সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

থাবড়া হামিদ – কাজী জহিরুল ইসলাম

September 20th, 2016 7:43 am
থাবড়া হামিদ – কাজী জহিরুল ইসলাম

উপন্যাসিকা

থাবড়া হামিদ

কাজী জহিরুল ইসলাম

 

উঠানের মাঝখানে ইজিচেয়ারে শুয়ে বিশাল নিমগাছের দিকে তাকিয়ে আছেন আব্দুল হামিদ। নিমগাছের ডালে বসে একটি মা কাক তার বাচ্চার মুখে আহার তুলে দিচ্ছে। এই দৃশ্য দেখতে আব্দুল হামিদের খুব ভালো লাগছে। আচ্ছা, যে কাকটি বাচ্চার মুখে আহার তুলে দিচ্ছে সেটাতো মা না হয়ে বাবা কাকও হতে পারে, পারে না? আব্দুল হামিদ ভালো করে তাকিয়ে দেখেন যে কাকটি বাচ্চার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে তার গায়ের রঙে ছাইয়া ভাব, তেলতেলে কালো না। পুরুষ পাখিদের গায়ের রং উজ্জ্বল হয়, দেখতে খুব সুন্দর হয়। মেয়ে পাখিগুলোর গায়ের রং হয় মরা। শুধু পাখি নয়, পশুদের বেলায়ও এই রীতি প্রযোজ্য। পুরুষ সুন্দর, নারী অসুন্দর। খালি মানুষের বেলায় উল্টো রীতি, নারী সুন্দর, পুরুষ অসুন্দর। নারী সুন্দর, কথাটা মনে হতেই আব্দুল হামিদের মৃতা স্ত্রীর মনে পড়ে গেল। নূরবানু ছিলেন অতি সুন্দরী এক নারী। যার রূপের কোনো তুলনা হয় না। অথচ এই রূপবতী নারীর সঙ্গে তার বিয়ে প্রায় ভেঙেই যাচ্ছিল।

সব ঠিকঠাক। ইমাম সাহেব বিয়ে পড়াতে চলে এসেছেন। হঠাৎ মেয়ের বাবা বলে বসেন, বেয়াই সাহেব, ভালো করে আরেকবার ভেবে দেখেন, আমার মেয়ে কিন্তু চোখে দেখে না।

– চোখে দেখে না?

– কানেও শোনে না।

– কানে শোনে না?

– কথাও বলে না।

– বোবা?

বাবা খুব রাগী মানুষ। তিনি লাফ দিয়ে উঠে বলেন, একটা বোবা, কানা মেয়েকে তো আমি ছেলের বৌ করে ঘরে তুলতে পারি না। ঘটক সাহেব সাথে সাথে বাবার হাত ধরে বলেন। ভাই সাহেব, কন্যার বাবা মারেফতি কথা বলেছেন। এই কথার মাজেজা আছে। আপনি আগে মেয়ে দেখেন। তারপর সিদ্ধান্ত নেন।

মেয়ে কোকিল পাখির মতো কথা বলছে।

– আমার নাম নূরবানু।

বাবা বলেন, মাশাল্লাহ। মেয়ে কথা বলছে। অতি সুমিষ্ট কণ্ঠ। বেয়াই সাহেব ইমাম সাহেবকে বিয়ে পড়াতে বলেন।

বৌ নিয়ে ফেরার সময় নূরবানুর বাবা আলি আকবর খাঁ বাবার হাত ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন। বেয়াই সাহেব, এই মেয়েকে আমি অতি আদরে মানুষ করেছি। কখনও গায়ে রোদ লাগতে দেইনি। সে তার সতের বছরের জীবনে কোনোদিন একটি খারাপ কথা বলে নাই, কারও সঙ্গে ঝগড়া করে নাই। এই জন্যই বলেছিলাম আমার মেয়ে বোবা। নিজ কানে সে কারও কোনো খারাপ বুদ্ধি-পরামর্শ গ্রহণ করে নাই, রাগ বা ঘৃণার দৃষ্টিতে কারও দিকে চোখ তুলে তাকায় নাই। তাই বলেছিলাম আমার মেয়ে কানা, বয়রা। বেয়াই সাহেব, আমার অতি আদরের নুরবানুকে আপনার হাতে তুলে দিলাম। তাকে আপনি নিজের মেয়ের মতো করে রাখবেন।

– বেয়াই সাহেব, আপনার মেয়েকে আমি নিজের কন্যার মতো করে রাখতে পারবো না। নিজের কন্যাকে আমি কথায় কথায় বকা-ঝকা করি। এই মেয়েকে আমি বকা দিতে পারবো না।

আলি আকবর খাঁ জোরে জোরে শব্দ করে কাঁদতে শুরু করেন।

আগামীকাল নূরবানুর ছেলের বিয়ে। ভদ্রমহিলা বেঁচে থাকলে খুবই আনন্দিত হতেন। পাঁচ বছরের শিশু ছেলেকে রেখে তিনি চলে গেলেন।

মকবুলের হাতে একটি বাটি। সে বাটির দিকে তাকিয়ে অতি সাবধানে হেঁটে উঠানের দিকে আসছে। মনে হয় বাটিতে কোনো তরল পদার্থ আছে। চোখ সরালেই তা পড়ে যাবে। মকবুল যেভাবে বাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটছে তাতে যেকোনো মুহূর্তে সে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে পারে।

আব্দুল হামিদের মাথার কাছে বাটি হাতে দাঁড়িয়ে আছে মকবুল।

– বাটিতে কি মকবুল?

– সালুন চাচাজি। আমি নিজ হাতে রান্না করেছি।

মকবুল আদপের সাথে আব্দুল হামিদের দিকে বাটিটা বাড়িয়ে ধরে।

– কিসের সালুন রান্না করেছ?

– বিরিক্ষি তোমার নাম কি ফলে পরিচয়। সালুন তোমার নাম কি স্বাদে পরিচয়। চাচাজি, আগে আপনি খেয়ে বলেন স্বাদ কেমন হয়েছে, তারপর সালুনের পরিচয় বলবো।

হামিদ এক চামচ সুরুয়া মুখে দিয়ে বলেন, স্বাদ ভালো হয়েছে। তোমার রান্নার হাত ভালো। এখন বলো সালুনের নাম কি?

– এই সালুনের নাম কুনা গোশ। লাহোরের ইশপিশিয়াল ডিশ। জি-টিভির খানা খাজানা অনুষ্ঠানে দেখিয়েছে। চাচাজি, বিবাহের রান্না কি আমি করবো?

মকবুলের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস।

– না, তুমি করবে না।

মকবুলের মুখে কালো মেঘ। সে মাথা চুলকাচ্ছে।

– শোন মকবুল। তোমার রান্নার হাত ভালো। কিন্তু বিয়ে বাড়ির আয়োজন বড়। তাছাড়া তুমি রান্নায় ব্যস্ত থাকলে আমার সাথে কে থাকবে?

– জ্বী চাচাজি। এখন বুঝতে পেরেছি।

– মকবুল, আমার মনে হয় সালুনটার নম কুনা গোশ না, ভূনা গোশ। বড়ই সোয়াদ হয়েছে। রেসিপি কি?

খুক খুক করে কাশি দেয় মকবুল। এর অর্থ হলো, চাচাজি আপনি সব জান্তা না। এই খাবারের নাম কুনা গোশ। ভূনা গোশ না। কুনা গোশ রান্না করা হয় খাঁটি সরিষার তৈল দিয়া। সাথে সামান্য দৈ আর হজ পাতা।

– জে চাচাজি। রেসিপি তেমন কিছু না। খাসির রানের গোশত, সাথে সরিষার তৈল, দৈ আর হজ পাতা। এছাড়া অন্যান্য গোশতের মশলা। বিয়ে বাড়ির রান্না-বান্নার জন্য কি রহমান বাবুর্চিকে খবর দিব?

– খবর দেওয়া হয়েছে। একটা প্রশ্নের উত্তর দেও তো মকবুল। মানুষ ও পশুপাখির মধ্যে পার্থক্য কি?

অতি কঠিন প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর মকবুল জানে না। মকবুল ভাবছে, আমি কি কোনো ভুল করলাম? পশু-পাখি পর্যায়ের কিছু করে ফেলেছি? চাচাজি নিশ্চয়ই আমাকে পশু-পাখির সাথে তুলনা করতে শুরু করেছেন।

– মকবুল, তোমাকে আমি কোনো পশু-পাখির সাথে তুলনা করছি না। প্রশ্নটা অন্য কারণে করেছি।

মকবুলের গলা শুকিয়ে যায়। এক গ্লাস পানি খেতে পারলে ভালো হতো। চাচাজি মনের কথা বুঝতে শুরু করেছে। এবার তার কপালে একটা রাম-থাবড়া আছে। চাচাজির নাম আগে ছিল থাবড়া হামিদ। চেয়ারম্যান হওয়ার পর হয়েছে থাবড়া চেয়ারম্যান। থাবড়া চেয়ারম্যানের থাবড়া খায় নাই সদর ইউনিয়নে এমন লোক নাই। মকবুল খেয়েছে আঠারবার। উনিশতম থাবড়ার জন্য নিজেকে তৈরি করছে মকবুল। চারবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগিরি করে এইবার হয়েছে উপজেলা চেয়ারম্যান। এখন থাবড়া দেওয়ার তরিকাও বদলে গেছে। আগে যখন তখন থাবড়া মারতেন। এখন মারেন আয়োজন করে। আয়োজন করে লোক ডেকে থাবড়া মারা বিরাট বে-ইজ্জতি ব্যাপার।

kazi-zohirul-islam-1

– চাচাজি বুঝতেছি না।

– কিছু একটা বল। কিছু না পারলে বল যে পশুর চার পা আর মানুষের দুই পা।

– জ্বে চাচাজি। এইটা একটা পার্থক্য। আরও একটা আছে। মকবুল মনে মনে ভাবছে, পশু কাউরে থাবড়া দিতে পারে না। মানুষ পারে। কিন্তু মুখে বলে, পশুর শিং আছে, মানুষের নাই। হৈছে না চাচাজি?

– হুঁ, হৈছে। তরকারির বাটিটা মকবুলরে হাতে দিয়ে ইজি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান হামিদ চেয়ারম্যান।

– আরও একটা বড় পার্থক্য আছে, বুঝলা মকবুল। তুমি আরও চিন্তা করো। না বাইর করতে পারলে, পরে তোমাকে বলবো। এখন যাও, লঞ্চঘাটে গিয়া দেখ তোমার রূপ মিয়া ভাইসাব আইছে কি-না। আমি বাজারে যাব। রূপ মিয়া আসলে আমারে খবর দিবা। এডভোকেট হারুনের চেম্বারে পাবে আমাকে।

মকবুল পন্টুনে বসে মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে মেঘনার টলমলে পানির দিকে। একদল স্যালভ্যালা মাছ কিলবিল করছে। এক লোক একটি বনরুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে পানিতে ফেলছে। সেই রুটির টুকরো খাওয়ার জন্য মাছগুলো বেছুইন হয়ে আরও বেশি কিলবিল করছে। মকবুলের মাথার ভিতর এখন একদল স্যালভ্যালা মাছের মতো কিলবিল করছে মানুষ ও পশু-পাখির মধ্যে পার্থক্যগুলো। চাচাজির মনের ভিতর যেই পার্থক্যটা আছে সেইটা বের করতে না পারলে একটা থাবড়া খেতে হবে। আয়োজন করে থাবড়া। উঠানের চারদিকে জনাপঞ্চাশেক মানুষ। সবাই তাকিয়ে আছে মকবুলের গালের দিকে। চাচাজি এসে ঠাশ করে একটা থাবড়া মারলেন। সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। বিরাট বে-ইজ্জতি ব্যাপার। বে-ইজ্জতি থেকে বাঁচার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে মকবুল।

পার্থক্যগুলো লিখে ফেলা দরকার। মকবুল সামান্য পড়াশুনা জানে। লিখতে গেলে বানান ভুল হবে। তাতে কোনো অসুবিধা নেই। কুদ্দুসের ঘর থেকে এক তা কাগজ আর একটি কাঠপেন্সিল কিনে আনে মকবুল। পন্টুনের বেঞ্চে বসে লিখতে শুরু করে। এক তা কাগজে কাঠপেন্সিল দিয়ে লেখা বড়ই জটিল বিষয়। পেন্সিলে চাপ দিলে কাগজ ফুটা হয়ে যায় আবার চাপ না দিলে দাগ পড়ে না। মকবুল যা লিখেছে তা মোটামুটি কষ্ট করে পড়া যাচ্ছে।

১. মানুসের দুই পাও, পসুর চার পাও।

২. মানুস রাননা করে খাই পসু কাছা খাই।

৩. মানুস কাপর পরে পসু পরে না। (বেসি সিত পরলে গরুদের গায়ে ছালা পরানো হয়)

৪. মানুসের সরম আছে পসু-পাখির নাই।

৫. মানুস বিচানায় সুয়ে গুমায়, পসু-পাখি দারায়ে গুমায়।

৬. পসু-পাখি সকলের সামনে হাগা-মুতা এবং ঐ কাজ করে কিন্তু মানুস এইসব লুকায়ে করে। (ছুটু সিসুদের কথা আলাদা। তাহারা সকলের সামনে হাগা-মুতা করে বলে তাহারাও পসু-পাখিদের দলে পড়ে)

৭. মানুস বিয়া-সাদি করে, পসু-পাখি বিয়া-সাদি করে না।

৮. মানুসে মানুসে বরলোক ছোটলোক আছে, পসু-পাখিদের মদ্যে বরলোক ছোটলোক নাই। (থাকলে থাকতেও পারে আমরা জানি না)

পশু-পাখিদের মধ্যে বড়লোক-ছোটলোক আছে কি-না এই বিষয়টা ভালো করে জানা দরকার। রূপ মিয়া ভাইসাব ওকালতি পাস দিয়েছে। ভাইসাবকে জিজ্ঞেস করলে বলতে পারবে। উকিলদের সকল বিষয়ে জ্ঞান থাকে। অন্য কোন পেশার মানুষের থাকে না।

একটি ছেলে রুটি নিয়ে পন্টুনে ঢোকে। এই লুডি লুডি লুডি.. এই লুডি লুডি লুডি…।

এই ছেলেকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয় পশু-পাখিদের মধ্যে বড়লোক ছোটলোক আছে কি-না? না থাক। সে পারবে না। মকবুল পন্টুনের এ-মাথা, ও-মাথা হাঁটছে।

-এই যে লুডিঅলা বাই।

– ছুডু বন দুই টিয়া, বড়বন তিন। ফাউলুডি, ইডা, বড়ডা, অস্টো টিয়া। কোনডা নিবেন?

– একটা কথা জিগাইতাম।

– কি কতা, চালাইয়া কন?

– পসু-পাখির মৈদ্যে বড়লুক-ছুডুলুক আছে নি-ও?

– অবশ্যই আছে। অস্ট্রেলিয়ার গাই দেখছেননি? আধমণ দুধ দেয়। হেইডা ঐলো বড়লুক। আর আমরার দেশি গাই, যিডা দেড় সের দুধ দেয়, হেইডা ঐলো গিয়া ছুডুলুক। অহন লুডি নিবেন নি কন। নঞ্চের টাইম ঐছে, আমার লেডি অয়ন লাগবো।

মকবুল রুটিঅলার কথার জবাব না দিয়ে কাগজ পেন্সিলে মনযোগ দেয়। ওর মনের ভিতর মানুষ ও পশু-পাখির মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য যেটি ঘুরপাক খাচ্ছে সেটি লিখে ফেলে।

৯. মানুস চেত উটলে অন্য মানুসরে থাবড়া মারে কিন্তু পসু-পাখি তা করে না।

নবীনগর ঘাটে ঢাকার লঞ্চ ভিড়ে দুপুর আড়ইটায়।

রূপ মিয়াকে রিসিভ করার জন্য মকবুল ছাড়াও আরও একজন এসেছে, নাসরিন। নাসরিন রূপ মিয়ার ছোট আম্মার মেয়ে। নবীনগর কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। নাসরিনের গায়ের রং শ্যামলা হলেও চেহারা মিষ্টি, মায়াভরা মুখ, ভাসা ভাসা চোখ। নাসরিনের চোখের মণি দুইটা অতিরিক্ত কালো হওয়ার কারণে মায়াময় ভাবটা আরও বেড়েছে। গ্রাম দেশের মেয়েদের উচ্চতা কম হয়। এই মেয়ে পেয়েছে শহরের উচ্চতা। এই বয়সেই পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি। লম্বা মেয়েদের মুখের লাবণ্য কমে যায়। এই মেয়ের লাবণ্য কমে নাই। বরং আরও বেড়েছে। অতিরিক্ত লম্বা হওয়ার কারণে বাবার মতো সে-ও একটি নাম পেয়েছে, লেডি অমিতাভ। লেডি অমিতাভ উঁকি মেরে লঞ্চের কেবিনের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করছে। রূপ মিয়াকে দেখা যাচ্ছে না।

– মকবুল ভাই, ভাইয়া কি আসে নাই? ভাইয়া যদি না আসে, আব্বাজান বেজায় রাগ করবেন।

– আমি কি লঞ্চে উঠবো? কেবিনের ভিতরটা দেইখ্যা আসি?

– অবশ্যই দেখে আসবেন। লাফ দিয়ে লঞ্চে ওঠেন, দাঁড়ায়ে আছেন কেন?

মকবুলকে লঞ্চে উঠতে হলো না। রূপ মিয়া কেবিন থেকে বেরিয়ে আসছে। তার পেছন পেছন একটি লিকলিকে পাতলা ধবধবে ফর্শা বিদেশি মেয়েকেও দেখা যাচ্ছে, সেও লঞ্চ থেকে নেমে আসছে।

– মকবুল ভাই, ওই বিদেশি মেমটা কি ভাইয়ার সাথে আসছে?

– মনে হয় না। রূপ মিয়া ভাইসাব কোন আক্কেলে একটা মেয়েছেলে নিয়া বাড়ি আসবেন? তাছাড়া কাইল তার বিবাহ।

লঞ্চ থেকে পন্টুনে নামতে হয় কাঠের মই বেয়ে। বিদেশি মেয়েটি রূপ মিয়ার হাত ধরে নেমে আসছে। মকবুল হাত বাড়িয়ে রূপ মিয়ার ব্যাগটা নিয়ে নেয়। অন্য হাত বাড়িয়ে বিদেশিনীর ব্যাগ নিতে চাইলে সে বলে, নো থ্যাঙ্কস, আই ক্যান হ্যান্ডল ইট।

পন্টুনের পেছনে, লঞ্চঘাটে একদল মানুষের ভিড় জমে গেছে। এক কিশোর চিৎকার করে বলছে, কেডায় আছো দেইখ্যা যাও-ও থাবড়া চেয়ারম্যানের পুতে বিদেশি মেম বিয়া কৈরা আনছে।

খবরটা খুব দ্রুত নবীনগর বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। হারুন উকিলের চেম্বারেও তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যায়।

অ্যাডভোকেট হারুনের চেম্বারে এখন তিনজন মানুষ। অ্যাডভোকেট হারুন আর হামিদ চেয়ারম্যান ছাড়া তৃতীয় মানুষটি হচ্ছে মকবুল। মকবুল মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে কিছুটা আনন্দ। চাচাজির একটা উচিত শিক্ষা হয়েছে। এইবার যদি যারে-তারে থাবড়া দেওয়া বন্ধ হয়।

– মকবুল।

– জ্বে চাচাজি।

– বিষয় কি বল। লোকজন যা বলাবলি করতেছে তা কি সত্যি?

– সত্যি চাচাজি। রূপ মিয়া ভাইসাব বিদেশি মেম বিয়া কৈরা আনছে। মেমসাহেবে দেখতে পরির চেয়েও সুন্দর।

– মেম সাহেবের রূপের বর্ণনা দিতে বলি নাই। ঘটনা যে সত্যি তুমি বুঝলা কেমনে?

– ভাইসাব তারে হাত ধৈরা লঞ্চ থাইকা নামাইছে। ভাইসাব আপনের ছেলে। সে তো আর বেগানা আওড়াতের হাত ধরবে না।

– এই যুক্তিতেই তুমি নিশ্চিত হৈলা যে মেয়েটাকে রূপ মিয়া বিবাহ করেছে?

– জ্বি চাচাজি। আমি নিশ্চিত ভাইজানের সাথে যিনি আসছেন তিনি আমরার ভাবীসাব।

– এই মেয়ে সম্পর্কে রূপ মিয়া তোমাদের কিছু বলেছে?

– বলেছে, এর নাম করলা। বিলাতি মেম। আর কিছু বলে নাই।

– মেয়ের নাম করলা?

– জ্বি করলা। তয় তিতা করলা না, মিডা করলা। মেম ভাবিসাবের ব্যবহার আঙুর ফলের লাহান মিডা। আমারে খুবই ইজ্জত করছে। আমি তিনার ব্যাগ নিতে চাইলে বলে ‘নো নো নো, থ্যাঙ্ক থ্যাঙ্ক’। বয়সে মুরুব্বিতো, তাই ইজ্জত করছে। মেয়ের আদব লেহাজ ভালো। আমারে বলে ইউ চুইট।

– শোন মকবুল, তোমার যুক্তি ভুল হয়েছে। রূপ মিয়ার সাথে যে মেয়ে লঞ্চ থেকে নেমেছে। সে একটা এনজিও’র কাজে এসেছে। রূপ মিয়ার সাথে আসে নাই। লঞ্চেই তাদের পরিচয়। বুঝেছো?

– জ্বে চাচাজি বুঝেছি।

– তাহলে এখন যাও। তোমার দায়িত্ব হৈলো আগামী তিন ঘণ্টায় নবীনগর শহরে যারে পাইবা, তারেই এই কথা বলবা। বুঝতে পারছো মকবুল?

– জ্বে চাচাজি। সমঝে আসছে। একটা রিকশা ভাড়া করে মাইক দিয়ে বলবো?

– মকবুল, আমার সাথে ইয়ার্কি করবা না। এইটা ইয়ার্কির সময় না। এখন যাও। আল বিদা।

হামিদ চেয়ারম্যানের মুখ হাসি হাসি। হারুনের কাছে খুবই খটকা লাগে। চেয়ারম্যান খুব কঠিন এক সমস্যায় পড়েছে। এখন তার কপালে ভাঁজ থাকার কথা, মুখে হাসি থাকার কথা না। রতনপুর কাজী বাড়িতে ছেলের সম্বন্ধ ঠিক করেছেন। আগামীকাল বিবাহ। শিশু মিয়া কাজীর সাথে সম্বন্ধ হয়ে গেলে আগামী নির্বাচনে এমপি নমিনেশন নিশ্চিত। নমিনেশন না পাওয়া গেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পাস করে আসবেন। এখন যদি এই বিয়ে ভেঙে যায়, চেয়ারম্যানের পদ নিয়েই টানটানি পড়ে যাবে।

-হারুন, তুমি কি জান মুসা নবীর ভাইয়ের নাম ছিল হারুন।

-ছিল নাকি?

-প্রশ্নের জবাবে প্রশ্ন কর কেন? জানলে বলবা জানি, না জানলে বলবা জানি না। তোমার উকালতি প্যাচ আমার সাথে খেলবা না। এখন শোন। মুসা নবী যখন গহীন মরুভূমিতে পড়ে বনি ইসরাইলের ফালতু ষড়যন্ত্রে দিশাহারা তখন হারুন তাকে উদ্ধার করে। বুঝতে পেরেছো?

-অবশ্যই বুঝতে পেরেছি। এইটাতো ইতিহাস।

-এখন বল, এই ইতিহাস থেকে তুমি কি শিক্ষা গ্রহণ করেছো?

অ্যাডভোকেট হারুন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে চেয়ারম্যানের মুখের দিকে।

-বুঝ নাই? তুমি হৈলা এখন মুসা নবীর ভাই হারুন। এইবার বল, তুমি আমারে এই বিপদ থেকে কিভাবে উদ্ধার করবে?

-আপনে কি মুসা নবী?

-ধুর মিয়া, এতো পেচাও কে? আমি মুসা নবী না, আমি হামিদ, থাবড়া হামিদ। তুমিতো আমার ভাই হারুন, নাকি আমাকে তুমি ভাই মনে করো না?

-অবশ্যই ভাই মনে করি।

-তাহলে এখন বল, কিভাবে এই বিপদ থেকে আমাকে উদ্ধার করবে?

-বিষয় খুবই জটিল চেয়ারম্যান সাব। রূপ মিয়া যদি সত্যই বিদেশি মেয়েটাকে বিবাহ করে থাকে তাহলে একটা বেরাছেরা লাগ্যিা যাইব। শিশু মিয়া কাজী খুবই গরম লোক। আপনার ছেলের সাথে আগামীকাল তার মেয়ের বিবাহ। এখন যদি কোনো খারাপ খবর হয়।

-হারুন শোন। বাংলাদেশে ৪৬০টা উপজেলা। কোন উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাত নাই। আমার ডরে নবীনগরের বাঘ-ছাগল এক ঘাটের পানি খায়। এমপি সাহেব দিনে তিনবার টেলিফোন করে আর খোঁজখবর করে। কেন করে জান?

-আপনি সরকারি দলের লোক, আর এমপি হৈলো বিরোধী দলের।

-জায়গা মতো আসছো। নিজের দলের এমপি প্রার্থীকে আমি ইলেকশনে ফেল করিয়েছি, কারণ একটাই। তিনি এমপি হয়ে আসলে, আমি হৈতাম ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা। এইটার নাম পলিটিক্স। বুজজো নি উকিল সাব?

হারুন মাথা দোলায়। মুখে কিছুই বলে না।

-চায়ের কথা কও হারুন। এককাপ চা খাইয়া মাথা ঠিক করি। বুঝলা হারুন। রূপ মিয়া বিদেশি মেমটারে বিবাহ করে নাই। আমার ছেলে আমার সাথে একটা খেলা খেলতাছে। এই খেলার নামও পলিটিক্স। বাপের গুণ কিছুটা পাইছে। আমিও দেখতে চাই আমার ছেলে খেলাটা কত ভালো খেলতে পারে।

গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আঁড়চোখে তিনি উকিলের দিকে তাকান।

-এইবাবার কাজের কথায় আসি। তুমি আজ রাতের মধ্যেই একটা উইল তৈরি করবা। আমি নবীনগর শহরের বাড়িটা আমার বৌমা, শিশু মিয়া কাজী সাহেবের কন্যা, মোসাম্মৎ আরিফা কাজীকে দানপত্র করে বিবাহের দিনই দিতে চাই।

বৈঠক ঘরের মাঝখানে একটি ইজিচেয়ার। ইজিচেয়ারে শুয়ে হুক্কা টানছেন হামিদ চেয়ারম্যান। বাঁ দিকে, নব্বুই ডিগ্রি এঙ্গেলে ঝুঁকে কল্কির আগুনে ফুঁ দিচ্ছে অবনী। পশ্চিম দিকের জানালা খোলা। খোলা জানালা দিয়ে, নারকেল পাতার ফাক গলে পড়ন্ত বিকেলের একফালি মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে চেয়ারম্যান সাহেবের পায়ের ওপর।

-অবনী।

-জ্বে কর্তা।

-মকবুল কোথায়?

-করলা মেমসাহেবের সাথে। দাদাবাবু মকবুলকে বলেছেন, করলা মেম সাহেবেকে আমরার গ্রামটা ঘুরে দেখাতে।

-সরাইল থেকে যে একজন লোক আসার কথা, সে কি এসেছে?

-জ্বে কর্তা এসেছে। দুপুরের আগেই এসেছে। স্নানাহার সেরে এখন অতিথিশালায় বিশ্রাম নিতেছে।

-ঠিক আছে। বিশ্রাম নিতে দাও। তুমি গিয়ে রূপ মিয়াকে খবর দাও। আমি যখন আমার ছেলের সাথে কথা বলবো তখন যেন এই ঘরে কেউ না আসে। আমাদের কথা শেষ হলে সরাইলের লোকটাকে আসতে বলবে।

-আজ্ঞে কর্তা।

হামিদ চেয়ারম্যান কথাবার্তায় খুবই দক্ষ। কথার মারপ্যাচে তিনি অনেক জ্ঞানী-গুণীকে বশ করে ফেলেছেন। কিন্তু নিজের ছেলের সাথে কথা বলতে গেলেই তিনি সব এলোমেলো করে ফেলেন। অতিরিক্ত স্নেহের কারণেই এটা হয়।  স্নেহ আর মুক্তি একসাথে যায় না। স্নেহ এসে মুক্তির ধার কমিয়ে দেয়। রূপ মিয়ার সাথে খুব গুছিয়ে কথা বলতে হবে।

রূপ মিয়া ঘরে ঢুকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। পিতা প্রশ্ন না করলে এই ছেলে কোনো কথা বলবে না। হুক্কার নলে টান দিতে দিতে আবদুল হামিদ তাকিয়ে আছেন রূপ মিয়ার দিকে। পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকায় জানালা দিয়ে ঢোকা বিকেলের রোদটা এখন হামিদের পা থেকে উঠে রূপ মিয়ার মুখে পড়েছে। রূপ মিয়ার ফর্সা মুখটা এখন আরও বেশি ফর্সা লাগছে। হামিদের ইচ্ছে করছে বিলেতি মেমটাকে পাশে দাঁড় করিয়ে দেখতে কে বেশি ফর্সা। এই ছেলে তার মায়ের সব রূপ নিয়ে জন্মেছে। এই জন্যই তিনি ছেলের নাম রেখেছেন রূপ মিয়া। ছেলেদের এত রূপ ভালো না। বেশি রূপবান ছেলেদের মধ্যে একটা মেয়েলি ছায়া পড়ে। রূপ মিয়ার মধ্যেও তা পড়েছে।

-মেয়েটার নাম কি করলা?

খুব হালকা ধরনের কথাবার্তা দিয়ে শুরু করতে চান আব্দুল হামিদ।

-জ্বি না। ওর নাম ক্যারোলাইন।

-আমিও তাই বলি, মেয়ের নাম করলা হবে কেন? মকবুল ক্যারোলাইনকে করলা বানিয়ে ফেলেছে। অবশ্য বিদেশিদের নামের কোনো ঠিক নাই। নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট দলের একজন খেলোয়াড় ছিল। তার নাম মার্টিন ক্রো। এর অর্থ কি? শালিক কাক। একজন কুস্তিগীরের নাম বুল ডগ। মানে হৈলো বলদ কুকুর। মানুষের নাম শালিক কাক বলদ কুকুর হবে কেন? মানুষ আশরাফুল মখলুকাত। মানুষের নামও হবে আশরাফুলের মতো। সুন্দর, অর্থপূর্ণ নাম। বাড়ি কোথায় ক্যারোলাইনের?

-লন্ডন।

-বেড়াতে এসেছে বাংলাদেশে?

-জ্বি-না, কমনওয়েলথ লিগাল এইড নামক একটি সংস্থায় কাজ করে। বাংলাদেশে পোস্টিং।

-ঢাকায়?

-জ্বি।

-সেও কি উকিল?

-জ্বি

-ভালোই হয়েছে। একজন বিলেতি উকিলের সাথে জানাশোনা থাকা ভালো। আমি ঠিক করেছি বিয়ের পর তুমি বৌমাকে নিয়ে বিলেত যাবে, ব্যারিস্টারি পড়ে আসবে। নবীননগরে কোনো ব্যারিস্টার নাই। এতবড় একটি উপজেলা। একজন ব্যারিস্টার থাকা খুবই প্রয়োজন। মেয়েটার সাথে তোমার কি লঞ্চেই পরিচয়?

-জ্বি-না। আইন সালিশ কেন্দ্র নামে একটি এনজিও আছে। অসহায় মানুষদের আইনি সহায়তা দেয়। আমি ওদের একটি সেমিনারে গিয়েছিলাম। সেখানে পরিচয়।

-বুঝতে পেরেছি। মেয়েটি তোমার সাথেই নবীনগরে এসেছে। এখানকার মানুষের আইন-কানুন নিয়ে গবেষণা-টবেষণা করবে। কোনো অসুবিধা নাই। আমি হারুনকে বলে দিব, সে সবরকম সাহায্য করবে। তা মেয়েটি থাকবে কোথায়? গেস্ট হাউস বুক করা হয়েছে?

-আব্বা, ক্যারোলাইন আমার বন্ধু।

আব্দুল হামিদের বুকের ওপর থেকে একটি পাথর নেমে যায়। যাক, বিয়ে যখন করে ফেলে নাই, বাকি বিষয় সামলানো যাবে।

-গেস্ট হাউসে রাখতে চাও না। ঠিক আছে। মকবুলকে বলবো, রিকশায় করে শহরবাড়িতে রেখে আসবে। বিছানা-বালিশ সব ধোওয়া আছে। কেয়ারটেকার আছে। কোনো অসুবিধা হবে না। তোমার যখন বন্ধু, এইটা পরিবারের ইজ্জতের বিষয়। গেস্ট হাউজে কেন থাকবে, তোমার বাড়িতেই থাকবে। শহরবাড়ির কথা যখন উঠলোই, তোমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে ফেলি। শহরবাড়িটা আমি তোমাকে দান করে দিতেছি। সরাসরি তোমাকে না। আমি বাড়িটা বৌমাকে লিখে দিতেছি। বৌমার যা কিছু সবইতো তোমার।

-আব্বা এইটা বোধ হয় ঠিক হবে না। এই বাড়িটা আপনি নাসরিনের জন্য বানিয়েছেন।

-বাবা রূপ মিয়া, আমি আর কয়দিন। নাসরিন আর তোমার আম্মার ভারতো তোমার ওপরই। তুমিই তাদের দেখবা। আমি চাই তুমি ব্যারিস্টারি পড়ে নবীনগরে ফিরে আসো। ওকালতি কর। বিষয়-সম্পত্তি বুঝে নেও।

এই কথাগুলো বলে তিনি চোখ বন্ধ করে ফেলেন। চোখ বন্ধু করে ছেলের প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছেন। ভেবেছিলেন এই ইমোশোনাল অস্ত্রটা তিনি ব্যবহার করবেন না। কিন্তু সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। তিনি হয়ত প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি কথাও বলছেন। রুপ মিয়া এখনও আরিফা সম্পর্কে কিছুই বলছে না কেন? এর মানে কি? এতো সহজেই সবকিছু হয়ে যাচ্ছে?

-আব্বা, একটা কথা ছিল।

রূপ মিয়া বোধ হয় এখন আসল কথাটা বলবে। ছেলেকে সেই সুযোগ দেওয়া যাবে না। বিয়ের সময় যত কাছে আসবে এই বিয়েতে তার অমত থাকলে সেই কথা প্রকাশের সুযোগ তত কমে আসবে।

-তুমি এখন ক্লান্ত আছ। আগামীকাল বিবাহ। অনেক দূর হাঁটতে হবে। তোমার শ্বশুরকে বলেছিলাম, রতনপুর ব্যাকওয়ার্ড জায়গা, ৪/৫ মাইল পথ হাঁটতে হয়। তারচেয়ে বরং মেয়েকে নিয়ে আগের দিন নবীনগর চলে আসেন। বিয়ে-শাদীর কাজটা এইখানেই সেরে ফেলি। তিনি রাজী হলেন না। বড় বংশের মানুষ। বড় আয়োজন। নিজের বাড়িতেই সব করতে চান। তুমি এখন যাও। বিশ্রাম নেও। অন্য কথাবার্তা পরে শুনবো।

রূপ মিয়া কিচুক্ষণ ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। পিতার মুখের ওপর ওরা দুই ভাই-বোন কেউ কোনোদিন কথা বলে নি। আজও বলার সাহস নেই।

-রূপ মিয়া।

-জ্বি আব্বা।

-কাছে আসো।

রূপা মিয়া ঘুরে দাঁড়ায় তবে কাছে আসে না।

-তোমাকে আমি অত্যধিক স্নেহ করি। তোমার মুখের দিকে তাকালে তোমার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। তোমার মায়ের ষোলআনা রূপ নিয়ে জন্মেছো বলে তোমার নাম রাখি রূপ মিয়া।

-এই কথা আপনি আরও অনেকবার বলেছেন।

-তুমি  সেই নাম বদল করে নাম রেখেছ রউফ আব্দুল হামিদ। নিজের নামের সাথে পিতার নাম জুড়ে দিয়ে আমাকে সম্মানিত করেছ। আমি খুশি হয়েছি। কিন্তু আমার দেওয়া নামটা চিরদিনের জন্য মুছে দিয়ে আমাকে আঘাত করেছ।

রূপ মিয়া কিছু বলতে গিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

-শোন রূপ মিয়া। তুমি অতিরিক্ত রূপ নিয়ে জন্মেছ কিন্তু বুদ্ধি নিয়ে জন্মাও নাই। বুদ্ধি নিয়ে জন্মেছে তোমার বোন নাসরিন। খোদার কি লীলা। যার দরকার রূপ তারে দিল বুদ্ধি, যার দরকার বুদ্ধি তারে দিল রূপ। তুমি রেফার্ড পেয়ে বিএ পাস করেছ। অনেক তদবির করে এলএলবি-তে ভর্তি করিয়েছি। আজ তুমি এলএলবি পাস করে ফিরে এসেছ। আমি খুবই খুশি হয়েছি। আশা করি বিলেত গিয়ে ব্যারিস্টারি পাস দিয়ে বাড়ি ফিরবে। আমি যা করতেছি তোমার জন্য উত্তম ভেবেই করতেছি। আরিফার ছবি তোমাকে পাঠানো হয়েছে। মেয়ে অতি রূপবতী। এই বছর উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছে। কলা শাখায় জিপিএ ফাইভ পেয়েছে। রান্না-বান্না, সুচিকর্মে পারদর্শি। ধর্মপরায়ণা। মেয়ের স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার অতিশয় ভালো। আমি লোক লাগিয়ে খোঁজ-খবর করেছি। এইসব বিষয়ে তোমার সাথে আমার টেলিফোনে কথা হয়েছে। হয়েছে না?

-জ্বী হয়েছে।

-তাহলে আর সমস্যা কি? মনের মধ্যে দ্বিধা রাখবে না। তোমার বোন গায়ে হলুদ উপলক্ষে একটা হুলুস্থুল আয়োজন করেছে। সন্ধ্যায় খালেক দেওয়ান আর জীবন আসবে। পালা গানের আয়োজন হয়েছে। বিলাতি মেয়েটাকে বলে দেখ। এইসব গান-বাজনা তার ভালো লাগতে পারে।

রূপ মিয়া আর কোনো কথা না বলে বেরিয়ে যায়। বাঁশঝাড়ের পেছনে বিকেলের সূর্যটা হেলে পড়েছে। উঠানে আলো-ছায়ার খুনসুটি। রূপ মিয়া উঠান পেরিয়ে পুকুরঘাটে চলে আসে। পুকুরের অন্য প্রান্তে ক্যারোলাইন। মকবুল তাকে কিছু একটা বলছে। ক্যারোলাইন খিলখিল করে হাসছে। কী প্রাণখোলা হাসি। মানুষের মন যত সংস্কারমুক্ত হয় তার হাসি তত সাবলীল হয়। ক্যারোলাইন একজন মুক্তমনের মানুষ। বাবার বিশাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সিইও হওয়ার প্রস্তাবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ছুটে এসেছে এ দেশের অসহায় নারীদের পাশে দাঁড়াতে। ক্যারোলাইন এখনো হাসছে। মকবুল হাত-পা নেড়ে কি সব বলে যাচ্ছে।

যে মেয়েকে কোনোদিন চোখে দেখিনি, একদিন কথা বলিনি, কি করে তাকে বিয়ে করা সম্ভব? বাবার খোঁজ-খবরে কোন ত্রুটি নেই, একথা নিশ্চিত। মেয়ে সুন্দরী, গুণবতী। আর ভয়টতো সেখানেই বেশি। হয়ত আমাকে আরিফার পছন্দ না। ওর বাবাও হয়ত ওকে জোর করে আমার সাথে বিয়ে দিচ্ছে। বাবা যখন টেলিফোনে বিয়ের কথা বলেছিল তখনি কথাগুলো বলা উচিত ছিল। রূপ মিয়া অস্থিরভাবে পুকুরঘাটে ছুটাছুটি করতে থাকে।

দরোজার ওপাশে দাঁড়িয়েছিল অবনী। তার পেছনে ছয়ফুট লম্বা এক বলিষ্ঠ পুরুষ। লোকটির মাথা কামানো, বড় একজোড়া গোঁফ। অর্ধেক গোঁফ শাদা। কান দুটি কুলার মতো বড়। মুখভর্তি গুটি বসন্তের দাগ। অবনীর পেছন পেছন লোকটি ঘরে ঢোকে।

-কর্তা, ইনি সরাইলের মেহমান।

হামিদ চেয়ারম্যান লোকটির পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নাম জিজ্ঞেস করেন।

-স্যার আমার নাম জয়নাল।

-জয়নাল তুমি যন্ত্রপাতি কিছু চালাতে পারো?

-পারি স্যার।

-কি কি চালাতে পারো?

-কাটা রাইফেল, শটগান, একে ফোর্টি-সেভেন। পিস্তলও চালাইতাম পারি স্যার।

-একে ফোর্টি সেভেন চালানো শিখেছ কোথায়? আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলে নাকি?

-জ্বে না স্যার। সুযোগ মিলে নাই।

-সুযোগ মিললে যাবে না-কি?

চোখ বড় বড় করে হামিদ তাকায় জয়নালের দিকে। জয়নাল এই দৃষ্টিটা ভালো করেই চেনে। জয়নাল চুপ মেরে যায়।

-শোন জয়নাল। ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি করতে নবী করিম (স.) নিষেধ করেছেন। জীবনতো মিয়া একটাই। ঠিক আছে থাক। এই বিষয়ে কথা বলতে ভালো লাগতেছে না। তোমার হাতের টিপ কেমন?

-পরীক্ষা প্রার্থনীয়।

-সময়মতো পরীক্ষা হবে। সরাইলের চেয়ারম্যান আমার অতি পিয়ারের মানুষ। তিনি তোমাকে পাঠিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তুমি খুব বিশ্বস্ত। আমি তার কথার ইজ্জত করি। আজকের দিনটা বিশ্রাম নেও। কাল থেকে তোমার ডিউটি শুরু। বেতন বলতে হবে?

-জ্বি না স্যার। আপনার সম্পর্কে আমার খোঁজ-খবর আছে। আমি ঠগবো না।

-ঠিক আছে জয়নাল, তুমি এখন যাও।

-জ্বে আচ্ছা।

-আর শোন। কাল তুমি আমার সাথে রতনপুর যাবে। বন্দুক নিয়েই যাবে। এরপর থেকে দিনের বেলায় আমার পেছন পেছন বন্দুক নিয়ে ঘুরবে না। একজন লোক দিনের আলোতে বন্দুক নিয়ে পেছন পেছন ঘুরছে দেখতে ভালো লাগবে না। সন্ধ্যার পরে কোথাও বের হলে অস্ত্রটা সাথে রাখবে। দেখি একটা পিস্তল জোগাড় করতে পারি কি-না। ছোট জিনিস, সব সময় সাথে রাখা যায়।

-স্যার, পিস্তল কিনলে ব্যারোটা চিতা কিনবেন। ইতালিয়ান জিনিস। ওজন মাত্র ছয়’শ গ্রাম। হালকা জিনিস। সাথে নিয়া ঘোরাফেরায় আরাম।

হুক্কার আগুন নিভে গেছে। আব্দুল হামিদ ইজি চেয়ারে শুয়ে নিভে যাওয়া হুক্কার নলটি মুখে লাগিয়ে মৃদু-মন্দ টান দিতে থাকেন। জয়নাল মানুষটাকে বোকা কিসিমের মনে হলো। বডিগার্ড বোকা হওয়াই ভালো। মানুষ যত বোকা হয় তত অনুগত হয়। বুদ্ধিমান মানুষ হয় বেঈমান। পলিটিশিয়ানদের বুদ্ধি বেশি। তারা দিন রাত দেশের সাথে বেঈমানি করে।

অবনী একটি টিক্কা ধরিয়ে এনে কল্কিতে রেখে ফুঁ দিচ্ছে।

-হ্যালো।

-স্লামালেকুম শিশু ভাই। কেমন আছেন?

-আর এই বয়সে থাকা। অনেকদিন পর ফোন করলা। তা এমপি সাব, আছো কেমন?

-এমপি আর হৈতে পারলাম কই। আগামী নির্বাচনে তো নমিনেশনই পাব বলে মনে হচ্ছে না।

-কি যে কও তুমি আনোয়ার।

-শিশু ভাই, এমন একটা লোকের সাথে আপনি কেমনে সম্বন্ধ করতাছেন, আমার মাথায় কিছুই আসে না। লোকটা বদের বদ। দলের সাথে বেঈমানি কৈরা আমারে ফেল করাইছে খালি নিজের স্বার্থের জন্য। থাবড়া হামিদ নামে লোকে তারে ভেংচি কাটে। এমন লোকের সাথে সম্বন্ধ করলে আপনের ইজ্জত থাকে?

-আনোয়ার, রাইত পোয়াইলে মেয়ের বিবাহ, এখন এইসব কথা বৈলা তুমি আমারে কি বুঝাইতে চাও? আর শোন, থাবড়া দিয়া কেউ যদি প্রশাসন ঠিক রাখে, আমি তাতে দুষ দেখি না। আব্দুল হামিদ চেয়ারম্যান হওয়ার পর নবীনগরে কোনো দুই নম্বরী নাই। কৃষি ব্যাংক ঘুষ ছাড়া ঋণ দিতাছে, থানা পৈশা ছাড়া কেইস নেয়, জিডি করে। দুই একটা থাবড়ায় যদি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, দুষ কি?

-শিশু ভাই, আপনের ইজ্জত আমার ইজ্জত। নবীনগর থেকে হান্নান টেলিফোন করেছিলো। কৈলো, থাবড়া হামিদের পুত রূপ মিয়া নাকি এক বিদেশি মেম বিয়া কৈরা নবীনগরে আইন্না তুলছে। আপনে একটু বালা কৈরা খোঁজ-খবর করেন।

-এইডা তুমি কি কৈলা আনোয়ার। ঠিক আছে অহন রাখি, তোমার লগে পরে কথা কমু।

শিশু মিয়া কাজীর কপালের বলিরেখার ঘামের বিন্দু। আনোয়ার চায় না আব্দুল হামিদের সাথে তার সম্বন্ধ হোক। রূপ মিয়ার মেম বিয়া করার কথাটা গুজব হওনেরই সম্ভাবনা বেশি। তারপরও খোঁজ-খবর করতে হবে। তিনি বাড়ির বাড়ির উঠান পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে স্কুলঘরের পুকুরঘাটে চলে আসেন। মাথার ওপরে একটি বিশাল শিমুল গাছ। আজ ফাগুন মাসের মাসের এক তারিখ। শিমুল ফুল ফুটতে শুরু করেছে। শিমুলের ডালে বসে একজোড়া লাউয়া ঘুঘু ডাকছে। ঘুঘুর ডাকের মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি আছে। কিন্তু প্রশান্তিটা শিশু মিয়া উপভোগ করতে পারবেন না। তার মনের মধ্যে অস্থিরতা। আরিফা তার সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। মেয়ের জন্মের সময় তার মা মারা যায়। অতি আদরে তিনি এই মেয়েকে মানুষ করেছেন। আরিফার জীবন কোন পলিটিক্সের মধ্যে পড়ুক এটা তিনি চান না। তিনি কি এই বিয়ে ভেঙে দেবেন? ঠিক বুঝতে পারছেন না। এই মুহূর্তে বিয়ে ভেঙে দিলেও মেয়েটার কপালে একটা দাগ পড়বে। আগে খোঁজ নেওয়া দরকার ঘটনার কতখানি সত্য আর কতখানি রটনা।

কাকে ফোন করা যায়? নবীনগর কলেজের প্রিন্সিপালকে করা যেতে পারে। তিনি প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমানের নম্বরে রিঙ করেন। ফোন বাজছে কিন্তু হাবিবুর রহমান ধরছেন না। ঘটনা কি? থানার ওসিকে ফোন করবেন? পুলিশের কাছে সব খবর অবশ্যই থাকবে। না, পারিবারিক বিষয়ে পুলিশকে টেনে আনা ঠিক হবে না। হিতে বিপরীত হতে পারে। প্রেসক্লাবের সভাপতি মোবারক খানকে টেলিফোন করা যায়। ঘটনা যদি গুজব হয়, তাহলে মোবারক আবার একটা ইস্যু পেয়ে যাবে রিপোর্ট করার। তিনি আবার প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমানের নম্বরে রিং করেন। সেল ফোন বাজছে। পাঁচবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে এল।

-স্লামালেকুম শিশু ভাই।

-ওয়ালাইকুম সালাম জোবায়দা। কেমন আছো?

-ভালো আছি শিশুভাই। আপনি কেমন আছেন? কালইতো আরিফার বিয়ে, না?

-হু। কালই বিয়ে। হাবির বাসায় নাই?

-আছে। বাথরুমে গেছে। ডাকবো?

-বাথরুমে গেলে ডাকবে কিভাবে? শোন, নবীনগরে কোন ঘটনা ঘটেছে নাকি আজকে? শুনেছো কিছু?

-কী ধরনের ঘটনা বলেনতো?

-কোন বিদেশি লোকজন এসেছে না কি?

-ও হ্যাঁ হ্যাঁ। আমাদের রূপ মিয়ার সাথে একটি ব্রিটিশ মেয়ে এসেছে। কমনওয়েলথ লিগাল এইডের অফিসার। শহরে অবশ্য একটা গুজব শোনা যাচ্ছে।

– তোমার কি মনে হয় একথাটা গুজব,না এর মধ্যে সত্যি কিছু আছে?

-আমার মনে হয় গুজব। নবীনগরের মানুষ গুজবে ওস্তাদ। এরা তিলকে তাল না, একেবারে তালগাছ বানিয়ে ফেলে। আমার মনে হয় এইটাও সেই তালগাছের একটা তাল।

-ঠিক আছে।

-উনাকে কি ফোন ব্যাক করতে বলবো?

-না, থাক।

-আপনি কোনো চিন্তা করবেন না শিশুভাই। যদি বলেন, আমি খোঁজ খবর নিয়ে আপনাকে জানাতে পারি।

-তুমি কিভাবে খোঁজ নিবে?

-সেই চিন্তা আপনাকে করতে হবে না। আমার গোয়েন্দাবাহিনী আছে।

-তুমি কি শার্লক হোমস?

-না, জোবায়দা হোমস।

-ঠিক আছে জোবায়দা হোমস। খোঁজ-খবর করো। দেইখ্যো আবার, গুবলেট করে ফেল না।

-আপনে কোন চিন্তা করবেন না। এক ঘণ্টার মৈধ্যেই খবর পাবেন।

এক ঘণ্টার মধ্যে খবর আসে না। শিশু মিয়ার চিন্তা আরও বাড়তে থাকে। চিন্তাটা এখন যে পর্যায়ে আছে এটাকে দুশ্চিন্তার পর্যায়ে ফেলা যায়। তিনি ভিতর বাড়িতে ঢোকেন। মেয়ের দুই চাচি, চাচাতো বোনেরা, দুই ভাবী মিলে হুলুস্থুল গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান করছে। শিশু মিয়াকে দেখে তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রীরা, ছেলের বউরা লম্বা করে ঘোমটা টানে।

-আব্বা আসেন, আপনে নিজের হাতে আরিফার গায়ে হলুদ মাখিয়ে দেন। পিতার হাতে হলুদ পাওয়া মেয়ের জন্য বিরাট সুভাইগ্যের বিষয়। এই মেয়ে বিরাট ভাইগ্যবতী।

বড় ছেলের বউ শ্বশুড়ের দিকে হলুদের ডালি বাড়িয়ে দেয়। শিশু মিয়া আরিফার কাছে এগিয়ে যান। এক চিমটি হলুদ নিয়ে আরিফার কপালে মাখিয়ে দেন। তখনি পাঞ্জাবির পকেটে তার সেল ফোন বেজে ওঠে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখেন। তিনি চেয়ারে বসেন। আরিফার একটা হাত শিশু মিয়া নিজের কোলে তুলে নেন। মেয়েটার চোখ ছলছল করছে। হয়ত এক্ষুনি কেঁদে ফেলবে।

-তুমি কোনো চিন্তা কৈরো না আম্মা। আমি তোমার শ্বশুরের সাথে অতি গুরুত্বের সাথে তোমার পড়া-লেখা বিষয়ে কথা বলেছি। তোমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হবে। তুমি অতি অবশ্যই এমএ পাস দিবা। রতনপুর কাজী বাড়ির মেয়ে এমএ পাস না করলৈ ইজ্জত থাকে? রূপ মিয়া অতি ভদ্র ছেলে। বুদ্ধি একটু কম। তোমার বুদ্ধি ভালো। দুইজনের বুদ্ধি বেশি হৈলে সংসারে অশান্তি হয়।

আরিফার চোখ থেকে দুটি বরফগলা নদী হরহর করে বেরিয়ে আসে। শিশু মিয়ার সেল ফোন আবারও বেজে ওঠে। প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমানের ফোন। এই ফোনটা ধরতে হবে।

-আমি বৈঠকঘরে যাই আম্মা। জরুরি টেলিফোন আসছে।

হাঁটতে হাঁটতে ফোন ধরেন শিশু মিয়া।

-শিশু ভাই, আমি জোবায়দা।

-বল জোবায়দা। কোন কিছু জানতে পেরেছো।

-অবশ্যই পেরেছি। একটু দেরি হয়ে গেল শিশু ভাই। শার্লক হোমসের মিশন ব্যর্থ হয় আমার মিশন ব্যর্থ হয় না। তবে মাঝেমধ্যে একটু সময় বেশি লাগে। শোনেন, মেয়েটার নাম ক্যারোলাইন স্মিথ। বয়স ছাব্বিশ। বাবা-মার ডিভোর্স হয়ে গেছে। ঘরভাঙা গরু। স্যার গরু না, ঘরভাঙা বাছুর। এরা অতি দুষ্ট প্রকৃতির হয়। ক্যারোলাইন বার-এট-ল করেছে। বাংলাদেশে এসেছে এ দেশের অসহায় মেয়েদের আইনের অধিকার এবং এক্সেস নিয়ে গবেষণা করতে।

-রূপ মিয়ার সাথে তার কি সম্পর্ক?

-বিয়া-শাদি হয় নাই। তবে লটর-পটর আছে। ঘর ভাঙা বাছুর তো বিয়ে শাদিতে যাবে না। লটর-পটর চালিয়ে যাবে। এখন আপনি ভেবে দেখেন, এই ছেলের সাথে মেয়ে বিয়ে দেবেন কি-না?

-তুমি যা বলতেছ তা কি ঠিক?

-অবশ্যই ঠিক। জোবায়দা হোমসের রিপোর্ট কখনো ভুল হয় না।

টেলিফোন রেখে জোবায়দা সোফায় এসে বসে। হাবিবুর রহমান স্ত্রীর ওপর খুবই বিরক্ত হন।

-এই কুটনামিটা না করলেও পারতে। কাল মেয়েটার বিয়ে। বিয়ের আগ মুহূর্তে এইরকম একটা ঝামেলা লাগিয়ে দিলে?

-ঝামেলা যা হওয়ার বিয়ের আগে হওয়াই ভালো, পরে হওয়া ভালো না। তোমার সাথে বিয়ের আগে ঝামেলা হয়নি বলে এখন ঝামেলা লেগেই আছে।

-তোমার সাথে আমার ঝামেলা লেগে আছে?

-অবশ্যই লেগে আছে। বিয়ের আগে যদি খোঁজখবর করে জানতাম তোমার টমেটোর দোষ, তাহলে তোমার সাথে আমার বিয়ে হতো না। বিরাট ঝামেলা থেকে বেঁচে যেতাম।

-আমার টটেমোর দোষ?

-অবশ্যই টমেটোর দোষ। কলেজের অফিস রুমে কচি কচি মেয়েদের ডেকে তুমি কি কর আমি কিছুই জানি না? কোনোদিন না ফেইসবুকে ছবি বেরিয়ে যায়, এখন সেই ভয়ে আছি।

-জোবায়দা তোমার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। তোমাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নেওয়া দরকার।

-শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করবে না। আমি তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কথা বলি না। আমার নাম জোবায়দা হোমস।

– তোমার নাম জোবায়দা হোমস?

-হ্যাঁ, জোবায়দা হোমস। তোমার কোন অসুবিধা আছে?

-তোমার নাম জোবায়া হোমস হবে কেন? তোমার নাম জোবায়দা রহমান। হাবিবুর রহমানের স্ত্রী। তুমি তো শার্লক হোমসের স্ত্রী না।

-খবরদার নোংরা কথা বলবে না।

-আমি নোংরা কথা বলছি?

-অবশ্যই নোংরা কথা বলছো। শার্লক হোমসের বোন বলতে পারতে।

-শার্লক হোমসের বাবার নামতো মিস্টার হোমস ছিল না। জোবায়দা হোমস কি করে তার বোন হবে?

-শার্লক হোমসের বাবার নাম কি?

-শার্লক হোমসেরতো বাবাই নেই।

-কি বললে, শার্লক হোমসের বাবা নেই? জারজ সন্তান?

-জারজ সন্তান কি-না তা তো জানি না। তবে শার্লক হোমসের বাবার নাম কেনন ডয়েল বলতে পারো।

-কেনন ডয়েল?

-হ্যাঁ, কেনন ডয়েল। শোন শার্লক হোমস নামে পৃথিবীতে কেউ ছিল না। এটি একটি কাল্পনিক চরিত্র। কেনন ডয়েলের লেখা একটি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত জনপ্রিয় গোয়েন্দা সিরিজ শার্লক হোমস। কাজেই কাল্পনিক চরিত্রের স্ত্রী বলাতে তোমার চরিত্র খারাপ হয়ে যায়নি।

জোবায়দা হাউমাউ করে কান্না শুরু করে।

-ঠিক আছে, তুমি শার্লক হোমসের বোন। এখন যাও, শিশু ভাইকে আবার টেলিফোন কর। ফোন করে বল, জোবায়দা হোমসের কাছে নতুন রিপোর্ট এসেছে। আগের রিপোর্ট ভুল ছিল। ক্যারোলাইনের সাথে রূপ মিয়ার কোন সম্পর্ক নেই।

জোবায়দা তখনও বাচ্চা মেয়ের মতো কাঁদছে।

হামিদ ক্রমাগত টেলিফোন করে যাচ্ছে কিন্তু শিশু মিয়া ফোন ধরছেন না। তিনি পালঙ্কের ওপর এসে স্ত্রীর পাশে বসেন। মরিয়ম বিবি এক খিলি পান তুলে দেন হামিদের হাতে।

-এত টেনশন নিয়েন না। বিয়াই সাহেব ব্যস্ত আছেন। ফোন ধরতে পারতেছেন না।

-আনোয়ার হারামিটা কোন প্যাঁচ খেলতেছে নাতো? এইটা নিয়েই টেনশনে আছি। যদি এই বিয়ে নিয়ে সে কোন প্যাঁচ খেলে, তাকে আমি নবীনগরে ঢুকতে দিব না। কোনমতে ঢুকে পড়লেও এমন থাবড়া দিব। থাবড়া দিয়ে ওর বত্রিশটা দাঁত ফেলে দিব।

-দয়া কৈরা আপনে এখন যারে-তারে থাবড়া দেওয়া বন্ধ করেন।

-থাবড়া কি আর সাধে দেই মরিয়ম বিবি। থাবড়া ছাড়া এই দেশে কিছুই চলে না। সবকিছু পুরানো ট্রানিজসটারের মতো হয়ে গেছে। থাবড়া দিলে চলে থাবড়া না দিলে বন্ধ।

আব্দুল হামিদ ক্রমাগত মোবাইলের বোতাম টিপেই যাচ্ছে।

-হ্যালো।

-স্লামালেকুম বিয়াই সাহেব।

-ওয়ালাইকুম সালাম।

-অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করতেছিলাম।

-খুব ঝামেলার মৈধ্যে আছি চেয়ারম্যান সাব।

-বেয়াই সাহেব, দয়া করে আপনি আমাকে চেয়ারম্যান সাহেব বলবেন না। আপনার মুখে বেয়াই সাহেব ডাক শোনার ইচ্ছা আমার অনেক দিনের।

হামিদের মনে খটকা লাগে। ঘটনা কিছু একটা নিশ্চয়ই ঘটেছে।

-রাত পোহালেইতো বিয়ে। বিয়ের আর বাকি কি? বেয়াই সাহেব, আমি আপনাকে দুইটা সুখবর দেওয়ার জন্য ফোন করেছি। আমি ঠিক করেছি, নবীনগর শহরের বাড়িটা আমি আমার বউমা আরিফাকে বিয়ের উপহার হিসেবে দানপত্র করে দিব। আজ রাতেই উইল তৈরি হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ। আর দ্বিতীয় সুখবর হলো, বিয়ের পর আমি রূপ মিয়া এবং বউমাকে বিলেতে পাঠিয়ে দেব। ছেলে ব্যারিস্টারি পড়বে, বউমাও সেখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। কি বলেন বেয়াই সাহেব?

আব্দুল হামিদের কথায় শিশু মিয়া কাজী কতখানি খুশি হয়েছেন সেটা বোঝা গেল না। তবে শিশু মিয়ার কথায় আব্দুল হামিদ খুবই অসন্তষ্ট হয়েছেন। শিশু মিয়া দুটি শর্ত দিয়েছেন। কাল সকালেই বিদেশি মেয়েটাকে নবীনগর থেকে বের করতে হবে। দ্বিতীয় শর্ত হলো, আগামী তিন বছর ছেলেকে বিলেতে পাঠানো যাবে না।

রাগে আব্দল হামিদ গজর গজর করছেন। তার শরীরের রসায়ন মস্তিষ্কে উত্তেজনা তৈরি করছে। যেকোনো মুহূর্তে মরিয়মের ওপর বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

-আরেক খিলি পান দেব? খাবেন?

-না পান খাব না। পান খাওয়ার মৈধ্যে কোনো মাহাত্ম্য নাই। মানুষতো আর ছাগল না, যে সারাদিন পাতা চাবাবে। মানুষ আশরাফুল মখলুকাত। তার আচরণও আশরাফুল হওয়া উচিত। বুইড়ার কত বড় সাহস। আমাদের শর্ত দেয়। আমি হৈলাম ছেলের বাপ। শর্ত দিলে আমি দিব। তুই শর্ত দেওয়ার কে? তুই হৈলি মেয়ের বাপ। মাথা নিচা কৈরা থাকবি। ইচ্ছা করতাছে বুইড়ারে একটা রাম থাবড়া দেই।

-এইডা আপনে কি কন। উনি মুরুব্বি মানুষ। নবীনগরের হগল মানুষ উনারে ইজ্জত করে। আপনে উনারে থাবড়া দিবেন?

-হ দিব। থাবড়া দিয়া বুইড়ার বত্রিশটা দাঁত ফেলে দিব।

মরিয়ম পালঙ্ক থেকে নেমে দাঁড়ায়।

-মানুষ আশরাফুল মখলুকাত। আর আচরণও আশরাফুল হওয়া উচিত। কথাটা বলেই মরিয়ম ঘর থেকে বেরিয়ে যান।

রাত এখন দশটা। উঠানে পালা গান চলছে। খালেক দেওয়ান আর জীবন দেওয়ান লড়াইয়ে নেমেছে। একজন মানুষ, অন্যজন পশু। নবীনগরের কলোসিয়ামে এখন মানুষ ও পশুর লড়াই চলছে। রোমের সিজার এখন চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ। খালেক দেওয়ান গাইছে :

সৃষ্টির সেরা মানুষ আশরাফুল মখলুকাত

তার তরেই বিশ্ব সৃজন জীব-জড় পঞ্চভুত সব

তার তরেই পশু-পাখির নিত্য কলরব

খোদার পরে আমিই সেরা এই মনুষ্যজাত

ও মানুষ আশরাফুল মখলুকাত॥

জীবন দেওয়ান এর জবাবে গায়Ñ

ভুল, ওরে ভুল, সবই ভুলের বাহাদুরি

নিত্যদিনই মানুষ করে প্রকৃতিরে চুরি

আমি পশু কান্দে জোয়াল সেবা দিয়ে যাই

ফসল ফলাই দুধ দেই সবাইরে বাঁচাই

আমার গোশত খেয়ে মানুষ বাড়াও তোমার ভুড়ি

নিত্যাদিনই মানুষ করে প্রকৃতিরে চুরি॥

 

উপস্থিত জনতা সাবাশ জীবন দেওয়ান, সাবাশ জীবন দেওয়ান, বলে বাহবা দেয়। হামিদ চেয়ারম্যান কিছুক্ষণ উপস্থিত থেকে চলে আসেন। মকবুল এবং অবনী, দুই ছায়াসঙ্গী তার পেছন পেছন বৈঠকঘরে ঢোকে।

-বুঝলা মকবুল সব মুর্খের দল, মানুষ ও পশুর আসল পার্থক্যটা কেউই ধরতে পারতাছে না। তুমারে কৈছিলাম এই বিষয়ে চিন্তা করতে। চিন্তা করেছ?

-জ্বে চাচাজি চিন্তা করেছি।

-চিন্তা করে কি পেয়েছো?

মকবুল একটি কাগজ বাড়িয়ে দেয় হামিদ চেয়ারম্যানের দিকে।

-এইটা কি?

-মানুষ এবং পশুপাখির মধ্যে পার্থক্য। সবগুলো লেখা আছে।

হামিদ কাগজটাতে চোখ বুলায়। নয় নম্বর পার্থক্যটা পড়ে তার মাথায় রক্ত উঠে যায়। তিনি ঠান্ডা মাথায় কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে রাখেন। মকবুলের এতো বড় সাহস, সে আমার সাথে মস্করা করে! তা-ও আবার লিখিত মস্করা। ডকুমেন্টেড এভিডেন্স। তিনি পকেট থেকে কাগজটা বের করে আরেকবার পড়েন। নয়-নম্বর পার্থক্যটায় চারটা বানান ভুল। ভুল বানানে মকবুল আমার সাথে মস্করা করে, হারামজাদার এতবড় সাহস! ‘মানুস চেত উটলে অন্য মানুসরে থাবড়া মারে কিন্তু পশু-পাখি তা করে না।’ কত বড় হারামজাদা। সে আমার থাবড়া নিয়া কথা বলে। আরে গাধা এইটা কোন পার্থক্য হৈলো? পশুপাখি চেত উঠলে কি করে? গুতাইয়া শত্রুর আতুড়ি-ভুতুড়ি বের করে। এইটা কি থাবড়ার চেয়ে ভালো না খারাপ? উল্লুক কা পাঠা। মরহুম খালাত ভাইয়ের ছেল না হৈলে তরে আমি অখখন লাথি মাইরা বাইর কৈরা দিতাম। আব্দুল হামিদ বৈঠক ঘর থেকে উঠে অন্দর মহলে অথবা পালাগানের আসরে চলে যান। উঠান থেকে জীবন দেওয়ানের গান ভেসে আসছে। সে আবারও ব্রিজ লাইনটা গাইছে ‘নিত্যদিনই মানুষ করে প্রকৃতিরে চুরি।’ জীবন দেওয়ান মনে হয় প্রকৃতিকে পশু-পাখির দলে ফেলেছে। সে বড় কোনো ভুল করে নাই। শুধু সমস্যা হলো, প্রকৃতির জেন্ডার নাই পশু-পাখির জেন্ডার আছে।

আরিফার সাথে রূপ মিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে। নানান ঝক্কি-ঝামেলা সেরে বিয়ে পড়াতে আছরের ওয়াক্ত পার হয়ে গেছে। এক পর্যায়ে শিশু মিয়া বলে বসেন, আমি এই ছেলের সাথে মেয়ে বিয়ে দেব না। ছেলের বাপ আমার শর্ত পালন করে নাই। বিদেশি মেয়েটা এখনো নবীনগরে ঘুরাফিরা করতেছে। দ্বিতীয় ঝামেলাটি লাগে জয়নালকে নিয়ে। জয়নাল কাজী বাড়ির অন্দরমহলে বন্দুক নিয়ে ঢুকে পড়েছিল। বন্দুক হাতে ছয়ফুট লম্বা মাথা কামানো এক লোককে দেখে আরিফার বড় চাচি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। তার জ্ঞান ফিরতে দুই ঘণ্টা লেগেছে।

এখান থেকে রসুল্লাবাদ পর্যন্ত কোন সড়ক পথ নেই। গ্রামের আলপথ। এই দুই মাইল পথ বর-বধূকে পাল্কি চড়ে যেতে হবে। চোর-ডাকাতের ভয়ও আছে। এই রাস্তাটা অন্ধকার হওয়ার আগেই পার হতে হবে। বিদায়ের সময় শিশু মিয়া প্রকৃত মেয়ের বাপ হয়ে গেলেন। তার চোখে পানি। অতি আবেগে তার মুখ দিয়ে কবি-সাহিত্যিকদের মতো ভাষা বের হচ্ছে। তিনি বেয়াই সাহেবের হাত ধরে বলেন, আমার ঘরের প্রদীপ আপনার হাতে তুলে দিলাম। শিশু মিয়া যখন বিদায় লগ্নে কাঁদতে কাঁদতে আরিফাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, আরিফা তখন বাবার কানে মুখ নিয়ে বলে, কাঁদবেন না আব্বাজান, আমি ফিরে আসতেছি।

বিয়ের যাত্রা রতনপুরের চক পেরিয়ে এখন দাররা গ্রামে। আর এক মাইল পেরুলেই কাবিখার সড়ক। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে দুটি মাইক্রোবাস।

এক পাল্কিতে বর অন্য পাল্কিতে বধূ। পেছনে হামিদ চেয়ারম্যান। তার দুই পাশে মকবুল এবং অবনী, পেছনে কাঁধে বন্দুক নিয়ে হাঁটছে জয়নাল। জয়নালের পেছনে আরও পঞ্চাশজন। যার মধ্যে কন্যাপক্ষের দশজন। একটি শুকনো খালের ঢাল পেরুবার সময় হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যায় একজন বরের বেহাড়া, সাথে সাথে হুমড়ি খেয়ে পড়ে অন্য বেহাড়ারা। খালের ঢালে ধাক্কা খেয়ে পাল্কি গড়িয়ে পড়ে খালের তলায়। রূপ মিয়ার চশমা ভেঙে কাচ ঢুকে যায় চোখের ভেতর। বিয়ের শেরওয়ানি রক্তে লাল। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে পাল্কির ওপর। টেনে বের করা হয় রূপ মিয়াকে। ওর ডান চোখ থেকে টপটপ করে রক্ত পড়ছে।

হামিদ চেয়ারম্যান গর্জন করে ওঠেন।

-থামো মিয়ারা। এই মেয়ে অপয়া। বিয়ে বাড়িতে আমার মানিব্যাগ চুরি হয়। ভেবেছিলাম, নানান জায়গা থেকে লোকজন এসেছে, দুই একটা চোর-বাটপার আসাও বিচিত্র কিছু না। কিন্তু এখন পাল্কি ভেঙে ছেলে অন্ধ। আমি এই মেয়ে ঘরে তুলবো না। তোমরা মেয়ের পালকি নিয়ে ফিরে যাও।

আরিফার বড় ভাইয়ের মেয়ে শিলা, যার বয়স ওর কাছাকাছি, এগিয়ে এসে হামিদ চেয়ারম্যানের সামনে দাঁড়ায়।

এইটা আপনি কি বলেন দাদাজান। উল্টা-পাল্টা কথা বাদ দিয়ে ফুফাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

-শোন মেয়ে। আমি এক কথার মানুষ। তোমরা তোমার ফুফুকে নিয়ে ফেরত যাও। মকবুল।

-জ্বে চাচাজান।

-রূপ মিয়া হাঁটতে পারবে?

-মনে হয় না। চোখ দিয়ে রক্ত পড়তেছে। ভাইজানের হাত-পাও কাঁপতেছে। তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারতেছেন না।

-অতিরিক্ত ভয় পেয়েছে। বোকা ছেলেরা সাহসী হয় জানতাম। এই ছেলেতো দেখি ভিতুর বৈদা। কাছাকাছি পাল্কি পাওয়া যাবে কোথায়?

-আপনের মোবাইলটা দেন। পাল্কিঅলাকে ফোন দিয়ে দেখি।

বিয়ের কাফেলাটি এখন দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে থেকে আছে। কণের পাল্কিকে ঘিরে কনে পক্ষের লোকেরা। আর রূপ মিয়াকে ঘিরে বরপক্ষের লোকেরা প্রাথমিক চিকিৎসার কসরত করছে। রূপ মিয়া দুই চোখ বন্ধ করে ভয়ে কাঁপছে। আরিফা পালকির ভেতর থেকৈ বেরিয়ে আসে। রূপ মিয়াকে ঘিরে ভিড়টা সরে গিয়ে আরিফাকে পথ করে দেয়। সকলের সামনেই আরিফা রূপ মিয়ার হাত ধরে। রূপ মিয়ার মনে হয় ওর চোখ ভালো হয়ে গেছে, ওর চোখের আর কোনো যন্ত্রণা নেই। সে এখন দেখতে পাচ্ছে।

-আপনি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন?

-রূপ মিয়া চোখ বন্ধ করেই ওপর-নিচ মাথা নাড়ে।

-বোকার মতো মাথা নাড়বেন না। চোখ বন্ধ থাকলে কিভাবে দেখবেন? আমি আপনার ডান চোখে হাত রাখতেছি, আপনি বাম চোখ খোলেন।

রুপ মিয়া ভয়ে ভয়ে বাম চোখ খোলে। আরিফার মুখ থেকে বিয়ের ঘোমটা সরে গেছে। ফসলের মাঠের শেষ প্রান্তে প্রকা- সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে। একদল শুভ্র বলাকা গ্রামের ডোবা-নারায় সারাদিন কাটিয়ে এখন সন্ধ্যার প্রান্ত ছুঁড়ে নীড়ে ফিরে যাচ্ছে। শেষ বিকেলের আলোতে রূপ মিয়া দেখে ওর মুখের সামনে কে অপ্সরী বসে আছে। অপ্সরীর একটি হাত ওর ডান চোখের ওপর। সেই হাতের স্পর্শ এত ভালো লাগছে কেন? রূপ মিয়ার এখন সাগর সেনের গাওয়া সেই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি শুনতে ইচ্ছে করছে, ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা/তুমি আমার সাধের সাধনা/ও মোর শূন্য গগন বিহারী/আমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে/তোমারে করেছি রচনা/তুমি আমারি, তুমি আমারি, মম অসীম গনন বিহারী/’

-পুরুষ মানুষের এত ভয় পেলে চলে? আপনি ঢাকায় যান। চোখের চিকিৎসা করান।

-তুমি আমার সাথে ঢাকায় যাবে?

-যাবো। তবে এখন না। এখন আমি রতনপুর ফিরে যাচ্ছি। আমার শ্বশুড় একজন মানী লোক। তিনি যখন একবার বলে ফেলেছেন, তোমরা মেয়ে নিয়া ফেরত যাও, আমাকে ফেরত যেতে হবে। তিনার কথার ইজ্জত রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। আপনার তেমন কিছু হয় নাই। সাতদিনের মধ্যেই ভালো হয়ে যাবেন। ভালো হয়ে সোজা রতনপুর চলে আসবেন।

মকবুল হামিদ চেয়ারম্যানকে টেলিফোন ফেরত দিয়ে বলে, চাচাজি পাল্কিঅলাকে ফোন করেছি। এক ঘণ্টার মধ্যে নতুন পাল্কি আসতেছে।

‘অন্ধজনে দেহ আলো’ ক্লিনিকের এক নম্বর কেবিনে শুয়ে আছে রূপ মিয়া। এখনি তার চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হবে। ডাক্তার দুইবার এসে ফেরত গেছে। রূপ মিয়া ক্রমাগত আরিফার সাথে টেলিফোনে কথা বলে যাচ্ছে। মকবুল এসে আরও একবার তাগাদা দেয়।

-শুনেন, এখন ফোন রাখেন। আগে আপনার চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হোক। তারপর ফোন দিবেন। আমি ফোনের অপেক্ষায় থাকবো।

-চোখে ব্যান্ডেজ নিয়ে আমি আরও কিছুক্ষণ তোমার সাথে কথা বলবো। এইটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা হিসাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, বুঝলা? চোখের ব্যান্ডেজ খোলার জন্য ডাক্তার সাহেব ঘোরাফেরা করতেছে আর আমি একচোখ কানা হয়ে তোমার সাথে টেলিফোনে কথা বলতেছি। এই দিবসটার নাম হবে ‘একচোখা প্রেম’ দিবস। ভবিষ্যতে আমরা এই ঐতিহাসিক দিবসটা কেক কেটে উদযাপন করবো।

মকবুল আবারও কেবিনের ভেতর ঢুকে পড়ে।

-ভাইজান, ডাক্তার সাহেব বেজায় রাগ করেছেন। ত্রিশ মিনিটের মৈধ্যে তিনার আরেকটা অপারেশন আছে। আপনে মোবাইল রাখেন। আগে চোখের বেন্ডিজ খোলা হোক। দুই চোখে দুনিয়াডা দেখেন। দুই চোখে দুনিয়া দেইখ্যা ভাবিসাবের লগে কথা বলেন।

-এই, একটু ধরো তো, একটু ধরো।

রূপ মিয়া মোবাইলে হাতচাপা দিয়ে মকবুলের উদ্দেশ্যে বলে-

-মকবুল, তুমারে না কৈছি আমারে ভাইজান ডাকবা না। আমি বয়সে তুমার দুই বছরের ছোট। শোন মিয়া, দুই চোখে দুনিয়া দেইখ্যা সারাজীবনই কথা কমু। একচোখে কথা কওনের একটা অন্যরকম মজা আছে।

-চাচাজির নির্দেশে আপনাকে ভাইজান ডাকি। চাচাজি অতি বিচক্ষণ মানুষ। আপনি হৈলেন গদিনশিন। দুইদিন পরে চাচাজির মিত্যু হৈলে আপনি গিয়া গদিতে বসবেন। তখন আপনের পেছন পেছন ছাতা নিয়ে হাঁটবে মকবুল। আপনি গিয়া থানার ওসিরে দিলেন এক থাবড়া। মকবুল কৈলো রূপ মিয়া, তুমি ওসি সাবরে থাবড়া দিলা, ওসি হৈলো আইনের লোক। তখন ওসি ভাববে, আরে এই লোকেরতো কোনো ইজ্জত নাই। চাকর-বাকর মানুষ তারে তুমি কৈরা বলে। ওসি তখন উঠে গিয়ে আপনাকে দিবে দুই থাবড়া। খালি থাবড়া দিবে না, হাজতে ঢুকিয়ে বোতল পালিশও দিবে। আর মকবুল যদি বলে ভাইজান, এই ওসি অতি বদ তার বাম গালে আরও একটা থাবড়া দেন। বন্দুক নিয়ে পেছনে থাকবে জয়নাল। ওসি তখন ডরে নিজের হাতে হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে হাজতে ঢুকে যাবে।

-মকবুল, তুমি কি সারাদিন খালি গল্প বানাও? ঠিক আছে, ভাইজানই চালিয়ে যাও। এখন যাও, ডাক্তার সাহেবকে আসতে বল, ফোন রাখতেছি।

রূপ মিয়া আবার আরিফার সাথে কথা বলে,

-শোন জান। এখন রাখি। দোয়া কৈরো। আই লাভ ইউ জান।

-ইশসিরে, কি বেশরম। আচ্ছা রাখি।

রাখি রাখি করেও ওরা ফোন রাখতে পারে না। আবারও কথা শুরু করে।

-আরিফা, একটা সত্যি কথা বলবে?

-না বলবো না। স্বামীকে সব সময় সত্যি কথা বলতে হয় না।

রূপ মিয়া থতমত খেয়ে যায়। অনেকক্ষণ কোন কথা বলে না। আরিফাও চুপ করে থাকে।

-ঠিক আছে কথাটা কি বলেন। ভেবে দেখি সত্যি বলবো, না মিথ্য বলবো।

-না, থাক। বলতে হবে না।

-ইসসসশিরে আমার রূপকুমার রাগ করেছে। ঠিক আছে সত্যি বলবো, এখন বলেন কথাটা কি?

-তুমি কি খুশিমনে আমাকে বিয়ে করেছ, না পরিবারের চাপে রাজি হয়েছ?

-গত তিনদিনে এই নিয়ে ছয়বার এই কথা জিজ্ঞেস করলেন। শোনেন, আমার একটা পাখি আছে। তার নাম ডাকমণি পাখি। ডাকমণি পাখি ভবিষ্যতের কথা আমাকে আগাম বলে দেয়। আপনার সাথে যে আমার বিয়ে হবে, এই খবরও সে আমাকে তিনমাস আগেই বলেছে।

– সে কি পাল্কি ভাঙার খবরও তোমাকে আগাম বলেছে?

-না, বলে নাই। এখন রাখি। ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

-আর একটা কথা। সেই গানটার একটা কলি শোনাও না প্লিজ, তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা।

-না। এখন আপনাকে অন্য একটা গানের কলি শোনাবো। ‘এ জীবনে যতটুকু চেয়েছি? মন বলে তারও বেশি পেয়েছিÑ নিশি রাত বাঁকা চাঁদ আকাশে/চুপি চুপি বাঁশি বাজে বাতাসে’

আরিফা এত সুন্দর করে গানটা গাইছে। আনন্দে রূপ মিয়ার চোখ ভিজে যায়। আরিফা যেন গানের মধ্যে দিয়েই ওকে বলে দিচ্ছে, আমি আপনাকে খুব পছন্দ করেই বিয়ে করেছি।