সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত পাঁচ কথাশিল্পীর সাহিত্যকর্ম

September 19th, 2016 9:48 pm
বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত পাঁচ কথাশিল্পীর সাহিত্যকর্ম

বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত

পাঁচ কথাশিল্পীর সাহিত্যকর্ম

 

স্বপন নাথ

 

ভাষা, ভাব, চিন্তা ও সৃষ্টিতে ভিন্ন ভিন্ন মেজাজের কথাশিল্পীরা সক্রিয় রয়েছেন সাহিত্যকর্মে। তাঁরা জনপ্রিয়, জনশ্রুত, পাঠকপ্রিয় কথা ও গদ্যশিল্পী। তাঁদের কয়েকজন হলেন : আনিসুল হক, হরিশংকর জলদাস, পূরবী বসু, জাকির তালুকদার ও শাহীন আখতার যথাক্রমে ২০১১, ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেছেন। মূলত, তাঁরা কথাশিল্পী। এর বাইরে প্রবন্ধ, রম্যকথা, স্মৃতিকথা ও জীবনীগ্রন্থ লিখেছেন। তবে, তাঁরা সকলেই কথাসাহিত্যে অসামান্য অবদান রেখেছেন এবং এখনও নিয়োজিত আছেন।

প্রসঙ্গত, এর বাইরে পত্রিকায় কেউ কেউ নিয়মিত কলামও লিখে চলেছেন। যেমন জাকির তালুকদার ও আনিসুল হক। আনিসুল হকের গদ্যকার্টুন খুব জনপ্রিয়। রচনার বৈশিষ্ট্যে, বিষয় বিন্যাসে সাদৃশ্য, বৈসাদৃশ্য যেমন আছে, তেমনি তাঁরা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র ভূগোলের অধিবাসী। বস্তুত, তাঁর স্ব-স্ব বৈশিষ্ট্যে সাহিত্যচর্চায় নিবিষ্ট রয়েছেন। আগামীতে হয়ত উৎকৃষ্ট ও উদাহরণতুল্য কিছু লিখে পাঠকসমাজকে ধরে রাখবেন তাঁদের লেখার শক্তিতে। এ প্রচেষ্টাই তাঁদের আলাদা সত্তায় পরিণত ও প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ কর্মসূত্রই তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিশ্চিত করেছে।

আমাদের এ আলোচনার পরিধি খুব বড় নয়। সে বিবেচনায় এ আলোচনা সীমিত রাখা হয়েছে। এর মধ্যেই চিহ্নিত করতে হবে উল্লিখিত পাঁচজন গদ্য ও কথাশিল্পীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তাঁরা প্রত্যেকেই স্ব-স্ব রচনায় স্বকীয় বিবেচনা, স্বতন্ত্র স্টাইল ও নির্মিতিতে অবস্থান প্রকাশে সফল হয়েছেন। একইসঙ্গে তাঁদের সাহিত্য পাঠ করেও বোঝা যায় যে, তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন লেখক। তাঁরা পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তাঁদের নিজস্ব ভাষাভঙ্গি, বিষয় নির্বাচন, দৃষ্টিকোণ পরিচর্যা ও প্রাতিস্বিকতায়।

তাঁরা এখনও সক্রিয় বলেই, তাঁরা আরও অনেক কিছু লিখবেন। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত ও  উল্লেখযোগ্য রচনাবলি সংখ্যায় অপ্রতুল নয়। এ বিষয়টি যে কোনো আলোচনায় বিবেচনায় রাখতে হয়। এ আলোচনার যে পরিধি তাতে নির্বাচিত লেখকদের বিশাল রচনা নিয়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণ প্রায় অসম্ভব। এ বিষয়টি ভাবনায় রেখে বর্তমান আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা যৌক্তিক বলে মনে করি। এ ছাড়া প্রতিজনের লেখার বৈশিষ্ট্য বোঝাপড়ায় অবলম্বিত একটি রচনাকে কেন্দ্রে রেখে অন্যান্য রচনা অঙ্গীভূত করা সমীচীন হবে বলে আমি মনে করি। এভাবে সাহিত্যবোধকে উপস্থাপনের কৌশল বেছে নেওয়া পাঠকের জন্যও স্বস্তিকর হতে পারে। কারণ, এত ছোট পরিসরে রচনাবলি সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে কোনোটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। এজন্য তাঁদের  সাহিত্যচিন্তা ও শৈলী বোঝাপড়ার জন্য এ কৌশল আমরা বিবেচনায় রাখতে ইচ্ছুক।

প্রসঙ্গত, বিখ্যাত লেখক নিজেকে বদলে ফেলেন। একটি পাঠকৃতির তত্ত্ব, ভাবনা, বিষয় ও বৈশিষ্ট্য অন্য পাঠকৃতির সঙ্গে নাও মিলতে পারে। এটাই স্বাভাবিক। বৈচিত্র্য এলেও খুব একটা দূরত্ব তৈরি হয় না। ব্যক্তি লেখকের ভাবাদর্শ, কেন্দ্রীয় চিন্তা এবং মৌল লক্ষণ থেকে বিচ্যুতি খুব একটা হয় না। সুতরাং আমরা প্রতি লেখকের সাহিত্যচিন্তা বা বোধকে চিহ্নিত করতে চেষ্টা করব।

 

 

 

আনিসুল হক

আনিসুল হক একজন বহুলপ্রজ লেখক। তাঁর বইয়ের সংখ্য প্রায় শতাধিক। তিনি ২০১১ সালে অর্জন করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। এছাড়াও তিনি লাভ করেছেন সিটি-আনন্দ আলো সেরা বই, খালেকদাদ চৌধুরীসহ কয়েকটি পুরস্কার। নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখেই চলেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশে যে কয়েকজন কথাসাহিত্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, তাদের মধ্যে আনিসুল হক একজন। আয়েশা মঙ্গল, বীর প্রতীকের খোঁজে, নিথুয়া পাথারে, ফাল্গুনের রাতের আঁধারে, একাকী একটি মেয়ে, খেয়া, ফাঁদ, আমার একটা দুঃখ আছে, হৃদিতা, মনে রেখ প্রিয় পাতা, সেঁজুতি, তোমার জন্য, ৫১ পরবর্তী, মা, যারা ভোর এনেছিলো, চিয়ারী বা বুঁদু ওরাঁও কেন দেশ ত্যাগ করেছিল, মায়া, জননী সাহসিনী ১৯৭১, আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী, স্বপ্ন, বিক্ষোভের দিনগুলিতে প্রেম, জেনারেল নারীরা, ক্ষুধা ভালোবাসার গল্প ইত্যাদি। লিখেছেন কয়েকটি নাটক ও চিত্রনাট্য। কবি হিসেবেও তিনি সমধিক পরিচিত। এ ছাড়া কলাম ও রম্যলেখক হিসেবে তাঁর খ্যাতি রয়েছে।

স্বাধীনতাউত্তরকালে বাংলাদেশের সাহিত্য পাঠে ক্লান্তিবোধ করে পাঠকসমাজ। বাংলাদেশের পাঠকরা ছিল নতুন গল্প সন্ধানে। উৎকৃষ্ট লেখক যে ছিলেন না, তা নয়। যদিও  সে সময় শওকত ওসমান, শওকত আলী,  আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, মাহমুদুল হক, হরিপদ দত্তসহ অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ও গল্প লিখেছেন। কিন্তু মধ্যবিত্ত পাঠক নিরলঙ্কার কিছুর আকাক্সক্ষায় অপেক্ষা করেছে। তাদের ভাবজগৎকে আকৃষ্ট করে এমন গল্প তারা পায়নি। ফলে, সিরিয়াস সাহিত্য পাঠ থেকে পাঠক মুখ ফিরিয়ে নেয়। দীর্ঘদিন বিশেষত উপন্যাস বা গল্প পড়তে দ্বারস্থ হয়েছে পশ্চিম বাংলার লেখকদের লেখার। হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলনের কথাসাহিত্যে প্রবেশে সাধারণ পাঠক আবার বাংলাদেশের উপন্যাস ও গল্পপাঠে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। তাঁরা স্বল্প সময়ে পাঠকের মনোজগতে অবস্থান করে নিতে সমর্থ হন। হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্যসৃষ্টিতে মধ্যবিত্ত মন মননকে আলোড়িত করেছেন। হুমায়ূন-মিলনের জনপ্রিয়তার মধ্যেই আনিসুল হক সাহিত্যচর্চায় খুব দ্রুতই জনশ্রুতি অর্জন করেছেন। হুমায়ুন-মিলনের পাঠক তার নিজের পরিসীমাতে খুঁজে পায় অন্য এক আপনজনকে। এখানে পাঠকের চেতনার পালাবদল করতে হয়নি। পাঠক হিসেবে সে শুধু তার রুচি বদল করেছে মাত্র। তার স্বীয় ব্যাপ্তিকে বাড়িয়ে নিয়েছে।

বস্তুত, হুমায়ূন-মিলনের মাঝখানে আনিসুল হককে খুঁজে পাবার কথা নয়। কিন্তু আশ্চর্য হতে হয়, এবং পর্যবেক্ষণে লক্ষণীয় যে, তাদের জনপ্রিয়তার পরিধিতে তিনি প্রবেশ করেছেন। পাঠক সহজেই তাঁকে গ্রহণ করে। ওই সময়ে লেখক হিসেবে স্থান করে নেওয়াটা এত সহজ ছিল না। কিন্তু আনিসুল হক তাঁর সামর্থ্যই  জনপ্রিয়তার তুমুল তরঙ্গে জায়গা করে নিলেন। এ বিষয়টি এত সহজ নয়, তাহলে এ কঠিন কাজটি কীভাবে সম্ভব হলো, তা যেকোনো পাঠকের মনে এ প্রশ্ন উদিত হতে পারে। খুব সহজেই এ উত্তরটি পাওয়া যায় তাঁর উপন্যাস ও গদ্যকার্টুনে। অতি সহজেই তিনি বলেছেন এ সমাজ, চারপাশ ও সাধারণ মধ্যবিত্তের চাওয়া পাওয়ার সমস্যা। এ সহজে বলার সাবলীল ভাষাটি তিনি আয়ত্ত ও প্রয়োগ করেছেন। সমসাময়িক ঘটনা ও বিষয়কে তিনি যেভাবে তাঁর ‘গদ্যকার্টুন’-এ বিধৃত করেন, তেমনি এ সমকালীন বিষয় ও চরিত্রকে তুলে আনেন উপন্যাসের গল্পে। ফলে, এ বৈশিষ্ট্য সহজেই পাঠকের স্নায়ুকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়। এ বৈশিষ্ট্য আনিসুল হকের জনশ্রুতি অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি কারণ। অতি সহজে প্রকাশের বিষয়টি ভালোভাবেই তিনি রপ্ত করেছেন বলেই তা সম্ভব হয়েছে। সহজ ভাষা আর আবেগ ও হিউমারের মিশ্রণ তাঁকে জনপ্রিয়তার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

Printআনিুসল হক সামাজিক অন্যসব বিষয়ের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস সৃষ্টি করেছেন। যদিও তিনি নিজে বলেছেন যে, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখনও কোনো উৎকৃষ্ট লেখা প্রকাশিত হয়নি। তবে, সকলে মিলে চেষ্টা করছেন যেন মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে একটা ভালো উপন্যাস রচিত হয়। আনিসুল হক নিজেও চেষ্টা করেছেন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস লিখতে। তবে তিনি আফসোসও করেছেন লেখা না হয়ে ওঠার জন্য। এ অনুশোচনাই প্রমাণ করে তিনি আরও ভালো হয়ত কিছু লিখবেন, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

তাঁর সুলিখিত কয়েকটি উপন্যাসই প্রমাণ করে যে, আনিসুল হক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাস নিয়ে কী ভাবেন, চিন্তা করেন। ফলে, সাধারণ জীবন ও এর নানামাত্রিক সমস্যা-সংকটের সঙ্গে তিনি যুক্ত করে নেন মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ। লেখক হিসেবে তাঁর দায়, দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি খুব সচেতন বলেই ইতিহাসের উচ্চকিত ঘটনা ও ঐতিহ্য তাঁর ভাবনার স্তরে গভীরতর প্রেষণায় স্থাপিত। তিনি অত্যন্ত সচেতন বলেই ইতিহাসের সত্য উপন্যাসের সত্যে নির্মাণ করেন অসামান্য দক্ষতায়। যেমন, তাঁর যারা ভোর এনেছিলো, জননী সাহসিনী ১৯৭১, মা, সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর জেনারেল নারীরা উপন্যাস। প্রতি উপন্যাসেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের সত্যকে অক্ষুণœ রেখে উপন্যাসের স্বতন্ত্র ভাষা নির্মাণ করেছেন। কারণ, ইতিহাস আর সাহিত্যের সত্য এক হওয়ার কথা নয়। কল্পিত বর্ণনা দিয়ে বাস্তবের সত্য উপলব্ধি করতে যা কিছু করতে হয়, তিনি তাই করেছেন। জেনারেল ও নারীরা উপন্যাসের বিষয়বস্তু হলো ১৯৭১ সালে ক্ষমতাবান পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের যৌন ও শাসক জীবন। কেউ কেউ বলেছেন যে, এটি ইংরেজি একটি বইয়ের অনুকৃতি মাত্র। যা-ই হোক না কেন আনিসুল হক তাঁর গদ্যরীতিতে জেনারেলের জীবনের বৈচিত্র্য অঙ্কনে সফল হয়েছেন। যারা ভোর এনেছিল, আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী মুক্তিযুদ্ধের চিরায়ত তথ্য ও ব্যক্তিকে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করেছেন। আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী উপন্যাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে  কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে বর্ণনা প্রসারিত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন ও তাঁর অবদানের ওপর লিখিত এ উপন্যাস। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহযোগী, অনুসারী ও সমকালের অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকেও তিনি সমগুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করেছেন। উপন্যাসের ক্যানভাসে নিয়ে এসেছেন বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য ও পরিস্থিতি সাপেক্ষে তাঁর নির্দেশনা। এর বাইরে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের প্রসঙ্গ অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে অঙ্কন করেছেন।  বঙ্গবন্ধুর সাথে সে সময়ের রাজনীতিবিদ মাওলানা ভাসানী, সোহরাওয়ার্দীর নাম ও ভূমিকা উপস্থাপন করেছেন। বস্তুত, মুক্তিযুদ্ধের  মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য নিষ্ঠা, ইতিহাসের প্রতি তাঁর নিবিষ্টতা আমরা লক্ষ করি।

লক্ষণীয়, তিনি মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস লিখতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠে নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছেন। ইতিহাসের আকর থেকে তথ্য সংগ্রহ এবং এ তথ্যে নিজের অর্জিত জ্ঞানকে যাচাইও করেছেন। ফলে, ইতিহাসের সত্য থেকে সরে যাননি। বীর প্রতীকের খোঁজে উপন্যাসে উপস্থাপিত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা করিমন বেওয়া বীর প্রতীককে খুঁজে বের করার কাহিনি। মুক্তিযোদ্ধা করিমন বেওয়া নিজেও ভাবেননি একদিন তাঁকে কেউ খোঁজ করবে। পত্রিকায় রিপোর্ট ছাপা হবে। তাঁকে জাতীয়ভাবে সম্মান জানানো হবে। এ করিমনকে আবিষ্কার করা হলে চারদিকে মিডিয়াসহ, বিভিন্ন দিকে খুব দ্রুততার সাথে খবর ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু করিমন বেওয়ার পরিচয় প্রকাশিত হলেই তো শেষ হয়ে যায় না সব। পেছনে চেপে ধরে সামাজিক সংকট। এ করিমন মুক্তিযুদ্ধের পর অনাহারে অর্ধাহারে দিনানিপাত করেছেন, কেউ তাঁর খোঁজ রাখেনি। অবশেষে পরিচয় প্রকাশিত হলেও মানবিক পরিচয়টা শক্তিশালী হয়ে ওঠে না। পুলিশ তাঁর কোমরে দড়ি দিয়ে থানায় নিয়ে আসে। আবার সাংবাদিক কারণ জানতে চাইলে তিনি সাধারণ কথায় মুক্তিযুদ্ধের দর্শন ও  জীবনযুদ্ধে শ্রেণি অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে দেন। করিমন বলেন :

‘বুবু আগেও হামার যুদ্ধ হামরা নিজেরা করেছি, এলাও মোর যুদ্ধ মুই নিজেরই করছোম। খয়বার মুন্সিকে ইনশাল্লা ধান নিবার দেঁও নাই।’ (বীরপ্রতীকের খোঁজে, মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, পৃ ৩০৭)

এদেশের সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য বোঝাতে করিমনের উদাহরণই যথেষ্ট। সাংবাদিকসহ যারা তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত, তাদের এখনও কোনো না কোনো উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু করিমনরা কখনওই তাদের ব্যক্তিস্বার্থে মুক্তিযুদ্ধে যায়নি। সাংবাদিক সাবিনা যখন বীরপ্রতীক প্রসংগ এনেছে, তখনও নিরাসক্ত ছিলেন করিমন। বস্তুত, করিমন বেওয়ার ব্যক্তিগত জীবন সংগ্রাম, তাঁর মুক্তিযুদ্ধ, প্রাত্যহিক জীবনে নানা ঘাত-প্রতিঘাতে এগিয়ে চলা এবং এ নাগরিক সমাজে তার সংশয়পূর্ণ যোগাযোগ ইত্যাদি চমৎকার শৈলীতে উপস্থাপন করেছেন আনিসুল হক।

এভাবে মাসহ কয়েকটি উপন্যাস তিনি রচনা করেছেন ইতিহাসের সঠিক তথ্যে ও উপাদানে। বাংলা সাহিত্যসহ বিশ্বসাহিত্যে মাকে নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস লিখিত হয়েছে। এর মধ্যে ম্যাক্সিম গোর্কির মা, পাল এস বাক-এর মা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জননী,  শওকত ওসমানের জননী, মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশীর মা এবং আনিসুল হকের অনবদ্য উপন্যাস মা। মা উপন্যাস লিখতে তিনি যেসব বইয়ের কথা উল্লেখ করেছেন গ্রন্থপঞ্জিতে, তাতে এ বিষয়টি ভেবে নিতে হয় পাঠককে। মা উপন্যাসের মূল তথ্য ও ঘটনা নিয়েছেন শহিদ জননী লিখিত স্মৃতিকথা একাত্তরের দিনগুলি থেকে। বলাবাহুল্য যে, একাত্তরের দিনগুলি হলো এ উপন্যাসের ভিত্তি। এর সাথে তিনি মুক্তিযুদ্ধের অনেক বিষয়কে নিয়ে এসেছেন। একাত্তরের দিনগুলিতে যেসব চরিত্রের সাথে আমাদের পরিচয় হয়। এখানে তিনি এগুলো অক্ষুণœ রেখেছেন। ক্র্যাক প্লাটুনের সকল সদস্যসহ মুক্তিযোদ্ধা আজাদ অসম সাহসের সাথে তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছেন দেশের জন্য। এ বিবরণ আনিসুল হক দিয়েছেন অতি আবেগের সাথে যা অপরিহার্য ছিল কাহিনির প্রয়োজনে। মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ আজাদ-রুমীদের সাথী অনেকেই এখনও বেঁচে আছেন। পাকিস্তানি সেনাদের কাছে বন্দি আজাদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন তাঁর মা। নির্যাতনে আহত, শক্তিহীন আজাদকে দেখেছেন, আজাদ ভাত খেতে চেয়েছে। মায়ের সাথে দেখা হলে নৃশংস নির্যাতনের কথা জানান আজাদ। কিন্তু পরদিন ভাত নিয়ে গেলে আর আজাদকে দেখা যায়নি। এ মা-ই তো ছেলেকে যুদ্ধে যেতে বলেছেন, দেশের প্রয়োজনে। এমনকি নির্যাতনের কথা বললে মা বলে দিয়েছেন, সে যেনও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম না বলে। মা বলেছেন:

‘বাবারে, যখন মারবে, তুমি শক্ত হয়ে থেকো। সহ্য কোরো। কারো নাম যেন বলে দিও না।’ (মা, মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস,পৃ ২০৬)

এ সাধারণ কোনো মা নয়, মুক্তিযুদ্ধের মা।  গোর্কির মা উপন্যাসের মা ‘পেলাগেয়া নিলভনা’ ছেলেকে যেমন উৎসাহিত করেছে শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবে, অন্যদিকে নিজেও হয়ে ওঠে বিপ্লবী। আনিসুল হকের নির্মিত মাও ছেলেকে মুক্তিসংগ্রামে অংশ নিতে প্রেরণা দিয়েছেন। লক্ষণীয়, সর্বজনীন মাতৃত্ব ও মায়ের একটি সাধারণ রূপ রয়েছে। যা কোনো কালিমায় শেষ হয়ে যায় না। এ মা সারারাত টিফিন ক্যারিয়ার হাতে দাঁড়িয়ে থেকেছেন, আজাদের দেখা মেলেনি, ভাত খাওয়ানো হয়নি। শুধু অপেক্ষা, আজাদ একদিন ফিরে আসবে। এ অপেক্ষা একদিন মিথ্যে হয়ে যায়। বিছানায় না শুয়ে, ভাত না খেয়ে এই মা মৃত্যু পর্যন্ত আজাদের জন্য অপেক্ষা করেছেন। কিছুটা ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর সংলাপে, ‘এত এত লোক আত্মত্যাগ করল, নিজের জীবন দিয়ে দিল, আর মায়ের কাছে ছেলের চেয়ে বড় ধন আর কী হতে পারে, মায়েরা হাসিমুখে ছেলেদের তুলে দিলেন মৃত্যুর হাতে, সব বৃথা যাবে?’ ( প্রাগুক্ত, পৃ ২৩৫)  যে আজাদ একদিন শখ করেছিল, সে বড় হলে মায়ের কথা বলবে মানুষের কাছে। তার বলা হয়নি। আজাদের অর্জন অনেক বড় হয়েছে। মায়ের কথা বলা হয়নি। এ মায়ের কথা বলতেই আনিসুল হক লিখেছেন তাঁর অনন্য উপন্যাস মা।

 

হরিশংকর জলদাস

বাংলাদেশের অনন্য এক কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় বা এ সমাজ বোঝাপড়ায় একজন ধীসম্পন্ন পর্যবেক্ষক তিনি। তাঁর লেখার মৌল বিষয় হলো প্রান্তজনের জীবন, সংগ্রাম ও অধিকার। এর আগেও ধীবরজন, জেলে, প্রান্তজন ও তাদের জীবন জীবিকা নিয়ে বিখ্যাত কিছু সাহিত্য রচিত হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলো ধারণ করেছে নিয়তিবঞ্চিত জেলেজীবনের ভাষ্য। এর সংগে সংশ্লিষ্ট রয়েছে নদী। এ প্রসঙ্গে গবেষণায় নদীভিত্তিক শব্দবন্ধটি তিনি ব্যবহার করেছেন তাঁর গবেষণা অভিসন্দর্ভে। হরিশংকর জলদাস এ নিম্নবর্গীয় মানুষের বেদনা, সুখ ও জীবনসংগ্রামের চিত্রাঙ্কনে সমুদ্রবিহারী হয়েছেন। শুধু সচেতন লেখক নন, ব্যক্তি হিসেবে সমুদ্রের নোনাজলে যাঁর বড় হয়ে ওঠা ও তাঁর সফল জীবনের পরিণতি। তিনি রচনা করেছেন সফল কয়েকটি উপন্যাস ও গল্প। সক্রিয় রয়েছেন কথাসাহিত্য রচনায়, প্রবন্ধে। তাঁর কথাসাহিত্যে চিত্রিত হয়েছে প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় অবহেলিত, নির্যাতিত, ঘৃণার আগুনে পুড়ে অঙ্গার হওয়া মানুষের জীবন। যাদের পেশা, জীবনের অসচ্ছলতাই তাদের নিয়তি নির্ধারণ করে দিয়েছে। সে জীবনের কথাই অঙ্কিত হয়েছে জলপুত্র, দহনকাল, রামগোলাম, হৃদয়নদী, কসবি, মোহনা, আমি মৃণালিনী নই, প্রতিদ্বন্দ্বী, এখন তুমি কেমন আছ, সেই আমি নই আমি এবং একলব্য উপন্যাসে। গল্পগুলো হলো : জলদাসীর গল্প, চিত্তরঞ্জন অথবা যযাতির বৃত্তান্ত, কাঙাল, লুচ্চা, হরকিশোরবাবু, বাছাই আরো, গল্পসমগ্র প্রভৃতি। কয়েকটি মননশীল প্রবন্ধগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলি হলো :  কৈবর্তকথা,  নিজের সঙ্গে দেখা, জীবনানন্দ দাশ ও তাঁর কাল, সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গ, কবিতা এবং ধীবর জীবন কথা, আমার কর্ণফুলী, নদীভিত্তিক বাংলা উপন্যাস ও কৈবর্তজীবন।

হরিশংকর জলদাস ২০১২ সালে সাহিত্যকর্মে অবদানের জন্য বিশেষত কথাসাহিত্যের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেছেন। এছাড়াও গ্রহণ করেছেন আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার, সিটি-আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন সম্মাননা পদক, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার, জীবনানন্দ মেলা সম্মাননা স্মারক, অবসর সাহিত্য পুরস্কার, ড. রশীদ আল ফারুকী সাহিত্য পুরস্কার। যদিও পুরস্কার প্রাপ্তি শ্রেষ্ঠত্বের মানদ- নয়।

বলা বাহুল্য যে, কর্মজীবনের উপান্তে অনেক কাজই তিনি সম্পন্ন করেছেন। জেলে-জীবনের অন্যতম ভাষ্যকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অদ্বৈত মল্লবর্মণসহ অনেকেই নদীকেন্দ্রিক জেলে-জীবনের নিয়তির কথা সাহিত্যে বয়ান করেছেন। যা কেবল বাংলা নয়, বিশ্বসাহিত্যেও অনন্য সম্পদ বলে মনে করা যায়। হরিশংকর জলদাস আরও বিস্তৃত করে নিয়েছেন সমুদ্রে। কেবল ধীবর, দলিত, যৌনজীবী, হরিজন ও জেলে-জীবনের যন্ত্রণা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও প্রাত্যহিক জীবনের রিরংসা, হিংসা ও সংঘাত রূপায়ণ করেননি। তিনি নির্মাণ করেছেন বহুস্বরিত জীবনের শিল্পভাষ্য। তাঁর চিন্তাভাবনায় শুধু নিয়তি নির্ধারিত জীবন একই স্বভাবের, একরৈখিক কোনো কিছু নয়। এ প্রান্ত-জীবনেও রয়েছে বহুমাত্রিক জটিলতা। খানাখন্দকের নানামাত্রিক জটিলতার বহুকৌণিক স্বরকে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন হরিশংকর জলদাস। কারণ, এ জীবন যতই আধুনিকতা, জগতের যন্ত্রণা থেকে দূরে থাক, এ সমাজ ও রাষ্ট্রের জটিলতার সঙ্গে যৌগিক সম্পর্ক অস্বীকার করার উপায় নেই। এ সাধারণ জীবনের চলমানতাকে প্রভাবিত করে রাষ্ট্র ও সমাজের বহুমাত্রিক গণিত। ফলে, অভাব, যন্ত্রণার মাঝে যতই এ জীবন বিচ্ছিন্ন হোক না কেন, কোনো না কোনোভাবে এ জীবন সম্পকির্ত থাকে অপরাপর জটিল ও কূটিল বিষয়ের সঙ্গে। রামগোলাম ও কসবি উপন্যাস ভিন্ন বিষয় অবলম্বিত হলেও ওই জীবন তথাকথিত ভদ্রজনোচিত পরিবেশ থেকে দূরেই থাকে  কাল থেকে কালান্তরে। আমরা এসব নিয়ে ভাবি, সমাধান খুঁজি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে। লেখক হরিশংকর এ উপন্যাস দুটি নির্মাণ করেছেন ব্রাত্য চেতনার আলোকে। দূর থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করে নয়। ব্রাত্য, অস্পৃশ্য সে যেভাবেই, শ্রেণিগত দিক থেকে কোনো পার্থক্য থাকে না। নিখাদ মননে তাঁর দেখা ও নির্মিতি।

Printসুতরাং, হরিশংকর জলদাস এ বিষয়কে দেখেছেন খুবই স্পষ্টভাবে, চিত্রিত করেছেন তাঁর উপন্যাস ও গল্পে। শত শত বছর থেকে চলে আসা আরোপিত, কৃত্রিম জাত-বর্ণ-গোষ্ঠীকেন্দ্রিক হিংসা-বিদ্বেষে ক্ষয়ে যাওয়া মানুষের আখ্যানই তাঁর লেখার মৌল উপজীব্য। এর সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে সামষ্টিক ও মনোজাগতিক সমস্যা। যে সমস্যাগুলোতে সকল মানুষই কম-বেশি আক্রান্ত। হরিশংকর এসব বিষয়ের সঙ্গে শোষণ বঞ্চনার বহুকৌণিক বিষয়কে তুলে ধরেন অতি সহজে। সেখানে হিসাববিজ্ঞানের জটিল অংকের মুখোমুখি হতে হয় না। জলপুত্র দিয়ে শুরু করে আর তাঁকে থামতে হয়নি। সদর্থকতার আলোকে জলপুত্র উপন্যাসে উত্থাপিত জীবন নিরর্থক। মানুষ হিসেবে কোথাও এ নিম্নবর্গীয় পরিচিতির মূল্য নেই। এ জীবনের বর্ণনাকে জেলেজীবনের কাঠামোতে না দেখে পাঠক যদি সর্বশোষিত মানুষের ক্যানভাসে রাখেন তাহলে উপন্যাসের বয়ন নিয়ে অন্যভাবে চিন্তার আস্বাদ পাওয়া যায়। লেখকের নিজের প্রত্যক্ষ অবলোকন নয়, নিজে যাপন করা এ জীবন, এত অকৃত্রিম আর কোথাও পাওয়া যাবে না। তাঁর জীবনকে ক্রমাগত পুড়ে পুড়ে যেন অন্য একটি জীবন তিনি তৈরি করে নিয়েছেন। এর কিছু বর্ণনা তিনি উল্লেখ করেছেন কৈবর্ত কথা, আমার কর্ণফুলি, আর অপ্রকাশিত নোনাজলে ডুব-সাঁতার শিরোনামার আত্মজীবনীতে। গদ্যসাহিত্যে উচ্চারিত তাঁর কথাগুলো কথাসাহিত্যের আঙিনায় যাওয়া-আসা করেছে। ফলে, সাহিত্যের সত্য আর বস্তুগত সত্যে তৈরি হয়েছে একই সমতলের পরস্পর সম্পর্ক। বিষয় বিন্যাসে রামগোলাম, কসবি, মোহনা উপন্যাস তিনটি অন্য উপন্যাসগুলো থেকে ভিন্ন, কিন্তু বক্তব্যে একই লক্ষ্য নির্দিষ্ট হয়ে আছে। লেখকের সততা এখানেই। তিনি তাঁর দায়বোধ থেকে পিছনে যাননি। মাছ ধরা, জাল, জল, নদীভিত্তিক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস রয়েছে বাংলাসাহিত্যে। তিনি সমুদ্র পর্যন্ত ক্যানভাসকে বিস্তৃত করেছেন আর মানুষের নানামাত্রিক জটিলতাকে তাঁর স্বীয়ভঙ্গিতে উপস্থাপনের প্রয়াস প্রয়েছেন। আবার তিনি স্থানিক পরিবেশের রঙ, ভাষাকে চমৎকারিত্বে উপস্থাপন করেছেন। পাঠক স্বাভাবিকভাবেই মনে করবে সে-ও যেন ঘটনার মধ্য দিয়ে তাঁর সময়কে অতিক্রম করছে।

‘উথাল পাথাল বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকিয়ে আছে উনিশ বছরের ভুবনেশ্বরী।’ এ বাক্যের মাধ্যমে জলপুত্র উপন্যাসের শুরু। এ নিরর্থক, তরঙ্গময় ও অনিশ্চিত জীবনকে দেখার বিস্তৃতি ঘটে অপরাপর উপন্যাসে। দহনকাল প্রথম আলো বর্ষসেরা উপন্যাস হিসেবে নির্বাচিত হলো ২০১১ সালে। এ উপন্যাসের শুরুতে বলেছেন, ‘ওই চলেছে রাধানাথ জলদাস, হনহন করে। তার ডান হাতে সাত বছরের ছেলেটি ধরা- হরিদাস। খানাখন্দে ভরা মেটে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে তারা।’ এ হাঁটার শেষ নেই। জীবনের ভার বহনে এ গতি এবং খানাখন্দের বিস্তৃতি কখনও শেষ হয় না। এ পরিবেশের মধ্যেই তাঁর ব্যক্তিজীবনের বিকশিত হওয়া। কল্পনাবিলাসের কোনো পরত থাকলে এর মধ্যে তাকে দেখতে হয়েছে। বিপন্ন অবস্থাকে তিনি যেভাবে জীবনের প্রাতঃকালে দেখেছিলেন, কিছু খোলনলচে পরিবর্তন হলেও অবশেষে এসবই তাঁকে দেখতে হচ্ছে। এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তিনি ২০১১ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার উপন্যাসের মধ্যে আমাদের জীবনে সংঘটিত ঘটনাগুলো হুবহু উপস্থাপিত হয়নি। আমি ৫৫ বছরের জীবনে যা দেখে এসেছি এখানে তার প্রতিফলন আছে। তা কারও কারও জীবনের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, মিশে যাচ্ছে।… আমি বিশ্বাস করি আজ থেকে ৫৬ বছর আগে অদ্বৈত মল্লবর্মণ নদীভিত্তিক জেলেদের নিয়ে যে উপন্যাস লিখেছিলেন, আমি তাঁর সেই প্রচেষ্টাকে নদী থেকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত করার সাধনায় আছি।’ যথার্থ অর্থেই তিনি সমুদ্রে নিয়ে গেলেন। তিনি অন্য একটি স্মৃতিতর্পণে স্মরণ করেছেন বেড়ে ওঠার কথা কিংবা নদী ও সমুদ্র এক হয়ে যাবার গল্প :

‘জলজীবন আমার। জীবনের ত্রিশটি বছর সমুদ্রজলে কাটিয়েছি আমি। সমুদ্রজল ঢেউবহুল। সমুদ্রের মাতাল ঢেউ এবং খরস্রোতে আমার বাবার সঙ্গে সঙ্গে আমার  হাড়মাংসও জরজর করে ছাড়ত।’

সমুদ্রের নোনাজলে যারা ভাসমান এ অসংগঠিত জেলেরা বহুলপঠিত দহনকাল উপন্যাসে সংঘবদ্ধ ও সচেতন হয়েছে। শোষণের বিপক্ষে, নির্যাতনে ও মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনি এদেশীয় দালালদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। একটি সংলাপে এ শ্রেণিচেতনা ও সচেতনতার ইংগিত স্পষ্ট হয়ে ওঠে :

‘জাইল্যনির পেডত জন্মা ব্যাসদেব মহাভারত লেইখ্যে, গীতা লেইখ্যে। যারা আঁরারে ছোড জাত কঅর, হিতারা স্বর্গ পাইবাল্লাই সকাল-সন্ধ্যা গীতা পড়ে, গীতা বুগত লই শ্মশানত যা। ছোড জাতর বই পড়ি স্বর্গ যাইত চা।’

২৫ মার্চের পর চট্টগ্রাম পতেঙ্গা এলাকা যখন পাকিস্তানি সেনাদের দখলে, সে সময় জেলেদের বন্দি জীবন। সমুদ্রে মাছ ধরতে পারছে না। ফলে, জেলেদের অভাব অনটনে নিরন্ন দিন। রসমোহন বাধ্য হয়ে মাছ ধরতে গেলে তাকে আটক করে সেনারা, পরিচয় জানতে চায়- সে কি হিন্দু না মুসলমান না মুক্তি? এর উত্তরে সে বলে, ‘বাবুরা আমি জেলেÑজাইল্যা। গরিব জাইল্যা।’ অর্থাৎ, তাদের পরিচয় তারা জেলে। আবার রাধানাথকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে পকিস্তান সেনা সদস্যরা। ক্যাপ্টেন দাউদের সঙ্গে সাক্ষাতে কথা বলে রাধানাথকে মুক্ত করে নিয়ে আসে পুত্র হরিদাস। সে সময় হরিদাস সাহসের সঙ্গে ইংরেজি বাক্য বিনিময় করেছে। সে বলে, ‘আই ক্যান, আই শেল বি এযাবল টু বিয়ার মাই ফাদার।’ লেখকের ভাবনায়, এ হরিদাস জেলেসমাজের নতুন প্রতিনিধি। সে যেনও এ জেলেপাড়ার কষ্ট যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পায়। তাঁর লক্ষ তিনি পূর্বাপর বজায় রেখেছেন, যে গতির উল্লেখে উপন্যাসের শুরু, এর মধ্য দিয়ে এর সমাপ্তি। লেখক ইঙ্গিত দেন এ হরিদাসের মধ্য দিয়ে জেলেপাড়ার বিষণ্ন পরিবেশের উত্তরণ ঘটবে :

‘হরিদাস গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বাবার আকুলতাময় চোখে চোখ রেখে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘বাবারে, তোঁয়ারে কথা রাইখ্যম আঁই। আঁই হাঁইট্যম, আরো আরো সামনের মিক্কে হাঁডি যাইয়ম আঁই।’ (দহনকাল, পৃ ১৭৬)

এ লক্ষ্য ও সাধনার সঙ্গে অসামান্য সৃজনসামর্থ্যে গল্প উপন্যাসে যোজন করে নিয়েছেন মিথ-পুরাণের অনুষঙ্গ। যেমন : সেই আমি নই আমি এবং একলব্য উপন্যাস। এ দুটি উপন্যাসে শকুনি ও একলব্য চরিত্র পুরাণের হলেও বর্তমান কালের চেতনায় তিনি নির্মাণ করেছেন। ভাষা ও বর্ণনার কৌশলে সেকালের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসতে সচেষ্ট ছিলেন। একলব্য বঞ্চিত, নিয়তি প্রত্যাখ্যাত এক প্রান্তজন। ধনুর্বিদ্যায় নিষাদ একলব্যের প্রতিষ্ঠা অর্জুন, কূটবিলাসী দ্রোণাচার্য মেনে নিতে পারেনি। একলব্যের অপরাধ হলো- সে ব্রাত্যজন; আর  স্বীয় প্রচেষ্টায় যে ধনুর্বিদ্যা অর্জন করেছে। কিন্তু একলব্য ছিল দৃঢ়, সে তার কথার বরখেলাপ করেনি। অর্জুনের কূটচাল আর দ্রোণের হিংসার কাছে পরাজিত হলো একলব্যের প্রতিষ্ঠা। সে অসীম কৌশল আয়ত্ত করার পরও তাকে ট্রাজিক পরাজয় মেনে নিতে হয়েছে। একলব্য দ্রোণাচার্যকে মানসগুরু হিসেবে শ্রদ্ধা করেছে; এ সরলতার সুযোগ নিয়েছে অর্জুন ও দ্রোণাচার্য। ‘‘দু’হাত জোড় করে একলব্য বলল, ‘আপনিই আমার অস্ত্রগুরু। আপনি স্বীকার করেন বা না করেন, আপনি আমার দীক্ষাগুরু। আমার যা কিছু অস্ত্রবিদ্যাজ্ঞান, সবই আপনার কল্যাণে।… ভক্তিই আমার মূলধন গুরুদেব। আমার সমস্ত অন্তর জুড়ে বিরাজ করছেন আপনি।’ (একলব্য, পৃ ১৪১-৪২) সে আরও বলল যে, গুরু হিসেবে গুরুদক্ষিণা যা চাইবেন তা-ই সে দান করবে। দ্রোণাচার্য এ সুযোগ সদ্ব্যবহার করেন দ্রুত; ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিতে বললেন :

সেটাই হবে প্রকৃত গুরুদক্ষিণা। ‘তারপর তীক্ষ্ন টাঙ্গিটি দিয়ে একটানে নিজের ডানহাতের বুড়ো আঙুলটি কেটে ফেলল।’(প্রাগুক্ত, পৃ ১৪৬)

তবে হরিশংকর আবারও তাঁর মৌল লক্ষের দিকে  ফিরে আসেন। উপন্যাসে একলব্যের টান টান উত্তেজনাপূর্ণ জীবন গুরুদক্ষিণার নিমিত্তে পরাজয় মেনে নিলেও তাঁর স্বপ্ন নিঃশেষ হয়ে যায়নি। ওই আলো জে¦লে রেখেছে কালান্তরে। এ কারণেই পুরাণ কাহিনি আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে একালের পটভূমিতে। একলব্য দৃঢ়ভাবে বলেছে :

‘এই জগৎসংসারকে আমি দেখিয়ে যেতে চাই- একলব্য নামে একদা এক নিষাদপুত্র ছিল। যে হেলায় জাতপাতের দুর্লঙ্ঘ্য দেয়াল ডিঙিয়ে, উচ্চবর্ণের অবহেলা- অপমানকে পাত্তা না দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছিল।’

(প্রাগুক্ত, পৃ ১৫৭)

যে স্বপ্ন ছড়িয়ে দিলো মহাকালের প্রাঙ্গণে। লেখক বলেছেন :

‘একলব্য অপেক্ষা করতে থাকল সেই ভবিষ্যতের জন্য, যে ভবিষ্যতে ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়ের দ্বারা আর ভারতবর্ষ শাসিত আর শোষিত হবে না।, শাসিত হবে জাতবর্ণ নির্বিশেষে প্রাকৃত মানুষের দ্বারা।’

(একলব্য, পৃ ১৯৫)

 

পূরবী বসু

পূরবী বসু বাংলা কথাসাহিত্য ও গবেষণায় অনন্য একজন লেখক। পেশায় বিজ্ঞানী, কিন্তু সাহিত্যে ভিন্ন চিন্তা ও সৃজনশীল চর্চায় তাঁর ভূমিকা অসামান্য। কর্মসূত্রে প্রবাসী হলেও বাংলা সাহিত্যচর্চায় মাটি সংলগ্ন একজন লেখকের পরিচয় তাঁর লেখার প্রতিভাস। সাহিত্যে তিনি অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার এবং বাংলা একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন ২০১৩ সালে। গল্পলেখক হিসেবে ইতোমধ্যে তিনি নিজেকে স্বতন্ত্র ভূগোলে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তা বলাই বাহুল্য। তাঁর গল্পগ্রন্থগুলো হলো : জীবন যৌবনের গল্প, ধলেশ^রী মিসিসিপি, নিরুদ্ধ সমীরণ, দিনরাত্রির ছায়াঘর, আজন্ম পরবাসী, নারীবাদী গল্প, সম্ভব অসম্ভবে পারাপার, জোছনা করেছে আড়ি, নারী তুমি নিত্য, নামে কী আসে যায়, গল্প সমগ্র , গল্প সমগ্র । তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ হলো : নারী সৃষ্টি বিজ্ঞান, প্রাচ্যে পুরাতন নারী, নোবেল বিজয়ী নারী, নারী দীপাবলী ইত্যাদি। এ ছাড়াও গল্প ও প্রবন্ধসহ একসংগে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে : আমার এ দেহখানি নারীর কথা গল্পে ও রচনায়। আমার এ দেহখানি একটি ব্যতিক্রমী সংকলন। এর অধ্যায় বিভক্তিতেও রয়েছে চমৎকারিত্ব। একটি অধ্যায়ে বক্তব্য ও বিষয়বস্তু অনুযায়ী গল্প ও প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। অর্থাৎ, একটি থিমকে কেন্দ্র করে একটি অধ্যায়। এ থিমসংশ্লিষ্ট গল্প ও প্রবন্ধ অধ্যায়ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন :  নারী, যৌবন, যৌনতা শিরোনামার অধ্যায়। এ বিষয়ক গল্প ও প্রবন্ধকে তিনি এখানে ভুক্ত করেছেন এবং বাকি অধ্যায়গুলো একইভাবে সাজিয়েছেন। এতে বোঝা যায় কত বিচিত্র তাঁর গল্প ও প্রবন্ধ।  যেমন : অধ্যায় হলো মাতৃত্ব, এখানে রাখা হয়েছে দুটি প্রবন্ধ : মা হওয়া কি মুখের কথা, সৃষ্টির রহস্য : নারী ও পুরুষ এবং গল্প রয়েছে ধরীত্রি, জনকজননী, সবাই তাকে পাগল বলে। অর্থাৎ, গল্প ও প্রবন্ধে তিনি তাঁর একই বক্তব্য স্পষ্ট করতে চেষ্টা করেছেন। মূলত, পাঠক যে মাধ্যম পছন্দ করে, সেখান থেকে ওই বিষয়ে রসাস্বাদন করে নিতে প্রয়াসী হবে। নারী সম্পর্কিত বিজ্ঞানভাবনা যা প্রবন্ধে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন, তাই তিনি গল্পের প্রকরণে বলেন ভিন্নভাবে। ফলে, যুক্তির নিরিখে বা গল্পের কথনে পাঠক বুঝে নিতে সক্ষম হন নারী সম্পর্কিত তাঁর প্রতিবেদন।

অন্যদিকে বিজ্ঞান ও ভাবনার মিশেলে যে গল্প তৈরি হচ্ছে, এর ভাষা ও প্রকরণে রয়েছে ব্যতিক্রম চমৎকারিত্ব। পূরবী বসুর লেখার এ বিষয়টি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গল্পের বিষয়, অনুষঙ্গ, বক্তব্য ইত্যাদির বাইরে তাঁর স্বতন্ত্র করণকৌশল আমাদের আলোচ্য বা অবলোকনের মূল কেন্দ্র হতে পারে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে পূরবী বসুর লেখার সারার্থ উদ্ধার বা তাঁর চিন্তার পরিধি বোঝা সহজ হবে বলে আমরা মনে করি। এর আগে বাংলা সাহিত্যে বেগম রোকেয়া নারীর অবস্থা, অধিকার, নির্যাতন ইত্যাদি বিষয় উপন্যাস ও প্রবন্ধে উপস্থাপন করেছেন। একালে পূরবী বসু বেছে নিয়েছেন গল্প। তবে, তিনি তাঁর ভাষা, দৃষ্টিকোণ, পরিচর্যার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। একটি সূক্ষ্ম বিষয়কে ধরে সাহিত্যের দুটি ভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। যেমন, ‘নারী হয়ে ওঠা’ একটি থিম। এ থিমকে কেন্দ্র করে লিখেছেন প্রবন্ধ এবং গল্প। তাঁর উদ্দেশ্য হলো লক্ষ্যে পৌঁছা।

সাধারণত আমরা উপন্যাস ও গল্পে আন্তর্বয়ন (Intertextuality) তৈরি হতে দেখি। যাকে কি না এর আগে  বিনির্মাণ বলেছেন কেউ কেউ। কিন্তু প্রবন্ধ ও গল্পে সে আন্তর্বয়ন সৃষ্টির সুযোগ আছে কি না আমার জানা নেই। কিন্তু পূরবী বসু তাঁর থিমকে গল্পে ও প্রবন্ধে ভিন্ন ভিন্ন কাঠামো ও ভাষায় প্রতিস্থাপন করেছেন এবং থিমকে স্পষ্ট করেছেন তাঁর অনন্য কুশলতায়। এখানেই পূরবী বসুকে আলাদা করে ভাবতে হবে পাঠকের। প্রবন্ধে যা বলেছেন যুক্তির নিরিখে এবং তত্ত্ব সৃজনের প্রচেষ্টায়, গল্পে বলেছেন কথার বর্ণনায়। তবে তা অযৌক্তিক কোনো বিষয় অবলম্বনে বা গল্প বলার জন্য বলা- ঠিক তা নয়। শুধু পাঠকের কাছে বিষয়কে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম হিসেবে। একটি সাক্ষাৎকারে পূরবী বসু তাঁর এ কৌশল সম্পর্কে বলেছেন :

Print‘নানান আঙ্গিকে, নানান ভঙ্গিতে, মানুষের অন্তর্জগতের বিচিত্র সব ভাবনা ও তাদের বাহ্যিক কর্মকাণ্ড স্ববিরোধিতা যার অনেকটাই বিশ্লেষণযোগ্য নয়, আমি গল্পের মাধ্যমে আমার কল্পনা জুড়ে প্রকাশ করতে পারি। সামাজিক ও রাজনৈতিক কিছু কিছু বিষয় ও বাস্তবতা যা মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে বা করতে উদ্যত হয় বলে আমার নজর কাড়ে, প্রধানত সেসব বিষয় বা সমস্যা নিয়েই আমি প্রবন্ধ বা নিবন্ধ লিখে থাকি। আর লিখি আমার নিজের জীবনের কিছু উল্লেখযোগ্য বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা যার কিছুটা হলেও সর্বজনীন একটা আবেদন আছে বলে আমি বিশ্বাস করি। তবে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় কথা, আমি যা বলতে চাই, তা গল্পের মাধ্যমে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতেই আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। ছোটগল্প এখনও একটি বিশাল আকর্ষিত ভূমি, যাকে একই ফসল বা ফলনের জন্যেও নানাভাবে কর্ষণ করা চলে।…এখানে সম্পূর্ণ স্বাধীন, আমার চলাচলের পরিধি অবারিত।’

এ কারণেই প্রবন্ধে বলেন যুক্তি ও প্রমাণের ভাষায় আর গল্পে গল্পের ভাষায়।

আরও একটি মনোযোগের সাথে লক্ষণীয়, নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু যৌক্তিক অবস্থান, তাঁর শারীরিক, সামাজিক, আর্থ-রাজনীতিক পরিস্থিতি, পরিবেশের সঙ্গে নারীর সম্পর্ক ইত্যাদি ব্যাখ্যাসহ বলা বেশি হয় না। স্পষ্টত, নারীর একটি ঐতিহাসিক পরিক্রমণ রয়েছে, যা ভেবে দেখতে হবে ঐতিহাসিক ধাপ কিংবা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। এসব বিষয়াবলির মধ্যে শুরু থেকেই নারী হিসেবে বরণ করতে হয়েছে প্রকাশিত অপ্রকাশিত নির্যাতন। বহুমাত্রিক চাপ ও নিবর্তনের মাঝে নারী এগিয়েছে বা তার কণ্ঠ উচ্চকিত করছে। এ বিষয়টি বাংলাসাহিত্যে খুব একটা হয়নি। একেবারে হয়নি, তা নয়, পূরবী বসু যেভাবে ওই বিষয়টি নিয়ে নিবিষ্ট রয়েছেন, এভাবে পাওয়া যায়নি। এখানেই স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা। প্রসঙ্গত, নারীর জীবনসংগ্রাম, অবদমন, অধস্তন হয়ে যাওয়া, উৎপাদন সম্পর্কে নেতিবাচক অবস্থান সবই এসেছে তাঁর সুলিখিত প্রাচ্যে পুরাতন নারী গ্রন্থে। প্রকৃতির নির্ধারণকে পুঁজি করে পুরুষ কীভাবে নারীর চিন্তাভাবনা, ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর আধিপত্য বিস্তৃত করেছে ক্রমান্বয়ে এরই বিবরণ প্রাচ্যপুরাণের অনুষঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন পূরবী বসু।

নারী প্রসঙ্গে বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ ও কল্পভাবনার এমন যৌগ সংকলনÑ আমার এ দেহখানি, এর আগে আমাদের চোখে পড়েনি। পূরবী বসু তাঁর লেখার নারীর ব্যক্তি হিসেবে অবদমন এবং প্রকৃতির মাঝে তার অবস্থান, সামাজিক, রাষ্ট্রিক, পারিবারিক বঞ্চনা, নির্যাতন ইত্যাদি গল্পের কৌশলে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। গল্প বলতে বলতে তিনি কিছু প্রশ্নেরও অবতারণা করেন। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়ত সচেতন পাঠক পঠিত গল্পের বয়ানেই পাবার সুযোগ রয়েছে। সচেতন না হলে আর খুঁজে পাওয়া মুশকিল। নিরেট বাস্তবতার চালচিত্র গল্পের ভেতরেই তিনি বলে দেবার চেষ্টা করেন। নারী অধিকার, তার চেতনা, সংগ্রাম, বেঁচে থাকা, বিপরীতের মুখোমুখি হওয়া, অস্তিত্বের সংগ্রামে নিয়ত পথচলা ইত্যাদি বিষয়ে লেখালেখির কারণে তাঁকে নারীবাদী লেখক হিসেবে অনেকেই আখ্যায়িত করা হয়। বিশেষার্থে বা একটি বিষয়ে বেশি জোর দিতেই নারীবাদ শব্দটিকে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। পূরবী বসুকে নারীবাদী হিসেবে যে অভিধায় নির্ধারণ করা হয়, সেখানে তিনি এ অভিধাকে সমর্থন করেন না। পূরবী বসু এক সাক্ষাৎকারে বলেন :

I do write on women’s condition, their place in our society and their rights. However, I write on many other issues as well. It’s not that I am uncomfortable with the term ‘feminist.’ However, I am not sure whether I should be quite categorized as a feminist writer. I also do not like to be cornered or labeled just as a feminist writer as every human rights violation inspires me to write; not only women’s issues.

 

বস্তুত, নারীকে বাদ দিয়ে সমাজের অস্তিত্বই থাকে না। সেখানে নারীর জটিলতা বা সমস্যা সমাজেরই সমস্যা। এ দৃষ্টিতেই তিনি এ বিষয়কে দেখতে আগ্রহী। আবার উৎপাদন, বণ্টন, প্রকৃতির নির্মাণ ও ধ্বংসে, যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছে নারীরাই। সে হিসেবে নারীর অবস্থান ও শক্তিকে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি মূল্যায়নের চেষ্টা করেছেন। আমরা বলেছি যে, তিনি যে তত্ত্ব দাঁড় করান প্রবন্ধে, এর একটি একটি রূপ সৃজন করেন গল্পে। নারী হয়ে ওঠার বিষয়কে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন তত্ত্বে আবার গল্পেও। প্রবন্ধে দেখিয়েছেন কীভাবে প্রকৃতি ও নারীর সম্পর্ক এবং বন্ধনের মাত্রা। নারীর শরীর কীভাবে নারী হয়ে ওঠে। কী কারণে পুরুষতন্ত্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পেল। সাধারণ বিষয়কে পূরবী বসু বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ, বিচার ও মূল্যায়নের চেষ্টা করেছেন। নারীকে যতভাবে অবহেলা, শোষণ, নির্যাতন করা হয়ে থাকে, এর প্রতিটি নিয়ে তিনি ভিন্ন ভিন্ন গল্প লিখেছেন। নারী যেভাবে পিতৃগৃহে, সহপাঠী, বন্ধুর কাছে অবনমিত ভাবনায় ভীতির মধ্যে বড় হয়ে ওঠে, এর সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করেছেন একইসঙ্গে গল্পে ও প্রবন্ধে। লক্ষণীয় :

জীবনের দ্বিতীয় দশকে মেয়েরা যখন কিশোরী বা কৈশোরোত্তীর্ণ, তাদের মনে পুরুষ সম্পর্কে আগ্রহ জাগে মনের ভেতর নানা ধরনের রোমান্টিক চিন্তা প্রত্যাশা জন্মায় প্রেম প্রেমিক সম্পর্কে রোমান্টিক সব স্বপ্ন দেখতে শুরু করে

চতুর্দশী গল্পের রূপা কিশোর বয়সে যখন প্রবেশ করে, তার বাইরে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আগের মতো মাঠে আর বন্ধুদের সঙ্গে খেলায় অংশ নিতে পারে না। হঠাৎ করে রজঃশালা হলে সে আতঙ্কিত হয়। তার মনে শরীরে পরিবর্তন সে অনুভব করে। আগে যা ভাবত না এখন তা ভেবে পুলকিত হয়। বন্ধুকে সংকোচ ও অসংকোচের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রূপা বলে :

জানিস তোর মেজভাই যখন ইদানীং মাঝে মাঝে আমার দিকে কেমন করে তাকাত, উল্টাপাল্টা কথা বলত, আমার কেমন অস্বস্তি লাগত ভয় করত কিন্তু আজ যখন সত্যি সত্যি সে দুহাত দিয়ে আমার মুখ জড়িয়ে ধরল, আমি বুঝতে পারছিলাম কাজটা ঠিক হচ্ছে না বিন্তু কী আশ্চর্য জানিস, আমার কিন্তু খুব ভয় লাগেনি বরং (আমার এ দেহখানি, পৃ ৩৪)

বিশ্বে, রাষ্ট্রে, সমাজে নারীর অবদমিত হওয়াকে তিনি এককভাবে বিচার করেননি। বহুবিন্দু থেকে তিনি দেখার চেষ্টা করেছেন। ফলে, তার যুক্তি-তর্ক একপেশে হয়ে ওঠেনি। পূরবী বসুর নানামুখি বিচার বিশ্লেষণে প্রমাণিত হয় যে, সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার সাথে নারীর অধিকারের প্রশ্ন জড়িত। ফলে, শুধু কথায় নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ফাঁকা বুলিরই নামান্তর। নারী পরিবেশ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘প্রকৃতির মতো নারীও ক্রমাগত পুরুষের আত্মতৃপ্তির জন্যে অতিরিক্তভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বহুকাল ধরে। ফলে, নারী নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের সখ্য খুঁজে পায়, সহমর্মিতা জাগে নারীর পরিবেশের প্রতি এই ক্রুদ্ধ, নিষ্ঠুর আচরণের জন্য।’ (আমার এ দেহখানি, পৃ ৩৯৯)

এ অধ্যায়ভুক্ত গল্প একদা এখানে কন্যাসন্তান জন্ম নিত। গল্পে উল্লিখিত চন্দনকর জনপদে একটি অদ্ভূত ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে গত বিশ বছর ধরে কোনও কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেনি। সুন্দরী চম্পা দাসী আক্রান্ত হয়েছিল ভিনদেশি লোকদের হাতে। তারপর সে নির্জন হয়ে গেল। একদিন দস্যুরা চন্দনকর এলাকায় প্রতিটি কিশোরী যুবতীকে ধর্ষণ করল। এ থেকে চম্পা দাসীসহ সবার শারীরিক পরিবর্তন শুরু হয়। এ পরিবর্তন এবং কন্যাসন্তান জন্ম না হওয়া নিয়ে চলে ব্যাপক গবেষণা। কিন্তু কোনো সমাধান কেউ দিতে পারেনি। এ এলাকায় স্থাপিত মন্দিরের দেবী মায়াবতীর পুরোহিত বলেছে শুধু পাপ মোচনের কথা। এ গল্পে তিনি তাঁর প্রবন্ধের বক্তব্যকেই সম্প্রসারিত করেছেন। সুন্দর প্রকৃতিকে দখল করতে যেভাবে নির্দয় আচরণ দেখায় মানুষ, সেভাবে নারীর ওপর আধিপত্য বিস্তারে চলে অমানবিক আচরণ। তাঁর নিজের কথায় :

পদে পদে বাধানিষেধ আর বদ্ধ দরজার মুখোমুখি হতে হতে বেড়ে ওঠা নারীর জীবনে কখন কখন নেমে আসে গভীর অন্ধকারএকাকিত্ব, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম, বিশ্রামের নিভৃতির অভাবের মতো মনোজাগতিক সূক্ষ্ম অস্বাচ্ছন্দ্য ছাড়াও কোনো কোনো নারীর শরীরের ওপর এসে পড়ে সরাসরি নারকীয় আক্রমণ-। (ভূমিকা, আমার এ দেহখানি)

এ নির্যাতন, চাপের বিপরীতেই তিনি বক্তব্যকে উপস্থাপন করেছেন তাঁর গল্প ও প্রবন্ধে। পূরবী বসুর বক্তব্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই। একজন নারী হিসেবেও প্রকাশিত হননি। সমস্যাকে তিনি দেখেছেন নারীর নয়, যৌথভাবে মানুষের। ফলে, তাঁর বক্তব্য পাঠককে আকৃষ্ট করে।

 

জাকির তালুকদার

জাকির তালুকদার এ সময়ের অন্যতম একজন শিল্পসচেতন, বোদ্ধা কথাসাহিত্যিক। ঘটনা বা বিষয়বস্তুকে কোথায় কীভাবে ভাষায় বুনতে হয় বা পাঠককে নিবিষ্ট রাখতে হয়, এর নিপুণ কারিগর জাকির তালুকদার। কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ বা অতি সাধারণ, অবহেলিত বিষয়কে উপন্যাস বা গল্পের কাঠামোতে পিনদ্ধ করেন, তা-ই পর্যবেক্ষণের বিষয়। বলা বাহুল্য যে, কথাসাহিত্যে স্বীয় বৈশিষ্ট্যে জাকির তাঁর স্বাতন্ত্র্যরেখা নির্দেশ করে দিয়েছেন। তিনি সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন। এ ছাড়াও গ্রহণ করেছেন কাগজ সাহিত্য পুরস্কার, জেমকন সাহিত্য পুরস্কার, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কথাসাহিত্য পুরস্কার। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস : কবি কামিনী, পিতৃগণ, মুসলমানমঙ্গল, কুরসীনামা, হাঁটতে থাকা মানুষের গান, মেয়েটি কেবল নিয়তির কাছে গিয়েছিল। গল্পগ্রন্থ হলো :  স্বপ্নযাত্রা কিংবা উদ্বাস্তু পুরাণ, বিশ্বাসের আগুন, বাছাই গল্প, ছায়াবাস্তব, কল্পনা চাকমা রাজার সেপাই, মাতৃহন্তা অন্যান্য গল্প, গল্প সমগ্র ১ম -, নির্বাচিত গল্প ইত্যাদি। তিনি সক্রিয় রয়েছেন সাহিত্যচর্চায়। আমাদের প্রত্যাশা যে, তাঁর হাতেই আগামীতে আরও পাঠকপ্রিয় সাহিত্য রচিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। একবার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংশয়ী একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন ‘ছোটগল্প কি মরে যাচ্ছে?’  স্বীয় এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তিনি বাংলা ছোটগল্পের বিকাশ- বিবর্তন আলোচনা করে আশাবাদী কথাও বলেছিলেন। নিভে যাওয়া আলোর আলোময় ইঙ্গিত নিশ্চয়ই বাংলাভাষী পাঠককে আশান্বিত করে তোলে। ইলিয়াসের সংশয়পূর্ণ বক্তব্যের উত্তর জাকির তালুকদার দিয়েছেন গৌরবের সঙ্গে। গল্প হারায়নি বা মরে যায়নি। নুতন নতুন নিরীক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গির নিরিখে ভাবছেন নির্মাণ করে চলেছেন অনেকে। এ ভাবনা ও সৃষ্টির মাঝে বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যতের জন্য বার্তাও রয়েছে। বিশেষত, জাকির প্রমাণ করেছেন ছোটগল্প না মরে বাংলা কথাসাহিত্য সমৃদ্ধ করেছে।

6-zakir-talukdar-pic-for-webজাকির তালুকদার গল্পে সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতির পালাবদল এবং সমকালীন বিষয়াবলি রূপায়িত করেছেন। গল্পের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন ঐতিহ্য, মিথ-পুরাণের অনুষঙ্গ। প্রাচ্য, পাশ্চাত্য ও সেমেটিক মিথ-ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক উপাদান অনুষঙ্গী ও প্রয়োগ করেছেন ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু সমাজ ও ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত মানুষের জীবনপ্রবাহ, ধারাবাহিকতা এবং জাগতিক জীবনের প্রয়োজনে। তুলে ধরেছেন নিয়ত সংগ্রামী সামাজিক ব্যক্তি এবং সমাজ ও রাজনীতিকে। তিনি এক্ষেত্রে সামাজিক শক্তির কথাই বলেছেন। যে সাধারণ মানুষ নির্যাতিত হতে হতে সংঘবদ্ধ হতে থাকে। বারবার ব্যর্থ হলেও প্রতিবাদী প্রত্যয়ে ওঠে দাঁড়াবার প্রয়াসে সংগ্রাম করে। এ সংগ্রামী ও চলমান মানুষই জাকির তালুকদারের চরিত্র। তিনি যে সব মানুষকে নিয়ে আসেন, তাদের স্থানিক ও কালিক পরিচয়ও তিনি উহ্য রাখেন না। তাছাড়া অবলম্বিত বিষয়বস্তু ও ঘটনাসাপেক্ষে ভাষার নির্মিতি জাকির তালুকদারের অসামান্য বৈশিষ্ট্য। তাঁর গল্পে ও উপন্যাসে সময়, সমাজ, সম্প্রদায়, গোষ্ঠী ইত্যাদি স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যেই প্রকাশিত। সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রাম, ঐতিহাসিক বিবর্তন, শ্রেণি-সম্প্রদায়-বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠীকেন্দ্রিক পীড়ন, শোষক ও শোষিতের চারিত্র্য, প্রাত্যহিক জীবনের সংস্কার-বিশ্বাস-প্রথা, সমকালীন জীবনের টানপড়েন, রাষ্ট্র-সমাজে প্রচলিত সংঘাত, দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা, শোষণের বৈচিত্র্য, আরোপিত সমস্যার বিরুদ্ধে মানুষের অবস্থান ও চেতনার বুদবুদ কথাসাহিত্যে উপজীব্য করেছেন জাকির। বিষয় অনুযায়ী নির্মাণ ভাষা ও বুননরীতি। ফলে, তাঁর সাহিত্যের ভাষা ও পাঠকৃতির বৈশিষ্ট্যে পরিমিত বাঁক ও স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিতাশ বসু বলেছেন, ‘জাকিরের প্রতিটি গল্পেই বাংলাদেশের ভৌগোলিক বিস্তারের অসাধারণ মাত্রার বিবরণ উঠে এসেছে। তল্লাট, জনপদ, জেলাওয়ারি কথ্যভাষার বিভিন্নতা লক্ষ করবার মতো। জাকিরের আখ্যান গড়ে তোলার শৈলীটিও চমৎকার।’

তিনি কথাসাহিত্যে স্বনির্মিত কৌশলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের চিন্তা-ভাবনা-বিশ্বাস, সামাজিক জীবনাচরণ তুলে ধরেছেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এটি খুবই সহজ কাজ। কিন্তু তা মোটেও সহজ নয়। কারণ, একটি সমাজ-সম্প্রদায়ের শিকড় বা ভিত্তি অনেক গভীরে প্রোথিত। বস্তুত, এ বিবেচনায় তিনি সংশ্লিষ্ট সমাজ, সম্প্রদায়ের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে এর দার্শনিক ভিত্তি খোঁজ করেছেন। অন্যদিকে প্রতিনিয়ত তৈরি হওয়া প্রথা ও সামাজিক শক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে, তিনি কখনও এ বিষয়কে অবনমিত করে ভাবেননি বা লিখেননি। যেমন, মুসলমানমঙ্গল উপন্যাস। সাম্প্রতিক সময়ে এমন শ্রমলব্ধ সাহিত্য দুর্লভ। তিনি মূলত এ অঞ্চলের মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় সংকটের উৎস উপলব্ধির চেষ্টা করেছেন। তিনি খুঁজ করেছেন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-সংঘাতে চলমান বাঙালিত্বের বিষয় নিয়ে প্রশ্নের মীমাংসার পথ তৈরি না হওয়ার কারণ। প্রশ্নের সমাধানে আদৌ কোনো ইচ্ছে আছে কি না তাও ভেবেছেন। আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে সংকট তৈরি হয় মনে-মননে এবং প্রকাশিত হয় বাহ্যিক আচরণে। এর পেছনে ঐতিহাসিক, দর্শনগত ও সাংস্কৃতিক কারণও ব্যাখ্যা করেছেন এ উপন্যাসে। নিজেই নিজের কাছে প্রশ্ন-উত্তরের রীতিতে আত্মবিশ্লেষণ অতঃপর বিন্যস্ত করেছেন উপন্যাসের পাঠকৃতি। লেখক লিখেছেন :

পাশ কাটাতে চায় ইউসুফ কিন্তু অন্যকে পাশ কাটানো যত সহজ নিজেকে পাশ কাটানো তত সহজ নয়ই, বরং এককথায় অসম্ভব (মুসলমানমঙ্গল, পৃ ২২)

যেসব প্রশ্নের অবতারণা আগেও হয়েছে, এখনও হচ্ছে, এসবের জন্য তিনি গভীরে হেঁটেছেন এবং ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে উপসংহারে পৌঁছার চেষ্টা করেছেন। এ উপন্যাসে উদ্ধৃত প্রশ্ন এবং বয়ানে যা আছে এ প্রশ্ন ও প্রসঙ্গে- এর ব্যাখ্যা রয়েছে বইয়ের মলাটে। বলা হয়েছে :

বাহিরের দিকে আছে তথাকথিত উন্নত বিশ্বের মানুষ তারা কিছু ভিক্ষে, সাহায্য ঋণচক্রজালের সাথে প্রতিনিয়ত অবজ্ঞা ঘৃণা ছিটিয়ে চলে আমাদের মুখে আর ভেতরের দিকে রয়েছে আমাদের পাহাড় সমান অজ্ঞতা, পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতে মানুষের অনীহা, ধর্মের নামে প্রতারিত হওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকা, সারাজীবন ভুল নেতৃত্ব নির্বাচন, আত্মসম্মানবোধের অভাব, বহির্বিশ্বে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণাহীনতা এবং সর্বোপরি নিজেকে চিনতে চেষ্টা না করার বেদনাদায়ক অথর্বতা, আমাদের আছে গৌরবের ইতিহাস, কিন্তু অসম্মানের বর্তমান আর অনিশ্চয়তার ভবিষ্যৎ এই উপাখ্যান তাই এক অর্থে বেদনারও উপাখ্যান

 

চলনবিলের বিবিধ বিষয় ও বৈচিত্র্য তাঁকে প্রভাবিত করেছে। আর্থ-সামাজিক কারণেও চলনবিল খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। চলনবিল এবং এ বিলকে কেন্দ্র করেই শত শত মানুষের জীবন ও জীবিকার পরিণাম লক্ষণীয়। চলনবিলের জল, ভূমি, ফসল চিরকালই ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর লোভ ও লাভের উৎস। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার অবলম্বন। যেখানে খাদ্য ও সম্পদের উৎস, সেখানেই রচিত হয় ভণ্ডামি, শঠতা, দখল, শোষণের প্রেক্ষিত। যেক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থের সঙ্গে রাষ্ট্র ও প্রথাগত সমাজ একাকার হয়ে যায়। তবে, এখানে প্রতিরোধ রচিত হয়, মানুষ বেঁচে থাকার সংগ্রামে বারবার আত্মবিশ্বাসে উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু এর বিপরীতে শক্তিশালী হয়ে ওঠে সংস্কারকেন্দ্রিক বাধা। এ প্রতিবন্ধকতাকেও লেখক কৌশলে উপস্থাপন করেছেন। এসব নিয়েই রচিত হয়েছে হাঁটতে থাকে মানুষের গান উপন্যাস। এ চলমানতা বিস্তৃত করেছেন অন্য গল্প ও উপন্যাসে। যাতে তাঁর সৃজনক্ষমতার ভিন্ন আঙ্গিক, প্রকাশের নান্দনিকতা ফুটে উঠেছে।

এ ছাড়াও মিথ-পুরাণের ব্যবহারে লিখেছেন কয়েকটি গল্প। যেমন : সোলেমান পয়গম্বরের দেয়াল, স্বপ্নযাত্রা কিংবা উদ্বাস্তু পুরাণ, পাচার, শত্রুসম্পত্তি। এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন সামাজিক, রাজনৈতিক আর্থনীতিক সংকটের গতিপ্রকৃতি। আমাদের মনে হয় তিনি যা বলতে চেয়েছেন, সেসব এ অনুষঙ্গ আশ্রয়ে প্রকাশের অনন্যপ্রচেষ্টা। না হলে বিশ্লেষণ বা প্রকাশ করা তাঁর পক্ষে মুশকিল হতো। এ লক্ষ্যে অসাধারণ নৈপুণ্যে জাকির লিখেছেন মাতৃহন্তা গল্প। আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে নারীর অবস্থান ভিন্ন এক কৌশলে লিখেছেন তিনি। হয়েছেন প্রতীকাশ্রয়ী। এমনই এক নির্মিতির আবছায়া তৈরি করেছেন, যাতে সরাসরি কোনো কিছুই বোঝা যায় না। এ গল্পে তিনি লিখেছেন, ‘মনে পড়েছে, আমাদের পাপের কথা মনে পড়েছে। আমরা মাতৃমাংসভক্ষক। পাপ! হায় পাপ! মনে পড়েছে। এখন আমাদের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে! এক অমাবস্যা রাতের শেষ প্রহরে নারীরা জেগে উঠে দেখল, তাদের পুরুষরা শয্যায় নেই। কেউ বলেনি, তবু তারা অন্তরে নিশ্চিত অনুভব করলো, তাদের পুরুষরা প্রায়শ্চিত্ত করতে বটবৃক্ষের কাছেই গেছে।’ (মাতৃহন্তা, নির্বাচিত গল্প, পৃ ১৯৬)

দাসপরম্পরা গল্পটি শুরু করেছিলেন রম্য কথনে। কিন্তু অবশেষে তাঁর স্বভাবভঙ্গিতে তিনি মৌল বৈশিষ্ট্যের দিকে ফিরে গল্পটির সমাপ্তি টেনেছেন। অনেক ঘটনার সন্নিবেশ এ গল্পে লক্ষণীয়। দাসপরম্পরা তো  জীবনের অনেক ঘটনার যোগফল। একটি শক্তির দ্বারা দাস রাখা যায় না। যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের অনেকগুলো সূচক ক্রিয়াশীল থাকে। পশ্চাৎপদ, দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিমজ্জিত সমাজে অনেক ঘটনাই স্বাভাবিক মনে হয়। সহ্যক্ষমতাও বেড়ে যায়। যখন অভাব অনটনে খাবারের সন্ধানে অস্তিত্ব হেলে যায় নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোথাও। কেউ ধর্মান্তরিত হয়, ট্রেনে ভ্রমণের সময় ট্রেনের বাথরুমে দেহদান করে রেলগাড়ির টিটির কাছে।

ঋণ ও সামূহিক কারণে এ চিরদাসত্বের চালচিত্র জাকির রূপায়ণ করেছেন তাঁর পিতৃগণ উপন্যাসে। কৈবর্তদের সংগ্রাম ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সন্ধানে বাঙালি জাতিসত্তার খোঁজে আত্মানুসন্ধানে সন্ধিৎসু হন। এখান থেকেই আবিষ্কার করেন ভূমিপুত্রদের আদি অধিকার। জাকির তালুকদার বলেছেন :

আমি বাঙালিত্ব নিয়ে নয়, উদ্বেলিত ছিলাম বহিরাগত আর্যদের পরাজয় আমাদের ভূমিপুত্রদের রাষ্ট্রস্থাপন নিয়ে সেই কারণেই এই অবিরাম অনুসন্ধানী পথচলা

এ পথচলায় তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন কৈবর্ত-সংস্কৃতি, আচার, সামাজিকতা, ধর্ম, লোকশ্রুতি এবং জন্ম-জন্মান্তরে তাদের দাসত্ব। পথ থেকে পথে পরিভ্রমণ করে তিনি পিতৃগণ উপন্যাসে বিস্মৃত বিষয়কে অনুষঙ্গী করেছেন। এ কৈবর্তদের পরাজয় তাদের নিয়তি বলেই মনে করা হয়। যা তাদের বিশ্বাসের অনুবর্তী আচরণ মাত্র। জাকির, তাঁর সৃজনসামর্থ্যে ইতিহাসের বিবিধ উপাদানকে অনুষঙ্গী করেছেন। একইসঙ্গে আঁধার আক্রান্ত অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র তৈরি করে দিয়েছেন পিতৃগণ উপন্যাসে। দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতার নির্মম পরিণতি, এনজিও সংস্থার নির্যাতন, মহাজন-জোতদার, দখলদার-লুটেরাদের অত্যাচার ইত্যাদির মধ্যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন অঙ্কন করেছেন জাকির তালুকদার। যেমন আজগর আলীর হিসাববিজ্ঞান গল্পটি। বছরব্যাপী কাজ করেও আজগর আলীর হিসেবে কিছুই অবশেষ থাকে না। সব শূন্য হয়ে যায় মহাজনের হিসেবে। উলটোদিকে সানাউল্লাহ মাস্টারের গোলা ধানে ভর্তি হয়। আজগর আলী ফিরে খালি হাতে। ‘তারপর আবার খাতওয়ারি হিসাব করে টাকাগুলোকে হিসাব করতে যায়। তার এতদিনের পরিশ্রমের টাকা আবার খাত শেষ হবার আগেই শেষ হয়ে যায়। তার মাথাঘোরা আরো একটু বেড়ে যায়। ন্যাড়া মাঠের দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার সময়ও আর একটু বাড়ে।’

( নির্বাচিত গল্প, পৃ ৮৫)

জাকির তালুকদার সমাজের চলমান অনতিক্রান্ত বাস্তবতা, প্রতিক্রিয়ার কথা লিখেছেন সাহিত্যে। মানুষ দীর্ঘদিন একইভাবে থাকতে থাকতে বাস্তবতার দাসে পরিণত হয়। তিনি এ বাস্তবতাই তুলে ধরেছেন। তাঁর লিখন-কৌশলে মানুষের লড়াই সংগ্রাম-প্রতিবাদের কথা, মিথ-পুরাণ-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-ইতিহাসের সহযোগে শিল্পিত হয়ে ওঠে সাহিত্যে। তিনি নির্মাণ করেছেন তাঁর নিজস্ব ভাষা ও বর্ণনারীতি। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর নিজস্ব শিল্পশৈলী।

 

 

 

শাহীন আখতার

সাহিত্যে ভিন্ন স্বর ও মেজাজের শিল্পী শাহীন আখতার। ইতোমধ্যে আন্দোলিত করেছেন বোদ্ধা পাঠক সমাজের মন ও মনন। বলা অত্যুক্তি হবে না যে, সাহিত্যে তিনি অতি স্বল্প সময়ে ঈর্ষার স্থানটি দখল করে নিয়েছেন। কথাসাহিত্যে তাঁর চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিকোণ, বিষয় ও ভাষা বয়নের ভঙ্গিতে নিশ্চিত ব্যবধান তৈরি করেছেন। বিষয় নির্বাচন করেছেন আমাদের পরিচিত জগৎ থেকেই। তিনি যেক্ষেত্রে ওই বিষয়কে বিনির্মাণ করেছেন, তাতে সহজেই শাহীন আখতারের নিজস্ব নির্মিতি বলেই শনাক্ত করা যায়। সক্রিয় রয়েছেন, তাই অনন্য কিছু সৃষ্টির কাজে তিনি নিজেকে সচল রাখবেন বলেই আমাদের ধারণা। সাহিত্যে তিনি ব্যতিক্রম সৃষ্টির একজন বলে প্রশংসিত হয়েছেন। ইতোমধ্যে কয়েকটি পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ২০১৪ সালে আইএফআইসি ব্যাংক পুরস্কার, প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার প্রভৃতি। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো : সতী স্বতন্তরাবাংলা সাহিত্যে নারী (তিন খণ্ড), জানানা মাহফিলবাঙালি মুসলমান লেখিকাদের নির্বাচিত রচনা, পালাবার পথ নেই, তালাশ, ময়ূর সিংহাসন, বোনের সঙ্গে অমরলোকে, শ্রীমতির জীবনদর্শন, সখী রঙ্গমালা ইত্যাদি। এ ছাড়াও কয়েকটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তালাশ উপন্যাস ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ফলে, অন্য ভাষার পাঠকদের কাছে তাঁর রচনা প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়েছে। শাহীন আখতার লেখার পরিমাণে স্বল্পপ্রজ। কিন্তু অত্যন্ত পরিমিতিবোধ ও ভাষা নির্মাণের অসামান্য দক্ষতায় তিনি সকলের দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছেন, তা বলাই বাহুল্য। তালাশ উপন্যাসের ভিত্তি হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনেক উপন্যাসের ভিড়ে তালাশ ভিন্ন কিছু বলে পাঠকের কাছে পঠিত। তিনি বর্ণনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু, যুদ্ধের ভেতরে যুদ্ধরত মানুষের কথা বলেছেন। এ মানুষেরা ক্ষত, বিক্ষত, আক্রান্ত হয়েছে নানাভাবে। তাদেরই একজন মরিয়ম। বীরাঙ্গনা মরিয়ম বেঁচে থাকে, তার অন্তরে ক্ষত, বিশাল এক গহ্বর। লেখকের সঙ্গে পাঠকসহ সবাই মুক্তিযুদ্ধের না বলা কথা জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠে শাহীন আখতারের তালাশের অনুপ্রেরণায়।

ইতিহাসে আমরা যত যুদ্ধ লক্ষ করি এর অনিবার্য পরিণতি হলো, নারী নির্যাতন, শিশু ও বয়স্ক মানুষ হত্যা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশে একইভাবে নারীরা আক্রান্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এর কারণকেন্দ্রিক প্রশ্নের উত্তরে যে তালাশ- এর সংগে সবাই সংযুক্ত। এখনও সে প্রশ্নের আপাত সমাধান পেলেও আমরা তালাশের পেছনেই আছি। তিনি সংবেদন, সচেতন বলেই এ উপন্যাসে প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত নির্যাতিত নারীদের কথাই ব্যক্ত করেছেন।

বর্ণনার পরিমিতি, ভাবালুতাহীন ভাষা পাঠককে মোহাবিষ্ট করতে সক্ষম। উপন্যাসের শুরুতেই তিনি অধ্যায়ের নাম দিয়েছেন, ‘জলাভূমির গোলকধাঁধা’। প্রারম্ভিক বর্ণনাতেই অসামান্য জাদু তৈরি করেন শাহীন আখতার। বর্ণনায় কাব্যময়তা আছে, কিন্তু এর কি আবশ্যিক প্রয়োজন ছিল? বিষয়ের সংগে সম্পৃক্ত করতে তাঁর উদ্যোগ কি না, তা বোঝা যায় না। তবে চমৎকারিত্ব আছে।

প্রসঙ্গত, তালাশ উপন্যাসের পাঠকপ্রিয়তা, বিষয়বস্তু ও নির্মাণশৈলী নিয়ে তিনি এক সাক্ষাৎকারে কিছু কথা বলেছেন। ‘২০০৪ সালে একুশে বইমেলায় তালাশ উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়। শুরুতে বইটি ছোট পরিসর হলেও পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এর কারণ হয়ত বইয়ের বিষয় মুক্তিযুদ্ধ। তা ছাড়া দুই লাখ নির্যাতিত নারীর কথা যে আমরা শুনি, তাদেরই একজন উপন্যাসের মূল চরিত্র মরিয়ম। তাকে ঘিরে উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে যুদ্ধোত্তর আরও তিনদশক জুড়ে। একথা সত্য যে, যুদ্ধ ধর্ষণের শিকার নারীর জীবনটা পুরোদমে পিষে ফেলে, তার ভোগান্তি যুদ্ধকালেই শেষ হয়ে যায় না, চলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তাতে মহত্ত্বের ছোঁয়া থাকে না। বরং বিষয়টা ধামাচাপা দেওয়ারই পায়তারা চলে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের এ আড়াল করা অধ্যায়টি জানার কৌতূহল নিশ্চয়ই আরও অনেকেরই ছিল। আমার মনে আছে মেলা চলাকালেই নিউএজ পত্রিকায় তালাশ-এর দীর্ঘ আলোচনা ছাপা হয়েছিল। এর পরে বাংলাদেশের কম দৈনিক বা সাপ্তাহিক আছে, যেখানে এর আলোচনা-সমালোচনা হয় নাই।’

তাঁর নিজের কথা থেকেই আমরা বুঝে নিতে পারি তালাশ উপন্যাসের তালাশের মর্মার্থ কী। যুদ্ধযাত্রার আগে থেকেইে মরিয়মের যুদ্ধ শুরু হয়। জীবনে বেঁচে থাকা না থাকার কী আছে, কিন্তু অস্তিত্বের তালাশ চলে অবিচল, অবিরাম। মরিয়ম নির্বোধের মতো ছাত্রনেতা আবেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। তারপর প্রতারিত হয়ে গর্ভপাত ঘটাতে হয়। এরপর পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বাজারি দ্রব্যের মতো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চালান হয়ে যাওয়া। ‘মল্লিকপুর থেকে যেদিন চালান হয়, তখন রাত না দিন, মেয়ে দুটি সঙ্গে আছে কি নেই, তারা শাড়ি পরেছে কি পরেনি, বোঝার উপায় ছিল না। কারণ, ঘর  থেকে চোখ বেঁধে তাদের বাইরে আনা হয়। সেখানে অন্ধ প্যাঁচার মতো তারা দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ।’ (তালাশ, পৃ ৬৮)Print

যুদ্ধ পরবর্তী সময়েও মরিয়ম, অনুরাধা, শোভারানির যুদ্ধ শেষ হয় না। বরং, আবার নতুন সংকটে যুদ্ধ শুরু করতে হয়। মরিয়মরা নির্যাতিত, এ কারণে বীরাঙ্গনা। তবে সামাজিক বোধ পরিবর্তিত হয় না বলে বীরাঙ্গনার সম্মান এ সমাজ দিতে পারেনি। এ কথাটি শাহীন তাঁর লেখনিতে তুলে ধরেছেন। সাধারণ মানুষ এ নিয়ে উপহাস করেছে। এ হলো ভাবালুতাহীন নিখাদ বাস্তব। আবেগহীন এমন বর্ণনা এ উপন্যাসের আলাদা মূল্য তৈরি করে। ‘’৭২ সালে পুনর্বাসনকেন্দ্র থেকে মরিয়মদের যখন চাকরি দেওয়া হয়েছিলো রেডক্রস বিল্ডিংয়ে, সারাক্ষণ মানুষের ভিড় লেগে থাকত ওখানে। ‘কী ব্যাপার? কী চান আপনারা?’ জিগ্যেস করলে বলত, ‘আমরা বীরাঙ্গনা দেখতে আইছি।’ (তালাশ, পৃ ২২৩)

অবশেষে সবাই এক অনিশ্চিত জীবনের দিকে যাত্রা শুরু করে। যেখানে তালাশ শেষ হয় না। লেখক যেভাবে বর্ণনা সমাপ্ত করেন, ‘টুকির মুখ থেকে আঁচল সরে যায়- যে দেশের জন্য আমরা শরীরের রক্ত দিছিলাম।’

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পর শাহীন লোকবাংলার উপাদানের কাছে ফিরে গেছেন। লোকায়ত সংস্কৃতির কাহিনি, উপাদানে নির্মাণ করেছেন অনন্যউপন্যাস সখী রঙ্গমালা। তাকে কেন্দ্র করেই দুই রাজবিলাসী ব্যক্তির প্রতিযোগিতা। এখানেও নারীকেন্দ্রিক কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। শাহীন লোককথা ও লোকায়ত ইতিহাসের উপাদানে সমৃদ্ধ করেছেন এ উপন্যাসের কথাবস্তু। সখী রঙ্গমালা লেখকের স্বীয় সৃজনকৃতিতে শৈল্পিক হয়ে ওঠে। জমিদারনন্দন রাজচন্দ্র চৌধুরী ব্রাত্য রঙ্গমালার প্রেমপ্রার্থী। অন্যদিকে পিতৃব্য রাজেন্দ্র নারায়ণ নানা কূটকৌশলে রাজচন্দ্রকে পরাভূত করতে চেষ্টা করেন। অবশেষে এ দু-জনের দ্বন্দ্ব হিংসাত্মক রূপ নেয়। রাজেন্দ্র নারায়ণ পরাজিত হন। রাজচন্দ্র রাজ্যের মালিক হন। প্রেম ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বই এখানে প্রবল হয়ে ওঠে।  এখানেও চরম সত্য- প্রেমের জন্য, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নারীকে চরম মূল্য দিতে হলো। সখী রঙ্গমালা রক্ষিতা হয়েও জীবন দিতে হলো, ফুলেশ্বরী হলো নির্বাসিত।

শাহীন ক্রমশ ইতিহাসের দিকে চলতে চলতে কখনও লোকায়ত কখনও রাজনীতির ইতিহাসে নিয়ে গেছেন। তাঁর আরও একটি চমৎকার উপন্যাস ময়ূর সিংহাসন। ময়ূর সিংহাসন তৈরি করেছিলেন সম্রাট শাহজাহান। সিংহাসনের ক্ষমতা নিয়েই চার ভাইয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত। ফলে তারা রক্তাক্ত করেছে শাহজাহানের রাজত্ব। সম্রাট শাহজাহান অসুস্থ হলে ভাইদের মধ্যে সংঘাতের শুরু। চারজনই এ ময়ূর সিংহাসনের দাবিদার। এ উপন্যাসে শাহীন জোর দিয়েছেন শাহ সুজার পালিয়ে যাবার ঘটনাকে। ঘটনার সময় ১৬৫৯-১৬৬৫ খ্রি. পর্যন্ত বিস্তৃত। শাহ সুজা আরাকানে পালিয়ে গেলে সেখানেই তিনি নিহত হন। তবে এখানে শাহীন আখতার সুজা কন্যা গুলরুখের প্রতি সুলতান ও কাতিবের আকৃষ্ট হওয়ার বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে অঙ্কন করেছেন। কাতিব ব্যর্থ হলেও তার ছুটে চলার পথে অনেক বিবরণই পাঠককে আকৃষ্ট করে। উপন্যাসে সিংহাসনের কথা থাকলেও আরাকান রাজ্য, এর ইতিহাস, রাজা সুধর্মা, পর্তুগিজদের কথা প্রভৃতি উপস্থাপিত হয়েছে। ইতিহাসের ছায়ায় প্রেমের কথাই বিবৃত হয়েছে বেশি। উপন্যাসের চরিত্রগুলো আত্মবয়ানে নিজের ও পারিপার্শ্বিকতার বিবরণ তুলে ধরে। অবশেষে সিংহাসন বা ক্ষমতা মুখ্য থাকে না। উপন্যাসে সর্বত্রই যেনও বিচ্ছেদ ছড়িয়ে আছে। কোথায় কেউ যেনও কিছুরই সাক্ষাৎ পায় না। যেমন কাতিবের বয়ানে চিরবিচ্ছেদের কথারই প্রতিধ্বনি শুনি, ‘আমি কি কিতাবের মানুষগুলোর কথা বলছি, যারা আমার জীবন জুড়ে ছিল। সবাই এক এক বিদায় নেওয়ার সময় আমার রুহ-কলিজা একটু একটু করে ছিঁড়ে নিয়ে যায়।… যে যেখানে যেভাবে থাকুক, আগের সুযোগ-সুবিধা বা অভ্যাসের ছিটেফোঁটা রয়েই গেছে। আমিও কি কাগজ-কলমে বেড়ি ভাঙতে পেরেছিলাম?’ (ময়ূর সিংহাসন, পৃ ২৫৩)

ইতিহাসের তথ্যগত শুদ্ধতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে লেখকের কল্পনাশক্তির ক্ষমতা ও ভাষার বুনন। ফলে, আমরা বাইরের খোলসে ইতিহাসের নিগড়ে বন্দি না থেকে উপন্যাসে উপস্থাপিত সাধারণ জীবনালেখ্য পাঠ করি। এখানেই শাহীন আখতারের অনন্য নির্মিতি ও কৃতিত্ব।