abdul-wazed-1

প্রবন্ধ

কবি ও সম্পাদক শিশির দত্ত

‘সম্পাদকের বড় দায়িত্ব হচ্ছে

অন্যকে দিয়ে লেখানো’

সৈয়দ আবদুল ওয়াজেদ

কবি ও সম্পাদক শিশির দত্ত প্রতিনিয়ত ব্যস্ত একজন মানুষ। সাহিত্য, প্রকাশনা ও নাট্যাঙ্গন থেকে বর্তমান সমাজ ভাবনার সময় পর্যন্ত একজন বহুমাত্রিক মানুষ। মাঝখানে বিশ শতকের মধ্য আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের প্রথম কয়েক বছর প্রায় দশ বছর দৈনিক সংবাদপত্রের ফিচার এডিটর ছিলেন তিনি। স্বভাবতই অন্যান্য ফিচার পাতা তার সার্বিক পর্যবেক্ষণে আর সাহিত্যের পাতা তার সরাসরি সম্পাদনাতে বের হয়ে লেখকদের মধ্যে সৃষ্টি করে তুমুল তোলপাড়। সে সময় চট্টগ্রামের দিকে ঢাকাসহ সারা দেশের লেখকদের দৃষ্টি ফেরাতে তিনি সফলভাবেই সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত সে-সময়কার অন্যতম আধুনিক চারিত্র্যের সংবাদপত্র দৈনিক পূর্বকোণ  প্রকাশের ক্ষেত্রে যে ক’জন শক্তিমান সারথি ছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। সংবাদপত্রটির উদ্যোক্তা মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী ছিলেন আধুনিকতার পক্ষে একজন বড় সহায়ক মানুষ। ফলে সমমনা সাংবাদিক কে জি মুস্তফাসহ দেশের প্রখ্যাত সাংবাদিকরা একদিকে যেমনি সংবাদপত্রটির হাল ধরলেন, অন্যদিকে শিশির দত্তসহ আরও অনেক খ্যাতিমান কবি ও লেখক যুক্ত হলেন তাতে।

সম্পাদক শিশির দত্তের হাত ধরে সে-সময়ে উঠে আসা অনেক তরুণ লেখক আজ দেশের লেখালেখির অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত। সেই সব লেখকদের অনেকেই আবার হয়ে উঠেছেন সমকালীন সময়ের সফল সম্পাদকও। সম্পাদক শিশির দত্তের হাতে যেসব তরুণ লেখকদের তাজা জীবনবোধ সংবলিত সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটেছিল, তারা সবাই জানেন তাদের প্রিয় সম্পাদক এখন জীবনের আরেক মাত্রায় নিয়তঃকর্মিষ্ঠ আরেকজন মানুষ। তিনি এখনও সাহিত্য-সংস্কৃতির ভেতরেই আছেন। তবে কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত।

শিশির দত্ত নিজেই বল্লেন, ‘আমার জীবনের কয়েকটি অধ্যায় রয়েছে’। বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, প্রতিটি অধ্যায়েই রয়েছে-অজস্র কাজ, অগণিত সৃজনমনস্ক ঘটনা আর বিপুল ইতিহাস। নিজের কবি সত্তাটিকে সযত্নে লালন করে সম্পাদনা ও সাহিত্য আন্দোলনের কোলাহলে দীর্ঘদেহী সুঠাম, ঝাঁকড়া চুলের অসাধারণ বিনয়ী মানুষটি সব সময় অবিচল থেকেছেন। কী করে পারলেন? এই প্রশ্ন করে সহজেই জবাব মিলবে না। কিন্তু শিশির দত্ত সব অসম্ভবকেই সম্ভব করেছিলেন। অনেক কাজে সহযোগী সহযোদ্ধাও ছিলেন। তাদের প্রায় সবারই লক্ষ্য ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রথাবিরোধী আধুনিক তারুণ্যের উত্থান এবং আত্মার স্বাধীনতা। তবে তারা কেউ নেতা ছিলেন না, সবাই ছিলেন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের যোদ্ধা সহযোদ্ধা। শিশির দত্তের ব্যক্তিগত আদর্শে, কবি স্বভাবে পরিকল্পনাহীন কোনো ভাবালুতা নেই। তার আদর্শ হচ্ছে শ্রম-সৃজন-স্বাধীনতা-পরিকল্পনা।

abdul-wazed-2সম্পাদক শিশির দত্তকে নিয়ে যে এত কথা, সে-প্রসঙ্গেই তার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে একটি অতি মূল্যবান বক্তব্য সব সময়ের সম্পাদকদের জন্য একটি অনুকরণীয় আদর্শের বিষয়কে তুলে ধরে। তিনি বলেন, ‘সম্পাদনা একটি বড় ধরনের সৃজনশীলতা। সম্পাদক নিজে লেখেন না, লিখনযোগ্য কোনো বিষয় কোনো একজন লেখককে দিয়ে লিখিয়ে নেন।’ তার এই কথায় সহজেই বোঝা যায়, যথার্থ একজন লেখক আর সত্যিকার একজন সম্পাদকের মধ্যে সম্পর্কটা হতে হয় বন্ধুত্বের। সেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্পাদকের অবস্থাটা অনেক সময় হয় বিড়ম্বনার। একদিকে বন্ধুত্ব রক্ষা, অন্যদিকে কাক্সিক্ষত লেখাটা লিখিয়ে নেয়া। আবার সুসম্পাদনার গুণে, প্রতিষ্ঠিত ভালো লেখকদের লেখাও সম্পাদকের হাতে শুভেচ্ছার মতো আসে। এতে সুসমৃদ্ধ হয় প্রকাশনা। একজন সত্যিকার ভালো সম্পাদক হিসেবে শিশির দত্ত কেন এতো বেশি প্রশংসিত তা তার সম্পাদিত প্রকাশনাগুলো হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে না দেখলে বুঝতে পারা যাবে না।

স্পার্ক জেনারেশন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ : সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে চট্টগ্রামে গড়ে উঠা স্পার্ক জেনারেশন একটি বহুল আলোচিত সাহিত্য আন্দোলনের নাম। এই আন্দোলন সেই সময় থেকে সারাদেশে তরুণ প্রজন্মের লেখকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পেরেছিল। অচলায়তনের বিরুদ্ধে, কূপম-ক প্রাতিষ্ঠানিকতার (এস্টাবলিশমেন্ট) বিরুদ্ধে স্পার্ক জেনারেশন আন্দোলনের ছয় তরুণ সদস্য সোচ্চার ঘোষণা দেন। বিশ শতকের সত্তরের দশকের শুরুতে এই আন্দোলন তাই হয়ে ওঠে এদেশের তরুণ লেখক ও সাহিত্যকর্মীদের জন্য একটি আইকন। শিশির দত্ত স্পার্ক জেনারেশনের অন্যতম একজন সদস্য।

১৯৭৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয় স্পার্ক জেনারেশন সম্পাদিত স্পার্ক জেনারেশন নামের প্রথম সাহিত্য সামিয়িকীটির প্রথম সংখ্যা। এতে কবিতা ও সাহিত্যবিষয়ক লেখা মুদ্রিত হওয়ার পাশাপাশি এই আন্দোলনের মেনিফেস্টো হিসাবে ৭টি ঘোষণাও ছাপা হয়। এটি প্রকাশিত হওয়ার পর শুধু চট্টগ্রামে নয়, আলোচনার ঝড় ওঠে সদ্যস্বাধীন পুরো বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে। এতে প্রকাশিত ৭টি ঘোষণার উল্লেখযোগ্য তিনটি ঘোষণা তুলে ধরা যাক :

*আমরা ঈশ্বরের ভাষায় কথা বলি।

  জ্ঞানপাপীরা নিপাত যাক।

*দুঃখ যন্ত্রণা অবক্ষয় ক্ষুধা থেকে

  সকলকে আমরা মুক্তি দেবো।

*আমরা আত্মার ক্রন্দনকে প্রতিফলিত

  করছি কোরবো । … …

স্পার্ক জেনারেশনে যারা যুক্ত হয়েছিলেন সে-সময় তাদের বয়স ছিল ২০ থেকে ২৫-এর কোঠায়। এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের সদস্যরা হলেন, ১. স্বপন দত্ত, ২. হেনা ইসলাম, ৩. সৈয়দ ইকবাল, ৪. কাজী রফিক, ৫. শিশির দত্ত,  ৬. শেখ খুরশিদ আনোয়ার। এসব তরুণরা তাদের সমকালীন বিভিন্ন মতাদর্শ থেকে এসে এই সাহিত্য আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। এদের কেউ ছিলেন বামপন্থী মতাদর্শ অনুসারী, কেউ ছিলেন ছাত্রলীগের অনুসারী বা কর্মী, কেউবা ছিলেন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা। স্পার্ক জেনারেশন গড়ার সময় আরও যেসব অনুভূতি ছয় তরুণকে প্রাণিত করেছিল সে প্রসঙ্গে শিশির দত্ত বলেন, ‘সদ্যস্বাধীন দেশে আপামর জনতার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি রাষ্ট্র অর্জন, বাঙালি নামের একটি জাতিগোষ্ঠীর স্বাধীন ভূমি ইত্যাদি সবকিছু আমাদের মধ্যে অফুরন্ত উদ্যম ও ভালো লাগার সৃষ্টি করে। যে অনুভূতি আগে কখনও পাইনি। পাকিস্তানি যে পুরাতন এস্টাবলিশমেন্ট ভূতের মতো দাঁড়িয়েছিল তখন আমাদের মনে তাকে ভেঙেচুরে নতুন করে গড়ে তোলার স্পৃহা প্রবলভাবে জেগে উঠেছিল। নেতা, রাষ্ট্র, ভাষা ও দেশকে একই সাথে মুক্ত দেখতে পেয়ে আমাদের মধ্যে সমুদ্রের জোয়ারের মতো উৎসাহ জাগে। আমরা সদ্যস্বাধীন দেশে সাহিত্য, নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদেরকে সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে মেলানোর তাগিদ অনুভব করেছি।’

abdul-wazed-3শিশির দত্তের কথায়, ‘বিভিন্ন মতাদর্শ থেকে এসে এরকম একটি সাহিত্য আন্দোলনে যুক্ত হওয়া সত্যিই বিরল ঘটনা। হেনা এসেছিলেন ছাত্রলীগ থেকে, কাজী রফিক ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। স্পার্ক জেনারেশন প্রকাশিত হওয়ার পর চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এর প্রকাশনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে কোনো সভাপতি ছিল না। বলা হলো আমরা সবাই সভাপতি। এই সংখ্যাটিতে নানা বিষয়ে গদ্য ও কবিতা ছিল। ছয়জন সদস্যের আলোকচিত্র দিয়ে প্রথম সংখ্যাটির প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করেছিলেন সৈয়দ ইকবাল। স্পার্ক জেনারেশন ছিল তারুণ্যের ব্যতিক্রমী, সাহসী ও ভিন্নমাত্রিক উচ্চারণ। পরে অনেকেই স্পার্ক জেনারেশন-এ লেখালেখি শুরু করেন। আরও আগে পাকিস্তানি আমলে ঢাকায় ‘সাক্ষর’ নামের একটি  আন্দোলনের কথা শোনা যায়। চট্টগ্রামে স্বাধীনতার আগেও বিভিন্ন সাহিত্য আন্দোলন হয়েছে। এখান থেকে ভালো কিছু পত্রিকা সাময়িকী বের হয়েছে। স্মরণ করতে হয় আধুনিক রুচির লেখক সুচরিত চৌধুরীর কথা। তিনি প্রাচী ও সীমান্ত-এর মতো সাময়িকীর সাথে যুক্ত ছিলেন। যা দেশের সাহিত্যের ইতিহাসে প্রাসঙ্গিক। স্বাধীনতার পর আধুনিক সাহিত্যের প্রতীক হিসাবে নিভৃতচারি সুচরিত চৌধুরী চট্টগ্রামে বসে অসাধারণ সব লেখা লিখে গেছেন। চট্টগ্রাম থেকে সত্তরের দশকের সন্ধিক্ষণে আরও যেসব সামিয়িকী পত্রপত্রিকার নাম মনে পড়ে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে মাহবুবুর রহমান সম্পাদিত কবিতা, মনন ইত্যাদি। আরও রয়েছে হেনা ইসলাম সম্পাদিত দৈনিক আন্দোলন, নিজাম উদ্দিন সম্পাদিত দেশবাংলা ও আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল হারুণ চৌধুরী সম্পাদিত দৈনিক স্বাধীনতা…।’

১৯৭১ সালে শিশির দত্ত ও প্রদীপ খাস্তগীরের সম্পাদনায় বের হয়েছিল লিটল ম্যাগাজিন পলাশ ঝরা ফালগুন। এটি বের করার ক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। এটি মুদ্রিত হয়েছিল ডিলাক্স প্রিন্টিং প্রেস থেকে। তবে স্পার্ক জেনারেশন  প্রকাশনাতেই শিশির দত্ত কাক্সিক্ষত কাজগুলো করতে পেরেছিলেন।

১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে শিশির দত্তের প্রথম একক সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল সাহিত্যবিষয়ক লিটল ম্যাগাজিন উদবর্তন। এটিও মুদ্রিত হয়েছিল রহমতগঞ্জ ডিলাক্স প্রিন্টিং প্রেস থেকে। এতে ছিল কবিদের কবিতা। সে-সময় এই প্রকশনাটি সম্পর্কে আকাশবাণীর বাংলা বিভাগ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিল। লিটল ম্যাগ উদবর্তনের যে বৈশিষ্ট্যটি সবার দৃষ্টি কেড়েছিল তা হলো, পুরো প্রকাশনাটির আকৃতিকে বাংলাদেশের পতাকার আদলে আনা হয়েছিল। আর পতাকার সবুজের ভেতর যে লাল বৃত্তভূমি তার ভিতর পৃষ্ঠা-পর্যায়ক্রমে সবগুলো কবিতা ছাপা হয়েছিল। আকাশবাণী’র প্রশংসায় গেটআপ মেকআপ-এর এই নান্দনিকতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল।

abdul-wazed-4শিশির দত্তের সম্পাদনায় বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম সাহিত্য সংবাদ ঘোষণাপত্র সম্পাদক প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালের ১৬ জুলাই। ১৯৭৩ সালের ১৫ মে তারিখে শিল্পী কামরুল হাসানের আঁকা ‘ধর্ষিতা নারী’র একটি ড্রইং দিয়ে এটির প্রচ্ছদ করা হয়। এতে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু গুণ, মেজবাহ খান, স্বপন দত্ত প্রমুখ কবিদের কবিতাংশ মুদ্রিত হয়েছিল। চট্টগ্রামের সুলেখা ছাপাঘর থেকে মুদ্রিত এই প্রকাশনাটিতে কবি স্বপন দত্তের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। ঐ সময় চট্টগ্রামে দুই বাংলায় সাড়া জাগানো একটি ছড়া আন্দোলন চলছিল। এতে সে সম্পর্কিত একটি সংবাদও ছিল। ঐ ছড়া আন্দোলনের সময় অজয় দাশ গুপ্ত, খালিদ আহসান, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, সঞ্জীব বড়ুয়া, মাসুদ উশ শহিদ, আইউব সৈয়দ, বখতেয়ার হোসেন, আবু মুসা চৌধুরী প্রমুখ লিখিয়েরা দুর্দান্ত সব ছড়া রচনা করেছেন বলে জানালেন শিশির দত্ত।

শিশির দত্ত জানালেন, পঁচাত্তরপরবর্তী সামরিক শাসনামলে ভয়ভীতি অনিশচয়তায় ভরা দুঃসময় এলে সাহিত্য সংবাদ প্রকাশনায় একটি নতুন কৌশল তিনি অবলম্বন করেন। প্রকাশনার ক্যাপশন তাই হয়ে ওঠে আমি তুমি প্রেম চুমু দুঃখ প্রিয়তমার চিঠি । সাহিত্য সংবাদ বুলেটিন সম্পাদক-এর দ্বিতীয় সংখ্যা বের হয় ১৯৭৮ সালের ১৫ এপ্রিল, ১ বৈশাখ ১৩৮৫ বাংলায়। এটি’র প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করেন খালিদ আহসান। চট্টগ্রামের লেখক সাহিত্যিকদের মধ্যে সুনীল নাথ, মামুনুর রশিদ, মোহাম্মদ ইদরিস, মোস্তফা ইকবাল প্রমুখ স্বাধীনতার পর লেখালেখির ক্ষেত্রে নীরব হয়ে পড়েছিলেন। সম্পাদক-এর পক্ষ থেকে এদরকে লেখালেখি করার আহ্বান জানানো হলো। ফলে তারা এগিয়ে আসেন, সদর্পে অবদান রাখেন। শিশির দত্ত জানান সাহিত্য কাগজ মনন-এ মুহাম্মদ ইদরিসের লেখা ইত্যাকার প্রসঙ্গ নামের কলামটি বেশ আলোচিত ছিল। শিশির দত্ত চট্টগ্রাম বেতারে চলমান চট্টগ্রাম নামে একটি লেখা লিখতেন, যা সম্প্রচারিত হতো। তিনি দৈনিক দেশবাংলা পত্রিকায় নিষিদ্ধ দশক নিষিদ্ধ ভাবনা নামে একটি কলামও লিখতেন।

দৈনিক কবিতা : সত্তরের দশকে সেই প্রথম একটি অবিস্মরণীয় কাজ হয়েছিল একটি অসাধারণ ও ব্যতিক্রমী প্রকাশনার মাধ্যমে। দৈনিক কবিতা নামের একটি পত্রিকা বের হয়েছিল শিশির দত্তের সম্পাদনায়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে এরকম ঘটনা আজ অবধি আর  মেলেনি। শিশির দত্ত জানালেন :

‘চট্টগ্রামের সাহিত্যিক-শিল্পী ও এ’ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত তারুণ্যের আড্ডা ছিল প্রথমে কোতোয়ালি মোড়ের বিখ্যাত সাধুর দোকানে। বিশ শতকের সত্তরের দশকের সেই স্বপ্নভরা সময় সেটা। পঁচাত্তরের পরে আড্ডাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারপর আমাদের আড্ডা জমে ওঠে সদরঘাট কালিবাড়ির পেছনে চেম্বার প্রেসে। সেখান থেকেই এক সময় দৈনিক কবিতা পত্রিকাটি প্রকাশ করার উদ্যোগ নিই। সেটাও ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। আমার সম্পাদনায় এটি বেরিয়েছিল একটানা একুশদিন ধরে চেম্বার প্রেস থেকেই। এটিতো দৈনিক সংবাদপত্র ছিল না, এটি ছিল দৈনিক কবিতা পত্রিকা, তাই  এতে থাকতো সাহিত্যের খবর।  স্বভাবতই এর পাঠক ছিলেন কবি, সাহিত্যিক. শিক্ষাবিদ. শিল্পী ও সুধী সমাজ। রাতভর কাজ করে দুই পাতার দৈনিক কবিতা সেই কাকডাকা ভোরে আমি নিজে গিয়েই তুলে দিয়ে আসতাম কেসিদে রোড, চেরাগি পাহাড় হকার সমিতিসহ আরও অন্যান্য সংবাদপত্র  এজেন্টদের হকারদের হাতে। পত্রিকাটি পৌঁছে যেতো সকালেই সুচরিত চৌধুরী, কামাল এ খান, কবি ও নাট্যজন জিয়া হায়দারসহ এই শহরে সে-সময় বসবাসকারী আরও অনেক শিল্পী- সাহিত্যিক-শিক্ষক ও সুধীজনদের ঘরে। ক্ষণজীবী  এই দৈনিক কবিতা’র কথা বেশ মনে পড়ে।’

স্পার্ক জেনারেশন থেকে চট্টগ্রামে যে সাহিত্য আন্দোলনের সূচনা তার সুদূরপ্রসারি প্রভাব অনতিবিলম্বে ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে। এটিকে চট্টগ্রামের স্ফুলিঙ্গ প্রজন্মের সফল উদ্ভাস বল্লেও ভুল হবে না। সে-সময় বরিশালের সাহিত্যকর্মী ও লেখকগণ তৈরি করেন সুনীল করতল নামের একটি সাহিত্য সংগঠন। কুমিল্লার সাহিত্যকর্মী ও লেখকগণ তৈরি করেন সে আমি তুমি এবং আমরা জ্যোৎস্নার প্রতিবেশি নামের দু’টি সাহিত্য সংগঠন। এসব সাহিত্য সংগঠন সাহিত্য সম্মেলন, কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানসহ সাহিত্যবিষয়ক নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সর্বত্র বিপুল উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। সেই সাথে কুমিল্লা, বরিশাল, রাজশাহীসহ দেশের নানা প্রান্তে যেসব সাহিত্য-সংস্কৃতিবিষয়ক প্রকাশনা ও লিটল ম্যাগাজিন বের হয়েছে সেগুলোতে কমবেশি স্পার্ক জেনারেশনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ঐ সময়টা ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দিলেন। তিনি এখানে এসে শিশির দত্তের সাথে দেখা হতেই বল্লেন, ‘আপনাদের প্রকাশনা এবং আপনাদের সাহিত্য আন্দোলন দেখে চট্টগ্রাম চলে আসলাম।’ শিশির দত্তের রচিত বহুল আলোচিত ও বহুল পঠিত সে-সময়কার বিখ্যাত কবিতা ক্যাপ্টেন ক্যাপ্টেন আমাকে তুলে নিয়ে যাও কবিতাটির উপর ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল একটি চমৎকার লেখা লিখলেন। সেটি ছাপা হয়েছিলো দৈনিক ইত্তেফাক-এর সাহিত্যের পাতায়। ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালের দিকে চট্টগ্রামে সামরিক শাসনবিরোধী একটি প্রতিবাদী কবিতা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল চট্টগ্রাম মুসলিম হল ইনস্টিটিউটে। সেই কবিতা সম্মেলন আয়োজনের পুরোভাগে ছিলেন কবি ও সম্পাদক শিশির দত্ত। বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি সংগঠন চট্টগ্রামেই সৃষ্টি হয়েছিল আশির দশকে। এ-প্রসঙ্গে শিশির দত্ত বল্লেন, ‘আশির দশকে চট্টগ্রামে আবৃত্তি সংসদ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুললাম, এটি তৈরি করার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছিলেন বিশিষ্ট অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। আর আমাদের সাথে ছিলেন অধ্যাপক জিয়া হায়দার।’

এত কিছুতে জড়িয়ে যাওয়া ও তারুণ্যের তুমুল ব্যস্ততার ভেতরেও  শিশির দত্তের সৃষ্টিশীল কবি সত্তা থেমে থাকে নি। ১৯৮৪ সালে সম্পাদক প্রকাশনী থেকে বের হয় তার কবিতার বই ভালোবেসে হয়ে উঠি একা এবং ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একই প্রকাশনী থেকে বের হয় তার কাব্যগ্রন্থ আমার মাতৃভূমি আমার মতো একা নয় । দু’টি কাব্যগ্রন্থই মুদ্রিত হয়েছিলো সিগনেট প্রেস, চট্টগ্রাম থেকে। ভালবেসে হয়ে উঠি একা কাব্যগ্রন্থটির প্রচ্ছদ হয়েছিল বিশিষ্ট শিল্পী ও ভাস্কর অলক রায়ের স্কেচ দিয়ে। চট্টগ্রামের সম্পাদক প্রকাশনী আরও বের করেছিল কবি স্বপন দত্তের কাব্যগ্রন্থ স্বপ্নের বসতবাটি অন্তর্লীন চাষাবাদ, কবি আবুল মোমেনের গ্রন্থ চার ভুবনের চারণ, কবি নির্মলেন্দু গুণের গ্রন্থ তার আগে চাই সমাজতন্ত্র এবং কবি আসাদ চৌধুরীর গ্রন্থ প্রশ্ন নেই উত্তরে পাহাড় ।

স্বনির্বাচিত : আশির দশকের শুরুতেই শিশির দত্ত সম্পাদিত একটি সাড়া জাগানো প্রকাশনার নাম স্বনির্বাচিত । এটি ছিলো একটি ব্যতিক্রমধর্মী কবিতার সংকলনগ্রন্থ। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রজন্মের ৪৮জন খ্যাতিমান কবির জীবন বৃত্তান্তসহ তাদের প্রত্যেকের স্বনির্বাচিত একাধিক কবিতা এতে মুদ্রিত হয় সম্পাদক শিশির দত্তের অসাধারণ সম্পাদনায়। ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে শুধু বাংলাদেশেই নয় পশ্চিম বাংলার সাহিত্যাঙ্গনেও হৈচৈ পড়ে যায়। বিভিন্ন বুকস্টল থেকে গ্রন্থটি দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। মুদ্রণ পরিপাট্য, নান্দনিক প্রচ্ছদ, কবিদের রেখাঙ্কিত প্রতিকৃতি, বিষয়, আধুনিক সম্পাদনা সবকিছু মিলিয়ে গ্রন্থটি লেখক-পাঠক মহলের অনিবার্য সংগ্রহের গ্রন্থে পরিণত হয়। গ্রন্থটিতে রেখাচিত্র এঁকেছিলেন মুর্তজা বশীর, অলংকরণ করেছিলেন আহমেদ নেওয়াজ, প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন খালিদ আহসান। গ্রন্থটির মুদ্রক ছিলেন ছাখাওয়াত উল্লাহ ইউনুছ। সম্পাদক প্রকাশনী থেকে বের হওয়া গ্রন্থটির প্রকাশক ছিলেন শহীদুল হক। মূল্য ছিল পঁচিশ টাকা। ১৯৮২ সালে এটি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসাবে পুরষ্কৃত হয়।

নাট্যাঙ্গনে শিশির দত্ত : সম্পাদক, কবি, সাহিত্য সংগঠক শিশির দত্তের জীবনের আরেকটি বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় চট্টগ্রামের নাট্যাঙ্গনেও বিস্তৃত রয়েছে। এ-পসঙ্গে এ-কথাটি বলে নেয়া প্রয়োজন যে, চট্টগ্রামে নাট্যচর্চার ইতিহাস সুপ্রাচীন। তারই ধারাবাহিকতায় বিশ শতকের ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে ‘থিয়েটার ৭৩’ নামের নাট্য সংগঠন বা নাট্যআন্দোলন আত্মপ্রকাশ করে। এটিই চট্টগ্রামে প্রথম গ্রুপ থিয়েটার। থিয়েটার ৭৩ প্রযোজিত জিয়া হায়দার নির্দেশিত জহির রায়হানের গল্প অবলম্বনে রচিত সদরুল পাশার নাটক ম্যাসাকার এবং মমতাজ উদদীন রচিত ও নির্দেশিত নাটক স্পার্টাকাস বিষয়ক জটিলতা নাটক দু’টির মাধ্যমে স্বাধীনতাউত্তর বিশশতকের সত্তরের দশকের প্রথম লগ্নে নাট্যচর্চা ও নাটক মঞ্চায়নের অভিযাত্রার সূচনা হয়। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় নাট্যোৎসবে থিয়েটার ৭৩ প্রযোজিত জিয়া হায়দার রচিত ও জিয়াউল হাসান নির্দেশিত নাটক এলেবেলে  কৃতিত্বপূর্ণ মঞ্চায়নের জন্য পুরস্কৃত হয়…। (তথ্যসূত্র : হাজার বছরের চট্টগ্রাম, দৈনিক আজাদী, ৩৫ বর্ষপূর্তি বিশেষ সংখ্যা, চট্টগ্রাম, নভেম্বর ১৯৯৫। কার্তিক ১৪০২, প্রকাশক : এম এ মালেক, সম্পাদক : মোহাম্মদ খালেদ, সহযোগী সম্পাদক : অরুণ দাশগুপ্ত, নির্বাহী সম্পাদক : মাহবুবুল হক) চট্টগ্রামের সাড়া জাগানো গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের অন্যতম সংগঠন অরিন্দম নাট্যসম্প্রদায়। শিশির দত্ত এই সংগঠনেরও প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম একজন। গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনে ‘ভাঙনের জয়গান’ একটি আলোচিত বিষয়। থিয়েটার ৭৩’ থেকে একদল নাট্যকর্মী বেরিয়ে এসে ১৯৭৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর গঠন করেন অরিন্দম নাট্যসম্প্রদায়। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত প্রথম জাতীয় নাট্যোৎসবে অরিন্দম নাটক মঞ্চায়ন করে। ১৯৭৭ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে অরিন্দম আয়োজিত সপ্তাহকালব্যাপী জাতীয় নাট্যোৎসব ছিল বাংলাদেশে প্রথম গ্রুপ থিটোর উৎসব। চট্টগ্রাম থেকে দেশের বাইরে প্রথম নাটক মঞ্চায়নের গৌরবও অরিন্দম-এর। ১৯৮৬ সালের এপ্রিলে কলকাতায় অরিন্দম লালসালু নাটকের দু’টো প্রদর্শনী করে। ১৯৮০ সালের মার্চে বাংলাদেশ টেলিভিশন অরিন্দম শিশির দত্ত নির্দেশিত সেলিম আলদীনের নাটক আতর আলীদের নীলাভ পাট নাটকটি সম্প্রচার করে। অরিন্দম নাট্যসম্প্রদায়ের শিশির দত্ত ১৯৯২ সালে ঢাকার লোক নাট্যদলের নাট্যকর্মী পদকে ভূষিত হন। অরিন্দমের প্রশংসিত নাটকগুলোর মধ্যে ছিলা আন্তন চেখভের যামিনীর শেষ সংলাপ, অমিত চন্দ রূপান্তরিত ব্রেখটের রাইফেল, তলস্তয়ের পাপপুণ্য, এবং শিশির দত্ত ও মুনির হেলাল নাট্যরূপকৃত সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ’র লালসালু । এসব নাটকগুলোর নির্দেশক ছিলেন যথাক্রমে, সদরুল পাশা, শিশির দত্ত, অমিত চন্দ ও কামাল উদ্দিন নীলু।  (তথ্যসূত্র : হাজার বছরের চট্টগ্রাম, দৈনিক আজাদী, ১৯৯৫, চট্টগ্রাম)।

শিশির দত্তের দৈনিক পূর্বকোণ অধ্যায় :  সারা দেশের সংবাদপত্র শিল্পে একটা প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় দৈনিক সংবাদপত্র দৈনিক পূর্বকোণ। শুধু প্রাত্যহিক খবর, সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয় নিয়ে নয়, সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিবিষয়ক রুচিসম্মত নান্দনিক সাপ্তাহিক ফিচার পাতা নিয়ে একটি দৈনিক সংবাদপত্র যে হয়ে উঠতে পারে আধুনিক ও বহুমাত্রিক, দৈনিক পূর্বকোণ-এর বেলায় একথাটি সবাই স্বীকার করেন। ইউসুফ চৌধুরী এর স্বপ্নদ্রষ্টা হলেও এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে শিশির দত্ত ছিলেন একজন অন্যতম সফল নেপথ্য কুশীলব।

দৈনিক পূর্বকোণ-এ শুরু থেকেই ফিচার এডিটরের দায়িত্ব পালন করেন শিশির দত্ত। সে-সময় দেশে সপ্তাহে এতগুলো ফিচার পাতা নিয়ে আর কোনো দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হতো না। একেকটি পাতার দায়িত্বও দেয়া হয়েছিলা একেকজনকে। সার্বিক দায়িত্বটা তিনিই পালন করতেন। পাতাগুলোর মধ্যে ছিলো রমণীয়, কলরোল, কলরোল পাতাটি বিভিন্ন সময় বিশ্বজিৎ চৌধুরী, ওমর কায়সার এবং ফারুক ইকবাল  দেখেছেন। ইতিহাস-ঐতিহ্য পাতাটি দেখতেন শামসুল হোসাইন, বইপত্র পাতাটি দেখতেন ভুঁইয়া ইকবাল, শিল্পকলা পাতাটি দেখতেন আনোয়ার হোসেন পিন্টু। সাহিত্য সাময়িকী পাতাটি ছিলো শিশির দত্তের পূর্ণাঙ্গ দেখাশোনায়।

শিশির দত্ত দৃষ্টি রেখেছিলেন বাংলা প্রকাশনার সম্পদনায় বিগত প্রায় দু’শ বছরে ‘সম্পাদক’ শব্দটি যে প্রাতিষ্ঠানিক মহিমা অর্জন করেছিল তার দিকে। কারণ সৃজনশীল লেখা সম্পাদনায় বিশেষত অবিভক্ত বাংলায় একটি ঐতিহ্যের সৃষ্টি হয়েছিল। শক্তিমান সম্পাদকদের হাত দিয়েই বাংলায় অনেক কালজয়ী লেখক সৃষ্টি হয়েছেন। মূলত ব্যবসামনস্ক প্রকাশকদের দায় একজন সৃষ্টিশীল সম্পাদকের মতো প্রবল নয়। শিশির দত্তের হাত ধরে লেখালেখি ও প্রকাশনার জগতে আসা প্রতিষ্ঠিতদের সবাই তাদের জীবনে সম্পাদক শিশির দত্তের অবদানকে অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করেন আজ।

শিশির দত্ত বলেন :

‘১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্বকোণ বের হওয়ার ছ’মাস আগে থেকেই আমি, কবি-সাংবাদিক আবুল মোমেন, সাংবাদিক মোহাম্মদ বেলাল পত্রিকাটির প্রকাশনার খুঁটিনাটি ও সামগ্রিক রূপরেখা নিয়ে কাজ শুরু করি। এতে ইউসুফ চৌধুরীর আধুনিক মনোভাব ব্যাপকভাবে সহায়ক হয়েছিল। পত্রিকা প্রকাশ হওয়ার পর লেখকদের জন্য সম্মানীর ব্যবস্থাও করলাম। এতে লেখকদের মধ্যে অভূতপূর্ব উদ্দীপনার সৃষ্টি হলো। পত্রিকার সংবাদ ও লেখার হেডিংগুলো ফটোটাইপসেটারে কম্পোজ করে ছাপানো শুরু হলে মুদ্রিত লেখার গুণগতমানের দিকটা অভাবনীয়ভাবে বেড়ে যেতে দেখলাম। পাঠকরা চমকিত হলেন। মুদ্রণ সৌকর্যের ক্ষেত্রে মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরীর বিশেষ আগ্রহের দিক-টা ছিল তাতে সহায়ক- শক্তির মতো। এখানে একথা না বল্লেই নয়, এই সংবাদপত্রটির জন্য যখন নাম চাওয়া হলো বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সাহিত্যিক ড. আনিসুজ্জামানের কাছে, তিনি কবি সুকান্তের কবিতার একটি পঙ্ক্তির ভেতরের ‘অবাক পূর্বকোণ’ কথাটি থেকে ‘পূর্বকোণ’ শব্দটি বাছাই করে আমাদের দিলেন। পত্রিকাটি বের হওয়ার পর আনিসুজ্জমান স্যার, কবি শামসুর রাহমানসহ দেশের প্রখ্যাত ও প্রধান লেখকরা এখানে লিখতে শুরু করলেন। বিচিত্রা, দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতার মতো পূর্বকোণ-এর সাহিত্য পাতাকে কেন্দ্র করে একটি বড় সাহিত্য আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। সাহিত্য সৃষ্টি ও প্রকাশনায় যুগপৎভাবে ভিন্ন রুচি ও আধুনিকতার সূচনা হয়। ষাট ও সত্তর দশকীয় পুরানো প্রকাশভঙ্গিটা দূর হয়ে যায়। আজকে যারা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত লেখক তাদের অনেকেরই প্রথম লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল পূর্বকোণ-এর সাহিত্য পাতায়। ইউসুফ চৌধুরী আমাদেরকে অফুরন্ত স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। পত্রিকাটিতে সম্পাদক হিসেবে যোগ দিলেন দেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক কে জি মুস্তফা। একথা স্মরণ করতে খুবই ভালো লাগে যে, সে-সময় প্রতিদিন সকালে পূর্বকোণ কাগজটি দেখার জন্য ঢাকা প্রেসক্লাবে দেশের অনেক বরেণ্য কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক অধীর অপেক্ষায় বসে থাকতেন।’

শিশির দত্তের সম্পাদনার সময়ে পূর্বকোণ-এর সাহিত্য পাতায় প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পাশাপাশি অনেক তরুণ লেখকের লেখাও ছাপা হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত ও তরুণ লেখকদের লেখা ছাপানোর ক্ষেত্রে সমন্বয়টা জরুরি বলেই মনে করেন সাহিত্য সম্পাদক শিশির দত্ত। আমরা যেমনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দিন, বুদ্ধদেব বসুসহ আরও অনেক কালজয়ী সম্পাদককে, যারা লেখক সৃষ্টি করেছেন, বাংলা সাহিত্যকে উন্নত লেখায় সমৃদ্ধ করেছেন। তারা অনেকেই হয়ত নিজে লেখেননি, বরং একটি কালজয়ী লেখা লিখিয়ে নিয়েছেন এদেশের কবি-সাহিত্যিকদের হাত দিয়ে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং আরও অনেকে নিজেরা বিভিন্ন সময় সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করলেও তারাও তাদের অনেক সময়-উত্তীর্ণ লেখা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের কাছে পাঠিয়ে প্রকাশিত হওয়ার অপেক্ষা করেছেন। প্রকাশিতও হয়েছে। ঐ সময়ের মতো এ- সময়েও কোনো লেখকের শিল্প-অনুত্তীর্ণ লেখা না ছাপানোর কারণে সম্পাদক লেখকের বিরাগভাজন হয়েছেন এ অভিজ্ঞতা সম্পাদক মাত্রেরই আছে।

সম্পাদক শিশির দত্ত মনে করেন, পাঠক কী চায় এ-বিষয়টাও একজন সম্পাদককে উপলব্ধি করতে হবে। তিনি পূর্বকোণ-এ তার সম্পাদনার অভিজ্ঞতার আলোকে জানান, ঐ সময়টাতে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বিশেষ প্রাধান্য দেয়া হয়েছে নানাভাবে। পূর্বকোণ-এর পাতায় গ্রামের অনেক লেখককে প্রাধান্য দেয়া হতো। সেই সাথে খেয়াল রাখা হতো শৈল্পিক উপস্থাপনা এবং লেখাজোখায় সমসাময়িককালের ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে কিনা। এভাবে অনেক বিষয়ে ফিচার ছাপা হয়েছে, যেগুলো সমসাময়িকতার কারণে সব মহলে ব্যাপকভাবে পঠিত ও আলোচিত হয়েছে। তাই তার কথা, ‘সম্পাদকের বড় দায়িত্ব হচ্ছে নিজে না লিখে অন্যকে দিয়ে লেখানো।’ এদেশে গ্রামীণ জনপদে আজও একটি বিরাট পাঠকগোষ্ঠী রয়েছে। বর্তমান সাহিত্যের বড় সংকট হচ্ছে ঐ বিশাল পাঠকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছতে না পারা। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের গ্রাম কুসংস্কারচ্ছন্ন থাকলেও কখনও দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল না। বর্তমানে গ্রাম আরও কুসংস্কারচ্ছন্ন হয়েছে, আর গ্রাম থেকে যারা শহরে এসেছে তারা আরও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছে। শিশির দত্ত আন্তরিকভাবে মনে করেন, গ্রামকে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির সাথে যুক্ত করা না গেলে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হবে না। তিনি বলেন :

‘গ্রামে বাউল আছে, স্বভাব কবি আছে, আরও অনেক কিছু আছে যা হয়ত আমরা জানি না। বাংলাদেশে আজ গ্রাম ও শহরের মেলবন্ধন তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি নতুন মাত্রা পাবে। সেই সাথে আমাদের সংস্কৃতিকে শিক্ষার সাথে যুক্ত করা না গেলে মূল্যবোধের পরিবর্তন হবে না, পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা মানুষের মনে জাগবে না। এটা একটা দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার যে, দেশে গল্প-উপন্যাসকেন্দ্রিক একটা পাঠকগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা সিরিয়াস বা গভীর বিষয়ের বই পড়ছে না। উদ্ভাবনীমূলক লেখা কেউ লিখছে না। স্কুল-কলেজে আজকাল সাংস্কৃতিক সপ্তাহও হয় না।’

কবি সম্পাদক শিশির দত্ত বর্তমানে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব থিয়েটার আর্টস (বিটা)-এর নির্বাহী পরিচালক হিসাবে আরও বড় পরিসরে তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

abdul-wazed-5

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares