সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

চিত্রকলা

October 13th, 2016 7:33 pm
চিত্রকলা

chitrokola-1

চিত্রকলা

ভার্চুয়াল প্রজেক্ট ও তার শরীর

ফেইসবুককে শিল্পী নাজিব তারেক তার শিল্পধারণা প্রচারের একটি ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। বিচ্ছিন্নভাবে ছবি পোস্ট করার বদলে একটু সুচিন্তিতভাবেই। ব্যবহারের সেই নির্দিষ্টকরণের একটি কার্যক্রমকে তিনি প্রজেক্ট বলছেন। যা ‘আর্ট মেকস আস হিউম্যান’ বা ‘শিল্প আমাদের মানুষ করে তোলে’ শিরোনামে প্রচারিত। ভার্চুয়াল এই প্রজেক্টকে তিনি শরীরীরূপ দিয়ে বাস্তব ও নিজস্ব স্পেসের আরেকটি প্রজেক্টকেই বোধহয় সক্রিয় করেন আমাদের জন্য। নাজিব তারেকের সেই স্পর্শযোগ্য ও চলনযোগ্য স্পেস ‘স্টুডিও ৬/৬’-এ বসেই  কথা হলো ‘প্রজেক্ট’ ভাবনার রকমফের জানতে। যা ডালপালা মেলেছিল এলোপাতাড়ি।  শব্দঘর-এর পক্ষে কথা বলেছেন শিল্পী দীপ্তি দত্ত। তারই কিছু অংশ এখানে শিল্পরসিক পাঠকদের জন্য

chitrokola-2শব্দঘর : ‘শিল্প আমাদের মানুষ করে তোলে’- এই ধারণার উপস্থাপনকে প্রজেক্ট বলছেন কেন?

নাজিব তারেক : আমি কোনো একটা আইডিয়া নির্মাণ করি, তা লিখি, তারপরে তা কোনো একজনের কাছে উপস্থাপন করা হয়, তিনি ফান্ড দেন। এ পুরো প্রক্রিয়াটাকে আমরা বলছি প্রজেক্ট। আমি যা করছি তা এরকম নয়। আমি এই প্রক্রিয়াটার ভিতরে নাই। আমাদের হয় এখন একটা নতুন শব্দ খুঁজে বের করতে হবে অথবা এ শব্দটিকেই ব্যবহার করতে হবে। তো আমি ভাবলাম, নতুন শব্দ খুঁজে বের করার চেয়ে, গত ৪০ বছরে যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, সেটিকেই ব্যবহার করি। তা দিয়ে গত ৪০ বছরে যে প্র্যাকটিসটা হচ্ছে তাকেও চ্যালেঞ্জ জানাই। দেখ, তুমি যে কন্টেমপোর‌্যারি আর্টিস্ট, মডার্ন আর্টিস্ট। প্রজেক্ট ট্রজেক্ট কইরা আসলে যে তুমি পুঁজিপতির দ্বারস্থ হইতেছ, এটা ছাড়াও সম্ভব। মডার্ন আর্টে শিল্পীর স্বাধীনতার জায়গাটা তৈরি হইছে। পোস্টমডার্ন আর্টের আগে তো শিল্পী অন্তত ছবিটি এঁকে ফেলতো কিংবা স্কাল্পচারটা করে ফেলতো। তারপরে না হয়, সেল হবে কি হবে না সে বিপদে পড়তো। কিন্তু সে প্রজেক্ট অ্যাপ্রুভালের জন্য বসে থাকতো না।

শব্দঘর : ফেসবুকের এই প্রজক্টে প্রায় সাতশ’র বেশি ছবি আছে। যেখানে ইমেজ নয়, আপনার এই স্লোগানটিই গুরুত্ব পেয়েছে। স্লোগানের ইলাসট্রেশন হিসেবে ইমজেগুলো এসেছে। যা বাজারি ইমেজ। বাজারি বলছি, কারণ অন্যের চাহিদামতো করা ইলাসস্ট্রেশন। আবার ব্র্যাণ্ড মার্কেটিং বিষয়ে আপনার লেখা আছে, নিজেও কাজ করেন। নিজস্ব ব্র্যাণ্ড তৈরির জন্য এই ‘প্রজেক্ট’ কি শিল্পীর আরেকটি ব্র্যাণ্ড পলিসি আসলে?

নাজিব তারেক : প্রত্যেক শিল্পীই ব্র্যান্ড চায়।

শব্দঘর : আপনি বলছেন যে ‘শিল্প আমাদের মানুষ করে তোলে’। শিল্প আর মানুষ দুটি সত্তা? মানুষের ওপর শিল্প প্রযুক্ত হচ্ছে দ্বিতীয় সত্তা হিসেবে?

নাজিব তারেক : মানবাকৃতির ওপর প্রযুক্ত হচ্ছে। শিল্পপ্রযুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত সে আসলে মানবাকৃতি। একটি প্রাণী মাত্র।

শব্দঘর : শিল্পপ্রযুক্ত হওয়ার পর সে মানুষ হচ্ছে। এই প্রযুক্ত হওয়ার কাজটা কিভাবে হচ্ছে?

নাজিব তারেক : আমরা জানি, যারা ডিসকভারি চ্যানেল বা এ ধরনের বিভিন্ন চ্যানেল দেখি তারা জানি যে, হাতি দলবদ্ধভাবে চলে। কেন চলে? তার অন্যতম কারণ হচ্ছে বাচ্চা মানুষ করতে হবে। হাতি কিন্তু একা চলাচলে সক্ষম প্রাণী। হাতি, তিমি এরা কিন্তু একা চলতে সক্ষম। এদের আকৃতির জন্য। কিন্তু তবু  সে সমাজবদ্ধভাবে চলে। এখানে এই যে প্রযুক্ত শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস। আফ্রিকায় একটা প্রবাদই আছে যে, একটি বাচ্চা মানুষ করতে পুরো গ্রাম লাগে। অতএব কে প্রযুক্ত করছে…

শব্দঘর : তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন এটা ন্যাচারাল থিং?

নাজিব তারেক : এখানেই হচ্ছে টুইস্টটা। আমি হাতির উদাহরণ কেন দিয়েছি? হাতি একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাটেই চলছে, কয়েক কোটি বছর ধরে। আর এখানেই হচ্ছে মানুষ এবং হাতির মধ্যে পার্থক্য। মানুষ ক্রমাগত নিজে ক্রিয়েট করে যাচ্ছে। একই জিনিসের বহু ব্যবহার চিহ্নিত করছে। এই যে মানুষের এ পারাটা। বিজ্ঞান? না বিজ্ঞান না এটা। বিজ্ঞান তাকে পারার সক্ষমতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু পারার ইচ্ছেটা আর্ট।

আর্টিস্টের কাজ হচ্ছে সমকালীন বা প্রচলিত যে ব্যবস্থা তাকে অতিক্রম করে যাওয়া। এখন তুমি বলতে পার যে, এটাতো বিজ্ঞানীও করে, প্রযুক্তিবিদও করে। এখন প্রবলেমটা হচ্ছে বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও আর্টিস্টের পার্থক্য কী। বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ সোস্যাল কন্টেন্ট নেই। আর্টের গুরুত্বটাই হচ্ছে এখানে। এইখানে ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড সারা পৃথিবীকে লিড দিচ্ছে এই বাক্যটা বোঝার জন্য।

শব্দঘর : প্রযুক্তিবিদ চাহিদা তৈরি করে।

নাজিব তারেক : না প্রযুক্তিবিদ চাহিদাও তৈরি করে না। দেখ সোসাইটিতে, ইউরোপের সোসাইটিতে আর্টিস্ট আইডিয়াস, আর্টিস্টের গুরুত্বটা হচ্ছে এখানে। তুমি মনে করো না যে, আনিশ কাপুরকে কয়েকদিন আগে যে সাইনটি করিয়েছে, এ ব্ল্যাক কালারটি সেটি আনিশ কাপুর ছাড়া আর কেউ ব্যবহার করবে না। খুব সিম্পল ব্র্যান্ড মার্কেটিংয়ের জায়গা থেকে ভাবো তো, যে এই ব্ল্যাকটির মার্কেটিং কী করে সম্ভব। সম্ভব না। কারণ কনজুমারিজমের জায়গা থেকে এটি তাকে বেচতে হবে ১০০ টাকায়। এর চেয়ে বেশি তো করতে পারবে না। না হলে সে লার্জ স্কেলে হতে পারে ইন্ডাস্ট্রিয়ালি।

শব্দঘর : আর্টিস্ট যা করছে। আপনিতো বলবেন আর্টিস্ট ডিকোডিং করছে। আর্টিস্ট কি অ্যানার্কিস্টের মতো ডিকোডিংই করবে।

নাজিব তারেক : না না তুমি এনার্কিস্টের জায়গাটা দেখছ কেন?

হুসেন সম্পর্কে একটি কথা হচ্ছে, আরে দূর, উনার কাছে কেউ ছবি কিনতে আসলে উনি জিজ্ঞেস করে তোমার দেয়ালের রং কি? সোফাসেটের রং কি? তো কেন হুসেন এটা মনে রাখে, কেন এটা জিজ্ঞেস করে? কিভাবে জিজ্ঞেস করে? এবং কেন করে?

কারণ পুরো ভারতবর্ষের মধ্যে হুসেনই একমাত্র লোক যে পুরো পাশ্চাত্য শিল্পের ইতিহাসটা জানে। কারণ হুসেন লাইব্রেরিতে বসে এই পড়াটাই পড়ছে। ও কোনো স্কুল থেকে সার্টিফিকেট নেয় নাই। রেনেসাঁর শিল্পীরা অর্ডারি কাজ করতো। আর মডার্ন শিল্পীরা নিজের মতো আঁকে। ও দুটোর সমন্বয় সাধন করছে। এবং তার এ সমন্বয় সাধনটি এর প্রক্রিয়াটি পরবর্তী পর্যায়ে ইন্ডিয়ান মার্কেটিং স্ট্র্যাটিজিস্ট গুরুদের কাছে একটি তত্ত্ব হিসেবে দেখা দিয়েছে। আর্টিস্ট এ তত্ত্বটা দেয়।

শব্দঘর : আর্টিস্ট কি আসলে এ তত্ত্ব নির্মাণ করতে চাইছে? নাকি তার নিজের সারভাইভাল পলিসি, নব্য পুঁজির আর্থ-কাঠামোর সাথে শিল্পের নব্য মার্কেটিং পলিসি. . .

নাজিব তারেক : আমি বলছি। আমার সাথে তার ডিফারেন্সটা হচ্ছে ওইখানে। একটা জিনিসকে আমরা কখন পণ্য বলি। যখন সেটা সংগ্রহযোগ্য হয়। এবং সেটির বিনিময়যোগ্যতা তৈরি হয়। পণ্য ব্যাপারটাতো আসলে সংগ্রহযোগ্যতার নয়। পণ্য ব্যাপারটা হচ্ছে বিনিময়যোগ্যতার। একটি নারী শরীরতো কেউ পতিতালয় থেকে সংগ্রহ করে না। সে পতিতালয়ে যায় এবং সেটা বিনিময় করে। এইজন্য আমরা বলি নারী শরীরকে পণ্য করা হয়েছে। অর্থাৎ বিনিময়যোগ্যতাটিই হচ্ছে পণ্য বিষয়টা ক্রিয়েট করছে। তুমিতো আসলে সে বিনিময়যোগ্যতাটা তৈরিই করেছ।

বাঙ্কসি’র কন্টেন্টের সোস্যাল মিডিয়া কোন স্ট্যাটাসের? বাঙ্কসি কেন এটাকে ব্যবহার করেন? এটার একটা ভাবনা আছে। বাঙ্কসি হয়তো খুব ক্লাসিক টাচে থাকতে চাইছে। ধর, এই যে আমরা বলছি ফিজিক্যাল প্রেজেন্টেশন। হোয়াই ইউজ দ্য ওয়ার্ডস। ফিজিক্যাল প্রেজেন্টেশন এর হয়তো একটা মূল্য আছে। বাঙ্কসি হয়ত এ ব্যাপারটাকেই ধারণ করতে চাইছে। এজন্যই হয়তো সে ভার্চুয়াল মিডিয়ায় যায় নাই। কিন্তু এর মূল্য তাকে দিতে হচ্ছে পালিয়ে থেকে। কারণ ফিজিক্যাল প্রেজেন্টেশনকে মূল্য দিতে গিয়ে ব্রিটেনের আইন তো তাকে ভাঙতে হচ্ছে। আমারটা সেদিক থেকে আরও এক কাঠি উপরে…

শব্দঘর : আপনারটা কী করে আইন অমান্য না করেও ডিকোডিং, কি ডিকোড করছেন…

নাজিব তারেক : আমারটা এখন পর্যন্ত আইন অমান্য না করে। কারণ তুমি এখন আছ ভার্চুয়াল জগতে। এখন পর্যন্ত আইনের স্ট্রাকচার আছে। ভার্চুয়াল জগতে আইনের স্ট্রাকচার আছে। ধর আমি ভাবলাম, যে আমি ‘জেফ কুনস’-এর মতো কিছু কাজ করবো। তার পর্নোগ্রাফির যে কাজ। আমি কিন্তু ভার্চুয়াল জগতের আইন না ভেঙেই এটা করে ফেলতে পারব। বাংলাদেশের ঢাকা শহরে বসেই।

শব্দঘর : বাংলাদেশ যদি আপনার কন্টেক্সট হয়। আর সেখানে একই কাজ যখন আপনি ফিজিক্যালি করবেন তখন যেহেতু এখানে আপনি নিষিদ্ধ হয়ে যাচ্ছেন, তার মানে আপনার কন্টেক্সটে ওইটাও আসলে ডিকোডিং। যা আপনি শিল্পীর একটা কাজ হিসেবে দেখছেন…

নাজিব তারেক : নো নো, নো, এখানে দেখতে হবে, বাঙ্কসি কিন্তু আইন ভাঙার জন্য আইন ভাঙছে না। বাঙ্কসি চাচ্ছে যে, ক্লাসিক্যাল যে আর্টফিল বা লুকস। বাঙ্কসি’র আকার স্টাইলেও দেখবা যে ওই নোটটা রাখা আছে। বাঙ্কসি কোনো ভিজুয়াল কিউবিস্ট বা ইম্প্রেশনিস্ট স্টাইলেও যাচ্ছে না। হ্যাঁ তাকে খুব দ্রুত এঁকে বের হয়ে যেতে হবে বলে সে হয়তো ওয়্যারহলকে গুরু হিসেবে নিয়েছে। ওয়্যারহলও কিন্তু ক্লাসিক লুকস থেকে বের হয় নাই। তার জায়গাটা ভিন্ন। ওয়্যারহলের ক্লাসিক ওয়েস্টার্ন লুকসের যে ফরম্যাট সেটাকে খুব মেনে কাজ করেছে। ওয়্যারহলের আমার সবচেয়ে পছন্দের কাজ হচ্ছে ‘ডু ইয়োরসেলফ’। অন্যান্য কাজগুলোয় সোস্যাল কন্টেক্সট মুখ্য। কিন্তু এখানে সে আর্টিস্ট সোসাইটিকেও ইনভলভ করে ফেলছে। সে সমগ্র সোসাইটিকে শুধু যুক্ত করে নাই। একেবারে আর্টিস্ট সোসাইটিকেও এর সঙ্গে যুক্ত করে ফেলছে।…

শব্দঘর : আমি বলছি যে, আপনি গ্রাফিতি বলেন আর যাই বলেন এখানে আপনারা কেবল একটা স্টাইল হিসেবেই দেখে নেন। আমাদের আর্টিস্টরাতো খালি স্টাইলটাই খোঁজে। আর তার অনুকরণ করে। সেইটাও যদি করেন, আমাদের আর্টিস্টদের এ অনুকরণপ্রিয়তাও এক্ষেত্রে কাজ করে না। সেই জায়গা থেকে বলা যায়, আমাদের আর্টিস্টরা আসলে স্টাইলের ক্ষেত্রেও খুব চুজি। যে কারণে ব্যক্তিগতভাবে, অ্যাবস্ট্রাকশনের দিকে যাত্রা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। আমাদের অ্যাবস্ট্রাকশনকে গ্রহণ ও তার দিকে যাওয়া।

chitrokola-3

আপনার কাজ দিয়েও আলটিমেটলি মনে হয় যেন, টু-ডি, কিন্তু টু-ডি না আসলে। আবার এটা কোনো ধরনের ইমোশন দেয় না। যদিও আপনি ফিগারে যে ভাঙচুর করেন, যে ফ্যাসেটগুলো তৈরি করেন সেগুলো দিয়ে ফরম্যাল ল্যাঙ্গুয়েজ যেন এক্সপ্রেস করতে চায় কিছু, কিন্তু ভ্যানগগিয় স্টাইলে শেষ পর্যন্ত কোনো এক্সপ্রেশনও ক্রিয়েট করে না। কয়েকটা ফর্মে রূপান্তরিত হয়। যে কাজগুলোয় নারী ফিগারে সেন্সেবিলিটিটা আছে, সেটা করেছেন টু-ডিতে, এক্সট্রিম টু-ডিতে। কিন্তু ভয়াবহ সেন্সুয়্যাস। আমার কাছে মনে হচ্ছিল ওই একই সংকট। আপনার কাজের ইভ্যুলিউশনটা দেখলে বোঝা যেতো। আর্টিস্টের পলিটিক্যাল সিচুয়েশনের সঙ্গে তার একটা ভাবনার এসিমিলেশন নিশ্চিতভাবেই থাকার কথা। এটা একটা বিষয়। আরেকটা বিষয় হচ্ছে যে, আমি মনে করি, শেষপর্যন্ত আমাদের ডিজায়ারগুলো হচ্ছে এক ধরনের রূপান্তরিত ফর্মের দিকে নিয়ে যায়। আসলে রূপান্তরিত এক্সপ্রেশনের দিকে নিয়ে যায়। যে কারণে আমাদের অ্যাবস্ট্রাকশনের যে সংকট, সেটা হচ্ছে- আমি সবাইকেই ধরছি না, কিন্তু আমি অধিকাংশকেই মনে করি এই সংকটে আক্রান্ত। আমার কাছে নাজিব তারেকের কাজ দেখতে দেখতেও একটা পর্যায়ে মনে হয়েছে যে, সেও এই সংকটে আন্ত। আমার তাকে এতটা গ্রাফিক্যাল মনে হয় নাই, যতটা দৃশ্যমান। গ্রাফিক্যাল জায়গা থেকে ইনফ্লুয়েন্সড হয়ে শুধুমাত্র তার ছবি এই ক্যারেক্টার নিচ্ছে না। বরং আর্টিস্ট গ্রাফিক ক্যারেক্টারটাকে আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করতেছে তার ডিজায়ারটাকে মিনিমাইজ করে একটা রূপ দেয়ার জন্য।

নাজিব তারেক : আমি একটু বলি, প্রবলেমটার আপডেটস আছে এখানে। যত ইমেজ ব্যবহার করা হচ্ছে, প্রত্যেকটি হচ্ছে একেকটি ইলাস্ট্রেশন। প্রথম কথাই হচ্ছে ও্ই ইমেজের কন্টেক্সটি আসছে একটি টেক্সট থেকে। কেউ একজনের কোনো একটি টেক্সট লিখেছে, আমি সেই টেক্সট পাঠের পর প্রতিক্রিয়াটি চিত্র আকারে উপস্থাপন করছি। যেকোনো ইলাস্ট্রেশনের প্রধান শর্তই এটা। ইলাস্ট্রেশনের যে মুদ্রণ ব্যবস্থা, ইলাস্ট্রেশনগুলো করার সময় আমাকে মাথায় রাখতে হচ্ছে তৎকালীন মুদ্রণ পরিস্থিতি ও ব্যবস্থাকে। ওই সময়টায় অফসেট প্রিন্টিং মাত্র এসেছে। ব্লকের যুগ থেকে বের হয়ে আমরা কেবল অফসেট প্রিন্টিংয়ের দিকে যাচ্ছি। সো পজিটিভ নেগেটিভ যে বিষয়গুলো সে-বিষয়টিকে আমাকে মাথায় রাখতে হচ্ছে। আমার কাজের ক্ষেত্রে আমার নিজের ফর্ম ভাবনা যেমন থাকছে, টেক্সট মাথায় থাকছে, আর থাকছে মুদ্রণ পরিস্থিতি ও টেকনোলজি। আমি যখন এ প্রজেক্টটি ফেসবুকে করতে শুরু করি, তখন কিন্তু আমি একেবারে রিসেন্ট ইলাস্ট্রেশনগুলো দিয়েই শুরু করেছিলাম। ইলাস্ট্রেশন হিসেবে সবচেয়ে বেশি দাবি করে যে ইমেজগুলো সেগুলো হচ্ছে, ওয়ার্ল্ড আর্ট। আমি যদি ইউরোপিয়ান ইমজগুলোকেই ওয়ার্ল্ড আর্ট হিসেবে ধরে নিই তাহলে ইমেজ পেতে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমি যদি সারা পৃথিবীর দিকে ভালোভাবে তাকাই তাহলে আমি ভয়ঙ্কর বিপদে পড়ব। সেখানে ধর আমাদের ইন্ডিয়ান মাস্টারপিসের ছবিই আমি পাব না। মাস্টারপিসতো দূরের কথা। আমি আমার পছন্দের দু-একজন আর্টিস্টের ছবিও আমি পাব না। মানে ভারতবর্ষের পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসের কথা ভুলে যাই। আমি জাস্ট রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা কাজ ব্যবহার করতে চাই, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন সময় আমরা বিভিন্ন জায়গায় কয়েকটা ইমেজ দেখেছি। আমার দৃষ্টিতে তার সেরা ছবি হচ্ছে একটা ফুল। আমি এই ইমেজ এখন খুঁজে পাব না। আমি নেটে খুঁজে দেখছি। ইমেজটা পাচ্ছি না। আমি যখন রবীন্দ্রনাথের কোনো ছবি ইলাস্ট্রেশন হিসেবে ব্যবহার করতে চাচ্ছি, আমি তো ওটাই রাখবো, ওর সর্বোচ্চটা রাখবো। আমি মনে করি এটাই আমার দায়িত্ব। তো আমি সেটা পারব না। ওই ব্যর্থতা নেয়ার চেয়ে আমি এই ব্যর্থতা একটু সরিয়ে রাখলাম। এটি আমার ব্যর্থতা। আমি একে ব্যর্থতা হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তাকে সরিয়ে রাখলাম। যে আগ্রহী ছাত্র। চারুকলার নয়, তার মাথায় যদি ঢোকে আর্ট ম্যাকস আস হিউম্যান, সে কিন্তু ওয়ার্ল্ড মাস্টারপিস খুঁজে নিতেই থাকবে। কিন্তু আমি তাহলে ইলাস্ট্রেশন হিসেবে কি ব্যবহার করব। অজস্র ড্রইং আছে আমার। পনের-কুড়ি হাজার। আমি সেই ড্রইংগুলো দিয়েও শুরু করতে পারতাম। আমি একটু সামাজিক হতে চাইলাম। আমি যে ইলাস্ট্রেশনগুলো করেছি, সেগুলো শুধু আমাকে ধারণ করে না। ইলাস্ট্রেশনগুলো একজন কবির চিন্তাকেও ধারণ করে। একজন সম্পাদকের চিন্তাকেও ধারণ করে, একজন প্রকাশকের চিন্তাকেও ধারণ করে। তাই একটু সোস্যাল।

chitrokola-4শব্দঘর :  না, এই জায়গাতেই আবার মিডিয়া চরিত্রের কথা আসে। কথিত পপুলার ইলাস্ট্রেশনের এই ইমেজগুলো দিয়েই সোস্যাল মিডিয়াতেই আবার আপনি আপনার চিন্তাকে এক্সপ্লোরের কাজে যখন ব্যবহার করেন সেই ক্ষেত্রে একটা দায়িত্বহীনতার প্রশ্ন চলে আসে কিনা? শিল্প আমাদের মানুষ করে তোলে, আর এই যে  কথিত ইমেজগুলো, যে ইমেজগুলা আসলে সোসাইটিকে ডিকোডিং করে না, যে ইমেজগুলা আসলে আমাদের কথিত সোসাইটির রিপ্রেজেন্টেটিভ মাত্র। সেই ইমেজকে আবার শিল্প আমাদের মানুষ করে তোলে, এর মধ্য দিয়ে প্রচার করা। এই প্রচার করা, আপনি নিজেই বলছেন যে, ইমেজের একটা নিজস্ব গুরুত্ব আছে, আমি যদি টেক্সট ফেলে দিই তারপরও। তাহলে সেই ইমেজকে আবার মানুষের মস্তিষ্কে প্রবেশ করানো, এই যে দায়িত্বটা পালন করা…

নাজিব তারেক : বলছি বলছি, ইমেজগুলো আমার করা। প্রথমেই ওই যে বলেছি, সবচেয়ে উপযুক্ত জিনিসগুলো আমি ব্যবহার করতে পারছি না। দ্বিতীয় উপযুক্ত জিনিস কী ছিল? সেটা হলো নতুন করে ইলাস্ট্রেশন করতে থাকা কন্টিনিউয়াস।

শব্দঘর : আরেকটা উপায় ছিল, সেটা হচ্ছে আপনি প্রজেক্ট দিয়ে যে কনভেনশনাল জায়গাটাকে স্যাটায়ার হিসেবে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন বলছেন, সেখানে এই ইমেজগুলোও কেন? এটা একটা মধ্যপন্থা। এগুলো দেখে কেউ এটা ভাববে না যে, আর্টিস্ট এটাকে স্যাটায়ার হিসেবে করছেন। এটাকে মানুষ শিল্পীস্বীকৃত সাধারণ ইমেজ হিসেবেই ধরে নেবেন।

নাজিব তারেক : মধ্যপন্থা শব্দটি পারফেক্ট। আমি কোথাও কোনো প্রান্ত পন্থায় অবস্থান নিচ্ছি না। তুমি যে শব্দটি ব্যবহার করছ, স্যাটায়ার। আমি কিন্তু ডিরেক্ট স্যাটায়ারের মধ্যে ফেলছি না। আমি কিন্তু প্রজেক্ট শব্দটি ব্যবহারের পরে অনেকেই প্রশ্নটা করবে। যারা প্রজেক্ট বোঝে পুরোপুরি। তারা বলবে, এটা ক্যামনে প্রজেক্ট? আপনি কোনো ফাইল দিলেন না। যে জানে সে প্রশ্নটা করবে। আর যে জানে না সে কিন্তু তার মতো ঘুরতে থাকবে।

শব্দঘর : তারপরও আমি বলবো যে আপনার ইমেজের দায় আপনারই। আপনাকে ধন্যবাদ।

নাজিব তারেক : আপনাকেও ধন্যবাদ এবং পাঠক-শিল্পরসিকজনের প্রতি আমার শ্রদ্ধা।

chitrokola-5