pijus-kumar-v-1

প্রবন্ধ

হাফিজের কাব্যানুবাদে

নজরুলের স্বকীয়তা

পীযূষ কুমার ভট্টাচার্য্য

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) একজন সফল অনুবাদক হিসেবে স্বকীয়তা তুলে ধরেছেন। নিজের বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন হাফিজের কাব্যানুবাদে প্রস্ফুটিত হয়েছে। নজরুলের হাতে রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ-এর অনুবাদ মোহন সুন্দররূপে ধরা দিয়েছে। ফারসি কবিদের অন্তরের সাথে নজরুলের অন্তরের সখ্য তাঁর হাফিজের রুবাইয়াৎ এর অনুবাদে ফুটে উঠেছে।

মহাকবি হাফিজের আসল নাম শাম্সুদ্দিন মোহাম্মদ। ‘হাফিজ’ তাঁর ‘তখল্লুস’, অর্থাৎ কবিতার ভণিতায় ব্যবহৃত উপ-নাম। যাঁরা সম্পূর্ণ কোরান কণ্ঠস্থ করতে পারেন, তাঁদেরকে কোরআনের ‘হাফিজ’ বলা হয়। হাফিজের জীবনী যাঁরা রচনা করেছেন তাঁদের বর্ণনায় বলা হয়েছে হাফিজ তাঁর পাঠ্যাবস্থায় কোরান কণ্ঠস্থ করেছিলেন। শিরাজ, পারস্যের তীর্থভূমি। শিরাজের মোসল্লা নামক স্থানে মরমি কবি হাফিজ চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে জন্মগ্রহণ করেন। শিরাজের বিশ্বখ্যাতি রয়েছে। ইরানের প্রায় সমস্ত শ্রেষ্ঠ কবিরই লীলা-নিকেতন হলো এই শিরাজ। ইরানবাসী  আদর করে হাফিজকে ‘বুলবুল-ই-শিরাজ’ বা শিরাজের বুল্বুলি বলে সম্ভাষণ করেন। ইরানবাসী শুধু কবি বলে হাফিজকে ভালবাসেন সেটা নয়। তাঁরা হাফিজকে ‘লিসান্-উল্-গায়েব্’ (অজ্ঞাতের বাণী), ‘তর্জমান্-উল্-আসরার’ (রহস্যের মর্মসন্ধানী) বলে বেশি শ্রদ্ধা করেন। হাফিজের পিতা বাহাউদ্দীন, ইস্পাহান নগরী থেকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে শিরাজে এসে বসবাস করেন। তিনি ব্যবসায় উন্নতি করেছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর সময়ে সমস্ত ব্যবসা এমন এলোমেলো করে রেখে যান, যার ফলে শিশু হাফিজ ও তাঁর মা ঐশ্বর্যের হাত থেকে দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে পতিত হন। সে সময় হাফিজকে বাধ্য হয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে  অর্থোপার্জন করতে হয়। কিছু জীবনী-লেখক বলেন, দারিদ্র্যের কারণে হাফিজকে তাঁর মা অন্য একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর কাছে দিয়েছিলেন। সেখানে থেকে হাফিজ পড়াশুনা করার সুযোগ পান। যেভাবেই হোক তিনি যে কবি-খ্যাতি লাভ করার আগে বিশেষরূপে জ্ঞান অর্জন করেন, তাঁর কবিতা পড়েই উপলব্ধি করা যায়। হাফিজের বন্ধু ও তাঁর কবিতাসমূহের (দিওয়ানের) মালাকর গুল্-আন্দামের মতে হাফিজের মৃত্যু হয়েছে ৭৯১ হিজরি বা ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে। হাফিজের কবর আজ ইরানের শুধু জ্ঞানী-গুণীজনের শ্রদ্ধার জায়গা নয়, সকলের কাছে দরগা বা দরবেশের কবর।

নজরুলের জীবনে ফারসি ভাষার প্রতি অনুরাগের উন্মেষ চাচা বজলে করিমের মাধ্যমে। পরবর্তীকালে তাঁর শিক্ষক হাফিজ নুরুন্নবীর অবদানও অনস্বীকার্য। যার পূর্ণতা লাভ পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর সাহিত্য ও সঙ্গীতে।

‘নজরুলের দ্বিতীয় ভাষা ছিল ফারসি। সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন এক পাঞ্জাবি মৌলভির কাছে নজরুল যে কবি হাফিজের কবিতা পাঠ করতে পেরেছিলেন তার ভিত্তিভূমি প্রস্তুতিতে হাফিজ নুরুন্নবীর অবদান অবশ্যই স্বীকার্য।’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র ০১ : পৃষ্ঠা-২১)

নজরুলের সৈনিক জীবন তাঁকে কাব্য ও জ্ঞান চর্চার সুযোগ এনে দিয়েছিল। ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ১লা আষাঢ় কলকাতায় রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ-এর মুখবন্ধ লেখেন স্বয়ং নজরুল। সেই মুখবন্ধ থেকে জানা যায় :

‘আমি তখন স্কুল পালিয়ে যুদ্ধে গেছি। সে আজ ইংরেজি ১৯১৭ সালের কথা। সেই খানে প্রথম আমার হাফিজের সাথে পরিচয় হয়। আমাদের বাঙালি পল্টনে একজন পাঞ্জাবি মৌলবী সাহেব থাকতেন। একদিন তিনি দীওয়ান-ই-হাফিজ থেকে কতকগুলি কবিতা আবৃত্তি  ক’রে শোনান। শুনে আমি এমনই মুগ্ধ হয়ে যাই যে, সেইদিন থেকেই তাঁর কাছে ফার্সি  ভাষা শিখতে আরম্ভ করি। তাঁরই কাছে ক্রমে ফার্সি কবিদের প্রায় সমস্ত বিখ্যাত কাব্যই প’ড়ে ফেলি। ’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র ০২ : পৃষ্ঠা-২৩)

নজরুল মধ্যপ্রাচ্যে দৈহিকভাবে না গিয়ে থাকলেও পারস্যে তাঁর মানসিক ভ্রমণ হয় করাচি সেনানিবাসে ফারসি কাব্যপাঠের মাধ্যমে। তাঁর ‘আরব সাগরের বিজন বেলায়’ বসে লেখা ‘সালেক’ গল্পে কবি হাফিজের সাথে কাল্পনিক পরিচয়-কাহিনি লিপিবদ্ধ রয়েছে :

‘বমে সাজ্জাদা রঙ্গিন কুন্ গরৎ পীরে মাগাঁ গোয়েদ!

কে সালেক বেখবর না বুদ্ জেরাহোরসমে মঞ্জেল হা’

‘জায়নামাজে শারাব-রঙিন্ কর্ , মুর্শেদ বলেন যদি!

পথ দেখায় যে, জানে সে যে, পথের কোথায় অন্ত আদি’

সৎমা-তাড়ানো মাতৃহারা মেয়ের মত অশ্রু আর অভিমান-আর্দ্র মুখে একটা ভারি কালো মেঘ সব ঝাপসা, ক্রমে অন্ধকার ক’রে দিলে। কাজী সাহেব প্রাণের বাকি সমস্ত শক্তিটুকু একত্রে ক’রে ভাঙ্গা গলায় বললেন, ‘কে? ওগো পথের সাথী  তুমি কে?’ অনেকক্ষণ কিছু শোনা গেল না! নদীর নিস্তব্ধ তীরে তীরে দুলে গেল আর্তগম্ভীর প্রতিধ্বনি, ‘তু – মি – কে?’ খেয়া পার হ’তে খুব মৃদু একটা আওয়াজ কাঁপতে কাঁপতে কয়ে গেল ‘মাতাল হাফিজ!’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র ০৩ : পৃষ্ঠা-১৫৩-১৫৪)

সে সময় করাচির সেনা জীবনে সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি কলকাতার সাহিত্য জগতের সাথে তাঁর ভাল যোগাযোগ ছিল।

নজরুল তাঁর সেনাজীবনে  হাফিজ ও অন্যান্য বিখ্যাত ফারসি কবিদের কবিতা পড়ার সুযোগ পান। সে সময় ফারসি ভাষা শেখা এবং ফারসি কবিদের প্রায় সব বিখ্যাত কাব্য পড়ে চুপচাপ বসে থাকেন নি। তিনি হয়তো সে সময় ফারসি কবিতা থেকে কিছু অনুবাদ করে থাকবেন। তাঁর মধ্যে সে সময় প্রবলভাবে যে ইচ্ছাটি দেখা দেয় তা হলো ‘দীওয়ান’ অনুবাদের। নজরুলের প্রথম অনুবাদ হাফিজের কবিতা ও গজল। তাঁর এই অনুবাদের প্রকৃতি বিভিন্ন- কোনটি ভাবানুবাদ, কোনটি মূলানুবাদ, আবার কোনটি কিঞ্চিত অনুসৃতি মাত্র। তিনি সব সময় মূলের প্রতি অনুবর্তী থাকতে চেয়েছেন। হাফিজের অনুবাদের পেছনে সক্রিয় ছিলো তাঁর সৌন্দর্যের চেতনা, রসবোধ এবং বাঙালিয়ানার অনুভব। তিনি কয়েক বছর পরে হাফিজের দীওয়ান অনুবাদের কাজে হাত দেন। সেগুলো হাফিজের রুবাইয়াৎ নয়- গজল- অনুবাদ করেন। সেই অনূদিত গজলের সংখ্যা হলো ত্রিশ-পঁয়ত্রিশটি। নজরুলের নিজের বক্তব্য থেকে জানা যায় তাঁর ধৈর্যের অভাবে ঐখানেই ইতি হয়ে যায়। ‘এই অনুবাদগুলো প্রবাসী, মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান- সাহিত্য-পত্রিকা, কল্লোল প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র ০৪ : পৃষ্ঠা-২৫৪)

নজরুল তাঁর অনুবাদ-দক্ষতায় হাফিজের কবিতা ও গজল তাঁর (হাফিজের ) ভাব ঐশ্বর্যে তুলে ধরেছেন। অনুবাদের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বাধীনতা নিয়ে থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই মূলভাব ও মূলের ধ্বনি-মাধুর্য রাখতে চেয়েছেন। হাফিজের মধ্যে তিনি বাঙলার সবুজ দূর্বা ও জুঁই ফুলের সুবাস পেয়েছেন। তার মধ্যে তিনি আরও পেয়েছেন প্রিয়ার চূর্ণ কুন্তলের যে মৃদু গন্ধের সন্ধান সে সবই তো খাঁটি বাংলার কথা, বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, আনন্দরসের পরিপূর্ণতা।

নজরুল স্বয়ং প্রকাশ করেছেন, ‘পরবর্তী এস. সি. চক্রবর্তী এন্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী মহাশয়ের জোর তাগিদে এর অনুবাদ শেষ করি।’ তিনি তাঁর শিশু পুত্র বুলবুলের শয্যা পাশে বসে হাফিজের রুবাইয়াৎ এর অনুবাদ আরম্ভ করেন। যেদিন শেষ হয় সেদিনই তাঁর পুত্র মারা যান। উৎসর্গে তাঁর মৃত সন্তান বুলবুলের উদ্দেশ্যে লিখেছেন :

‘বাবা বুলবুল !

তোমার মৃত্যু-শিয়রে ব’সে  ‘বুলবুল্-ই-শিরাজ’ হাফিজের রুবাইয়াতের অনুবাদ আরম্ভ করি। যেদিন অনুবাদ শেষ ক’রে উঠলাম, সেদিন তুমি আমার কাননের বুলবুলি- উড়ে গেছ ! যে দেশে গেছ তুমি, সে কি বুলবুলিস্তান ইরানের চেয়েও সুন্দর? জানি না তুমি কোথায় ! যে লোকেই থাক, তোমার শোক-সন্তপ্ত পিতার এই শেষ দান শেষ চুম্বন ব’লে গ্রহণ ক’রো। তোমার চার বছরের কচি গলায় যে সুর শিখে গেলে, তা ইরানের বুলবুলিকেও বিস্ময়ান্বিত ক’রে তুলবে।

শিরাজের বুলবুল-কবি হাফিজের কথাতেই তোমাকে স্মরণ করি,

       ‘সোনার তাবিজ রূপার সেলেট

                         মানাত না বুকে রে যার,

      পাথর চাপা দিল বিধি

                         হায়, কবরের শিয়রে তার।’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র : পূর্বোক্ত : পৃষ্ঠা-২১)

বাংলা ভাষায় নজরুল ব্যতীত অন্যান্য যাঁরা হাফিজের কাব্যের অনূবাদ করেছেন তাঁরা হলেন-কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার (১৮৩৪-১৯০৭), কান্তিচন্দ্র ঘোষ (১৮৮৬-১৯৪৮), অজয় কুমার ভট্টাচার্য্য (১৯০৬-১৯৪৩), নরেন্দ্র দেব (১৮৮৮-১৯৭১) প্রমুখ। কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের সদ্ভাবশতক অর্থাৎ সদ্ভাবপূর্ণ কবিতাকলা (১লা ফাল্গুন, ১৭৮২ শক, ১৮৬১) কবিতাগ্রন্থের বেশিরভাগ কবিতাই হাফিজ ও সাদির ফারসি কবিতার ভাবানুবাদ। সদ্ভাবশতক-এর কবিতার উপাদান মূলত হাফিজের দীওয়ান থেকে গৃহীত। যে সব কবিতা মূলত হাফিজের মর্মানুবাদ সে গুলোতে তাঁর ভণিতা দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে :

‘বিরহ-বারিধি-নীরে জীবনের তরি

ডুবিল ডুবিল আহা ! প্রাণে মরি মরি।

কেঁদ না হাফেজ বল কি ফল রোদনে?

কমল কোথায় কন্টক বিহনে?’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র : পূর্বোক্ত পৃষ্ঠা-২৫৬)

pijus-kumar-v-2

নজরুল হাফিজের রুবাইয়াৎ এর অনুবাদক হলেও তিনি প্রথম অনুবাদক ছিলেন না। স্বয়ং অজয় কুমার ভট্টাচার্য্য তাঁর  রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ গ্রন্থে কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত নিবেদনে নিজেকে প্রথম অনুবাদক হিসেবে নিবেদনে লিখেছেন-‘ আমি যতদূর জানি তাহাতে মনে হয়, আমার এই অনুবাদই হাফিজের সর্বপ্রথম অনুবাদ। ’ গ্রন্থটির প্রকাশকাল দেওয়া হয়েছে শ্রীপঞ্চমী, ১৩৩৬ সাল (১৯৩০)। নজরুল মূল ফারসি থেকে অনুবাদ করেছেন। কিন্তু অজয় কুমার ভট্টাচার্য্য সৈয়দ আবদুল মজিদ ও এন. ক্রানমার-বিঙ এর অনুবাদ অবলম্বনে মূল ৬৫ টি রুবাইয়াৎ এর অনুবাদ করেছেন। তিনি মিল দিয়েছেন ককখখগগ। প্রকৃতপক্ষে তিনি তৃতীয় পংক্তিকে ভেঙ্গে দুটো ছোট পংক্তি করে তাদের অন্ত্যমিলের ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর অনুবাদে স্বরবৃত্ত ছন্দ ব্যবহারের মাধ্যমে যথেষ্ট গতি অনুভব করা যায়। উদাহরণ হিসেবে তাঁর অনুবাদের ১ নং রুবাইয়াৎ এর অনুবাদটি তুলে ধরা হলো :

‘ঐ যে গোলাপ জাগ্লে সুখে; –

                 ফুটল হাসি গুল্ব গের।

ফুল-পিয়ালা পূর্ণ হল; –

                 শুনছি বাঁশী নওরোজের।

    তরুণ সাকীর সরব-সুধা

    মিটায় যাহার মনের ক্ষুধা-

সুখের নেশায় বিভোর সে যে,-

                 রইল কোথায় দুঃখ তার?

রক্ত নাচে রুদ্রতালে,-

                 বন্দী সে কি থাকবে আর? ’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র : পূর্বোক্ত পৃষ্ঠা-২৫৬)

কান্তিচন্দ্র ঘোষ তাঁর রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ  গ্রন্থে ৭৫ টি রুবাইয়াৎ এর অনুবাদ করেছেন। তিনি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন। কান্তিচন্দ্র ঘোষের অনুবাদে স্বরবৃত্ত ছন্দ প্রযুক্ত হয়েছে। তাঁর অনুবাদে অন্ত্যমিল দিয়েছেন ককখখ। তাঁর অনুবাদে ঐতিহ্যের রূপ রক্ষিত না হলেও স্বাচ্ছন্দ্য ও গতিশীলতার অভাব নেই। তাঁর ২৬ নং রুবাইয়াৎটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হলো :

 ‘সাকীর সাথে স্বপ্ন রচন নদীর ধারে বসে

খেয়ালটা সেই মিটিয়ে নে গো-স্মৃতিটি যাক খসে।

ফুলের মতই প্রাণের আভাস- দিন কয়েকের নেশা

সেই কটা দিন পেয়ালা ভরে হাসির সঙ্গে মেশা ! ’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র : পূর্বোক্ত পৃষ্ঠা-২৫৭)

নজরুল বলেন, ‘হাফিজকে আমরা কাব্য-রস পিপাসুর দল কবি বলেই সম্মান করি, কবি-রূপেই দেখি। তিনি হয়ত বা সুফি-দরবেশও ছিলেন। তাঁর কবিতাতেও সে আভাস পাওয়া যায় সত্য। শুনেছি, আমাদের দেশেও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশব সেন প্রভৃতি হাফিজের কবিতা উপাসনা-মন্দিরে আবৃত্তি করতেন। তবু তাঁর কবিতা শুধু কবিতাই। তাঁর দর্শন আর ওমর খৈয়ামের দর্শন প্রায় এক।’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র ০২ : পৃষ্ঠা-২৬)

নজরুল হাফিজের রুবাইয়াৎ অনুবাদ করেছেন মূল ফারসি থেকে। তাঁর কাছে যে কয়টি ফারসি দীওয়ান-ই-হাফিজ ছিল তার প্রায় সবকটিতেই ৭৫ টি রুবাইয়াৎ দেখতে পান। কিন্তু ফারসি সাহিত্যের বিশ্ববিখ্যাত সমালোচক ব্রাউন সাহেব তাঁর History of Persian Literature-এ এবং মৌলানা শিব্লী নৌমানী তাঁর শেয়রুল-আজম-এ মাত্র ৭৯ টি রুবাইয়াৎ এর উল্লেখ করেছেন। তাঁরা দু’জনই ফারসি কবি ও কাব্য সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ। নজরুল মনে করেন তাঁদের ধারণা ঠিক। তিনি হাফিজের মাত্র দুইটি রুবাইয়াৎ বাদ দিয়েছেন। সব রুবাইয়াৎ এর আসল সুরের সাথে এই দুইটি রুবাইয়াৎ এর কোন মিল নেই বলে তিনি মনে করেন। নজরুলের কাছে এই দুইটি রুবাইয়াৎ এর আগাগোড়া শারাব, সাকি, হাসি, আনন্দ, বিরহ ও অশ্রুর মধ্যে এই উপদেশের সুর তাঁর কাছে সামঞ্জস্য মনে হয় নি। তাঁর কাছে কালের  বা সময়ের মাতা ই বা কে, পিতা ই বা কে, সঠিকভাবে কিছু বুঝতে পারা যায় না। তাই তিনি এ দুটি রুবাইয়াৎ তাঁর অনূদিত গ্রন্থের মুখবন্ধে তুলে ধরেছেন :

০১.  ‘জমায় না ভিড় অসৎ এসে

               যেন গো সৎলোকের দলে।

পশু এবং দানব যত

               যায় যেন গো বনে চ’লে।

আপন উপার্জনের ঘটায়

হয় না উপার্জনের মুগ্ধ কেহ,

আপন জ্ঞানের গর্ব যেন

               করে না কেউ কোনো ছলে।

০২. কালের মাতা দুনিয়া হ’তে,

পুত্র, হৃদয় ফিরিয়ে নে তোর !

যুক্ত ক’রে দে রে উহার

               স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ ওর।

হৃদয়ে রে, তুই হাফিজ সম

হ’স যদি ওর গন্ধ-লোভি,

তুইও হবি কথায় তথায়

               দোষগ্রাহী, অম্নি কঠোর ! ’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র : পূর্বোক্ত : পৃষ্ঠা-২৪ ও ২৫)

নজরুলের রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজের অনুবাদ ১৩৩৭ জ্যৈষ্ঠের ‘জয়তী’তে প্রথম প্রকাশিত হয়। সেখানে ১০ টি রুবাইয়াৎ প্রকাশিত হয়। সে রুবাইয়াৎগুলো হলেন ৬,৭, ৮, ১২, ১৫, ৩২, ৪১, ৪৯, ৫৩ ও ৫৪। ‘জয়তী’তে’ ছাপা ৫৪ নম্বর রুবাইয়াৎটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হলো :

‘তোমার বিরহে গো আমি

           কাঁদি মোমের বাতির চেয়ে।

আরক্তধার অশ্রু ঝরে

          নদের কুঁজোর মতো বেয়ে,

পান-পেয়ালার মতো আমি,

হৃদয় যখন কৃপণ হেরি

দূর বাঁশরির বিলাপ শুনে,

          রক্ত ধারায় উঠি ছেয়ে  ॥ ’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র : পূর্বোক্ত পৃষ্ঠা-১৮৯)

নজরুলের ১৩৩৭ বঙ্গাব্দে আষাঢ় মাসে রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ-এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়, প্রকাশক, শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী এন্ড সন্স, ২১, নন্দকুমার চৌধুরী লেন, কলকাতা, মূল্য-২ টাকা। তিনি সংস্করণ গ্রন্থে ৩ টি রুবাইয়াৎ এ সামান্য পরিবর্তন করেছেন। সেই ৩ টি রুবাইয়াৎ হলো-৩২, ৪১ ও ৫৩। তিনি ১৩৩৭ আষাঢ়ের সওগাতে একটি সুদীর্ঘ কবিতা লেখেন। কবিতাটির শিরোনাম হলো ‘শাখ-ই-নবাত’। নজরুল কবিতাটির আখ্যার নীচে বন্ধনীর মধ্যে বলেন :

‘শাখ-ই-নবাত’ বুলবুল-ই-শিরাজ কবি হাফিজের মানসী প্রিয়া ছিলেন। ‘শাখ-ই-নবাত’ -এর অর্থ হলো-আঁখের শাখা। কবিতাটির প্রথম শ্লোক তুলে ধরা হলো :

‘শাখ-ই-নবাত ! শাখ-ই-নবাত ! মিষ্টি রসাল ‘ ইক্ষু-শাখা ’!

বুলবুলিরে গান শেখাল তোমার আাঁখি সুর্মা-মাখা’। ’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র : পূর্বোক্ত : পৃষ্ঠা-১৮৯)

হাফিজের সৃষ্টির উল্লেখযোগ্য দিক ফুটে উঠেছে তাঁর কাব্য ‘শাখ্-ই-নবাত্’ নামে কোনো ইরানি সুন্দরীর স্তবগানে মুখরিত হয়ে। অনেকের মতে এই নামটি হাফিজের দেয়া এবং ‘শাখ্-ই-নবাত্ ’ তাঁর প্রিয়া ছিলেন। আবার অনেকে মনে করেন হাফিজের সাথে তাঁর পরিণয় হয়। নজরুলের কাছে যেভাবে ধরা দেয় :

‘হাফিজের সমস্ত কাব্য ‘শাখ্-ই-নবাত্’ নামক কোনো ইরানী সুন্দরীর স্তবগানে মুখরিত। অনেকে বলেন, ‘শাখ্-ই-নবাত্’ হাফিজের দেওয়া আদরের নাম। উহার আসল নাম হাফিজ গোপন করিয়া গিয়াছেন। কোন্ ভাগ্যবতী এই কবির প্রিয়া ছিলেন, কোথায় ছিল তাঁর কুটির, ইহা লইয়া অনেকে অনেক জল্পনা-কল্পনা করিয়াছেন। রহস্য-সন্ধানীদের কাছে এই হরিণ-আঁখি সুন্দরী  আজো রহস্যের অন্তরালেই রহিয়া গিয়াছেন। কেহ কেহ বলেন, এই  শাখ্-ই-নবাতের  সহিতই  হাফিজের বিবাহ হয় এবং হাফিজের জীবিতকালেই তাঁহার মৃত্যু হয়। কিন্তু কোনো জীবনী-লেখকই একথা নিশ্চিতরূপে বলিতে পারেন নাই। ’

  (তথ্য-উপাত্ত সূত্র : পূর্বোক্ত পৃষ্ঠা-৫৯)

নজরুল তাঁর অনূদিত রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ গ্রন্থে যে ৭৩ টি রুবাইয়াৎ অনুবাদ করেছেন আমার এই স্বল্প পরিসরের লেখায় প্রতিটি রুবাইয়াৎ এর পূর্ণাঙ্গ রূপ তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি রুবাইয়াৎ এর প্রথম লাইন তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো :

‘১. তোমার ছবির ধ্যানে, প্রিয়, ২.আমার সুখের শত্রু হ’তে ৩. র্কল আড়াল তোমার থেকে ৪. আমার সকল ধ্যানে জ্ঞানে ৫. আন্তে বল পেয়ালা শারাব ৬. ভাব্নু, যখন করছে মানা ৭. বিশ্বে সবাই তীর্থ-পথিক ৮. তোমার আকুল অলক-হানে ৯. ভিন্ন থাকার দিন গো আমার ১০. আমার পরান নিতে যে চায় ১১. রক্ত-রাঙা হ’ল হৃদয় ১২. রবি, শশী, জ্যোতিষ্ক সব ১৩. যে দিন হ’তে হৃদয়-বিহগ ১৪. আমার করে তোমার অলক ১৫. তোমার পথে মোর চেয়ে কেউ ১৬. দল্তে হৃদয় ছল্তে পরান ১৭. পরান ভরে পিয়ো শারাব, ১৮. আয়না তোমার আত্মার গো – ১৯. রঙিন মিলন-পাত্র প্রথম ২০. তোমার মুখের মিল আছে, ফুল, ২১. আপন ক’রে বাঁধতে বুকে ২২. সোরাই-ভরা রঙিন্ শারাব ২৩. তোমার হাতের সকল কাজে ২৪. কুঁড়িরা আজ কার্বা-বাহী ২৫. কুন্তলেরি পাকে প্রিয়ার- ২৬. চাঁদের মত রূপ গো তোমার ২৭. রূপসীরা শিকার করে ২৮. তোমার ডাকার ও-পথ আছে ২৯. যেদিন আমায় করবে সুদূর ৩০. দাও মোরে ঐ গেঁয়ো মেয়ের ৩১. পূর্ণ কভু করে নাকো ৩২. মদ-লোভীরে মৌলভী কন, – ৩৩. তারি আমি বান্দা গোলাম, ৩৪. হয় না ধরার বিভবরাশি ৩৫. আনন্দ আর হাসি-গানের ৩৬. র্দবেশ আমার সামনে এল ৩৭. বিষাদ-ক্ষীণ এ অন্তরে মোর ৩৮. বিশ্বাসেরে মেরে হ’ল ৩৯. ক্ষত হৃদয় যেমন চাহে ৪০. কি লাভ, যখন দুষ্ট ভাগ্য ৪১. সকল কিছুর চেয়ে ভাল ৪২. আয়ুর মরু বেয়ে এলো ৪৩. আল্তো ক’রে আঙুল রেখে ৪৪. বিনিদ্র কাল কাট্ল নিশি ৪৫. বীরত্ব শেখ্ ‘ খয়বরী ’ – দ্বারা ৪৬. প্রিয়া তোমায় দেছে দাগা? ৪৭. ‘ বাবিলনের ’ যাদু বুঝি ৪৮. দেখ্ রে বিকচ ফুলকুমারীর ৪৯. বুকে হ’তে তার পিরান খোলে ৫০. মোমের বাতি ! পতঙ্গে এ ৫১. কে দেখেছে সরল মনের ৫২. সেই ভালো মোর-এই শারাবের ৫৩. আনন্দের ঐ বিহগ-পাখার ৫৪. কাঁদি তোমার বিরহে গো ৫৫. পরান-পিয়া! কাটাই যদি ৫৬. আলিঙ্গন ও চুম্বন হায় ৫৭. দয়িত মোর ! অল্পে এত ৫৮. দুঃখ ছাড়া এ-জীবনে ৫৯. আমায় প্রবোধ দেওয়ার তরে, ৬০. আর কতদিন করবে, প্রিয়, ৬১. কোরান হাদিস্ সবাই বলে- ৬২. চন্দ্র সূর্য রাত্রি দিবা ৬৩. মদের মত কি আর আছে ৬৪. পাতার পর্দানশীল মুকুল, ৬৫. আশ্বাসেরই বাণী তোমার ৬৬. তোমার আঁখি জানে যাহা ৬৭. দাও এ হাতে, ফুর্তি শিকার ৬৮. হায় রে, আমার এ বদ্নসিব ৬৯. ফুল্লমুখী দিল্-পিয়ারী, ৭০. শাহী তখতে বসেছে ফুল- ৭১. বন্দী বোঁটায় কইল কুসুম, ৭২. সেও এ মন্দ-ভাগ্য সম ৭৩. ওরে হাফিজ, শেষ কর্ তোর।’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র :  পূর্বোক্ত : পৃষ্ঠা-২৯ থেকে ৫৩)

রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ প্রথম সংস্করণের শেষে নিম্নলিখিত শব্দার্থমালা মুদ্রিত হয়। সেই সমস্ত শব্দার্থমালা তুলে ধরা হলো :

‘বে-দিল-হৃদয়হীন। মুসাফির-পথিক। বান্দা-দাস। রৌশনী-ঔজ্জ্বল্য। আনার-কলি-ডালিম কুঁড়ি। মত্ত-উন্মত্ত। লহমা-নিমেষ। ইমানদারী-বিশ্বাস-জনক। দেওয়ানা-পাগল। শিরীন্-মিষ্টি। কার্বা-রৌপ্যপাত্র। নার্গিস-Narcissus. এক প্রকার ইরানী ফুল। ইরানি কবিরা ইহার সহিত সুন্দরীদের চোখের তুলনা দেন। নজরানা-উপহার। দিল-পিয়ারা-হৃদয়েশ্বরী। দিল-দরদী-ব্যথার ব্যথী, হৃদয়ের সাথী। দিল-রুবা-এক প্রকার তারের বাদ্যযন্ত্র। খয়বরী-দ্বার ভগ্ন-কারী আলী-আলী হজরত মোহাম্মদের জামাতা। ইনি সে যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর ছিলেন। কথিত আছে, ‘খয়বর’ প্রদেশ অধিকারের সময় ইনি উহার দুর্গ-দ্বার হাত দিয়া ভাঙিয়া ফেলিয়াছিলেন। কুনবরের বাদশা-আরবের বিখ্যাত দান-বীর ছিলেন। বাবিলনের যাদু-আরবি ও ইরানিরা বলে, বাবিলনই সকল যাদুর আদি জন্মভূমি। আব-ই-হায়াত- মৃত-সঞ্জীবনী-সুধা। গোরি-গৌরবর্ণা তন্বী। হাদিস্-মোহাম্মদের বাণী। বেহেশ্ত্-স্বর্গ। হারাম-নিষিদ্ধ। শাহী তখত- সম্রাটের সিংহাসন। শিরাজী- শিরাজে প্রস্তুত দ্রাক্ষারস।’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র : পূর্বোক্ত : পৃষ্ঠা-১৯০)

নজরুল তাঁর হাফিজের কাব্যানুবাদে স্বকীয়তা দেখিয়েছেন মূলরূপটি অক্ষুণ্ন রাখার মাধ্যমে। তিনি সাধারণভাবে প্রথাগত চতুষ্পদীর অন্ত্যমিল দিয়েছেন ককখক। নজরুল কিন্তু রুবাইয়াৎ এর রূপানুসারে তৃতীয় পঙক্তিকে একটানা রাখেন নি। তৃতীয় পঙক্তিটিকে ভেঙে দুটো ক্ষুদ্র পঙক্তিতে সাজিয়ে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্ত্যমিল দিয়ে তিনি বাংলা কবিতার রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। উদাহরণ হিসেবে ৩১ নং রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ তুলে ধরা হলো :

‘পূর্ণ কভু করে নাকো

       সুন্দর-মুখ দিয়ে আশা।

প্রেমের লাগি’ যে বিবাগী-

       ভাগ্য তাহার সর্বনাশা।

প্রিয়া তব লক্ষ্মী সতী

তোমার মনের মূর্তিমতী?

প্রেমিক-দলের নও তুমি কেউ,

      পাওনি প্রিয়া-ভালোবাসা ॥ ’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র : পূর্বোক্ত : পৃষ্ঠা-৩৯)

নজরুলকে হাফিজের জীবন উপভোগের আগ্রহ ও প্রেমতৃষ্ণা এক নব দিগন্তে আকর্ষণ করে। এ কাব্যে বাংলাদেশের যৌবনপ্রেমের তিনি সন্ধান পান। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে এক পত্রে নজরুল লিখেছেন যা তা তুলে ধরা হলো :

‘…পারসিক কবি হাফিজের মধ্যে বাঙলার সবুজ দূর্বা ও জুঁই ফুলের সুবাস আর প্রিয়ার চূর্ণকুন্তলের যে মৃদু গন্ধের সন্ধান পেয়েছি, সে সবই তো খাটি বাঙলার কথা, বাঙালীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, আনন্দরসের পরিপূর্ণ সমারোহ। … বাঙালীর সচেতন মনে মানুষের ভাবজীবনের এই একাত্মবোধ যদি জাগাতে পারে তবে নিজেকে ধন্য মনে করব ।’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র ০৪ : পৃষ্ঠা-২৫৭)

১৩৩৭ সালের (১৯৩০) বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা সওগাত এ নজরুলের রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ-এর প্রশংসা করে একটি লেখা প্রকাশিত হয়। লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হলো :

‘কবি হাফিজের অপরিমেয় প্রতিভা, তাঁহার রুবাইয়াৎ অনুবাদ করিয়াছেন কবি নজরুল ইসলাম, তাঁহারও প্রতিভা আমাদের প্রশংসার অনেক উর্দ্ধে। একজন মরমী কবি ভিন্ন ভাষাভাষী আর একজন মরমী কবির অন্তরকে নিজের অন্তরে বসাইয়া বাংলা কাব্যে তাঁহার পরিচয় পরিস্ফুট করিয়া তুলিয়াছেন। … কবি মূল পারসী হইতে রুবাইগুলির তর্জমা করিয়াছেন এবং মূল পারসীর যে ছন্দ, অনুবাদে তাহা অক্ষুণœ রাখিয়াছেন। কবির এ কৃতিত্বের মহিমা কেবল সমঝদার পাঠকই সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করিতে পারিবেন। হাফিজের রুবাইয়াতের অনুবাদ কবি নজরুল ইসলামের হাতে যেরূপ মোহন সুন্দররূপে ফুটিয়াছে, বাংলা অন্য কোনো কবির হাতে সেরূপ ফুটিতে পারিত না, ইহাই আমাদের বিশ্বাস। কারণ পারসী কবিদের অন্তরের সহিত তাঁহার অন্তরের পরিচয় যেমন নিবিড় তেমন আর কাহারো নহে। মুখবন্ধে হাফিজের সম্বন্ধে সাধারণভাবে কিছু মন্তব্য করিয়া এবং উপসংহারে হাফিজের জীবনী দিয়া কবি নজরুল অনুবাদখানিকে আরো মনোরম, আরো উপভোগ্য করিয়াছেন। মোটের উপর আমরা এ কথা জোর করিয়াই বলিতে পারি যে, রসিক পাঠক এই অনুবাদখানি পড়িয়া অপূর্ব আনন্দ রসে অভিষিক্ত হইবেন।’

(তথ্য-উপাত্ত সূত্র : পূর্বোক্ত পৃষ্ঠা-২৫৭ )

সমালোচক ও অনুবাদ-বিশেষজ্ঞদের মতে হাফিজের অনুবাদে নজরুলের স্বকীয়তা অধিকতর সফল পাশাপাশি কাব্যশিল্পগুণসম্পন্ন।  তাই নজরুল-বিশেষজ্ঞ আবদুল কাদির লিখেছেন (নজরুল প্রতিভার স্বরূপ, পৃষ্ঠা-২২৮) : ‘তবে এ বিষয়ে সন্দেহ নাই যে, নজরুলের অনুবাদ ছন্দঃপ্রসাদে অধিকতর গতিশীল এবং মূলের দিক থেকেও অনেক বেশী নির্ভরশীল।’

(সূত্র : মানবর্দ্ধন পাল : গ্রন্থোৎসর্গে নজরুলমানস, পৃষ্ঠা-১৭১)

নজরুল তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনে অনুবাদে আগ্রহী থাকায় রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ, কাব্য আমপারা  ও রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম অনুবাদ করার পাশপাশি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাষার কবিদের কিছু কবিতা অনুবাদ করেন। যেমন : ‘কাবুলী-কবি খোশহাল খানের স্ত্রীর একটি কবিতা-‘ বিরহ-বিধুরা ’ (পূবের হাওয়া), ফারসি কবি জালালউদ্দীন রুমী (১২০৭-’৭৩)র একটি কবিতা-‘বাঁশীর ব্যথা ’ (নির্ঝর), শেলীর একটি কবিতা-(‘Mask of Monarchy’-এর অংশ বিশেষ), ‘জাগর-তূর্য’ (ফণি-মনসা), হুইটম্যানের একটি কবিতা- (‘Pioneers! O Pioneers’), ‘অগ্র-পথিক’ (জিঞ্জীর) উল্লেখযোগ্য। তাঁর এ কবিতাগুলো রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ, কাব্য আমপারারুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম-এর মতো মূলানুগ নয়। এগুলোতে মূলের আনুগত্য অনেক শিথিল। নজরুলও এগুলো প্রকাশের সময় এগুলোর শীর্ষটীকা বা পাদটীকায় মূলের ‘ভাব-অবলম্বনে’ বা ‘অনুসরণে ’রচিত বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন, বিরহ-বিধুরা মোসলেম ভারতে প্রকাশকালে (মাঘ, ১৩২৭) পাদটীকায় লেখা হয়, ‘কাবুলী কবি খোশহাল’-এর হিন্দুস্থানে নির্বাসনকালীন তাঁহার সহধর্মিণীর লিখিত একটি কবিতার ভাব অবলম্বনে।’ জাগর-তূর্য গণবাণীতে প্রকাশকালে ( বৈশাখ, ১৩৩৪ ) শীর্ষটীকায় লেখা হয়, ‘শেলীর ভাব অবলম্বনে’, ‘অগ্র-পথিক’ সওগাত-এ প্রকাশকালে লেখা হয়, ‘হুইটম্যানের অনুসরণে’

(সূত্র : আবু হেনা আবদুল আউয়াল : নজরুলের সাহিত্যচিন্তা ও তাঁর সাহিত্য, পৃষ্ঠা-১০৭)

নজরুল মূল ফারসি থেকে সরাসরি অনুবাদ করায় তাঁর অনুবাদে অন্যান্য অনুবাদকদের চেয়ে ঋদ্ধ। পাশাপাশি মূলভাব ও ভাষা, ছন্দ ও প্রকাশভঙ্গি সমন্বিত রূপের ফলে অন্যান্য অনুবাদকদের অনুবাদের চেয়ে তাঁর অনুবাদ শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে বলে চিত্তে লালন করি। তাঁর অনুবাদে মৌখিক ভাষার ছন্দ বা স্বরবৃত্ত ছন্দ ব্যবহার করায় তা বিশেষভাবে সাবলীল হয়ে ওঠে। হাফিজের অনুবাদে আরবি, ফারসি, ইংরেজি, তুর্কি, হিন্দি,চলতি ও গ্রাম্য বাংলা শব্দ অত্যন্ত সুন্দর ভাবে ব্যবহার করেন। আরবি ও ফারসি শব্দ বাংলায় খুব অন্তরঙ্গভাবে ব্যবহৃত হয়ে অনুবাদের শক্তি ও ঐশ্বর্য বৃদ্ধি  করেছে। তিনি চলতি বাংলা শব্দ নৈপুণ্যের সাথে ব্যবহার করে হাফিজের অনুবাদকে সহজ, সুন্দর, পরিমার্জিত ও সাবলীল করে তোলেন। চিত্তভূমিতে লালন করি নজরুল হাফিজ চর্চায় জড়িত হয়ে আমাদেরকে অমৃত রসে ভরিয়ে দিয়েছেন। নজরুল তাঁর অসাধারণ প্রতিভার অবদানে বাঙালিকে চিরঋণী করেছেন। বাংলার সাহিত্যকুঞ্জ তাঁর প্রাণের রঙে আলোর মহিমায় প্রোজ্জ্বল। মরমী কবি হাফিজের যোগ্য প্রতিভা সূচারুরূপে তুলে ধরেছেন আমাদের প্রিয় কবি নজরুল। নজরুলের অনুবাদের পূর্বেও হাফিজ বাঙালির কাছে প্রিয় কবি ছিলেন। ‘হাফিজ জীবিতকালে বাঙালির কাছে সমাদর পেয়েছিলেন। বাংলায় আসার জন্য তিনি প্রথমবার বন্দরে এসে জাহাজে উঠেছিলেন কিন্তু প্রচণ্ড ঝড় শুরু হলে ভয় পেয়ে আর সমুদ্রযাত্রা করেননি। দ্বিতীয়বার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অতিবৃদ্ধ স্বাস্থ্যগত কারণে আসতে পারেননি। সে বছরই তাঁর মৃত্যু হয়। দ্বিতীয়বার তিনি ওই সময়ের বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিনের আমন্ত্রণে আসতে চেয়েছিলেন।’

 (তথ্য-উপাত্ত সূত্র : তাহা ইয়াসিন : নজরুলের জীবনবোধ ও চিন্তাধারা, পৃষ্ঠা-৩২৫)

বহুমাত্রিক পরিচয়ের কবি কাজী নজরুল ইসলাম হাফিজের কাব্যানুবাদ করে বাংলা সাহিত্যভা-ারকে সমৃদ্ধ ও আলোকিত করেছেন। ফারসি কবি হাফিজের সাথে নজরুল চমৎকার আঙ্গিকে বাঙালি জাতিকে পরিচিত হতে নতুন মাত্রা সৃষ্টি করেছেন। নজরুলের শৈল্পিকতা আমাদের অমৃত রস আস্বাদনের বড় উপকরণ। নজরুল তাঁর সাহিত্যে অমর হয়ে  থাকবেন যুগ যুগ ধরে।

তথ্য-উপাত্ত সূত্র :

০১.  ননী গোপাল বিশ্বাস : সর্বকালের নজরুল, সচিত্র বাংলাদেশ, আগস্ট ২য় পক্ষ ২০১২, প্রকাশক, চলচিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা।

০২ কাজী নজরুল ইসলাম : নজরুলের কাব্যানুবাদ : তৃতীয় মুদ্রণ, মার্চ ২০১৪, প্রকাশক, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা।

০৩. নজরুলের ছোটগল্প সমগ্র : অষ্টম মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৫, প্রকাশক, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা।

০৪. ড. সুশীল কুমার গুপ্ত : নজরুল-চরিতমানস, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় দে’জ সংস্করণ, মাঘ ১৩৯৫, প্রকাশক দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।

০৫. মানবর্দ্ধন পাল : গ্রন্থোৎসর্গে নজরুলমানস, প্রথম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৩, প্রকাশক, অক্ষর প্রকাশনী, ঢাকা।

০৬. আবু হেনা আবদুল আউয়াল : নজরুলের সাহিত্যচিন্তা ও তাঁর সাহিত্য, প্রকাশকাল, মে ২০১০, প্রকাশক, নজরুল

     ইন্সটিটিউট, ঢাকা।

০৭.    তাহা ইয়াসিন : নজরুলের জীবনবোধ ও চিন্তাধারা, প্রকাশকাল, মে ২০১৩, প্রকাশক, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares