2_badol-syed

গল্প

অ্যানজেলিনা

বাদল সৈয়দ

কুয়ালালামপুর থেকে ওড়ার ঘণ্টাদুয়েক পর বুঝলাম সমস্যা হচ্ছে।

পুরনো সমস্যা। প্লেনের কড়া এসির মধ্যেও কপালে চিকন ঘাম জমছে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে  আসছে, সারা শরীরে ঠান্ডা অনুভুতি, মনে হচ্ছে বরফ কামড় দিচ্ছে। কোনোভাবেই ফুসফুসে বাতাস নেয়া যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে মরে যাচ্ছি,

এটাকে বলে, প্যানিক ডিজঅর্ডার। সাইকেলজিক্যাল সমস্যা। হঠাৎ দেখা দেয়। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। অক্সিজেনের জন্য ফুসফুস হাহাকার করে, কঠিন ঠান্ডা ভাবের সাথে মগজে লাফ দিতে থাকে তীব্র মৃত্যুভীতি।

আমি কোনোরকমে কোটের পকেটে ওষুধ খুঁজতে থাকি। সবসময় থাকে। কারণ আমার মাঝে মাঝে এ সমস্যা হয়। কিন্তু সেখানে ওষুধ নেই। উঠে দাঁড়িয়ে প্রাণপণে প্যান্টের পকেট হাতড়াই। না সেখানেও নেই। ঘাম বাড়ছে, ডানহাতে তা মুছতে মুছতে কোনোরকমে ওভারহেড লকার থেকে ব্রিফকেস নামিয়ে দেখি সেখানেও কোনো ওষুধ নেই। তীব্র আতঙ্কে বুঝতে পারি, ফেলে এসেছি। আমার ভুলোমন এ সর্বনাশ করেছে। লিজা থাকলে এটি কখনও হতো না। ও বেশ ক’জায়গায় ওষুধ রাখে, যাতে হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। এবার সে যাচ্ছে না। একা যাচ্ছি। তাই এ-সর্বনাশ।

মনে হচ্ছে একটু পর আমার সব অক্সিজেন ফুরিয়ে যাবে, কেউ বুঝতেও পারছে না যে, তাদের সাথের একজন সহযাত্রী মারা যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ আগে ডিনার সার্ভ করা হয়েছে। তারপর বাতি নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। মালেশিয়ান এয়ারলাইনের এ-বিমানটির প্রায় সবাই এখন নিদ্রামগ্ন। বাইরে গভীর রাত। অন্ধকারে তেমন কিছু দেখাও যাচ্ছে না। আমি কোনোরকমে হাত বাড়িয়ে ইমারজেন্সি বেল টিপে কেবিন ক্রু ডাকার চেষ্টা করি, কিন্তু পারি না, মরা সাপের মতো হাত নেতিয়ে পড়ে। তাতে কোনো জোর নেই।

হা করে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, আশপাশে কাউকে ডাকার চেষ্টা করি, পারি না। আমার পাশের সিট্ খালি। পেছনের সারিও খালি। সবচেয়ে কাছের যাত্রী বেশ দূরে বসেছে। আমি অনুচ্চশব্দে ডাকতে থাকি, ‘মা, মা।’

হঠাৎ অন্ধকারে ছায়ার মতো একজন কেউ একজন এসে দাঁড়ায়, ঝুঁকে এসে বলে, তোমার কী খারাপ লাগছে?

আমি আস্তে আস্তে মাথা নাড়ি।

ছায়ামূর্তি দ্রুত আমার পাশের খালি আসনে বসে পড়ে। আমি কোনোরকমে বলি, এনি ডক্টর অন বোর্ড?

সে হালকা হাসে। আধো অন্ধকারে সে হাসিতে কেমন যেন রহস্য। তারপর বলে, “আমাদের জানামতে নেই। তবে ভয় নেই। আমি একজন প্যারামেডিক কেবিন ক্রু। তোমাকে সাহায্য করতে পারবো।” বলতে বলতে সে আলতোভাবে আমার ডান হাত তার মুঠোতে তুলে নিয়ে মৃদু চাপ দিতে থাকে। আরেকজনের  হাতের গরম স্পর্শ আমাকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। আমি অনুচ্চস্বরে বলি, আমি কি মারা যাচ্ছি?

সে লাস্যময়ী হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে বলে, ‘আমাদের প্লেনে কেউ কখনও মারা যায়নি, তুমিও যাবে না। কিন্তু আজই কি  তোমার প্রথম সমস্যা হলো? আগে হলেতো ওষুধ সাথে সাথে থাকার কথা।’

‘না, আগেও হয়েছে। তবে ওষুধ নেই, ফেলে এসেছি।” বলতে বলতে আমার গলা ভেঙে আসে, আমার খুব খারাপ লাগছে, খুব।’

সে  আবার হাতে চাপ দেয়। ‘সমস্যা নেই। আমি হাফ ডাক্তার, সব ঠিক করে দিচ্ছি। তুমি শুধু কথা বলার চেষ্টা করো। যা ইচ্ছে বলো, ‘বলতে বলতে সে আবার হাসে, মিষ্টি হাসি ‘ইভেন ইউ ক্যান প্রপোজ মি। যদিও বয়সের ডিফারেন্সটা একটু বেশি হয়ে যায়, তারপরও আমি ভেবে দেখবো।’

এই প্রথম আমার হাসি পায়, বলো কি? তুমি কি এনগেজড না?

আবার হাসি। ‘অবশ্যই এনগেজড। ইনফ্যাক্ট এটাই আমার শেষ ফ্লাইট।’

আমার খুব কৌতূহল হয়, কেন এটা তোমার শেষ ফ্লাইট?

‘কারণ এ ফ্লাইট শেষে পরশু আমার বিয়ে। পিয়েরে বলে দিয়েছে, সে আমাকে ছাড়া একদ- থাকতে পারবে না। আমাকে নাকি তার গানের দলের সঙ্গী করে নেবে। আমরা দুনিয়ার সব সুন্দর জায়গায় কনসার্ট করে বেড়াবো।’

তারপর গভীর মমতা নিয়ে উচ্চারণ করে, ‘স্রেফ পাগল একটা। তবে খুব ভালো গায়।’

পিয়েরে! সে কে?

‘আমি যার ফিয়াসে, পরশু আমাদের বিয়ে, ভুলে গেলে?’

না, না ভুলিনি, কিন্তু তোমার নাম তো জানা হলো না।

‘এঞ্জেলিনা। এঞ্জেলিনা গোমেজ, অবশ্য পিয়েরে ডাকে এঞ্জেলিনা জোলি। খুব ফাজিল, বুঝেছো?’

আমি আবার হাসি, শিল্পীরা একটু পাগল হয়।

‘পাগল মানে মহাপাগল,’ হালকা অন্ধকারে হাসির সাথে মিষ্টি মিন্টের সুবাস ছড়ায়। “সারাদিন গান আর গান, ‘বব মারলে’ তার খুব প্রিয়, সব সময় ঠোঁটে লেগেই আছে, বাফেলো সোলজার ইন দা হার্ট অফ আমেরিকা।”

স্টোলেন ফ্রম আফ্রিকা ব্রট টু আমেরিকা…

তার মেয়ে কণ্ঠে পুরুষালি বব মারলে ভালোই ফুটে ওঠে।

তোমার গলাতো বেশ ভালো, তুমি গাও না?

সে খিল খিল করে হাসে, “আরে না, দুজনেই গান বাজনা নিয়ে থাকলে সংসার কি বাতাসে চলবে? তবে হা, পিয়েরে আমার গান খুব পছন্দ করে, বিশেষ করে সিলেন ডিওনের ওই গানটা, বলতে বলতে আবার কিণ্ণর কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ে :

‘এনড ইন টু ইয়োর আইজ,

আই সি রিবন অফ কালারস

আইসি আস ইনসাইড অফ ইচ আদার’

আহা, কি আবেশ। এমন সুর অনেকদিন কানে বাজে নি। আমার ঘুম ঘুম লাগে।

না, না, তুমি গানই গাও, এত ক্ষমত নষ্ট করার জন্য ঈশ^র তোমাকে দেননি।

মেয়েটি আবার হাসে, ‘পিয়েরে তাই বলে। তার ইচ্ছে আমরা দুজন গন্ডোলার ব্যবসা খুলবো, সারাদিন টুরিস্ট নিয়ে ঘুরবো আর রাতে শুধু ভেসে বেড়াবো। সে গন্ডোলা বাইবে আমি গাইবো আবার সে গাইবে আমি বাইবো। ওহ, তোমাকে তো বলা হয়নি, আমরা দুজনেই ভেনিসের পুরনো বাসিন্দা। সেখানে নদীর পাড়ে আমরা বড় হয়েছি, আমার গা থেকে নোনা গন্ধ পাচ্ছো না?’ বলতে বলতে সে হেসে গড়িয়ে পড়ে, উচ্চহাসি।

আমি ঘুম জড়ানো গলায় বলি, আমি তোমাদের শহরে অনেকবার গেছি। অপূর্ব। আহা, গন্ডোলা নামে নৌকা, তার রং-বেরঙের পাল, বাহারি পোশাকের মাঝি, তোমাদের ‘কথা বলা’ ময়নার মতো উচ্ছল নদী, ঘরে বানানো জলাপাইয়ের আচার আর লাল মদ। এর তুলনা নেই।

‘আসলেই নেই, আমরা প্রতি সন্ধ্যায় সেই লাল মদ, জলপাই আচার আর গিটার নিয়ে ভাসতেই থাকব, কেবল ভেসে থাকা।’ বলতে বলতে আবছা ছায়ায় মেয়েটির চোখে জলকণা ফুটে ওঠে।

অবাক গলায় প্রশ্ন করি, তুমি কাঁদছ কেন?

সে নরম আঙ্গুলে চোখ মুছতে মুছতে বলে, ‘পিয়েরে কথা মনে হলেই আমার কান্না আসে। আনন্দের কান্না, আবার ভয়ে ও কাঁদি। ওর জন্য ভয় লাগে, কেন লাগে জানি না। কিন্তু খুব ভয় লাগে।’ তার নরম আঙুল আবার চোখ মুছে।

আমি তীব্র মমতা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু পারি না, চোখ বুজে আসছে। জোর করে বলি, আমার খুব ইচ্ছে করছে, তোমাদের বিয়েতে থাকতে, কিন্তু জীবনের কত ইচ্ছেই যে  পূরণ হয় না, তাই না?

সে ঝুঁকে এসে বলে, ‘না, হয় না, আমাদের আর কোনোদিন দেখা হবে কিনা তারও ঠিক নেই। তবে, তোমাকে আমাদের একটা ছবি দিচ্ছি, এটা দেখবে আর আমাদের জন্য প্রার্থনা করবে, কেমন?’

বলতে বলতে সে তার ওয়েস্ট কোটের পকেট থেকে একটি ছবি বের করে বলে, ‘আমাদের পরিচয়ের প্রথম দিকের ছবি।’ আমি সহ্য হয়ে আসা অন্ধকারে অপূর্ব একটি ছবি দেখি।

গন্ডোলায় একটি অসম্ভব রূপবান যুবক গিটার হাতে গাইছে, তার ঝাকঁড়াচুল বাতাসে উড়ছে, আর দাঁড় বাইছে হাস্যোজ্জ্বল অ্যানজেলিনা। তার চুলের পনিটেলকে মনে হচ্ছে লাল মোরগের ঝুঁটি।

গভীর ঘুম থেকে যখন উঠলাম তখন সকাল। শরীর ঝরঝরে লাগছে, কোনো সমস্যা নেই। পাইলট ঘোষণা দিচ্ছেন, আমরা প্যারিসে নামছি, উই আর এপ্রোচিং টু দা চার্লস দ্য গল এয়ারপোর্ট, প্যারিস…

কখন এঞ্জেলিনা চলে গেছে জানি না, পাশে পড়ে আছে তার দেয়া ছবি।

ছবিতে সে এবং পিয়েরে গন্ডোলায় ভাসছে।

সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে একজন বিমানবালাকে ডেকে বললাম, দয়া করে একটু এঞ্জেলিনা ডেকে দেবে। তাকে আমার একটা ধন্যবাদ দেয়ার আছে।

বিমানবালা সত্যিকারের প্রফেশনাল হাসি হেসে বললেন ‘কাকে ডেকে দেবো?’

আমি আবার নাম বললাম। মনে হচ্ছে সে বুঝতে পারছে না। আমি আবার বললাম, আমি কেবিন ক্রু এঞ্জেলিনার কথা বলছি, যার আগামীকাল বিয়ে।

এবার তিনি বুঝলেন, কিন্তু তার চেহারায় একটু কেমন যেন ভাব জেগে উঠলো।

‘স্যার আপনি বসুন’, বলে তিনি চলে গেলেন এঞ্জেলিনাকে খবর দিতে। একটু পর ককপিট থেকে তার সাথে বেরিয়ে আসল বেশ সুপুরুষ একজন ভদ্রলোক। তিনি পাশে বসতে বসতে বললেন, আপনি কার সাথে দেখা করতে চাইছেন?

এবার আমি রীতিমতো অপমানিত বোধ করলাম, রাগীকণ্ঠে এঞ্জেলিনার ছবি তার চোখের সামনে ঝুলিয়ে বললাম, আমি এর কথা বলছি।

তিনি গভীর মনোযোগের সাথে ছবিটি কিছুক্ষণ দেখলেন, তারপর বললেন, ‘আমি এ  ফ্লাইটের সহকারী পাইলট।’ বলেই আবার চুপচাপ ছবি দেখতে লাগলেন। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, ‘আপনার সাথে আসলে পাইলট কথা বলতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু প্লেন ল্যান্ড করার সময় তার ককপিট ছাড়ার নিয়ম নেই।’

আমার আবার ধপ করে রাগ জ¦লে উঠল, কিন্তু সমস্যা কি?

কো পাইলট ঠান্ডা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন,

‘এ ছবিটি না দেখলে অবশ্যই এটা ভেবে উড়িয়ে দিতাম যে, প্লেনের মুফতে মদের ঘোরে সব কল্পনা করেছেন। কিন্তু’… বলতে বলতে তিনি মাথা ঝাঁকালেন।

আমি প্রায় চেঁচিয়ে বললাম, মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ। সমস্যা কি হয়েছে?

কো পাইলটের গলা আরও নির্লিপ্ত হয়ে গেল, ‘স্যার আই এপোলাইজ, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এঞ্জেলিনার সাথে আপনার দেখা হওয়ার কথা নয়, কোনোভাবেই নয়।’

কেন?

‘কারণ সে ছিল আমাদের ফ্লাইট ৩৭০-এর কেবিন ক্রু। যেটি ২০১৪ সালের ৮মার্চ কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিং যাওয়ার সময় ২৩৩ জন যাত্রী আর ১২জন ক্রু নিয়ে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছিল। এঞ্জেলিনা তাদের একজন।’

বলতে বলতে ভদ্রলোকের চোখের স্থির মণিতে রক্তাক্ত চাঞ্চল্য ফুটে ওঠে। ‘আর হ্যাঁ, সেটিই ছিল তার পেশা জীবনের শেষ ফ্লাইট। একদিন পরে তার বিয়ে…’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares