এক সময় সরিসৃপের ন্যায় সে বেরিয়ে গেল কুঠির থেকে। এইরূপ বর্ষায়, ডাঙ্গায় কৈ মীন কেলি করে- পদ্মাবতী সেটা জানে। ছিতনী হস্তে উধাও হল সে। কানকো বেয়ে কৈ মাছের ডাঙ্গার বিচরণ অনুসরণ করে মীন শিকার করা প্রকৃতই অতীব আনন্দের। সে ছুটোছুটি করে দীঘির পাড়ে আম্রকাননে বৃক্ষচ্যুত চূত কুড়াবে পল্লীর বালক-বালিকার সাথে।

 

৫.

কীর্ত্তনিয়া ও সদানন্দ মাসাধিককাল হরিকোটি গ্রামে অবস্থান করেন। ব্রাহ্মণদ্বয় পরিভ্রমণের উদ্দেশ্যে গৃহ ত্যাগ করেছিলেন। শীতকালে নদী পারাপার যথেষ্ট নিরাপদের। কিন্তু শীত ঋতু অতিক্রান্ত হওয়ার পর চৈত্রের খরায় নদ যখন একেবার নিস্তরঙ্গ ছিল তখন তারা ত্রিপুরা থেকে ব্রহ্মপুত্র নদে ভেসে পশ্চিম কূলে অবতরণ করেন। মনস্থ ছিল পশ্চিম পাড়ে জয়স্কন্ধাবার বিক্রমণীপুরে কয়েক দিবস অবস্থান করে নবদ্বীপে যাবেন। তদন্তর সুযোগ সুবিধা বুঝে গঙ্গা পাড়ি দিয়ে কনৌজ অবধি গমন করবেন। কিন্তু গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে এসে বাসুদেবের মহিমা জ্ঞাত হন। তার সঙ্গে সাক্ষাতের মানসে পদ্মাবতীদের কুটিরে দিবসের খর প্রহরে এসে উপস্থিত হন। কুঞ্চকানন পরিবেষ্টিত এই কুটিরে এসে অবধি মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন। গ্রৈষ্মিক ঋতু বিগত হওয়ার পূর্বে প্রমোহ ত্যাগ করে প্রব্রাজনের যাত্রারম্ভ না করলে শীত ঋতু না আসাবধি এতদস্থলে আবদ্ধ থেকে বর্ষাবরণ করতে হবে। বর্ষার স্রোতস্বিনী দুকূল প্লাবিত করে সকল পথ রুদ্ধ করে ফেলবে। সুতরাং বর্ষা ঋতু আগমনের পূর্বেই পদ্মাবতীর পরিবার পরিত্যাগ করে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে প্রস্থান বাঞ্ছনীয়। নচেৎ ভ্রমণের সকল পরিকল্পনা বিসর্জিত হবে।

উভয় ব্রাহ্মণ নিজেদের মধ্যে সংকল্প স্থির করে বাসুদেবকে অবহিত করেন। বিচক্ষণ বাসুদেবের পূর্ব থেকেই মানসাঙ্ক কষা ছিল। অতিথিদ্বয়ের আগমনাবধি তাদের সদুদ্দেশ্য অবহিত আছেন। তদুপরি পদ্মাবতীকে এখন তো শ্বশুরালয়ে পাঠান যাবে না। কীর্ত্তনিয়া তার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করে প্রত্যাগমনের পর এতৎ বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। এইরূপ মনঃস্থিরপূর্বক কোন ছল উপস্থাপন না করে বাসুদেব বদান্যবদনে সম্মতি প্রদান করলেন। যাত্রা যেন শুভ এবং নির্বিঘ্ন হয় তার জন্য কিছু পরামর্শ ও নির্দেশনা প্রক্ষেপ করলেন। তার পরামর্শানুযায়ী জ্যৈষ্ঠের কৃষ্ণ পক্ষের প্রারম্ভে রাজনগরের মেলা চলাকালীন সময়ে যাত্রারম্ভ সমীচীন হবে, স্থির হল।

শুকতারার এই সংবাদ শ্রবণের প্রস্তুতি ছিল না। তার মানসাঙ্কে কীর্ত্তনিয়ার পরিভ্রমণ রহিত ছিল। ভেবেছিলেন বাসুদেবের পাণ্ডিত্য আর পদ্মাবতীর মোহ তাকে পরিভ্রমণে নিবৃত করবে। এক্ষণে বিমর্ষাকর্ষণে ভঙ্গুর হয়ে পড়লেন। পতিকে প্ররোচিত করলেন জামাতার গমনেচ্ছা প্রতিহত করতে। ফল লাভ হল না। বাসুদেব এই প্ররোচনায় প্রলুব্ধ হলেন না বরং কীর্ত্তনিয়ার যাত্রায় কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয় সেদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখলেন।

পদ্মাবতী যখন অবহিত হল যে, কীর্ত্তনিয়া উচ্চতর জ্ঞান লাভের ইপ্সায় আপাতত নবদ্বীপে চলে যাবে। তখন তার মন যথেষ্ট বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল। স্বামী তাকে পরিত্যাগ করে যাবে এই বোধে নয়, কারণটা প্রত্যুষে-প্রদোষে কীর্ত্তনিয়ার সাথে সংগীত চর্চা আর হবে না! করতালে বোল তুলতে কে তাকে শেখাবে? বাবা যে করতালে বিশেষ আগ্রহী নন। তিনি মধুর সুরে বংশী বাজাতে পারেন। বংশীর নির্মল সুরে করতালের তাক ধিন তা শব্দ শ্রবণ কটু বিধায় করতালে তার ঘোর আপত্তি আছে, এটাই পদ্মাবতীর মনঃপীড়ার রহস্য। কীর্ত্তনিয়ার এই পরিকল্পনা অবগত হয়ে ভীষণ মর্মাহত পদ্মাবতীর চঞ্চল মন স্থিত হচ্ছিল না। যন্ত্রণাসংক্ষুব্ধ চিত্তে বাসুদেবের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে সে কঠোর বাণ নিক্ষেপ করল, বাবা, তুমি তাকে যেতে দিও না!

হতচকিত বাসুদেব কন্যাকে উরুতে বসিয়ে সাদরে বুঝালেন,

ওদের যেতে হবে মা। তীর্থ যাত্রা শেষে ফিরে এলে তার সাথে তোমাকেও পরিভ্রমণে শ্বশুরালয় পাঠিয়ে দেব।

না বাবা, তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। তোমার মত জ্ঞান ওর নেই। ও নক্ষত্র চেনে না বাবা, সত্যি!

তাই বুঝি? কিন্তু সে যে মার্গসংগীতে পারদর্শী, মা।

সেজন্যই তো ওকে যেতে দেবে না। আমি তবে কলাবন্ত শিখব কার কাছে, বল?

বাসুদেবের অন্তঃকরণ চঞ্চল হয়ে উঠল। তিনি অতঃপর কন্যাকে প্রবোধ প্রদানে বিরত থাকলেন।

অস্থির চিত্তে পদ্মাবতী বাবার কাছ থেকে নিভৃতে গিয়ে একান্ত মনে স্থির করল কীর্ত্তনিয়াকে সে কিছুতেই যাত্রার অনুমতি দেবে না। প্রয়োজনে সদানন্দ দাদা নিসঙ্গ যাবে।

বিদায় দিবসে কীর্ত্তনিয়া এবং সদানন্দ পল্লীর এ-বাটি সে-বাটি ঘুরে সজ্জন সকলের নিকট থেকে অনুমতি নিলেন। সকলেই শুভকামনা নিবেদন করেন। কীর্ত্তনিয়া তাড়াতাড়ি বাড়ি-ফিরতে চেয়েছিল। পদ্মাবতীর সঙ্গে কিছু সময় অতিবাহিত করার অন্তর্গূঢ় ইচ্ছা ছিল। পদ্মাবতীর প্রাণের গভীরে পুঞ্জিত বেদনা তার নিজের হৃদয়ে উপলব্ধ হচ্ছিল। কিন্তু সজ্জন সাক্ষাতে অতিরিক্ত সময় ব্যয়িত হলে সন্ধ্যা আহ্নিকের পূর্বে বাসুদেবের দেবালয়ে প্রত্যাবর্তন সম্ভব হল না। কীর্ত্তনিয়া যখন দেবপুঞ্জে ফিরল তখন পদ্মাবতী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কীর্ত্তনিয়া পদ্মাবতীকে ঘুমন্ত অবস্থায় পেয়ে অন্তস্থলে তীক্ষ্মশরের যন্ত্রণা অনুভব করল। কিন্তু ভাবে সেটা প্রচার করল না।

শুকতারা জামাই আদর ভালভাবে করতে পারেননি, এই দুঃখে কাতর। অদ্য সারা দিনমান এই প্রতিক্রিয়া জানিয়ে স্বামীকে দোষারোপ করলেন। কিন্তু, যাত্রার প্রাক্কালে বিশেষ আহারের আয়োজনে সমস্ত দিবসকাল ব্যতিব্যস্ত রইলেন।

ব্রাহ্মণদ্বয় বাটিতে প্রবেশমাত্র শুকতারা অন্নাহার সহযোগে দধি আর ক্ষীরখ- পরিবেশন করলেন। ভোজনপ্রিয় কীর্ত্তনিয়া গোগ্রাসে আহার করতে পারল না। তীক্ষ্মশরের যন্ত্রণা তাকে বিচলিত করছিল। শুকতারা পান্থদ্বয়ের জন্য শুষ্ক মিষ্টখণ্ড, পিষ্টক আর কতক চিড়া-গুড় পথিমধ্যে প্রয়োজনানুসারে ব্যবহার করতে পারে এই ভেবে নব কদলীপত্রের আবরণে বিশেষ কৌশলে মোড়ক করে দিলেন।

বিদায় লগ্নে আশীর্বাদ প্রাপ্তির কালে কীর্ত্তনিয়া বাসুদেব সমীপে অঙ্গীকার করল যে যথাশীঘ্রই সে প্রত্যাগমন করে পদ্মাবতীকে সঙ্গে নিয়ে ত্রিপুরায় গৃহস্থালিতে নিবিষ্ট হবে।

প্লাবিত জ্যোৎস্নার নির্মল আলোকে ব্রাহ্মণদ্বয়ের কায়া-ছায়া ঘন বনের মেঠোপথে হারিয়ে না যাওয়া অবধি পতি-পত্নী সেই পানে স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলেন। নবপত্রপল্লবে মনোহর চন্দ্রালোকের ক্ষীণ বিকিরণ বাসুদেবকে ম্রিয়মান হওয়া থেকে নিষ্কৃতি দিল। নিদ্রিতা নব্য পরিণীতা বালিকা বধূ পদ্মাবতী বুঝতেই পারল না তার জীবনের সর্বাধিক আরাধ্যজন তাকে অকূলপ্লাবনে ভাসিয়ে দিয়ে নিরুদ্দেশ যাত্রায় গমন করেছে।

 

৬.

নিত্যকার মত অদ্য প্রত্যুষে পদ্মাবতী নেত্র উন্মীলন করতেই হৃদয়াম্বরে কীর্ত্তনিয়া উদ্ভাসিত হল। ততক্ষণাৎ শয্যা ছেড়ে দ্রুত ধাবনে পার্শ্বে অবস্থিত কীর্ত্তনিয়ার শয়ন কক্ষে গেল। নাহ! কীর্ত্তনিয়া সেখানে উপস্থিত নেই! তাহলে! চলে গেছে কীর্ত্তনিয়া! তার অনুশাসন মানেনি!

একটুখানি হৃদয়টায় শত সহস্র বৃশ্চিকের দংশন। হতাশ অন্তরের নিগুঢ়তম প্রদেশ থেকে উথলে ওঠা ক্রন্দনকে থামাতে পারছে না। মায়াময় চঞ্চল নেত্রের কোল উপচে আঝোরে অশ্রুর ধারা কোমল কপোলদ্বয় গড়িয়ে ছোট ছোট মুক্তমণি হয়ে ভূতলে পড়তে থাকল। সকল ক্রিয়া-কর্ম ভুলে দেবত্রয়ের সম্মুখে বসে ক্রন্দনরত পদ্মাবতী অদ্য দেবগণকে প্রণতি জানানোর কর্তব্যেও ভ্রম করল।

বাসুদেবের নিদ্রাভঙ্গ হলে তিনি আঙিনায় এসে পদ্মাবতীকে দেবচত্বরে উপবিষ্ট দেখতে পেলেন। পদ্মাবতী বাসুদেবকে অদূরে পেয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে দৌড়ে গিয়ে দৃঢ় বন্ধনে আবিষ্ট হল। পিতৃবক্ষের চেয়ে অধিক নিরাপদ আশ্রয়স্থান এই ধরা তলে দ্বিতীয়টি নেই। পিতার বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠ কোন সান্ত্বনা-বাণী উদগীরণ করতে পারল না। আচ্ছন্ন পদ্মাবতীকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ রেখে তার কৃষ্ণঘন গুচ্ছ কেশে নিজের আশীর্বাদপুষ্ট দক্ষিণ করের অঙুলি প্রক্ষালনে বরাভয়ে রত থাকলেন। পদ্মাবতীর সবুজ অবুঝ মর্মের স্পন্দন কোনক্রমেই নিয়ন্ত্রণ মানছিল না। তার ডাগর দুটি খঞ্জন গঞ্জন নয়ানে নোনা জলের সমুদ্র।

 

৭.

কীর্ত্তনিয়া ও সদানন্দ রাতের মধ্য প্রহরে বাসুদেবের কুটির থেকে নির্গত হয়ে চন্দ্রালোক প্লাবিত মেঠো পথ ধরে বন্দর অভিমুখে দ্রুত পাদবিক্ষেপে অগ্রসর হতে থাকেন। প্রত্যুষের পূর্বেই তিন ক্রোশ পথ অতিক্রম করতে হবে। কীর্ত্তনিয়ার ঝুলির ভিতরে বরাভরণে প্রাপ্ত বস্ত্রখণ্ডসমূহ আর শাশুড়ির দেওয়া কলাপাতার মোড়কে শুষ্ক প্রয়োজনীয় যৎসামান্য আহারাদি সঞ্চিত আছে। তদরূপ সদানন্দের ঝুলিতেও বিন্নীধানের খই আর গুড়খণ্ড বর্তমান। কেবল বাসুদেবের দেওয়া দুটি সুবর্ণমুদ্রা কীর্ত্তনিয়ার কাছে গোপনে সংরক্ষিত।

পথচলার শ্রান্তি নিষ্কাষণের উদ্দেশ্যে নীরবতা ভেঙ্গে সন্দেহাশ্রিত কণ্ঠে কীর্ত্তনিয়া অহেতুক প্রশ্ন করল,

দাদা, আমরা প্রত্যুষের পূর্বে গঞ্জে উপস্থিত হতে পারব তো?

পথটি পরিচিত থাকায় নিঝুম রাতে পান্থদ্বয় তাদের পদযুগল দ্রুততর পরিচালনা করছিলেন। মনের গহীন থেকে বাক্য উৎসারিত হতে চাচ্ছিল কিন্তু কেউই মনের কথা মুখে উচ্চারণ করছিলেন না। কীর্ত্তনিয়া নিজেকে কোনক্রমেই স্থির রাখতে পারছিল না। তাই মাঝেমধ্যে এটা-সেটা বলছিল আর সদানন্দ তাকে সংক্ষিপ্ত উত্তর দানে নিবৃত্ত করছিলেন।

বন পেরিয়ে অবগুণ্ঠন উন্মুক্ত বিস্তীর্ণ সমতট, দিগন্ত প্লাবিত জ্যোৎস্নালোকে স্নাত ধরিত্রীর বিমুগ্ধ মনোহরণ রূপ। বিষণ্ন বদনে কীর্ত্তনিয়া গুন গুন করে উঠল কিন্তু গাইল না। সদানন্দ লক্ষ্য করলেন চুপিসারে। কোন আগ্রহ প্রকাশ করলেন না। তিনি নিজেকে সংবরণ করছিলেন এবম্বিধ কীর্ত্তনিয়াও তদরূপ হৃদয়কে প্রবোধ দিতে পারে সে জন্য তাকে তখন উৎসাহ প্রদান না করে নিস্তেজ রাখাটাই কর্তব্য ভেবে কাতর হৃদয়কে চঞ্চল হওয়া থেকে বিরত রাখলেন।

জ্যোৎস্নার অনুষ্ণ স্নিগ্ধ আলোয় পথ চলতে কোন অসুবিধা হচ্ছিল না। মৃদুমন্দ মলয়ে দ্বিজদ্বয় বিরামহীন পথ অতিক্রম করতে থাকেন। তাদের গন্তব্য স্থির ছিল। ভ্রমণের টানেই বেরিয়ে পড়েছেন। বিক্রমণিপুরে এতদিন অবস্থান করার কোন মানস ছিল না। কিন্তু পদ্মা পেরিয়ে তটে উপস্থিত হলে বিজ্ঞ বাসুদেবের স্তুতি শুনতে পান। অর্ধনারীশ্বর দেব-এর সংবাদ পাওয়া উভয়ের কাছে অযাচিত ছিল। দেব-এর পাদপদ্ম্যে প্রণতি জানাতে উৎসুক হৃদয়কে আর প্রবোধ মানাতে পারলেন না। অর্ধনারীশ্বর দেব-এর তথ্য তাদের জ্ঞাত ছিল না। সনাতন ধর্মমতেও অত্র দেব-এর প্রতিষ্ঠার বিষয় তাদের অবিদিত। অত্র স্তুতিবাদই তাদেরকে বাসুদেবের গৃহ পর্যন্ত নিয়ে আসে। বেদ বিশেষজ্ঞ বাসুদেবের পাণ্ডিত্যের সংস্পর্শে এসে অনতিবিলম্বে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েন দ্বিজগণ। এবং ঘটনা চক্রের আবর্তে পতিত হয়ে দ্বিমাসাধিককাল বাসুদেবের সাদর আতিথেয়তায় হরিকোটি গ্রামে দিন যাপন করেন। এর অতিরিক্ত সময় এখানে অবস্থানের উপায় ছিল না। কেননা বর্ষা সমাসন্ন। শীত গ্রীষ্মের ক্ষীণতোয়া ধারা কালিগঙ্গা বর্ষায় স্ফীতকায়া, খরস্রোতা, দুর্বার ভীষণা ও দুকূলপ্লাবনী হয়ে যায়। তখন গঙ্গা পাড়ি দেওয়া দুঃস্বপ্নের সমান। সেই হেতু কালবিলম্ব না করে পুনরায় তড়িঘড়ি তীর্থ যাত্রায় নির্গত হওয়া। আপাতত নবদ্বীপ হয়ে বিদেহ রাজ্যের রাজা জনকের রাজধানী মিথিলা যাওয়ার মানস আছে। রাতের আঁধার ম্লান হতে দেখে বোঝা গেল নিশি ভোরের দ্বারপ্রান্তে। যতদ্রুত সম্ভব বন্দরে পৌঁছাতে হবে। তাদের পাদবিক্ষেপ দ্রুততর হল। বন্দরের অবস্থান অনতিদূরে। আর অর্ধেক ক্রোশ পথ অতিক্রম করলেই গঞ্জে প্রবেশ করা যাবে।

গঞ্জের প্রান্তে উপস্থিতির কালে প্রত্যুষের রক্তিম অরুণ ততক্ষণে ক্রোধসমৃদ্ধ হয়ে দশ বাহু ঊর্ধ্বে উঠে গনগন করতে আরম্ভ করেছেন। রাজনগরে প্রসিদ্ধ বন্দরের পূর্ব প্রান্তে এই মেলার আয়োজন। নৈর্ঋত কোণ বরাবর অতিক্রান্ত পথশেষে বন্দরের প্রবেশপথে অধিষ্ঠিত জগন্নাথ মন্দিরের দাওয়ায় পরিশ্রান্ত পান্থদ্বয় উপবেশন করেন। ত্রিদিবস কাল আড়ং-এর অদ্য প্রথম দিবসের আয়োজন চলছে। মহাসমারোহে কোলাহল মুখর হয়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ সমতটাঞ্চল। সকলের পসরা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রয়েছে, এখনও সুচারু রূপে সকলে পসরা সাজিয়ে বসতে পারেননি।

অদ্য এই হট্টাঞ্চলে আড়ং আয়োজনের সংবাদ সদানন্দ পূর্ব থেকেই বিদিত ছিলেন। এই উপলক্ষেই বাসুদেবের সম্মুখে দৃঢ় প্রত্যয় উপস্থাপন করেছিলেন সদানন্দ। হরিকোটি গ্রামের দক্ষিণে শ্রী শ্রী দিগম্বরী তলা তীর্থস্থানে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষোলকলা শেষে ত্রিদিবস কাল এই আড়ং সংঘটিত হয়। এই বন্দরের চতুর্পাশ্বে যান চলাচলের জন্য অনেকগুলো ইষ্টক নির্মিত সরণি রয়েছে। এখানে বিপণিগুলোতে নানাবিধ পণ্য দ্রব্যের সমাহার। সভ্যতা ও রুচি অনুযায়ী সমুদয় দ্রব্য এখানে সহজলভ্য। বন্দরটি সর্বদাই কোলাহলে পূর্ণ তদুপরি অদ্য মেলার ব্যস্ততা। দূর দূরান্ত থেকে আগত পণ্যবাহী শকট সারিবদ্ধ  দ-ায়মান। অত্রে তথ্য বিনিময়েরও উপযুক্ত স্থান। এখান থেকে যাত্রা সঙ্গী এবং বাহন উভয়ই সহজে সংগ্রহের সমূহ সম্ভাবনা।

উদর পীড়া দিচ্ছিল। উদর আহ্বান করছে পূর্তি করার জন্য। বিচ্ছিন্ন ভাবনা প্রতিহত করে দ্বিজগণ সঞ্চিত চিড়া-গুড় ভক্ষণে আপাতত সতেজ হওয়ার প্রয়াস পেলেন। আহারের অবসরে লক্ষ্য করলেন আড়ং উপলক্ষে আনীত নানাবিধ পণ্যসামগ্রীর সাথে বিচিত্র আহারের উপকরণ রয়েছে যা আগত বেলায় রসনা বিলাসের বিশেষ উপযোগী হবে।

জগন্নাথ মন্দিরেও যথেষ্ট লোকের সমাগম। মন্দিরের সম্মুখদেশে পুরোহিত বা তদস্থানীয় কোন ব্যক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেল না।

একজন অতীব পরিচ্ছন্ন নারীকে সম্মুখে পেয়ে সদানন্দ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। শুক্লা নাম্নী এই ললিত রমণীর নিকট থেকে কিছু তথ্য সংগৃহীত হল। রমণীটি কোন জনের সন্ধান করতে বহিরাঙ্গনে এসেছিল।

সদানন্দ তাকে কাছে পেয়ে নিজেদের পরিচয় দেন। দেবদাসী যেন তাকে গুরুত্ব দেয়নি। অন্তত এরূপ বাসুদেবের কাছে অনুমিত হওয়ায় তিনি মর্মাহত হলেন; বিস্ময় সংবরণ করলেন। মন্দির প্রাচীর সংলগ্ন এক কোণে কূপ দেখে স্নানের লালসা অনুভূত হল। শরীর উন্নিদ্র পথচলার পরিশ্রমে ক্লান্ত। কিন্তু কৌপ্য জলে স্নানের অনুমতি পাওয়া গেল না। শুক্লার রমনীয় নির্দেশনায় ভীষণ অস্বস্তিতে সদানন্দ বিকৃত অবয়বে অবসন্ন দেহের স্বস্তি লাভের মানসে দীঘির জলের উদ্দেশ্যে তটস্থ হলেন। অগত্যা কীর্ত্তনিয়াও ঝুলি স্কন্ধে তাকে অনুসরণ করতে উঠে দাঁড়াল। আড়ং এর নির্দিষ্ট সীমানা অতিক্রম করে দক্ষিণ ঘেঁষে নৈর্ঋত কোণ বরাবর কিছুদূর অগ্রসর হয়ে বীথিবদ্ধবৃক্ষ পরিবেষ্টিত দীঘি দৃষ্টিগোচরে আসে। দেব-দেউলের স্থান থেকে অনেকখানি দূরে এই দীঘির অবস্থান থাকায় কোলাহলশূন্য বিরাটাকার পুষ্করিণীর পাড়ে এসে প্রভূত শান্তি অনুভূত হল। এতক্ষণে শুক্লার রমণীয় শ্লীল অভিজ্ঞতায় ব্রাহ্মণদ্বয় আস্বস্ত হলেন। বুঝতে পারলেন এই নারীর অভিজ্ঞতা তাদের পাথেয় হতেও পারে। দীঘির তিরতির ঢেউ আর পত্রপল্লবে ঝিরঝির বায়ু নব্য অতিথিদ্বয়কে দেখে যেন কানাঘুষা করছে। নির্জন পরিবেশে দারুণ আনন্দ হল কীর্ত্তনিয়ার। স্নানের পূর্বেই প্রাণ জুড়াল পুষ্করিণীর পাড়ে বৃক্ষের শীতল ছায়ায়। ঘাসাবৃত মৃত্তিকায় উপবিষ্ট হয়ে মলয় পর্বত থেকে আগত মৃদুমন্দ দক্ষিণা বাতাস উপভোগ করতে করতে দ্বিজন্মদ্বয় নিজেদের আপাতত করণীয় স্থির করা হেতু আলোচনায় রত থাকলেন।

দীঘির জলে সরাসরি সূর্যের কিরণপাত তদরূপ হয় না। প্রায় অর্ধাংশ জলে ছায়ার আস্তরণ। ফলতঃ জলজ তৃণের স্বল্প বিস্তার। যে পরিমাণ তৃণ উৎপন্ন হয় তার সমস্তটা মীনাহারের জন্য। সুতরাং দীঘির জল কাকচক্ষু স্বচ্ছ, শীতল এবং পান উপযোগী।

কীর্ত্তনিয়া তার উপলব্ধি থেকে সদানন্দকে উদ্দেশ্য করে বিষয়টি উল্লেখ না করে বলল,

দাদা, একটি বিষয় লক্ষ্য করেছ?

সদানন্দ তার চন্দন-চর্চিত কুঞ্চিত ললাট ঈষৎ উদীক্ষিত করে কীর্ত্তনিয়ার দৃষ্টিতে তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি স্থাপন করলেন। মুখে রা করলেন না। কীর্ত্তনিয়া উত্তরের সম্মতি বোধ করে পুনর্বার শব্দগুচ্ছ মুখগহ্বর থেকে নিঃসৃত করল,

এতদাঞ্চলে যথেষ্ট পরিশ্রমেও শরীর থেকে স্বেদ নিঃসরণ হয় না।

বাসুদেব বিজ্ঞের মত দিলেন, সূর্যের প্রখর কিরণ অত্যধিক ঘন বনানী ভেদ করে সহসা মাটিতে পতিত হয় না। অনুপ দেশের মৃত্তিকা তাই যথেষ্ট নরম, রসাল এবং উর্বর। বায়ুমণ্ডলে জলকণার প্রাবল্যে বায়ু শীতল থাকে বিধায় দেহ ঘর্মসিক্ত হয় না।

ঝোপের আড়ালে শরীরকে ভারমুক্ত করে দীঘির শীতল জলে অবগাহনের পর পট্টবস্ত্র পরিবর্তন করে পুনরায় দ্বিজদ্বয় জগমন্দিরে প্রত্যাগমন করেন। বিস্তীর্ণ মেলা প্রাঙ্গনে লোক সমাগমের আধিক্য পরিলক্ষিত হল। দ্বিজদ্বয় সরাসরি মন্দির পানে অগ্রসর হলেন।

মন্দিরটি দুটি অংশে বিভক্ত। উন্মুক্ত অংশটি সর্বসাধারণের উপাসনার জন্য নির্মিত। সেখানে জগদ্বরেণ্য পরমেশ্বর ঠাকুরের কৃষ্ণ পাষাণের বিগ্রহ অধিষ্টিত। বন্দরে আগত জনগণ এই স্থানে উপস্থিত হয়ে আশীর্বাদ প্রার্থী হন। কেউ কেউ নতমস্তকে প্রসাদ বিতরণে সন্তুষ্ট হন। অনতিদূরে অন্নসত্রে লোকে লোকারণ্য। বরেন্দ্র, গৌড়, বঙ্গ, সমতট, রাঢ়ের, বেদান্তাবলম্বী জনগণের সকল কামনা-যাচনার পীঠস্থান। অত্র অঞ্চলের এই প্রভুদেবল প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র। ভিন্নাঞ্চল থেকে পরিভ্রমণে আগত পথিক-সওদাগর, দর্শনার্থী সকলেই সন্নতি প্রণাম নিবেদন করতে এখানে অবশ্য উপস্থিত হন এবং মুক্ত হস্তে দর্শনি-দক্ষিণা প্রদান করেন।

এই মন্দির সন্নিবেশিত ইষ্টক নির্মিত প্রাকার পরিণদ্ধ অপর অংশটি সুরক্ষিত। অভ্যন্তরে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এই কারণে মন্দিরে উপস্থিত হয়ে দ্বিজদ্বয় কোন সাধু-সন্ত-পুরোহিত ঠাকুরের সন্ধান পাননি। দ্বিজদ্বয় নিজেদের পরিচয় এবং উদ্দেশ্য শুক্লাকে অবহিত করেছিলেন। শুক্লা বালেন্দু সদৃশ অবয়বে স্মিত হাস্যে একপ্রকার সুব্যবস্থার আশ্বাসও দিয়েছিল। কিন্তু মন্দিরের বহিরদেশে শুক্লার সাক্ষাৎ পাওয়া গেল না। অগত্যা তারা মেলা পরিভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন। মেলায় অজস্র পণ্য সমাহার তাদের অভিভূত করল। কতক পণ্য তাদের পূর্ব পরিচিত ছিল। কতক সম্পর্কে বিন্দু-বিসর্গও তারা অবহিত ছিলেন না। সপ্তধাতু নির্মিত দুখানি বালা এক টঙ্কায় বিনিময় করলেন সদানন্দ। উভয়ে দক্ষিণ হস্তে বালা পরিধান করে আহ্লাদিত হলেন। একবিংশ কড়ির বিনিময়ে দু জনে দুটি ভিন্ন পদের দীর্ঘায়িত উজ্জ্বল নীল বর্ণের পাথুরে মালা ক্রয় করে স্কন্ধে ঝুলিয়ে নিলেন। পরিপক্ক পাহাড়ি কদলি এক কড়িতে ক্রয় করে যথেষ্ট হতাশ হলেন সদানন্দ। এই বিনিময় মূল্যটি অতিরিক্ত প্রতিপন্ন হচ্ছিল। চিড়া ভিজিয়ে কদলী-গুড়ের সহযোগে দ্বিপ্রহরের আহার সারতে হবে। মুখরিত মেলা ইতস্তত প্রদক্ষিণকালে প্রায় ভূষণবিহীন দুজন বাউরা সন্নাসীর সাথে পরিচয় হল। তারা কু-লু-তু নদের দক্ষিণ তট থেকে এসেছেন। সদানন্দ ও কীর্ত্তনিয়া তাদের মলিন ও হতদরিদ্র বেশ লক্ষ্য করে তুচ্ছ জ্ঞানে ভাবের বিনিময়ে উদ্দীপ্ত হল না। সদানন্দের অনেক দ্রব্যই ক্রয় করতে ইচ্ছা করছিল কিন্তু কার জন্য উপহার সামগ্রী নেবেন, এমন কোন প্রিয়জন তার নেই তাই কেনাকাটা করা থেকে বিরত থাকলেন। কীর্ত্তনিয়া মনে মনে স্থির করল প্রত্যাবর্তনকালে পদ্মাবতীর জন্য উজ্জ্বল হীরকখণ্ড নির্মিত অলংকারাদি সংগ্রহ করে নিয়ে আসবে।

সমস্ত দিবসকাল ইতি-উতি পরিব্রাজন করে জাননিয়াদ্বয় গৌধূলি লগ্নে মন্দির প্রাঙ্গণে এসে উপস্থিত হলেন। তখন ব্যাপৃত মন্দির প্রাঙ্গণ লোকারণ্যে মুখর। কীর্ত্তনিয়ার দৃষ্টি চঞ্চল হয়ে চতুর্পার্শ্ব আবর্তিত হল। না, শুক্লা এখানে উপস্থিত নেই। মন্দিরে কাঁসার ঘণ্টার অবিরাম ধ্বনি পবন সমুদ্রে অনুরণন তুলে দিগন্তে হারিয়ে যাচ্ছিল। নিত্যাহ্নিক সমাপ্ত হলে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা প্রাঙ্গণে নিদ্রার আয়োজন করছিলেন। এমন সময় শুক্লা অপর এক উন্নতবক্ষোজ ললিতাকে নিয়ে দ্বিজদ্বয়ের সম্মুখে উপস্থিত হল। শুক্লা ভর্ৎসনা-সুরে জিজ্ঞেস করল,

এতক্ষণ সংবাদ দেননি কেন?

হতবাক প্রাজ্ঞদ্বয় বিস্ময়বিমূঢ় একে অপরের পানে চেয়ে থাকলেন। মুখ থেকে শব্দ নির্গত হল না। ভর্ৎসনা পরিপাক করতে নতমস্তকে উভয়ে উপবিষ্ট থাকলেন। ব্রাহ্মণদ্বয় দ্বিধা সংকুচিত চিত্তে পান্ডাদের কাছে শুক্লার সন্ধান করেননি। শুক্লা তাদের অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া জ্ঞাত করেনি। রীতি-নীতি জ্ঞান শূন্য পথিকদ্বয় এতটা নির্বোধাচরণ করবেন শুক্লাও ধারণা করেনি। সে ভেবেছিল দ্বিজগণ অন্যত্র কোথাও স্থান সংকুলান করেছেন। নিতান্ত কৌতূহলবশতঃ বহিরাঙ্গনে এসে দ্বিজদ্বয়কে পেয়ে তদ্দণ্ডেই কীর্ত্তনিয়া আর সদানন্দকে মৃদু ভর্ৎসনাপূর্বক তাদের সঙ্গে নিয়ে প্রাচীর পরিবেষ্টিত মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রত্যাবৃত হয়। উভয়ে কৌপের জলে হস্ত-পদ ধৈাত করে একটি প্রকোষ্ঠের বহির অলিন্দে পূর্ব নির্ধারিত আসনকৃত স্থানে আসীন হন।

শুক্লাকে আর কোথাও দেখা গেল না। দেবদাসী সঙ্গিনী চন্দ্রা পরিচ্ছন্ন কদলীপত্রে আবৃত দুটি মোড়ক এনে ব্রাহ্মণদ্বয়ের সম্মুখে উন্মুক্ত করে দিল। ঘৃত মিশ্রিত ঈষৎ ধুম্রায়িত সফেন ভাত আর কতক জম্বির রসে সিক্ত পোড়া মরলা মাছে দারুন আহলাদে দ্বিজগণ আহার সমাপন করলেন। ব্রাহ্মণগণ যতক্ষণ আহার করলেন চন্দ্রা পরিচারিকার ন্যায় ততক্ষণ তাদেরকে তালপত্তরের চামরী দিয়ে বীজন করল। কীর্ত্তনিয়া দণ্ডে-দণ্ডে চন্দ্রার প্রতি সংগোপন নেত্রপাত করল। দেববালা সুন্দরীর হরিদ্রাবর্ণ গাত্রে মশালের স্বর্ণালোর চঞ্চলতা অভূত মনোহর নর্তন করছিল।

আহারাদি সমাপনান্তে মোত্রার পাটি পুনর্বার সিক্ত বস্ত্রখণ্ড দ্বারা পরিষ্কার করার কালে যথেষ্ট মনোযোগী হয়ে কীর্ত্তনিয়া চন্দ্রাকে নিরীক্ষণ করল। সুডৌল তনুকায়ার পশ্চাৎদেশ স্ফীত, পৃষ্ঠাঙ্গে বিস্তৃত কৃষ কৃষ্ণ আকুঞ্চন কেশ আর সম্মুখ ভাগে পীন স্তন্যবক্ষ কীর্ত্তনিয়ার ইন্দ্রিয়কে উদ্দীপ্ত করতে যথেষ্ট ভূমিকা নিল।

চন্দ্রার ষষ্ঠ-ইন্দ্রিয় অতিমাত্রায় প্রখর। তার ষষ্ঠ-ইন্দ্রিয় তাকে প্রবুদ্ধ করল যে কীর্ত্তনিয়ার দৃষ্টি তার শরীরের প্রত্যেকটা বাঁকে সন্তরণ করে বেড়াচ্ছে। সে সহসা পশ্চাৎ পানে তাকিয়ে কীর্ত্তনিয়াকে অপ্রস্তুত করে জানাল,

অদ্যকার নিশিযাপন অত্রস্থলেই করতে হবে।

এর অতিরিক্ত একটি শব্দও প্রক্ষেপ করল না। কীর্ত্তনিয়ার দৃষ্টি নিদ্রা স্তিমিত চন্দ্রার নেত্রে স্থাপিত হওয়ায় সে কিছুটা সংকুচিত হয়ে পড়েছিল কিন্তু দেববালার নিসংকোচ ভাব লক্ষ্য করে ভারমুক্ত হল। চন্দ্রা বিদায় নিলে পইথানে ঝুলি রেখে উভয় ব্রাহ্মণ বিছানো পাতির উপর গাত্র মেলে দিলেন এবং অনতিবিলম্বে নিদ্রাঘোরে পতিত হলেন।

অতি প্রত্যুষে ঘণ্টা ধ্বনির অনুরণে চক্ষুরুন্মীলন ঘটলে তড়িৎ গাত্রোত্তলন করে দ্বিজদ্বয় সজাগ হওয়ার প্রয়াস পান। চন্দ্রা যেন তাদের তন্দ্রাভঙ্গের অপেক্ষায় ছিল। দ্রুত এসে তাদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করল। শৌচাগারের কর্ম সম্পাদনে সহায়তা করল। প্রথমে সদানন্দ ও পরে কীর্ত্তনিয়া জগবন্ধুকে প্রণাম নিবেদনের জন্য বহিরাঙ্গনে দেবালয়ের সম্মুখ ভাগে উপস্থিত হল। সেখানে এক প্রবীণ পুরোহিত আশীর্বাদ দানে ব্যস্ত ছিলেন। একপার্শ্বে পণব, পিনাকী আর মন্দিরা সহযোগে ভজন পরিবেশিত হচ্ছিল। সকলে মগন হয়ে উদগ্রাহ শ্রবণ করছিলেন।

কীর্ত্তনিয়ার পদ্মাবতীকে মনে পড়ে গেল। প্রত্যহ প্রত্যুষে কীর্ত্তনিয়াকে সে সজাগ করত এবং নিজে মন্দিরে গিয়ে সর্বাগ্রে দেবগণের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে কীর্ত্তনিয়ার প্রতীক্ষায় বসে থাকত। লোক সমাগমের অপেক্ষা না করে কীর্ত্তনিয়া উপস্থিত হওয়া মাত্রই দুজনে ভজনে মগ্ন হত। পদ্মাবতী অবিচলিত চিত্তে তাকে সঙ্গ দিত। প্রণয়বিহীন সেই মধুর ক্ষণসমূহ বারংবার স্মৃতিতে উদয় হলে তার হৃদয়টা বিমর্ষাক্রান্ত হয়ে পড়ে। সদানন্দ ঝুলি ক্রোড়ে পূর্ব থেকেই দেবালয়ের সম্মুখ প্রাঙ্গণে উপবিষ্ট ছিলেন। কীর্ত্তনিয়া সন্তর্পণে তার দক্ষিণ বাহু সংলগ্ন শূন্য স্থানটিতে নিজের অবস্থান নিয়ে পূর্ণ করল।

কীর্ত্তনিয়ারও হরিনাম ভজন করতে ভীষণ ইচ্ছা হচ্ছিল। নিজেকে সংবরণ করাটা মনঃস্থির করল। অধিক লোকের সমাগমে তার ভজনে মন সম্মতি দিচ্ছিল না। তাদোপরি পদ্মাবতীর অবয়ব অন্তর্লোকে ভাসমান হয়ে দৃষ্টি অস্বচ্ছ করে কণ্ঠ রুদ্ধ করে দিচ্ছিল। কীর্ত্তনিয়া অত্রস্থলেও নিজেকে স্থির রাখতে পারছিল না। সে সদানন্দকে অভিহিত না করেই নীরবে উঠে প্রাকারাভ্যন্তরে পূর্বের স্থানে গিয়ে পদ্মাবতীকে মস্তিষ্কে ধারণ করে অধিষ্ঠান করল।

পদ্মাবতী এখন কি করছে! সে কী তার বাবার সঙ্গে দেবগণের পাদপদ্মে বসে মন্দিরা বাজাচ্ছে? অদ্য খাপলা ভরে শ্বেতবর্ণ মোত্রাফুল না অতুলনীয় সৌন্দর্য বিতরণকারী সোনাল ফুল তুলেছে শিশু প্রণয়িনী পদ্মাবতী। নাকি অভিমান করে কালিগঙ্গার তীরে হিজল তমাল তলায় বসে বসে শষ্প উৎপাটনে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে। কে জানে! চোখের সম্মুখে পদ্মাবতীর নিত্যকার ক্রিয়াকলাপের দৃশ্যকল্প কীর্ত্তনিয়াকে কাতর করে তুলল, ক্ষুদ্র হৃদয়ের অতীব সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো স্মরণ করে সে বিচলিত হল। অধীর চিত্তে সে জগন্নাথক্ষেত্র থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে পূর্বের শয্যার স্থানে প্রত্যাবর্তন করে অধোবদনে পদযুগল ঝুলন্ত রেখে বসে থাকল। অস্থির চিত্তের অন্তরদৃষ্টির পটে পদ্মাবতীর গোল পূর্ণিমা সদৃশ মুখাবয়ব দৃশ্যমান। তার ডাগর দু নয়নের গভীর দৃষ্টিতে কী অদ্ভুত মায়া!

শুক্লা দূর ব্যবধান থেকে লক্ষ্য করছিল কীর্ত্তনিয়াকে। মঞ্জুল মৃদ্ভাণ্ডে কতক পান্তা-উচ্ছে ভাজা আর রক্তিম পুষ্ট কাঁচা লঙ্কা সমেত কীর্ত্তনিয়ার সম্মুখে এসে উপস্থিত হল। সিক্ত কেশের শুভ্র বসনা শুক্লা হস্তে মৃন্ময় পাত্র নিয়ে মুক্তা-দন্ত বিকশিত করে কীর্ত্তনিয়াকে দিবসারম্ভের সম্ভাষণ জানাল। কীর্ত্তনিয়ার পার্শ্বে উপবিষ্ট হয়ে, যামিনীর নিদ্রা-বিশ্রাম হয়নি আশঙ্কা প্রকাশ করে সে আশ্বস্ত করল যে অদ্য দিবাগত রাত্রে নিশ্চিত একটি সুব্যবস্থা হবে।

তনুশ্রী শ্বেত বসনা শুক্লার প্রাণবন্ত হাস্যবদন অবলোকন করে কীর্ত্তনিয়ার দুশ্চিন্তার ঘোর অবসানে চিত্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। প্রাতরাশের পাত্র সম্মুখে রেখে শুক্লা নির্লজ্জ প্রশ্ন করল,

প্রিয়ার কথা মনে পড়েছে, দেবতা?

কীর্ত্তনিয়া স্তম্ভিত হল। নারী সংযোগ তার রাশির বশ্য। এই নারী কী মুখরা? বিশ্বাস হতে চায় না। মুখরা রমনীর কণ্ঠে এত মাধুরী থাকতে পারে না!

তুমি দেবতা সম্বোধন করলে কেন? প্রতি প্রশ্ন নিক্ষেপ করল কীর্ত্তনিয়া।

দাসীর কাছে সকল ব্রাহ্মণই যে দেবতা গো।

শুক্লার লাস্যময়ী উত্তরে কীর্ত্তনিয়া বাকরোধ হয়ে নিশ্চুপ থাকল।

গোসাঁই, তোমার অপর সঙ্গী কোথায়? পুনর্বার প্রশ্ন শুক্লার।

শুক্লার প্রশ্নে অদ্ভুত আন্তরিকতা। ভ্রম কাটিয়ে শুক্লার মুখ নিঃসৃত কথার ধ্বনিগুলো সুরের মত প্রতিধ্বনিত হয়ে বাজতে লাগল কীর্ত্তনিয়ার কর্ণবিবরে। তার হৃদয় চঞ্চল হল। সে শুক্লার দীর্ঘ সান্নিধ্য কামনা করল মনে মনে।

তুমি আহার করে নাও ঠাকুর। অনেক বেলা হল।

শুক্লার অকপট তুমি সম্বোধনে যে আন্তরিকতা প্রকাশ পাচ্ছে তাতে হৃদয়ের নিকটজন ভেবে ভ্রম হওয়ার বিস্ময়। কীর্ত্তনিয়া পান্তা ভরা পাত্র সন্নিকটে নিয়ে আহারের উদ্দেশ্যে তাতে দক্ষিণ হস্ত পরিচালনা করল। শুক্লাকে নির্বিকার বসে থাকতে দেখে এইবার নীরবতা চূর্ণ করে কীর্ত্তনিয়া স্বয়ং প্রশ্ন করল,

তুমি কর্মশূন্য বুঝি?

হ্যাঁ, অনেকটা সেরকমই।

তোমাকে গৃহস্থালি করতে হয় না?

তা নয়, তবে অনেক দেববালা, সেবাদাসী অত্রে বাস করে। তাই আমি প্রায়শ কর্মশূন্যই থাকি। দেবতার মনোরঞ্জনই আমার প্রধান কর্ম। তার সেবাই আমার ব্রত। হা হা! আমার কর্ম দুই, খাই আর শুই।

কীর্ত্তনিয়ার বোধগম্য হল না শুক্লার শ্লেষ বাক্য। কি বলতে চাচ্ছে এই সোমত্ত রমণীয় রমণী। দেবতা সম্বোধন তো তাকেও করছে। শুক্লার কথায় কিসের ইঙ্গিত ভাসমান সেটা অনুমানের চেষ্টায় এক দৃষ্টে তার কমনীয় উজ্জ্বল মুখাবয়বে লোচনদ্বয় স্থির নিবদ্ধ করল। শুক্লা কীর্ত্তনিয়ার তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে সংকুচিত না হয়ে দন্ত উদাম করে চপলতার সাথে বলল,

প্রেমে পড়ে গেলে দেবতা। এই দৃষ্টি আমার ওপর নিক্ষেপ কর না। প্রত্যাখাত হয়ে হৃদয় ক্লিষ্ট হবে। আমি যে এই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ঠাকুরের সংরক্ষিত সম্ভার।

এতটুকু বলে পুনর্বার মুক্তা-দন্তÍ প্রস্ফুটিত করে সশব্দে হেসে উঠল। তার উচ্ছল হাসিতে কোন মলিনতা ছিল না তথাপি কীর্ত্তনিয়ার কর্ণকুহরে হাস্য ধ্বনিতে বেদনার সুর ঝংকৃত হল।

আকাক্সিক্ষত শুক্লার দীর্ঘ সান্নিধ্য পাওয়া গেল। অনেক তথ্য পরিবেশন করল সে। কীর্ত্তনিয়ার বুঝতে বিলম্ব হল না যে শুক্লা চপলা হলেও এই মন্দিরাভ্যন্তরে তার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। শুক্লা আর চন্দ্রা এই দুই পুরদ্বার প্রধান পুরোহিতের একান্ত সেবিকা। অন্যান্য আরও বিভিন্ন বয়সী ত্রিংশ দেববালা-দাসী এই জগমন্দিরের সেবায় রত আছে। এই দাসীরা পর্যায়ক্রমে রাজার পুরাভ্যন্তরে এবং দেবকুলের সেবায় নিয়োজিত থাকে। দ্বাবিংশ প্রহরী পান্ডায় এই মন্দির সংরক্ষিত। প্রধান পুরোহিত ব্যতীত আরও চার জন পুরোহিত এখানে অবস্থান করেন। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অহর্নিশ দ্বিজ ব্রাহ্মণগণের আগমন ঘটে। অত্র মন্দিরটি প্রচুর মুনি-তপস্বীর সম্মিলন কেন্দ্র। সংরক্ষণের দায়িত্ব তথা আনুষঙ্গিক ব্যয় রাজাধিরাজ নিজ কোষাগার থেকে করেন।

মন্দির পরিচালনার সমস্ত তথ্য শুক্লা অবহিত করল। এবং নিঃসংকোচে তথায় প্রয়োজনানুসারে দিনাতিপাত করতে পরামর্শ দিল। কীর্ত্তনিয়া এই সুযোগে শুক্লাকে তাদের মনোবাঞ্ছা অবহিত করার সাহস পেয়ে যায়। শুক্লা তাদের বাসনা অভিহিত হওয়ার পর বলল, অত্রস্থলে অবস্থান করলে তোমাদের একটা বিহিত ব্যবস্থা হবেই।

দৃঢ় আশ্বাস বাণী প্রদান করে হঠাৎ ত্রস্ত পদে স্বরস্বতীর ভীষণা উত্তরঙ্গ রম্ভোরুতে প্রদর্শন করে কাইঞ্জাত আড়ালে শুভ্র বসনা অন্তর্হিত হল। মনোরম সান্নিধ্য বিবর্জিত কীর্ত্তনিয়া অগত্যা পইথানে ঝুলি রেখে দিবা নিদ্রার উপক্রম করল।

 

৮.

বাসুদেবের বাসস্থানটি কুটির নয়, কুঠিরও নয়। বিস্তীর্ণ আঙিনা বোধিদ্রুমের ছায়ায় শীতল। ঈশান থেকে বায়ু হয়ে নৈর্ঋত কোণ বরাবর তাল, নারিকেল আর গুবাক তরুর বীথি। নারিকেল বৃক্ষের ঝাকড়া মস্তকের সারি ক্রোশ দূরত্ব থেকে দৃষ্টিগোচর হয়। বাসুদেবের সীমানা চিহ্নিত করার এটি সহজ উপায়। এগুলো এতটা ঊর্ধ্বমূখী যে বায়ূর তোড়ে দোদুল্যমান পত্ররাশি সর্বদাই একটি মধুর সুরে ঝির ঝির রব তোলে। ঈশান থেকে অগ্নিকোণ অবধি কুঞ্জবন আর ঔষধি লতা-বৃক্ষে ঘন শ্যামল বর্ণে চিত্রিত। এর পূর্বে খরস্রোতা কালিগঙ্গা আপন মহিমায় ছলাৎ ছলাৎ হিল্লোলিত। অগ্নি থেকে নৈর্ঋত কোণ উদোম ফাঁকা। কোন মহীরুহ না থাকায় দক্ষিণ মলয় নির্বিঘ্নে ঝাঁপিয়ে এসে দেবালয়ের আচ্ছাদন, বিস্তীর্ণ অশত্থের পত্রে পত্রে আছড়ে পড়ে। এখানে প্রশান্তি অপার। অগ্নি-নৈর্ঋত দিকে জোড়া কক্ষের দোচালা দুটি আবাসগৃহ। এর দক্ষিণ উন্মুক্ত। উত্তরে গোবরছড়ায় পরিপাটি আঙিনা ডিঙালেই দেবালয়। দক্ষিণে একটু অগ্রসর হলেই উদারাম্বরের পুরোটাই পর্যবেক্ষণ করা যায়। বাসুদেবের নিশি যাপনের আদর্শ স্থান। নিকটস্থ সরোবরের কৃষ্ণ জলের পাড় ঘেঁষে মুলি বাঁশের তৈলাক্তবৎ পাটাতনের ছোট একটা আতালি নির্মিত আছে। এই পাটাতনে বসে-শুয়ে রাতের অধিকাংশ সময় বাসুদেব এখানে নির্বিঘ্নে অতিক্রান্ত করেন। দীঘির পাড়ে ছোট ছোট বুনো বন আর কচুঘেঁচু ঝোপের মাথার ওপর দিয়ে অজস্র জুনিপোকা পিট পিট জ্বলতে থাকে। এগুলো মর্ত্যরে তারকারাজি। নক্ষত্র খচিত রাত্রির আকাশ আর সন্নিকটে জোনাকির ঝিলিমিলি দেখতে বেশ মনোহর। খাদ্যোত পোকার শরীরে কোন এক রসায়নের হেতু রাতের আঁধারে আলো বিকিরণ করে। তাদের গতিবিধি রাশি রাশি নক্ষত্রপুঞ্জের মত। মিটি মিটি জ্বলে আর নেভে। পতঙ্গগুলো যখন ডানা মেলে উড়তে থাকে তখন শরীর থেকে আলো বিচ্ছুরিত হয় পুনরায় ডানা গুটিয়ে শরীর আবৃত হলে আলো আর বিকিরিত হয় না। প্রখর সূর্যালোকে নক্ষত্র রাশির জ্যোতি দৃষ্টি ক্ষমতার বাইরে থাকে। ঘোর তমসা ব্যতিত রাতাম্বর পর্যবেক্ষণ সম্ভব নয়। শীতকালের স্বচ্ছ আকাশ জ্যোতিষ চর্চার সর্বোৎকৃষ্ট সময়।

বেদজ্ঞ বাসুদেব বিবিধ শাস্ত্রে জ্ঞানলব্ধ পণ্ডিত। তার পূর্বপুরুষগণ অত্রাঞ্চলে সংস্কৃত চর্চার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। ফলত ঈদৃশ উৎসাহবান কতিপয় যে সকল দ্বিজ সংস্কৃত ভাষা সঞ্জীবিত রেখেছেন বাসুদেব তাদেরই অন্যতম।

বাসুদেবের অঙ্গনের ঈশান কোণে অবস্থিত বেদিমূলে যে সকল শিষ্যরা পাঠ গ্রহণের অভিপ্রায়ে সমবেত হয় তাদের হৃদয়মূলে তিনি বেদের নিগূঢ় তত্ত্ববাণী প্রোথিত করতে সচেষ্ট হন।

পিতার স্নেহের দুলালী পদ্মাবতীর পূজার বেদি সংলগ্ন উঠানেই দিবাভাগের অধিকাংশ প্রহর অতিবাহিত হয়। ঘুরেফিরে, সে দেবদ্বয়ের সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়। মুগ্ধ নয়নে অর্ধনারীশ্বর দেবের কৌমরূপ নিরীক্ষণ করে। কি সর্বাঙ্গ সুন্দর গঠন। কি সুন্দর মসৃণ অবয়ব। শিল্প নৈপূণ্যে বাম পার্শ্বে কোমলতা ও দক্ষিণ পার্শ্বে বলিষ্ঠ প্রকাশ। ঊর্ধ্বে মস্তকের বামদিকে ফণীময় বিলম্বিত জটাজাল স্কন্ধের উপর এসে লুটিয়ে পড়েছে। ললাটে অর্ধচন্দ্র। দুই ভাগে বিভক্ত কেশের সম্মুখস্থ বামদিকে শোণ সিন্দুর বিন্দু। আকর্ণ বিস্তৃত দুটি পদ্মলোচন। বাম কর্ণে কর্ণভূসা, দক্ষিণে ফণীকুণ্ডল। কণ্ঠে নরমু- মাল্য। বাম হস্তে বাজু ও বলয় এবং অন্যান্য অলংকার। বাম বক্ষে পীন স্তনকে পরিবৃত করতে মণীময় মালিকার ভূষণসমূহ স্তরে স্তরে দোলায়মান। দক্ষিণে স্থূল যজ্ঞোপবীত আর হস্তে ত্রিশূল। দক্ষিণের বক্ষস্থল পুরুষোচিত দৃঢ়তার সাথে উন্মুক্ত। পরিধানে বাঘছাল। কটিতে নরমস্তক। তার নিম্নেই উভয় উরুর সন্ধিস্থলে ঊর্ধ্বে উত্থিত শিশ্ন। স্থূল দক্ষিণ পদখানি বিকশিত শতদলোপরি অধিষ্ঠিত এবং বামপদখানি পদালঙ্কার শোভিত শতদলের উপর সুরক্ষিত।

পদ্মাবতী অর্ধনারীশ্বরের রূপ মগ্ন হয়ে দেখে। দেবের সর্বাঙ্গ জুড়ে কিসের যেন আহবান চিত্রিত। নিজের পূর্ণাঙ্গ অবয়বটা দেখার মানস হয়, ভীষণ! পুষ্করিণীর পাড়ে স্বচ্ছ কৃষ্ণ জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে পদ্মাবতী অস্ফুটে জিজ্ঞাসে,

তুমি কে?

দৈনন্দিন কর্মের অবসরে পদ্মাবতীর অবকাশযাপন পিতার সান্নিধ্যে হয়। অদম্য জ্ঞানাহরণের বাসনায় উদ্বেলিত পদ্মাবতী। বাসুদেবও কন্যার অন্তরে জ্ঞান প্রতীতি জন্মাতে সর্বদাই সচেষ্ট। নিরলস প্রশ্নবাণে জর্জরিত বাসুদেব নিজের জ্ঞান-ভাণ্ডার উন্মোচিত করে দেন কন্যার সকাশে।

ষষ্ঠ বর্ষীয়া পদ্মাবতীকে শিশুই বলতে হয়। নিবিষ্ট চিত্তে সে সকল পাঠ গ্রহণ করার চেষ্টা করে। কোনটা অন্তঃকরণে স্থাপিত না হলে পরবর্তী প্রহরে পিতার কাছ থেকে একান্তে পাঠ নেয়। পিতাও অকুণ্ঠে তার কন্যাকে পাঠ দান করেন।

বাসুদেব বেদ স্তুতি করেন। বেণু বাজান স্বস্বনে। বৈদ্য কর্মেও মনোনিবেশ করেন প্রশান্ত চিত্তে। প্রচুর পরিশ্রম স্বীকার করে বনাঞ্চলে বিচরণ করেন ঔষধি সংগ্রহের নিমিত্তে। আর স্বপ্নাতুর নিশীথের তিমিরে শত সহস্র নক্ষত্রের গতিবিধি অনুসরণ করেন। জ্যোতিষশাস্ত্রের গবেষক বাসুদেব কন্যাকে পরিচয় করিয়ে দেন কালপুরুষ, সপ্তর্ষিম-লের সাথে। পদ্মাবতীও অবাক চেয়ে থাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন ধরিত্রীর আচ্ছাদন, নক্ষত্র খচিত অপরূপ শোভায় বিস্তৃত নভোমণ্ডলের পানে।

সংবৎসরে নক্ষত্রপুঞ্জ এক স্থানে স্থির থাকে না। নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে কিন্তু একটি নক্ষত্র প্রতিদিন একই স্থানে থেকে জ্বল জ্বল করে। দিবস-রজনীর সন্ধিক্ষণে সর্বপ্রথম যে নক্ষত্রটি দৃষ্টির সীমানায় আসে এর নাম-সন্ধ্যাতারা। পুরাণোক্ত রাজা উত্তানপাদের হরিভক্ত পুত্র এই ধ্রুবতারাটি পৃথিবীর মানবকুলের দিক-নির্দেশক। গৌধুলী উত্তীর্ণ হলেই কোন এক অবসরে পশ্চিম বায়ু-কোণে নিজেকে প্রকাশ করেন এই হরিভক্ত উত্তানপাদপুত্র। পদ্মাবতী ভাবে এটাও নিশ্চয় কোন দয়াবান দেবতাই হবেন। অনেক ঊর্ধ্বে থেকে পৃথিবীর সকল কৃত কর্মাদি লক্ষ্য করেন।

পদ্মাবতী প্রায় প্রত্যহ ধ্রুব নক্ষত্রের উদয়লগ্নে উদীক্ষণ চেয়ে থেকেছে অনিমিলিত নয়নে। একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে থাকতে যখনই দৃষ্টি ফিরিয়েছে তখনই চুপিসারে উত্তানপাদপুত্র বেরিয়ে এসে পদ্মাবতীকে নিয়ে ফিক ফিক হাস্যপরিহাস করেছেন। পদ্মাবতী রাগান্বিত হয়েছে। বাবার নিষেধ ভুলে গিয়ে ধরিত্রীর বক্ষে প্রবল আক্ষেপে পদ-নিক্ষেপ করেছে। পরক্ষণেই লজ্জাবনত সন্নতি জানিয়েছে ভূ-জননীকে। কেন না, ধরিত্রীর বুকে পদাঘাত ব্রাহ্মণের শিষ্টাচার বহির্ভূত বলেই এতকাল সে জেনে এসেছে।

আচার্য পিতা আর শিষ্যা কন্যা। উপযুক্ত শিষ্যকে গুরু পরম পরিতোষে বিদ্যা দান করেন। এই দান অন্যান্য সাধারণ শিষ্যদের অনুকূলের নয়। কেবল প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত সুবচনা পদ্মাবতী এবং বিচক্ষণ ধীশক্তি সম্পন্ন জয়দেবই এই পাঠদান গ্রহণ করতে পারে। একবার শ্রবণেই পদ্মাবতী শ্রুতপাঠ মস্তিষ্কে ধারণ করতে পারে। স্মৃতিভ্রম হয় না সচরাচর। কদাচিৎ বিস্মৃতি তাকে বিহ্বল করে তোলে। তখন সস্নেহে বাসুদেব তাকে পুনর্বার স্মরণ করিয়ে দেন পাঠ। সেই পাঠ মনুসংহিতা, পবিত্র বেদ বা শ্রীমদভগবৎ গীতা কিংবা জ্যোতিষশাস্ত্র নতুবা বেদগীতি যেটাই হোক না কেন। পাঠ দান বা গ্রহণের বরাদ্দকৃত কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। পদ্মাবতীর জন্য সতত গুরু প্রস্তুত থাকেন। কন্যা তার জননীর সঙ্গে গৃহের কাজকর্ম করতে করতে কিংবা ক্রীড়ারতাবস্থায় ছুটে এসে জেনে নেয় তার ইপ্সিত উত্তর। শুকতারার কাছ থেকেও তার শিক্ষা গ্রহণ হয়। নানান জৈবিক ক্রিয়া-কর্ম, পুজা-অর্চনা-ভক্তি আর নারীদেহের উন্মোচনোন্মুখ স্বতঃসিদ্ধ রহস্য।

অতি প্রত্যুষে বেদিতে উপবিষ্ট হয়ে বাসুদেব শঙ্খ বাজান দীর্ঘতর লয়ে। পদ্মাবতীর তারও পূর্বে নিদ্রা ভঙ্গ হয়। সর্বাগ্রে নিজেকে পরিপাটি করে নেয়। তদন্তর বটবৃক্ষের নিম্নে অবস্থিত বেদীমূলে উপস্থিত হয়। প্রণাম সেরে দেবদ্বয়ের আশপাশটা পরিচ্ছন্ন করে সন্তর্পণে, শ্রদ্ধা অবনত চিত্তে, আকণ্ঠ প্রণয় নিমজ্জিত নিবিষ্ট মনে। শৈশব থেকে মাকে এই কাজে নিয়োজিত দেখেছে। মায়ের সাথে নিজেও প্রণাম করে দেবদ্বয়ের সেবা করেছে। ইদানীং মায়ের স্থলাভিষিক্ত হয়ে নিজ স্কন্ধে তুলে নিয়েছে এই গুরুভার। শৈশব উত্তীর্ণ পদ্মাবতী সব কিছু পরিপাটি করতে পারে।

দ্বিধাহীন চিত্তে দেবগণের সেবা করে, বিস্তীর্ণ দেবাঙ্গন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখে। বিরাটকায় ন্যগ্রোধ বৃক্ষের একটি ভূপতিত প্রপর্ণও ইতস্তত পড়ে থাকে না দেবালয়ের অঙ্গনে। দেবত্রয়ের ভালবাসায় সিক্ত সতত সজাগ পদ্মাবতী প্রত্যুষ থেকে প্রদোষ অবধি দেবগণের আর পিতৃ সেবায় নিয়োজিত রাখে নিজেকে।

শৈশবে মায়ের সাথে আঁচল ভরে ফুল তুলতে গিয়ে কত আনন্দ করেছে সে। ইদানীং কুসুম সংগ্রহ করে কর্তব্য পালনে। প্রত্যুষে ঘুম থেকে সজাগ হয়েই শরীরকে নির্ভার করে কালীগঙ্গার প্রমত্ত জলে ডুব দিয়ে পরিশুদ্ধ করে নেয় নিজেকে। সিক্ত বসন ত্যাগ করে তন্তুবায় বয়নকৃত দশহস্ত দীর্ঘ একখণ্ড বস্ত্র পরিধানে নিজের কমলসদৃশ অর্ধপরিস্ফুট শরীরকে পরিবৃত করে। গৃহাভিমুখে প্রত্যাবর্তনকালে কখনও তুলে আনে বিকশিত রুধির সরোজ। কখনও বা বকুল তলায় গিয়ে শাখায় নাড়া দিয়ে অঞ্চল ভরে নেয় সহস্র কুসুমে। কদাপি বৃক্ষের কাছ থেকে অঞ্চল ভরে নিয়ে আসে রক্তজবা। ঋতুর পরিবর্তনের সাথে নতুন নতুন পুষ্পে রঞ্জিত প্রকৃতির কাছ থেকে সংগ্রহ করে এনে দেবত্রয়ের পাদপৃষ্ঠে অর্পণ করে সে তৃপ্ত হয়। কত শত ফুল! চৈত্রের চতুষ্কোণ কাউফুল, আষাঢ়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লটকা ফুল আর নবপত্রের উপর সাদা সাদা গুচ্ছ বনুয়া ফুল, কী নয়নাভিরাম! সরু শাখার অগ্রভাগে পিঠক্ষীরা কুসুমের ছড়া ঝুলে থাকে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুষ্পগুলোর কোন ঘ্রাণ নেই। সবুজ পাপড়ি ও পুষ্পাবরণ একই বর্ণের কারণে দৃষ্টি অনাকর্ষণকারী এই কুসুমগুলোও আহরণ করে কোল ভরে এনে দেবত্রয়ের পদতলে অর্পণ করে। শ্বেত বর্ণের সুদৃশ্য মোত্রা ফুল, অতুলনীয় সৌন্দর্য বিতরণকারী এই কুসুমগুলোও আহরণ করে হৃদয়ের আনন্দে। শ্বেত বর্ণের সুদৃশ্য মোত্রা ফুল, মনোহর সৌন্দর্য বিতরণকারী গন্ধহীন সোনাল ফুলের ঝাড় আর চুঙ্গি আকারের পঞ্চপুষ্পাবরণ সমন্বয়ে শুভ্র সুন্দর ভান্ডিল ফুলে ভরা বুনো কানন। পদ্মাবতীর যখন যেটা হৃদয়ে ধরে সেটাই এনে ভক্তি ভরে প্রত্যার্পণ করে দেবগণকে। বসন্তের সৌরভে বনস্থালী চূতমুকুলে প্রমোদিত হয়। পদ্মাবতী আনমনে অঞ্জলি ভরে মৌলও তুলে আনে কখনও কখনও।

দেবত্রয়কে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করেই নিজের কক্ষে যায়। রজতকৌটায় সঞ্চিত সিন্দুর থেকে তার পূর্বপুরুষকে প্রদত্ত মহাধিপতি আদিশূরের স্বর্ণমুদ্রার প্রান্তে এক চিমটি সিন্দুর তুলে নিজের সিঁথি রঞ্জিত করে। তৎপরে শুষ্ক মোত্রা গাছড়ার ঝাঁটা দিয়ে সমস্ত উঠান পরিষ্কার করে। আর চামরী দিয়ে বীজন করে অলঙ্কারাবৃত দেবগণের সুশোভিত গাত্র থেকে ধূলা-মাটি অপসারণ করে। এই কর্মটি পদ্মাবতী অন্তত তিনবার করে থাকে দিবসালোকে। এত ভক্তি দেবত্রয়কে কতটুকু প্রসন্ন করে পদ্মাবতী জানে না তবে পিতাকে সে প্রসন্ন করতে পারে, এটা অনুমেয়। পিতৃ অভিব্যক্তি তাই প্রমাণ করে। ইতোমধ্যে বাসুদেবের নিদ্রা ভঙ্গ হলে সর্বপ্রথম বেদীমূলে উপস্থিত হয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেন দেবগণকে। অতঃপর শঙ্খ নিনাদে মাতাল করে তোলেন সদ্য জাগ্রত ধরণীকে। দীর্ঘক্ষণের শঙ্খ ধ্বনিতে প্রকৃতি পরিশুদ্ধ হয়। সতেজ হয়ে ওঠে লতাগুল্ম, গাছ-গাছালি, পাক-পাখালি, শিশু-বৃদ্ধ। দীর্ঘ শঙ্খের ধ্বনিতে অনুবীক্ষিত প্রাণীকুল, প্রত্যুষে এই শঙ্খনিনাদ সহ্য করতে না পেরে অবশ হয়ে পড়ে, সম্বিৎ হারিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেয়। এভাবেই পদ্মাবতীর বাবা অনেকটা কলুষমুক্ত করেন ভূতল। তৎপরে দেবকুলের সম্মুখে বসে স্তুতি জপ করেন। পদ্মাবতী বাবার গা ঘেঁষে এসে বসে। হাতে তুলে নেয় মন্দিরা। তুন তুন তা না না, তুন তুন তা না না মন্দিরা বাজিয়ে বাবাকে সঙ্গ দেয়। কতভাবেই না বাবা হরি নাম জপ করেন! পদ্মাবতী খুব আপ্লুত হয় এই হরিহর ভজনে। বাসুদেব যখন বহির বাটে থাকেন তখন সে মন্দিরা বাজিয়ে একা একা জপ করে তার পিতার অনুকরণে। ভালই গাইতে পারে সে। তার সুরেও সমবেত ভক্তরা দোল খান।

 

তোমার দয়া বিনে কারও ঠাঁই নাই প্রভু, দয়া কর, দয়া কর…

সদানন্দ স্থির বসে স্তোত্র হরিগুণানুকীর্তন শ্রবণে অন্তঃকরণ প্রশান্ত এবং নাথের অবতারত্বে হৃদয় প্রশ্বস্ত করছিলেন। প্রভুর সমীপে কত আরতি, কত প্রার্থনা কতই না মাগন। অম্লান বদনে জগবন্ধু সকলেরই শ্রবণ করছিলেন। প্রচুর লোক সমাগম। বিস্তীর্ণ মেলা প্রাঙ্গণ জনারণ্যে পরিপূর্ণ। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার উচ্ছ্বাস কোলাহলে মুখরিত। অজস্র পদের জিনিসপত্রে পূর্ণ পণ্যবীথি। ক্রেতার মুখম-লে আকাক্সিক্ষত বস্তু সংগ্রহের তৃপ্তি আর বিক্রেতার পরিশ্রান্ত দেহ মন অর্থ উপার্জনের আনন্দে উদ্ভাসিত।

সদানন্দ এখনও কোনরূপ অন্নজল গ্রহণ করেননি। ক্ষুধা বোধ হচ্ছিল। কীর্ত্তনিয়া মন্দিরাভ্যন্তরে আছে জেনেও তিনি গাত্রোত্তোলন করলেন না। একজন পান্ডাকে নিকটে ডেকে নিজের জন্য কিছু আহারের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেন। পান্ডাটি অপর একজনকে নির্দেশ প্রদান করে দ্রুত অন্তর্ধান হল। সদাশয় সদানন্দ অবুঝের মত নিশ্চুপ থাকলেন। কিছুক্ষণ বিরতির ব্যবধানে আহারের পুনরায় উদ্যোগ নিতে মনঃস্থির করলেন। সেই সময় পান্ডা নির্দেশিত লোকটি শুষ্ক বট পত্রের সম্পুটে ঢেকি পিষ্ট চালের অপুপ আর গুড়ের সন্দেশ নিয়ে আসল। সদানন্দ তার বহনকৃত সম্পুটকটি গ্রহণ করবেন কি না দ্বিধায় পতিত হলেন। লোকটি নিজেকে কায়স্থ পান্ডা দাবী করায় দ্বিধা কাটিয়ে সদানন্দ আহারের মোড়কটি গ্রহণ করলেন। মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের সমাবেশ এক্ষণে নেই। যে কজন ভক্ত আছেন তারা ইতস্তত বিশ্রামের উদ্দেশ্যে ক্লান্তি দূর করতেই উপস্থিত রয়েছেন। সূর্যদেব মধ্য গগনে গনগন করছিলেন। কিন্তু অত্রস্থলে বট পাকুড় বৃক্ষের নিবিড় ছায়ায় অচিন্তনীয় প্রশান্তি বিরাজমান। ঔদের খরতাপ অনুভব করে সদানন্দ দেব সন্নিবেশিত প্রাঙ্গণ থেকে মেলার ক্রিয়াকলাপ অবলোকনে আনন্দ উপভোগ করছিলেন। কত বিচিত্র প্রয়োজন মনুষ্যকুলের থাকতে পারে, ভাবছিলেন সদানন্দ। এক শ্রেণীর মনুষ্যগুচ্ছ সেই সকল নিত্য নৈমিত্তিক প্রয়োজন মেটাতে তৎপর। কত অদ্ভুত সব পণ্যসামগ্রীর সমাহার। কত দূর-দূরান্ত থেকে ঝুঁকি আর কষ্ট স্বীকার করে পসারিরা বেসাতের নিমিত্তে পসরা এনেছেন। ইতিপূর্বে সদানন্দ প্রভুত মেলা উপভোগ করেছেন কিন্তু রামনগরের মেলার বৈশিষ্ট্য অনেকটাই ভিন্ন এবং এর আয়োজন অত্যন্ত সমৃদ্ধ বিধায় প্রসিদ্ধিও বিশেষ বিদিত। হঠাৎ এই ক্ষণে মু–শ্মশ্রু ম-িত কতিপয় শ্রমণকে মেলায় বিক্ষিপ্ত বিচরণ করতে দেখলেন। সদানন্দ ভাবিত হলেন। এই স্থলে ভিক্ষুগণের আগমন তাকে কিছুটা বিস্মিত করল। ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব তটে ত্রিপুরা রাজ্যে ভিক্ষুদের প্রভাবের ইতিহাস তার জ্ঞাত আছে। এখানে তাদের অবস্থিতি সদানন্দের ভাল লাগল না। তার বিচলিত হৃদয় আনন্দ উপভোগ বিসর্জন দিয়ে চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়ল।

কীর্ত্তনিয়া অনেকক্ষণ দিবা নিদ্রার ব্যর্থ চেষ্টা করে পুনরায় দেবদেউলে উপস্থিত হয়ে যথাস্থানে সদানন্দকে দেখতে পেয়ে একটু অবাকই হল। অম্লান বদনে সদানন্দের সম্মুখে এসে উপস্থিত হল এবং সংক্ষেপে জিজ্ঞেস করল,

দাদা, কিছু ভাবছ?

হ্যাঁ ভাবছি। এইমাত্র কতিপয় শ্রমণকে পরিভ্রমণ করতে দেখলাম। অত্রস্থানে তাদের উপস্থিতি আমাকে বিচলিত করেছে। তাদের উদ্দেশ্যটা জানা প্রয়োজন।

ক’জন ছিল, দাদা?

সংখ্যা গুণতে পারিনি। বেশ ক’জন দেখলাম। আরও আছে নিশ্চয়ই। অত্র স্থানের শান্তিপ্রিয় জনগণকে ধর্মদোষে সংক্রামিত করতে আসেনি তো? প্রতিহত করা দরকার!

আমরা পান্থজন। আমরা এর কোন বিহিত ব্যবস্থা করতে পারব না। অহেতুক ভাবনা কর না।  চল বরং ভিতরে গিয়ে বিশ্রাম করি। দ্বিপ্রহরের পর শশ্মান ঘাটে যাব। এতটুকু বলে সদানন্দের হস্তযুগল টেনে ধরে তার গাত্রোত্তোলন করে প্রাচীরাভ্যন্তরে প্রত্যাবৃত হল। দ্বার প্রান্তেই চন্দ্রা উভয় দ্বিজকে ধৃত করে দেবালয় সংলগ্ন পূর্ব প্রান্তের এক প্রকা- পরিপাট্য প্রকোষ্ঠের সন্নিকটে এসে ‘দিদি’ সম্বোধন করে কোন নারীর উদ্দেশ্যে কলস্বনে ডাকল। ভিতর থেকে শুক্লার পরিচিত কণ্ঠ শ্রুত হল,

মাননীয়াদের ভিতরে নিয়ে আয়।

চন্দ্রা সর্বপ্রথম প্রকোষ্ঠাভ্যন্তরে প্রবেশ করল। চন্দ্রাকে অর্ধত্রস্ত অর্ধবিজড়িত পদ বিক্ষেপে অনুসরণ করলেন দ্বিজদ্বয়। গৃহের অভ্যন্তরে প্রধান পুরোহিত ব্যাঘ্রাজিনাসনে হাঁটু ভাঁজ করে শান্ত মুদ্রায় আসীন। তার দক্ষিণে-বামে অপেক্ষাকৃত নবীন দুজন পুরোহিত বস্ত্রপট্যে সমরূপ মুদ্রায় উপবিষ্ট। দ্বিজদ্বয় গৃহে প্রবেশ করে পুরোহিতগণের উদ্দেশ্যে প্রণতি নিবেদন করলেন। অতঃপর প্রধান পুরোহিত দ্বারা আদিষ্ট হয়ে সরাসরি তার সম্মুখে আসন গ্রহণ করলেন।

দক্ষিণের পুরোহিত মৃদু স্বরে শুক্লার নিকট থেকে তাদের সু-পরিচয় ইতোমধ্যে জ্ঞাত হয়েছেন বলে অভিহিত করলেন। প্রধান পুরোহিত বললেন,

যতকাল যান-শকটের সুব্যবস্থা না হয় ততকাল মন্দিরে নির্দ্বিধায় অবস্থান করবেন। তত্তাবৎ শুক্লাকে উপগমের ইঙ্গিত করলেন। শুক্লা পুরোহিতের অঙ্গে জঘন সন্নিবেশ করে অনঙ্গকলা পরিদর্শন করতে উন্নত উরজযুগল দক্ষিণ উত্তমাঙ্গে চেপে লতা সদৃশ জড়িয়ে কর্ণকুহর প্রায় উত্তরাষ্ঠে স্থাপন করল। পুরোহিত তাকে নিম্নস্বরে কোন নির্দেশ প্রদান করলে সে মু- দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে উত্তম পুরোহিতাঙ্গ থেকে নিজ দেহ-সৌষ্ঠব বিচ্ছিন্ন করে উদ্দীপ্ত কামাচরণ নির্বাপন করল।

ততক্ষণে বৃহদাকার পাঁচটি কাঁসার থালায় মধ্যাহ্ন ভোজের ভোগ সামগ্রী নিয়ে চন্দ্রা অন্যান্য পরিবেশনকারিণীদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে পাঞ্চ ব্রাহ্মণের সম্মুখে পরিবেশন করে সে ব্যতীত অন্য সকলে প্রস্থান করল। সদানন্দ এবং কীর্ত্তনিয়া লক্ষ্য করল ধুম্রায়িত সুসিদ্ধ শালী ত-ুলের মদির ঘ্রাণে গৃহের অভ্যন্তরের স্থিত বায়ু অস্বাভাবিক হয়ে গেছে। থালার চতুর্পার্শ্ব নানা রকম ব্যঞ্জন দিয়ে থরে থরে সাজানো। তিন পদের মৎস, নিরামিষ, ঘণ্ট, ঘৃত, আহা! পৃথক পৃথক কাঁসার বাটিতে দুগ্ধস্বর আর মৌ মৌ সুমিষ্ট অমৃত ফল। ঘ্রাণে ভোজনের পূর্বেই হৃদয় পরিপূর্ণ, আহার বাসনা তৃপ্ত। দুজন দেবদাসী শুক্লা আর চন্দ্রা সর্বক্ষণ ব্যজন সঞ্চালনে ব্যস্ত রইল। সমুচিত এবং আন্তরিক সমাদরে অতিথি কীর্ত্তনিয়া ও সদানন্দ যথেষ্ট প্রীত হলেন। ভোজন শেষে বিশ্রামের জন্য শুক্লা ব্রাহ্মণদ্বয়কে পার্শ্বে একটি প্রশস্ত শয্যা প্রকোষ্ঠে নিয়ে গেল। সেখানে পালঙ্কের ওপর কার্পাসের শয্যা পাতা ছিল। শুক্লা জানাল,

এখন থেকে তোমাদের অবস্থানের জন্য এই স্থানটি নির্দিষ্ট করা হয়েছে। যত দিবস-নিশি তোমাদের প্রয়োজন এখানে অবস্থান করতে পারবে। ঝুলি স্কন্ধে নিয়ে বিচরণের প্রয়োজন নেই। এই প্রকোষ্ঠে তোমাদের বিনা অনুমতিতে কেউ প্রবেশ করবে না।

তারপর মুক্তা-দশন প্রকাশ করে হেসে বলল,

আমাকেও বারণ করে দিতে পার। তাতে অবশ্য তোমাদের ক্লেশ বাড়বে বৈকি।

সদানন্দ আর কীর্ত্তনিয়ার উত্তরের অপেক্ষা না করে পুনরায় বলল,

এখন বিশ্রাম নাও। সন্ধ্যা আহ্নিকের পর তোমাদের ভজন শুনব। এই বলে শুক্লা নিতম্বে ছন্দ তুলে প্রস্থান করল। হতভম্ব দ্বিজগণ অনুধাবন করতে পারলেন না যে শুক্লা কীভাবে তাদের এই গুণের সংবাদ অবহিত হল। তারা একে অপরের মুখাবয়ব পানে হতবাক দৃষ্টি নিক্ষেপে বিস্ময় স্থির রাখলেন।

পর্যঙ্কে বিশ্রাম নেওয়ার মানস কীর্ত্তনিয়ার ছিল কিন্তু সদানন্দকে সঙ্গ দিতে প্রস্তুত হল। সদানন্দের প্রধান কৌতূহল অত্রাঞ্চলে শ্রমণদের আগমন। দ্বিজদ্বয় ঝুলি স্কন্ধে বাটি থেকে বেরিয়ে মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেন। কিন্তু মেলায় উদ্বেজয়িতা ভিক্ষুদের কোথাও পাওয়া গেল না। অনুসন্ধান করে জানা গেল যে শ্মশান ঘাটের পথে যেতে দক্ষিণে দণ্ডায়মান প্রাচীন বোধিদ্রুমের আচ্ছাদনে কানাৎ গেঁথে গত ত্রিদিবসকাল কয়েকজন প্রব্রজিত শ্রমণ-শ্রমণি একত্রে অবস্থান করছেন। সদানন্দ তদাভিমুখে যাত্রার উপক্রম করলে কীর্ত্তনিয়া আপত্তি জানাল। মত প্রকাশ করল,

অদ্য নয় আগামীকল্য প্রত্যুষে জগদীশ্বরকে প্রণাম করে তাদের সাথে সাক্ষাতে লিপ্ত হব।

সদানন্দ একটু মনোক্ষুণ্ন হলেও কীর্ত্তনিয়ার যুক্তিকে মান্য করা সমীচীন ভাবলেন। উভয়ে মেলা প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করে জগবন্ধুর পাদপদ্মে বিরিখ বেষ্টিত ছায়াতলে মৃদু মধুর বাতাসে শ্রান্তির উপশম বেদিতে এসে উপস্থিত হন। ক্রমে অত্রস্থলে লোকজনের সমাগম বৃদ্ধি পেতে থাকে। অল্পক্ষণের ব্যবধানে লোকারণ্যে দেবালয়ের সম্মুখদেশ পরিপূর্ণ হয়ে গেল। এককোণে বংশী-মন্দিরা-পিনাক-পণব সহযোগে কলতানে ভজন-কীর্ত্তন চলছিল। সঙ্গীতের অনুরণন বায়ু তরঙ্গে প্রবহমান। কীর্ত্তনিয়ার চিত্ত পদ্মাবতীতে মগ্ন। পদ্মাবতীর স্মৃতিতে হৃদয় উদ্বেলিত। সে অনুক্ষণ হরিকোটি গ্রামে প্রত্যাগমনের আবশ্যকতা অনুভব করছিল। তীর্থ যাত্রার সংকল্প প্রত্যাগমনের অন্তরায় ভূমিকা পালন করল। বিচলিত চিত্ত মহাসংকটাবদ্ধ। পদ্মাবতীর জন্য অন্তর চঞ্চল, তার হৃদয় এতটা অস্থির হবে এটা কীর্ত্তনিয়া কখনও ভাবেনি। এক্ষণে উভয় সংকটাপন্ন কীর্ত্তনিয়া সদানন্দের শরণাপন্ন হল,

দাদা অস্থির চিত্তকে কিছুতেই প্রশমিত করতে পারছি না।

সদানন্দ অত্যন্ত স্নেহাবিষ্ট স্বরে আশ্বাস প্রদানে সচেষ্ট হলেন। বললেন,

পদ্মাবতী তো সাক্ষাৎ দেবী। তার সংস্পর্শে এসে এত সহজে কেউ বিচ্ছিন্ন হতে পারবে না। তার প্রভাব তোমাকে বিচলিত করবে। কয়েক দিবস ধৈর্য্য ধর বিস্মৃতির আবর্তে মোহ সকল ম্লান হয়ে যাবে। তুমি ব্যাকুল না হয়ে আপাত প্রবোধ মানাতে সচেষ্ট হও।

কিন্তু কোনো প্রবোধই অধীর চিত্তকে স্থির করছিল না। পদ্মাবতী কি উপেক্ষিত হল! তাকে এভাবে পরিত্যাগ করে চলে আসা বিবেক বিবর্জিত কর্ম হয়েছে! এটা পাপ! মহাপাপ! এই কৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে! এইস্য ভাবনা অনুক্ষণ উদিত হয়ে কীর্ত্তনিয়ার অন্তরকে আকীর্ণ করছিল।

 

১০.

পরদিন প্রত্যুষে দ্বিজদ্বয় মন্দির থেকে সরাসরি প্রাচীন বোধিদ্রুমের সন্ধানে নির্গত হলেন। তত্রে উপস্থিত হয়ে পূর্বাহ্নে দেখা শ্রমণগণের সন্নিকটে উপস্থিত হন। তাদের সম্মুখস্থ হয়ে বুঝতে পারেন যে এই ভিক্ষুসকল এ দেশীয় নন। কৌতূহল নিবারণের নিমিত্তে সরাসরি তাদের নিকটবর্ত্তী হলে একজন মৃত্তিকারঙপট্টধারী যুবক কাছে এসে সম্ভাষণ জানায়। দ্বিজগণ প্রত্যুত্তর করলে যুবক অন্যান্য সকল ভিক্ষুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সদানন্দ লক্ষ্য করলেন ভিক্ষুদের মধ্যে তাদেরকে নিয়ে কোন চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়নি। অত্যন্ত শালীন আচরণে শান্ত শিষ্ট অবয়বে সৌম্য দর্শন শ্রমণগণ তথায় অধিষ্ঠান করছেন। পরিচিতি পর্ব শেষ হলে দণ্ডে দণ্ডে সকলের সাথে কিছুটা সখ্য স্থাপন হল।

পরিচয় হল নাগছো ছুলঠিম জলবা’র সঙ্গে। সঙ্গে আছেন ভূমিসঙ্গ- ইনি রাজভিক্ষু। পশ্চিমের এক রাজা, দীপংকর শ্রীজ্ঞানের কনিষ্ঠ সহোদর শ্রীগর্ভও আছেন, দীক্ষান্তে যার নাম হয় বীর্যচন্দ্র। আছেন পণ্ডিত ভূমিগর্ভ, জ্যাতোন প্রমুখ। ছুলঠিম জলবা আরও চারিজনকে সঙ্গী করে সুদূর তিব্বত থেকে এস্থলে উপস্থিত হয়েছেন। মহাযান অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞানের কাছে মহাপতি এশেউদের ভ্রাতুষ্পুত্র রাজা ওদদে ও তার ভাই রাজভিক্ষু জনছুব ওদদের বার্তা নিয়ে এসেছেন তিব্বতের ঞারি প্রদেশ থেকে।

রাজ-রাজড়ার বার্তা বহনকারী জলবা’র পরিচয় পেয়ে সদানন্দ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে গেলেন। মহাযান দীপংকর শ্রীজ্ঞানের সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা ছিল না। কেননা বৌদ্ধমত তাদের কাছাড়ায় লুপ্ত প্রায়। তাদের ধারণা ছিল এই বঙ্গেও তদ্রুপ হবে। এখানে এসে অবধি তন্ত্র-মন্ত্র- ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার প্রভাবও যথেষ্ট লক্ষ্য করেছেন। সদানন্দ এই মহাজ্ঞানী সম্পর্কে একটু জ্ঞানাহরণ করতে ইচ্ছুক হন। তিনি শুধালেন,

মহাজ্ঞানী শ্রীজ্ঞান সম্পর্কে আমরা কিছুই অবহিত নই। তার বৃত্তান্ত একটু দিলে কৃতার্থ হই।

সোৎসাহে গৌরবর্ণ সতীশপা পরিচয় দিতে আগ্রহী হন-

এই বিক্রমণিপুরের বজ্রযোগিনী জনপদে ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম হয়। রাজ পরিবারের মানুষ কল্যাণশ্রী স্বয়ং রাজা ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক ধর্মপ্রাণ রাজন্য, তার স্ত্রীর নাম প্রভাবতী। তাদের তিনজন পুত্র। যথাক্রমে পদ্মগর্ভ, চন্দ্রগর্ভ ও শ্রীগর্ভ। আমরা চন্দ্রগর্ভের বাড়িতে তাঁর জননীর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে এসেছি। চন্দ্রগর্ভই হচ্ছেন আচার্য দীপংকর শ্রীজ্ঞান। বাবা ছিলেন মাতৃপুজক, তান্ত্রিক। পরিবারের ইষ্টদেবী আর্যতারা। তিনি নিজেই শিশু চন্দ্রগর্ভকে তারাদেবীর মন্দিরে নিয়ে গিয়ে তান্ত্রিক মতে দীক্ষা দিয়েছিলেন।

চন্দ্রগর্ভ একটু বড় হলে একদিবস নিকটের অরণ্যাভ্যন্তরে একাকী প্রবেশ করেন। সেখানে এক পণ্ডিত যোগী জেতারির তিনি দেখা পান। জেতারি একটি অল্প বয়সী ছেলেকে অত্র জঙ্গলাভ্যন্তরে নিজ কুটিরের সম্মুখে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

তুমি কে! কোথা থেকে আসছ?

আমি অত্রাঞ্চলের রাজপুত্র। আপনার কাছে শিক্ষা গ্রহণের মানসে এসেছি।

প-িত বনবাসী শান্ত জেতারি বললেন,

আমার কোন রাজা নেই, তাই কোন রাজপুত্রকেও আমার প্রয়োজন নেই। আমার কোন প্রভু নেই, আমিও কারও প্রভু নই। তুমি যেই হও, তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই।

লজ্জিত চন্দ্রগর্ভ ভুল বুঝতে পারলেন এবং ততক্ষণাৎ ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। বললেন,

আপনি আমাকে শিক্ষা দান করুন। আমার শিষ্যত্ব গ্রহণ করুন। প্রয়োজনে আমি সর্বস্ব ত্যাগ করতে প্রস্তুত।

তখন মহাবৈরাগী সন্তুষ্ট চিত্তে তাকে শিক্ষা প্রদানে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। পরে মাত্র ১২ বছর বয়সে শ্রীজ্ঞান রাজ্যসুখ বর্জন করে কৃষ্ণগিরিতে রাহুলগুহ্যবজ্রের কাছে হেবজ্রন্দ্র দীক্ষা নিলেন। দীক্ষান্তে, তার নতুন নাম হল গুহ্যজ্ঞানবজ্র। অতঃপর পূর্বভারতের বহু বিদ্যাপীঠ আর তীর্থস্থান ঘুরে সিদ্ধাচার্যগণের কাছে শিক্ষালাভ করেন। ওড্ডিয়ান দেশে তিন বছর তন্ত্রচর্চা করেন। তন্ত্রচর্চার পূর্বে আচার্য অদ্বয়বজ্রের নিকট অষ্টাদশ বৎসর বয়স পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করেন।

তাঁর উচাটন মন এই সিদ্ধি লাভে সন্তুষ্ট ছিল না। এক রাত্রে তিনি স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নে অসংখ্য শিষ্যসহ ভগবান বুদ্ধদেব দেখা দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন,

এ জীবনের প্রতি তোমার আসক্তি কেন? কেন তুমি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করছ না?

দীপংকর পথ খুঁজে পেলেন। অনতিবিলম্বে সকল যোগী, সিদ্ধাচার্য আর ডাকিনীদের সঙ্গ ছেড়ে তিনি বিশুদ্ধ বৌদ্ধধর্মের ধর্মরক্ষিত নামের এক আচার্যের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন। এই প্রব্রজ্যাগ্রহণের সময়ই তাঁর নাম রাখা হয় দীপংকর শ্রীজ্ঞান। তখন তিনি ঊনত্রিশ বছর বয়সের সুঠাম পুরুষ।

বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর নিরলস দুই বৎসর তিনি নানা শাস্ত্র পড়ে শেষ করেন। তবু তার জ্ঞানাহরণের অদম্য আকাক্সক্ষা নিস্তেজ হয়নি। তিনি সুবর্ণদ্বীপে শাস্ত্রবিধ ধর্মকীর্তির কাছে শিক্ষা গ্রহণ করতে তথায় যান। দ্বাদশ বৎসর সুমাত্রায় অবস্থান করলেন এবম্বিধ আচার্য ধর্মকীর্তির সংস্পর্শে থেকে তাঁর তত্ত্বাবধানে যাবতীয় শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। বর্তমানে বিক্রমশীল বিহারের আচার্য রূপে তথায় অধিষ্ঠান করছেন। তিনি প্রধান আচার্য রত্নাকর শান্তি মহাকরের অনুমতি প্রাপ্তির সাপেক্ষে তিব্বতে গিয়ে মহাযান মতের সুশিক্ষা প্রদানের সম্মতি জানিয়েছেন।

গভীর মনোযোগ দিয়ে দ্বিজদ্বয় সতীশপার ধর্ম-ব্যাখ্যা বিবর্জিত ইতিহাস শুনছিলেন। অত্রস্থানে তাকে থামিয়ে দিয়ে সদানন্দ জানতে চাইলেন,

মহাযান-হীনযান শব্দের সাথে পরিচিত আছি কিন্তু এই উভয় যানের অন্তর্নিহিত গূঢ় তত্ত্ব আমাদের জ্ঞান সীমার পরিধিতে নেই।

তিনি বললেন,

প্রাণী বধ করবে না। তোমাকে দেওয়া হয়নি এমন বস্তু-নিও না। মিথ্যা বলবে না। সোমরস খাবে না। ব্যভিচার করবে না। সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহার করবে না। উঁচু শয্যায় শোবে না। স্বর্ণ-রজত ছুঁয়েও দেখবে না।

বৌদ্ধ মতে দর্শনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যবস্থা আছে। শুধু নির্বাণ নিয়েই প্রচুর আরাধনা। মানুষের চিত্ত যখন তত্ত্বজ্ঞানলাভের জন্য বা বোধিপ্রাপ্তির নিমিত্তে ব্যাকুল হয় তখন তাকে বোধিচিত্ত বলে। এই বোধিচিত্তের সাধনার ঊর্দ্ধগতি বিচিত্র। নির্বাণের দিকে যাত্রাপথে বোধিচিত্তকে যেতে হয় সদ্ধর্মপথে। পথে পথে মনুষ্যলোক, ত্রয়স্ত্রিংশৎ ভুবন, যামলোক, নির্মাণরতি লোক, পবনির্মিত-বশবর্তী লোক। তারপর রূপলোক। তারও পর অরূপলোক। তদন্তর অনন্ত শূন্য।

মহাযানপন্থীরা এই নিষ্প্রাণ শূন্যে করুণা সংযোজন করলেন। শূন্যেই ছিল সবকিছুর শেষ। কিন্তু এই নি®প্রাণ শূন্যে করুণা মিশে যাওয়ায় জীবনের সঞ্চার হল, আরও বহু-সূক্ষ্ম চিন্তায় নিমজ্জিত হল বৌদ্ধদের শুদ্ধ মন।

বুদ্ধদেবের প্রত্যক্ষ শিষ্যদের ‘শ্রাবক’ বলা হয়। এঁদের যে যান, তাকে ‘শ্রাবকযান’ বলে।

এঁরা ধ্যানের দ্বারা জন্ম, জরা, মৃত্যু থেকে মুক্তি লাভ করতে পারতেন। বুদ্ধদেবের অন্তর্ধানের পর স্বয়ং বৌদ্ধধর্ম চর্চা করে নিজের চেষ্টায় এই জন্ম, জরা, মৃত্যুর কবল থেকে অব্যাহতি যাঁরা আয়ত্ত করতে  পেরেছেন তাদের ‘প্রত্যেকবুদ্ধযান’ বলে। তবে এঁরা কেবল নিজেদের উদ্ধার করতে পারতেন পক্ষান্তরে অন্যকে উদ্ধার করার ক্ষমতা বিন্দুমাত্র ছিল না।

আচার্যের অনুকরণীয় একাংশ যাঁরা নিজেদের মহাযান বলে আখ্যায়িত করলেন তাঁরা এই ‘শ্রাবক’ এবং ‘প্রত্যেক’-দের স্বার্থপর অভিহিত করে হীনযান আখ্যায়িত করলেন। কেবল নিজেদের উদ্ধার নয় জগতের উদ্ধারই এই মহাযানীদের মহাব্রত। উভয় যানেই ত্রিশরণগমনের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে হীনযানের ত্রিরত্ন এরকম- প্রথমে বুদ্ধ, তারপরে ধর্ম শেষে সঙ্ঘ। মন্ত্রটি-

বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি

ধর্মং শরণং গচ্ছামি

সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি

কিন্তু মহাযান বৌদ্ধদের ত্রিরত্ন হচ্ছে প্রথমে ধর্ম পরে বুদ্ধ ও শেষে সঙ্ঘ। অর্থাৎ মহাযানীরা বুদ্ধের থেকেও ধর্মকে বেশি গুরুত্ব দিলেন।

দ্বিজগণ অভিভূত হয়ে শ্রমণের বক্তব্য শ্রবণ করছিলেন। গৌড় রাজবংশের রাজপুত্র রাজ্য শাসনের লোভ বিসর্জন দিয়ে মানুষের কল্যাণ্যকে ব্রত করেছেন। যত্রে তন্ত্র-মন্ত্রের আধিক্য তত্রে বৌদ্ধমতের বিশারদ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের মাহাত্ম্যে নিজেরা বিচলিত হলেন। সদানন্দ আরও তথ্য সংগ্রহণের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন,

আপনারা হেথায় কী উদ্দেশ্যে অবস্থান করছেন।

ছুলঠিম জলবা বললেন :

আমরা বরেন্দ্র থেকে আগত। শ্রীঘ্রই মহাযান আচার্যের জন্মভূমি বজ্রযোগিনী দর্শন এবং মাতাকে প্রণাম করে বিক্রমশীল অভিমুখে যাত্রা করব। রাজা ওদদে প্রদত্ত ভেটসমূহ বিক্রমশীলে দিয়ে পণ্ডিত মহাযান আচার্য দীপংকর শ্রীজ্ঞানকে আমরা তিব্বতের রাজধানী শহর থোলিঙ-এ নিয়ে যাব।

কীর্ত্তনিয়া ও সদানন্দ গভীর মনোযোগ সহকারে শ্রমণের কথাগুলো শুনছিলেন। তারা ছুলঠিম জলবার কাছে দীপঙ্করের আদর্শমত জানতে চাইলেন।

ছুলঠিম জলবা বৌদ্ধমত প্রচার করতে জানালেন :

বাহ্যেন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ কর। তৃষ্ণাই নানারকম জন্মের কারণ। যদি নিজের মুক্তি চাও তবে ওই তৃষ্ণাকে ধ্বংস কর। তৃষ্ণা ইত্যাদির ক্ষয় হলে দুঃখেরও ক্ষয় হবে। ধর্মের দিকে দৃষ্টি দাও। তাহলে তৃষ্ণা দূর হবে। ধর্মে জন্ম নেই, মৃত্যু নেই, ব্যাধি নেই, নৈরাশ্য নেই।

লুইপা, সরহপা প্রমুখ সিদ্ধাচার্যগণও রাজা ধর্মপালের সময়ে  অপভ্রংশ-ভাষার মিশ্রণজাত আমাদের বঙ্গপ্রাকৃত-ভাষায় লিপিকরদের মাধ্যমে তাঁদের গূঢ়বাণী উৎকীর্ণ করে আমাদের জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন-

কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল।

চঞ্চল চীএ পইঠা কাল ।।

দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।

লুই ভণই গুরু পূছিঅ জাণ।।

সঅল সমাহিঅ কাহি করিঅই।

সুখ দুখেতে নিচিত মরিঅই।।

এড়িঅউ ছান্দ বান্ধ করণ কপটের আস।

সূনু পথে ভিড়ি লাহু রে পাস।।

ভণই লুই আমহে ঝাণে দীঠা।

ধমণ চবণ বেণি পিন্ডী বইঠা।।

 

অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ তরুসদৃশ এই মানবদেহ, পাঁঞ্চটি তার শাখা, ধ্বংসরূপী চঞ্চলচিত্তে প্রবেশ করার পর মানুষের জ্ঞানাহরণ পালা চলে, প্রীতির সঞ্চার করে এবং বস্তুজগৎই চরম ও পরমজ্ঞান বলে ভ্রমসৃষ্টি করে। একমাত্র পথ দেখাতে পারেন সদগুরু। সেই গুরুর নির্দেশে যোগসাধনার পথ বেছে নিতে হবে।

 

১১.

কীর্ত্তনিয়া নিদ্রাহীন নেত্রে শয্যায় পার্শ্ব-পরিবর্তনে অধীর হচ্ছিল। কতক্ষণ নিদ্রার ব্যর্থ চেষ্টা করে শয্যা ছেড়ে প্রকোষ্ঠের বাইরে আচ্ছাদনযুক্ত চত্বরে এসে বসল। ঘোর তিমির, উদাস নিখিল। প্রাঙ্গণের মশাল নিভে যাওয়ায় বহ্নিশিখার আলোকচ্ছটাও নেই। ঊর্ধ্বে তারকা শোভিত অম্বর নিথর। ঝিরঝিরে যাম্য সমীরণে ঝিঁ ঝিঁ রবের একটানা সুর।

সেইক্ষণে পার্শ্বের প্রকোষ্ঠের কপাট খুলে বিস্রস্ত বেশে আলুথালু কেশে একটি নারী মূর্তি বেরিয়ে উঠোন পেরিয়ে প্রকোষ্ঠের আড়ালে গেল। অল্প বিরতির পর সেখান থেকে বেরিয়ে কৌপের কাছে এসে স্থির হল। কীর্ত্তনিয়া এই নারী মূর্তিকে বিলক্ষণ চেনে। অবয়ব স্পষ্ট দেখতে পায়নি তবে তার পার্ষ্ণি-চাপা চলন একান্তই পরিচিত। শুক্লা কি কীর্ত্তনিয়াকে লক্ষ্য করেনি? কে জানে।

সেবিকা কৌপের সন্নিকটে স্থাপিত মটকি থেকে জল তুলে নির্বিকার ক্রমাগত শরীরে জল ঢেলে স্নান সারল। তদন্তর সিক্ত বসন পরিত্যাগ করে শুষ্ক বস্ত্রপট্টে নিজেকে আবৃত করে নিল। অতি নিপুণতার সাথে এই পিনদ্ধ কর্ম সম্পাদন করল। নিশিথের অন্ধকার সর্বত্র বিরাজমান। অদূরে বসে কীর্ত্তনিয়া শুক্লার শরীরের অনাবৃত কোন অংশই দৃষ্টির গোচরে আনতে পারল না। শুক্লার বস্ত্রপরিধানের নৈপুণ্যে কীর্ত্তনিয়া অভিভূত। নিজের কর্ম সম্পাদন করে অলস পদক্ষেপে কীর্ত্তনিয়ার সমীপে এসে দেবদাসী উপবেশন করল। কোন বাক্য উচ্চারণ করল না। কীর্ত্তনিয়াও নিশ্চুপ থেকে সময় ক্ষেপণ করছিল। উভয়ের মৌনতা যেন আলাপচারিতার প্রস্তুতি পর্ব।

হঠাৎ আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করে কর্কশ কণ্ঠে নিঃসখা নিশাচর ডেকে উঠল। উভয় নারী-পুরুষ সচকিত হল। এই কর্কশ স্বননে নিভৃতের নর-নারীর অঙ্গে প্রবাহিত রুধির গতি বৃদ্ধি পেল। কীর্ত্তনিয়া বলল,

তোমারও বোধ হয় ঘুম পাচ্ছিল না?

কিভাবে বুঝলে?

এই নিশীথে স্নান করলে, তাই বললাম।

শুক্লার অধরে হাসির রেখা। এই বক্র হাসি কীর্ত্তনিয়া আঁধারে লক্ষ্য করতে পারল না। শুক্লা ভাবল, পুরুষটা একেবারে নির্বোধ। একজন নারী গভীর রাত্রে শয্যা ত্যাগ করে কেন স্নান করে তাও তার জানা নেই। শ্লেষাত্মক কণ্ঠে শুক্লা বলল,

সারা শরীরে মধু মেখে শুয়ে থাকা যায় না গোসাই।

এ আবার কী কথা।

শরীরে মধু মাখানো থাকলে পিপীলিকা থেকে রক্ষা পাব?

তোমার হেঁয়ালী আমার বোধগম্য নয়। এই নিশিথে শরীরে মধু মাখবে কেন?

আহ মরি!

বুঝিয়ে বল না কেন?

সময়কালে বুঝবে।

বেশ। তাহলে তোমার গল্পের শেষটুকু বল শুনি।

শেষের কথা শেষে বলব। আজ থাক।

শুক্লপক্ষের চন্দ্র শেষ নিশির পশ্চিমাকাশে মেঘের আবরণে ইতস্তত নিজেকে আড়াল করছিলেন। ধীরে ধীরে উঠানের আলো আরও স্তিমিত হচ্ছিল। বর্ধিষ্ণু অর্ধশশীর ম্লান মুখশ্রীর পানে চেয়ে কীর্ত্তনিয়া বিষণœœতা অনুভব করল। কুয়াশাচ্ছন্ন চন্দ্রালোকে শুক্লার কায়া অনেকটা স্পষ্ট ছিল। তবু মুখাবয়ব ততটা স্পষ্ট নয়। দ্বিজ বুঝে উঠতে পারছিল না যতিনী শুক্লার মুখটি যে বরাবরের ন্যায় উজ্জ্বল নাকি সেখানে অপ্রসন্নতা ধৃত।

অবসন্ন শরীরে ক্লান্ত দ্বিজের হঠাৎ ভীষণ নিদ্রা অনুভব হল। তথাপি অধোবদনে শুক্লাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য নিশ্চুপ উপবিষ্ট রইল। দেবদাসী সম্ভবত কীর্ত্তনিয়ার অবসন্নতা অনুভব করতে পেরে মৌনতা ভঙ্গ করে বলল,

যাও ঠাকুর একটু নিদ্রা দাও। নিশি আর বেশি নেই।

বিপ্রের উত্তরের অপেক্ষা ললিতা করল না। স্ব-গাত্রোত্থানে শ্লথ পদক্ষেপে প্রকোষ্ঠের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে দারু কপাট রুদ্ধ করে দিল।

অগত্যা কীর্ত্তনিয়া উঠে গৃহাভ্যন্তরে শয্যায় গিয়ে নিদ্রার উপক্রম করল। সদানন্দ অঘোরে নিদ্রায় মগ্ন। কীর্ত্তনিয়া শয্যায় শরীর এলিয়ে দিয়ে শুক্লার কথা স্মরণ করল। শুক্লা গতকাল তপ্তদগ্ধ দ্বিপ্রহরে নিজের বিগত জীবনকে অনেকটাই উন্মোচিত করেছিল। এই বিজন রজনীর তিমিরে সে যখন কাছে এসে বসল তখন কীর্ত্তনিয়া প্রসঙ্গ টেনে তার জীবনের রহস্যময় ইতিবৃত্ত অবহিত হতে উৎসুক্য প্রকাশ করে। ভেবেছিল, শুক্লা যখন অর্ধেকটা জীবন-ইতিহাস শোনাতে দ্বিধা করেনি তখন অবশিষ্টাংশটুকু শোনাতে তার আড়ষ্টতা থাকবে না। নারীর আচরণ প্রকৃতই রহস্যময়। তারা উন্মুক্ত হওয়ার আভাস দেয় কিন্তু নিজেদেরকে সযত্নে আবৃত রাখে। একটু বিচলিত ভাব মনকে চঞ্চল করেছিল কিন্তু প্রবোধ মানিয়ে স্থির হয় সে। তবে, এ কথা সত্য যে শুক্লার মর্মন্তুদ জীবনবৃত্তান্ত শুনে সে প্রকৃতই মর্মাহত। শুক্লা শুনিয়েছিল,

আমাদের বাড়ি শীতলক্ষ্যার নদের পশ্চিম তীরে ভিটি পাড়ায়। অনতিদূরে অবস্থিত বিখ্যাত বরোমী বন্দর। নিয়মিত হট্টে বিপনি বিতানসমূহে হরেক রকম দ্রব্য সামগ্রী ক্রয় বিক্রয় হয়। অঞ্চলের শুধু চাহিদা মেটে না বরং অত্রাঞ্চল থেকে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যোগাযোগ স্থাপন হয়। বাণিজ্য হয় নির্বিঘ্নে।

পণ্যসামগ্রী নিয়ে নৌযানগুলো বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে পোতে নোঙর করে। বরেন্দ্রাঞ্চল থেকে গুড়, শালী অত্রাঞ্চলে আমদানী হয়। অত্রে গোলায় রেখে প্রাত্যহিক ক্রয়-বিক্রয় হয়। অত্রত্য থেকে গুড়, গুবাক, তণ্ডুল-তাম্বুল, আরও কীসে কীসে যেন বোঝাই অর্ণবযানগুলো সুবর্ণদ্বীপ, কোয়াঞ্চু হয়ে আরব্য দেশসমূহে রপ্তানি হয়।

আমার বাবা বরোমী বন্দরে একটি গোলার অধিকারী ছিলেন। এই গোলায় পণ্য সামগ্রী রাখা হত। ব্যবসায়ীরা সময় বুঝে সেগুলো ভিন্ন দেশে রপ্তানি করতেন।

মহাসুখে কালাতিক্রান্ত হচ্ছিল। হায়! বিধি মোর বাম। গ্রীষ্ম যায় যায়। ক’দিন ধরে কৃষ্ণ মেঘপুঞ্জ কখনও পশ্চিমে কখনও পূর্বের আকাশ ভেদে ঊর্ধ্ব পানে দেখা যায়। কিন্তু বৃষ্টি আর নামে না! ধরিত্রীর বক্ষ ফেটে চৌচির। প্রকৃতি ভীষণ রকম তৃষিত। সকলে বলাবলি করছিলেন এইবারের খরায় মন্বন্তর হবে। মেঘ নামল না। বৃষ্টি এলোই না, এলেন ওলা। অঞ্চলজুড়ে বিসূচিকারোগের প্রাদুর্ভাব। বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার উপায় ছিল না। কারণ, আমার একমাত্র দাদা প্রারম্ভেই এই রোগে মারাত্মকাক্রান্ত হয়ে পড়েন। দাদাকে একা ফেলে বাবা-মা কেউ বাড়ি ছাড়তে চাইলেন না। বাড়িতে প্রখ্যাত বৈদ্য কাশীনাথ এলেন। দুর্লভ দাড়িম্ব কুঁড়ির রস সেবনের জন্য দিলেন। হল না দাদার রোগমুক্তি। দুদিন ভুগে চলে গেলেন আমাদের সকল মায়া মমতা ছিন্ন করে অনেক দূরের না ফেরার রাজ্যে।

ততক্ষণে বাবা আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। বৈদ্য পাওয়া গেল না। কোন বৈদ্য অত্র গ্রামে গতান্তরে সম্মত হলেন না। মা নিরলস বাবার সেবায় রত হলেন। হরিনাম মাল্য গলায় পরান হল। দেবতার সকাশে কত যে অনুনয়, কতই না মাগন! সব কিছু বিফল প্রতীয়মান হল। একদিন অন্তরে বাবা মৃত্যুমুখে পতিত হলেন। এবার মহা বিভ্রাট উপস্থিত, মা’কে নিয়ে। -সতীর প্রাণ পতিত্বে। যেথায় প্রাণ অন্ত সেথায় নশ্বর দেহের ইহধামে কর্ম কী!- মা বাবার সাথে চিতায় উঠবেন। অন্তপুরবাসিনী এয়োতিগণ উলু দিয়ে স্বাগত জানাল। আমি তখন পাগল প্রায়, দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য। শোক বিহ্বল মা নির্বাক হয়ে গেলেন। তাকে স্নান করিয়ে সমস্ত অলংকারাদি অঙ্গে জড়ানো হল। জাদ দিয়ে কেশ বাঁধা হল। নব পরিণীতা বধূর ন্যায় মাকে দেখাচ্ছিল। মা কোনই আপত্তি করলেন না। অগ্র ব্রাহ্মণেরা শব নিয়ে গেল। মা নিজেই হেঁটে হেঁটে শ্মশান অব্দি চলে গেলেন। তারপর…

শুক্লা বাকরুদ্ধ হয়ে কতক সময়ের জন্য দিগন্তে হারিয়ে গেল।

কীর্ত্তনিয়া জিজ্ঞাসা করল, তারপর?

তারপর? তারপর মাকে শালকাষ্ঠের সাথে শক্ত করে বেঁধে বাবার চিতায় তুলে দিয়ে ঘৃত ঢেলে তাতে অগ্নি সংযোগ করে দেওয়া হল। দাউ দাউ লেলিহান বহ্নিসংস্কার দেখলাম। একবার মায়ের অস্ফুট চিৎকার বোধ হয় শুনতে পেয়েছিলাম। সৎকার্যে নিয়োজিত ব্রাহ্মণগণের হরিবোল আর হৈ চৈ-এর মাঝে মায়ের মৃত্যুকে দেখলাম। রোদনে রোদনে নীরের ঘনকেশগুলো ঝরে পড়ল। এ জগৎ সংসারে আমার আপন বলতে আর কেউ রইল না।

ক্রন্দনাবিষ্ট স্বর স্থির হয়ে গেল শুক্লার।

হতভম্ব কীর্ত্তনিয়াও বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। কি রূপে সান্ত¡না দিতে হয় সে জানে না। ইতিপূর্বে এই রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি। দিবসের অধিকাংশ সময় গুরু’র সান্নিধ্যে অতিবাহিত হয়েছে। সংসারের সুখ-দুঃখের দোলাচল তার অভিজ্ঞতায় নেই। শুক্লার কথন যেন ফুরিয়ে গেছে। আর কিছু বলার নেই। অস্বস্তি কাটাতে কীর্ত্তনিয়া প্রশ্ন করল, কতকাল পূর্বে এই ঘটনা ঘটেছিল?

আমি তখন একাদশবর্ষিয়া কিশোরী। অদ্য থেকে প্রায় অষ্টবৎসর পূর্বে। কীর্ত্তনিয়ার ভীষণ জানতে ইচ্ছা করছিল শুক্লা দেবদাসী হল কীভাবে? সে নিজেকে সংবরণ করে প্রশ্ন করল,

তোমার বাবার ব্যবসার কী হল?

বলতে পারব না।

কেউ কি তত্ত্বাবধানের ছিল না।

জ্ঞাতি-গোষ্ঠির সকলে তখন গ্রাম ছাড়া। ওলা দেবীর সেই আক্রমণে পঞ্চাশোর্ধ গ্রামবাসী ইহলীলা সাঙ্গ করে।

কীর্ত্তনিয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কৌতূহল নিবারণে জিজ্ঞেস করে ফেলল,

এইস্থানে এলে কিভাবে?

শুক্লা মুখ তুলে কীর্ত্তনিয়াকে দেখল। আকর্ণ বিস্তৃত নয়ন জলে ডবডব। দ্বিজ আড়ষ্ট হয়ে পড়ল। মনে স্থির করল, আর কোন প্রশ্ন নয়। কৌতূহল নিবারণ করতে গিয়ে শুক্লার মনঃকষ্ট বৃদ্ধি পাক সে এটা চায়নি। কিংকর্তব্যবিমূঢ় কীর্ত্তনিয়ার করুণ নয়ন শুক্লার পানে স্থির। শুক্লা অঞ্চল দিয়ে আর্দ্র নয়নের নীর মুছল। তারপর বলল,

সে আর এক দীর্ঘ ইতিহাস।

ক্লিশ্যমান জীবনের অন্য বাঁকের ইতিবৃত্ত সেদিন শুক্লা উন্মোচন করেনি। কীর্ত্তনীয়ারও আগ্রহ প্রদর্শন করার মানসিক শক্তি ছিল না। তারও আগ্রহ ততক্ষণে স্তিমিত প্রায়। অদ্যে তারই ইতি টানতে চেয়েছিল। শুক্লা সযতনে এড়িয়ে গেল।

 

১২.

গত ত্রি দিবস-রজনী মন্দির সম্মুখস্থ বিস্তীর্ণ আড়ং প্রাঙ্গণ লোক জনে মুখরিত ছিল। অদ্য চতুর্থ দিবসে দর্শনার্থীদের ভীড় নেই তবে কোলাহল এখনও যথেষ্ট। বেসাতিরা নিজনিজ গন্তব্যে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ আবার তার অবশিষ্ট সমুদয় পণ্যসামগ্রী হট্টাঞ্চলের স্থায়ী ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রীর চেষ্টায় রত। কীর্ত্তনিয়া লক্ষ্য করল পান্ডা সকল মহাব্যতিব্যস্ত। অতিথির সেবায় নয়, বেচা-কেনার দালালি বৃত্তিতে। ধারে কাছে কোন পান্ডার টিকিটিও নেই।

পরপর দুই অপরাহ্ন বোধিদ্রুমের ছায়ায় দ্বিজদ্বয় ছুলঠিম জলবার সাথে সময় অতিবাহিত করেছেন। জলবা কোনরকম তাদেরকে ধর্মান্তরিত হওয়ার পরামর্শ দিতে সচেষ্ট হননি। কেবলি তার নিজ দায়িত্ব কর্তব্য পালনের মানস ব্যক্ত করেছেন। সুষ্ঠুভাবে অর্পিত দায়িত্ব কীভাবে পালন করা যায় এই ভাবনায় সদাই উদ্বিগ্ন দেখা গেছে তাকে। স্তুতিপাঠ ছাড়া ধর্মোপদেশের প্রবণতা থেকে তিনি বিরত থেকেছেন। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে বর্ষাবাস আরম্ভ হবে। তার পূর্বে বজ্রযোগিনী পল্লীতে মাতাকে প্রণাম করে অতিসত্বর বিক্রমশীলায় পৌঁছাতে হবে। বিলম্ব করা যাবে না। তাই তারা অদ্য রাত্রির শেষ প্রহরে রাজনগর পরিত্যাগ করে চলে গেছেন। কীর্ত্তনিয়া আর সদানন্দ একবার মনোস্থির করেছিলেন বজ্রযোগিনীতে মাতাকে দর্শন করে যতদূর সম্ভব তাদের সাথে পরিভ্রমণ করবেন। ছুলঠিম জলবার কোন আপত্তি ছিল না।  কিন্তু এই মনোবাঞ্ছা শুক্লার কাছে ব্যক্ত করা মাত্র সে হৈ হৈ করে বিস্তর ভাষণে ভীতি প্রদর্শন করল। কীর্ত্তনিয়ার বোধগম্য হল না যে, যে ধর্মের মূলে রয়েছে, জীব হত্যা মহা পাপ, তারা কীভাবে মনুষ্য জাতির ক্ষতি সাধন করতে পারে। জলবা বা তার সঙ্গীদের আচরণে ধৃষ্টতা প্রকাশ পায়নি। শুক্লার সকাশে এই যুক্তি উপস্থাপন করার সাথে সাথে মুখ ঝামটা দিয়ে দাবড়ি দিল। তদন্তর সে বলল,

রাজন্যবর্গের বিরাগভাজন এই সকল শ্রমণবর্গ যেমন শান্তশিষ্ট তদরূপ বিরুদ্ধাচরণে পারদর্শী। যুদ্ধ সংগ্রামে নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে ভীষণ হিংস্র।

হেন ভীতি প্রদর্শন করে দ্বিজদ্বয়কে নিবর্ত করল।

জগমন্দিরে অবস্থানের ষষ্ঠ দিবসাবসানের সন্ধ্যালগ্নে একাকি শান্ত প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর রূপ হরণ করছিল কীর্ত্তনিয়া। এতদকালে সদানন্দ হন্তদন্ত ছুটে আসলেন। কীর্ত্তনিয়া তার বৈকল্য অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করল,

কি সংবাদ দাদা! তোমাকে ব্যগ্র, সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে।

সন্ত্রস্ত নই, ব্যগ্র বটে।

হেতু, দাদা?

দেবদাসীর কাছে জানতে পারলাম প্রধান পুরোহিত ভূপতির নির্দেশে নবদ্বীপ যাত্রা করবেন। তত্রে নাকি রাজধানী স্থানান্তর হবে। দাসীটি বলছিল আমরা নাকি ইচ্ছা করলে তাঁর যাত্রা সঙ্গী হতে পারি।

তাহলে তো ভালই হয়।

আমাদের পুরোহিত প্রধানের সাথে আলাপ করা প্রয়োজন।

কবে যাত্রা করবেন সেটা কি বলেছে?

না। সেটা তো জিজ্ঞেস করা হয়নি।

তাহলে?

শুক্লার নিকট বিস্তৃত জানা যাবে।

 

রাত্রির আহারকালে কীর্ত্তনিয়া চন্দ্রার সম্মুখে প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে চন্দ্রা তেমন আগ্রহ প্রকাশ করল না। কীর্ত্তনিয়া এইক্ষণে সরাসরি জানতে চাইল যে, তাদের অত্র যাত্রা দলের সঙ্গী হওয়ার কোন সুযোগ আছে কিনা বা এই দলে কত জন অন্তর্ভুক্ত আছে ইত্যাদি। কীর্ত্তনিয়া কতগুলো প্রশ্ন করার পর চন্দ্রা মুখ খুলল। এতক্ষণ আহার পরিবেশন করতে ব্যস্ত ছিল। বলল,

ঠাকুর তো নবদ্বীপে যাবেন?

আহারাদি সারতে সারতে কীর্ত্তনিয়া বলল, আমরাও নবদ্বীপে যাবার উদ্দেশ্যেই গৃহ ত্যাগ করেছি।

তাহলে দিদির সাথে আলাপ কর না কেন?

তোমার দিদিকে তো সহসা পাওয়া যায় না। তার সাথে কথা বলার সুযোগ কই।

তারা শ্রীঘই যাত্রা করবে, এতদব্যতীত অন্য কিছুই তার কাছে অবহিত হওয়া গেল না। মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন জেগে রয়েছে। কিন্তু চন্দ্রার নিকট কোন সদুত্তর পাওয়া গেল না। চন্দ্রা ভুক্তাবশিষ্ট পরিষ্কার করে চলে গেল। মহাসংকট! কি করা, দ্বিজদ্বয়ের জ্ঞানে কুলাচ্ছে না। কার কাছে, কীভাবে এতদসংক্রান্ত বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা যায় তার ফন্দি আঁটতে উভয়ে ব্যস্ত। বোঝা গেল কোথায় যেন একটা গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে। রাত্রিতে শুক্লার দেখা পাওয়া গেল না। বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে ভেবে যে দেববালা সদানন্দকে এই সংবাদ জ্ঞাত করেছিল তার নিকট তিনি অতিরিক্ত তথ্য নেওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থাকলেন।

কীর্ত্তনিয়ার শুক্লার প্রতি আস্থা আছে। কিন্তু শুক্লার দেখা পাওয়া গেল না বিধায় অস্থির চিত্তকে প্রশমনের জন্য সে ভাবল যে, শুক্লা তাদের সাথে নিশ্চয় কোন প্রতারণা করবে না, এই ভেবে মনকে প্রবোধ দিল। অগত্যা এই রাত্রিকালে অনন্যোপায় হয়ে নিদ্রা বিলাসে নিশি হরণের সিদ্ধান্ত নিল। প্রত্যুষে শয্যা ছেড়ে সদানন্দ নিত্যকার মত পোত অভিমুখে গমন করলেন। তথ্য সংগ্রহের নিমিত্তে অযথাই যত্রতত্র প্রহর দুই ব্যয় করে বিশুষ্ক অবয়বে মন্দিরের নির্ধারিত প্রকোষ্ঠে এসে উত্তমাঙ্গের বস্ত্রপট্ট খুলে বিশ্রামের উদ্যোগ নিলেন। ভাবলেশহীন কীর্ত্তনিয়া তখন নিবিষ্ট চিত্তে বৈদিক শ্লোক চর্চা করছিল। একবার দৃষ্টি তুলে সদানন্দকে অবলোকন করে পুনরায় নিজের কর্মে মনোনিবেশ করল।

মধ্যপ্রহরে ব্যতিব্যস্ত শুক্লাকে একবার দেখা গেল। দ্বিজের প্রতি তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। এই দেবদাসীরে সঙ্গে গত কয়েকদিবস যে সখ্য সৃষ্টি হয়েছিল অদ্য শুক্লার আচরণে তার কোন বহিঃপ্রকাশ নেই। কীর্ত্তনিয়া শুক্লার কপট আচরণে ক্লেশিত হৃদয়ে প্রকোষ্ঠের অভ্যন্তরে পালঙ্কে উপুড় হয়ে শুয়ে রইল।

খরপ্রহর অতিক্রান্ত। ত্বিষাম্পতি দিগন্তের আড়ালে অস্তমিত। তখন প্রদীপ নিয়ে পরিপাট্য বসনে শুক্লা দ্বারের বাইরে এসে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করল। কীর্ত্তনিয়ার হৃদয়ের পরিস্থিতিতে চঞ্চলতা বৃদ্ধি পেল। শুক্লার শঙ্কা অপহরণ করে বলল, তোমার ভেতরে প্রবেশের জন্য অনুমতির প্রয়োজন হয়? জানা ছিল না।

প্রত্যহের মত সহাস্য বদনে শুক্লা সংবর্তিকা অঞ্জলিপুটে নিয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করল।

কোন ভূমিকা নয়, কোন ছলনা নয়, সরাসরি প্রদীপ যথাস্থানে স্থাপন করতে করতে বলল,

তোমরা তো নবদ্বীপে যাবেÑ প্রস্তুত থেক। যামিনীর মধ্যপ্রহরে আমরা যাত্রা করব।

হতবাক দ্বিজদ্বয় স্তম্ভিত। রমণীটি বলে কি! উত্তর দিল,

আজ্ঞে।

তোমার যদি আপত্তি থাকেও, তদুপরি আমাকে যেতে হবে। শুক্লার বাঁকা কথনে গভীর আকর্ষণ আছে। শ্লেষ মিশ্রিত শুক্লার বাক্য শ্রবণে কীর্ত্তনিয়া অভ্যস্ত। তবু একটা হোঁচট খেল।

আমার আপত্তি থাকবে কেন?

অবলাজনদের সঙ্গী করলে পুরুষদের অনেক বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয় তো, তাই বললাম।

ক’জন যাত্রী হবে।

সেটা কী জানবার খুব বেশি প্রয়োজন আছে? আমি সঙ্গে যাচ্ছি তোমাদের সেবা করার জন্য।

কীর্ত্তনিয়া এর পর কোন প্রশ্ন খুঁজে পেল না। শুক্লার রহস্যাবৃত আচরণে কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়ে নিশ্চুপ বসে থাকল। নির্বাক কিয়দমুহূর্ত কালের গর্ভে হারিয়ে গেল। বুদ্ধিমতি শুক্লা কীর্ত্তনিয়া আর সদানন্দের তঞ্চিতাবস্থা অনুমান করে বলল,

তোমরা অসন্তুষ্ট হয়ো না। যাত্রার সময়সূচী গোপন রাখা হয়েছে ইচ্ছাকৃত। এ সকল সচরাচর প্রচার করা হয় না। অত্র অঞ্চলের দুর্বৃত্ত শ্রেণীর প্রবল উৎপাত থেকে রক্ষা পেতেই অনাড়ম্বর এবং যথেষ্ট সংগোপনে এই ব্যবস্থা করা হয়। তদুপরি আমাদের সঙ্গে অতিরিক্ত যাত্রী থাকবে না। কতিপয় আরক্ষী থাকবে। যথাসময়ে সব বুঝতে পারবে। আপাতত আহার ভোগে নিদ্রা যাও। যথাসময়ে ডাক দেব।

শুক্লার দীর্ঘ প্রশমিত ব্যাখ্যায় উভয়ের বোধগম্য হল যে, সঙ্গত কারণেই এই সতর্ক ব্যবস্থা। দ্বিজদ্বয়ের মস্তিষ্ক থেকে সকল সন্দেহ অন্তর্হিত হল। তারা আশ্বস্ত হল যে, শুক্লার সদয় দৃষ্টি তাদের প্রতি রয়েছে।

যামিনীর মধ্য প্রহরে মৃদু কোলাহলে সদানন্দের নিদ্রা ভঙ্গ হল। তিনি সজাগ হয়ে কীর্ত্তনিয়াকে সজোরে ঠেলা দিয়ে তার নিদ্রা হরণ করলেন। উভয়ের নিদ্রা ভঙ্গ হলে কক্ষের মধ্যে সংবর্তিকার স্তিমিত আলোয় শয্যায় গাত্রোত্থান করলেন। বুঝতে অসুবিধা হল না যে যাত্রার প্রস্তুতি বহিরাঙ্গনে চলছে। তাদের এখন কি করা উচিৎ বোধে আসছে না। অস্থিরতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুক্লা, বলেছিল, যথাসময়ে তাদেরকে ডাকবে। তাহলে এখনও সময় স্থির হয়নি। শুক্লার বিলম্বে ধৈর্যের রেতি ভেঙে গেল। কীর্ত্তনিয়া পর্যঙ্ক থেকে নেমে প্রকোষ্ঠের বাইরে এল। উঠানে শুক্লা দাঁড়িয়েছিল। তার পরিপাটি বসনভূষণ দেখে বুঝতে অসুবিধা হল না যে, সে যাত্রার জন্য রীতিমত প্রস্তুত। কীর্ত্তনিয়াকে কক্ষের বাইরে দেখতে পেয়ে শুক্লা এগিয়ে এসে বলল,

তোমাদের তৈরি হতে বেশি সময় লাগবে না নিশ্চয়।

কীর্ত্তনিয়ার নিদ্রোত্থিত ঘোর শুক্লার কথায় তাড়া খেয়ে চক্ষুপল্লব থেকে ততক্ষণাৎ উধাও হয়ে গেল। সে শুধু বলল,

না। আমরা প্রায় প্রস্তুত।

তাহলে বিলম্ব না করে বহিরাঙ্গনে আস।

শুক্লার হেন আচরণে বিস্ময়ের উদ্রেক হয়। কীর্ত্তনিয়া ভাবল যে, সে যদি বেশ্মের বাইরে না বের হত তাহলে কি তাদেরকে রেখেই শুক্লা যাত্রা করত। শুক্লার নির্মোহ ব্যবহারে এইরূপ ইঙ্গিত স্পষ্ট। পুনরায় নিজের অন্তরকে প্রবোধ মানাতে ভাবল- নিশ্চয়ই শুক্লা এইরূপ আচরণ করত না। সে তো ভাল করেই জানে যে আমরা তার ওপর নির্ভর করেছি। কীর্ত্তনিয়া শুক্লার সঙ্গে কোন বাক-বিত-ায় জড়াল না। প্রকোষ্ঠের ভেতরে গিয়ে সদানন্দকে ত্বরিত প্রস্তুত হওয়ার জন্য বলল।

এক দ-কাল সময়ে উভয় দ্বিজ সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে প্রাঙ্গণে এসে উপস্থিত হল। রাত্রি তখন দ্বিপ্রহর। মন্দিরের অন্যান্য সদস্যবৃন্দের দেখা পাওয়া গেল না। শুক্লা-চন্দ্রার সাথে একজন তন্বঙ্গী দেববালাকে তারা দেখতে পেল। দেববালাকে ইতোপূর্বে মন্দির প্রাঙ্গণে তারা দেখেনি। দেববালার শরীর অতিশয় কৃশ। তার ক্ষাম দেহ দেখে মন্দিরবাসী বলে মনে হল না। মন্দির অভ্যন্তরের সকল দেবদাসী-দেববালাদের শরীর হৃষ্টপুষ্ট। হরিৎ বঙ্গের শ্যামল রমনীর দেহ সৌষ্ঠবের বিপুল অভাব এই দেববালার মধ্যে লক্ষণীয়। দীর্ঘ কৃষ্ণ কেশ পশ্চাদদেশের অধমাঙ্গের উপরিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত। গণ্ড বলতে কিছু নেই, কপাটির দশনপাটি চর্মাবরণের বাইরে থেকে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান। চর্চিত কপালের নিম্নে উল্লম্ব নাসার উভয় পার্শ্বে স্থাপিত নেত্রযুগল তার কোটরের অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে উদ্যত। কনীয়সী দেববালাকে শুক্লা কলমি নামে ডাকছে।

শুক্লার পশ্চাৎ পশ্চাৎ বহির বাটে এসে দ্বিজদ্বয় দেখল তিনটি বৃষ টানা শকটে যাত্রার প্রস্তুতি চলছে। কোনটায় তাদের স্থান সংকুলান হবে বুঝতে না পেরে এক কোণে স্থির দাঁড়িয়ে প্রস্তুতি পর্বের কার্যকলাপ লক্ষ্য করছিল।  সর্বাগ্রে যে শকটটি দণ্ডায়মান তাতে অনেক মালপত্র বোঝাই করা রয়েছে। দ্বিতীয়টিতে প্রধান পুরোহিতের জন্য আয়োজনটি সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হল। এই শকটে প্রধান লম্বোদর কর্তার সাথে অপর একজন ঋষিমুনিকে দেখা গেল। তাদের জন্য যাত্রার সুখ ভোগের যথেষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। সর্বপশ্চাতের শকটে শুক্লা, চন্দ্রা আর কৃশকায় কলমি উঠে বসল। হতভম্ব দ্বিজদ্বয় বুঝে উঠতে পারছিল না, তাদের কি করা উচিৎ। তারা কী বৃষশকটের পশ্চাতে পদব্রজে যাত্রা করবে নাকি তাদের এই যাত্রায় ক্ষান্ত দিতে হবে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় নিশ্চল দাঁড়িয়েছিল কীর্ত্তনিয়া ও সদানন্দ। চতুষ্টয় আরক্ষীবৃন্দ ভূজে পরিঘ, ভল্ল নিয়ে প্রস্তুত। এমন সময় শুক্লার ডাক শুনতে পেল কীর্ত্তনিয়া। শব্দের গতি অনুসরণ করে সেই পানে দৃষ্টি দিল সে। শুক্লা তাকে হস্ত সঞ্চালনে আহবান করছে। কীর্ত্তনিয়া যেন হালে জল পেল। সে দ্রুত পদক্ষেপে শুক্লার সম্মুখে গিয়ে উপস্থিত হল। কীর্ত্তনিয়াকে কাছে পেয়েই শুক্লা ফণিনীর ন্যায় উদগ্র হয়ে বলল,

মহাশয়রা কি পদব্রজে গমন করবেন?

বিমূঢ় কীর্ত্তনিয়া শুক্লার শ্লেষ মাখানো বাক্যে অত্যন্ত আহত হল। কী উত্তর করবে বুঝতে না পেরে বিহ্বল দাঁড়িয়ে থাকল।

শুক্লা নির্দেশ দিল- উঠে বস শকটে। আমার সঙ্গেই পথ চলতে হবে। এই বাক্য শ্রবণে কীর্ত্তনিয়ার অবয়বে প্রসন্নতা ফিরে এল। সে যথাদিষ্ট সদান্দকে ডেকে নিয়ে শুক্লার সাথে বৃষযানে আরোহণ করল। চারজন রক্ষী সহযোগে তিনটি বৃষ শকট গভীর নিশিথে নবদ্বীপের উদ্দেশ্যে যাত্রারম্ভ করল।

প্রত্যেক শকটের শিরোভাগে শৃঙ্গধারী জোড়ায় জোড়ায় বৃষ সংযুক্ত রয়েছে। বিশালাকার ষ- তাদের বৃহৎ ককুদ দুলিয়ে দেহের শক্তি প্রয়োগ করে যানগুলোকে টানতে টানতে সম্মুখ পথে এগিয়ে চলল। শুক্লপক্ষের শেষ নিশীথের ষোলোকলার পূর্ণশশীকে আজ ভীষণ ভাল লাগছিল কীর্ত্তনিয়ার। কেউ কোন রা করছিল না তাই কীর্ত্তনিয়াও নিশ্চুপ শকটে বসে বামে-দক্ষিণে শরীরের দুলুনিতে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছিল। অল্পক্ষণের মধ্যে শকট যানগুলো পোড়া মাটির ইষ্টক নির্মিত সরণি শেষে মাটির পথে নামল। দুধারে গভীর অরণ্যানীর ভূতল পত্রপল্লব ভেদ করে কদাপি চন্দ্রালোকে উদ্ভাসিত হয়। পল্লবে পল্লবে মনোহর আলোর নর্তন। কর্ণপুটে আলোড়ন সৃষ্টিকারী পতঙ্গের ডানা ঝাপটানো ঝিঁ ঝিঁ রবের সাথে শকটের বিশালাকার কাষ্ঠনির্মিত চাকার ক্যাঁচ ক্যাঁচানি, মন বিষিয়ে তোলা অসহায় আর্তনাদ।

কীর্ত্তনিয়ার শকট থেকে নেমে হাঁটতে ইচ্ছা হচ্ছিল। ইচ্ছাটি সবার সমক্ষে ব্যক্ত করল। সকলে মন্তব্য থেকে বিরত রইল। এক ফাঁকে চন্দ্রা যেন স্বগতোক্তি করল,

কেবলমাত্র আরম্ভ। সম্মুখে কত পথ চলার রয়েছে। আমাদেরও হয়ত হাঁটতে হতে পারে। বৃষ্টি নামলে তো আর রক্ষা নাই।

রামনগর ছাড়িয়ে কঙ্কগ্রাম অতিক্রম করে ঘন বিস্তীর্ণ কামকোটি গ্রামের বনাঞ্চল পেরিয়ে পদ্মার পূর্বতট অবধি এই শকটে প্রগমন করতে হবে। সেখান থেকে নৌযানে গঙ্গাপাড়ি দিয়ে পশ্চিম পাড় ঘেঁষে আরও দক্ষিণে অগ্রসর হলে নবদ্বীপের পথ। সব কিছু নির্বিঘ্নে চললে চতুর্থ দিবসে নবদ্বীপে তারা পৌঁছাতে পারবে। বৃষ শকট খাল-বিল ছাড়িয়ে পরের দিবসের মধ্যাহ্নে অকূল নদীর পাড়ে এসে উপস্থিত হল।

ভাটির বিপরীতে নদীতে নৌকা ভাসান যাবে না। পাল না জাগালে দশ জন মাল্লার পালবিহীন নৌকা চালনে কষ্ট অপরিসীম। উজানের অপেক্ষায় অত্রস্থলে কাল অতিবাহিত করতে হবে। গত্যন্তর নাই। সবাই বজরায় চড়ে বসল। পথ চলার শ্রান্তি দূর করতে বিশ্রামের আয়োজন করল। দেবদাসীরা আহারের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। যাত্রার পর শকটে বসে বহনকৃত ঢেকি পিষ্ট চালের অপুপ, ইক্ষুরসের গুড়, রোচনী ভর্তা আর মধুপর্ক দিয়ে আহার সারা হয়েছে। যাত্রায় কোথাও বিরাম নেওয়া হয়নি। পাছে নদী তটে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়।

দুই যাম পর পর নদীতে উজান আসে। এক উজানে নদী পাড়ি দেওয়া যাবে না দ্বাদশ দ-কাল সময়ের প্রয়োজন হবে। তাই মাঝিরা অত্রে সময় নষ্ট করতে চাইল না। মাল্লারা নৌযান নদীতে ভাসিয়ে দিল।

নৌকা নদীতে ভাসান দেওয়ার পূর্বে দুজন মাঝি কাছা বেধে পাড় হাতড়িয়ে কতক পার্শে আর কতক বাগদা এনে দিয়েছিল। বাগদার আবরণ ছাড়িয়ে কটু তেলে ভাজা আর পার্শের চচ্চড়ি দিয়ে তপ্ত শীল ত-ুলের সহযোগে দ্বিপ্রহরে আহার পরিবেশন করল দেবদাসীরা।

কামকোটি গ্রাম অতিক্রম কালে ময়রার কাছ থেকে শুক্লাকে ঘন গোদুগ্ধ আর ছানা সংগ্রহ করে দিয়েছিল কীর্ত্তনিয়া। নদীর জলে ভাসমান নৌকায় সকলে তৃপ্তি সহকারে সেই মিষ্টান্নসমূহ, সরযুক্ত ঘনদুগ্ধ আর পাকা কদলী দিয়ে আহার ভোগ করেন।

আহারের পর অষ্টজন মাল্লা ছন্দোবদ্ধ বৈঠা চালিয়ে নৌযানকে তরতর বেগে আগিয়ে নেয়। ভানুর প্রতাপে পরিশ্রম কিঞ্চিৎ অধিক। জলে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে উষ্ণতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মাল্লারা মাথায় মাথাল দিয়ে একভাবে বৈঠা চালিয়ে যাচ্ছে।

ক্ষণে ক্ষণে ধেয়ে আসা নদীর বাতাসে ক্ষেপনী ঠেলার পরিশ্রমের অনেকটা লাঘব হয়। একজন বলিষ্ঠ প্রবীণ নৌযানের পুচ্ছ গলুই-এ দাঁড় ধরে বসলেন। অন্য মাল্লারা বজরার উভয় পার্শ্বে বৈঠা চালনায় নিমগ্ন হল। নৌকার সম্মুখস্ত গলুই-এ মশাল প্রজ্জ্বলিত। মাস্তুল উল্লম্ব করে বাঁধা রয়েছে। বায়ু প্রবাহের গতি অত্যন্ত ক্ষীণ থাকায় নদীতে তরঙ্গ নেই। পাল তোলা হয়নি।

বজরার ভেতরে দাসী-বালা ত্রয়ী এবং দুই জন ঋষি অবস্থান নিলেন।  দুজন প্রহরী আর তিনজন শকটচালক নৌযানে আরোহণ করেনি। তারা ফিরে গেছে নিজেদের আবাসস্থলে। দুজন আরক্ষী সঙ্গী রয়েছে। তারা  দাঁড়ির সম্মুখে বজরার পাটাতনে বসে গল্প শুনতে ব্যতিব্যস্ত। কীর্ত্তনিয়ার বজরার খুপরিতে যেতে ইচ্ছা করছিল না। সদানন্দকে সঙ্গী করে বজরার প্রশস্ত ছইয়ের পুবদিকে বসল। ত্বিষাম্পতি তখন স্বৌজঃ হারিয়ে পশ্চিম দিগন্তে ঢলে পড়েছে।

সুঠাম দেহের মাল্লাদের নিরলস বৈঠা চালনায় সম্মুখ পানে দুর্বার এগিয়ে চলে বজরার আরোহীসকল। মেঘবিহীন পশ্চিম দিগন্তে রক্তিম থালার মত সূর্যটা একসময় টুপ করে জলে ডুবে গেল। গুটি গুটি পায়ে, সন্তর্পণে সমস্ত অন্তরীক্ষ ব্যাপে মেদুর আঁধার ঘনিয়ে এল।

কৃষ্ণপক্ষের তৃতীয় যামিনী। অম্বর ছেয়ে সহস্র অযুত নক্ষত্রের মিটমিটানি। কীর্ত্তনিয়া বজরার বিস্তৃত ছইয়ের উপরে উত্তানশয়নে নক্ষত্র গোনার বৃথা চেষ্টায় রত। বেশ মজার ক্রীড়া। গুনে শেষ করা যায় না। কেবলি খেই হারিয়ে যায়। কীর্ত্তনিয়ার নক্ষত্রের সাথে পরিচয় নেই। তবু সুযোগ পেলেই এই তারকা গণনে আহ্লাদিত হয়।

পশ্চাতের গলুই-এ বলিষ্ঠ বাহুতে দাঁড় দ- আঁকড়ে ধরে দণ্ডায়মান মাঝি আঞ্চলিক সুরে গেয়ে উঠলেন। এটি সাম্যগান বা মার্গ সঙ্গীত নয়। সম্পূর্ণ দেশীয় সুর। এখানে আলাপ, তান, লয়, মূর্ছনা প্রভৃতি অলঙ্কারের সমাবেশ নাই। নদীর জলে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ আর মাঝির ক্ষণে ক্ষণে বিরতি দিয়ে গেয়ে ওঠা গানের শব্দগুলো পাড়বিহীন জলের কল্লোলে ধেয়ে ধেয়ে দূরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নদীতে বিরাজমান বিক্ষিপ্ত বায়ু দিগ্বিদিক সেই শব্দগুলোকে যেন আঁচড়ে ফেলছে। জলতরঙ্গের শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে পুবে পশ্চিমে উত্তরে দক্ষিণে বায়ুতে লম্ফ-ঝম্ফ সুরের খেলা। এই অনুপ দেশের নদী-পাড়ের জনগোষ্ঠীর প্রাণের সুর ভাটি-আলি।

নদী পাড়ি দিতে দীর্ঘ সময় বয়ে গেল। উজান বেয়ে নৌযান অনেকটা দক্ষিণে চলে গিয়েছিল। তাই মাল্লারা পুনর্বার পাল নামিয়ে বিপরীত দিকে গুনটানা আরম্ভ করে। ঘাটে উপস্থিত হতে হতে রাত্রি গভীর হয়ে গেল। ঘাটে কোন লোকজনের উপস্থিতি ছিল না। অদ্য হাটবার ছিল। তত্রাপি লোকের উপস্থিতি নেই। মাত্র দুটি নৌযান ঘাটে নোঙর করে আছে। যে কোন সময় তারা নৌকার পাল তুলে দেবে। ঘাটে রাজরক্ষীদের পাওয়া গেল না। তারা উপস্থিত নেই কেন? রাজরক্ষীদের অনুপস্থিতি কিছুটা ভাবিয়ে তুলল সকলকে। পোতের অর্ধ ক্রোশ দূরে একটা পান্থশালা আছে। মাল্লাদের সঙ্গী হতে অনুরোধ করলে তারা নিজেদের অপরাগতা নিবেদন করল। অগত্যা সঙ্গে আনা বস্তুসমূহ নিজেদের মধ্যে বন্টনপূর্বক নিজেরাই বহন করে অর্ধক্রোশ দূরত্বের পান্থনিবাসের উদ্দেশ্যে ঘাটস্থান পরিত্যাগ করলেন।

জনমানবহীন পান্থশালায় মাত্র দুটি কক্ষ। তল্লা বাঁশের রেতি দিয়ে তৈরি। চতুর্পার্শ্বে ঘনবন। অদূরে মাটির স্তূপ পরিবেষ্টিত  রন্ধনশালা। তার অল্প ব্যবধানে খননকৃত কৌপ। কৌপ্যের অস্তিত্ব পেয়ে সকলে আশ্বস্ত হলেন। রাজরক্ষীরা উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত অত্র স্থানে দিবস অতিবাহিত করা যাবে। কীর্ত্তনিয়া একটি মশাল প্রজ্জ্বলিত করে সদানন্দকে সঙ্গে নিয়ে অধিশ্রয়ণীর নিমিত্ত কাঠ সংগ্রহ করতে বনের গহনে গেল। কতক সময় পর পান্থশালায় সৃষ্ট হট্টগোল ও উচ্চরব পেয়ে দ্বিজদ্বয় খড়কুটা ফেলে দিয়ে দ্রুত ধাবনে পান্থনিবাসের সম্মুখে উপস্থিত হল।

একজন প্রভারুণ বর্ণ চোখের ভীমসদৃশ পুরুষ তার দক্ষিণ হস্তে চন্দ্রা ও বাম হস্তে শুক্লার উরোজবক্ষ আপন অঙ্গের সাথে দৃঢ় ধরে রেখেছে। এই অনার্য কৃষ্ণপুরুষের সবল বাহু বন্ধনে দুই অবলা বন্দিনী হরিণীর ন্যায় হাঁসফাঁস করছিল। অপর দুই দস্যু পুরোহিতদ্বয়কে উপুড় করে আড়মোড়ায় হস্তযুগল গ্রন্থিত করার কর্মে লিপ্ত। হতবাক পুরোহিতদ্বয় অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন। সদানন্দ ও কীর্ত্তনিয়া অঘটন ঘটনায় বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। প্রেক্ষাপট বুঝতে দুই পল সময় নিল। আরক্ষীদের কোথাও দেখা যাচ্ছিল না। কীর্ত্তনিয়া হঠাৎ মশাল হস্তে ধর ধর চিৎকার করে দেবদাসীদের উদ্ধারের প্রয়াসে অগ্রসর হল। তইখন হঠাৎ পশ্চাৎ থেকে কেউ প্রচণ্ড শক্তিতে তার মস্তকে দণ্ডাঘাত করল। কিছু বোধগম্য হওয়ার পূর্বেই তার হস্তে ধৃত মশালদণ্ড ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল।

আঁধার ধরিত্রীর বুক ভরে নিবিড় তিমির- ভূলুণ্ঠিত কীর্ত্তনিয়া অকস্মাৎ উপলব্ধি করল। ঘোর অন্ধকারেও দিব্যি পথে চলাচল করা যায়। এখন যে পদযুগল আড়ষ্ট হয়ে রয়েছে। তার চলৎশক্তি বিহীন পদযুগলের শুধু বাম প্রপদের অঙ্গুষ্ঠ ধরণীর বুকে আঁচড় কষতে ব্যস্ত। খুব নিকট থেকে নারীকণ্ঠের চিৎকার না শীৎকার শোনা যাচ্ছে। …কার কণ্ঠ? শুক্লার! চন্দ্রার! স্মৃতিতে ভেসে উঠছে স্মার্ত বাসুদেবের দর্শনÑ তিমিরেরও রূপ রস বাস আছে। কই সে রূপ? কই সে রস? কই সে ঘ্রাণ? কিছুই নেই, শুধুই অনন্ত শূন্যতা। সহসা শুধু সুখদায়ক পরশ অনুভব হচ্ছে। কার পরশ? মায়ের? আহ!

চার জন দস্যু আক্রমণ করেছিল এই তীর্থযাত্রীদের। একজনের কাছে শুক্লা আর চন্দ্রা ধৃত ছিল। চতুর্থজন আরক্ষীদের এলোপাথাড়ি আঘাত করে কৌপের জলে ফেলে দিয়ে পান্থনীড় প্রত্যাবর্তনকালে কীর্ত্তনিয়ার উদ্ধত আচরণে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পশ্চাৎ থেকে তার মস্তকে প্রবল বেগে দ-াঘাত হানে। কীর্ত্তনিয়া ভুলুণ্ঠিত হলে নিরীহ সদানন্দকে সে দড়ি দিয়ে আষ্ঠেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে। হতবিহ্বল সদানন্দ প্রতিহত করার কোন চেষ্টাই করেননি। দস্যু দল পুরুষ যাত্রীদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে শুক্লা, চন্দ্রা ও কলমির ওপর পর্যায়ক্রমে উপগত হয়। রমণীদের নির্দয়ভাবে রমণ করে যাত্রীদলের সর্বস্ব নিয়ে পলায়ন করে। শুক্লার জীবনে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। সে তার পূর্ব অভিজ্ঞতাকে অত্রকালে কাজে লাগিয়ে আপন ওষ্ঠকে পেষণে-পেষণে ক্ষত বিক্ষত করে সম্ভোগ যন্ত্রণাকে সহ্য করে। কিন্তু চন্দ্রা আর কলমির শীৎকার আর্তনাদ কীর্ত্তনিয়ার শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করে কোমল হৃদয়ে আলোড়ন তুলছিল। দস্যুদল চলে যাওয়ার অব্যবহিত পরেই শুক্লা বিস্রস্ত বসনে এসে কীর্ত্তনিয়ার অবশ দেহ নিয়ে কবোষ্ণ ক্রোড়ে তুলে নেয়। নাসারন্ধ্র নিঃসৃত তপ্ত শোণিতধারা আর মুখগহ্বরের কিণ্ব শুক্লা তার বসনাঞ্চল দিয়ে গভীর মমতায় পরিষ্কার করার সময় কীর্ত্তনিয়া পরিনির্বাণ লাভ করে।

চন্দ্রা কিয়দকাল পর আত্মস্থ হয়ে বাঁশের নির্মিত খুপরি থেকে বেরিয়ে এসে পুরোহিতদের প্রথমে মুক্ত করে তারপর শুক্লার নিকটে এসে কীর্ত্তনিয়ার প্রাণহীন নিথর শরীর দেখে ডুকরে ক্রন্দনে রত হয়। সদানন্দকে মুক্ত করার বিষয় আর মনে থাকে না। পুরোহিতদ্বয় বহিরাঙ্গনে এসে কীর্ত্তনিয়ার পরিণতি লক্ষ্য করেন তদন্তর সদানন্দকে মুক্ত করেন। সম্মিত্র সদানন্দ বন্ধন মুক্ত হয়ে পরিস্থিতির আকস্মিকতায় অসাড়, নিস্পন্দ অবস্থায় তত্রস্থলেই বসে থাকেন। উপপাতে নিজের কর্তব্য কর্ম স্থির করতে পারছিলেন না। প্রধান পুরোহিত ও তার সঙ্গী সন্ধান করে আহত আরক্ষীদের যন্ত্রণা কাতর অবস্থায় কৌপ্য থেকে উদ্ধার করেন।

বিদগ্ধ সকলে কীর্ত্তনিয়ার চতুর্পার্শ্বে অবস্থান নিয়ে সমস্ত রাত্রিকে কলির কাল থেকে হরণ করে নিল। শুক্লা নীরবে অঝোর ধারায় চক্ষুনীর বিসর্জন দিল। নক্ষত্র খচিত উন্মুক্ত অম্বর তলে দেবদাসীর অন্তরের গহীন থেকে উৎসারিত গভীর ভালবাসায় প্রাণহীন কীর্ত্তনিয়া সমস্ত রাত্রি সিক্ত হতে থাকে।

কীর্ত্তনিয়ার শেষকৃত্যকালে তার স্কন্ধের ঝুলি থেকে কতক টঙ্কা ও দুটি সুবর্ণমুদ্রা পাওয়া যায়। এই অর্থ আবিষ্কার হলে কপর্দক শূন্য যাত্রীদের সুডৌলে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে।

 

১৩.

সদ্য ঋতুবতী রোহিণী পদ্মাবতী তরাসে কম্পমান শুষ্ক অবয়বে মায়ের সন্নিকটে শরীরের শোণিত নিঃসরণের ক্রিয়া অবহিত করে। শুকতারা এই সংবাদে দুইবাহুর বেষ্টনে পদ্মাবতীকে নিয়ে তার ললাটে চুম্বন করেন এবং শিকায় ঝুলন্ত ভা-গহ্বরে হস্তচালনা করে নারিকেল-গুড়ের নাড়ু তুলে এনে মেয়ের মুখ ভরিয়ে দেন। দুহিতা অবাক বিস্ময়ে মায়ের চোখে চেয়ে থাকে। তার শরীরের রক্তক্ষরণের সংবাদে মায়ের উচ্ছ্বাস তাকে আশ্চর্যান্বিত করেছে। ভেবে কূল পায় না। শুকতারা তাকে হতবিহ্বল অবস্থায় দক্ষিণ হস্তে ভা- ভর্তি মিষ্টান্ন নিয়ে এক প্রকার টানতে টানতেই পাষাণময়ী অর্ধনারীশ্বর দেব সমীপে উপস্থিত হয়ে করযুগল সন্নিবেশিত করে কন্যার মঙ্গল কামনা করেন। আর মিষ্টান্ন প্রসাদ-ভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দেন দেবের পাদপদ্মে। দেব সম্মুখে উপস্থিত সকল ভক্তের মুখে নৈবেদ্য’র মিষ্টান্ন তুলে দিতে হবে। ভীষণ হরষে শুকতারার প্রাণ উদ্বেলিত।

শুকতারার সমস্ত দিবস হরষে-বিষাদে একাকার। কন্যাটি ঋতুবতী হয়ে গেল! তিন শকাব্দ ষষ্ঠ চন্দ্রের সপ্তদশ দিবস অতিক্রান্ত হয়ে গেছে কীর্ত্তনিয়া প্রত্যাগমন করল না। এখনই উপয্ক্তু সময় পদ্মাবতীর পাণি গ্রহণ করার। কন্যাটি কদলী কাণ্ডের ন্যায় দ্রুত ফেঁপে উঠেছে।

অত্র দিবাগত রাত্রে দৈর্ঘ্যে দশ প্রস্থে দ্বাদশ হস্ত পরিসরের শয়নকক্ষে গাম্ভারী পালঙ্কে কার্পাসের নরম শয্যায় আলিঙ্গনাবদ্ধ ব্রাহ্মণী ফিস ফিস করে বললেন,

স্বামীন, আলিঙ্গণমুক্ত কর, একটি সুসংবাদ দেওয়ার আছে।

সুখাক্রান্ত বাসুদেব পরবর্তী সুখের আশ্বাসে বিশ্বাস না করে অতিশয় গভীর বন্ধনে স্ত্রীকে আবদ্ধ রাখলেন।

শুকতারা বাহু অবরুদ্ধ থেকেই বললেন, বাহুমুক্ত কর। মেয়ের কথা ভাব। আমাদের মেয়ে যে ঋতুবতী হল।

এইটুকু বলেই ব্রাহ্মণী ক্ষান্ত দিলেন। ততক্ষণাৎ বুঝতে পারলেন না ব্রাহ্মণ। ইষৎ সময়োত্তীর্ণ হলে কথাগুলো কর্ণকুহরে প্রবেশ করে হৃদয়ে আলোড়ন তুলল। ধীরলয়ে বাহুবন্ধন শিথিল হয়ে পড়ল। পরম প্রণয়িনী সহধর্মিণী স্বামীর দুর্ভেদ্য প্রণয় বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে শয্যায় উঠে বসলেন। দীর্ঘ কুন্তলরাজি দুবাহুর সহায়তায় মস্তকের পেছনের উপরিভাগে অদ্ভুত দক্ষতায় কানড় করলেন। দ্বিযুগ লালিত অনাবৃত বিস্রস্ত স্তনযুগল কুঞ্জবন্ধনে আবৃত করে কক্ষটিকে আলোয় উদ্ভাসনের জন্য সংবর্তিকা উসকে দিলেন। নিগূঢ় অন্ধকার অন্তর্হিত হল। কম্পমান ম্লান আলোয় ধনিনী শুকতারা কম্পিত স্বরে বললেন,

কীর্ত্তনিয়ার সন্ধান করাটা অতীব প্রয়োজন।

সেই যে কীর্ত্তনিয়া গেল আর ফিরল না। বাসুদেব তাকে সন্ধানের একাধিকবার মনোবাঞ্জা পোষণ করেছেন কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেটা হয়নি। গুণধর কীর্ত্তনিয়াকে প্রথম সাক্ষাতেই তিনি হৃদয়ে স্থান দিয়েছিলেন। এভাবেই একটি ভ্রান্ত সমীকরণে মেতে উঠে কীর্ত্তনিয়ার সাথে পদ্মাবতীর বিবাহের ইচ্ছাকে লালন করেন। বাসুদেব ভেবেছিলেন কীর্ত্তনিয়া তার জ্ঞান গরিমায় আসক্ত হয়ে অত্রস্থলে তার কাছেই অবস্থান করবে। বেদ শাস্ত্র চর্চা করবে। পদ্মাবতীর রূপ লালিত্যে শিবনেত্র কীর্ত্তনিয়া পরাভূত হবেই। অত্রত্য সে রকম কোনটাই হয়নি। তাই নিজের ভ্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর বীতশ্রদ্ধ বাসুদেব চিন্তিত না হয়ে মেয়ের শিক্ষার প্রতি মনোনিবেশ করেছেন। দীক্ষা দিয়ে কন্যাকে গুরুজ্ঞানে সমৃদ্ধ করে প্রজ্ঞাবান করবেন।

বাসুদেব নিশ্চুপ থাকলেন। এই সুসংবাদ তাকে চিন্তাযুক্ত করল। কীর্ত্তনিয়ার সন্ধান করা প্রয়োজন। কীর্ত্তনিয়াকে কখনও কোন প্রকার দুশ্চরিত্রের অধিকারী মনে হয়নি। বাসুদেবের সম্মতি নিয়েই উভয় ব্রাহ্মণ ঋষি-মুনির সন্ধানে যাত্রা করেছিল। দুই বৎসরের মধ্যে ফিরে এসে পদ্মাবতীকে সঙ্গে করে কাছাড়ে পিত্রালয়ে ফিরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে গেছে। তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাল বিলম্ব হয়ে গেছে। হেন আচরণ মর্মাহত করে বাসুদেবকে। মাঝে মধ্যে তিনি ভেবেছেন জামাতার সন্ধান কীভাবে করা যায়! কিন্তু উদ্যোগ নেননি। এক্ষণে স্থির করলেন কীর্ত্তনিয়ার নিবাসভূমি ত্রিপুরাতে দূত পাঠাবেন।

নেত্র থেকে তার নিদ্রাহরণ হল। মনের পরিস্থিতি ভয়াবহ। বিলাস মনোভাব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জম্পতি কুটির অভ্যন্তর থেকে নিষ্ক্রমণ হয়ে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এসে উপস্থিত হলেন। কাষ্ঠ নির্মিত পিড়ি পেতে দিলেন শুকতারা। বাসুদেব জ্যোতিষীর অভ্যাসানুযায়ী ঊর্ধ্বপানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ সর্বত্র প্রদক্ষিণ করল তার নিরীক্ষণ। ন্যগ্রোধ মহীরুহের শাখা-পত্র অম্বয়ীষের অনেকটাই দৃষ্টির আড়ালে রাখল। বিগত যামিনীগুলোতে যেরূপ পুঙ্খানুঙ্খ পরখ করেন অদ্য তদরূপ হল না। অন্তরের অন্তঃস্থলে কিঞ্চিৎ বেদনা অনুভূত হচ্ছে। এই বেদনা শারীরিক না মানসিক তাও সঠিক অনুধাবিত নয়। কদাচ শরীরের কদাচ হৃদয়ের, দ্বৈত যাতনায় পিষ্ট ব্রাহ্মণকে ঈষৎ চিন্তিত করে তুলেছে এই হর্ষণ সংবাদ।

ব্রাহ্মণীর হর্ষটাই অধিকতর। ত্রি অব্দাধিককাল বিগত হল কীর্ত্তনিয়ার কোন সংবাদ আসেনি। মন্দ ভাবনা বোধাচ্ছন্ন করল। ছিঃ ধিক্কারে এই বিরূপ ভাবনাকে বিতাড়িত করে সোমত্ত কন্যার জন্য হৃদয়ে উত্থিত হর্ষকে লালন করতেই মনস্থ করলেন। শুকতারার দৃঢ় বিশ্বাস যে কীর্ত্তনিয়া যথাসময়ে প্রত্যাবর্তন করবে। সে তো আর জানে না যে নবমবর্ষীয়া পদ্মাবতী এখনই স্বামীর সঙ্গে নিশিযাপনের উপযুক্ত হয়েছে। জানতে পারলে তড়িৎ এসে উপস্থিত হবে। পুরুষের অন্তরক্রিয়া যথেষ্ট জানেন তিনি। পদ্মাবতীর সমাগত রূপ-যৌবন কীর্ত্তনিয়া অনুধাবন করেই পরিণয়াবদ্ধ হয়েছে বলে নিশ্চিত শুকতারা।

হৃদয়ের সঙ্গে যুদ্ধ সংগ্রামে লিপ্ত থেকে শুকতারা তাম্বুল হস্তে বাসুদেবের কাছে এসে উপস্থিত হলেন। শুকতারার মৃদু ভাষণে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বাসুদেব স্ত্রীর পানে ফিরলেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ অবধানে শরীরে কম্পন হল। শুকতারার প্রসারিত দক্ষিণ নগ্নবাহুর প্রান্তে চম্পক কদলী সদৃশ আঙুলের ফাঁকে গুয়া আর তাম্বুল পল্লবের একটি খিলি দেখতে পেয়ে স্ব দক্ষিণহস্ত উৎসারিত করে বাসুদেব সেটা গ্রহণ করলেন। অনেকদিনের ব্যবধানে মৃগনাভীর কস্তুরিকার একটি কণা তাম্বুল পল্লবে স্থাপন করে দিয়েছেন শুকতারা। মদির ঘ্রাণে নিশির তিমির বায়ু প্রমোদিত। শুকতারা চাপটি খেয়ে বসে স্বামীর সম্মুখে অবস্থান নিলেন। ব্রাহ্মণ মৃগনাভীর ঘোরে আবিষ্ট চিন্তাশক্তি রহিত হয়ে তাম্বুল চর্বনে মনোনিবেশ করেছেন। অবশ দেহটা সতেজ হয়ে উঠছে। ভারাক্রান্ত চিত্তে রুধির সঞ্চালনের গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকক্ষণ নিশ্চুপ থেকে শুকতারা মৌনতা ভঙ্গ করে আকুতির স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

হ্যাঁ গো কীর্ত্তনিয়াকে সংবাদ দেওয়া যায় না?

নিরুত্তর বাসুদেব চর্বিতচর্বণে ব্যস্ত। ভাবলেন, বললেই তো আর এদিক-সেদিক দূত প্রেরণ সম্ভব নয়- রাজাধিরাজ তো নই!

 

১৪.

পদ্মাবতী কীর্ত্তনিয়ার জন্য অপেক্ষা করেছে দীর্ঘকাল। বিরহ নয় ভালবাসার আকক্সক্ষায় ষষ্ঠ শকাব্দ অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। কীর্ত্তনিয়ার কোন সন্ধানই পাওয়া যায়নি। বাসুদেব জায়ার ক্রমাগত ইন্ধনে কাছাড়ে পত্রবাহক পাঠিয়েছিলেন। তথায় কীর্ত্তনিয়া ফেরেনি। মাতা শ্রীমতি মৃন্ময়ী সর্ব শ্রবণে পুত্রবধূকে পাঠিয়ে দিতে বাসুদেবের সংকাশে পত্রে অনুরোধ ও ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। লিখেছেন :

শ্রী শ্রী বাসুদেব মহামহোপাধ্যায় বৈদান্তিক বৈদুষ্য রাজন্যের শ্রী চরণে প্রণাম। আপনার বিসৃষ্ট পত্র হস্তগত হওয়ায় সুখোদয় হইয়াছে। অস্মদাদি কীর্ত্তনিয়ার সন্ধান পাইতে বিশেষ উৎসুক রহিয়াছি। চতুঃবৎসরাধিককাল বিগত হইয়াছে। তার মুখশ্রী বিস্মৃত প্রায়। অনুমতি প্রার্থনালব্ধ সম্মতি সাপেক্ষে সে স্বভূমি ত্যাগ করিয়াছিল। অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল যে, অতিসত্ত্বর পর্যটন সমাপ্ত করতঃ গৃহে প্রত্যাবর্তন করিবে। বহিরদেশে উর্ধ্বে বর্ষ দুই অধিষ্ঠানের পরিকল্পনা করিয়াছিল। নবদ্বীপের সন্ধান আমাদের জ্ঞাত নয়। আপনার পত্রপাঠে তার পরিণয়ের সংবাদে বিশেষ উপশমিত হইলাম। তত্রাপি আপনার সমীপে দুটি অনুরোধ জ্ঞাপন করিতে দুঃসাহস অনুভব করিতেছি। প্রথমত, নবদ্বীপে কীর্ত্তনিয়ার অনুসন্ধান করতঃ তার সন্ধানের সুসংবাদ আমাদের অনতিবিলম্বে অবহিত করিবেন। দ্বিতীয়ত অনুযোগ প্রকাশ করিতেছি যে, আমার পুত্রবধূ সম্পর্কে আপনার প্রজ্ঞাময় পত্রে বিসারিত তথ্য পরিবেশন থেকে বিরত রহিয়াছেন। তথাপি পুত্রবধূর সংবাদে আমি আহ্লাদিত। বালিকার সংসর্গ পাইবার দুর্বার ইচ্ছাকে প্রশমন করা দুরূহ হইয়া পড়িয়াছে। দয়াপরবশ আপনার কন্যাকে স্বয়ং আমার কুঠিরে নিয়া আসিয়া আতিথেয়তার সুযোগ প্রদান করিবেন। আমার সুপুত্রের চন্দ্রাসম বধূকে সন্নিকটে পেয়ে পুত্রশোক বহুলাংশে রহিত হইবে বলে বিশ্বাস। যেযাবৎ জীবিত থাকিব তত্তাবৎকাল আপনার কন্যার দায়ভার আমার ওপর ন্যস্ত থাকিবে। অতিশয় কুশলে থাকিবেন। ইতি শ্রীমতি মৃন্ময়ী হিড়িম্বা।

বাসুদেব মহাবিপাকে পতিত হলেন। কীর্ত্তনিয়ার অবর্তমানে পদ্মাবতীর তথায় গিয়ে কাজ নেই। দুলালী দূহিতা নিজ গৃহেই থাকুক। বাসুদেব জম্পতির এটাই সিদ্ধান্ত। পিতার সিদ্ধান্তে পদ্মাবতীর বক্ষের জগদ্দল পাথর সরে গেল। হাঁফ ছাড়ল বালিকা। অত্রে মাতা-পিতার সান্নিধ্যই যথেষ্ট মধুর।

নব যৌবন সম্ভারে সমৃদ্ধ পরিণীতা পদ্মাবতী মাঝে মধ্যে স্বামীর কথা স্মরণ করে। তার কি কখনও বধূর কথা অন্তরে উদয় হয়? সে যদি আসত তাহলে পদ্মাবতী প্রণয়াবদ্ধে বিভোর থাকত। তার রূপ আর পল্লবিত যৌবনই শুধু নয় জ্ঞানের গরিমাও যে অফুরন্ত।

দ্বিজ তুমি কোথায়!

ছোট শার্শিতে নিজেকে আপাদমস্তক দেখে অস্ফুট বেরিয়ে আসা বাক্যের মধুর ধ্বনি আরক্তিম কর্ণমূলে প্রবেশ করে। শিহরিত সর্বাঙ্গে লজ্জত ভাব। নাসারন্ধ্রের চূড়ায় ঘর্ম বিন্দু। শার্শিতে নিজের সদ্য প্রস্ফুটিত অঙ্গ দেখার সাহস বিধৌত। ত্বরিৎ শার্শিটা পেটরার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখল। আপ্লুত চিত্ত। শিহরণের আবেশে অর্ধ নিমিলিত চোখে রসাল অধরদ্বয় সন্তর্পণ লয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

এই শার্শিটা পদ্মাবতীর সদ্য সম্পর্কিত দাদু উপহার দিয়েছেন। শার্শিতে আপন অবয়ব দেখে বিহ্বল হয়ে পড়ে বালিকা। সকল কর্ম ব্যতিরেকে কেবলি নিজের শ্রীমুখ দেখে। দাদুও মহাখুশি। পদ্মাবতীর কা- দেখে রঙ্গ করে বলেন,

মেনকা দেবী আপন চেহারা বার বার শার্র্শিতে দেখলে দৃষ্টি লাগবে যে! দেখার মানুষ তাহলে দেখবে কী?

পদ্মাবতী উত্তর করে না। দাদু এইরূপে আদর সম্ভাষণ করেন। অল্পকালেই দাদুর সান্নিধ্যে সে সুখে বিভোর। মনে হয়, কতকালের পরিচয়। নাড়িতে নাড়িতে কী এক ভীষণ টান আর হৃদয়ে হৃদয়ে দুর্বার দোলা। অসামঞ্জস্য বয়সী নর-নারীর প্রণয় ক্রীড়ায় স্বর্গীয় অনুভূতি। যেন শোণিত সম্পর্ক।

দাদুকে সে বলপূর্বক তার কুঞ্জে ধরে নিয়ে এসেছে। এক দিবস-ঢলা গোধূলির শেষ লগ্নে সখী শ্রাবন্তির বাটি ছেড়ে নিজ কুঞ্জে প্রত্যাগমনকালে পথিমধ্যে এই দাদুর সম্মুখস্থ হয় পদ্মাবতী। একটি পট্ট খ-ে অধমাঙ্গ আবৃত দাদুর। স্কন্ধে দোলায়মান একটি আনদ্ধ বাদ্যযন্ত্র। ইতোপূর্বে এই রূপ কোন যন্ত্র সে দেখেনি। দাদুর বাম হস্তে কমঠ আর দক্ষিণ হস্তে ডমরু। ঋষি ডম্বরুতে ক্ষণে ক্ষণে বোল তুলে অগ্রসর হচ্ছিলেন। পদ্মাবতী পশ্চাতে পশ্চাতে ব্যবধান রেখে পাদবিক্ষেপ করছিল এবং লক্ষ্য রাখছিল এই প্রীণ ঋষির গতিবিধি। সে অনুমান করেছিল যে, এই ঋষি অবধারিত তাদের বাটিতে যাবেন। কিন্তু মুনিমানব আপন মনে পুবের পথ ফেলে উত্তরে অগ্রসর হতে থাকেন। পদ্মাবতী অল্পক্ষণ দ-ায়বৎ ইতস্তত করল। অতঃপর রুদ্ধশ্বাস ধাবনে ঋষির সম্মুখে গিয়ে নিজের দক্ষিণ-বাম দুবাহু দুপ্রান্তে প্রসারিত করে সন্ন্যাসীর পথ রোধ করল। অবাক সন্ন্যাসী বললেন,

কী চাই মাতঃ? কি হেতু আমার পথ রোধ করলে?

পদ্মাবতী কোন সম্ভাষণ, সম্বোধন করল না। বলল,

তুমি আমাদের কুঞ্জ পশ্চাতে ফেলে এসেছ।

তাতে কী? মাতঃ! আমি তো তোমাদের কুঞ্জে অধিষ্ঠানের ইচ্ছা পোষণ করছি না।

তদর্থ তুমি আমাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে এই পথে আসনি?

সঠিক বলেছ মাতঃ।

তুমি অর্ধনারীশ্বর দেব-এর দর্শন করবে না?

আমার যে কোন দেব দেবী নেই মাতঃ।

অর্ধনারীশ্বর দেব-কে কেউ দর্শন না দিয়ে অত্র অঞ্চল পরিত্যাগ করে না।

মাতঃ, আমার আরাধনা বিগ্রহে নয়, পথ পরিক্রমায়।

বিগ্রহে পুজা দিতে তোমাকে আগ্রহান্বিত করছি না।

তবে মাতঃ আমার কর্ম আমাকে করতে দাও।

সেই কর্ম সম্পাদন করতেই তোমাকে আমাদের কুঞ্জে যেতে হবে।

আমাকে ক্ষমা কর মাতঃ।

তোমাকে মার্জনা তৎকালে করব যৎকালে তুমি আমাদের কুঞ্জে অবস্থান করবে।

মাতঃ আমি তোমার ব্রতকথা অনুধাবন করতে পারছি না।

প্রীণ ঋষি একবারও মা ব্যতিত পদ্মাবতীকে অন্য কোন সম্বোধন করেননি। অহংবুদ্ধিসম্পন্ন পদ্মাবতী সন্ন্যাসীকে পিতৃবৎ তুল্য না করে জাতিস্মর সম্বোধনে আখ্যায়িত করল। বলল,

আমার কথা বুঝতে পারছ না দাদু?

না মাতঃ।

তোমাকে যে আমার অনেক প্রয়োজন।

কেন মাতঃ?

কেন প্রয়োজন? তবে শোন-

পদ্মাবতী তার বাম হস্তে আপন কর্ণ লতিকা ক্ষিপ্রতার সংগে ধরে কল্ম  াষ  গৌধুলীর স্তিমিত আলোয় বৃক্ষের দিকে দক্ষিণ বাহু উত্থিত করে উদীক্ষণে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কণ্ঠে মার্গসঙ্গীতের উদগ্রাহ তুলল। মুহূর্তে নির্জন স্থৈর্য তমাল-তরুতল তার কম্পিত স্বরের মূর্ছনায় চঞ্চল হয়ে উঠল।

পবনে পবনে সুরের নর্তন। সর্বত্রই যেন প্রাণের স্পন্দন থরথর কম্পন করছে। অরণ্যচারী অধ্যাত্ম শান্তিকামী ঋষির অরণ্যগেয়গান বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি একাধিকবার মথুরা বৃন্দাবনে পরিভ্রমণ করেছেন। সেখানে দীর্ঘকাল অবস্থান করেছেন। বিপ্রকীর্ণ, শ্রীবিলাস, পঞ্চভঙ্গি, পঞ্চানন প্রভৃতি প্রবন্ধের পাঠ নিয়েছেন, তার শুদ্ধ কলা আয়ত্ব করেছেন। রাগরাগিনীযুক্ত তার গান বিশুদ্ধতার শিখরে অবস্থান করে। নামগান, গুরুভক্তি, সংসার বৈরাগ্য, জীবে প্রেম এবং ভগবানে আত্মসর্ম্পণ বা ভেদবুদ্ধি বিসর্জনের বাণী প্রচার করতে জীবন উৎসর্গ করেছেন। অনেক ভ্রমণ করেছেন তিনি। শ্রীকৃষ্ণ-রাধার লীলাভূমি থেকে পৌ-্রবাসীর মহিমান্বিত ঐতিহ্য কর্ষণ করে সমতট-রাঢ়-বঙ্গের বনবাদাড়ে মুক্ত বিহঙ্গের মতো যত্রতত্র ঘুরে বেড়িয়েছেন। কিন্তু এই যৌবনোদয় যুবতীর কণ্ঠে ধ্রুবকার কম্পিত স্বর তার অন্তঃকরণকে বিমোহিত করে দিল। সন্ন্যাসীর ধূম্র-ধুমল নয়ন বিস্ফারিত। সুরের মূর্ছনায় অধ্যাত্ম ঋষির তন্ময় দুনয়ন বেয়ে অশ্রু ধারা ক্রমাগত গণ্ড বেয়ে সর্বংসহা ভূতলে টপ টপ ঝরে পড়ল।

পদ্মাবতীর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। প্রদোষের অন্ধকার দ্রুত বৃক্ষের শাখায় শাখায় ঘনীভূত হচ্ছে। সম্মোহিত সন্ন্যাসী করদ্বয় সন্নিবেশিত করে প্রণামরত অবস্থায় বালিকার সম্মুখে দণ্ডায়মান- যেন দেবীর বর প্রার্থনায় নিমগ্ন। পদ্মাবতী লয়ের মধ্যঅবসরে নিশ্বাস গ্রহণের কালে সন্ন্যাসীর করজোড় আলোকনে সম্বিৎ ফিরে পেল। সে দ্বিতীয়বার আলাপে আরোহণ না করে ঋষির চরণে ষড়ঙ্গে প্রণামার্থে নিজেকে নিপতিত করল। বিহ্বল বৈরাগী তার চরণে নিক্ষেপিত পদ্মাবতীর স্কন্ধদ্বয় ধরে ভূতল থেকে উঠালেন। কিশোরীর শ্রীঅঙ্গ তখন ধুলায় ধূসরিত। এ যেন মর্তের অপ্সরা। নৃত্য নয় গীতই হচ্ছে তার সম্মোহনী শক্তি।

কোন কুঞ্জে তোর নিবাস রে মেনকা দেবী!

পদ্মাবতী প্রীণ ঋষির বিহ্বলতার ততক্ষণাৎ প্রশমন না করে তার দক্ষিণ বাহু নিজের সম্প্রতি উত্থিত পেলব বক্ষে আলতো স্পর্শে চেপে ধরে পশ্চাৎ ফিরে দেবকুঞ্জের অভিমুখে তত্রস্থ অবস্থান থেকে প্রস্থান করল।

 

১৫.

ছয় বৎসর পূর্বে অতিথি হয়ে কীর্ত্তনিয়া ও সদানন্দ বাসুদেবের কুটিরে এসেছিলেন। তখন পদ্মাবতী ষষ্ঠবর্ষীয়া প্রগলভা শিশু। দুই দিবসের ব্যবধানে কীর্ত্তনিয়ার সংস্পর্শে এসে তদগত চিত্তে পদ্মাবতী কালোয়াতি শিক্ষায় রত হয়। নিরলস নিখাদ কণ্ঠে অল্পকালের শিক্ষা। তদন্তর কীর্ত্তনিয়া পরিব্রাজনে গমন করায় সঙ্গীত গুরুর অভাবে আড়ষ্ট পদ্মাবতী পিতার অনুপ্রেরণায় অনাড়ম্বর কিন্তু অভিনিবিষ্ট চিত্তে সাধনায় রত থাকে। ললিত কণ্ঠ তার মহাসহায়ক। বাসুদেব দুহিতার সাধনার নিমগ্ন শ্রোতা হয়ে তাকে অনুপ্রাণিত করেন। প্রকৃষ্ট ললিত সুরললাম নিরূপণের জন্য সুরের উৎকৃষ্টাংশগুলো ধুয়ো দিতে বলেন। সুরগুলো স্তরে স্তরে সন্নিবেশিত করে দীর্ঘতর করতে বলেন। বাসুদেব পদ্মাবতীর উচ্চারিত ধ্রুবকার সন্ধিক্ষণগুলোয় বেণুতে অনুকরণ করে আরও শ্রুতিমধুর করে তোলেন। এতদস্থলে বাসুদেব পদ্মাবতীর গুরুজন নাকি পদ্মাবতী বাসুদেবের গুরু এতদ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত উপনীত হওয়া দুষ্কর। উভয়ে উভয়ের শিষ্য, উভয়ে উভয়ের গুরু।

কীর্ত্তনিয়া-সদানন্দের পরিভ্রমণে প্রস্থানের পরবর্তীকালে প্রচুর অতিথির আগমন অত্র দেবালয়ে হয়েছে। দূর দূরাঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা এসেছেন। বাসুদেবের কাছে বেদ শিক্ষা নিয়েছেন। অর্ধনারীশ্বরের দর্শনার্থীদের আগমন ঘটেছে। কোন বরাকীজন দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করেছেন। কেউবা দুএক রজনী স্থিতি স্থাপনের পর প্রস্থান করেছেন। বর্ষা ঋতুর প্রাক্কালে যারা উপস্থিত হন তারা প্রায় সকলেই বর্ষাকাল সমাপ্ত হলে অতিথিশালা থেকে নির্গত হন। অদ্যাবধি পদ্মাবতী অন্তরে কাউকে স্থাপন করতে পারেনি। সকল অতিথিকে ভালবেসে যত্ন সহকারে সেবা শুশ্রুষা করেছে। এটি শুকতারার শিক্ষা। নিবিষ্ট চিত্তে অম্লান বদনে অতিথিবৃন্দের সেবা, দেব সেবার সমতুল্য। দেব সেবকের ধর্ম-কর্ম একসূত্রে গাঁথা।

সখী শ্রাবন্তি আর জয়দেবের সাথে তার সখ্য। এই দুই ব্যক্তি ব্যতীত কারও সাহচর্য তার ইপ্সিত নয়। শ্রাবন্তির অক্ষর জ্ঞান নেই। আকৃষ্ট করার মত কোনো গুণ তার মধ্যে নিহিত নেই। তথাপি পদ্মাবতী আকর্ষিত হয় তার সান্নিধ্যে। ভীষণ মায়া-মমতা-ভালবাসা, ভাললাগার বন্ধন তাদের মধ্যে। প্রত্যহ একবার তাদের সাক্ষাৎ অতীব বাঞ্ছনীয়। নিয়মিত তারা এ ওর বাড়িতে গতায়াত করে। রঙ্গ তামাশা করে। মনের ভাব বিনিময় হয়।

আর জয়দেব। সে তো সার্বক্ষণিকের সঙ্গী। জয়দেবের শিক্ষা-দীক্ষা-কর্মে সর্বত্র বিচক্ষণতার ছাপ স্পষ্ট। দেবালয় তথা বাসুদেবের চতুর্পার্শ্বে তার সতত পরিক্রমণ। কদাচিৎ অনুপস্থিত থাকে। ইদানীং অস্ত্র চালনা শিক্ষা করছে। ভল্ল পরিচালনা করে। একদিন কাশবনের ধারে কালিগঙ্গার অববাহিকায় এককভাবে ভল্ল নিয়ে দীর্ঘক্ষণ প্রশিক্ষণকালে অদূরে হিজলের ছায়ায় বসে পদ্মাবতী দেখেছে। ভল্লটার বেশ ওজন। দুই হস্তে ধরে পদ্মাবতী সেটা মাটি থেকে উত্তোলন করেছিল। এত ওজনের লৌহ নির্মিত ভল্ল নিয়ে প্রহরীরা অনুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে কীভাবে! জয়দেব পদ্মাবতীকে বলেছে সে রাজ পরিবারে আরক্ষী দলভুক্ত হবে। যুদ্ধে গিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করবে। দেশ বিদেশে ভ্রমণ করবে। সে জন্য সবল দেহের প্রয়োজন। পথিমধ্যে দুর্বৃত্ত বা বন্যপশু দ্বারা আক্রান্ত হলে যেন তাদের পরাস্ত করা যায়। শরীরে পরাক্রম না থাকলে অঘোরে প্রাণ দিতে হবে। তাই সে নিয়মিত শরীর গঠনের সাধনা করে।

জয়দেব ভীষণ তড়িৎ কর্মা। নিত্যই বাসুদেবের পরিবারের সকল কার্যে তাকে প্রয়োজন হয়। সে ব্যতীত এক দ- চলে না। পদ্মাবতীও তদরূপ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তার সকল কর্ম ও মানস পূরণ করতে জয়দেব সহায়ক। জল তোলা থেকে ফুল তোলা অবধি। সকল কর্মেই পটুত্ব প্রদর্শন করে। জয়দেবকে ভীষণ পছন্দ যুবতী ললনার।

দাদু গৃহে দুই বৎসর ধরে অবস্থান করছেন। তিনি কেবলই পরিব্রাজনের উদ্দেশ্যে উদ্যোগ নেন। পদ্মাবতী তাকে প্রতিবারই নিবৃত্ত করে। দাদুকে হয়ত বেশি কাল আর আটকে রাখা যাবে না।

পদ্মাবতী এখন আর শ্রাবন্তির বাড়িতে যায় না। শ্রাবন্তী প্রায় দিনই চলে আসে তাদের নিকুঞ্জে। দুই সখীতে মিলে দাদুর সাথে নদীর ধারে যায়, কাশবনে লুকোচুরি খেলে, জ্যোৎস্না রাতে দাদু নানা প্রকার গল্প বলেন। টিবির উপর বসে তারা দাদুর কথা শোনে। ভিন্ন দেশের গল্প, নিত্য নতুন বিবরণ। কখনও লোমহর্ষক কখন ব্যঙ্গাত্মক। অবিশ্বাস্য গল্পের বিন্যাস, অনুপম বর্ণনা।

ললিতা সপ্তমির আহ্নিক পরবর্তী সান্ধ্যকালীন আসরে সখীদ্বয়ের সঙ্গে ঋষি জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করছিলেন। অকস্মাৎ পদ্মাবতী প্রশ্ন করল, দাদু কাছাড়ে কদাপি পর্যটন করেছ?

ঊর্ধ্ব-অধঃ মস্তক দুলিয়ে সম্মতি জানালেন বৃদ্ধ।

সেই দেশ পাহাড় পর্বতে ঘেরা, অনেক মনোরম?

হিড়িম্ব রাজ্য। দৈত্য-দানবের আবাসভূমি।

আমার শ্বাশুড়ির নাম মৃন্ময়ী হিড়ম্বী, কী অদ্ভুত সুন্দর নাম, না দাদু?

বল কি দাদু? এ যে রাক্ষস গোত্রীয়া শ্রীমতি।

কী যে বল না দাদু! তোমার কথায় কোনো ছিরিছাঁদ নেই।

তাই বুঝি। শ্বশুরালয়ের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ। বেশ ভাল, বেশ ভাল। তাহলে মহাভারতের একটা গল্প শোন।

কোন ঢোলতা গল্প শুনব না, দাদু।

ভাল কি মন্দ, তা তো জানি না। তবে বেদব্যাস যেভাবে জানিয়েছেন, মহাভারত উপাখ্যানে তারই বর্ণনায় এই হিড়িম্ব কাহিনী বিবৃত আছে।

শ্রাবন্তির আগ্রহ অত্যধিক বৃদ্ধি পেল। সে এতক্ষণ নিশ্চুপ বসে ছিল। নিমেষে দাদুর পক্ষ নিয়ে বলল,

দাদু, তোমার গল্প আমি শুনব।

তারপর সখীকে ভর্ৎসনা করল,

তোর শ্বশুরালয়ের প্রাক ইতিহাস না শুনতে চাইলে অন্যত্র যা। আমি দাদুর কাছে গল্প শুনব।

পদ্মাবতীর আগ্রহ কম ছিল না। কিন্তু দাদু কি বলতে কী বলেন! শ্রাবন্তি সেটা নিয়ে পরে রঙ্গ করবে।

মেনকা দেবী তোমার কুণ্ঠিত হওয়ার ভয় নেই। তবে আগ্রহ না থাকলে বলব না।

পদ্মাবতীর অহংবোধে আঘাত লাগল। চিত্তের প্রস্ফুরণ নিয়ন্ত্রণ করে সে বলল,

তোমার সকল গল্পই রসোত্তীর্ণ। তুমি আমার শ্বাশুড়ির জাতিত্ব নিয়ে কটুকাটব্য করবে, এই আশঙ্কায় আপত্তি জানিয়েছি। শ্রীমহাভারতের প্রাগৈতিহাসিক বর্ণনা আমি যথোচিত আগ্রহ সহকারে শ্রবণ করব। তুমি বল।

দাদু স্মিত হাস্যে ডম্বরুকে বিক্ষুব্ধ করে মহাভারত থেকে বর্ণনা দেওয়া আরম্ভ করেনÑ

পুরাকালে কাছাড়ে হেড়ম্ব রাজ্য অবস্থিত ছিল। কাছাড়ী ভূপতিগণ হেড়েম্বেশর উপাধিতে নিজেদের ভূষিত করতে গৌরবান্বিত তদরূপ সম্মানিত বোধ করতেন।

আতিশয্যমূলক বর্ণনার প্রারম্ভেই পদ্মাবতীকে নিপুণ কৌশলে প্রবীণ আশ্বস্ত করে দিলেন যে, যুবতীর ব্রীড়িত হওয়ার কিছু নেই বরং গৌরব বোধ করার আছে। বললেন,

মহাভারতের কাহিনীতে আছে যে, একদা পা-বগণ নৌকারোহণে যাত্রা করলেন। অতি ত্বরায় গঙ্গা পাড়ি দিলেন। ক্রমে সায়ংকাল উপস্থিত হল। পরে নক্ষত্র অনুসরণ করে দিক নির্ণয় হলে স্থলপথে ক্রমাগত দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হলেন। তারা পথিমধ্যে এক নির্ঝরী পর্বতসঙ্কুল মহারণ্যে প্রবেশ করেন। ততক্ষণে নিবিড় অরণ্যানীর অভ্যন্তরে তারা বিরাজিত। সেই অরণ্যে আছে শুধু নির্ঝরের পেয় জল, নাই কোন প্রকার আহারের ফল। ঐ বনের গভীরে বিশাল এক শালবৃক্ষ ছিল। তদুপরি মহাবল পরাক্রান্ত নর-মাংসাশী হিড়িম্ব নামা এক রাক্ষস বাস করত। হিড়িম্ব পা-বগণের মাংস ভক্ষণ ও রুধির পান করার নিমিত্তে সাতিশয় ব্যস্ত হয়ে স্বীয় ভগিনী হিড়িম্বাকে আহ্বান করে আদেশ দেয়,

যাও তাদের সকলকে বধ করে নিয়ে আস। আমরা একত্রে নরমাংস ভক্ষণে পরম পরিতোষে উদরপূর্ণ করে তালে তালে নর্তন করব।

রাক্ষসী তার ভ্রাতার আজ্ঞা পালনে অশঙ্ক চিত্তে অশক্য কার্যে রত হয়। সে পঞ্চপা-বগণের নিকটে এসে বিশাল বক্ষের মহাবল পরাক্রান্ত ভীমের অলোকসামান্য রূপলাবণ্য দর্শনে অতিশয় কামার্ত হয়ে পড়ে। মনে মনে স্থির করে- এই যুবক পুরুষকে আমি পতিত্বে বরণ করব। আমি কখনই ভ্রাতার ক্রুর বাক্যানুসারে কার্য সম্পাদন করব না। পতিস্নেহ সোদরস্নেহ অপেক্ষা অধিকতর মধুর, বলবান।  পাণ্ডবগণকে বধ করে ভ্রাতৃ সন্নিধানে উপস্থিত করলে মাংস ভক্ষণ ও শোণিত পানে আমার ক্ষণকালমাত্র তৃপ্ত হবে। যদি বধ না করে যুবক পুরুষকে পতিত্বে বরণ করি তাহলে চিরকাল পরমসুখ ভোগে কাল হরণ করব।

কামরূপিনী হিড়িম্বা এই সংকল্প করে মুহূর্তের অবকাশে দিব্যাভরণ ভূষিতা ষোড়শবর্ষীয়া দেশীয়া কামিনীর রূপ ও বেশ ধারণপূর্বক মৃদুমন্দ গমনে ভীমসেনের সংকাশে উপস্থিত হল এবং লজ্জাবনত সহাস্যবদনে অস্ফুট স্বরে সন্নত সম্ভাষণ জানাল। তদন্তর বলল,

হে পুরুষ শ্রেষ্ঠ! তুমি কে? তোমরা কি জান না যে, এই গহন অরণ্য রাক্ষসগণের আবাসস্থল! এখানে হিড়িম্ব নামে এক পাপাত্মা রাক্ষসের বসবাস। সেই আমার সোদর ভ্রাতা। সে মাংস ও রুধির পানের মানসে তোমাদের বধ করতে আমাকে নিযুক্ত করেছে। কিন্তু আমি তোমার রূপকাঠিন্যে মোহিত। তোমাকে পতিত্বে বরণ করতে ইচ্ছুক। হে ধর্মাত্মন! আমাকে গ্রহণ কর।

এদিকে ঊর্ধ্বকেশ, মহাবাহু, নিবিড় তমালতুল্য কলেবর, লোহিত নয়ন, বিকট দর্শন দুরাত্মা হিড়িম্ব স্বীয় ভগিনী হিড়িম্বার অহেতুক বিলম্বে বিচলিত হয়ে বৃক্ষ থেকে অবতরণপূর্বক স্বয়ং পা-বগণের অভিমুখে গমনোদ্যত হল। তার ভীষণ বিকট গর্জ্জনে মাতৃসমবেত পাণ্ডব চতুষ্টয়ের নিদ্রা ভঙ্গ হলে তাঁরা সম্মুখিস্থিতা রূপধারী রমণীয় হিড়িম্বাকে দেখতে পেলেন।

অদূরে হিড়িম্ব দানবের কদাচরণে ভীমসেনের ক্রোধ দ্বিগুণিত হল। তিনি ততক্ষণাৎ বিলম্ব না করে হিড়িম্বকে বলপূর্বক ভূতলে নিক্ষেপ করে পশুর ন্যায় বধ করেন। অনন্তর তারা তৎস্থান ত্যাগ করে অন্যত্র গমন করতে থাকেন।

ভীমপরাক্রম ভীমসেন হিড়িম্বাকে পশ্চাতে আসতে দেখেন। তিনি মহাবিরক্ত হয়ে হিড়িম্বাকে বললেন,

রাক্ষসগণ মোহিনী মায়া বিস্তার করে বৈর নির্যাতন করে; অতএব হে নিশাচরী তোর আর আমাদের সমভিব্যহারে আসা উচিত নয়, তুইও স্বীয় সহোদরের পশ্চাৎ পশ্চাৎ শমনভবনে যাত্রা কর।

হিড়িম্বা ভীমের ক্রোধ দর্শনে ভীত, সন্ত্রস্ত ও অতিশয় বিষণ্ন হয়ে অগ্রজ যুধিষ্ঠির সমক্ষে মাতা কুন্তীকে কৃতাঞ্জলিপুটে অভিবাদন নিবেদন করে বলল,

আর্যে অবলাজন অনঙ্গশরে জর্জরিত হলে কিরূপ দুঃখ ভোগ করে সেটা আপনি সবিশেষ অবগত আছেন। হে মাতঃ! আমি ভীমসেনকে দেখা অবধি সেই রূপ যন্ত্রণা ভোগ করছি। যদি মহাবলপরাক্রান্ত পুরুষ শ্রেষ্ঠ কিংবা আপনি আমাকে প্রত্যাখান করেন, তাহলে নিশ্চয়ই আমি প্রাণ ত্যাগ করব।

ধর্মাত্মা যুধিষ্টির হিড়িম্বার বাক্য শ্রবণান্তর শর্ত প্রয়োগ করে বললেন,

তুমি যথার্থ বলেছ। তুমি সূর্যাস্তের প্রাক্কালে কৃতস্নানাহ্নিক ও কৃত কৌতূকমঙ্গল ভীমসেনকে ভজনা করো এবং দিবাভাগে তাকে নিয়ে যথেচ্ছা গমন করতঃ সচ্ছন্দে বিহারাদি করো কিন্তু দিবাভাগের অবসানে তাকে আমাদের সমীপে উপস্থিত করতে হবে।

বৃকোদর যুধিষ্ঠিরের এইরূপ শর্ত সাপেক্ষ বাক্য শ্রবণান্তর ‘তথাস্তু’ বলে অনুমোদন করলেন এবং হিড়িম্বাকে বললেন,

হে রাক্ষসী! আমি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার আজ্ঞানুসারে তোমার পাণি গ্রহণ করব বটে কিন্তু যতদিন পর্যন্ত তোমার গর্ভে সন্তান না জন্মাবে ততদিন তোমার সাথে সহবাস করব, এর অধিক নয়।

হিড়িম্বা ভীমের বাক্য শ্রবণ করে- যে আজ্ঞে, বলে স্বীকার করল। কিয়দ্দিন এইরূপ বিহার করতে করতে ভীমের সহযোগে হিড়িম্বা গর্ভবতী হল। রাক্ষসীরা গর্ভধারণ করেই সন্তান প্রসব করে। হিড়িম্বাও অমানুষ পুত্র প্রসব করে। ঐ পুত্রের মুখ অতি বিশাল, কর্ণ গর্দভের ন্যায় দীর্ঘ, ওষ্ঠদ্বয় তাম্রবর্ণ, দশন সকল সুতীক্ষ্ম, নাসিকা দীর্ঘ ও বক্ষস্থল সুবিস্তীর্ণ। পুত্র মাতৃগর্ভ থেকে নির্গত হওয়া মাত্র যৌবন প্রাপ্তÍ ও সর্বশাস্ত্রবিশারদ হল এবং সত্বরে পিতা-মাতাকে পদস্পর্শ করে প্রণাম নিবেদন করল। তারা পুত্রের নাম ঘটোৎকচ রাখলেন। পুত্রের মস্তক করীমু-ের ন্যায় কেশশূন্য ছিল বলেই এই প্রকার নাম রাখা হয়। ঘটোৎকচ পা-বদিগের প্রতি নিতান্ত অনুরক্ত ও ভক্তিমান ছিল। তারাও যথেষ্ট স্নেহ পরবশ ছিলেন।

নিশাচরী হিড়িম্বার প্রতিজ্ঞানুসারে স্বামী সহবাসের কাল অতীত হল। সে মাতৃসমবেত পা-বগণকে সম্ভাষণ জ্ঞাপনপূর্বক স্বস্থানের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করে। মহাবীর ঘটোৎকচও প্রস্থানকালে বিনয় বচনে- এ ভৃত্য আপনাদের প্রয়োজনানুসারে যথাসময়ে উপস্থিত থাকবেÑ এই গম্ভীর উক্তি উচ্চারণপূর্বক গুরুজনের আশীর্বাদ গ্রহণের পর তৎস্থান পরিত্যাগ করে।

ঋষি তার গল্প শেষ করলেন। অত্যন্ত নিবিষ্ট মনে সখীদ্বয় দাদুর কথন শুনছিল। পদ্মাবতীর এই ইতিবৃত্ত শুনে গর্বানুভব হচ্ছে। হিড়িম্বার উত্তরপরুষে তার পতির জন্ম। কী বলবে সে বুঝে উঠতে পারছিল না। সখী শ্রাবন্তী তন্ময় হয়ে মহাভারতের একাংশ শ্রবণ করছিল। ইত্যবসরে ত্রিদণ্ডকাল হরণ হয়ে রজনী নিবিড় হয়ে গেছে। শ্রাবন্তীর এই রাত্রিতে বাড়ি প্রত্যাবর্তন হল না। পদ্মাবতীর পালঙ্কে সখীদ্বয় একত্রে শয়ান করে নিদ্রাঘোরে স্বপ্নাতুর নিশি যাপন করল।

 

১৬.

শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন প্রত্যুষে কালিগঙ্গায় নিত্যকার স্নান সমাপনান্তে পদ্মাবতী নিত্যসেবার কুসুম চয়নের জন্য উপবনে আসে। শিশির সিক্ত ঘাসোপরি দাদু পদচালনারত ছোট্ট নিম-শাখাখণ্ড দিয়ে আপন দশন মার্জন করছিলেন। পদ্মাবতীর নিকট আগমনে স্মিত হাস্যে বললেন,

দাদু স্নান সেরে এলে।

আমার আরাধ্য অধ্যাত্ম দাদুর কাছে পূত না হয়ে কি আসা যায়।

তাই বুঝি। কিন্তু তুমি তো আমার কাছে কখনই অপবিত্র নও দাদু।

আমি জানি পূতাত্মা।

তাহলে অশুদ্ধ ভাবনা চেতনায় জড় হয়েছে কেন?

তত্রাপি বিশুদ্ধ হয়েই তোমার সকাশে এলাম।

তাহলে তুমি কী এতদপূর্বে বিশুদ্ধ ছিলে না?

পদ্মাবতী এই প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজে পেল না। সে জানে তার এই প্রাজ্ঞ দাদু যখন একটি বিষয়ের উপর আলোকপাত করেন তখন সেই বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত জ্ঞানদান অব্যাহত থাকবে। সে ক্ষীণ কণ্ঠে প্রশ্ন করল,

দাদু তাহলে আমি কী ভুল বলেছি?

হ্যাঁ, ভুল তো বলেছ বটেই।

কী প্রকারের? বুঝিয়ে বলো দাদু।

এ দেহ অপবিত্র হবে কেন? অপবিত্র আর বিশুদ্ধতা একটি সনাতন প্রক্রিয়া। হঠাৎ করে কেহ অপবিত্র হয়ে যায় না। অপবিত্রের বিষ্ক্রিয়া দেহে নয়, মনে। এই মনকে সর্বদা বিশুদ্ধ রাখার ব্রত নাও। দেহ তো নশ্বর। এই দেহ যে পরমেশ্বর সৃষ্টি করেছেন তার অসীম তাৎপর্যপূর্ণ নির্মাণ কৌশল কী অনুধাবন করা যায় দাদু! তাঁর নীলাম্বর, তাঁর ধূলি-কণা, তাঁর বায়ু, তাঁর জলের কোন পরিধি-পরিমাপ নেই! তাঁর বৃক্ষ লতাদি, পশু-পাখি আর তুমি-আমি’র রহস্যভেদ কী করা সম্ভব!

এ তো অতি উচ্চ মার্গের কথা। আমি তার কী বুঝি!

নৃত্য-গীতের সাথে এই বোধেরও আয়ত্তের প্রয়োজন আছে দাদু।

আমি যে তোমার দর্শন বুঝতে পারি না দাদু! আমি বুঝি পাপ-পুণ্যি। পরিশুদ্ধ হয়ে থাকা একটি পুণ্যকর্ম। তাই অতি প্রত্যুষে স্নান সেরে নিই। কিসে পাপ আর কিসে পুণ্য? আমি যে তার কিছু বুঝি না দাদু।

তাহলে, গঙ্গায় স্নান করলেই কি সব পাপ ধৌত হয়ে যাবে? এ বিশ্বাস অমূলক। ব্রাহ্মণে উল্লেখ আছে পুরাকালে দেবতাগণ পুণ্যার্জনার্থে স্বরস্বতীর জলে অবগাহন করতেন। তৎকাল দেবযুগ ছিল। অত্র যুগ কলিকালের। পুরাকালের সঙ্গে কলিকালের তুলনা করা যায়, মিলন করা উচিৎ নয়।

পদ্মাবতী নিজের প্রগলভতায় অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়ল। পিতা তাকে অক্ষর জ্ঞান দিয়েছেন। দাদু দ্রুত, গুরু, লয়, প্লুত  প্রভৃতি কালের বা তালের শিক্ষা দিচ্ছেন। উভয় শিক্ষাগুরু প্রতাপশালী। কিন্তু দাদু হঠাৎ হঠাৎ এত উচ্চাবস্থানের কথা বলেন যে পদ্মাবতী তার মস্তিষ্কে ধারণ করতে পারে না। দাদু স্বরে স্নেহের স্পর্শ মাখিয়ে বললেন,

দেহের কী পাপ সখী। চিত্ত হচ্ছে পাপের আধার। চিত্তকে কলুষমুক্ত কর। তাহলে দেখবে সর্বকর্মেই পুণ্য।

দাদুকে অঙ্গে দৃঢ় জড়িয়ে ধরতে পদ্মাবতীর খুব ইচ্ছা করছিল। তার ডাগর যুগল চোখের ভাষা দাদু পড়ে ফেললেন। পদ্মাবতীকে অবদমিত করার উদ্দেশ্যে বললেন,

বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। তোমার জন্য তাঁরা অধীর অপেক্ষায় আছেন।

দাদুর এই বাক্য অনুধাবন করতে পদ্মাবতীর মোটেই ভাবতে হল না। দাদু বুনো মোত্রাফুলের ঝোপের পার্শ্বে এসে দাঁড়ালেন। পদ্মাবতী দাদুর ইঙ্গিত বুঝে নিল। সে শুভ্র বর্ণের মোত্রা কুসুম দুই গুচ্ছ আহরণ করে, যাই দাদু, বলে আড়ষ্ট পদে অত্র স্থান ত্যাগ করে গৃহাভিমুখের পথ অনুসরণ করল।

হাঁটতে হাঁটতে পদ্মাবতী ভাবছিল এতকাল বাবার কাছ থেকে প্রত্যহ পাপ থেকে বিরত থাকার উপদেশ পেয়ে এসেছে। অদ্য দাদু জ্ঞান দিলেন পুণ্যে পরিপূর্ণ জগৎ-সংসার। পাপ, সে আবার কী!

ক্ষণকাল পূর্বে স্নান সেরে সে সম্পূর্ণ দিগম্বরী হয়ে বসন বদল করছিল। নিশ্চয়ই জয়দেব দূর থেকে তার শ্রীঅঙ্গ প্রত্যক্ষ করেছে। এ কি পাপ নয়? জয়দেবকে কামাসক্ত করার প্রয়াস কী পাপ কর্মের পর্যায়ে পড়ে না? এ কি তার পদস্খলন নয়? দাদুকে জানিয়ে দেবে নাকি? তার অস্থির চিত্ত অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ল।

কতক দিবস পূর্বে নিদ্রাসক্ত অলস দ্বিপ্রহরে দাদু আর বাসুদেব মত বিনিময় করছিলেন। পদ্মাবতী তাদের সন্নিকটে বসে সমস্ত উচ্চমার্গীয় কথোপকথন গলাধঃকরণ করছিল। দাদু বলছিলেন,

নিরাকার ঈশ্বরের সন্ধানে বৃথাই রত রয়েছি। তথাপি তাঁরই সন্ধান ইহকালে করে যাব। বৈদিক ধর্ম মতে সাতাশি লক্ষ বার পুনর্জন্মের পর সিদ্ধি লাভ হয়। মহাকালের গর্ভে এতবার পুনর্জন্মের কি প্রয়োজন আছে! যে জন্ম লালন করছি তাতেই সিদ্ধি লাভের চেষ্টা করি না কেন? দাদু বাবাকে বলছিলেন- এই যে তোমরা দেবত্রয়ের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছ, এই কঠিন শিলাবয়বে কি প্রাণ আছে? এই বিগ্রহ সাধনে কি তোমার উত্তরণ সম্ভব হবে?

অতঃপর আনমনে দুপার্শ্বে মস্তক দুলিয়ে বললেন, না, কখনই না। আমি তাই বিশ্বাস করি। তাই বলে তোমার বিশ্বাসে আমি কুঠারাঘাত করতে চাই না। তোমার সাধন থেকে বিরত হতেও বলছি না। ওটা তোমার আস্থার স্থান, তোমার একান্ত ধর্ম পথ।

বাসুদেব নীরবে শুনছিলেন।

ভগবানকে দর্শন করার ইচ্ছায় ঘুরে বেড়ালাম ভুবনময়। আসলে তাঁর দর্শন পেতে হলে সর্বপ্রথমে চিত্তকে শুদ্ধ করতে হবে। ধ্যানবলে যে ভগবৎ দর্শন হয় তাও প্রত্যক্ষ দর্শনের মতই হয়ে থাকে। ভগবানের সাক্ষাৎ দর্শনেই ভক্তদের আনন্দ হয়। জ্ঞান, যোগ ও ভক্তি এই তিন পন্থায় যথাক্রমে তিনি ব্রহ্ম, পরমাত্মা এবং ভগবান রূপে উপলব্ধ হন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলা আছে- আমি আমার প্রকাশের একটি অংশের দ্বারা সমস্ত জগতে প্রবিষ্ট হয়ে বর্তমান থাকি।

এতক্ষণ পরে ধীর স্বরে বাসুদেব বললেন।

আমি তা জানি। আমার পূর্বপুরুষ এই পথে স্বর্গারোহণ করেছেন। আমি বংশানুক্রমে তাদের প্রতিনিধিত্বের ব্যত্যয় করতে চাই না। আমার অন্তর্দৃষ্টি এত প্রখর নয় যে অন্তরালের বস্তুকে দৃষ্টির সামনে আনয়ন করতে পারি। আমি অকপটে স্বীকার করছি যে, এই দেবপূজা করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তাকে সম্মুখে রেখে আমার হৃদয়কে প্রশমিত করতে প্রয়াস পাই। পদ্মাবতী নিশ্চুপ এই দুই জন পিতৃব্য ব্যক্তির দর্শন শ্রবণ করছিল। দাদু কখনও পূজার্চনা করতে নিষেধ করেননি। কিন্তু তার বক্তব্যে অন্য সুর স্পষ্ট। দাদু বললেন,

এইটি আসল কথা। ঈশ্বর সর্বত্র আছেন। তাঁর বিভু গুণসমূহ তরঙ্গে এবং অতি সূক্ষ্ম কণা রূপে জীবের মধ্যে রয়েছে। তোমার মধ্যে যেমন আছেন, তিনি আমার মধ্যেও আছেন। সুতরাং আমার মধ্যেই তাঁকে খুঁজি না কেন? পার্থক্য শুধু, ভগবান হচ্ছেন প্রভু আর জীব হচ্ছে দাস।

তদন্তর কতক সময় নিশ্চুপ থেকে বললেন,

জীব মাত্রই মরণের স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ মরণের সীমান্তে জীবন। মরণের পরপারে কোন অসীমের আবাহন! এই বলে নিস্পন্দ শ্রোতাদ্বয়কে পার্শ্বে রেখে দাদু বোধিদ্রুমের পাতার ফাঁকে ফাঁকে কী যেন হৃত সম্পদের খোঁজে নিবিষ্ট হলেন!

হঠাৎ দাদু পদ্মাবতীর পানে দৃষ্টি ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

আচ্ছা দাদু বলতো, প্রভু কী কখনও ভিখারি হতে পারেন?

অকস্মাৎ প্রশ্নে পদ্মাবতী বিহ্বল হয়ে উঠল। কি উত্তর দেবে সে। ছি ছি! এ কেমন কথা। সম্পূর্ণ জগতটা যে তাঁরই। এই চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্রে সাজানো অম্বর, এই তাপদাহ অগ্নি, এই হরিৎ ঘেরা ফুলে-ফলে-রসে-রূপে ভরা উচ্ছল শ্যামল ধরিত্রীর কোল, এই জল ছলছল নদী, এই প্রাণ দানকারী বায়ু- সবই যে তাঁর!

তিনি কেন ভিখারি হবেন, দাদু?

দাদুর সরু ওষ্ঠের প্রান্তে মৃদু হাসির রেখা ফুটে রয়েছে।

সখী রে! ঈশ্বর এই শ্রেষ্ঠ জীবের সৃষ্টি করেছিলেন শুধুই কী স্তুতি পাওয়ার ইপ্সায়? তাঁকে খুঁজে পাওয়ার লোভে মানুষ পাগলপ্রায় হবে! কিন্তু মানবকুল তাঁর খোঁজ করে না। তাঁর স্তুতিতেই মগ্ন থাকে। দাদুর ঈঙ্গিত পদ্মাবতী বুঝতে পারল না। সে ওষ্ঠদ্বয় পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দাদুর পানে চেয়ে থাকল। বাসুদেব মহাবিব্রতকর অবস্থায় পতিত হলেন। তিনি ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন,

পিতৃব্য! আমি যে আপনার কাছে নিতান্তই শিশু। আমার সংসার জায়া-দুহিতার মধ্যেই সীমিত। অসীমের সন্ধানের শক্তি যে আমার নেই।

প-িত! ক্লিষ্ট হয়ো না। তোমার পথও কুসুমাচ্ছাদিত নয়। তোমার বিকশিত চেতনের নিরলস সাধনভক্তিতে আমি বিমোহিত। তোমার কর্ম তুমি নিরবচ্ছিন্ন করে যাও। তুমিও যে ধরিত্রীর বুকে একজন সৃষ্টিকর্তা। তোমার পদ্মাবতী আছে, জয়দেব আছে।

 

১৭.

বিচক্ষণ জয়দেব বিংশ বৎসরে বেদ বিশারদ হয়ে উঠেছে। শরীর গঠনের প্রয়াসে সে ব্যর্থ। দীর্ঘ বৎসরাধিক কাল নিয়মিত অক্লান্ত পরিশ্রম পরিগ্রহ করে দেহ গঠনে সফলতা নেই। তার পরিশ্রম এতদস্থলে সম্পূর্ণ বিফল। কারণ প্রকৃষ্ট গুরুর সংস্পর্শে সে আসতে পারেনি।

বাসুদেব তাকে কেবল বেদ বিশারদ করার প্রয়াস পেয়েছেন। জয়দেবকে সন্তানতুল্য স্নেহে লালন করেছেন। তাকে সংস্কৃতজ্ঞ করে গড়ে তুলেছেন। জয়দেব সংস্কৃত উচ্চারণে, ব্যাকরণে, ছন্দে পারদর্শী ও মাধ্বদর্শনে বিজ্ঞ। নিয়মিত বাসুদেব-এর নিকট জয়দেবের জ্ঞানচর্চায় বিচক্ষণতার তীক্ষ্মত্ব লক্ষিত হয়। যৌবনসমৃদ্ধ জয়দেবের মনোবল, শারীরিকবল উভয়ই তেজোদ্দীপ্ত। ষড়শী পদ্মাবতী তার মানসকন্যা। শিশুকাল থেকে পদ্মাবতীর সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক। পদ্মাবতীর জীবনের প্রতিটি সোপানে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। শৈশবের খেলার সাথী। পদ্মাবতীর পরিণয়কালে একান্ত আপনজনের স্থান গ্রহণ। ঝড়-ঝঞ্চার মত দুর্যোগে নিরলস ত্রাণকর্মী। বাসুদেবের একান্ত সচিব। বাটির নিবিড় অনুচর। ছায়ার মত তার অনুক্ষণ বিচরণ।  যুবতীর প্রাত্যহিক জীবনের দায়-দায়িত্ব অনেকটা যেন তার স্কন্ধে স্তূপীকৃত। বাসুদেব এবং শুকতারার নীরব সম্মতি তার স্পর্ধাকে বর্ধিত করেছে। দাদু এসে কিশোরী পদ্মাবতীকে গত দ্বিবর্ষাধিক কাল ধরে গীত সাধনার চাইতে নৃত্যে অধিকতর মনোনিবেশে উদ্বুদ্ধ করেন এবম্বিধ জয়দেবের ধীদীপ্ত অনুধাবন করে তাকে দিয়ে বিভিন্ন স্তুতি শ্লোক রচনায় উৎসাহিত করেন। প্রাজ্ঞ দাদুর তত্ত্বাবধানে পদ্মাবতীর নৃত্য আর জয়দেবের গীত বাসুদেব অনুমোদন করেন বিজ্ঞ মননে।

বাসুদেব জয়দেবের রচনায় স্বীকৃতি প্রদান করায় সে মহাসমারোহে গুণগীতি রচনা করতে অণুপ্রাণিত হয়। ঋষি দাদু, যোগিপাল, ভোগিপাল, মহীপালের গাঁথা বা গ্রাম্যগেয় জয়দেব আর পদ্মাবতীকে পিনাক ক্বণন মিলনে গেয়ে গেয়ে শোনান। জয়দেব মন্দিরের দাওয়ায় বসে গীত গায় আর পদ্মাবতী প্রাঙ্গনে হস্তপল্লবে কঙ্কন আর পদল্লবে নুপূর পরে নৃত্য করে। প্রীণ দাদু সযত্নে পদ্মাবতীকে মুদ্রাগুলো আয়ত্ব করিয়ে দেন। দাদুর দর্শন ভিন্ন। তার অভিমত যে, দেবতার সকাশে নারী নৃত্য নিবেদন করে সন্তুষ্টি অর্জন করবে আর পুরুষ করবে ভজন। তাই পদ্মাবতীকে কালোয়াতিতে মনোযোগ না দিয়ে নৃত্যে মনোনিবেশ করতে পরামর্শ দেন। তবু, পদ্মাবতী নিয়মিত মন্দিরা বাজিয়ে দেবত্রয়ের সম্মুখে আসনে উপবিষ্ট হয়ে ভজন গায়। এটা তার অন্তকরণের গভীরে প্রোথিত মনোবাঞ্ছার উৎসারিত রসে সুখ ভোগ। জয়দেবের রচনাকে বাসুদেব-পদ্মাবতী-দাদু এই ত্রয়ী অনুরাগী প্রাণ দিতে অধিকতর সচেষ্ট হন।

পদ্মাবতী মনোযোগ সহকারে দাদুর শিক্ষা এবং বাসুদেবের ছত্রছায়ায় তার বিচিত্র ধীশক্তির বিকাশ ঘটাতে সর্বদা নিবিষ্ট থাকে। দিবসের সর্বক্ষণ সে কোনো না কোনো শৌচ অভিনিবেশযুক্ত হৃদয়ে বিরাজ করে। তাকে কেন্দ্র করে তিন জন যুবক-প্রৌঢ়-বৃদ্ধের লোলুপ আবর্তন।

পদ্মাবতী অতি শৈশব থেকে প্রভাতে শয্যা ত্যাগ করে কালিগঙ্গার সলিলে স্নান সেরে কুঞ্জ কানন থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ কুসুম তুলে এনে দেবগণের পাদপদ্মে পুষ্পার্ঘ্য দেয়। কর্মটি সে অত্যন্ত প্রগাঢ় চিত্তে সম্পাদন করে। কোন উপেক্ষা, কোন অবহেলা নয়। তার কোমল হৃদয়ে অফুরন্ত ভালবাসা। সকল মনুষ্য তথা প্রাণী জগতের জন্য পদ্মাবতীর অন্তর মুক্ত আকাশ সদৃশ উন্মুক্ত। তার অকৃপণ গভীর শ্রদ্ধা দেবগণের প্রতি। পাষাণ বিগ্রহের প্রতি নিগূঢ় শ্রদ্ধা তাকে সর্বজনের কাছে প্রিয়তম করে তুলেছে। এই প্রেম তাকে অধিকতর কমনীয় হতে শিখিয়েছে।

দিবসের প্রারম্ভে সর্বাগ্রে দেবত্রয়ের সেবা তারপর অন্যান্য নিত্যকার কর্তব্য পালন। তদন্তর যথানুপূর্ব বেদদর্শন অধ্যয়ন, সঙ্গীতচর্চা আর নৃত্যের নিরলস সাধনা। সারা দিনমান ভীষণ ব্যস্ততা। এরই অবসরে শুকতারাকে রন্ধনশালায় সহায়তা দান। পরিচর্চার ক্ষেত্রে পিতার প্রতি বিন্দুমাত্র ক্রটি নেই। ব্রহ্মবাদী প্রিয় দাদুকে সে দৃষ্টির আড়াল করে না। অব্যবস্থিত চিত্তের প্রশ্রয় নেই তার ক্রিয়াকর্মে।

জয়দেবেরও দীর্ঘক্ষণ নিদ্রায় আসক্তি নাই। পক্ষীজাগা প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগী জয়দেব অরণ্যাঞ্চলে বিচরণ করে। তখনও আকাশে নক্ষত্রের নিবিড় মেলা থাকে। প্রত্যুষে ধরিত্রীর ঘুম ভাঙার পূর্বে পদ্মাবতী কালিগঙ্গার জলে শুদ্ধ হতে আসে। জয়দেব তারও অনেক পূর্বে অতি সংগোপনে কালীগঙ্গা নদের তিরস্থ হিজল তমালের অদূরে কাশবনের ভিতরে নিজেকে আড়াল করে রাখে। কিশোর বয়সে সে পদ্মাবতীকে অনুসরণ করত তার রক্ষণার্থে। কালের অপনোদনে পদ্মাবতী তার দৃষ্টির সম্মুখে কিশোরী থেকে যুতবী হয়ে উঠল। সেও সহসা যুবক-পুরুষ হয়ে গেছে। এখন পদ্মাবতীর রক্ষণার্থে অত্র স্থলে সে আসে না। সে আসে পদ্মাবতীর লাস্যময়ী দেহের রূপমাধুরী দৃষ্টিহরণ করতে। পদ্মাবতীর দেহ পরিবর্তনের প্রতিটি স্তর সে প্রাণ ভরে অবলোকন করেছে।

পদ্মাবতী যত্রে কালীগঙ্গায় অবগাহন সেরে আর্দ্র বসনে নদী থেকে বেরিয়ে আসে, তার সমস্ত শরীরে পাটাম্বর জড়িয়ে থাকে। সিক্ত বস্ত্রখানি মহানন্দে পদ্মাবতীর শরীরের সাথে মিশে একাকার হয়ে থাকে। তখন পদ্মাবতীর প্রস্ফুটিত শ্রীঅঙ্গের প্রতিটি ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অবাক বিস্ময়ে পদ্মাবতীর মনোহর এই রূপ প্রত্যহ দেখতে দেখতে মোহগ্রস্থ হয়ে পড়েছে জয়দেব। পদ্মাবতীর রূপ মহিমার কীর্ত্তন গাঁথতে ভীষণ ইচ্ছে হয় কিন্তু লোকলজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে সে এই রূপের বর্ণনা রচনা থেকে বিরত থাকে। শরৎ প্রভাতের মৃদু হিম বায়ে পদ্মাবতী সিক্ত বসন ছেড়ে শুষ্ক হওয়ার জন্য দিগম্বরী হয়ে পড়ে। সেই অবসরে জয়দেব তার নির্নিমিখ দৃষ্টি ধরে রাখে পদ্মাবতীর নগ্ন দেহে। জয়দেবের চেতনায় স্থায়ী সন্নিবিষ্ট রূপবতীর শরীরের প্রত্যেকটি ভাঁজ। মনোহরণ করা পদ্মাবতীর দেহ-বল্লরীর কী লীলা ভজন গাইবে সে! খুব নিকট থেকে পদ্মাবতীর পশ্চাদদেশ পর্যবেক্ষণ করেছে জয়দেব। চকচকে কদলী কাণ্ড সদৃশ পদযুগল। নিম্নাংশের শীর্ণ পদপল্লব ক্রমে ঊর্ধ্বে উত্থিত হতে হতে স্থূল হয়ে বিস্তৃত রম্ভোরুযুগলের মধ্যস্থিত গভীর খাদ নিতম্বকে দিখণ্ডিত করে রেখেছে। ক্ষীণ কটির উপরিস্থ বিস্তীর্ণ উত্তমাঙ্গে মস্তক বেয়ে কেশরাজিতে গহন আষাঢ়ে-মেঘের আঁধার পরিব্যাপ্ত। পদ্মাবতীর কৃষ্ণ ঘনকেশ জয়দেবের শত্রুর ভূমিকায় অবতীর্ণ থাকে সর্বদাই। দেহের পশ্চাতের শীর্ষদেশ গ্রীবা থেকে কটি অবধি দোলায়িত কেশগুচ্ছ সযত্নে পদ্মাবতীর আবরক। যেন সে ইচ্ছা না করলে এই অঙ্গ প্রস্ফুটনের নয়। নিতম্বের উপরে পৃষ্ঠবংশের উভয় পার্শ্বে অবস্থিত দেহের মোহনার আবর্তে সৃষ্ট চক্ষু সদৃশ ক্ষুদ্র রন্ধ্রদ্বয় জয়দেবের লোলুপ দৃষ্টিকে নীরব অনুনয়ে তিরস্কার করে। এই ইন্দ্রিয় শাসনে জয়দেবের সংযম হয় না। পদ্মাবতীকে বসনমুক্ত দিদৃক্ষমান আহলাদনে স্বর্গ সুখের অনুভূতি।

মোহগ্রস্থ জয়দেব রাত্রির অবসানে উষসী শরতের কাশবনের আড়ালে পদ্মাবতীর অগোচরের অপেক্ষা করে। প্রতীক্ষার ধৈর্য একসময় জয়দেবকে মহাপ্রাচুর্য্যবান করে তোলে। প্রভাতে রাশি রাশি কাশকুসুমগুচ্ছ মৃদুমন্দ সমীরণে আত্মহারা। সেই সময় জয়দেবের দিঠি সন্তর্পণে পদ্মাবতীকে অনুসরণ করছিল। পদ্মাবতী কালিগঙ্গার মত্ত সলিলে অবগাহ করে নিজের সিক্ত বস্ত্রপট্ট ত্যাগ করল। নিত্যকার মত দিগম্বরী উর্বশী। সদ্য প্রস্ফুটিত পদ্মের ন্যায় কালিগঙ্গার সলিল ফুঁড়ে মৃত্তিকার বৃন্তে বিকশিত পদ্মাবতীর দেহশ্রী। প্রভাতের ঈষৎ প্রভা তার সুবর্ণবর্ণ শরীরকে অন্তরঙ্গ লেহনে উন্মত্ত। বিভোর পদ্মাবতী হঠাৎ কাশবনের দিকে ফিরে দাঁড়াল। অভাবনীয় নগ্ন লাস্য রূপ এইভাবে প্রত্যক্ষ করবে জয়দেবের কল্পিত ছিল না। পদ্মাবতীর উত্তমাঙ্গে উত্তল পীন স্তনযুগল গর্বিত মহিমায় প্রস্ফুটিত। অর্ধনারীশ্বরের বাম পীনোন্নত স্তনের ন্যায় পদ্মাবতীর পরিপুষ্ট উরোজযুগল উন্মীলিত। তারই নিম্নে নাভীমূল স্বেত কাঞ্চন সদৃশ বিকশিত। সরু কটি বেয়ে দেহের বল্লরী উর্বশীর উল্লম্ব উরুদ্বয়ের সন্ধিক্ষণে এসে অভূতপূর্ব মনোরম বিভাজন সৃষ্টি করেছে। ঈশ্বরের নির্মিত ঐন্দ্রজালিক এই শিল্পকর্ম দৃকপাতে জয়দেবের দিঠি স্থির। হঠাৎ পদ্মাবতী কাশবনকে দুই হস্তে দুই পার্শে¦ সরিয়ে দণ্ডার্হ জয়দেবকে আবিষ্কার করে। আরক্তমুখ পদ্মাবতী স্বয়ং দ-পালের ন্যায় অদৃশ্য মন্থনদ- হস্তে রণচণ্ডীমূর্তি রূপে দণ্ডায়মান। ঘটনার আকস্মিকতায় চেতনালুপ্ত বিবশ নতজানু যুবক জয়দেব পদ্মাবতীর চরণকমলে করাঞ্জলিপুটে স্থিত। পদ্মাবতীর স্নাপিত শরীরের উত্তল স্থূল বক্ষ-কসুমের উভয় বৃন্ত থেকে সিক্ত দেহের পীয়ুষ রস টপ টপ জয়দেবের অঞ্জলিতে পড়তে থাকে। ভেজা মাটি আর বিবস্ত্র দেহভৃতের মদির সোঁদা ঘ্রাণে জয়দেবের ধমনীতে ধাবমান তপ্ত শোণিতে শৈত্য প্রবাহের ঝটিকা লাগে।

 

১৮.

জয়দেব অব্যবস্থিত চিত্তে কিয়দকাল নতজানু অবস্থায় থাকার অব্যবহিত পরে দৃষ্টি তুলে দেখতে পেল সম্মুখে পদ্মাবতী নেই। পদ্মাবতী কখন তার সম্মুখ থেকে বিদায় হয়েছে সে বলতে পারবে না। নারীদেহের মহিমান্বিত ঐশ্বর্য দেখে সে বিহ্বল। কিন্তু পদ্মাবতীর রণচণ্ডীমূর্তির কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করেছিল। পদ্মাবতীর দৃষ্টিতে কী লজ্জাবনত ভাব ছিল? সে এখন কী করবে? পদ্মাবতীর সম্মুখে এই অবয়ব নিয়ে কীভাবে দাঁড়াবে?

বিমর্ষ চিত্তে জয়দেব দীর্ঘ সময় ভাবল- কোনক্রমেই পদ্মাবতীর সম্মুখে গিয়ে সে দাঁড়াতে পারবে না। পদ্মাবতীর দৃষ্টিতে কী বহ্নিশিখা ছিল? নাকি কপট অভিমানে এই রণরঙ্গিণী মূর্তি ধারণ করেছিল? জয়দেব পদ্মাবতীর দৃষ্টির দিকে লক্ষ্য করেনি। দিগ¦সনা উর্বশীর রূপ মহিমায় সে বিভোর ছিল।

উন্মাদ! নচেৎ পদ্মাবতীর এত নিকট পৌঁছাবে কেন সে? দূর ব্যবধান রেখে পদ্মাবতীর উন্মুক্ত শ্রীঅঙ্গের অংশই সে অবলোকন করেছিল। আজকের বুভুক্ষ আচরণ তাকে ভীষণ পীড়া দিচ্ছে। পদ্মাবতীর উত্তল পরিপুষ্ট বক্ষে স্বচ্ছ স্ফটিকের মত অজস্র জল কণা দেখে মনে হচ্ছিল উর্বশী কালিগঙ্গায় ডুব দিয়ে সমস্ত শরীরে জড়িয়ে রাশি রাশি মুক্তা তুলে এনেছে। জল-পদ্ম ডাঙায় উঠে মুক্তা বিতরণ করছে। যেমতি শরতের সকালে অজস্র শষ্পের শীর্ষে শিশির বিন্দু ফুটে থাকে। সে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। ঘোরের বশে জল-পদ্ম’র গাত্র থেকে মুক্তা আহরণ করতেই যেন পদ্মাবতীর সন্নিকটে চলে আসে।

নির্বুদ্ধিতা তাকে মহা বিড়ম্বনায় পতিত করল। পদ্মাবতী যদি জয়দেবের এই ধৃষ্টতার বর্ণনা তার পিতা-মাতা অথবা দাদুর কাছে দেয়! তাহলে জয়দেব তাদের কাছে কী ব্যাখ্যা দেবে! সে আর পদ্মাবতীর বাড়িতে যাবে না। সহসা আক্রোশ ভুলে বিহ্বলতা কাটিয়ে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হল জয়দেব।

জয়দেব কাশবন থেকে বেরিয়ে আপন কুঞ্জে এসে একটি ঝুলিতে তার পরিধেয় বস্ত্রখণ্ড গুছিয়ে নিল। সঞ্চিত কয়েকটা কড়ি-টঙ্কা নিয়ে দ্রুত বনান্তরে প্রবেশ করল। পল্লীর পরিষ্কার পথকে এড়িয়ে বনপথকে বেছে নিয়েছে সে। দিবসকালে পল্লীবাসীর দৃষ্টির আড়ালে পথ চলার অত্র কৌশল সে অবলম্বন করল।

সচরাচর এই পথে কেউ গতায়াত করে না। দ্রুত পদক্ষেপে সে বন বাদাড় অতিক্রম করতে থাকল। কোন গন্তব্য স্থির নেই। তবে সংকল্প ইতোমধ্যে স্থির করেছে সে। যত্রেই যাক না কেন পদ্মাবতীর রূপ লাবণ্য বর্ণনা সে তার লেখনীতে চিত্রিত করবেই।

বনে কণ্টকাকীর্ণ পথে অন্য কোন চিন্তনের অবকাশ নেই। তত্রাপি অন্তঃকরণের গহনে স্তূপীকৃত ভালবাসার মায়া তার পদযুগলকে শৃঙ্খলিত করতে চাচ্ছিল। ঘন ঝোপের কণ্টক মাড়িয়ে সতর্কতার সাথে পথ অতিক্রমকালে জয়দেবের ইন্দ্রিয়সমূহ এতদ্ব্যতীত অন্য কোন বিষয়ের প্রতি ইন্ধন দিচ্ছিল না। সে নিজেকে অনন্তর সতেজ সজীব রাখতেই বদ্ধপরিকর।

দ্রুত পদক্ষেপে সে প্রভাহীন অরণ্যানী অতিক্রম করে বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত প্রান্তরে উপস্থিত হল। সূর্যদেব তখন মস্তকের উপরে অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করছেন। এতক্ষণ অরণ্যের স্কন্ধির নিবিড় ছায়ায় সূর্যের তীক্ষèশূল শরীরে বিদ্ধ হয়নি। এখন ঔদের তপ্ত বিকিরণে উষ্ণীষের প্রয়োজন অনুভূত হয়। পদ্মাবতীর বিবাহকালে উপহার হিসেবে প্রাপ্ত দীর্ঘ বস্ত্রখণ্ডটি ঝুলি থেকে বের করে নিজের মাথায় পরে নিল। ধরার তপ্ত বুকে পদপৃষ্ট ফেলা যাচ্ছে না। অদ্য আকাশে শুভ্র ছোট ছোট মেঘের ভেলার বিচরণ নেই। ধু ধু বালুকাময় মেঘাত্যয় প্রান্তরের এখানে সেখানে শুধু কাশবন দৃষ্ট হয়।

বিক্রমণিপুরের পূর্বে কৃষ্ণ ব্রহ্মপুত্র নদের প্রবাহ, পশ্চিমে গঙ্গা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর আর উত্তরে অকূল চুরাইন বিল এবং তারও উত্তরে পোণ্ড্র্রনগর। অত্র বঙ্গস্থানের ভূমি সমতল নয়। রামপাল,  ব্রজযোগিনী, কামকোটি, পঞ্চকোটি, হরিকোটি, কঙ্কগ্রাম, বটগ্রামের ভূমির কিয়দংশ অতি উচ্চ। এইস্য ভূমিতে বর্ষার প্লাবন পৌঁছায় না পক্ষান্তরে অন্যান্য সমস্ত স্থান নিরতিশয় নিম্নভূমি হওয়ায় বর্ষার জল প্লাবিত হয়ে শ্রীহীন অবস্থা ধারণ করে। তত্রস্থ এইস্য কালে প্রত্যেক বাটিতেই শয্যাশায়িত রুগ্ন জনের দৃষ্ট হয়।

বর্ষাকালে সমস্ত বিক্রমণিপুরে সর্পকুলের উপদ্রব পরিলক্ষিত হয়। কাল-গোখুরার ফোঁস ফোঁসানির শব্দ শুনে দ্রুত ধাবনে প্রাণ রক্ষা করতে হয়। শঙ্খচূড়ের তাড়া আর দংশনের ত্রাসে প্রাণ থাকে অতিষ্ট। শাখায়  প্রশাখায় পক্ষীকূলের ত্রাহি ত্রাহি ভাব। তাদের কণ্ঠের মধুর গান আর শ্রুত হয় না। জল আর জল সর্বত্র। অথচ পেয় জলের অভাব প্রকট হয়ে যায়। গাছের প্রপর্ণ পুষ্করিণীর জলে পড়ে সেগুলো পচে দুর্গন্ধযুক্ত অস্পর্শনীয় হয়ে পড়ে। অন্তত চারটি মাস দুর্বিষহ জীবন যাপন করতে করতে নাভিশ্বাস উঠে যায় অত্রত অঞ্চলের প্রাণীকুলের।

শুবচনী, ভরাকৈর প্রভৃতি গ্রাম শুষ্ক সময়ে বড়ই অদ্ভূত দৃশ্যমান হয়। উঁচু নিচু ঢেউ খেলানো অবস্থান বড় মনোহর। জয়দেব হরিকোটি গ্রামের বনাঞ্চল অতিক্রম করে পঞ্চকোটি গ্রামের দিগন্ত বিস্তৃত সমতট প্রান্তরে উপস্থিত হল। অত্র উচ্চ স্থান কাশবনে আবৃত ও বালুকাময়। সূর্য প্রখর হলে বিক্ষিপ্ত সমীরণে বালুকাকণা এবং কাশকুসুমরেণু দৃষ্টি সমাচ্ছন্ন করে গমনাগমন অসাধ্য করে তুলবে। এই কাশবন দ্রুত অতিক্রম করলে মনোরম কামকোটি গ্রামের শালী-ধান্য ক্ষেত দৃশ্যমান হবে। হরিৎ-এর সমারোহে দৃষ্টি জুড়িয়ে হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দেবে। কামকোটি গ্রাম বৃহদায়তনের। এর পূর্বে ফসলী ভূমির সমতট অঞ্চল। উত্তর পার্শ্ব দিয়ে কতক স্থান কালিগঙ্গা প্রবাহিণীসিক্ত। পশ্চিমে ঘন বাদাড়। অতঃপর গঙ্গা স্রোতসিণী।

এই বঙ্গে যারা বসবাস করেন তারা ঋতুর পরিবর্তনে বিচিত্র পরিবেশ উপভোগ করেন। বসন্তে ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় বনাঞ্চল। পক্ষীকুলের কোলাহল কাকলি আর মলয় সমীরণে প্রাণে লাগে হর্ষণ। গাছে গাছে নব পত্রপল্লবে সেজে ওঠে ধরণীজননী। এইস্যকালে বিবাহ উৎসবে মেতে ওঠে বাংলার পল্লী। সর্বত্র প্রাণের আবাহন। আহা কি আনন্দ!

বসন্তের শেষে রণচণ্ডী বেশে ধেয়ে আসে কালবৈশাখী। লণ্ড-ভণ্ড করে দেয় ধরণীর কোল। তবুও ভাল। নতুন সাজে সজ্জিত ধরা তল ফলে ফলে পরিপূর্ণ। রসালো আম, জাম, কাঁঠাল, বেল, চালতা, সপেটা প্রভৃতি ফলের সমাহার। মধু ঋতুর সমাপনান্তে দুর্বিষহ বর্ষা। এর চার মাস পরেই হেমন্ত-শীতকাল।

বাংলার শীতকালের স্থায়িত্ব প্রায় পাঁচ মাস। আহার এবঙবিধ বিচরণের জন্য কোনরূপ ক্লেশভোগ করতে হয় না এই কালে। প্রচণ্ড শীতে শরীরকে পট্টবস্ত্রে আবৃত রাখলেই চলে।

গঙ্গানগর থেকে লড়িকুলের মধ্য দিয়ে চণ্ডীদাস অবধি প্রবাহিত কালিগঙ্গা চুরাইন বিলে গিয়ে পতিত হয়েছে। গঙ্গার এই উন্মত্ত শাখা বিক্রমণিপুরকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। এই জয়স্কন্ধাবারে মাকড়সার জালের মত বিস্তৃত রয়েছে খাল-বিল-নদী-নালা। বর্ষাকাল ব্যতীতও এগুলো অতিক্রম করার জন্য খেয়া অথবা কোসার সহায়তা ছাড়া বেশিদূর পদব্রজে অগ্রসর হওয়া যায় না।

জয়দেব পদব্রজে দক্ষিণে রামনগরের দিকে না গিয়ে কালিগঙ্গার তীর ঘেঁষে কামকোটি গ্রাম অতিক্রম করে পদ্মা তটের অভিমুখে পশ্চিমে অগ্রসর হতে থাকে। কী আছে তার মনে, প্রভুই জানেন!

জয়দেব পলক বদ্ধ করে পথ অতিক্রম করতে থাকে। তার আনদ্ধ দৃষ্টিতে দিগ্বসন শ্রীঅঙ্গের দৃশ্য উদ্ভাসিত। জয়দেব অত্র দৃশ্যপট বিস্মরণে প্রায় একযুগ পূর্বের ঈদৃশ এক দিবসের কথা স্মরণ করছিল।

এতাদৃশ শরতে তপ্ত দ্বিপ্রহরে হটাঙ্গন থেকে কুঞ্জাভিমুখে প্রত্যাবর্তন পথে অত্র বালুকাময় প্রান্তরে এক পান্থজনের সাথে সাক্ষাৎ হয়। পথিক নবদ্বীপ থেকে প্রত্যাগমন করছিলেন। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় চলৎশক্তি রহিত ব্যক্তিটি তাকে একটি পত্র দেবদাসের কাছে পৌঁছে দিতে অনুরোধ করেন। বালক জয়দেব দৌত্যের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। পত্রটি যথাসময়ে যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করে ভদ্রজনকে তার দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি দেয়। পান্থজন আদতেই অসুস্থ ছিলেন। বালক জয়দেব আশ্বস্ত করায় তিনি পত্রটি তাকে হস্তান্তর করে নিজ গমনস্থানে প্রত্যাবৃত হন। জয়দেব প্রান্তর পেরিয়ে বিশ্রামের মানসে মাথার বোঝা নামিয়ে একটি জাম তরুতলে উপবিষ্ট হয়। কৌতূহলবশতঃ শুষ্কপত্রে লিখিত পত্রটি পড়ার জন্য দৃষ্টির সম্মুখে মেলে ধরে। চিঠিটি পড়ার পরে দীর্ঘক্ষণ বিমূঢ় বসে চিন্তা করার পর একসময় জয়দেব পত্রটি ছিন্নভিন্ন করে ফেলে দেয়।

সদানন্দের প্রেরিত এই পত্রে কীর্ত্তনিয়ার মৃত্যুসংবাদ ছিল। হেন সংবাদ দীর্ঘকাল গোপন করে রাখে জয়দেব। সে পদ্মাবতীর জনক জননীকে শোকাচ্ছন্ন অবস্থায় দেখতে চায়নি। তার বালক-বুদ্ধি এই প্রকার হটকারী সিদ্ধান্তে তাকে উপনীত করেছিল।

জয়দেব ভাবছিল; অদ্য সেই পত্রটি তার কাছে রক্ষিত থাকলে মন্দ হত না। অন্তত পত্রটি বাসুদেবের হাতে দিয়ে পদ্মাবতীকে একান্ত আপন করার ইচ্ছা ব্যক্ত করতে সাহস পেত। অবহিত করত তার মানসকন্যার প্রতি অব্যক্ত ভালবাসার কথা। সেই ভালবাসার গুড়ে এখন বালুকণার আস্তরণ।

গৃহাভিমুখে প্রত্যাগমনের ইচ্ছাটা হৃদয়ের গহীনে ক্ষণে ক্ষণে খোঁচা দিচ্ছিল। পদ্মাবতী যখন কাশবনের আড়ালে তাকে আবিষ্কার করল তখন জয়দেব তাকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করতেই পারত। কিন্তু কামলীলা চরিতার্থ করার মানস জয়দেবের চেতনাপ্রাপ্ত কখনও হয়নি। সর্ব সময়ই তার ভালবাসার রসায়নে প্রগাঢ় শ্রদ্ধার মিশ্রণ ছিল।

মানসপটে পদ্মাবতীর রুদ্রমূর্তি ভেসে উঠল। ভীষণ অভিমানে সে দ্রুততর পাদবিক্ষেপে সম্মুখ পানে অগ্রসর হল।

আর সে কখনও নারীশ্বরী পদ্মাবতীর কাছে প্রত্যাবর্তন করবে না।

 

১৯.

পদ্মাবতীর দাদু কুঞ্জ-কুটির-বেশ্মে অবস্থান নেওয়ার পর থেকে বাসুদেবের পরিবারের আবহ বিস্তর পরিবর্তন হয়েছে। আচার-আচরণের পরিবর্তন হয়েছে। ধর্মে-কর্মেও পরিবর্তন লক্ষিত হয়। দাদু পদ্মাবতীর পরিণয়ের ইতিবৃত্ত অবহিত হয়ে অনেকটাই বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন। তিনি পদ্মাবতীকে পুনর্বার বিবাহে উদ্বুদ্ধ করতে সচেষ্ট হন। প্রবীণ শুকতারার সম্মতি আদায় করতে প্রয়াস পান। তিনি শুকতারাকে মন্ত্রণা দেন- একটি কন্যা শিশু যখন নারীত্ব প্রাপ্ত হয় তখন তার হৃদয়ের ও দৈহিক ক্ষুধা নিবারণের জন্য একজন যুবা পুরুষের সান্নিধ্য অতীব প্রয়োজন। এই প্রকৃতি প্রদত্ত অমোঘ বিধান থেকে আমার মেনকা দাদুকে তোমরা অহেতুক বঞ্চিত করতে পার না।

শুকতারা তর্ক করলেন, সমাজে মুখ দেখাব কী করে?

রাখ তোমার সমাজ। সমাজ আবার কী? সেটা সর্বাগ্রে ভাল করে জানা প্রয়োজন। তোমাতে আমাতে মিলেই তো সমাজ। যদি আমার পরিবারের কোন সদস্যের অন্তরে সুখ না থাকে সেকি সমাজ বহির্ভূত থাকবে। সমাজ কী তার সদস্য হিসেবে তাকে গণ্য করবে না? যদি সে সমাজের সদস্য হয়েই থাকে তাহলে সমাজের মঙ্গল হল কিভাবে!

আমার তো অন্তর চায় পিতৃব্য, প্রবৃত্তি সায় দেয় না, কী করব বল? আমি তো চাইই এর একটা বিহিত হোক।

বাসুদেব নীরবে শুনছিলেন। তিনি স্ত্রীর বাসনাকে প্রতিহত করতে উদ্যত হলেন, না না সে হয় না। ধর্ম অনুমতি দেয় না।

দাদুর বিরক্তি চরমে পৌঁছাল, কী যে বল পণ্ডিত। বোধের উদ্রেক কর। ভাল করে ভাব। না ভেবে নিজের মত নিয়ে অনড় থেক না।

বাসুদেব এই প্রবীণকে পিতৃতুল্য জ্ঞান করেন এবং যথোচিত সম্মান করেন। প্রবীণের ধমক ভোগে তার স্বর কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে গেল। তথাপি তিনি আপত্তি প্রকাশ করতে বামে দক্ষিণে মস্তক দোলাতে লাগলেন।

দুাদু বাসুদেবের মনের পরিস্থিতি অনুমানপূর্বক তাকে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সুযোগ ব্যতিরেকে আলোচনা দীর্ঘায়িত না করে তত্র স্থান ত্যাগ করলেন। বাসুদেবকে চিন্তনের সুযোগ দিয়ে তিনি পদ্মাবতীর উদ্দেশ্যে দাদু দাদু হাঁক ছেড়ে বহির বাটে প্রস্থান করলেন।

শুকতারা ইত্যবসরে স্বামীকে একান্তে পেয়ে স্বাভিলাষ প্রতিষ্ঠা করতে বললেন,

ওগো তুমি আপত্তি করছ কেন? একজন পুরুষ যদি শতেক নারীর পাণি গ্রহণ করতে পরে তবে আমার পদ্মাবতী পুনর্বার বিবাহ করলে দোষের কী?

পদ্মাবতী নারী জাতি। তার বিবাহ তার শৈশবে একবার হয়েছে। তার স্বামী হয়তবা এখনও জীবিত আছে। সমাজ এই সকল প্রশ্নের উত্থাপন করবে, আমি কি উত্তর দেব তাদের। সকলে আমাকে মান্য করে। আমার পরিবারে এইস্য অধর্ম সংঘটিত হলে অন্যরা আর কোন ধর্মের অনুশাসন গ্রহণ করবে না।

তা বুঝলাম। কিন্তু আমার মেয়ে সোমত্ত হয়ে গেছে। গৃহে তার স্বামী নেই। সে যদি এখন দেহপোজীবিনী হয় তুমি তাকে ফেরাতে পারবে, বল? তোমার ধর্মের ভাঁড় সকল নিশিযাপন করতে তার গৃহে সংগোপনে গতায়াত করবে। তখন আমার অস্মিতা সমাজের সম্মুখে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে না?

শুকতারার এই তিরস্কারে বাসুদেব স্তিমিত হয়ে পড়লেন। তার কণ্ঠ থেকে কোন শব্দ নিঃসৃত হল না। তিনি ভাবনায় পতিত হলেন। প্রকৃতই ধর্মের অনুশাসনের ভীতি প্রদর্শন করে উত্তরকালে প্রলোভন আর প্ররোচিত করে নারীদের বেশ্যাবৃত্তি অনুশীলন করতে উৎসাহদান করা হয়। তদন্তর নিজেদের ভোগবৃত্তি বিনা দ্বিধায় নিবৃত্তি করার প্রয়াস পায়।

দীর্ঘক্ষণ অধোমুখে বসে থাকলেন বাসুদেব। শুকতারাও কথা না বলে নিশ্চুপ ছিলেন। তিনি তার স্বামীর অন্তরকে ক্লিষ্ট করেছেন। তার অন্তরে আহতের বেদনা। দুহিতা অপ্সরা পদ্মাবতীর জীবন এইরূপ অপাঙক্তেয় হয়ে পড়বে তাদের কল্পলোকেও ছিল না। দশ বৎসর পূর্বে পদ্মাবতীর বিয়ে না দিলে অদ্য তার এই পরিণতি হত না। নিশ্চয়ই কোন রাজন্যপুত্র পদ্মাবতীর পানি গ্রহণ করত। দীর্ঘক্ষণ উভয়ে নিশ্চুপ থেকে বাসুদেব উদ্বেগ পীড়িত ক্ষীণ স্বরে বললেন,

পদ্মাবতীকে কে গ্রহণ করবে?

এই প্রশ্নটি উত্তুঙ্গ পর্বতের আকার নিয়ে প্রতিবন্ধকতার প্রাকার হয়ে সম্মুখে স্থির হয়ে রইল।

 

জয়দেবের গৃহ ত্যাগে দেবালয় অনেকটা আড়ম্বরহীন হয়ে রয়েছে। তত্রে সার্বক্ষণিক জয়দেবের উপস্থিতির অভাব বিরাজমান। পদ্মাবতীর ক্লিষ্ট অবয়বে বিষণ্নতার প্রলেপ। স্পষ্টই জয়দেবের বিরহে উর্বশীর চঞ্চলতা বিগত। পদ্মাবতী প্রতিনিয়ত অন্যমনষ্ক থাকে। তার অধ্যয়ন, গীত, নৃত্য কোনটাতেই মনোযোগ নেই। প্রীণ দাদু পদ্মাবতীর বিরসকাল প্রত্যহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

দাদু দেবচত্বরে তন্মনস্ক চিত্তে ডম্বরুর বাধনগুলো নিরীক্ষা করছিলেন। সকল শিক্ষার্থী পাঠ গ্রহণ করে নিজ নিজ নিবাসে ফিরে গেছে। কতক দিবস পূর্বেও অলস প্রহরে দাদু জয়দেব আর পদ্মাবতীর সঙ্গে গীত, নৃত্য নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। পূর্বাহ্ন নির্দেশের ব্যাপারে শান্ত বিষয় এবং মধ্যাহ্ন নির্দেশের জন্য উদ্দীপনাযুক্ত বিষয় প্রয়োগ করতেন। অপরাহ্ন নির্দেশের জন্য জয়দেব রচিত করুণামিশ্রিত ধ্রুবা গাওয়া হত। জয়দেব নেই। পদ্মাবতী সঙ্গীহীন। তার সাধনায়ও বিরামের আবেশ। পদ্মাবতীর মৌনতা প্রবীণকে ভীষণ পীড়া দিচ্ছিল।

পদ্মাবতী দাদুকে একা দেবচত্বরে উপবিষ্ট দেখে নিকটে এসে বসল। দাদু নিজের কার্য সম্পাদন থেকে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন না করে বললেন,

জয়দেবের বিরহে কাতর হয়ে পড়েছ, দাদু?

পদ্মাবতী যেন ধৃত অপরাধী। নিজেকে মুক্ত করার জন্য সন্ত্রস্ত কণ্ঠে ত্বরিত উত্তর দিল, কী যে আবোল তাবোল বলো না দাদু!

দাদু পূর্ববৎ ডম্বরুর ডোর দৃঢ় করতে ব্যস্ত থাকলেন।  পদ্মাবতীর উত্তরের প্রত্যুত্তর করলেন না।

পদ্মাবতী অকস্মাৎ দাদুর হেন প্রশ্নে তটস্থ হল। তাহলে দাদুর শ্যেনদৃষ্টি সর্ব দিকেই বিস্তৃত। তার অন্তরের উথাল পাথাল পরিস্থিতির সন্ধানও তিনি রাখেন। এই প্রাজ্ঞ প্রীণের কাছে অন্তরের নিভৃতে জমে থাকা কথাগুলো কী উদ্গীরণ করে ফেলবে! জয়দেবের সংগোপন আচরণটা প্রকাশ করে দেবে! দাদু কিছু বলছে না কেন! আমার হৃদয়ের গহীনে অগ্নি সংযোগ করে তার উত্তাপ নিচ্ছে না কি? চতুর বৃদ্ধ!

পদ্মাবতীর অস্থিরতা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। হৃদয়ের স্পন্দন দ্রুততর হচ্ছিল। পদ্মাবতী ভেবেছিল, সেও তো জয়দেবের সঙ্গে শালীন আচরণ করেনি। সে নিজেই তাকে প্রশ্রয় দিয়েছে। আবার কপট আচরণ করে তাকে অপমানও করেছে। এইরূপ ভাবনা অন্তকরণকে সংকুচিত করছিল। সেখানে একটা হতাশা, বেদনার প্লাবন বয়ে যাচ্ছিল।

প্রীণ দাদু এতক্ষণ নিবিষ্ট চিত্তে নিজের কর্ম করছিলেন। তিনি পদ্মাবতীকে চিন্তা করার সময় দিলেন নাকি নিজে প্রস্তুত হলেন সঠিক বোঝা গেল না। ডম্বরুতে কয়েকটি চাটি মেরে পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে পদ্মাসনের নির্মিত ক্রোড়ে বাদ্যযন্ত্রটা রেখে পদ্মাবতীর দিকে চাইলেন। পদ্মাবতী ডাগর নেত্রদ্বয় পূর্ণ উন্মীলন করে দাদুর পানে চেয়ে ছিল। দাদুর অভিজ্ঞ নয়নে তার দৃষ্টি স্থাপিত হয়ে গেল। ভাষাহীন নেত্রে শুধুই অনুনয় সন্তরণ করছিল। প্রীণের হৃদয়ে উর্বশীর জন্য ক্ষতের সৃষ্টি হল। তার প্রজ্ঞা আন্দোলন করতে প্রবৃত্ত হল। তিনি পদ্মাবতীর স্থাপিত দৃষ্টিকে নিষ্পলক নয়নে চেয়ে থাকলেন। অতঃপর স্নেহমিশ্রিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

জয়দেবের জন্য অন্তরে ক্লেশ বোধ হচ্ছে দাদু?

পদ্মাবতী এবার কোন ধৃষ্টতা প্রদর্শন করতে পারল না। তার নিরুত্তাপ ডাগর নয়নের কৃষ্ণ মণিদ্বয়ের অবধাতকোল উপচে শ্রাবণধারার প্রপাত।

দাদু উত্তরের অপেক্ষা করলেন বোধ হয়। তারপর পরামর্শ স্বরে বললেন,

জয়দেবের সন্ধানে গৃহ থেকে নির্গমন হতে হবে দাদু।

পদ্মাবতী দাদুর কথায় ভীত হরিণীর ন্যায় চঞ্চল হয়ে উঠল। মুহূর্ত অবকাশে -না না- করে উঠল,

যে গেছে তাকে যেতে দাও। তোমাকে তাকে খোঁজার জন্য কোথাও যেতে হবে না। তুমি চলে গেলে আমি বাঁচব না।

পদ্মাবতীর আকুল আকুতি দাদুকে ভীষণ বিমর্ষ করে ফেলল। তার হৃদয়ে উৎসারিত সকল ভালবাসা চোখে-মুখে এসে স্থির হয়ে গেল। বিহ্বল চিত্ত দেহকে অসাড় করে দিল। এই যুবতী যে প্রচ-ভাবে ভালবাসতে পারে বৃদ্ধ সন্ন্যাসী কণায় কণায় অনুভব করতে পারলেন। তাহলে জয়দেব কেন বুঝতে পারল না। তিনি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে পদ্মাবতীকে প্রশ্ন করলেন,

দাদু, তোমার আর জয়দেবের মধ্যে কি বিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?

পদ্মাবতী হরিণী-দৃষ্টিতে দাদুর পানে চাইল। মুখে রা করল না। ভীষণ বিপন্ন বোধ হচ্ছিল। দাদু কি কেবল অনুমান করছেন, নাকি বদ্ধমূল ধারণা থেকে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে চাচ্ছেন। দাদুর কাছে কি আত্মসমর্পণ করবে সে? পরক্ষণেই সে সিদ্ধান্তে উপনীত হল- নাহ্ জয়দেবের অকর্ম প্রকাশ করে নিজের শুদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস করবে না। জয়দেবের মর্যাদা গগনস্পর্শী। তার চরিত্রে কোন কলুষ নেই। বরং সে স্বয়ং কতভাবেই তাকে প্রলোভিত করার চেষ্টা করেছে। এমনকি দিবসাবসানের পর সমস্ত তিমির নিশি কপাট উন্মুক্ত করে রেখেছে। জয়দেব তার এই নীরব আহ্বানে কখনই সাড়া দেয়নি। জয়দেবের মত জ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান সুপুরুষদের পক্ষেই এটি সম্ভব। জয়দেব মানুষ নয়, দেবতা।

 

২০.

দাদু পদ্মাবতীদের গৃহ ত্যাগ করে পরিভ্রমণে নির্গত হয়েছেন। প্রগমনের পূর্ব-সন্ধ্যায় বাসুদেবের সম্মতি গ্রহণ করেছিলেন। পদ্মাবতীকে কোন ধারণা দেওয়া হয়নি। দাদু জানতেন পদ্মাবতীর কাছ থেকে কোনক্রমেই অনুমতির প্রাপ্তি হবে না। পদ্মাবতী দাদুর গৃহত্যাগের প্রস্তাব অনুমোদন করবে না। ইতোপূর্বে একাধিকবার দাদু গৃহ ত্যাগের অনুমতি প্রার্থনা করেছেন। পদ্মাবতী সম্মতি প্রদান করেনি। পদ্মাবতীর অপার নির্মল ভালবাসার কাছে প্রীণ দাদু নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন। তাই, অদ্য তিনি পদ্মাবতীর অজ্ঞাতসারে সংগোপনে প্রত্যুষের পূর্বেই বাহুল্যবর্জিত প্রস্থান করেছেন।

পদ্মাবতীর ঋষি দাদু তার সম্পূর্ণ জীবনটা এভাবেই বাহিত করেছেন। দশ বর্ষ বয়সে দাদু গৃহহীন হয়েছিলেন। গত পাঁচ যুগেরও অধিককালে কোথাও এত অধিক দিবস যাপন করেননি। যৌবনে গুরুর সঙ্গে যততত্র ভ্রমণকালে পঞ্চবার বিবাহ বন্ধনে নিজেকে জড়িয়েছেন, স্থিত হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সংসার ধর্ম পালন করা হয়ে ওঠেনি। কোন নারী তাকে প্রেমালিঙ্গনে আবদ্ধ রাখতে পারেনি। প্রেম জীবনে এসেছে তবে একটিও স্থায়ী হয়নি। তার প্রেম-অপার্থিব, দৃষ্টির ওপারের, সীমার বাইরের সাথে। যে প্রেম তাকে অহর্নিশ ভাবায় সেই ভাবের মোহে তিনি বিভোর। প্রপঞ্চময় বিশ্বসংসারের ক্রীড়া তাকে মোহাবিষ্ট করে না। সুদূরের জীবন মরণের ওপারের বিশ্বে তার আসক্তি। এই ভাবের দাদুকে নবীন প্রাণের প্রেম কী আচ্ছন্ন রাখতে পারে!

প্রত্যুষে পদ্মাবতী নিত্যকার মত সেই দিবসও কালিগঙ্গায় অবগাহনে পরিশুদ্ধ হতে যায়। এখন তার অঙ্গে বসন থাকে প্রতিনিয়ত। বস্ত্রহীন অঙ্গে সে আর কালিগঙ্গায় স্নান সারে না। জয়দেব হরিকোটি গ্রাম ত্যাগ করার পর আর কখনই পদ্মাবতী নিজের দেহকে প্রকৃতির কাছে অনাবৃত করেনি। যৌবন প্রাপ্তির পর বসনহীন দেহের সাথে নিভৃতে ক্রীড়া করতে ভাল লাগত। জয়দেব তার নগ্ন শ্রীঅঙ্গের গোপন পুজারী ছিল। একদিবস সে জয়দেবকে আবিষ্কার করে ফেলে। জয়দেব গোপনে পদ্মাবতীর নগ্নমূর্তি দেখে দৃষ্টি শীতল করছিল। সেই দিবস থেকে পদ্মাবতী প্রায়ই নিজের বসন খুলে ফেলে জয়দেবকে কামনা করত। জয়দেবকে উদ্দীপ্ত করতে যুবতীর ভাল লাগত। নিজের দেহকে আবরণ মুক্ত করে জয়দেবকে আকর্ষণ করতে তার হৃদয় চঞ্চল হত। কিন্তু জয়দেব তার সন্নিকটে কখনও আসতে সাহস পায়নি। দূর থেকে সে শুধু অবলোকনে নিজেকে পরিতৃপ্ত করত। পদ্মাবতী প্রায় দিবসেই জয়দেবের গোপন বিহার লক্ষ্য করে আনন্দ উপভোগ করেছে। নিজেকে উন্মুক্ত করে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। কিন্তু জয়দেব পদ্মাবতীর এই নীরব আহ্বানে সাড়া দেয়নি। শরতের সেই প্রত্যুষে জয়দেবকে নাগালের মধ্যে পেয়ে বিবস্ত্রাবস্থায় তাকে ধৃত করে কপটাচরণে প্রবৃত্ত হয়। পদ্মাবতীর প্রবৃত্তিতে প্রকট কাম নিহিত ছিল। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি যে, জয়দেব এহেন নির্বোধ আচরণ করবে। জয়দেব তাকে গোপন দিদৃক্ষায় রূপ হরণ করতেই মত্ত থাকত। দেহ হরণ করার মানস-সাহস তার ছিল না। নচেৎ এত নিবিড় ভাবে তাকে পেয়েও কত দূরে চলে গেছে। আর হয়ত জীবনে তার সাক্ষাৎ পদ্মাবতী পাবে না। বিচক্ষণ জয়দেব শুধু জ্ঞানাহোরণ করেছে পদ্মাবতীর হৃদয়ে নিভৃতে লালিত কামনা বাসনার মন্ত্রগুলো উদ্ধার করতে পারেনি। অথচ, হৃদয়ে গভীর ক্ষত নির্মাণ করে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল!

শীতল ঋতু শেষে হয়ে গেছে। তবু কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে পৃথিবী। আজ সম্ভবত ভানুকরের দেখা পাওয়া যাবে না। ঘন কুয়াশায় দৃষ্টি গোচর হচ্ছে না। তটিনীর শীতোষ্ণ জলে অবগাহন করে আর্দ্র বস্ত্রে পিঠক্ষীরা কুসুমের দুটি ছড়া তুলে নেয় দেবত্রয়ের পাদপদ্মে অর্পণের জন্য। দাদুর কি এখনও নিদ্রা ভঙ্গ হয়নি। দাদু তো প্রত্যুষে উপবনে পদচালনা করেন। পদ্মাবতীকে তার পছন্দের ফুল দেখিয়ে দেন। পদ্মাবতী দাদুর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ভাললাগাকে বিসর্জন দিয়ে তার পছন্দের গুরুত্ব দেয়। অদ্য দাদু সেখানেও উপস্থিত ছিলেন না। তাহলে! সন্দেহের উদ্রেক হয় তার। গৃহে প্রবেশ করে নিজের সিক্ত বস্ত্র খুলে ত্বরিত শুষ্ক পাটাম্বর পরিধান কর। উষসীর ঘণ কুয়াশা তখনও আচ্ছন্ন করে রেখেছে ক্ষৌণির বক্ষ। হঠাৎ প্রচণ্ড শীত পদ্মাবতীর সমস্ত শরীরকে আড়ষ্ট করে ফেলে। দেবগণের সম্মুখে পুষ্পার্ঘ্য দিয়ে প্রণাম নিবেদন করে পদ্মাবতী। দ্রুত দেবচত্বর পরিত্যাগ করে উঠান পেরিয়ে দাদুর কক্ষে প্রবেশ করে। না, দাদু সেখানে নেই। শয্যার মধ্যেখানে ডম্বরু সযত্নে রাখা আছে। কিন্তু, একতন্ত্রী পিনাক নেই। পাগলিনীর মত ধাবনে পদ্মাবতী বাসুদেবের সম্মুখে উপস্থিত হয়। বাসুদেব শঙ্খ হস্তে দেবালয়ে উপবিষ্ট ছিলেন। গৌরববতী ষোড়শী উর্বশী পিতার সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। কোন রা করে না। বাসুদেব অবাঙমুখে উপবেশন করে আছেন। পদ্মাবতীর বুঝতে বিলম্ব হয় না যে দাদু গৃহ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছেন। ক্ষোভে বিষাদে পদ্মাবতীর শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল। সে দ্রুত গৃহ ছেড়ে কাশবনের ঝোপ পেরিয়ে কালিগঙ্গার তটে হিজল তমালের শষ্পাবৃত তলায় এসে দাঁড়াল। পদ্মাবতী তার আলোড়িত হৃদয়কে প্রশমিত করতে হিজল তমাল তলায় এসে উপস্থিত হয়। অদ্য হৃদয়াভ্যন্তরে তুমুল ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ঝড়ের প্রবল প্রমত্ততায় হৃদয়কমল ছিন্ন ভিন্ন হতে চায়। চতঃপার্শ্বে হা-হুতাশ, ক্রন্দন। সবুজ ঘাসের শীর্ষে শীর্ষে জলের মুক্তা বিন্দু। কুয়াশাচ্ছন্ন, প্রকৃতিতে আবছা দৃষ্টি। বিলুণ্ঠিত অঞ্চল সহস্র সহস্র শষ্পের অশ্রু জলে সিক্ত। হিজল পত্রের গাত্র বেয়ে ফোটায় ফোটায় জল অনবরত তার কৃষ্ণকেশাবৃত মস্তকে পড়ে সহমর্মিতা জ্ঞাপন করছে।

কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতি পদ্মাবতীর চোখের জল হয়ে পৃথিবীর সর্বত্র সমবেদনা প্রেরণের দায়িত্বে নিয়োজিত। অথচ পদ্মাবতীর চোখে জল নেই। শুষ্ক নেত্রদ্বয়ে তপ্ত মরুর খরানি। এ কোন রহস্য? জগদীশ্বরের এ কোন লীলা? ঈশ্বরের খাতায় পদ্মাবতীর জৈবিক জগতে প্রবেশ নিষেধ। কোথায় কীর্ত্তনিয়া! যার অপেক্ষায় অদ্যাবধি স্বপ্নের গ্রন্থন। যুবতীর জয়দেব তার সকল ভালবাসা ম্লান করে দিয়ে কাপুুরুষের মত পলায়ন করল। অদ্য দাদুও তাকে ত্যাগ করে নিরুদ্দেশ। এই বৃদ্ধটির মায়া যে বড়ই যন্ত্রণাদায়ক।

অদ্য শিশিরস্নাত হিজলতমালও পদ্মাবতীকে সান্ত¡না দিতে সাহস পাচ্ছে না। ক্রন্দনরত হিজলের নেত্রধারা তার পট্টবস্ত্রাবৃত সর্বশ্রীঅঙ্গে অনবরত টুপটুপ পড়তে থাকল। আর্দ্রীকৃতা পদ্মাবতী হৃদয়ে দৃঢ় প্রত্যয় স্থির করলÑ আর কোন প্রাণে ভালবাসার মোড়ক উন্মোচন করব না।

 

*এই বংশলতিকার সদস্যরাই বঙ্গ দেশে পরবর্তীকালে

আদিব্রাহ্মণের বংশধর বলে বিবেচিত হন।