3_abul-kashem

গল্প

একটি বিড়াল কাহিনি

আবুল কাসেম

বিড়াল ছানাটি বড় হয়েছে। ছানা থাকার বয়স উতরে গেছে প্রায়। এখনও পূর্ণাঙ্গ বিড়াল ওকে বলা যায় না। ছোট থাকার যে-ছেলেমিপনা, তা ওর আছে। ও যখন ওর মা’র দুধ ছাড়েনি, তখন ও মা-ছাড়া হয়। মর্মান্তিক একটি ঘটনা ওর জীবনে তখন উঁকি মারে। ওর একটি বোনকে নিয়ে যায় চুরি করে গ্রামের এক লোক। ও তখন একা হয়ে পড়ে। খেলার সাথী হারিয়ে ও মনমরা হয়ে থাকে। তখন থেকে ঘরের দরোজার কাছে উঁকিজুঁকি মারত বিড়াল ছানাটি। করুণস্বরে যেন মিঁউ মিঁউ করে কাঁদত। মা’র বুকে পড়ে থাকত একা একা। মা বিড়ালটিও মুষড়ে পড়েছিল। সে-ও মিঁউ মিঁউ করে খুঁজে-পেতে চাইত তার হারানো ছানাটিকে।

তারপর ওর জীবনে নেমে আসে আরও মর্মান্তিক বেদনা। মা-বিড়ালটির যেন হঠাৎ করে মন-মেজাজ কেমন বিগড়ে যায়। কী হলো তার? বিড়ালটি মাঝে-মধ্যে এবাড়ি-ওবাড়ির মুরগির বাচ্চা মুখে কামড়ে ধরে ঘরে নিয়ে আসতে শুরু করে দিল। আমরা তখন কী করি। মহামুশকিলে যেন পড়া গেল। কিছুতেই বাচ্চা শিকার করা বন্ধ হলো না ওর। ওকে  এজন্য মারধর করা হয়নি একটিবারও। শুধু ভয় দেখানো হতো। কি আর করা, একদিন কাউকে দিয়ে ব্যাগে পুরে ওকে দূরে কোথাও ফেলে দেওয়া হলো।

ওর নাম রাখা ছিল পুষি। ওকে ‘পুষি’ বলে ডাকলে সাথে সাথে চলে আসত। মা বিড়ালটি ক’বছর আগে সদ্যপ্রসবকরা ও চোখ না-ফোটা চারটি বাচ্চা নিয়ে আমাদের ঘরের কোণে আশ্রয় নেয়। খুবই নিরাপদ আশ্রয়। বাচ্চাগুলো একটি-একটি করে কামড়ে ধরে-নিয়ে ঢুকেছিল এসে। বিড়ালটি তখন অবাক-করা আচরণ শুরু করেছিল। সে কী করুণ চাহনি! মিঁউ মিঁউ করে পায়ের কাছে এসে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। আর প্রার্থনা জানাচ্ছিল ওকে যেন আমরা কিছু না-বলি। বাচ্চাগুলি নিয়ে থাকতে দিই। আমার দুই মেয়ে ও আমার  স্ত্রী ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পরে সে শান্ত হয়। বাচ্চাদের কাছে গিয়ে শুয়ে বুকের দুধ খাওয়াতে থাকে। আমি রাতে এসে আদ্যপান্ত ঘটনা অবগত হই। ঘরের কোণে উঁকি দিয়ে দেখি বাচ্চা চারটি ওর মার বুকে নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে। মা-বিড়ালটি চোখ বুঁজে শুয়ে আছে।

সেই থেকে আমাদের বাসায় ও থাকা শুরু করে। সাভারের যে-জায়গায় আমাদের বাড়ি, এ-জায়গা বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের অংশ। জাহাঙ্গীরনগরের পাশঘেঁষে পশ্চিমে। বেশ উঁচু-নিচু। মাঝে মাঝে জলাভূমি, মাঝে মাঝে টিলার মতো উঁচু, জঙ্গলে পরিপূর্ণ। এখন জঙ্গলাকীর্ণ স্থান অনেকটা মানুষাকীর্ণ হয়েছে; অন্যান্য বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হলেও ইঁদুরের উৎপাত বেশ। রাতে দলবেঁধে ঘরের ভিতর, ছাদে সারারাত, ভোর পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি, এটা-ওটা নষ্ট করা ছিল ইঁদুরের কাজ। ইঁদুর মারার ফাঁদ, বিষ দিয়েও নিস্তার ছিল না, ওগুলোর বিস্তার রোধকরা যেত না। শুধু পুষির আগমনে সব শেষ। ইঁদুর নেই, সাপ-কোপের ভয় কমে গেছে। তাই ওর আদরও বেড়ে গেছে। মাছ, মাছের কাঁটা, দুধভাত ওর জন্য বরাদ্দ। বেশ-আরামে দিন গুজরান করছে ও।

পুষি আমাদের বাসায় বাচ্চা দিয়েছে ক’বার। ওর বাচ্চা দেবার সময় হলে আমার গিন্নীর পায়ের কাছে গড়াগড়ি যেত। ও বাচ্চা দেবে, শীঘ্র করে বাচ্চা দেবার জায়গা করে দিতে। পুষিটা এভাবেই বুঝিয়ে দিত বাচ্চা দেবার সময় হলে। জায়গা ঠিক করে দেবার সাথে সাথেই ও বাচ্চা প্রসব করত। খুবই অবাক-করা ব্যাপার। কিন্তু ওর বাচ্চা থাকত না। বাচ্চাগুলি বড় হবার সাথে সাথেই গাঁয়ের মানুষজন নিয়ে যেত। কখনও চুরি করে, অথবা বলে-কয়ে।

পুষিটা ছিল ধবধবে সাদা। শরীরের কোথাও কোনো স্পট ছিল না। লেজ-পা-কান সাদা, একদম সাদা। খুবই ভদ্র ছিল ও। কখনও খাবার টেবিলে উঠত না, কোনো বাসন-কোসন-হাঁড়ি-কুড়িতে মুখ দিত না। ক্ষুধা পেলে মিঁউ মিঁউ করে পায়ের কাছে লেজ নাড়াত। খাবার দিলেই খুশি। দুধভাত, মাছভাত ওর প্রিয় ছিল। আমরা ওকে আদর করতাম।

শেষবার মাত্র দুটি বাচ্চা প্রসব করেছিল ও। বাচ্চা দুটির একটি ছিল আমাদের বাসায়। আর একটি গাঁয়ের একবুড়ি ছো মেরে ধরে কাপড়ের আড়ালে করে নিয়ে হাওয়া। যেটি ছিল ওর নাম ছিল তুলু। আমার ছোট মেয়ে নন্দিতা ওর নাম রেখেছিল। তুলু ছিল বেশ নাদুস-নুদুস। ওকে গোসল করাত ছোট মেয়ে। ওর মাকে হারিয়ে প্রথম প্রথম ও যেন মুষড়ে পড়েছিল। বুকের দুধের নেশা ছিল। মাকে খুঁজত, দরোজার কাছে গিয়ে মিঁউ মিঁউ করত। ওর এ-রকম মানসিক অবস্থায় আমাদের মন খারাপ হতো।

একদিন কী হলো, রাত্রি বেলায়, মা বিড়ালটি এসে বাসার গেটের কাছে মিঁউ মিঁউ করল। তুলু যেন সচকিত হলো। ও বুঝতে পারল ওর মা এসেছে। আমরা এসে বারান্দার গেট খুলে দিলাম। ভিতরে ঢুকে ও বাচ্চার গা-গতর সমানে চাটতে লাগল। মা-বিড়ালটি বার-কয় আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে করুণস্বরে মিঁউ মিঁউ করল। যেন বলতে চাইল বা অভিযোগ করল, আমরা কেন ওকে ফেলে দিয়েছিলাম। তুলু ওর বুকে পড়ে দুধ খেতে থাকল। পাঁচদিনের দিন বিড়ালটি বাড়ি চিনে কীভাবে যে এল, আমি অবাক হলাম। তুলু ওর মাকে পেয়ে কী যে আনন্দ প্রকাশ করল তা দেখার বিষয়। তুলু ওর মুখ এনে ওর মার মুখে ঘষতে লাগল। কত যেন আকুতি তার। পাঁচদিন ওর মার বুকের দুধ ছাড়া চলেছে। হায় কী নিষ্ঠুরতা! কিন্তু কিবা করার ছিল, ওযে মুরগির বাচ্চাখেকো অন্য একজন্তু হয়ে উঠেছিল। ওকে না-ফেলে ত উপায় ছিল না। কিন্তু এবার কী মনের সেই দুষ্টু ইচ্ছাগুলো ওর তিরোহিত হয়েছে। আমরা ওকে বললাম, মুরগির ছানা খাসনে আর কখনও। পুষি তুই ভালো হয়ে যা। এবার দশ-বারো দিন ছিল বাড়িতে। ছানা শিকারের নেশা ওকে পেয়ে বসেছিল। পাশের বাড়ির মুরগির ছানা ধরে সমানে খেতে থাকল। আবার দুশ্চিন্তায় পড়া গেল। বাচ্চার জন্য মায়া হলো। আবার মা-ছাড়া হবে- একথা ভাবতে পারছি না। মনের মধ্যে এক অজানা আশঙ্কা ছিল। কবে এসে কেউ বলে বসে, ‘আপনাদের বিড়ালটি আমাদের মুরগির ছানা খেয়েছে।’ তুলু ত বেশ আগেভাগে দুধভাত এবং খালি দুধ খাওয়া শিখে গেছিল। কাজেই অনেক চিন্তা-ভাবনা করে পুষিকে আবার দূরে কোথাও ফেলে দেওয়া হলো।

তুলু ফের ওর মা’র বিরহে কাতর হলো। অনেক রাত অবধি দরজার কাছে বসে থাকত। একটু শব্দ শুনলে মিঁউমিঁউ করে উঠত। যেন তা খুবই করুণ। আমরা ওকে খুবই আদর করতাম, মা-ছাড়া ছানাটি। আমার ছোট মেয়ে ওকে শ্যাম্পু মেখে গোসল করিয়ে দিত মাঝে-মধ্যে।

বিড়ালটি আর ফিরেনি। মনে হয়েছে রাত-বিরেতে আসার সময় হয়ত কোনো শিয়াল ওকে মেরে ফেলেছে। যে-এলাকায় ওকে ফেলে আসা হয়েছিল। সেই এলাকায় আমি কতদিন বিকেল বেলা ‘পুষি পুষি’ করে অনেক ডেকেছিলাম। কোনো উত্তর পাইনি। আমার ‘পুষি’ ডাক ওর চেনা। শুনতে পেলে দৌড়িয়ে চলে আসত। কিন্তু হায় ও এল না।

এদিকে ওর বাচ্চা তুলু একদম মুসড়ে পড়ল। পৌষ মাস। প্রচণ্ড শীত জাঁকিয়ে বসেছে। শীতে জবুস্থুবু অবস্থা। ওকে কোথায় রাখি এই শীতের রাতে। ও শুধু আমাদের লেপের নিচে এসে ঢুকে পড়ত। কী করি, ভেবে পেলাম না। এত পশম ওর গা থেকে ঝরত। ‘পশম আর পশম’ সবখানে। ফ্যান ছেড়ে দিলে পশম ওড়ে। খাওয়া-দাওয়া করা কঠিন হয়ে পড়ল। ওর জন্য মাছ-দুধ বরাদ্দ ছিল। শীতের রাত পাড়ি দেওয়ার জন্য ওকে একটি বাক্সের মধ্যে গরম কাপড় দিয়ে বিছানা পেতে দেওয়া হলো। বাক্সটি রাতের রান্নাশেষে চুলার ওপর রাখা হতো, ওর বিছানাটি গরম থাকত। শীতের কষ্ট থেকে ও রক্ষা পেয়েছিল তাতে।

বেশ কমাস হলো ও মা-ছাড়া। মার কথা যেন সে ভুলেই গিয়েছিল । আমার গিন্নী যেন ওর মা হয়েছে। ক্ষুধা পেলেই মিঁউ মিঁউ। মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে সে কী করুণ আকুতি। দুধভাত অথবা মাছভাত দিলে তবেই ঠান্ডা। চুপচাপ খেয়ে হয়ত ঘুমিয়ে পড়ত ও। মাঝে মাঝে আমার বড়মেয়ে ছোটমেয়ে অথবা ওদের মা ওকে কোলে নিয়ে আদর করত। আমিও হয়ত একটু হলেও কোলে নিয়ে আদর দিতাম। আমরাই ছিলাম ওর সব।

মা-ছাড়া এই বিড়ালছানা তুলুর আচরণ ছিল অদ্ভুত রকমের। ও মনে করত আমরাই ওর একান্ত আপন। সেই ভাবটিই ও করত সব সময়। হয়ত আমরা বসে আছি সোফায় ও দৌড়ে এসে কারও কোলের ওপর বসে পড়ত। এজন্যে ওকে কিছু বলা মানে ওর মন খারাপ করে দেয়া। সামান্য অনাদর ওর অভিমান চাড়া দিয়ে উঠত। দূরে গিয়ে শুয়ে থাকত নীরব হয়ে। পরে আদর পেলে আবার প্রাণবন্ত হতো ও। আমি অবাক হতাম। আমরা যখন দূরে দূরে রাখতে চাইতাম ওকে, তখন ও দূরে দূরেই থাকত। তবে মনে হতো, ওর মনে অভিমান আছে। আদর-অনাদরের মাঝে তুলু কখনও কাছে কখনও নিজেকে দূরে করে রাখত। এরকম একটা সময় যখন চলে যাচ্ছিল, তুলু অসুস্থ হয়ে পড়ল । আমি সেদিন রাতে যখন বাসায় ফিরলাম, তুলু সোফায় বসেছিল। এত যে অসুস্থ আমি জানতে পারিনি। আমাকে দেখে তুলু আমার দিকে মুখ করে মিঁউ করে উঠল। খুবই করুণ অবস্থা তার। আমার গিন্নী বলল, তুলু ভীষণ অসুস্থ। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করেছে। আসলে ও খেতে পারছে না। দুই দিন একবারে আহার বন্ধ, পানিও খেতে পারছে না। খুবই নাজুক ওর অবস্থা।

আমি ওকে পশু ডাক্তারখানায় নিয়ে যেতে বললাম আমার দু’মেয়েকে। কাল ভোরে নিয়ে যেতে। রাত পোহালে আর দেরি নয়। আমি তুলুকে বিছানায় লেপের নিচে নিয়ে রাখলাম। কিন্তু ও বেরিয়ে এল। সোফায় একটুকরো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখলাম। নাহ্, তাও বেরিয়ে এল। ও যেন কী বলতে চাইল, আস্তে নিচে নেমে গেল। যে-বাসনে ও পানি ও দুধ খায় তার ধারে গেল। মনে হলো কিছু খাবে। কিন্তু খেতে পারল না। ওই দিকে মুখ রেখে বসে রইল । আর দুবার মিঁউ মিঁউ করে ডাকল। আমি সবই দেখলাম। আবার সোফায় এসে চোখ বুঁজে বসে রইল। রাত গভীর হলো। আমি শুতে যাবো ভাবছি, তখন দেখি সোফা থেকে নিচে নেমে ও বাইরের দিকে গেল। আমার গিন্নী বলল, এত যে অসুস্থ ও, কষ্ট ওর, তবু বাইরে গিয়ে বমি করে আসে, ঘরে করে না। একটু পরে সোফায় এসে বসল আবার। আমি একটুকরো কাপড় ওর গায়ের ওপর দিয়ে রাখলাম।

ভোরে যখন উঠলাম,  সোফার ওপরে দেখলাম না ওকে। কোথায় গেল- ভাবতেই দেখি বারান্দায় চোখ বুঁজে বিছানায় বুক ঠেকিয়ে বসে আছে। কোনো রকম বেঁচে আছে। তিনটে দিন পানি ছাড়া, ভাবা যায়। মনে হলো, ও আর বাঁচবে না। আমি মাথায় হাত বুলালাম। ও মিঁউ করে অস্ফুট একটা শব্দ করল।

আমি একটু পরে আফিসে বেরিয়ে গেলাম আমার দুই মেয়ে ওকে ডাক্তারখানায় নিয়ে ইনজেকসন দিয়ে নিয়ে এসেছে। ওর অবস্থার কথা আমার মেয়েরা ফোনে জানাল, আরও খারাপ হয়েছে ও। রাতে বাসায় ফিরে দেখলাম, ও চার পা ছড়িয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। মৃদু নিশ্বাস টের পাওয়া গেল। আমি সারা গায়ে হাত বুলালাম। আবার যেন একটু মৃদু মিঁউ শব্দ করল। আমি নীরব-নির্বাক চেয়ে রইলাম ওর দিকে।

ভোরে দেখলাম, ওর নিথর দেহ মেঝেতে পড়ে আছে। ওর মান-অভিমান ওর চঞ্চলতা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আমার দুই মেয়েই কেঁদে ফেলল । আমারও দুচোখ ভরে জল গড়িয়ে পড়ল গ-দেশে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares