সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

অনুবাদের কোন বিকল্প নাই বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে গ্রহণীয় হওয়ার জন্য – শাহীন আখতার

September 19th, 2016 10:15 pm
অনুবাদের কোন বিকল্প নাই বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে গ্রহণীয় হওয়ার জন্য  – শাহীন আখতার

প্রচ্ছদ রচনা

আলাপন

 

[কথাশিল্পে অবদানের জন্য শাহীন আখতার বাংলা একাডেমি পুরস্কারে (২০১৫) সম্মানিত হয়েছেন। তিনি কলকাতা আনন্দ বাজার গ্রুপের টেলিভিশন চ্যানেল এবিপি আনন্দ প্রদত্ত ‘সেরা বাঙালি সাহিত্যিক’  পুরস্কার (২০১৪), ঢাকা প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কথাসাহিত্য পুরস্কার (২০১৪) এবং আইএফআইসি ব্যাংক পুরস্কার (২০১৫) লাভ করেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা : উপন্যাস ৪টি, গল্পগ্রন্থ ৫টি, সম্পাদিতগ্রন্থ ৩টি ও ১টি প্রবন্ধগ্রন্থ রয়েছে।]

 

অনুবাদের কোন বিকল্প নাই বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে গ্রহণীয় হওয়ার জন্য

– শাহীন আখতার

 

শব্দঘর : একুশ শতকে পৌঁছে বিশ শতকের বাংলাসাহিত্যের তুলনায় আমরা কতদূর এগুতে পেরেছি বলে আপনি মনে করেন?

শাহীন আখতার : একুশ শতকের মাত্র তো পনের বছর গেল। পঁচাশি বছর বাকি। বিশ শতকের সাথে তুলনাটা তখন করলেই ভালো হবে। গোটা বাংলাসাহিত্যের কথা ভাবলে বিশ শতক অনেক উজ্জ্বল। শতাব্দীর শুরুতে মুসলমান লেখকরাও আধুনিক সাহিত্যে অংশ নিতে শুরু করেন। বাংলাভাগের পর ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চা শুরু হয় কলকাতার আদলে। এর চেহারাটা অনেকটাই পাল্টে গেছে এখন। রাষ্ট্র আলাদা হওয়ার কারণে একই ভাষাভাষি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তাছাড়া মুখের ভাষা ও ধর্মীয় সংস্কৃতি তো বরাবরই আলাদা ছিল। এসব ভিন্নতার ছাপ পড়তে শুরু করেছে আমাদের সাহিত্যে। নিজস্ব ভাষা, বিষয় আবিষ্কার- এসব নিঃসন্দেহে অগ্রগতি। এদিক থেকে একুশ শতক বেশ সম্ভাবনাময় মনে হচ্ছে।

শব্দঘর : বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে বাংলাসাহিত্য কতখানি গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন? এ প্রসঙ্গে আপনার পরামর্শ কী?

শাহীন আখতার : বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে বাংলাসাহিত্য গ্রহণীয় বা বর্জনীয় হওয়ার মতো কোনো ঘটনা কি ঘটেছে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির বয়স হয়ে গেল একশ দুই বছর। বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে ঢেউ তুলতে গেলে দু-চারটা বই ইংরেজি অনুবাদ হওয়ার মতো ছোট ছোট ঢিলে কাজ হবে না। আমার মনে হয়, কোরিয়ান সাহিত্যের প্রতি আন্তর্জাতিক পাঠকমহলের এবার নজর পড়বে। হ্যান ক্যাং-এর দ্য ভেজিটেরিয়ান বইটা ম্যানবুকার পুরস্কার পেয়েছে বলে। একটা চমৎকার বইয়ের সুচারু অনুবাদের কোনো বিকল্প নাই বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে গ্রহণীয় হওয়ার জন্য।

শব্দঘর : আপনার নিজের লেখা উপন্যাস ও ছোটগল্প বিষয়ে কিছু বলুন।

শাহীন আখতার : আমার সাহিত্যকর্ম বলতে কয়েকটা ছোটগল্পের বই, ৪টি উপন্যাস (এখন যেটি লিখছি, তা বাদ দিয়ে), কিছু গদ্য রচনা আর সম্পাদিত দুটি সাহিত্য সংকলন। আমার প্রথম উপন্যাস পালাবার পথ নেই-র বিষয় গত শতকের আশি-নব্বইয়ের দশকের বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া দুটি মেয়ের নানাবিধ ক্রাইসিস। তালাশ ৭১-র মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা হলেও আমি একে ঐতিহাসিক উপন্যাস মনে করি না। উপন্যাসে যুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী দু’ধরনের বাস্তবতা রয়েছে। ধর্ষিত নারীর নিপীড়ন যুদ্ধকালে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা চোরাবালুর তল দিয়ে অদৃশ্যভাবে বইতে থাকে, যদ্দিন নারীটি বেঁচে থাকেন। স্বভাবত যুদ্ধ-পরবর্তী সময়টা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তালাশ উপন্যাসে। সেটি ২৭/২৮ বছর। তার মানে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রায়। কিন্তু পরের দুটি উপন্যাস- সখী রঙ্গমালা ও ময়ূর সিংহাসন যে কোনো বিচারেই ঐতিহাসিক।

সখী রঙ্গমালা অষ্টাদশ শতকের একটি পালাগান অবলম্বনে লেখা। বাস্তবেও যে ঘটনাটা ঘটেছিল, এর কিছু তথ্যপ্রমাণ, আলামত রয়েছে। আড়াইশ বছরের পুরানো কাহিনি নিয়ে লিখছি- ভাষা নিয়ে ভাবতে হয়েছিল বৈকি। আমি পালাগানের আঞ্চলিক ও সংগীতময় ভাষা নিয়ে এ উপন্যাসে কাজ করেছি। আরেকটা দিক তখন মাথায় রাখতে হয়েছিল। তখন সবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব শুরু হয়েছে। আদালতের ভাষা তখন ফারসি। সে যুগে উচ্চবর্গের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ফার্সি ভাষাটা শিখতেন। প্রয়োজনেই তাদের শিখতে হতো। উপন্যাসের বেশিরভাগ চরিত্র জমিদার পরিবারের। তাই আরবি-ফারসি শব্দের যথেচ্ছো ব্যবহার সখী রঙ্গমালায় লক্ষ্য করা যায়। আমি মনে করি, আমি যখন পাঠককে দূরবর্তী কোনো কাহিনি শোনাব, যে সময়টা তাদের অজানা-অচেনা, বর্তমানের চলতি ভাষা থেকে কিছুটা সরে গিয়ে সেটি তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা দরকার। যাতে উপন্যাসের বিষয় ও ভাষার মধ্যে সাজুয্য থাকে, দূরত্বের অনুভূতিটা হারিয়ে না যায়।

book-1

সখী রঙ্গমালার পর ময়ূর সিংহাসন লেখার ছোট্ট একটা কারণ হয়তো- আমার অতীত-মুখী জার্নিটা আমি অব্যাহত রাখতে চেয়েছি। চট করে বর্তমানে ফিরতে চাই নাই। তাছাড়া সখী রঙ্গমালা লিখে হয়তো মন ভরেনি। কোথাও একটা অপূর্ণতার স্বাদ ছিল। পূর্ণতা লাভের আকাঙ্খায় ময়ূর সিংহাসন লিখতে বসেছি, তাও হতে পারে।

ময়ূর সিংহাসন উপন্যাসে কাহিনি সাজানোর ব্যাপারে খুব উদ্যোগী ছিলাম। উপন্যাসের দূর অতীতের মানুষÑ রাজকুমার, রাজকুমারি, বাঁদি সবাই নিজেকে বা অন্যকে নিয়ে বা সেই সময়টা নিয়ে কথা বলে। উপন্যাসটিকে যদি হতভাগ্য এক রাজকুমারের সপরিবারে পলায়ন এবং ভিনদেশে মৃত্যুবরণের কাহিনি বলি, তাহলে এর পুরোটা বলা হয় না। তাহলে নিঃসঙ্গ এক পরিব্রাজক বাদ পড়ে যায়। সে এ মুলুকের নানা কিসিমের মানুষের ধূলি-মলিন কাহিনি নিয়ে আরাকান অর্থাৎ আজকের রাখাইন রাজ্যের দিকে এগিয়ে যায়। পৌঁছায় ওই জনপদের এ সময়কার রক্তাক্ত ইতিহাসে।

কেউ ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখছে শুনলে আমাদের চোখের সামনে পর্বত-প্রমাণ ধূলি-ধূসর নথিপত্র বা মহাফেজখানায় লেখকের চষে বেড়ানোর দৃশ্য ভেসে ওঠে। বেশ কিছু দিন আগে ইন্টারনেটে দেখেছি, ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার জারিজুরি শেখানোর জন্য কোর্স চালু করতে যাচ্ছেন এক লেখক। তাতে কী কী শেখানো হবে এর একটা ফর্দ দেওয়া ছিল। গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে ফর্দের একটি বাক্য আমার খুব মনে ধরে- How to research beyond the historical footnote.

সৃজনশীল লেখার জন্য ঐতিহাসিক নথিপত্র ঘাঁটা শেষ কথা নয়। আমরা তো শুধু মাথা দিয়ে সাহিত্য লিখি না। অন্য ইন্দ্রিয়গুলো সজাগ থাকা একান্তভাবে জরুরি। ছোটখাটো অনেক ডিটেইল শুধু বিষয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায় না, আমাদের চেনা জগতের বাইরে অচেনা ভূবনে নিয়ে যায়। সখী রঙ্গমালা লেখার প্রস্তুতির ব্যাপারে একটি কথা বলি, পালাগানটি আমি কানে হেডফোন লাগিয়ে বার বার শুনতাম। কখনও কখনও শুনতে শুনতে ঘুমিয়েও পড়েছি। এটি এমন এক বাহন, যা দূরবর্তী এক অচেনা জগতে নিয়ে যাচ্ছিল। মানুষের মুখের বুলি, দেহাতি সুরÑ কথ্য সাহিত্যের এমন সব অনুষঙ্গ, তাতে প্রাচীনত্ব বিশেষ ম্লান হয় না, আমাদের আনন্দ-বিষাদের স্মৃতির কণাও আবরিত থাকে। ময়ূর সিংহাসন নিয়ে একটি সূত্র দিই- পারসিয়ান মিনিয়েচার, মোগল মিনিয়েচার পেন্টিং খুব সহায়ক হয়েছিল। ফারসি কাব্য-মহাকাব্য, যা মোগল সম্রাটদের পরিবার ও দরবারে পঠিত হতো, সে সবের কাছেও আমি অশেষ ঋণী। বাংলা তর্জমাকারীদের কাছে তো অবশ্যই।

Print

আমার লেখালেখির শুরুটা ছোটগল্প দিয়ে হলেও এখন উপন্যাস লেখায় সময় দিচ্ছি বেশি। মনে হচ্ছে এটাই আমার জন্য উপযুক্ত সাহিত্য ফর্ম। দীর্ঘ সময় ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে লেখাটা এগিয়ে নিতে পছন্দ করি। উপন্যাসের বিষয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কীভাবে লিখছি, সেটা আমার কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটা উপন্যাস থেকে আরেকটা উপন্যাসের বিষয়, ভাব ও আঙ্গিক যেন আলাদা হয়Ñ সেটাও আমার চর্চার বিষয়। আমার লেখা ৪টি উপন্যাসের ক্ষেত্রে তাই করেছি। এখন যেটা লিখছি, এর একটা অংশ এবারের প্রথম আলো ঈদসংখ্যায় ছাপা হবে, এ উপন্যাসের ক্ষেত্রেও উপরোক্ত কথা প্রযোজ্য।

শব্দঘর : আমাদের প্রবীণ কথাসাহিত্যিকদের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? প্রবীণ কথাসাহিত্যিকদের তুলনায় আমরা কতটুকু এগিয়েছি বা পিছিয়েছি বলে আপনি মনে করেন?

শাহীন আখতার : প্রবীণ কথাসাহিত্যিকদের তুলনায় আমরা কতটুকু এগিয়েছি বা পিছিয়েছি- আমার মনে হয় সেটা বের করা সাহিত্য-গবেষকের কাজ। লেখক হিসেবে আমার মনে হয়, আমি তাঁদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছি- ভালো লেখা তো অবশ্যই মন্দ লেখা থেকেও। মন্দ লেখা থেকে শিক্ষাটা এমন যে, ও রকম লেখা যেন আমি না লিখি। তবে ইচ্ছার কথা যদি বলি, আমি অগ্রজদের থেকে ভিন্ন রকম লিখতে চাই।

শব্দঘর : আপনার পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন।

শাহীন আখতার : লেখক হিসেবে পাঠকদের উদ্দেশে আলাদা করে বলার কী আছে। লেখক-পাঠকের মধ্যকার যোগসূত্র বইখানাই তো যথেষ্ট। পঠনের মধ্য দিয়ে তাঁরা আমার সাহিত্যজগত শুধু নয়, জীবনেরও অংশীদার। সাহিত্যের প্রসার পঠনের মধ্য দিয়েই হয়। আর পাঠক এর বাহক। আমি তাই ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ আমার পাঠকদের প্রতি। আমার নয় বরং পাঠকদেরই আমার উদ্দেশে কিছু বলার থাকতে পারে- সে উপদেশ বা বুদ্ধি-পরামর্শ যা-ই বলেন।