সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দেন, তার যোগ্য আমি নই – আনিসুল হক

September 19th, 2016 9:58 pm
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দেন, তার যোগ্য আমি নই – আনিসুল হক

প্রচ্ছদ রচনা

আলাপন

 

[বাংলা একাডেমি পুরস্কারে (২০১১) সম্মানিত হয়েছেন কথাশিল্পী আনিসুল হক। এতদিন কোথায় ছিলেন বইয়ের জন্য পেয়েছেন সিটি-আনন্দ আলো পুরস্কার (২০১০)। চলচ্চিত্রে রচয়িতা হিসেবে এশিয়া প্যাসিফিক স্ক্রিন অ্যাওয়োর্ডে মনোনীত হয়েছিলেন। তাঁর বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্বের বাংলাভাষী সংবেদনশীল পাঠকদের মধ্যে অত্যন্ত সাড়া জাগিয়েছেন তিনি। মা উপন্যাসটি সুইডিশ, উড়িয়া, ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে।]

 

প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দেন, তার যোগ্য আমি নই

– আনিসুল হক

 

শব্দঘর : একুশ শতকে পৌঁছে বিশ শতকের বাঙালাসাহিত্যের তুলনায় আমরা কতদূর এগুতে পেরেছি বলে আপনি মনে করেন?

আনিসুল হক : খুব একটা এগুতে পেরেছি বলে মনে হয় না। বিশ শতক বাংলা গদ্যকে একটা রূপ দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ একবার দুঃখ করে বলেছিলেন, তোমরা মোপাসাঁ প্রমুখের কথা বলো, তোমরা ভুলে যাও যে তাঁরা তৈরি ভাষা পেয়েছিলেন, আর আমাকে ভাষা তৈরি করতে করতে গল্প লিখতে হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গল্প, কবিতা, উপন্যাসগুলোর সবই তো বিশ শতকের। সে আপনি মানিক, তারাশঙ্করই বলেন, আর সতীনাথ ভাদুড়ী কিংবা হাসান আজিজুল হক বলেন, জীবনানন্দ দাশ বলেন আর শামসুর রাহমান বলেন। আমাদের এই মুহূর্তের সমস্যা হলো, তরুণ প্রতিভাবানেরা এখন সাহিত্যচর্চায় আসতে চান না। এখন বিজ্ঞানচর্চা, বাণিজ্য পড়া, ছবি বানানো অনেক বেশি আকর্ষণীয় কাজ হয়ে উঠেছে।

তার প্রভাব আমরা সাহিত্যে দেখতে পাই। আপনি শামসুর রাহমানের কবিতায়, আল মাহমুদের কবিতায় ছন্দের ভুল পাবেন না, লেখায় ভুল বাক্য পাবেন না। কিন্তু এখনকার অনেক কবি ছন্দ জানেন না। নির্ভুল বাক্যরচনা করতে পারেন না। আমি সবার কথা বলছি না। প্রতিভাবান লেখক আমাদের সময়েও আছে। তবে এখনও আমরা গ্রেট কাউকে এই শতকে দেখছি না। হয়তো আর কিছুদিন পরে আমরা শনাক্ত করতে পারব।

শব্দঘর : বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে বাঙলাসাহিত্য কতখানি গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন? এ প্রসঙ্গে আপনার পরামর্শ :

আনিসুল হক : একদমই কোনো রকমের গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বাঙালি লেখক বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যারা পৃথিবীতে গণ্য হয়েছেন, তাদের প্রায় সবাই ইংরেজি ভাষার লেখক। তা তিনি মনিকা আলীই হোন বা জিয়া হায়দার রহমান হোন বা তাহমিমা আনাম হোন। বাংলা ভাষায় লিখে আজকাল কেউ বিশ্ব সাহিত্যে পাত পাচ্ছেন না। পাবার কোনও কারণও দেখি না। যা একটু দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন তা তসলিমা নাসরিন। তার কারণ সাহিত্যিক নয়। মহাশ্বেতা দেবীও কিছুটা প্রাসঙ্গিক হয়েছেন, কিছুটা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকদের নিম্নবর্গ সাহিত্য নিয়ে আগ্রহের কারণে। কিন্তু মূলধারার যারা, যেমন ধরুন সুনীল কিংবা দেবেশ রায়, শামসুর রাহমান বা হাসান আজিজুল হক, এদের কারুরই কোনো আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নাই। তার হয়তো দরকারও নাই।

শব্দঘর : তরুণ কথাশিল্পীদের নিয়ে আপনি কতটুকু আশাবাদী- উত্তরণের পথে করণীয় কী?

আনিসুল হক : খুবই আশাবাদী। তরুণেরা আমার পরামর্শের জন্য বসে নাই। তারা কাজ করছেন, এবং ভালো করছেন।

শব্দঘর : আমাদের প্রবীণ কথাসাহিত্যিকদের প্রতি আপনার মূল্যায়ন কী? সাহিত্যের উত্তরণের বিষয়ে আত্মসমালোচনা কিভাবে করবেন?

আনিসুল হক : আমি দেখি, বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথ মানিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ হাসান আজিজুল হক মাহমুদুল হকের বাংলা সাহিত্যে আমরা যারা এখন লিখছি, তারা আগের তৈরি গড় মানের অনেক নিচে। ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু মোটের ওপর প্রবীণেরাই ভালো লিখছেন। আপনি সৈয়দ শামসুল হকের কাছে এখনও ভালো কিছু পাবেন। আমরা তো তেমন কিছু লিখলাম না। হয়তো ভবিষ্যতে বোঝা যাবে যে আমাদেরও কেউ কেউ ভালো লেখেন। মূল্যায়িত হতে সময় লাগবে।

শব্দঘর : আপনার প্রিয় উপন্যাস ও ছোটগল্প বিষয়ে বলুন :

আনিসুল হক : উপন্যাস: মাহমুদুল হকের কালো বরফ, সতীনাথ ভাদুড়ীর জাগরী, আবু ইসহাকের সূর্য দীঘল বাড়ি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথা, অরুন্ধতী রায়ের এ গড অব স্মল থিংস, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের লাভ ইন দি টাইম অব কলেরা। আরও আছে। ছোটগল্প রবীন্দ্রনাথের অনেকগুলো গল্প, মানিকের গল্প। হাসান আজিজুল হকের অনেক গল্প। সমকালীনদের মধ্যে শাহাদুজ্জামান, মশিউল আলম, বদরুন নাহার প্রমুখের গল্প ভালো লাগে।

শব্দঘর : আপনার পাঠকদের প্রতি কিছু বলুন :

আনিসুল হক : প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দেন, তার যোগ্য আমি নই। কিন্তু আমার শতজনমের ভাগ্য যে আমি বাংলা ভাষার লেখক হয়ে জন্মেছি। আর কোনো ভাষার লেখক তার ভাষাভাষী মানুষের কাছে এত ভালোবাসা পায় কিনা জানি না। দুটো উদাহরণ দিই। মে মাস, ২০১৬। আমি ম্যানহাটানের লিটল ইটালির পথ দিয়ে হাঁটছি। উদ্দেশ্য পিইএনের দপ্তরে যাব। আমি যেতে পারছি না। বাঙালি দোকানি এবং দোকান মালিকেরা আমাকে ধরে মাথায় উপহার হিসেবে ক্যাপ পরিয়ে দিচ্ছেন, হাতে প্যাকেট ধরিয়ে দিচ্ছেন, কফির দোকানে কফির দাম নিতে চাইছেন না। এরা হয়তো আমার লেখা কেউ পড়েছেন, কেউ পড়েন নি। কিন্তু শুনেছেন আমি লেখক, তারা আমাকে ভালোবাসা দেখাচ্ছেন। মানে এই ভালোবাসাটা তারা বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্যকেই দেখাচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অপেরা হাউজের সামনে একই অবস্থা। আমি এসেছি জানার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালিরা আমাকে ঘিরে ধরলেন। একজন আপা, তিনি মিরপুরের, তার ব্যাগ থেকে আমার বই বের করে দেখিয়ে বললেন, আমি আপনার বইই পড়ছিলাম। আমি কী বলব? এত ভালোবাসা আর কোন ভাষার লেখক পান?

Print