kazi-johir-1

ভ্রমণ

সাকুরা মাতসুরি থেকে রঙ্কঙ্কমা

কাজী জহিরুল ইসলাম

 

সেল ফোন বাজছে। স্ক্রিনে সাংবাদিক শামীম আল আমিন। ‘ভাইয়া আজ তো ব্রুকলিনে চেরি ফেস্টিভেল, যাবেন না?’ মুহূর্তেই দু’শ পঁচিশ প্রজাতির চেরি ব্লসমের রঙের ঝালর চোখের সামনে ঝকমক করে উঠল। ওয়াশিং ডিসির চেরিফুলের উৎসবটি মিস করেছি, এটা আর মিস করতে চাই না। তুষার গলা জলের ওপর দিয়ে যখন বসন্তের হাওয়া বইতে শুরু করে, তখনি কুঁড়ি মেলে পিটপিট করে তাকায় চেরি ব্লসমের সবুজ পাতা। কদিনের মধ্যেই লাল-শাদা রঙে হেসে ওঠে চেরির ডালগুলো। এই লাজুক ফুলটির আয়ু সর্বসাকুল্যে মাত্র দু’সপ্তাহ, কখনও কখনও এর আগেই ঝরে পড়ে। শনিবার সকাল। সকলের চোখেই ‘আরেকটু ঘুমাই’ ভাব। স্ত্রী-কন্যাকে তাড়া দিয়ে ঝটপট তৈরি হয়ে নিই।

এপ্রিলের শেষ দিন। অডিসির এলসিডি স্ক্রিনে তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট, বাইরে সোনাঝরা রোদ। শীতের দৈত্যটাকে তাড়িয়ে গাঝাড়া দিয়ে জেগে উঠেছে নিউইয়র্ক শহর। ঝাউয়ের ঝোপ থেকে, লাল টালির ছাদ থেকে তুষারের শুভ্র লেপ খসে পড়তে না পড়তেই এই শহরের সুন্দরী ললনাদের গা থেকেও খসে পড়তে শুরু করেছে বাড়তি পোশাক। প্রকৃতি যেমন ফুল-পাতায় মেলে ধরছে রূপের পশরা, এ শহরের অনিন্দ্য সুন্দরীরাও তেমনি তাদের রূপের ঝাঁপি খুলে দিচ্ছে। ফুটপাতে সারি সারি নারী-পুরুষ। নারীর সংখ্যাই বেশি এবং অবধারিতভাবেই ওরা স্বল্পবসনা। এই হিরণ্ময় রোদে গা ঢাকা পোশাকপরা যেন মহাঅন্যায়, প্রকৃতিবৈরিতা।

শামীম, ওর স্ত্রী লিউজা এবং সাত বছরের কন্যা অপর্ণাকে তুলে নিয়ে আমরা গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল পার্কওয়ে নামক হাইওয়েটিতে উঠে এলাম সকাল সাড়ে এগারটায়। জিপিএস বলছে ব্রুকলিন বোটানিক্যাল গার্ডেনে পৌঁছে যাব সোয়া বারটায়। সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত খোলা থাকবে মেলা। পারফেক্ট টাইমিং। শুধু দুপুরের খাবারটা কোথায় এবং কখন খাবো, এ নিয়ে একটু দুশ্চিন্তায় আছি। কথাটা মুখ ফুটে বলা যাবে না। তাহলে আমার পেটুক স্বভাব নিয়ে একপশলা ঝড় বয়ে যাবে গাড়ির ভেতর। তাড়াহুড়োয় মুক্তি ওর মুখের কারুকাজটি শেষ করতে পারেনি। ফাইন্যাল ব্রাশ-আপটা গাড়িতেই সেরে নিচ্ছে। অবশ্য এ বিষয়ে টুশব্দটিও করা যাবে না। জল খুশিতে ডানা ফ্ল্যাপ করে ওর নিজস্ব ভাষায় আনন্দ প্রকাশ করছে।

জ্যাকি রবিনসনের সরু রাস্তায় এসে গাড়ির গতি শ্লথ হয়ে এলে ডানদিকের জানালায় মুক্তির অবাক দৃষ্টি। ও-মাকাল না গাছগুলো ন্যাড়া ছিল, একদিনেই কেমন সবুজ হয়ে উঠেছে! বিকশিত হওয়ার জন্য নিউইয়র্কের মানুষ ও প্রকৃতি এ দুইয়েরই বড় তাড়াহুড়ো। ব্যাকুল প্রতীক্ষায় থাকে ওরা, কখন যাবে শীত। নিউইয়র্কের বসন্ত প্রতি ঘণ্টায় বদলে যায়। এমনও হয়েছে সকালে পথের পাশে ন্যাড়া ডাল-কা- দেখে অফিসে গেছি, সন্ধ্যায় ফিরে আর নিজের বাড়ির রাস্তাটিকেই চিনতে পারছি না। কচি সবুজের কি দুরন্ত হুড়োহুড়ি পথের দু’পাশে। একটিমাত্র দুপুর-বিকেল, উষ্ণ হাওয়ার ছোঁয়া লাগতে না লাগতেই বার্চ-কিশোরীরা নিজেদের মেলে ধরেছে যতটা সম্ভব। পালাক্রমে এ শহরের প্রকৃতিতে পাঁচটি রঙের খেলা দেখি আমরা। ন্যাড়া ডাল-পালায় ধূসর শীত, ক’দিনের মধ্যেই শুভ্র তুষারের নিচে ডুব দেয়। তুষার গলা জলে নাতিশীতোষ্ণ হাওয়ার ছোঁয়া লাগতেই হালকা সবুজ রঙে জেগে ওঠে বসন্ত। ক্রমশ তা প্রগাঢ় সবুজে রূপ নিয়ে জানান দেয় গ্রীষ্মের। বুড়োপাতারা অভিজ্ঞতায় লাল হয়ে ওঠে, হলুদ হয়ে ওঠে, এক সময় প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে টুপটাপ ঝরে পড়ে। তখন মনে হয় চারদিকে রঙের আগুন লেগেছে। লাল-হলুদ রঙের এই সাজ দেখেই আমরা বুঝি নিউ ইয়র্কে হেমন্ত বা ফল এসেছে।

kazi-johir-2বাচ্চারা ফ্রি, আমাদের চারজনের জন্য টিকিট কাটতে হলো একশ ডলার দিয়ে। ভেতরে ঢুকে আমরা আনন্দে বিমোহিত-মুগ্ধ। যতই ভেতরে যাচ্ছি মনে হচ্ছে রোল করা রঙের কার্পেট ক্রমশ খুলে যাচ্ছে। চেরিফুলের বাড়ি জাপানে। আসলে এর আদি নিবাস হিমালয়ে। হিমালয়ের বুনো চেরিফুলকে তুলে এনে যত্নে-পরিচর্যায় জাপানিরা করে তুলেছে উৎসবের উপলক্ষ। সারা পৃথিবীতেই আজ চেরি উৎসব হয়। চেরির জাপানি নাম সাকুরা। আজ ব্রুকলিন বোটানিক্যাল গার্ডেনে আয়োজন করা হয়েছে ৩৫তম সাকুরা মাতসুরি বা চেরি উৎসব।

প্রাকৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি কিছু বাড়তি সংযোজনও আছে। শিশুদের আনন্দ দিতে এখানে সেখানে হাঁটছে নানান রঙের পোশাকপরা ক’জন সঙ। একটি সুবিশাল মঞ্চ আছে। ওখানে চলছে জাপানি প্রথাগত পারফরমেন্স। এই আয়োজনে রয়েছে সোহ দাইকো, কুরো পপ, ইউজুর স্বপ্ন, সোহেনরিউ’র চা সিরিমনি, শোগি’র দাবা প্রশিক্ষণ আরও কত কি। এখন মঞ্চে চলছে সোহ দাইকো। বিভিন্ন উচ্চতায় ছয়টি বিশাল ঢোল মঞ্চে সাজানো আছে। ড্রাগন আঁকা নীল-সবুজ জামা আর নেভি ব্লু পান্তালুন পরা আটজন নারী-পুরুষ মঞ্চে, ওদের প্রত্যেকের হাতে দুটি করে ঢোল পেটানোর লাঠি। নানান ভঙ্গিতে নেচে নেচে ওরা হাতের স্টিকগুলো দিয়ে ঢোলে আওয়াজ তুলছে। একটি ছন্দময় রিদম এবং ডিসিপ্লিনের মধ্য দিয়ে প্রত্যেক পারফর্মারই নাচতে নাচতে ঘুরে ঘুরে সবগুলো ঢোলে আঘাত করছে। আওয়াজটি অনেকটা পুজোর বাজনার মতো লাগছে আমার কাছে। ভিড়ের মধ্যে না গিয়ে আমি দেখছিলাম দূরে, একটি চেরি ব্লসমের ছায়ায় দাঁড়িয়ে। টের পাইনি দলের অন্য সদস্যরা ততক্ষণে ইতস্তত ছড়িয়ে পড়েছে ফুলের বাগানে, হাজারো মানুষের ভিড়ে এবং অচেনা কেউ একজন আমার পাশে, খানিকটা পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ কাঁধের ওপর কারও হাত। আমি ঘুরে তাকাই। অচেনা এক জাপানি মধ্যবয়স্কা। আমার নাম কায়ো। তুমি খুব মন দিয়ে দেখছিলে, আগে আর দেখেছো সোহ ডাইকো? আমি এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ি। না, এই প্রথম। আমি কাজী। এরপর আমাদের আলাপ জমে ওঠে। কৌতূহলবশত জানতে চাই সোহ ডাইকো পারফর্মেন্সের ইতিহাস। মেয়েটি জানায়, দক্ষিণ চীনের কাক্কো বাজনা শিখতে এক জাপানি যুবক গিয়েছিল কোরিয়ায়, ৫৮৮ সালে। তিনি ফিরে এসে টাইকো বাজনার প্রচলন করেন।

পরবর্তীকালে এটা যুদ্ধের বাজনা হয়ে ওঠে। ফিউডাল জাপানে সৈনিকদের উদ্দীপ্ত করার জন্য টাইকো বাজনা বাজানো হতো। সেই টাইকো থেকেই আজকের সোহ ডাইকো। আমরা আরও অনেকক্ষণ কাটাই পার্কের ভেতরে, প্রচুর ছবি তুলি। ছবি তুলি নানান প্রজাতির চেরিফুলের, টিউলিপের এবং ফুলের মতো সুন্দর মানুষের। দুপুর গড়িয়ে এক সময় বিকেল হয়, আমাদের পেটের ভেতর ক্ষুধা চনমনিয়ে ওঠে, পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য ক্রমশ মলিন হয়ে আসে। আমরা পার্ক থেকে বেরিয়ে আসি। ম্যগডোনাল্ডসের বার্গারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। মনে হয় বার্গারের চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই এই ধরণীতে। কিন্তু তা কেবল অল্প কিছুক্ষণের জন্যেই। খেয়ে-দেয়ে আমরা আবার প্রকৃতির গহনে অবগাহন করতে ছুটতে শুরু করি। এবার লেক রঙ্কঙ্কমায়, ষাট মাইল দূরে, লং আইল্যান্ডে।

গাড়িতে আমরা ছয়জন। দলের সবচেয়ে ছোট সদস্য শামীম আল আমিনের সাত বছরের কন্যা অপর্ণা। অপর্ণা মজার মজার সব হাসির গল্প জানে। এই মেয়ে সারাদিন ইউটিউবে গোপাল ভার দেখে। গোপালভার দেখে দেখে নিজে একটা মিনি গোপাল ভার হয়ে গেছে। ‘আমি কি এখন একটি গল্প বলতে পারি?’ বলেই সে তার গল্প শুরু করে দেয়। এখন সে বলছে আইসক্রিমের গল্প। আইসক্রিমের গল্পে আইসক্রিমের ভূমিকা খুবই সামান্য। একদিন সকালে মেয়েটিকে মা আইসক্রিম কিনে দিল। হঠাৎ হাত থেকে আইসক্রিমটি মাটিতে পড়ে গেল। মেয়েটি মাটি থেকে আইসক্রিম তুলতে গেলে মা বললো, ছিঃ মা ময়লা জিনিস তুলতে হয় না। আমি তোমাকে আরেকটা এনে দেব। এর কয়েকদিন পরে ওরা বেড়াতে যাচ্ছে। তখন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। বাসা থেকে বের হয়েই মেয়েটির বাবা পা পিছলে কাদায় পড়ে গেল। মেয়েটির মা বাবাকে তুলতে গেল। মেয়েটি তখন মাকে বললো, ছিঃ মা, নোংরা জিনিস তুলতে হয় না। আমি তোমাকে আরেকটা এনে দেব। হি হি হি হি। যে মেয়ের এতো বুদ্ধি সে কথায় কথায় ভেঁ ভেঁ করে কাঁদে। অপর্ণার হাজারটা সিক্রেট আছে। কিন্তু মুশকিল হলো কোনটা যে ওর সিক্রেট তা কারও বোঝার সাধ্য নেই। ওর সিক্রেট কাউকে বলা যাবে না। বললেই সে ভেঁ ভেঁ করে কাঁদতে শুরু করে। সেই কান্না আর থামে না। কাঁদতে কাঁদতে সে আবার স্বাভাবিক কাজকর্মও চালিয়ে যেতে পারে। একটা উদাহরণ দিই। লিউজার নানা যেদিন মারা যায় ওর মা, খালা, মামারা শোকে মুহ্যমান। সারা বাড়িতে কান্নার রোল। অপর্ণা হঠাৎ বলে উঠলো, ‘আহারে মা, আমার নানাভাইরা তো মতিন হয়ে গেল। এতিম শব্দটি ও তখনো ভালোভাবে শেখেনি। শোকের বাড়িতে হাসা যাবে না। তাই কেউ হাসছে না। এই গল্প যখন লিউজা আমার স্ত্রী মুক্তিকে টেলিফোনে বলছিল ও সেটা শুনে ফেলেছে। ‘আমার সিক্রেট বলে দিলে কেন?’

বলেই ভেঁ ভেঁ করে কাঁদতে শুরু করে। সেই কান্না আর কিছুতেই থামে না। লিউজা ওর একটি বিশেষ লিপজেল খুঁজে পাচ্ছে না। অপর্ণা কাঁদতে কাঁদতেই বলছে, ওটা বেডসাইড ড্রয়ারে, ভেঁ এঁ এঁ এঁ। সে কাঁদতে কাঁদতেই এরকম স্বাভাবিক কথাবার্তা চালিয়ে যেতে পারে। অপর্ণা এখনও কাঁদছে।  এখন কি কারণে কাঁদছে তা বলা যাবে না। বললে সে এই লেখা পড়ে আবার কাঁদবে। আমরা লং আইল্যান্ডের রহস্যময় লেক রঙ্কঙ্কমায় চলে এসেছি। বিশাল লেক দেখে ওর কান্না থেমে গেল। ‘আমরা সী-বিচে চলে এসেছি, কি মজা’। বেশি খুশি হলো লেকের পাড়ে চড়ে বেড়ানো জায়েন্ট সাইজের একটি রাজহাঁস দেখে। ও তখনও বাঁ-দিকের, খানিকটা টিলার ওপরে অবস্থিত, প্লে গ্রাউন্ডটি দেখেনি। গাড়ি থেকে নেমেই প্লে গ্রাউন্ডটিতে চোখ পড়ার সাথে সাথে সী-বিচ আর রাজহাঁস নিতান্তই তুচ্ছ হয়ে গেল। আমরা ওকে কিছুতেই বোঝাতে পারছি না, সন্ধ্যা হবার আর বেশি বাকি নেই, এখনি লেকের পাড়ে হাঁটাহাঁটি করতে হবে, প্লে গ্রাউন্ডে পরেও খেলা যাবে। অপর্ণা তখন নানান যুক্তি দিতে শুরু করে।

-লেকে তো পরেও যাওয়া যাবে। লেকটাতো আইসক্রিম না যে একটু পরে গলে যাবে।

-প্লে গ্রাউন্ডেও তো একটু পরে যাওয়া যাবে।

-আমার তো এখনি দোলনায় চড়তে হবে।

-তুমি কি একটু অপেক্ষা করতে পারবে না?

-তোমরাও তো একটু অপেক্ষা করতে পারো।

-একটু পরেতো অন্ধকার হয়ে যাবে। তখন তো লেক দেখা যাবে না।

-তাহলে লাইট জ্বালিয়ে দেখবে।

-ওখানেতো কোনো লাইট নেই।

যুক্তিতে হেরে গেলে অপর্ণা যা করে তাই করল। ভেঁ ভেঁ করে আবারও কান্না জুড়ে দিল। সেই কান্নার শব্দ একটি সুশৃঙ্খল লয়ে কিছুক্ষণ ওপরের দিকে উঠে এক জায়গায় এসে স্থির হয়ে আছে। কিছুতেই আর নামছে না। আমি বললাম, তোমার কান্না শুনে রঙ্কঙ্কমা উঠে আসছে। ‘ও এখন কোথায়?’ খুব স্পষ্ট উচ্চারণে প্রশ্নটি করেই আবারও কান্না। কান্নার মাঝখানে ও যখন প্রশ্ন করে বা কথা বলে কারও বোঝার  সাধ্যই নেই এই মেয়েটি একটু আগে কাঁদছিল এবং কথাটি শেষ করে আবারও কাঁদবে।

লেকের টলমলে স্বচ্ছ-স্থির জল দেখে আমার কন্যা জল পারে তো এক্ষুনি নেমে পড়ে। আমাদেরও কম লোভ হচ্ছে? নিদেনপক্ষে একটু তো পা ভেজাই। কেউ কেউ হাতে জল নিয়ে রাজহাঁসের মাথার ওপর উড়ে বেড়ানো সিগাল-সভায় ছুঁড়ে দিচ্ছে। লেক বটে কিন্তু পাড়ের সমতলে বিছানো বিস্তীর্ণ লাল বালুকারাশি দেখে সমুদ্র সৈকত বলে ভুল যে কারওরই হতে পারে। আমরা সেই সৈকতে রাজহাঁসের পিছু পিছু হাঁটছি। স্প্রিঙয়ের কচি সবুজের বেসামাল হুড়োহুড়ি চারপাশের অরণ্যে। ওপরে ঝকঝকে নীল আকাশ, তার ছায়ায় লেকের জলরাশি হয়ে উঠেছে ঘন নীলের এক রিজার্ভার।

kazi-johir-3এক কিলোমিটার প্রশস্ত এবং তিন কিলোমিটার লম্বা লেক রঙ্কঙ্কমার একটি কিংবদন্তি আছে। লং আইল্যান্ডের সাফোক কাউন্টিতে অবস্থিত রঙ্কঙ্কমা ১১৮ মাইল দীর্ঘ এই দ্বীপের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির লেক। এই লেকের ৯৫ ফুট গভীর তলদেশে লুকিয়ে আছে এক অনুদ্ঘাটিত রহস্য। আমি সেই রহস্যাবৃত গল্পটিই এখন সবাইকে বলছি। এখানে এই লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে বলব বলেই গল্পটি এতক্ষণ ওদের বলিনি। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি কোনো এক সময়। সন তারিখ কেউ জানে না। আমেরিকার আদিবাসীদের আমরা রেড ইন্ডিয়ান বলেই জানি। রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যে ছিল অনেক ছোট ছোট জাতি। সেতোকেত এমনি এক জাতি। সেতোকেত সম্প্রদায়ের রাজকন্যা ছিলেন রঙ্কঙ্কমা। লেকের অন্য পাড়ে বাস করতো ইংরেজ কাঠুরে যুবক হিউ বার্ডসেল। এক শীতে ঠান্ডায় বরফ হয়ে যাওয়া লেকের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে ষোড়শী রঙ্কঙ্কমা ওপারে চলে যায় এবং হিউর সাথে দেখা হয়। প্রথম দেখাতেই প্রেম। এরপর রোজ ওরা দেখা করত। ঘটনাটি জানাজানি হলে সম্প্রদায়ের প্রধান, রঙ্কঙ্কমার বাবা, ওদের প্রেমকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। পরবর্তী সাত বছর ধরে গাছের বাকলে রঙ্কঙ্কমা রোজ একটি করে চিঠি লিখে হিউর উদ্দেশ্যে লেকের জলে ভাসিয়ে দিত। ওদের আর কোনোদিন দেখা হয়নি। এরপর এক জ্যোৎস্না রাতে রঙ্কঙ্কমা ছোট্ট একটি নৌকা নিয়ে লেকের মাঝখানে গিয়ে নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে আত্মহত্যা করে এবং লেকের অতল গহনে তলিয়ে যায়। সেই থেকে প্রতিবছর একজন যুবা পুরুষ এই লেকের জলে ডুবে মারা যায়। কথিত আছে রঙ্কঙ্কমা প্রতিবছর একজন নতুন সঙ্গীকে তার কাছে নিয়ে যায়। যারা লেকের জলে ডুবে মারা গেছে তাদের অধিকাংশেরই মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় নি। এজন্য এই লেকটিকে তলাবিহীন লেকও বলা হয়। এটি কিংবদন্তি বটে তবে পরিসংখ্যান বলছে ঘটনা সত্যি। ড. ডেভিড ইগনেরি নামের এক ভদ্রলোক ৩২ বছর এখানে প্রধান লাইফগার্ডের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, এই সময়ে অন্তত ৩০জন ডুবে মারা যায়, যাদের সবাই যুবা পুরুষ। ইগনেরি বলেন, কোনো এক রহস্যময় কারণে ১০ ফুটের নিচে কোনো ভিজিবিলিটি নেই, কেউ এর নিচে চলে গেলে তাকে আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। ১৯৬৫ সালে ইগনেরি একজনকে খুঁজতে লেকের তলা অব্দি চলে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ফায়ারওয়ার্কের শব্দ শুনেছেন এবং তার কাছে মনে হয়েছে কোথাও  উৎসব-আনন্দ চলছে কিন্তু তিনি কিছুই দেখতে পাননি। একবার ইগনেরি স্বপ্নে দেখেন জুলাইয়ের চার তারিখে একজন ডুবে মরবে। তিনি এসব বিষয়ে মোটেও বিশ্বাস করতেন না, তথাপিও সবাইকে এলার্ট করেছিলেন। সবাইকে লাইফগার্ডরা চোখে চোখে রাখছিলেন সেদিন। হঠাৎ দুপুরের পরে ১৫ বছরের এক তরুণ মৃগীরোগী পানিতে নেমে কাঁপতে কাঁপতে ডুবে যায়। সাথে সাথে লাইফ গার্ডরা নেমে পড়ে। ৪৫ মিনিট ডুব-সাঁতার কেটেও ছেলেটির কোনো হদিস মেলেনি। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আমরা লেকের পাড় থেকে উঠে আসি। অপর্ণা এবং জল দোলনায় দুলছে। অন্য একটি দোলনায় আমার স্ত্রী মুক্তি। একটু দূরে শামীম আর লিউজা, খুব কাছাকাছি। হঠাৎ আমি নিম্নচাপ অনুভব করি। লেকের পাড়ের গেস্ট হাউসে তালা। হালকা অন্ধকারের মিহি জাল ভেদ করে ধীরে ধীরে লেকের পাড়ে নেমে যাই। হঠাৎ টের পাই কেউ একজন খুব দ্রুত আমার দিকে ছুটে আসছে। এসেই আমার কাঁধে হাত রাখে। পেছনে ফিরে দেখি মুক্তি। ‘রঙ্কঙ্কমা ডাকছে?’ আমি শব্দ করে হেসে উঠি। খুব স্পষ্টতই শুনতে পাই সেই হাসির প্রতিবিম্ব লেকের তলদেশ থেকে ফিরে আসছে কান্নার মিহি সুর হয়ে।

kazi-johir-4

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares