rezwana-chow-1

সংগীত

ধা রা বা হি ক :   আ ঠা রো ত ম  প র্ব

রবীন্দ্রআলোয় আপন ভুবন

একুশ শতকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাসঙ্গিকতা

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা

rezwana-chow-2

রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। তাঁর বিচরণ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। কবিতা, গান, নাটক, উপন্যাস থেকে শুরু করে সমাজচিন্তা, শিক্ষাচিন্তা, ধর্মচিন্তা, নান্দনিকচিন্তা সর্বোপরি বিশ্বায়নের যে যুগোপযোগী চিন্তা এ সবেরই প্রাসঙ্গিকতা আলোচনাসাপেক্ষ। বিষয়টি নিঃসন্দেহে ব্যাপক এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ।

রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা যুগে যুগে সময়ের সাথে, সমাজের সাথে রাজনৈতিক কিংবা ভৌগোলিক বিভাজনের পরেও আসন্নকালের সাংস্কৃতিক উত্তরণের রূপরেখাটি তৈরির ক্ষেত্রে সমকালীন এবং সেটা তিনি করে গেছেন তাঁর গান, নাটক তো বটেই শিক্ষা, ভাষা, শিল্প, জীবনচর্চাসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ও খুঁটিনাটি বিষয়ে লেখনী চালিয়ে, কর্মযজ্ঞে যুক্ত হয়ে, আগামীদিনের আগামী প্রজন্মের মানবিকগুণসম্পন্ন সৃজনশীল মানুষ তৈরি করার প্রয়াস হিসেবে ব্রহ্মবিদ্যালয় ও বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

ব্রিটিশ ভারতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানে, ঔপনিবেশিক শক্তির ষড়যন্ত্র প্রতিহত করায় তাঁর চিন্তা, চেতনা, দর্শন, মনন, কবিতা, নাটক, গান সেই সময়ের বাঙালিকে যতখনি উজ্জীবিত করেছে ৪৭-পরবর্তী পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে মুক্তমনা, চিন্তাশীল বাঙালি সাধারণ মানুষের মধ্যে বাঙালি-চেতনা এবং জাতীয়তার উদ্ভবও ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে।

’৪৭ থেকে ’৭১ পর্যন্ত যে রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা তার মূলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক নেতা, মুক্তমনা-চিন্তাশীল-বুদ্ধিজীবী এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন সবাই বাঙালি হিসেবে নিজের সরব অস্তিত্ব প্রচারে প্রধান অবলম্বন হিসেবে রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা, নাটকের ব্যবহার এবং চর্চা করেছেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবর্ষ পালনের মধ্য দিয়েই বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ একই মঞ্চে নিজেদের যুক্ত করেছেন তাতে পেছন থেকে শক্তি যুগিয়েছে তৎকালীন বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলসমূহ। উনবিংশ শতকের শেষ চারদশক আর বিংশশতকের প্রথম চার দশক ধরে মোট ৮০ বছরের রবীন্দ্র জীবনকাল ঔপনিবেশিক ভারতে কাটলেও ভারত ও বাংলাদেশ; স্বাধীন এই দুটি দেশের জাতীয় সংগীত তাদের স্বাধীনতার বহু যুগ আগেই রচনা করে গেছেন। তিনি যে তাঁর কালের শ্রেষ্ঠ রূপকার শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর কালকেও অনায়াসে অতিক্রম করেছেন গানে, গল্পে, কবিতায়, নাটকে।

স্বদেশ ভাবনা

তাঁর স্বদেশ ভাবনার মৌলিকতা কেবল দেশের স্বাধীনতার মধ্যে নিহিত ছিল না। ঔপনিবেশিক শাসনে জন্ম নেয়া কবির পক্ষে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা খুবই স্বাভাবিক এবং প্রাসঙ্গিক। আর তারই ধারাবাহিকতায় বাক স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, ব্যক্তির স্বাধীনতা, সমাজের স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বাধীনতা সম্পর্কিত তাঁর ভাবনার এবং বাঙালি জাতীয়তার পথনির্দেশও আমরা তাঁর লেখনীতে পাই।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় ১৯০৫ সনে লেখা স্বদেশ পর্যায়ের গান তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এ গান কেবল ‘দ্রোহের গান’ বা ‘স্বাধীনতার গান’ নয়। এ গান আত্মবিশ্লেষণের গান, আত্মজাগরণের গান, আত্মশুদ্ধির গান। তাই এ গান আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর গান ১৯৭১-এর স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় যতখানি প্রাসঙ্গিক ছিল বা ১৯৪৭-পূর্ববর্তী পরাধীন দেশের স্বাধীনতার চেয়েও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে ততখানিই প্রাসঙ্গিক ছিল। রাখীবন্ধনের উৎসব প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে সেই সম্প্রীতিই তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সেই পরাধীন দেশে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সম্পর্কের যে ভিত্তি তিনি রাখীবন্ধন উৎসব প্রবর্তনের মধ্যে দিয়ে করতে চেয়েছিলেন তা তত বেগবান, সার্থক হয়নি; পারস্পরিক অবিশ্বাস, সন্দেহ এবং ব্রিটিশ ষড়যন্ত্রের কারণে, কিন্তু বাংলাদেশের বাঙালির স্বদেশ এবং ভাষা নির্ভর যে জাতীয় চেতনার উদ্ভব তাতে রবীন্দ্রনাথের দিক-নির্দেশনা নিঃসন্দেহে সুদূরপ্রসারি :

‘বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা-

সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান ॥

বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন,বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন

এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান ॥’

স্বদেশ পর্যায়ের এই গানে তাঁর এই কামনা প্রার্থনায় পরিণত হয়। কিন্তু এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার উগ্র জাতীয়তাবাদ কবি কখনই স্বীকার এবং সমর্থন করেননি। জাপান ভ্রমণে তাঁর এই মনোভাব এবং আশঙ্কা সেখানে বসেই নানা বক্তৃতায় প্রকাশ পেয়েছে এজন্য তাকে সমালোচনাও কম শুনতে হয়নি। ঘরে বাইরে উপন্যাসে নিখিলেশের মুখের সংলাপ প্রকৃত অর্থে কবির নিজস্ব ভাবনা, যেখানে নিখিলেশ সন্দীপকে বলছে :

‘দেশকে দেবতা বানিয়ে যখন তোমরা অন্যায়কে কর্তব্য, অধর্মকে পুণ্য বলে চালাতে চাও তখন আমার হৃদয়ে লাগে বলেই আমি স্থির থাকতে পারি না।’

রবীন্দ্র-আদর্শে ন্যায়-অন্যায় আর ধর্ম-অধর্মের সংজ্ঞা কোনো প্রথাসিদ্ধ ধর্মকে অনুসরণ করে হয়নি। নিরাকার ব্রাহ্ম ধর্মের কবি হিন্দু, মুসলমান, জাত-পাত-বর্ণগোষ্ঠীর সংকীর্ণতাকে ধর্মজ্ঞান করেননি। করেননি বলেই পরাধীন দেশে এই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প যে কত মারাত্মক হতে পারে সে আশংকা তিনি তাঁর সময়েই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। পরস্পরের মধ্যে অসহিষ্ণুতা, অবিশ্বাস, সংশয় ও দূরত্ব এবং পরস্পরকে বোঝার মধ্যে যে বিপুল সমস্যা তা কবির কাছে অস্পষ্ট ছিল না আর এটাও তার জানা ছিল যে এই সমস্যার সমাধান ছাড়া বাঙালির অগ্রযাত্রা অসম্ভব। তাঁর তীব্র আক্ষেপ উল্লেখ করতে পারি :

‘এবার আমাদের স্বীকার করিতেই হইবে হিন্দু-মুসলমানের মাঝখানে একটা বিরোধ আছে। আমরা যে কেবল স্বতন্ত্র তাহা নহে। আমরা বিরুদ্ধ। আমরা বহুশত বৎসর পাশে পাশে থাকিয়া এক ক্ষেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূর্যের আলোক ভোগ করিয়া আসিয়াছি; আমরা এক ভাষায় কথা কই, আমরা একই সুখ-দুঃখে মানুষ, তবু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর যে সম্বন্ধ মনুষ্যচিত যাহা ধর্মবিহিত তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই, আমাদের সুদীর্ঘকাল ধরিয়া এমন একটি পাপ আমরা ঘোষণা করিয়াছি যে, একত্রে মিলিয়াও আমরা বিচ্ছেদকে ঠেকাইতে পারি নাই।’

এই সম্প্রীতির গানই তার স্বদেশ পর্যায়ের গান :

‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে

ঘরের হয়ে পরের মতন ভাই ছেড়ে ভাই ক’দিন থাকে’

রবীন্দ্রনাথের এই প্রাসঙ্গিক চিন্তা সেই সময় অনুসরণ না করার ফল আমাদের সমাজে, আমাদের সংস্কৃতিতে, আমাদের রাজনীতিতে আমাদের ইতিহাসে যে সুদূরপ্রসারি সর্বনাশের বীজ বপন করেছে তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে।

ধর্ম ভাবনা

রবীন্দ্রজীবনের শুরুর দিকে উপনিষদের আদর্শেই অনুপ্রাণিত কবি বিশ্বলোক অন্তরলোকের মধ্যে যে সেতুবন্ধ রচনা করেছেন তাই রবীন্দ্রনাথের দর্শন ও মননের মূলভিত্তি। তাঁর কবিতা, গান, নাটক ও অন্যান্য রচনায় যে ঈশ্বর চিন্তা, নান্দনিকতা, প্রকৃতি প্রেম, মানব প্রেম তাঁর প্রকৃত উৎস। এই বিশ্বলোক ও অন্তরলোকের অন্তর্মিলন আর সেখানেই রবীন্দ্রনাথ কালজয়ী। তাঁর রচনা সমসাময়িক সমাজ, প্রচলিত ধর্ম, সাংস্কৃতিক স্থিতি রাজনৈতিক মতাদর্শ সবকিছুকে অনায়াসে অতিক্রম করে যায়। থাকে কেবল মানবতা, তা সমাজের, দেশের এবং বিশ্বের। এই মনুষ্যত্ববোধের উৎকর্ষ সাধনই হয়ে ওঠে তার মূলমন্ত্র, মূলধর্ম। সেখানে তিনি সর্বদেশে, সর্বকালে সর্বসমাজে প্রাসঙ্গিক।

রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর চিন্তার মূল তিন ভিত্তি-সত্য, আনন্দ আর মঙ্গল। শান্তিনিকেতন প্রবন্ধমালায় এ-সম্পর্কে তিনি বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ঈশ্বরচিন্তার মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছিল কৈশোরের উপনিষদ পাঠ, যৌবনের পূর্ববঙ্গের নির্জন এককের আত্মোপলব্ধি তার সাথে যুক্ত বাউলের মনের মানুষ আর পরিণত জীবনের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। নিজের এই ধর্মকে তিনি বলেছেন ‘মানুষের ধর্ম’। ১৯৩০ সনে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে Hubert বক্তৃতায় তিনি Religion of Man নামে এই বক্তৃতা দিয়ে তৎকালীন বিদগ্ধ সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

রবীন্দ্রনাথের মানুষের ধর্ম প্রকৃতপক্ষে পরিণত রবীন্দ্রনাথের দর্শন। একটু একটু করে জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, দুঃখ, আঘাত, নিষ্ঠুরতার মধ্যে তিনি যা অর্জন করেছিলেন। সেই ‘পথের সঞ্চয়’ই তাঁর ৭২ বছর বয়সের রচনা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রাককালে রচিত ‘মানুষের ধর্ম’ প্রবন্ধের ভিত্তি :

‘একদিকে সত্য, অন্যদিকে আনন্দ, মাঝখানে মঙ্গল, তাই এই মঙ্গলের মধ্য দিয়েই আমাদের আনন্দলোকে যেতে হয়।’

রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরের তিনটি রূপের কথা বলছেন সত্যের মধ্যে দিয়ে তাঁর সূচনা, আনন্দের মধ্যে দিয়ে যাত্রা আর মঙ্গলেই তার পরিপূর্ণতা। মানুষের মধ্যে দুই বিপরীত ঐক্য আর দ্বন্দ্বের কথা বলছেন কবি। একদিকে তার প্রকৃতির অন্তর্গত সীমাবদ্ধ সত্তা যেখানে তার স্বাধীন ইচ্ছে নেই বা থাকলেও প্রকৃতির সঙ্গে মিলেই তার জীবনাচরণ। না হলেই অশান্তি, নিয়মভঙ্গ। আবার নিয়মমতো চললে প্রকৃতিতে শান্তি বিরাজিত থাকে। এটিকে বলা যেতে পারে জীবনের সত্য। আবার অন্যদিকে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আনন্দের উপকরণ। আনন্দের এই স্বরূপ দেখি স্বাধীন ইচ্ছা পূরণের মধ্যে। যাহা চাই তাহা পাই এই ইচ্ছা পূরণের আনন্দ। কিন্তু নিজের ইচ্ছা আর অপরের ইচ্ছার মধ্যে কখনও কখনও মিলন নাও হতে পারে। সেখানেই অশান্তি ,বঞ্চনা, নিষ্ঠুরতা, হিংস্রতা।

আবার পরস্পরের ইচ্ছার মধ্যে মিলনের যে আনন্দ, প্রেম, মৈত্রী সেখানেই মঙ্গল বা কল্যাণ পরস্পরের কল্যাণকামনা মঙ্গলচিন্তার ব্রত নেয়া। তাই মানুষের ইচ্ছার সঙ্গে ইচ্ছার মিলন হলেই সমাজে আনন্দস্বরূপ মঙ্গলময়কে পাওয়া যায়। একই সাথে প্রকৃতিতেও ঈশ্বরের শান্ত স্বরূপকে পাওয়া যায় তাই রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর মানবজগতে অবির্ভূত হন মঙ্গল, কল্যাণ আর আনন্দরূপে। আর প্রকৃতি জগতে অবির্ভূত হন শান্ত সৌন্দর্য হিসেবে। তাইতো অনায়াসে বলতে পারেন :

‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর’

অথবা

‘সত্যমঙ্গল প্রেমময় তুমি, ধ্রুবজ্যোতি তুমি অন্ধকারে’

কবির মতে মানবসমাজে কল্যাণ আর প্রকৃতিতে শান্তি প্রতিষ্ঠাতেই ঈশ্বরের প্রকৃত প্রকাশ। এই চিরন্তন সত্য দেশ, কাল, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম, কৃষ্টি সীমারেখাকে অনায়াসে অতিক্রম করে যায়। আজকের পৃথিবীতে যে শোষণ, নিপীড়ন, হিংসা, বিদ্বেষ, অসহনশীলতা, ক্ষমতার দম্ভ, প্রাচুর্যের অশ্লীল প্রদর্শন আর সমস্ত পৃথিবীব্যাপী যে বহুধা বিভক্ত শক্তির প্রদর্শনী এ-সব কিছুর ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের এই মানবধর্মের চাইতে বেশি প্রাসঙ্গিক আর কি কিছু হতে পারে?

কবি গানে সহজ সুরে সহজ কথায় সে কথা বলে যান। অনুসরণ করার উপর নির্ভর করছে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা :

                মোরা      সত্যের ’পরে মন  আজি কবির সমর্পণ।

                                                জয় জয় সত্যের জয়।

                মোরা      বুঝিব সত্য, পূজিব সত্য, খুঁজিব সত্যধন।

                                                জয় জয় সত্যের জয়।

                যদি         দুঃখে দহিতে হয় তবু মিথ্যাচিন্তা নয়।

                যদি         দৈন্য বহিতে হয় তবু মিথ্যাকর্ম নয়।

                যদি         দণ্ড সহিতে হয় তবু মিথ্যাবাক্য নয়।

                                                জয় জয় সত্যের জয় ॥

                মোরা      মঙ্গলকাজে প্রাণ আজি করিব সকলে দান।

                                                জয় জয় মঙ্গলময়।

                মোরা      লভিব পুণ্য, শোভিব পুণ্যে, গাহিব পুণ্যগান।

                                                জয় জয় মঙ্গলময়।

                যদি         দুঃখে দহিতে হয় তবু অশুভচিন্তা নয়।

                যদি         দৈন্য বহিতে হয় তবু অশুভকর্ম নয়।

                যদি         দণ্ড সহিতে হয় তবু অশুভবাক্য নয়।

                                                জয় জয় মঙ্গলময় ॥

                সেই অভয় ব্রহ্মনাম আজি মোরা সবে লইলাম-

                                                যিনি সকল ভয়ের ভয়।

                মোরা করিব না শোক যা হবার হোক, চলিব ব্রহ্মধাম।

                                                জয় জয় ব্রহ্মের জয়।

                যদি         দুঃখে দহিতে হয় তবু নাহি ভয়, নাহি ভয়।

                যদি         দৈন্য বহিতে হয় তবু নাহি ভয়, নাহি ভয়।

                যদি         মৃত্যু নিকট হয় তবু নাহি ভয়, নাহি ভয়।

                                                জয় জয় ব্রহ্মের জয় ॥

                মোরা      আনন্দ-মাঝে মন আজি কবির বিসর্জন।

                                                জয় জয় আনন্দময়।

                                সকল দৃশ্যে সকল বিশ্বে আনন্দনিকেতন।

                                                জয় জয় আনন্দময়।

                                আনন্দ চিত্ত-মাঝে আনন্দ সর্বকাজে,

                                আনন্দ সর্বকালে দুঃখে বিপদজালে,

                                আনন্দ সর্বলোকে মৃত্যুবিরহে শোকে-

                                                জয় জয় আনন্দময় ॥

রবীন্দ্রনাথ মানুষের মধ্যে ধর্মকে খুঁজেছেন; সমাজের কল্যাণে সন্ধান করেছেন। তারপর দেশ, কাল, সমাজের ব্যাপ্তি ছাপিয়ে বিশ্বলোকের মধ্য দিয়ে সমস্ত বিশ্বের কল্যাণের মধ্য দিয়ে তাঁর ধর্মকে আবিষ্কার করেছেন। তাঁর ধর্মের কেন্দ্রে ব্যক্তিসত্তা, বহির্লোকে বিশ্বসত্তা। যে বিশ্বায়নের কথা আজ আমরা বলি, তার সূত্র দিয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ :

                                বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো

                                সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও ॥

নয়কো বনে, নয় বিজনে,    নয়কো আমার আপন মনে-

সবার যেথায় আপন তুমি, হে প্রিয়,    সেথায় আপন আমারও ॥

                                সবার পানে যেথায় বাহু পসারো

                                সেইখানেতেই প্রেম জাগিবে আমারও।

                গোপনে প্রেম রয় না ঘরে,    আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ে-

                সবার তুমি আনন্দধন হে প্রিয়, আনন্দ সেই আমারও ॥

গানের প্রাসঙ্গিকতা

গান নিয়ে কবির যেমন ছিল দুর্বলতা, আবেগ তেমনি ছিল আত্মবিশ্বাস। কী ভীষণ দৃঢ়তায় তিনি বলতে পারেন আমার গান বাঙালিকে গাইতেই হবে। কোথায় পান এই আত্মবিশ্বাস? উনবিংশ শতকের যে-পর্বে কবির আবির্ভাব তখন বাংলাগানের এক যুগ-সন্ধিক্ষণ। একদিকে প্রচলিত নাগরিক সমাজের টপ্পা, কবিগান, তরজা, আখড়াই, হাফ আখরাই, ঢপ কীর্তন প্রভৃতি আপেক্ষাকৃত স্থূল রুচির ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির পরিচয়-বাহক গান বাজনা। আরেক দিকে ব্রাহ্মসমাজের ব্রহ্মআন্দোলনের পথিকৃৎ রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ প্রমুখের উৎসাহ উদ্দীপনায় রচিত নানাধরনের ধ্রুপদাঙ্গের ব্রহ্মসংগীত, আরেক দিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় হিন্দুমেলার উপযোগী উদ্দীপনামূলক জাতীয় সংগীত। বাংলা সংগীতের এই ত্রিভুজ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব।

গীতাঞ্জলি রচনার আগ পর্যন্ত ১৯১০ সালের আগে রচিত কবির সংগীতগুলিকে আমরা এই ত্রিভুজক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে আসা কবির অনন্যপ্রতিভার স্বাক্ষর হিসেবে অনায়াসে গ্রহণ করতে পারি। তাঁর সুর, বাণীছন্দ, তাল, অঙ্গ, প্রকাশ এ সবেরই গীতরূপ আলোচনা করা যেতে পারে অসাধারণ সব সংগীতরচনা (composition) হিসেবে। তাতে নানা বৈচিত্র্য, বহু বৈশিষ্ট্য, রূপ, রস, বর্ণ ও বিবিধ, পূজা, প্রেম, স্বদেশ, বৈষ্ণবভাবনা, ব্রহ্মভাবনা এ সবেরই প্রকাশ দেখি নানাসুরে, নানারাগে, নানাছন্দে, নানাতালে। কিন্তু রবীন্দ্রপ্রতিভার স্বকীয়তার স্বাক্ষর তাতে থাকলেও রবীন্দ্রনাথের দর্শন ও নান্দনিকতার প্রকাশ যে গানে তা কিন্তু গীতাঞ্জলি পরবর্তী যুগে। যখন থেকে তার সমাজ চেতনা, স্বদেশচেতনা এবং ঈশ্বরপ্রেম এসে মিলে গেছে মানুষ আর প্রকৃতিতে। তখন তার গান আর গান থাকে না। হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের নান্দনিকতার স্বরূপ। সেখানেই কবির বিশ্বলোক আর অন্তর্লোকের মিলন হয়। তিনি গেয়ে ওঠেন গান :

‘গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি

তখন তারে চিনি আমি, তখন তারে জানি ॥’

রবীন্দ্রনাথের অবিনশ্বর প্রতিভার স্বাক্ষর তাঁর গান শুরু থেকেই আমাদের জীবনের উপলব্ধি, অনুভূতি, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার সাথী হয়েছে। বাঙালি তাঁর সকল সংকট, সংগ্রাম অতিক্রম করেছে তাঁর গান গলায় ধারণ করে। এ কথা তো সবারই জানা, কেবল গান কেন তাঁর কাব্য, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ বাংলাদেশের বর্তমান প্রাসঙ্গিক সময়ে বহু চর্চিত, বহু আলোচিত। নানান দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের উপর আলোকপাত করা হচ্ছে কিন্তু এ হলো রবীন্দ্র গবেষক বা রবীন্দ্রচর্চাকারী বাঙালির বৃহৎ জনগোষ্ঠীর এক ক্ষুদ্র অংশ। মননশীল রবীন্দ্রনাথ বা মানবধর্মে বিশ্বাসী বিশ্বমানবের সংজ্ঞায় বিশ্বাসী রবীন্দ্রদর্শনের কতটুকু আমরা গ্রহণ করতে পারছি? অসংগতিপূর্ণ, অন্তঃসারশূন্য যে সমাজে বা যে বিশ্বে আমাদের বাস সেখানে রবীন্দ্রগানের ভাবলোকে প্রবেশের পথ কি আমাদের জানা? গান বা কবিতার ক্ষেত্রে শ্রোতা এবং শিল্পী উভয়ই দক্ষতা ও নৈপুণ্যের প্রতি আমরা যতটা যতœশীল রবীন্দ্রনাথের গানকে অধ্যাত্মলোকের সেই সাংস্কৃতিক পরিম-লে ততটা সত্য করে তুলতে পারছি না। এর কারণ প্রয়োজনীয় অধ্যয়ন, পঠন-পাঠনের সুযোগ আমরা গ্রহণ করি না, অন্তরে ধারণ করি না।

শিল্পীর দায়িত্ব কেবল রবীন্দ্রগানের সার্থক রূপায়ণে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এতে করে প্রতিভাবান দক্ষ শিল্পীও  রবীন্দ্রনাথের দর্শন মননকে সত্য করে তুলতে পারবেন না। তাদের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার লক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে আপনার চিত্তকে রবীন্দ্রআদর্শে সাজিয়ে তুলতে হবে। একথাও ঠিক বর্তমান যুগে সারা বিশ্বজুড়ে যে তামসিকতা, মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা, লঘুচাল (Short-cut) ইত্যাদি জীবনকে যেভাবে গ্রাস করছে তাতে গভীরভাবে নিমগ্ন হবার সুযোগ কম। সাধনার পথ ধরে অধ্যাত্মলোকে প্রবেশের সুযোগ নেই। কাজেই নেই রবীন্দ্রনাথে আত্মনিবেদন। তবে এর সমাধানের পথও রবীন্দ্রনাথেই খুঁজে নিতে হয়। প্রতিদিনের যাপিতজীবনের আত্মঅবমাননাকারী, আত্মবিনাশী জীবনকে প্রত্যাখ্যান করে মর্যাদাময় সত্যের ভিত্তির উপর জীবনকে তৈরি করতে হবে। আপনার চিত্তকে সকল রকমের বন্ধতা থেকে মুক্ত করতে হবে। সাথে থাকবেন সেই সর্বকালের রবীন্দ্রনাথ।

আর কেউ থাকুন না থাকুন রবীন্দ্রনাথে নিবেদিত মুক্তমনা, শিল্পীমনা মানুষেরা একাই এগিয়ে যাবেন রবীন্দ্রনাথকে সাথে নিয়ে। শুধু এখন কেন একবিংশ শতককে ছাড়িয়ে আরও দূরকালে, কাল সমুদ্রে আলোর যাত্রী হয়ে :

‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।

একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো রে ॥

যদি কেউ কথা না কয়,ওরে ও অভাগা,

যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে সবাই করে ভয়-

তবে পরান খুলে

ও তুই মুখ ফুটে তোর মনের কথা একলা বলো রে ॥’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares