srodhanjoly-1

শ্রদ্ধাঞ্জলি

নূরজাহান বেগম

নারী সাংবাদিকতার ইতিহাসে বনস্পতি

মালেকা বেগম

২৩ মে সোমবার সকালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিরবিদায় নিলেন ভারত উপমহাদেশের প্রথম নারী সাপ্তাহিক পত্রিকা বেগম-এর সম্পাদক, আমাদের প্রিয় আপা নূরজাহান বেগম (১৯২৫-২০১৬)। তিনি তো শুধু আপা নন, তিনি মাতৃসম হয়ে বিরাজ করছিলেন আমাদের সমাজে, সংস্কৃতিতে, সাংবাদিকতার জগতে, নারী আন্দোলনের দীর্ঘ যাত্রাপথে। তাঁর বিদায় শারীরিক-ইহজাগতিক হতে পারে; কিন্তু সমাজ-সংস্কৃতির ইতিবাচক প্রবহমান জগতে তিনি আছেন, থাকবেন বনস্পতি হয়ে। তাঁর সম্পাদিত বেগম বিষয়ে যথার্থই বলেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান :

‘বেগম দেখা যাচ্ছে, খণ্ড ইতিহাসের প্রকাণ্ড আকর। পঞ্চাশ বছর বা তার কিছু বেশি কাল ধরে বাংলাদেশের নারী-সমাজে যে-ধীর অগ্রগতি হয়েছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ ধারণ করে রেখেছে এই পত্রিকা।’১

আমরা জানি এই স্বীকৃতি যথার্থই নূরজাহান বেগমের প্রাপ্য। ৬৮ বছর ধরে বেগম প্রকাশনায় তিনি দেদিপ্যমান। তাঁর অবদান বেগম-এর লেখিকাদের স্মৃতিচারণা, লেখায় কালি ও কলমেও সুপরিস্ফুট। বেগম কেবল পত্রিকাই নয়, সমাজ বিনির্মাণের প্রতিষ্ঠানরূপেও স্বীকৃত।

তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল প্রায় এক বছর আগে ৪ জুন ২০১৫। সেদিন তাঁর ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাড়িতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম নিজের এবং সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে (উপাচার্য ও শিক্ষার্থীসহ) তাঁকে সালাম ও অভিনন্দন জানাতে। তিনি মধ্যমণি হয়ে উপস্থিত সবাইকে কাছে ডেকে মাথায় বুলিয়ে দিয়েছেন তাঁর স্নেহ-আশীর্বাদ। এরপর ফোনে বহুবার কথা হয়েছে। মাত্র কয়েক দিন আগে, চলতি মাসের ৬ তারিখে তিনি টেলিফোনে অনুরোধ করেছিলেন বেগম-এর ঈদসংখ্যায় লেখা দেওয়ার জন্য। কথা দিয়েছি লেখা পাঠাব। ভেবেছিলাম, তাঁর হাতে নিজেই পৌঁছে দেব। সেই ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গেল।

১৯৬৪ সালে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ের শুরু থেকে আজ অবধি তাঁর সঙ্গে যেসব কথা হয়েছে, যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলো চিরসবুজ, চিরনবীন হয়ে আমার হৃদয়ে বিরাজ করছে। সেসব আমাকে চলার পথে এগিয়ে দিয়েছে, নতুন নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে ভরিয়ে দিয়েছে।

আমি জানি, আমাদের দেশের নারী-পুরুষ বহুজনের মনে গুঞ্জরিত হচ্ছে একই ধরনের কথা, ভাবনা। প্রগতিবাদী মানুষের পথচলায় তিনি অন্য অনেক ধ্রুবতারার মধ্যে অন্যতম দিশারি। এই দিশারির শারীরিক অবক্ষয় হলেও তার কোনো প্রভাব প্রবহমান সমাজ প্রগতির ধারায় অবক্ষয় ঘটাবে না; বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তাঁকে স্মরণ রাখবে, ইতিহাসের অগ্রগতিতে ইতিবাচক প্রবহমানতার সৃষ্টি হবে।

বেগম (১৯৪৭)-এর প্রথম সম্পাদক সুফিয়া কামাল (১৯১১-১৯৯৯)। সে-সময় যুগ্ম সম্পাদক ও পরবর্তী সময়ে সম্পাদক (১৯৫০) হলেন নূরজাহান বেগম। বেগম-এর যাত্রা শুরু ও ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের (১৮৮৮- ১৯৯৪) সযত্ন নির্দেশে-পরিচালনায় সাংবাদিকতায় নূরজাহান বেগমের পরিপক্বতা রূপায়িত হয়েছে।

নূরজাহান আপা কখনওই বেগম থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিসত্তা বলে ভাবেননি। বেগম তাঁর আত্মার আত্মীয়, তাঁর সন্তানতুল্য। মন উজাড় করে বলেছেন আমাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে, বেগম-এর কাজ করতে আমার খুব আনন্দ লাগত। আমি প্রথম দিকে দেখেছি কলকাতায় মেয়েদের কী অবস্থা (১৯৪৭-এ) এবং ঢাকায় এসে মেয়েদের কী অবস্থা, সেটাও দেখেছি। সবাই লেখা দিতে আসে। বলেছে লেখাটি একটু দেখে দিন। ঈদসংখ্যার লেখার সাথে নিজ ইচ্ছায় ছবি দেন সকলে। বেগম-এর লেখক- সাংবাদিক মেয়েরা তাঁর সান্নিধ্যে পেয়েছেন পরিবারের স্নেহ-ভালোবাসা-যত্ন।

গভীর নিষ্ঠায় তিনি বেগম সম্পাদনা করেছেন, লেখা সংগ্রহ করেছেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে। তাঁর স্নেহ-ভালোবাসা- আন্তরিকতায় সিক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের গ্রাম-মফস্বল-শহরের দূর-দূরান্ত অঞ্চলের অন্তঃপুরবাসিনীরা। তাঁরা-আমরা সবাই তাঁর মধ্যে পেয়েছি মায়ের স্নেহ- ভালোবাসা। পেয়েছি বোনের সহমর্মিতা। বয়সভেদে কারও সঙ্গেই তাঁর দূরত্ব ঘটেনি। বিনয়ী, মমতাময়ী অথচ দায়িত্ব সচেতনতায় তাঁকে দৃঢ়-কঠোর হতেও দেখেছি।

srodhanjoly-2হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন হাজার হাজার লেখিকা, কর্মী ও সাংবাদিক। তাঁরা সেই ১৯৫০-এর দশক থেকে অদ্যাবধি সাহিত্যিক হিসেবে, সাংবাদিক হিসেবে স্বনামখ্যাত হয়েছেন স্ব-স্ব ক্ষেত্রে।

অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক নানা সমস্যার জন্য বেগম বর্তমানে ঈদসংখ্যায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ায় নূরজাহান আপা তাঁর ঘনিষ্ঠ সুহৃদদের কাছে দুঃখ-কষ্ট ভারাক্রান্ত মনে বলেছেন, এমনটা তিনি মানতে পারছেন না। তাঁর অশ্রুভারাক্রান্ত-বেদনাসিক্ত কণ্ঠ এখনও আমার কানে বাজছে। তিনি বলেছিলেন, বেগম পারিবারিকভাবে বংশানুক্রমে চলছে, চলবে। এখন আমার দুই মেয়ে আছে, তাদের নাতি-নাতনি আছে। বেগম প্রকাশনার কর্মকাণ্ডের মধ্যেই তাদের বসবাস। তাদের বাবাকে (প্রয়াত রোকনুজ্জামান খান) দেখেছে, তাদের নানাকে দেখেছে, মাকে দেখেছে এবং কীভাবে কী করে যোগাযোগ করি, কার সঙ্গে ফোন করি, দেখেছে। ওদের ওপর আমার বিশ্বাস আছে, ওরা দায়িত্বশীল। আমার বড় মেয়ে ফ্লোরা নাসরিন খান এখন ঈদসংখ্যা বের করছে। আমার এখন চোখও নেই, ‘ভয়েস’ও নেই। বলে দিই এটা এই, ওটা ওই। মেয়ে বলে, ‘আম্মা, ওটা ভালো লাগবে না, তুমি এটি দাও।’ বলি, ‘তা-ই দাও।’ এই করে চলে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, ওরা যদি অন্য কিছুর দিকে না তাকিয়ে শুধু নারীসমাজের উন্নয়নের দিকে তাকায়, তাহলেই বেগম চলবে। আমাদের ডাকতেন পরামর্শের জন্য। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত, বৃহত্তর বেগম-এর চলার পথে তাঁকে সহায়তা করার আহ্বানে আমরা কেউই তেমন কার্যকর ভূমিকা নিতে পারিনি।

নূরজাহান আপার কাছে জীবিতকালে বহুবার ক্ষমা চেয়েছি। এখন তাঁর আত্মার কাছেও ক্ষমা চাচ্ছি।

নূরজাহান আপা নারীজাগরণ আন্দোলনের কাজে সমিতি-সংগঠন- বেগম ক্লাবের সাংগঠনিক কাজ করেছেন। পত্রিকা চালানোর স্বার্থেই শুধু নয়, নারীসমাজের প্রগতির বৃহত্তর স্বার্থেই তিনি এসব কাজ করেছেন।

বেগম বা নিজের জীবন নিয়ে স্মৃতিকথা লেখেননি তিনি। বলতেন সাক্ষাৎকারে, বলতেন সভা-সেমিনারে। তাঁর জন্মদিনে ২০১৪ সালের ৪ জুন আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, মেয়েদের আর পেছনের দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। পথ এখন প্রশস্ত। আপনারা এগিয়ে চলুন। পুরুষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এগিয়ে চলুন। তাঁর কণ্ঠ এতটাই সজোর ও উচ্চ ছিল যে, মাইক ছাড়াও শুনতে-বুঝতে অসুবিধা হতো না। তাঁর কোনো ভাষণেই আত্মপ্রচার থাকেনি কখনও।

তবে বাবাঅন্তঃপ্রাণ, তিনি বাবার আদর্শ-নীতি-নিষ্ঠার কথা বলেছেন প্রায়ই। তাঁর বাবা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন প্রগতির পথে প্রগতিশীল লেখকদের সংগঠিত করতে যে প্রতিকূল পরিবেশে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন সওগাত পত্রিকার মাধ্যমে, সেই সংগ্রামের হাতেখড়ি দিয়ে মেয়ে নূরজাহানকে তিনি সাংবাদিকতার বা পত্রিকা সম্পাদনার কর্মকাণ্ডে যুক্ত করেছিলেন। সেসব নূরজাহান বেগম স্মৃতি থেকে অকপটে বলতেন কথোপকথনে ও সাক্ষাৎকারে।

মা ফাতেমা খাতুনের কথা বলতে গিয়ে তিনি শ্রদ্ধায়, কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হতেন। মা ছিলেন নীরব সচেতন গৃহিণী। বাবার হাত ধরে মেয়ের এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে মায়ের অকুণ্ঠ প্রেরণার কথা বলেছেন শ্রদ্ধেয় নূরজাহান বেগম। তিনি প্রায়ই কবি সুফিয়া কামালের অভিভাবকত্ব ও নেতৃত্বের প্রভাবের কথা বলতেন। মৃদু হাসিতে অত্যন্ত সংকোচে তাঁর লেখাপড়ার জীবনের কথা বলেছেন আমার আগ্রহভরা জিজ্ঞাসায়।

কলকাতায় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন প্রতিষ্ঠিত সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক (১৯৪২), কলকাতায় লেডি ব্রেবোন কলেজ থেকে স্নাতক (১৯৪৬) পাস করে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন বাবার সঙ্গে সাংবাদিকতার কাজে। স্কুল-কলেজের শিক্ষাকেন্দ্রে তিনি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক ইত্যাদিতে অংশ নিয়ে ও সংগঠক হিসেবে উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন। সেসব শিক্ষা ও কর্মতৎপরতার দীক্ষা তাঁর পরবর্তী জীবনে পত্রিকা পরিচালনা, বেগম ক্লাব পরিচালনা ও নারী সমিতি পরিচালনায় সংগঠক ও নেত্রী হিসেবে ভূমিকা পালনে কৃতী হতে সহায়ক হয়েছে।

srodhanjoly-3রোকেয়া পদক, রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়েছেন তিনি ১৯৯৭ সালে। পেয়েছেন অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (২০০২) এবং অন্যান্য বহু সাহিত্য সম্মাননা ও স্বর্ণপদক। এসব তাঁকে যেমন সম্মানিত করেছে, তেমনি তাঁকে সম্মানিত করে দেশ ও জাতিও সম্মানিত হয়েছে নিঃসন্দেহে।

তাঁর বাসায় ইদানীং যখনই গিয়েছি, দেখেছি তিনি বেলা ১১টার মধ্যে সকালের নাশতা শেষে পরিপাটি কাপড় পরে সুন্দর স্নিগ্ধ মুখে, প্রফুল্ল চিত্তে বেগম-এর লেখাগুলো নিয়ে কাজ করছেন।

বেগম তাঁর আত্মাসম, বন্ধুসম ছিল। বেগম নিয়ে তাঁর অতীত স্মৃতি-মাধুর্যের কথা শুনতাম, বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুনতাম। তাঁকে আশ্বস্ত করতে পারিনি। এই না-পারার বেদনা আমাদের বহুজনের মনে মর্মপীড়াদায়ক হয়ে আছে, থাকবে।

নূরজাহান আপার সার্থক দীর্ঘ জীবনের ইতিহাস আমাদের দেশ ও জাতির অমূল্য সম্পদ। তাঁর কথা আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে নিয়ে যাব তাদের উদ্দীপিত করার জন্য। তাঁর সন্তানদের সঙ্গে আমরাও চিরতরে হারালাম আমাদের পরম শুভাকাক্সক্ষীকে।

 তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য দরকার নানা কর্মকা-ের মধ্যে তাঁর কৃতিত্বকে ঐতিহাসিক করে তোলা। আমরা সবাই মিলে সেই দায়িত্ব পালন করতে এগিয়ে আসতে সচেষ্ট হব।

মালেকা বেগম: নারীনেত্রী, অধ্যাপক

সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি

১. শুভ্র সমুজ্জ্বল জীবনসঙ্গীর আয়নায় ও অন্যান্য, মালেকা বেগম, প্রথমা প্রকাশন, ২০১৬, পৃষ্টা. ১৭৭

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares