সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

বাংলাদেশের তরুণ কথাশিল্পীদের নিয়ে আমি প্রচণ্ড রকমের আশাবাদী – হরিশংকর জলদাস

September 19th, 2016 10:07 pm
বাংলাদেশের তরুণ কথাশিল্পীদের নিয়ে আমি প্রচণ্ড রকমের আশাবাদী  – হরিশংকর জলদাস

প্রচ্ছদ রচনা

আলাপন

 

[কথাশিল্পে অবদানের জন্য হরিশংকর জলদাস বাংলা একাডেমি পুরস্কারে (২০১২)  সম্মানিত। ‘সামাজিকভাবে অপমানিত হয়ে’ ৪৭ বছর বয়সে লিখতে শুরু করেন। ইতোমধ্যে অনন্য গদ্যশৈলীতে তাঁর ১১টি উপন্যাস এবং ৮টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (২০১৩), প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার (২০১০), সিটি-আনন্দ আলো পুরস্কার (২০১২), বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন সম্মাননা পদক (২০১২) ও ব্রাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার (২০১৪), অবসর সাহিত্য পুরস্কার (২০১১), ড. রশীদ আল ফারুকী সাহিত্য পুরস্কার (২০১১), বিশাল বাংলা প্রকাশনী সাহিত্য পুরস্কার (২০১৬), জীবনানন্দ মেলা সম্মাননা স্মারক (২০১৫)  লাভ করেন।]

 

বাংলাদেশের তরুণ কথাশিল্পীদের নিয়ে আমি প্রচণ্ড রকমের আশাবাদী

– হরিশংকর জলদাস

 

শব্দঘর : একুশ শতকে পৌঁছে বিশ শতকের বাংলাসাহিত্যের তুলনায় আমরা কতদূর এগুতে পেরেছি বলে আপনি মনে করেন?

হরিশংকর জলদাস : কটি বছরই বা গেল একুশ শতকের! মাত্র সাড়ে পনের বছর। শতসহস্র বছরের নিরিখে সাড়ে পনের বছর অতি সামান্য। এই সামান্য সময়কে একশ বছরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো যায় না। তারপরও প্রশ্নটি যখন করেছেন, দু’একটি কথা বলতেই হয়।

উনিশ শতকের ভিন্নরকমের একটা জৌলুস ছিল। কবিতা-নাটক-প্রবন্ধ। তারপর কথাসাহিত্য। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র। এঁদের হাত দিয়ে কথাসাহিত্য আচমকা পুষ্ট হয়ে উঠল। বঙ্কিমচন্দ্র তো ছোটগল্প লিখলেন না, লিখলেন উপন্যাস। তাঁর উপন্যাসে কখনো কখনো আদর্শ, সংস্কারÑ এসব বড় হয়ে উঠল। রবীন্দ্রনাথ এসে বঙ্কিমের সাহিত্যধারাটা পাল্টে দিতে শুরু করলেন। তাঁর কথাসাহিত্যেও যে ইজম নেই এমন তো নয়। তবে ওই ইজম কখনো মানবিক মূল্যবোধকে অতিক্রম করে যায়নি। তার ছোটগল্পে বাঙালিদের জীবন, ঘরবাড়ি-উঠান-এঁদো ডোবা, মাঠের গরু, বালিকাবধূর হƒদয়, হৈমন্তীদের হাহাকার স্পষ্ট হয়ে উঠল।

তাঁর পর তো শরৎচন্দ্র। বাঙালি পাঠককে কাঁদালেন, মর্মতলের সন্ধান দিলেন। এরপর আরও অনেকে উনিশশতকে কথাসাহিত্য রচনা করলেন।

বিংশ শতাব্দীর অনেকটা অংশ জুড়ে ওঁদের কলম সচল থাকল। সমুদ্র জলতলের চোরা স্রোতের মতো, ওই বিংশ শতাব্দীতে ভিন্ন একটা সাহিত্য স্রোত স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করল। এলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, তারপর সমরেশ বসু, বুদ্ধদেব বসু এঁরা। আবুল কালাম শামসুদ্দীন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, শওকত আলী, রাবেয়া খাতুন বাংলা সাহিত্যে নতুন মাত্রাযুক্ত করবার ব্রত গ্রহণ করলেন। কথাসাহিত্যের ধারা এগুতে লাগল। এ ধারায় যুক্ত হলেন সুনীল, শ্যামল, শীর্ষেন্দুরা আর হলেন হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, শহীদুল জহির, মঈনুল আহসান সাবের, নাসরীন জাহান, এঁরা। আনিসুল হক কথাসাহিত্যে নতুন একটা বাতাবরণ তৈরির চেষ্টায় রত থাকলেন। সেলিনা হোসেনের হাতে বাঙালি জীবন অসাধারণভাবে উপস্থাপিত হল।

এই একবিংশ শতকে বিংশ শতাব্দীর অনেকের কলমই সচল আছে। তাঁদের কথাসাহিত্যে নতুন নতুন বিষয়, নতুন নতুন রূপবৈচিত্র্য যুক্ত হচ্ছে। এঁদের পরে যাঁরা কলম ধরেছেন বা ধরছেন, তাঁদের মাধ্যমে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য আরও অধিক রূপময় হয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।

শব্দঘর : বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে বাংলা কথাসাহিত্য কতখানি গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে বলে আপনি মনে করেন? এ প্রসঙ্গে আপনার পরামর্শ কী?

হরিশংকর জলদাস : বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য গ্রহণীয় হয়ে ওঠার প্রধান অন্তরায় হলÑ অনুবাদ। কথাসাহিত্য নয় শুধু, সাহিত্যের সকল শাখা বিষয়ে একথাটি প্রযোজ্য। অনূদিত না হলে কোনো আঞ্চলিক সাহিত্যকর্ম বিশ্বদরবারে স্থান পাবে না কিছুতেই। তবে যেনতেন রকমের অনুবাদ হলে চলবে না। যথার্থ অনুবাদের প্রয়োজন আছে।

অনেক অনেক ভালো গল্প-উপন্যাস- কবিতা-নাটক রচিত হচ্ছে বাংলাদেশে। কিন্তু এগুলো অনুবাদের অভাবে শুধু বাঙালি পাঠকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। এও সত্য যে, এসব লেখার অধিকাংশ পাঠক বাংলাদেশি। আমাদের লেখাগুলো পশ্চিমবঙ্গ পড়ে না। বইপত্র যায় না বলে পড়ে না,না উন্নাসিকতার জন্য পড়ে না, তা সঠিক করে বলতে পারব না আমি।

যদি শুধুমাত্র বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের আলোকে প্রশ্নটি করে থাকেন, তাহলে আমি বলবÑ বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য তেমন করে এখনও পরিচিতি লাভ করেনি।

Print

শব্দঘর : বাংলাদেশের তরুণ কথাশিল্পীদের নিয়ে আপনি কতটুকু আশাবাদী- উত্তরণের পথে করণীয় কী?

হরিশংকর জলদাস : বাংলাদেশের তরুণ কথাশিল্পীদের নিয়ে আমি প্রচ- রকমের আশাবাদী। একটু আগের যাঁরা, তাঁরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে রক্ষণশীল, কিন্তু তরুণ লেখকরা সেই রক্ষণশীলতায় কুঠারাঘাত করছেন। তাঁদের কাছে জীবন  বড়; তাঁরা সবসময় চাইছেনÑ জীবনের মূল্যবোধটা যাতে কোনো সীমাবদ্ধ সামাজিক বা রাজনৈতিক খবরদারির কাছে মাথা নত না করে।

প্রবহমান কথাসাহিত্যের ধারাকে একেবারে অস্বীকার করছেন না তরুণরা, কিন্তু যেখানে যেখানে তাঁরা মনে করছেন এ ভাবনা ঠিক নয়, এ জীবনচিত্র অমূলক, সেখানে সেখানে বিদ্রোহীর কলম ঘষছেন তাঁরা। জীবন ঘষে ঘষে নতুন জীবনের সলতেয় আগুন জ্বালানের ব্রত নিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের চেষ্টা-প্রচেষ্টা বাংলা কথাসাহিত্যের ধারায় ভিন্নমাত্রার একটা প্রবল বেগ যুক্ত হবে।

শব্দঘর : আমাদের প্রবীণ কথাসাহিত্যিকদের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? প্রবীণ কথাসাহিত্যিকদের তুলনায় আমরা কতটুকু এগিয়েছি বা পিছিয়েছি বলে আপনি মনে করেন?

হরিশংকর জলদাস : পূর্ব পুরুষদের প্রতি যে উত্তরাধিকারী শ্রদ্ধা পোষণ করে না, সেই উত্তরাধিকারীরা ধিক্কারের যোগ্য। প্রবীন কথাসাহিত্যকরা অবশ্যই আমার কাছে নমস্য। তাঁরা সাহিত্যপথের কন্টক, আগাছা সরিয়ে সরিয়ে নতুন রাস্তা তৈরি করেছেন। সেই রাস্তা আজ বন্ধুর নয়, সুগম। সেই সুগম রাস্তা দিয়ে আমরা তর তর করে এগিয়ে যাচ্ছি। এই এগিয়ে যাওয়ার পথটি অনেক শ্রম-ঘাম ঝরিয়ে যাঁরা তৈরি করেছেন, তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

প্রবীন কথাসাহিত্যকদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করবার সময় এখনো আসেনি। সেই তুলনার জন্য আরও সময়ের দরকার। পরবর্তী জেনারেশানই সেই তুলনাটি করবেন।

 

শব্দঘর : সাহিত্যে ভবিষ্যৎ লেখালেখি নিয়ে আপনার নিজস্ব চিন্তা কী?

হরিশংকর জলদাস : ভবিষ্যৎ লেখালেখি নিয়ে তেমন করে ভাবি না আমি। মাঝে মধ্যে লেখালেখি বন্ধ করে দিতে ইচ্ছে করে আমার। তারপরও কোনো লেখার বিষয় যখন আমর ওপর ভর করে, দীর্ঘসময় ধরে পরিকল্পনা করি। যে বিষয়টি নিয়ে লিখব, তা নিয়ে লেখাপড়া করি।

book-2

আমি তো প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে লিখি মূলত। ভবিষ্যতে কী লিখব, তা মনের মধ্যে তেমন করে এখনো দানা বেঁধে ওঠেনি। তবে কৃত্তিবাস আমাকে হাতছানি দিচ্ছেন।

শব্দঘর : আপনার প্রিয় উপন্যাস ও ছোটগল্প বিষয়ে কিছু বলুন :

হরিশংকর জলদাস : প্রিয় উপন্যাস তো অনেক, ছোটগল্পও। মনোজ বসুর নিশিকুটুম্ব আমাকে একদা বিভোর করেছিল। তখন মনে হয়েছিল সাহেবের মতো চোর হতে পারলে জীবনটা বর্তে যাবে। ইমদাদুল হকের ভূমিপুত্র আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। সেলিনা হোসেনের গায়ত্রীসন্ধ্যা আমাকে দখল করে নিয়েছে। গল্পের কথা আর কী বলব!

শব্দঘর : আপনার পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন।

হরিশংকর জলদাস : পাঠকরা আমার নির্মাতা। পাঠকরাই ভালো লেখক তৈরি করেন। আমি ভালো লিখলে পড়বেন। লেখাটা ভালো না হলে ছুড়ে ফেলে দেবেন। এই দাবি আমার পাঠকদের প্রতি।