5_liton-mohonto

গল্প

টেঁপি

লিটন মহন্ত

তোর কোন্টে বিশায়, মোক কওয়া নাগবার নায়। মুকত গু মাকি দেইম, বেজন্মা কোন্টেকার।

নিজের মনে একজনকে গালিগালাজ করতে করতে রুক্ষ দীঘল চুলের বেড় মাথার উপর পাকিয়ে , হন্হন্ করে জমির আইলে বাধা গরুটার দড়িতে হেঁচ্কা টান দেয় চন্দনা। গরুটার গলায় টান লাগলে হাম্বা হাম্বা করে ওঠে। বেলা পড়ন্ত, মেঘ সিঁদুরের মতো রাঙা হয়ে পশ্চিমে পাহাড়ের মতো দিগন্তে আসন গেড়েছে। গরুটা আবার হাম্বা হাম্বা করল। হালকা বৃষ্টির ছাঁট হুশ হুশ করে তেড়িকাটা ছোবল বসায় মাঠের জংলা গাছগুলোতে। আবার গরুটা ঘোৎ ঘোৎ শব্দ তৈরি করে। ঝুপ করে দোপশলা বৃষ্টি চন্দনার শরীর ভিজিয়ে দেয়। গরুর দড়ি হাতে সে খ্যানটারির বাঁশঝাড়ের কোণে শ্যালো মেসিনের ঘরের বেড়ার কাছে দাঁড়াল; চুল ভিজে বৃষ্টির জল চুইয়ে পড়ছে, বুকের কাপড়ের কাছে উঁচু ঢিবি দুটো এখন স্পষ্ট হয়নি নেতানো শাড়ির খোলসের ভেতর। চন্দনার পায়ের গোড়ালি কাদায় পচ্ পচ্ করছে। গরুটা মাথা নিচু করে বাতাসে পড়ে থাকা হলুদ রঙের কাঠালপাতা কচকচ করে চিবায়। ধলুয়া বাতাসে চন্দনার শাড়ির আচঁল এবার বেসামাল হলো।

 -মরার দেওয়া আর সময় পাইল না নামবার।

নিজের মনেই গজ গজ করতে থাকে সে, গরুটা আবার এলোমেলো ঘরের বেড়ায় লটকে থাকা বাঁশ পাতায় জিব লকলকায়। সন্ধ্যার ধুনুটি আবছা আলো-ছায়া গড়গড়িয়ে ছেঁড়া বাতাসে প্যাঁচ খোলে, গরুটা দড়ির ভাঁজে জট পাকায়। বৃষ্টি থামার জো নেই। ভেজা বাতাস হালকা মিলিয়ে গেলে, গরুর দড়ি টানতে টানতে চন্দনা বাড়িমুখি পা চালায় হনহনিয়ে। চুলের বেড় খুলে খোলাপিঠে অন্ধকারের মতো জ্যাব জ্যাব করতে থাকে। কোথাও কেউ নেই দিগন্তের মাঠে।  গরুটাকে রান্নাঘরের কোণে বেঁধে রেখে নিজের ঘরে এসে ভেজা কাপড় পাল্টায় চন্দনা, হঠাৎ হারান পিশাচটার মুখ তার মনে পড়ল। ঘরের অন্ধকারে নিজের বুকের ঢিবি দুটো মলিন শুকনো গামছায় কচলায়। মদনের বাপ পাশের ঘরে বিড়িতে পোঁচ দিলে গন্ধটা বাতাসে চূড়ান্ত ঘাই চালায়।  চন্দনা ঘরের ভেতর ঘন অন্ধকারে নিজেই আনমনা হয়ে যায়, মদনের বাপ এই ঢিবি দুইটার কিছুই করতে পারে না; মানুষটা এই জগতের কোনো কর্মই ঠিকমতো করতে পারে কিনা সন্দেহ। বিয়ের আগে খুব শখ ছিল চন্দনার  কিন্তু হায়! নেতানো মানুষটা তার নেতানো শরীর নিয়ে বিছানায় পড়ে পড়ে ঘুমায়। শরীরের জ্বালায় চন্দনার শরীরের রক্ত জল হয়ে আসে, মানুষটা বড় দুর্বল, পোড়া কপাল। পাশের বাড়ির বিশ্বজিৎ যখন-তখন তাকিয়ে থাকে, সুযোগ পেলেই ফালতু গল্প জুড়ে দেয়। গামছায় ভেজা চুল প্যাচাতে প্যাচাতে চন্দনা সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালানোর জন্য কেরসিনের বোতল হাতড়াতে যায় চৌকির তলে। মদনের বাপ ঘরের ভেতর থেকে গজগজিয়ে আবার বিড়ি জ্বালায়। আকাশটা বেফাঁস গড়গড়, গুড়ুম শব্দ করল, খড়ের ছাউনি দিয়ে একফোঁটা জল টেবিলের উপর রাখা হাঁড়িতে টপ্ করে পড়ল।

-মরার দেওয়া যে কোনদিন ভাল্ হইবে, ভগবান জানে।

চন্দনা আবার নিজের সাথেই গজগজ কচ্কচ্ করতে থাকে। গরুটা আবার রান্নাঘর থেকে হাম্বা হাম্বা করে ডাকল, সারাদিন ঘাস খেয়ে পেট ভরেনি তার। রাতে চন্দনা ভাতের মারের সাথে ভূষি আর খানিকটা লবণ মিশিয়ে খেতে দিলে তবেই রক্ষে, নচেৎ সারারাত হাম্বা হাম্বা করে কাউকে ঘুমাতে দিবে না। গরুটা বয়স চার বছর, দুইবার বাচ্চা দিয়েছে, দুধ প্রতিদিন তিন কেজি করে দেয়। মদনের বাপের চিকিৎসার জন্যে আর তিন বান টিন কিনে ছাপড়া ঘর তৈরির জন্য গেল হাটে বড় বাছুরটা বিক্রি করে চন্দনা। চন্দনা গরুটাকে আদর করে টেঁপি বলে ডাকে, টেঁপি বলে নাম ধরে ডাকলে গরুটা হাম্বা বলে উত্তর দেয়। টেঁপির গায়ের রং মিশমিশে কালো, চোখ দুটি মায়াবী যেন কাজল পরান। টেঁপি দেখতে খাটো খুটো, পেটটা শরীরের তুলনায় বেশ বড়। মাঠের মধ্যে যখন টেঁপি হেঁটে হেঁটে ঘাস খায়, চন্দনা তখন টেঁপির সাথে কথা বলে, টেঁপি কখন হাম্বা, কখন হ্রাস্, কখন চন্দনার দিকে তাকিয়ে কথার উত্তর দেয়। চন্দনাকে  দেখতে না পেলে টেঁপি আবার হাম্বা হাম্বা ডাক শুরু করে দেয়। সন্ধ্যার সময় চন্দনা রান্নাঘরের কোণায় মাটির পাত্রে শুকনো পাতা আর গোবরের ঘুটা দিয়ে ধোয়া জ্বালায়। চন্দনাকে দেখে টেঁপি লেজ দিয়ে নিজের পিঠের  উপর  ঝাপটা মারে। বৃষ্টির দিনে মশার উৎপাত অনেক বেড়ে গেলে টেঁপি রাতে ঘুমাতে পারে না, টেঁপি হঠাৎ দাঁড়িয়ে দরদর শব্দ করে পেচ্ছাপ শুরু করল। রাতে আবার মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়; অন্ধকারাচ্ছন্ন বৃষ্টি। বর্ষাকালে যখন চারপাশে বৃষ্টির পানি থৈ থৈ করে তখন টেঁপিকে নিয়ে বেশ বিপাকে পড়তে হয় চন্দনাকে; কারণ আশপাশের সমস্ত মাঠঘাট বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেলে গরু চড়ানোর আর কোনো জায়গা থাকে না। খড় কিনে টেঁপিকে খাওয়ানোর সামর্থ চন্দনার নেই, তবুও ঘন বৃষ্টির সময় নিদেনপক্ষে কয়েকটা খড়ের আঁটি কিনে টেঁপিকে খেতে দেয়। চন্দনা ইদানীং ময়না ঘোষের বাড়ি থেকে ভাতের মাড়, সবজির খোসা, বাসিভাত চেয়ে নিয়ে আসে টেঁপির জন্য। ময়না ঘোষের নিজস্ব কোনো গাই-গরু নাই; কিন্তু দই-মিষ্টির দোকান আছে রাজারহাটে। কয়েক দিনের মধ্যে ঘন বৃষ্টি কমে গেল, বৃষ্টির পানি নামতে শুরু করেছে। পানির নিচে ডুবে থাকা মাঠঘাট আবার জেগে ওঠে কিন্তু ঘাস লতা-পাতা আর থাকে না। কয়েকদিন পর আবার জমির আইলের মাথায় কচিঘাসের ডগা জাগলে চন্দনা টেঁপিকে নিয়ে আবার মাঠে যায়। টেঁপি এখন তিন মাসের পোয়াতি গরু, চন্দনার মনে নতুন করে স্বপ্ন দানা বাঁধতে শুরু করে।

দুই.

বাতাসে কেমন জানি রাতের গন্ধ। মদনের বাপ অন্ধকারে চন্দনার শরীরে কাদা মাখতে থাকে, অপ্রতিরোধ্য এক নিয়তির মারপ্যাচে শরীর খুলে যায় মানুষটার, অনেকদিন পর চন্দনা আর অস্বীকৃতি জানায় না বিছানার উত্তাপকে। এই নিশুতিরাতে পাশের বাড়ির পুকুরে অন্ধকারে কে যেন বেঢপ শব্দে জলডুব দিল। রহমান ব্যাপারির অটোরাইস মিলের শব্দ ঘোঁ ঘোঁ করে কানের কাছে সুরসুরি দেয়। খুব সকালে ময়না ঘোষের পুকুরে ডুব দিয়ে এসে ভেজা কাপড় পাল্টায় চন্দনা। মদনের বাপ বদনা নিয়ে পাশের জঙ্গলে গেছে। চন্দনা প্রতিদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে উঠোন ঝাড়ু দিয়ে টেঁপিকে রান্না ঘর থেকে বের করে আমতলায় বেঁধে রাখে। সকালে উঠোনে চন্দনার পায়ের শব্দ পেলেই টেঁপি হাম্বা হাম্বা ডাক শুরু করে দেয়। চন্দনা ধারার বেড়ার দরজা খুলে রান্না ঘরে যায়।

-টেঁপি টেঁপি, ও মদনের বাপ কোন্টে গেইলেন , এদিক আইসো টেপির কি হইছে। ও..রে …ভগবান… মোর টেঁপির কী হইল রে..।

চন্দনার কান্নার শব্দ শুনে মদনের বাপ দৌড়ে আসে, টেঁপি চিত হয়ে চারপা উপুড় করে ঢোলের মতো পেটটা ফুলে মরে পড়ে আসে। গলার দড়িটা প্রায় ফাঁসের গিঁট হয়ে এঁটে আছে। টেঁপির চোখ দুটো উল্টানো, মুখের কাছে একদলা ফেনাকে ঘিরে ডুমো ডুমো মাছি ভণ্ ভণ্ করছে। চন্দনার চিৎকার শুনে পাশের বাড়ির মদন কাকা, পুলতির মা, মন্টুর বাপ দৌড়ে এসেছে উঠানের মধ্যে। স্যাঁতসেঁতে উঠানে পায়ের চাপে পায়ের ছাপ পড়ে যায়, একচিলতে রোদের ঝিলিক পুঁইমাচায় পুঁইপাতার উপর চিকচিক করছে।

-মদনের মাও এটা তো ঘোর অমঙ্গল। গরু গলাত দড়ি নিয়া মরছে, প্রায়শ্চিত্ত না করলে নরকত যাওয়া নাগবে। এই সর্বনাশ ক্যামন করি হইল।

চন্দনা ডুকরে আকুলিবিকুলি করে কান্না করছে, সে রান্নাঘরের মেঝেতে গড়াগড়ি দেয়। টেঁপির মৃত দেহটা পেচ্ছাপের কাদার মধ্যে উল্টো হয়ে পড়ে আছে, গলার দড়িটা আটসাঁট করে আটকানো। ডুমো ডুমো কালো মাছিগুলো এলোমেলো উড়াউড়ি করলে একটা অন্যরকম দৃশ্য জ্যান্ত হয়ে ওঠে। চন্দনার শরীর চুল মাটিতে লেপ্টে আছে , একটা গরুর জন্য এই রকম আর্তনাদ সবাইকে আক্রান্ত করল। মদন পাশে এসে মায়ের আচঁল ধরে টানে। ফুলতির মা চন্দনাকে টেনে এনে ঘরের দাওয়ায় ঠেস দিয়ে বসায়। মদনের বাপ পুঁই মাচার নিচে কপালে হাত দিয়ে কুজোঁ হয়ে ছায়ার মতো বসে আছে; উদোম শরীর, তার পিঠটা ধনুকের মতো বেঁকে বেঢপ দেখায় নেতানো মানুষটাকে। বেলা বাড়তে থাকলে আশপাশের ছেলেপুলে লোকজন আঙিনায় এসে ভিড় করে। বয়স্ক জগন্নাথ মিশ্র এই এলাকার পুরোহিত, সে কোথা থেকে খবর পেয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে হনহনিয়ে আসে। চন্দনার চোখের জল শুকিয়ে গেছে, তার বেঁচে থাকার গল্পটা এখন একটু অন্যরকম হয়ে যায়। পুঁই মাচার উপর একটা কালো কাক ঝপাং করে উড়ে এসে বসল, অহেতুক কা কা করছে, বেশ অপ্রাকৃত শোনায় তাঁর ডাক। রান্নাঘর থেকে টেঁপির শরীরের গন্ধ উৎকট হয়ে বাতাসে খচ্খচ্ করছে, মনে হয় এতদিন পর গুটিপোকাদের উল্লাস শুরু হলো। ইদানীং অকারণেই টেঁপিকে নিয়ে চন্দনার মনে এক ধরনের দুশ্চিন্তা আর ভয়ের উচ্ছ্বাস খেলা করত। আজ সেটা সত্যি হলো। গ্রামের কয়েকজন জোয়ান ছেলে ঘরের চাটাইয়ের বেড়া খসিয়ে টেপিকে উঠনে বের করে, টেঁপির গলার দড়িটা এখন ঝুলে আছে। রান্নাঘরের ছোট দরজা দিয়ে কোনোভাবেই টেঁপির ফুলেফেঁপে উঠা শরীরটা বের করা যাচ্ছিল না, পা চারটা কোনো না কোনোভাবে দরজার মধ্যে আটকে যাচ্ছে। টেঁপির নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে আবার চন্দনার চোখে অশ্রু জমা হলো। বাড়ির পিছনে একচিলতে জমিতে পুরাতন কাঁঠাল গাছের নিচে গর্ত করা হচ্ছে, টেপিকে মাটিচাপা দেবার জন্য। পাশের গ্রামের হরিদাস বাদিয়া এ-তল্লাটে পূজা কিংবা বিয়ের বায়না ছাড়া আসে না কিন্তু আজ সে এসেছে বাদ্য বাজাতে নয় অন্য কারণে, দূরে বটগাছের নিচে বসে সে বিড়িতে ফুঁ দেয়। মাটির নিচে তো টেঁপির চামরা পোচে নষ্ট হবে; সে চায় নগদ কিছু দাম দিয়ে গরুর চামড়াটা খসিয়ে নিয়ে যাবে। চন্দনার আর্তি দেখে সে আর দুঃসাহস করে কথাটা বলার সাহস পেল না। জগন্নাথ মিশ্র যাওয়ার সময় শাস্ত্রমতো বিধান দিয়ে গেল।

-মদনের মাও গোহত্যা মহাপাপ, গরুটা যখন গলাত দড়ি নিয়া মরছে, তাইলে তোমাক তিনদিন গলাত দড়ি দিয়া, কাঁচাফল আর একসিদ্ধ অন্ন খায়া পারণ করা নাগবে। তিনদিন কোনো কথা কওয়া যাবার নায়, বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করি তিনদিন পর চারদিনের মাথাত শ্রাদ্ধ শান্তি করা নাগবে। মুই মঙ্গলবার সকাল সকাল চলি আসিম, সউগ কিছু জোগাড় করি থোন।

দুপুরের দিকে সব ছেলেরা মিলে টেপিকে কাঠালগাছের নিচে মাটিচাপা দিল। চন্দনা আলগা মাটি দিয়ে একটা ঢিবি তৈরি করল টেঁপির জন্য কাঁঠাল গাছের ছায়ায়। তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে একটা অবোধ পশুর জন্য, যাকে সে সন্তানের স্নেহে লালিত করেছে নিজের স্বপ্নের মতো। মদন কোথা থেকে যেন একটা তুলসিগাছ এনে পুঁতে দিল ঢিবিটার উপর। চন্দনা কারও সাথে কথা বলছে না শুধু বোবা মানুষের মতো আকার ইঙ্গিতে কথা বলছে। দুপুরের পর ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। চন্দনা ঘরের মেঝেতে খড়ের উপর ছালা বিছিয়ে শুয়ে শুয়ে বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছে; টেঁপির কথা মনে হলো। সে হাম্বা হাম্বা ডাক দিয়ে উঠল। চন্দনা ঘোরের মধ্যে অন্ত্যজ মায়ার ছায়া খুঁজে পেল যেন। মদনের বাপ ধূপের ঘ্রাণ ছড়াচ্ছিল। পুঁইমাচার পাতাগুলো থরথর করে বৃষ্টির দাপটে কাপছে, দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছে দিনের আলো ও ঘ্রাণ; বিষণ্ণ ব্যাকুলতা মনের ভেতর গর্ত তৈরি করলো। সারাদিন কিছুই মুখে দিল না চন্দনা। মদনের বাপ সন্ধ্যার পর জোর করে চন্দনাকে কলাপাতায় পাকা কাঁঠাল খেতে দেয়। টেঁপি কাঠালের ভোতনা খুব পছন্দ করত; পাকা কাঁঠাল ভাঙলেই খাওয়ার জন্য হাম্বা হাম্বা শুরু করে দিত। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই, রাতে খড়ের বিছানায় শুয়ে একা একা আকাশপাতাল চিন্তা করে। সারারাত থেকে থেকে চন্দনার ঘুম ভেঙে যায়।

খালপাড়ের নিচে একটা চামড়া ছিলান গরু পাওয়া গেল, একদল কুকুর আর কাক সেটাকে নিয়ে টানা-হেঁচড়া করছে। মাঝে মাঝে কুকুরের তাড়া খেয়ে কাকের দল শূন্যে উড়াল দিয়ে একটা আবর্তে ঘুরতে থাকে। গরুটার নাড়িভূড়ি নিয়ে দুটো কুকুর ছোটাছুটি করছে। খালপাড়ের বাতাসে পচা গন্ধ ভুঁশ ভুঁশ করে নাকের মধ্যে ঘাই চালায়। একটা পচা মাংসের শরীর নিয়ে জ্যান্ত কতগুলো প্রাণী বেঁচে থাকার লড়াইয়ে অসম যুদ্ধে মেতে উঠেছে। এই পৃথিবীতে শরীরের জন্য অন্যশরীর ন্যায়-অন্যায়ের প্রাচীরকে ভেদ করে অহরহ ভোগের নৈবদ্যে উঠে আসে, পশুদের সেই খেলাটা আদিম, প্রাগৈতিহাসিক কিন্তু মানুষের ইতিহাসের চেয়ে ভয়াবহ নয়। খুব সকালে চন্দনার ঘুম ভাঙলে সে কাঁঠালগাছের নিচে এসে দাঁড়ায়, ঢিবিটা সমস্ত রাতের বৃষ্টির তোড়ে একদম মিলিয়ে গেছে। তুলসি গাছের চারাটা কাদার মধ্যে নেতিয়ে পড়েছিল, আধচাপা হয়ে। টেঁপিকে পুঁতে রাখা গর্তটার চারপাশে এলোমেলো মাটি, খানিক কোদালের ছোপ, মানুষের পায়ের অমলিন চিহ্ন রাতের অন্ধকারকে ক্রমশ স্পষ্ট করে তুলেছে। টেঁপি নেই। চন্দনা গর্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে খালপাড়ের দিকে তাকায়, একটা চেনা গন্ধ যেন ডানা মেলে এদিকে ভেসে আসছে।

 -টেঁপি… টেঁপি

চন্দনা চিৎকার করতে করতে দৌড়াতে থাকে খালপাড়ের দিকে, বাতাসে তার খোলাচুল নিতম্ব ছাপিয়ে আষাঢ়ের বাতাসে হাজার নাগিনীর ফণার মতো দুলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares