সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

বাংলা প্রবাদ ও প্রবচন

September 20th, 2016 7:39 am
বাংলা প্রবাদ ও প্রবচন

বিশেষ রচনা

বাংলা প্রবাদ ও প্রবচন

মাহবুবুল হক

 

প্রবাদ ও প্রবচন বাংলা বাগ্ভঙ্গির অপরিহার্য উপাদান। দৈনন্দিন জীবনে কথোপকথনে, হালকা সরস ধরনের রম্য রচনায় বাংলা প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার দেখা যায় অহরহ। বেশির ভাগ প্রবাদের জন্ম বাঙালির মুখে মুখে। তা ছাড়া বিশিষ্ট বাঙালি কবি-লেখকদের রচিত অনেক বাক্য বাংলা ভাষায় প্রবচনের রূপ নিয়েছে।

বাংলায় প্রবাদ ও প্রবচন প্রায় সমার্থক শব্দ হলেও এ দুয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। প্রবাদ অজ্ঞাত-পরিচয় সাধারণ মানুষের লোকপরম্পরাগত সৃষ্টি। সেগুলো জনশ্রুতি হিসেবে চলে এসেছে। বাংলায় বহুল প্রচলিত প্রবাদের কিছু উদাহরণ : ‘অতি লোভে তাঁতি নষ্ট’, ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’, ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’, ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারা’, ‘এক মুরগি দুবার জবাই’, ‘ওস্তাদের মার শেষ রাতে’, ‘কত ধানে কত চাল’, ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে’, ‘কারও পৌষ মাস কারও সর্বনাশ’, ‘খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি’, ‘খোদার ওপর খোদকারি’, ‘জুতো মেরে গরু দান’, ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’, ‘ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া’, ‘জন জামাই ভাগনা তিন নয় আপনা’, ‘জোর যার মুলুক তার’, ‘ঠেলার নাম বাবাজি’, ‘ডুবে ডুবে জল খাওয়া’, ‘ধান ভানতে শিবের গীত’, ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’, ‘যার জন্যে চুরি করি সেই বলে চোর’, ‘রুয়ে কলা না কাট পাত তাতেই কাপড় তাতেই ভাত’ (খনার বচন), ‘হাতি ঘোড়া গেল তল ভেড়া বলে কত জল’ ইত্যাদি।

অন্যদিকে প্রবচন হলো প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির প্রগাঢ় জ্ঞান বা অভিজ্ঞতাজাত ব্যক্তিগত সৃষ্টি। কবি, সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল বিজ্ঞজনই প্রবচনের ¯স্রষ্টা। তাদের পরিচয় আমাদের অজানা নয়। এক কথায় প্রবাদ লোক-অভিজ্ঞতার ফসল, প্রবচন ব্যক্তিগত মনীষার সৃষ্টি। প্রবচনের আধুনিক প্রতিশব্দ হচ্ছে, সুভাষণ বা সুভাষিত। বাংলায় ভারতচন্দ্র রায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রমুখ অনেক অনেক সাহিত্যিকের রচনার কোনো কোনো অংশ প্রবচনে পরিণত হয়েছে। প্রবচন বা সুভাষিতের এ রকম কিছু নিদর্শন :

১. ‘চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনি।’ (কাশীরাম দাস)

২. ‘জামাতা ভাগিনা যম আপনার নয়।’ (মুকুন্দরাম চক্রবর্তী)

৩. ‘কড়িতে বাঘের দুধ মিলে।’ (ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর)

৪. ‘যে কহে বিস্তর মিছা সে কহে বিস্তর’ (ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর)

৫. ‘যার কর্ম তারে সাজে অন্য লোকে লাঠি বাজে’ (ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর)

৬. ‘বিনে স্বদেশী ভাষা মিটে কি আশা?’ (রামনিধি গুপ্ত)

৭. ‘এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গে ভরা।’ (ঈশ্বর গুপ্ত)

৮. ‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’ (সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)

৯. ‘যৌবনে অন্যায় ব্যয়ে বয়সে কাঙালি।’ (মাইকেল মধুসূদন দত্ত)

১০. ‘একে মনসা তায় ধুনোর গন্ধ’ (মাইকেল মধুসূদন দত্ত)

১১. ‘মারি অরি পারি যে কৌশলে’ (মাইকেল মধুসূদন দত্ত)

১২. ‘পান্তা আনতে লবণ ফুরায়’ (দ্বিজেন্দ্রলাল রায়)

১৩. ‘ছেড়ে দিলাম পথটা বদলে গেল মতটা’ (দ্বিজেন্দ্রলাল রায়)

১৪. ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

১৫. ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ (কাজী নজরুল ইসলাম)

১৬. ‘সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে’ (এস ওয়াজেদ আলী)

 

ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রবাদ ও প্রবচনগুলোকে আলাদা করে দেখা হয় না। এ জন্যে প্রবাদ ও প্রবচন দুটিকেই অভিন্ন অর্থে প্রকাশ করার  জন্যে প্রবাদ-প্রবচন কথাটি ব্যবহৃত হয়। তবে মনে রাখা দরকার, যেসব প্রবচন বা সুভাষিত উক্তি পরিসরে কিছুটা দীর্ঘ সেগুলো প্রবাদের মতো সুপ্রচলিত নয়।

বিভিন্ন পরিস্থিতিতে জীবনের বিচিত্র ঘটনা বা অভিজ্ঞতার আলোকে সৃষ্ট বলে ভিন্ন ভিন্ন প্রবাদ-প্রবচনে অভিন্ন ভাবসত্যের প্রকাশ দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘স্বভাব পরিবর্তন হয় না’ – এই ভাবসত্য প্রকাশে বাংলায় ভিন্ন ভিন্ন প্রবাদ-প্রবচনের জন্ম হয়েছে। যেমন :

১. অবুঝে বুঝার কত বুঝ নাহি মনে

ঢেঁকিরে বুঝার কত নিত্য ধান ভানে।

১. আদা শুকালেও ঝাল যায় না।

২. আরের মন আর দিকে

চোরের মন বোচকার দিকে।

৩. ইল্লত যায় না ধুলে

স্বভাব যায় না মলে।

৪. কাকের বাসায় কোকিলের ছা

জাত স্বভাবে করে রা।

৫. কয়লা ধুলে ময়লা যায় না।

৬. কুত্তা রাজা হলেও জুতা খায়।

৭. ঘি দিয়ে ভাজ নিমের পাত

নিম ছাড়ে না আপন জাত।

৮. চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনি।

৯. ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে।

১০. শকুনের চোখ ভাগাড়ের দিকে।

অন্তর্নিহিত ভাবসত্য ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি নির্ভর করে গড়ে ওঠে বলে কখনও কখনও প্রবাদ-প্রবচন অর্থের দিক থেকে পরস্পরবিরোধী হতে পারে। যেমন : ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’ বনাম ‘অনেক সন্ন্যাসীতে গাঁজন নষ্ট।’  প্রথম প্রবাদে অনেকের হাত লাগানোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রবাদে অনেকের অংশগ্রহণকে কাজের বাধা হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

 

প্রবাদ-প্রবচনের জনপ্রিয়তার কারণ

প্রবাদ-প্রবচন বাংলা ভাষার বিশিষ্ট সম্পদ। জনপ্রিয় প্রবাদ-প্রবচনগুলো যে সর্বজনগ্রাহ্য বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে তার পেছনে কিছু কারণ লক্ষ করা যায়।

১. অভিজ্ঞতার সারাৎসার : প্রবাদের আকর্ষণ ও তাৎপর্যের মূলে রয়েছে সমৃদ্ধ জীবন অভিজ্ঞতার সরল ও সংহত প্রকাশ। যুগ-যুগান্তরের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এমনভাবে মিলে যায় যে আমরা প্রবাদে তার প্রতিফলন দেখে তার প্রতি আকৃষ্ট হই।

২. অর্থব্যঞ্জকতা : প্রবাদের রয়েছে গভীর অর্থব্যঞ্জকতা বা স্বল্প শব্দ প্রয়োগে গভীর ভাব প্রকাশের আশ্চর্য ক্ষমতা। এক্ষেত্রে প্রবাদের বাচনিক বা আভিধানিক অর্থ প্রধান নয়, অভিলষিত অর্থ বা রূপক অর্থই প্রধান।

৩. সর্বজনগ্রাহ্যতা : প্রবাদে সাধারণত এমন অভিজ্ঞতাই বাণীরূপ পায় যা সচরাচর সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার জগৎ থেকে বাইরে নয়। প্রবাদের ভাবসত্যের জগৎ আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতার পরিম-লের মধ্যে থাকে বলে তা সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে ওঠে।

৪. ভাবসংহতি : অনেক শব্দ প্রয়োগ করে যে ভাব প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে প্রবাদে তা অল্প কথায় সংহতভাবে প্রকাশিত হয়। ফলে যে অভিজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আমরা উপযুক্ত কথার জন্যে হাতড়াই প্রবাদে তা সহজে বাক্সময় হতে দেখে শেষ পর্যন্ত প্রবাদটিকেই ভাব প্রকাশের জন্য গ্রহণ করি। এভাবে যেসব ভাব প্রকাশে প্রবাদই সবচেয়ে বেশি সহায়ক হয় সেসব ক্ষেত্রে আমরা প্রবাদেরই সাহায্য নেই।

৫. সহজ অর্থদ্যোতকতা : প্রাত্যহিক জীবনের সহজ-সরল অনাড়ম্বর ভাষায় রচিত হয় বলে প্রবাদ-প্রবচনের অর্থ সহজেই বোঝা যায়। সহজ সারল্য ও অনায়াস অর্থবোধগম্যতার জন্যে সাধারণ মানুষ তাই প্রাত্যহিক জীবনে প্রবাদ প্রয়োগে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।

৬. সরল প্রকাশভঙ্গি : প্রবাদের সরল প্রকাশভঙ্গি সহজেই শ্রোতার মনে গেঁথে যায়। স্মৃতিতে ধরে রেখে লোকপরম্পরায় মুখে মুখে সম্প্রচলিত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রবাদের মধ্যে কিছু স্মৃতি সহায়ক বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। যেমন:

ক. ছন্দ:  আগে গেলে বাঘে খায়

পিছে গেলে সোনা পায়।

খ. অন্ত্যমিল: অল্প শোকে কাতর

অধিক শোকে পাথর।

গ. অনুপ্রাস: অভাবে স্বভাব নষ্ট। যেখানে যেমন সেখানে তেমন। অর্থই অনর্থের মূল।

এসব গুণের জন্যে এগুলো সহজেই মনে রাখা যায়। সাধারণ মানুষের কাছে প্রবাদের জনপ্রিয়তার এটি অন্যতম কারণ।

৭. শোভন ভাব প্রকাশ : মানব চরিত্রের স্বরূপ উদ্ঘাটন ও সমালোচনা অধিকাংশ প্রবাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। জীবনের নির্মম সত্যকে কঠিন বা স্থূল ভাষায় না বলে প্রবাদে ইঙ্গিতময় শোভন ভাষায় বলা হয়ে থাকে। রুচিবান মানুষের কাছে শোভন পন্থায় মানব চরিত্র সম্পর্কে সতর্ক সংবাদ এবং হিতকর পরামর্শ ও যথাযথ উপদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রবাদ-প্রবচন ব্যবহার কার্যকর বলে বিবেচিত হয়।

অর্থ বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে প্রবাদকে নানাভাবে ভাগ করা যায়। যেমন :

ক. সাধারণ অভিজ্ঞতাবাচক

(‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে।’, ‘অধিক সন্ন্যাসীতে গাঁজন নষ্ট।’)

খ. নীতিকথামূলক (‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।’)

গ. ইতিকথামূলক (‘ধান ভানতে শিবের গীত।’)

ঘ. মানবচরিত্র সমালোচনামূলক (‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল।’)

ঙ. সামাজিক রীতিনীতিজ্ঞাপক (‘কলমে কায়স্থ চিনি, গোঁপেতে রাজপুত।’, ‘কাজির কাছে হিঁদুর পরব।’,

‘মরলে শহিদ বাঁচলে গাজি।’, ‘মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত।’)

চ. প্রসিদ্ধ ঘটনামূলক: (‘লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন।’)

 

নানা উৎস থেকে বাংলা ভাষায় বহু প্রবাদের জন্ম হয়েছে। যেমন :

ক. আরবি-ফারসি ভাষায় প্রভাব : ‘বিসমিল্লায় গলদ’।

খ. ইংরেজি ভাষায় প্রভাব : ‘চকচক করলেই সোনা হয় না’

(‘অল দ্যাট গ্লিটার্স ইজ নট গোল্ড’)

গ. সংস্কৃত ভাষায় প্রভাব : ‘অতি দর্পে হত লঙ্কা’ ‘অল্পবিদ্যা

ভয়ঙ্করী’, ‘অধিকন্তু ন দোষায়’ ইত্যাদি।

 

মানব জীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ বলে বেশ কিছু প্রবাদ-প্রবচনের সঙ্গে উপভোগ্য কাহিনি বা ঘটনার যোগসূত্র লক্ষ করা যায়। এসব ঘটনা বা কাহিনির অধিকাংশই লুপ্ত। তবে কিছু কিছু কাহিনি এখনো সজীব। যেমন :

 

অতি লোভে তাঁতি নষ্ট

কাপড় বুনে তাঁতির দিন ভালোই চলছিল। কিন্তু দুধ বিক্রি করে বেশি লাভ করার আশায় তাঁতি তাঁত বিক্রি করে দিল। সেই টাকায় সে তাঁতঘর ভেঙে গোয়ালঘর বানালো। কিন্তু হাতে টাকা না থাকায় গরু কেনা হলো না। ফলে তার সবই গেল। এ প্রবাদ প্রসঙ্গে অন্য একটি কাহিনি এ রকম- এক বেতাল তাঁতিকে বর দিতে চাইল। স্ত্রীর পরামর্শে বেশি লাভের আশায় তাঁতি পেছনের দিকে আরও একটি মাথা এবং আরো দুটো হাত প্রার্থনা করল। বর পেয়ে দুটো মাথা আর চার হাত নিয়ে ফেরার পথে লোকে রাক্ষস মনে করে তাঁতিকে মেরে ফেলল। বেশি লোভের পরিণতি ক্ষতিকর হয়।

 

দশচক্রে ভগবান ভূত

ভগবান নামে এক লোক রাজার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বড় হচ্ছিল। রাজার কয়েকজন লোক তা সহ্য করতে না পেরে ষড়যন্ত্র করে তার মৃত্যুর কথা রটিয়ে দিল। রাজা একদিন তার গলার স্বর শুনতে পেয়ে ভগবানের মৃত্যু সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলে ষড়যন্ত্রকারীরা রাজাকে জানিয়ে দিল যে, মৃত ভগবান ভূত হয়ে এসেছে। সকলের মুখে একই কথা শুনে রাজা বাধ্য হয়ে তাতেই বিশ্বাস করলেন।

 

মেও ধরে কে

প্রচলিত গল্প থেকে এই প্রবাদের জন্ম। গল্পে আছে : বিড়ালের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্যে ইঁদুররা পরামর্শ করল বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বেঁধে দিতে হবে। তাহলে তার গতিবিধি আগেই টের পেয়ে ইঁদুররা সহজেই নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারবে। তারা পরিকল্পনা করল, ঘণ্টা বাঁধার জন্যে। ঠিক হলো, কেউ বিড়ালের কান ধরবে, কয়েকজন মিলে পা, কয়েকজন মিলে লেজ। কিন্তু একজন বৃদ্ধ ইঁদুর প্রশ্ন তুলল, বিড়াল যখন ‘মেও’ বলে ডেকে উঠবে তখন তো সবাই ভয়ে না পালিয়ে বাঁচবে না। তখন ‘মেও’ ধরবে কে? এ প্রবাদের মধ্যে নিহিত অর্থ হলো, দুরূহ কাজের মূল ঝুঁকির ব্যাপারটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

 

বামুন গেল ঘর তো লাঙল তুলে ধর

এই প্রবাদের পেছনেও গল্পের সমর্থন পাওয়া যায়। একজন ব্রাহ্মণ লোকজন লাগিয়ে জমি চাষ করাতেন। কাজের সময় উপস্থিত থাকলে লোকজন ঠিকমতো কাজ করত। ব্রাহ্মণ বাড়ি চলে গেলে বা অন্য কাজে গেলেই চাষের কাজের লোকজন আরাম করার জন্যে হালকা করে লাঙল ধরত। এতে জমি আলতোভাবে চাষ হতো। তদারকহীন কাজে এভাবেই ফাঁকি চলে। এই প্রবাদে সেই দিকটাই ব্যক্ত হয়েছে।

বিশ্বের প্রায় সব প্রধান ভাষাতে প্রবাদ-প্রবচনের প্রচলন আছে। তবে সেসব প্রবাদ গড়ে উঠেছে সেসব দেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিম-লে। যেমন বাংলায় ‘বামুন গেল ঘর তো লাঙ্গল তুলে ধর’ প্রবাদে যে ভাব ফুটে ওঠে তা এর ইংরেজি আক্ষরিক অনুবাদে ধরা পড়ে না। বরং তা ধরা পড়ে ইংরেজি এই প্রবাদে : হোয়েন দি ক্যাট ইজ অ্যাওয়ে দি মাইস আর অ্যাট প্লে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশকালগত পার্থক্য থাকলেও প্রায় সমভাবাপন্ন প্রবাদও দেখা যায়। যেমন : ‘তিলক কাটলে বৈষ্ণব হয় না’ এই প্রবাদের সমার্থক ইংরেজি প্রবাদ হচ্ছে : ‘কাউলস ডু নট মেক মংকস।’ আন্তরিক নিষ্ঠা ছাড়া বাহ্য আড়ম্বরে যে ধার্মিক হওয়া যায় না, দুটো প্রবাদে সেই অভিন্ন ভাবসত্যই ফুটে উঠেছে।

বাংলা প্রবাদ সংগ্রহের ইতিহাস প্রায় দুই শ বছরের কাছাকাছি। এ বিষয়ে অনেক তথ্য-উপাত্ত সন্নিবেশিত হয়েছে সুশীল কুমার দে সংকলিত বাংলা প্রবাদ গ্রন্থের ভূমিকা অংশে। তা থেকে জানা যায়, উইলিয়াম মর্টন সংগৃহীত ও সংকলিত দৃষ্টান্ত বাক্য সংগ্রহ (১৮৩২) গ্রন্থটিই প্রথম বাংলা প্রবাদ সংগ্রহ। এতে সংকলিত হয়েছে ৮০৩টি বাংলা প্রবাদ এবং ৭৩টি সংস্কৃত প্রবাদ। সেই সঙ্গে রয়েছে এসব প্রবাদের ইংরেজি অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা। তবে এই গ্রন্থের সীমাবদ্ধতা এখানে যে, প্রবাদগুলি বর্ণানুক্রমিক বা বিষয় অনুসারে সন্নিবেশিত হয়নি। মর্টন পরে ক্রিশ্চিয়ান অবজার্ভার পত্রিকায় চার কিস্তিতে আরও ১৫৬টি বাংলা প্রবাদ ও তার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন।

এর প্রায় তেত্রিশ বছর পর প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য প্রবাদ-প্রবচন সংগ্রহ পাদরি জেমস লং-এর প্রবাদমালা। দুই খণ্ডে প্রকাশিত এই গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে (১৮৬৮) ২৩৫৮টি বাংলা প্রবাদ বর্ণানুক্রমিকভাবে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটির দ্বিতীয় খণ্ড এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন ভাষার ভাণ্ডার থেকে সংগৃহীত প্রবাদ রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে সরস বাংলায় অনুবাদ করিয়ে ইউরোপ প্রবাদমালা (১৮৭২) নামে প্রকাশিত হয়। এতে জার্মান, ইতালিয়, স্পেনিয়, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, দিনেমার, ফরাসি, রুশ, মালয়ালম, তামিল, চীনা, পঞ্জাবি, মারাঠি, হিন্দি, ওড়িয়া ইত্যাদি ভাষার প্রবাদ স্থান পায়। একই বছরে পাদরি লং আরও একটি প্রবাদমালা (১৮৭২) প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থে আগের দুটি গ্রন্থের বাইরে অতিরিক্ত আরও ৩৪২৯টি প্রবাদ সংকলিত হয়।

বাঙালির হাতে সংগৃহীত প্রথম বাংলা প্রবাদ সংকলন সম্ভবত কানাইলাল ঘোষালের প্রবাদ-সংগ্রহ (১৮৯০)। এতে সংকলিত কিছু হিন্দি ও সংস্কৃত প্রবাদ বাদ দিলে বাংলা প্রবাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২১৮। প্রবাদগুলি বর্ণানুক্রমে সজ্জিত। এ সংকলনে নতুন প্রবাদ যেমন ছিল না তেমনি ব্যাখ্যাও সর্বত্র সঠিক হয়নি। কোনো কোনো প্রবাদের রূপও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ রক্ষিত হয়নি।

অবশ্য এই সংকলন প্রকাশের আগে ও পরে বামাবোধিনী পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যায় (১৮৮৬, ১৮৯১-১৮৯৩) বর্ণনানুক্রমিকভাবে ১৫৯৩টি প্রবাদ প্রকাশিত হয় ‘বাঙ্গালা প্রবচন’ নামে। তবে সংগ্রহ ও সংকলনকারীর নাম তাতে ছাপা হয়নি। তাছাড়া নতুন প্রবাদের সংখ্যাও ছিল অল্প। এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১২৯৭ বঙ্গাব্দের বামাবোধিনী পত্রিকায় আলাদাভাবে আরও ১০২টি প্রবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

একই সময়ে প্রবোধচন্দ্র মজুমদার ‘বঙ্গীয় প্রবচনাবলী’ নামে ১০০টি প্রবাদ প্রকাশ করেছিলেন উগ্রক্ষত্রিয় প্রতিনিধি পত্রিকায় (১৮৯২)। এরই পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছিল দ্বারকানাথ বসু প্রণীত প্রবাদ-পুস্তক (১৮৯৩)। এটি ছিল একাধারে প্রবাদ সম্পর্কিত প্রবন্ধ ও প্রবাদমালা সংকলন। বর্ণানুক্রমে সংকলিত প্রবাদের সংখ্যা ছিল ২২৭১টি।

এর প্রায় পাঁচ বছর পর প্রকাশিত হয় মধুমাধব চট্টোপাধ্যায় প্রণীত ও প্রকাশিত প্রবাদ পদ্মিনী (প্রখম ও দ্বিতীয় খণ্ড ১৮৯৮, তৃতীয় খণ্ড ১৯০২)। এতে সংকলিত প্রবাদের সংখ্যা ৭৫। প্রবাদ সংগ্রহ হিসেবে এর গুরুত্ব খুবই সামান্য। চন্দ্রভূষণ শর্মামণ্ডল রচিত ও চার ভাগে প্রকাশিত প্রবাদ-পদ্ম-ও একই ধরনের বই। এত সংকলিত প্রবাদের সংখ্যা নগণ্য এবং প্রবাদকে ছাপিয়ে উঠেছে ব্যাখ্যা ও গল্প।

দুর্গাগতি মুখোপাধ্যায় কর্তৃক সংগৃহীত ও প্রকাশিত ডাক পুরুষের কথা (১৯০৪) ৩৫টি প্রবাদ, ৯টি ডাকের বচন, এবং ২২টি খনার বচনের সংকলন। খনার বচনগুরি কৃষি বিষয়ক এবং সেগুলিকে ডাক পুরুষের কথা বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। এর ২৪ বছর পর প্রকাশিত হয় বক্রেশ্বর ন্যায়রতœ সংগৃহীত ডাক পুরুষের বচন (১৯২৮)। এটিই পুরোনো ডাকের বচনের একমাত্র প্রামাণ্য সংগ্রহগ্রন্থ।

প্রবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে মেয়েলি প্রবাদের বিষয়টিও বাদ যায়নি। ঢাকা সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে প্রতিভা পত্রিকায় প্রকাশিত ‘পূর্ববঙ্গের মেয়েলী শ্লোক’ তার উদাহরণ। এ পত্রিকায় প্রথমে (১৯১৩-১৯১৪) ধারাবাহিকভাবে মেয়েলি শ্লোক সংকলন করে প্রকাশ করেন যোগেন্দ্র কিশোর রক্ষিত। পরে (১৯১৪-১৯১৬) তা করেন গোপীনাথ দত্ত। পরবর্তীকালে ঢাকা সাহিত্য পরিষদ শ্লোকগুলি পুস্তিকাকারে প্রকাশ করেছিল। কিন্তু তাতে সংগ্রাহকের কোনো নাম ছিল না।

মেয়েলি প্রবাদকে পরে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন সুকুমার সেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় ‘বাংলা নারীর ভাষা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রবন্ধের শেষে তিনি ২০টি প্রবাদ উদাহরণ হিসেবে সন্নিবেশ করেছিলেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নাল অব দা ডিপার্টমেন্ট অব লেটার্স-এর অষ্টাদশ খণ্ডে (১৯২৮) ‘বাঙ্গালায় নারীর ভাষা’ ও ‘উইমেন’স ডায়ালেক্ট ইন বেঙ্গালি’ নামে যে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন তাতেও ৩১০টি মেয়েলি প্রবাদ সংকলিত হয়। অনেক পরে ড. নির্মল দাশের উত্তরবঙ্গের প্রবাদ প্রসঙ্গ (১৯৮৪) গ্রন্থে উত্তরবঙ্গের ৩০টি মেয়েলি প্রবাদ সংকলিত হয়।

প্রবাদ সংকলনে ১৯২০-এর দশকে এগিয়ে আসতে দেখা যায় বঙ্গবাসী পত্রিকাকে। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে পত্রিকাটি ধারাবাহিকভাবে ‘প্রবাদ সংগ্রহ’ শিরোনামে ৩৮০৮টি প্রবাদ প্রকাশ করে। তবে সংগ্রহকারী বা সংকলকের কোনো নাম ছিল না।

১৯৩০-এর দশকে প্রবাদ সংকলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে পুষ্পপত্র পত্রিকা। পত্রিকাটি ধারাবাহিকভাবে (১৯৩০-৩২) ইন্দুবিকাশ বসু সংকলিত মোট ৮০০ প্রবাদ প্রকাশ করে।

প্রবাদ সংগ্রহে পূর্ব বাংলায় বিশেষ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছেন মোহাম্মদ হানিফ পাঠান। পূর্ববঙ্গের ২৫৩টি প্রবাদের ব্যাখ্যা সংবলিত সংগ্রহ তিনি প্রকাশ করেন পল্লী সাহিত্যের কুড়ানো মানিক (১৯৩৬) নামে। পরবর্তীকালে বাংলা একাডেমি ঢাকা থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বাংলা প্রবাদ পরিচিতি (প্রথম খণ্ড ১৯৭৬, দ্বিতীয় খণ্ড প্রথম অংশ ১৯৬২, দ্বিতীয় খণ্ড দ্বিতীয় অংশ ১৯৮৫)।

বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রবাদ ও প্রবচনের আর একটি উল্লেখযোগ্য সংকলন হচ্ছে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বচন ও প্রবচন (১৯৮৫)। এতে ১০০০ বিষয়ে বিষয় ও উদ্দেশ্য ভিত্তিক প্রবাদ সংকলিত হয়েছে।

বাংলা একাডেমি ঢাকা থেকে প্রকাশিত ড. কাজী দীন মুহম্মদ সম্পাদিত এবং মোহাম্মদ সিরাজউদ্দীন কাসিমপুরী সংকলিত লোক-সাহিত্য ধাঁধা ও প্রবাদ (১৯৬৮) গ্রন্থ ৯৭৮টি প্রবাদ সংকলিত হয়েছে। এ ছাড়া ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের বাংলার লোকসাহিত্য গ্রন্থের ষষ্ঠ খণ্ডে (১৯৭২) বেশ কিছু প্রবাদ সন্নিবেশিত হয়েছে।

১৯৩০-এর দশকে দুটি বহুল প্রচারিত অভিধানে বাংলা প্রবাদ সংকলিত হয়। সুবলচন্দ্র মিত্রের সরল বাংলা অভিধানে (৭ম সংস্করণ, ১৯৩৬) ৩২০১টি বাংলা প্রবাদ সংকলিত হয়। প্রবাদগুলি বর্ণানুক্রমে বিন্যস্ত ও ব্যাখ্যাযুক্ত। আশুতোষ দেবের নূতন অভিধানে (১৯৩৭) সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা ও টীকা সমেত যে প্রবচন সংগ্রহ দেওয়া হয়েছে তার সংখ্যা ১৮৩০।

 

উনিশ শতকে আঞ্চলিক প্রবাদ সংগ্রহেও লক্ষণীয় উদ্যোগ দেখা গেছে। এ সবের মধ্যে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য ক্যাপটেন টি এইচ লেউইন সংগৃহীত হিল প্রোভার্বস অব দি ইনহ্যাবিট্যান্টস অব দা চিটাগাং হিলট্র্যাক্টস (১৮৭৩), জে. ডি. এন্ডারসন সংকলিত সাম চিটাগাং প্রোভার্বস (১৮৯৭)। প্রথম গ্রন্থটি দুর্লভ। দ্বিতীয়টিতে ইংরেজি অনুবাদ ও টিপ্পনী সহ ৩৫২টি প্রবাদ সন্নিবেশিত হয়েছে। এরই অনুসরণে ড. মুহম্মদ  এনামুল হক তাঁর চট্টগ্রামী বাংলার রহস্যভেদ গ্রন্থের পরিশিষ্টে প্রায় এক হাজার স্থানীয় প্রবাদ বর্ণানুক্রমিভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন।

বিশ শতকেও আঞ্চলিক প্রবাদ সংগ্রহ গুরুত্ব পায়। রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় স্থানীয় প্রবাদ ক্রমান্বয়ে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তারাশঙ্কর তর্করত্ন। পত্রিকাটির অষ্টম ভাগে (১৯১৩) ৬৫টি প্রবাদ প্রকাশিত হয় ‘রঙ্গপুরে প্রচলিত প্রবাদ’ শিরোনামে। ক্রমে আরও প্রবাদ প্রকাশিত হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হলেও তা প্রকাশিত হয়নি।

ময়মনসিংহের আঞ্চলিক প্রবাদ সংকলিত হয় কেদারনাথ মজুমদার প্রবর্তিত এবং ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত সৌরভ পত্রিকার পঞ্চদশ বর্ষে (১৯২৬-১৯২৭)।  তাতে কুমুদচন্দ্র ভট্টাচার্য সংগৃহীত প্রবাদগুলি প্রকাশিত হয়েছিল ‘প্রবাদের আবাদ’ শিরোনামে। এত প্রধানত ময়মনসিংহ অঞ্চলের ৪১২টি প্রবাদ সংকলিত হয়।

চারুচন্দ্র সান্যালের রাজবানিজ অব নর্থবেঙ্গল (১৯৬৫) গ্রন্থে ১৮০টি প্রবাদ গ্রন্থিত হয়েছে। রাধাগোবিন্দ মাহাত তাঁর ঝাড়খণ্ডের লোকসংস্কৃতি (১৯৭২) গন্থে ২৮১টি প্রবাদ সংকলন করেন। তাঁর লোকায়ত ছাড়খণ্ড গ্রন্থে সংকলিত ঝাড়খণ্ডী প্রবাদের সংখ্যা ৯০৫টি।

মানভূমে প্রচলিত ৩৬৬টি প্রবাদ-প্রবচন সংকলন করেছেন রেখা সিংহ তাঁর মানভূমের লোকসাহিত্য ও শব্দকোষ গ্রন্থে।

বাংলা প্রবাদের সবচেয়ে সমৃদ্ধ সংকলন গ্রন্থ হচ্ছে সুশীল কুমার দে সংকলিত বাংলা প্রবাদ (১৯৪৫)। এতে প্রায় সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি প্রবাদ সংকলিত হয়েছে। এই গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে (১৯৫২) প্রবাদসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯২০০টিতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষি সম্পর্কিত ১৩৫টি খনার বচন। এর পাশাপাশি রয়েছে বাংলা প্রবাদ নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা।

বাংলা প্রবাদগুলি বাস্তব লোক-অভিজ্ঞতাপ্রসূত। এসবের মাধ্যমে প্রকাশ পায় লোকসমাজের নীতিগর্ভ ও জীবন-সমালোচনামূলক মর্মবাণী। প্রবাদের সংক্ষিপ্ত ছোট পরিসরের বাক্য কিংবা ছন্দোবদ্ধ দুই চরণের মধ্যে প্রকাশ ঘটে জীবন, জগৎ ও সমাজ সম্পর্কে গভীর ভাবদ্যোতক অর্থবহ ব্যবহারিক জ্ঞান, উপলব্ধি বা অভিজ্ঞতার। এভাবে প্রবাদের মধ্য দিয়ে জাতি বা সমাজের জ্ঞান, সমাজমানস, ঐতিহ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে লোকসমাজের দৃঢ়মূল নানা ধারণা অভিব্যক্তি পায়। বাংলা প্রবাদ নিয়ে নিরন্তর আলোচনা ও গবেষণাচলছে। তার মাধ্যমে বাঙালির সমাজ ও সংস্কৃতির পরিচয় নিত্য নব রূপে আমাদের সামনে উদ্ঘাটিত হচ্ছে।

বেশ কিছু প্রবাদে পারিবারিক জীবন ও পারিবারিক সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রবাদে বাঙালির সংসার-জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে তাতে মায়ের আসন সবচেয়ে মমতার ও মর্যাদার। তা প্রাক-আর্য সমাজের মাতৃপ্রাধান্যসূচক বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক : ‘কিসের মাসী, কিসের পিসী, কিসের বৃন্দাবন /  মরা গাছে ফুল ফুটেছে, মা বড় ধন’ অন্যদিকে প্রবাদে সন্তানের প্রতি মায়ের অকৃত্রিম স্নেহের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এভাবে : ‘মাছ চেনে গভীর জল পাখি চেনে ডাল। / মায়ে জানে পুত্রের মায়া জীয়ে কতকাল॥’ বিবাহিত কন্যার মধ্যে মাতৃপ্রীতির চেয়ে স্বামীপ্রীতিকেও সমাজ ভালো চোখে দেখেনি। প্রবাদে তারই ইঙ্গিত : ‘‘মা মরে ঝিয়ের তরে, ঝি মরে ভাতারের তরে ॥’ প্রবাদে সতী নারীর ভূমিকাকে দেখা হয়েছে এভাবে : ‘পতির পায় আছে মতি, তবেই তারে বলে সতী।’  সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় নারীর রূপের প্রশংসনীয় বর্ণনা থাকলেও প্রবাদে নারীর রূপের  চেয়ে গুণকে দেওয়া হয়েছে অধিকতর গুরুত্ব : ‘রূপে মারি লাথি, গুণে ধরি ছাতি।’

কোনো কোনো প্রবাদে বাঙালির চরিত্র্য-বৈশিষ্ট্যও প্রকাশিত। দলছুট ব্যক্তি আবার দলে যোগ দিলে সে তথ্যকে ইঙ্গিত করে প্রবাদ : ‘ঝাঁকের কই ঝাঁকে যায়।’ নির্লজ্জ বা নির্গুণ লোকের ধৃষ্টতার পরিচয় প্রসঙ্গে প্রবাদে বলা হয়েছে : ‘কানকাটা কই  তালগাছ বায়, কালা মুখ নিয়ে দরবারে যায়।’ দরিদ্র লোকের ভোজন বিলাসকে প্রবাদে ব্যঙ্গ করা হয়েছে এভাবে : ‘খেতে পায় না শাক সজিনা। / ডাক দিয়ে বলে ঘি আন না ॥’

কোনো কোনো প্রবাদ মানব চরিত্রের নানা বৈশিষ্ট্য নির্দেশক। কারও রাগান্বিত অবস্থাকে প্রকাশ করার জন্য ব্যবহৃত হয়, ‘তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠা’ প্রবাদটি। পরিবারে কর্তৃত্বসূচক ভূমিকা বেড়ে গেলে জীবন  যে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে একটি প্রবাদে তার স্বীকৃতি : ‘এক বাড়িতে সাত কর্তা, করে কেবল বেগুন ভর্তা।’ সামান্য ব্যক্তির মধ্যে চমকপ্রদ গুণ দেখে যে বিস্ময় জাগে তার প্রকাশ ঘটেছে প্রবাদে : ‘লাউ থাকতে কুমড়ো থাকতে সরষের মধ্যে তেল।’ বাইরের পোশাক দিয়ে গুণসত্তা নির্ধারণ করা চলে না : ‘ছাই মাখলে যদি সন্নাসী হয়, চাল কুমড়ো কেন বাকি রয়?’

অনেক প্রবাদ সমালোচনামূলক। প্রবাদে অনর্থক অপচয়ের সমালোচনা করা হয়েছে। কারণ পরিণামে তা অভাব ডেকে আনে : ‘একদিন করে মজা, ছমাস খাবি ঝিঙে ভাজা।’ মিথ্যাচারকে সমালোচনা করা হয়েছে এভাবে : ‘ভাজে ঝিঙে তো বলে পটোল।’ নিজের দোষত্রুটি সত্ত্বেও কেউ যখন অন্যের খুঁত ধরে তখন ব্যবহৃত হয় এই প্রবাদ : ‘রসুন বলে − কাঁচকলা ভাই, তোমার বড় খোসা।’ কোনো কোনো প্রবাদে নিজের অবস্থা ভুলে অতিরিক্ত বিলাসিতাকে সমালোচনা করা হয়েছে : ‘নেই ঘর নেই বাড়ি, বউকে পড়ায় ঢাকাই শাড়ি।’ অসঙ্গত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিলাসিতাও হয়েছে সমালোচিত : ‘চুল নেই তার টেরিকাটা।’

কোনো কোনো প্রবাদে রয়েছে নানা অভিজ্ঞতার সারাৎসার । ভালো জিনিস না পেলে মানুষকে কম ভালো জিনিস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় : ‘আম না থাকলে আমড়া চোষে।’ কোনো কাজে লাভ না হয়ে বরং ক্ষতি হওয়ার অভিজ্ঞতা : ‘আমও গেল, ছালাও গেল।’  দুষ্ট জনের দোষটি সহজে ঘোচে না : ‘ছুঁচো যদি আতর মাখে, তবু কি তার গন্ধ ঢাকে।’

অযোগ্য লোককে যোগ্য করে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা বোঝাতে বলা হয় : ‘কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানো।’  কিন্তু যার মধ্যে সামান্যতম যোগ্যতাও নেই তাকে যোগ্য করে তোলা অসম্ভব : ‘ভিতরে যদি সার না থাকে, কিল গুঁতায় কি কাঁঠাল পাকে।’ অতিরঞ্জন যাদের স্বভাব তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত  প্রবাদ : ‘হয় যদি তিলটা, কয় তবে তালটা।’

উপযুক্ত অঙ্গ না হলে সাজপোশাক ও অলংকার শোভন হয় না। এ নিয়ে বিদ্রƒপাত্মক সমালোচনা : ‘গোদা পায়ে আলতা, খাঁদা নাকে নথ।’ কিংবা ‘চাল নেই ধান নেই গোলা ভরা ইন্দুর,/ ভাতার নেই, পুত নেই, কপাল ভরা সিন্দুর।’

প্রবাদপ্রতিম খনার বচনগুলিকে লৌকিক কৃষিবিজ্ঞান হিসেবে গণ্য করা চলে। যেমন : ভালো ধানের জন্য ঘন চাষ ও ভালো মই চালানো দরকার : ‘ ঘনাইয়া চাষ আর টীপাইয়া মই / এই ক্ষেতে ধান না হইয়া যায় কই।’ বিভিন্ন ফসলের জন্য বিভিন্ন রকম চাষ দরকার : ‘ষোল চালে মূলা / তার অর্ধেক তুলা / তার অর্ধেক ধান / বিনা চাষে পান।’

প্রবাদে সামাজিক নানা স্তর সম্পর্কে লোকায়ত দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে নানাভাবে। যেমন, সমাজজীবনে ধর্মসূত্রে ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য চলে আসলেও লৌকিক সমাজে ব্রাহ্মণের বিরুদ্ধে যে পুজ্ঞীভূত ক্ষোভ বিরাজিত ছিল তার প্রকাশ ঘটেছে প্রবাদে। ব্রাহ্মণের জীবিকা মূলত দক্ষিণা লাভের ওপর নির্ভরশীল : ‘বামুন বাদল বান, দক্ষিণা পেলেই যান।’ দক্ষিণালোভী ব্রাহ্মণ দক্ষিণার জন্য ধর্মকাজে যে কোনো পর্যায়ে নামতে পারে : ‘বামুনে দক্ষিণা ধরে, ঢেঁকির নামেও চণ্ডী পড়ে।’ প্রজাশাসন ও প্রজাশোষণের কারণে সমাজে জমিদারদের সম্পর্কে যে বিরূপ মনোভাব বিরাজিত ছিল প্রবাদে তারও প্রতিফলন ঘটেছে : ‘সাপ শালা জমিদার, তিন নয় আপনার।’

এভাবে প্রবাদে সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়, শ্রেণি ও পেশার মানুষের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি মানব-চরিত্রের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। সমালোচনা করা হয়েছে ত্রুটি-বিচ্যুতির। এর উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা পেশাকে হেয় প্রতিপন্ন করা নয়, বরং সমাজ-জীবনে মহৎ আদর্শময় পরিবেশ সৃষ্টি।

1-mahbubul-hoque