1-zahid-hayder

গল্প

প্রেক্ষাপটের দাসদাসী

জাহিদ হায়দার

পা দুটোর গোড়ালি পর্যন্ত ছিল বান্দরবনের সাংগুনদীতে ডোবা। আকাশের নীল ছায়াপড়া পানিতে মেয়েটির দুই পায়ের নখগুলি, সে এক সৌন্দর্য-বিলাসের শৌখিনতা, নেইল পালিশে ছিল চিত্রিত। পায়ের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে কয়েকটি ছোটো মাছ, খাদ্য ঠোকরানোর আনন্দে ছিল মহাব্যস্ত। বয়স কত হবে, আঠারো বা উনিশ, মেয়েটির গায়ে কোনো কাপড় ছিল না, উরুসন্ধির ত্রিকোণে কামড়ের দাগ ছিল, স্তনেও। ক্ষত জায়গায় ক্ষুধার্ত মাছি আর পিঁপড়ের ব্যস্ততার কোনো শব্দ ছিল না। ঠোঁট দেখাচ্ছিল ঝিমিয়ে পড়া ক্লান্ত দুটো জোঁকের মতো। বাম চোয়ালের মাঝখানে শক্ত দাঁতের দেওয়া কামড়ের দাগের মধ্যে কয়টি মাছি খুঁজছিল আরও রক্ত। একটি খয়েরি রঙের কাঁকড়া নাভির গর্তে চুপচাপ বসেছিল, অন্যটি কপালের উপর পড়ে থাকা মাটিমাখা চুলগুলির মাঝখানে। মেয়েটির ডান হাতে পরা ঘড়ির কাচ ছিল না, শুধু একটা কাঁটা স্থির ছিল ছয়টার উপর। তা থেকে বোঝার উপায় নেই, ওই ছয়টা সন্ধ্যা, নাকি সকাল। প্রথম সকালের রৌদ্রে শ্যামবর্ণ শরীর একেবারে জমানো ধূসর কাদার একতাল।

হঠাৎ হয়ে ওঠা দর্শক, হতভম্ব অবস্থা কেটে যাবার পর, হাফিজের ২৪ বছরের শরীরের মধ্যে, সত্যি, আদিমতার সত্য-চাহিদা তুলেছিল ঢেউ। উষ্ণ তরঙ্গ থেমে গেলে ওর ইচ্ছে হয়, দৌড়ে পালিয়ে যাবার। মাথার উপর কয়েকটি শকুন ঘুরছিল চক্রাকারে। ‘মেয়েটিকে কি আরও উপরের ডাঙায় তোলা উচিত?’ নিজের প্রশ্নে হাফিজের মনে হয়, টেনে তোলার সময় হাত দুটি কনুই থেকে খুলে যেতে পারে। সে একটু পিছিয়ে যায়। একঝোপের পাশে বসে। একটা বন্য পাতা মুখে লাগে। হাফিজ চোয়াল চুলকায়। ‘চুতরা পাতা লাগলো?’ সামনে এক শায়িত মৃত শরীর, স্থির। মৃত্যুর শীতলতা ছুঁয়ে নির্বিকার বয়ে যাচ্ছে নদী।

প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে খুন হওয়া যুবতীর সৌন্দর্য, কখনও মাথার দিক থেকে, কখনও হাঁটুর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে, কখনও দু’একবার কয়েক সেকেন্ডের জন্য পাশে বসে হাফিজ দেখেছিল। দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা ওকে এক জায়গায় দাঁড়াতে দেয়নি। এদিক ওদিক তাকিয়েছিল, কোথাও রক্তমাখা বা ছেঁড়া জামাকাপড় দেখা যায় কি-না। মেয়েটির পাশে বালির উপর কয়েকটি জুতোর দাগ ছিল। জুতোর ছাপগুলি চলে গেছে বনের ভেতর।

হাফিজের হাতে ছিল স্মার্টফোন। নদীর দিকে নেমে যাওয়া তীরের ক্রম-ঢালুর উপর আড়াআড়ি পড়ে থাকা মৃত শরীরের সমান্তরালে স্মাার্টফোনটা একবার বসিয়ে হাফিজ স্ক্রিনে দেখেছিল : ঘুমন্ত সুন্দর মুখ, স্তন, কোমর ও উরুর উপর পাহাড়ের গাছপালা, পাকদ-ি আর অলস ভাসমান মেঘ। যেন সবকিছুর ভূমি বা ভিত্তি এক মৃত দেহ। কয়েকটি ছবি তুলেছিল। মনে হয়েছিল, অসভ্যতা হলো না কি।

কানে আসে খসখস শব্দ। অদূরে দুটি শেয়াল খুবই বিরক্তিকর আর হিং¯্র চোখে দেখছিল হাফিজকে। তাদের খাদ্যের ভাগ নেওয়ার জন্য মানুষটা এক প্রতিদ্বন্দ্বী। শিয়াল দুটির চিন্তা হাফিজের বোঝার কথা নয়। ভয় পায়। ক্ষুধার্ত শিয়াল আক্রমণ করতে পারে। সব ক্ষুধার্তের আক্রমণ করবার একটা অধিকার তো থাকেই।

হাফিজ রিসোর্টে ফিরে আসে। বন্ধুদের ঘুম তখনও ভাঙেনি। টয়লেটে গিয়ে বারবার চোখ ধোয়। প্রাতঃভ্রমণে গিয়ে দেখা দৃশ্যটা দৃষ্টির সীমানা থেকে কিছুতেই ধুয়ে যাচ্ছে না। রিসোর্টের বারান্দায় ফিরে আসে। বেতের চেয়ারে বসে ওর মনে হয়, সকালে যা দেখেছে, কাউকে বলবে না, বললে, সবাই দেখতে যাবে অথবা ওকে নিয়েই গল্প বানাবে। একবার মনে হয়েছিল, বন্ধুদের মধ্যে কেউ কি রাত্রে উঠেছিল? না কেউ ওঠেনি। হারুন গতরাতে বলছিল, এখানে নিজের তাঁবু আর বান্ধবী থাকলে বনের মধ্যে আনন্দে রাত কাটানো যেত।’  তারপর হেসেছিল।

বান্দরবনে এসেছিল চার বন্ধু। হাফিজ ভোরে উঠে নদীর দিকে বেড়াতে যায়। ভালো লাগছিল পাখিদের জেগে ওঠা দেখতে। সাপখোপের ভয় মনে যে কাজ করেনি, তা বলা যাবে না। নদীর অন্য পাড়ে, বেশ দূরে, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর দু’জনকে দেখেছিল নদীতে নামতে। নামার আগে তারা প্রণাম করে নদীকে। হাঁটতে হাঁটতে প্রথমে চোখে পড়ে এলোমেলো চুলেভরা মাথার মতো একটা কিছু। থেমে পড়ে হাফিজ। কী ভেবে একগাছের আড়ালে যায়। এদিক ওদিক সরু চোখে তাকায়। কোনো মানুষকে দেখা যায় না। তবে দেখতে পায় যুবতীর নগ্ন শরীর। আড়াল থেকে ধীর পায়ে পড়ে থাকা মানুষের কাছে আসে। ধর্ষণ। খুন। পাখিদের ডাকাডাকি তখন ওর কানে আসে না। চারদিকের জাগরণে মৃত্যুর ভয় ঘুরে বেড়ায়।

২.

হাফিজ আর সেলিম দুই বন্ধু। সেলিম ভালো পাঠক। আদনান হাফিজ গল্প লেখে। সেলিম নারায়ণগঞ্জে কী একটা কাজ থাকার কারণে বান্দরবনে ওদের সঙ্গে যায়নি।

সেলিম আর হাফিজ বেইলিরোডে ভিকারুননেসা স্কুলের বিপরীতে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস্ কলেজের দেয়াল-সংলগ্ন ফুটপাত ধরে হাঁটছিল। গন্তব্য ছিল রমনা পার্ক। একটি গল্প ঘুরছে হাফিজের মাথায়। বন্ধুকে প্লটটা বলবে।

হাফিজ, দু’দিন আগে সাংগুতীরে দেখা মৃত যুবতীর কথা সেলিমকে বলে। জানায়, ভ্রমণ-সঙ্গী বন্ধুদের কারও কাছে ওই ঘটনার কথা বলেনি। সেলিম একবার দু’বার বলে, পুলিশকে জানানো দরকার ছিল। ‘পুলিশকে জানালে কী হতো?’ হাফিজ নিজের প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষা করে না। বলে, ‘আমাদের ধরে নিয়ে যেত, হাজারটা জেরা করতো পুলিশ, সন্দেহ করা ছিল স্বাভাবিক, খোঁজ নিত রিসোর্টগুলিতে ওই রাতে আর কারা ছিল।’

ওরা কথা বলছিল। ফুটপাতে হাঁটছিল। মুখ অফিসার্স ক্লাব ঢাকার দিকে।

হাফিজ ঘটনাটা নিয়ে একটি গল্প লিখতে চায়। নদীর, নগ্নতার, পাহাড়ি শান্ত পরিবেশের, শায়িত মৃত যুবতীর পবিত্র শরীরের, সব মৃত শরীরই পবিত্র, মৃত এবং আগুন পাপ করতে পারে না বলেই বোধহয় ওই বিশেষণ, একটি সুন্দর বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনা লিখবে। ওর নিজের মধ্যে আদিমতার যে ঢেউ এসেছিল,  সে কথাও লিখবে। নারীর প্রসন্ন সৌন্দর্য নাকি জৈবিকতা, কোনটার জয় হবে, হাফিজের গল্পের মূল ম্যাসেজ হবে তাই। লেখার পরিকল্পনা শুনে সেলিম বললো : লেখার আগে খুবই মনোযোগ দিয়ে, তুই যদি না পড়ে থাকিস, পড়বি মার্কেজের ‘মেমোরিজ অব মাই মেলানকোলি হোর্স’, ওই কাহিনিতে একটি ঘুমন্ত নগ্ন তরুণীর শরীরের সৌন্দর্য-শিল্পের বর্ণনা আছে, এক নব্বই বছরের বুড়ো তার জন্মদিনে এক হোরের সঙ্গে সময় কাটাতে চায়।’ সেলিম যখন ‘হোর্স’ শব্দটি বলেছিল, তখন একটি সুন্দরী যুবতী, বয়স হবে বিশ-বাইশের দিকে, পোশাক রুচিশীল, চুল স্টেপ কাট, হাতে ছিল দামি স্মার্ট ফোন, ঠিক ওদের পাশ দিয়ে সহজ চলনে যচ্ছিল। মেয়েটি  ‘হোর্স’ শব্দটি শুনে আড়চোখে ওদের দ্যাখে। চলার গতিতে সামনে একটু এগিয়ে যায়। দুই বন্ধুও বিপরীত দিকে কয়েক পা এগোয়। মেয়েটি দ্রুত ঘুরে ডাক দেয় : এই যে শুনুন।’ দুই বন্ধু মেয়েটির গলা শুনতে পায় না। হাঁটতেই থাকে। মেয়েটি আরও জোরে ডাকে, এই যে আপনাদের ডাকছি।’ সেলিম মাথা ঘোরায়। মেয়েটি বেশ জোরে আদেশ করে : দাঁড়ান।’ ওরা মেয়েটির দিকে এগিয়ে আসে, মেয়েটিও ওদের দিকে। মুখোমুখি হতেই : অসভ্য, বিচ, আমি হোর?’ মেয়েটির চোখেমুখে রাগের লালচে আগুন। ‘আপনি এসব কী বলছেন?’ সেলিমের কথা শেষ না হতেই মেয়েটি : একথাপ্পর মারবো, এখানে হোর খোঁজা হচ্ছে,’ বলে। ফুটপাতচারী দু’তিনজন ওদের কাছে দাঁড়িয়ে যায়। একজন বলে, ‘কী হয়েছে?’ মেয়েটি বলে : আমাকে হোর বলছে।’ প্রশ্নকর্তা মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে জানতে চায় : হোর মানে কী?’ মেয়েটি তর্জনী তুলে বলে ‘প্রসটিটিউট বোঝেন।’ ‘কেন আপনাকে বেশ্যা বলবে?’ অন্য একজন পুরুষ প্রশ্ন করে। এই সময়ের মধ্যে আরও দু’একজন মানুষ ছোটো ভিড়ের কাছে ভিড় জমায়। ‘আসক্ দেম’ মেয়েটির উদ্ধত তর্জনীর রাগ দুই যুবকের দিকে। হাফিজ বলে, ‘বিশ্বাস করুন আমরা ওনাকে ওই কথা বলিনি।’ ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বলে: মেয়েটা কি মিথ্যা বলছে?’ ‘আমাদের কথা আগে আপনারা শুনুন’, সেলিমের কথা শেষ না হতেই একজন বলে : রাস্তায় একা কোনো মেয়েকে দেখলেই এই বদমাইসরা এরকম করে, মার শালারে।’

ভিড় বাড়তে থাকে। ফুটপাত থেকে ভিড় বড় হতে হতে রাস্তার উপর চলে আসে। ট্রাফিক জ্যাম হয়। ভিড়ের কেন্দ্রে শুধু একটি মেয়ে। কেউ কেউ বলে, শালাদের  ধোলাই করো।’ মানুষ প্রতিশোধকামী। একজন থাপ্পর মারে সেলিমকে। অন্য একজন হাফিজের চুল ধরে বলে, ‘হারামজাদা।’ কোনো এক  পুরুষের একটি হাত মেয়েটির পাছা নাড়ে। ভয় পেয়ে মেয়েটি বলে : আমাকে বাঁচান।

কোথা থেকে দু’জন পুলিশ আসে। ঘটনা শোনে।  হাফিজ, সেলিম ও মেয়েটিকে বলে, থানায় চলুন।’

হাফিজ আর সেলিমের কোনো কথা ভিড়ের কেউ বিশ্বাস করেনি। ওরা বারবার বলেছে মার্কেজের বইয়ের কথা। ভিড়ের মানুষ, পুলিশ এবং মেয়েটিও জানে না কে মার্কেজ,  লোকটি কী করত, তার কী বই। সকলেই তাদের মতো করে নিশ্চিত, ছেলে দুটি মেয়েটিকে বলেছে হোর।

দু’জন পুলিশের সঙ্গে মেয়েটি, হাফিজ, সেলিম এবং কিছু কৌতূহলী মানুষ, যারা প্রায় সব ঘটনার শেষ দেখতে চায়, যেন এক ছোটো মিছিল, এখনি স্লোগান দেবে, নারী নির্যাতকের শাস্তি চাই, যাচ্ছে থানার দিকে। পথে পড়ল ব্রোঞ্জের দুটো ঘোড়ার মূর্তি, ঘোড়ার উপর বসে আছে শিরস্ত্রাণপরা বৃটিশ-ইন্ডিয়ার হাফ প্যান্টপরা দুজন পুলিশ, তাদের পায়ের নিচ দিয়ে যাচ্ছে দু’জন অপরাধী। থানার দিক থেকে ঘোড়া দুটির পায়ের নিচে দাঁড়ালে, হাতের ডান দিকে পড়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধতথ্য বিভাগ।

সেলিম আর হাফিজ কথা বলছে না। ভয় পাওয়া মুখ, চোখ। ধীরে হাঁটছিল। পুলিশ ধমক দেয়। হাঁটার গতি বাড়ে। সঙ্গে আসা মানুষরা অনেক কথা বলছে : নারী নির্যাতনের কেসে পড়বে’, ‘না না  যৌন হয়রানির’, ‘না না ইভটিজিঙের কেস’, ‘শালাদের এমন তক্তা বানানো দরকার জীবনে যাতে না ভোলে’, ‘আমার কিন্তু ছেলে দুইটারে ভদ্র মনে হইছে,’ ‘আরে রাখেন, ভালো কাপড় পরলেই মানুষ ভদ্র হয় না’, ‘দুইটাই শয়তান, বেশ্যা খুঁজতেছিল, বড়লোকের পোলা।’ মেয়েটি নিজেকে আলাদা করে সাবধানে হাঁটছিল, আবার যদি কোনো হাত তার গায়ে পড়ে।

থানার ওসির রুমে ভিড়।

‘আপনারা কেন ওনাকে ওই কথা বললেন?’ হাতের লাঠি দিয়ে টেবিলের উপর আস্তে আস্তে বাড়ি মারতে মারতে ওসি সেলিমদের প্রশ্ন করে। ইঙ্গিত স্পষ্ট। কথা হিসাবে না মিললে, ওসির হাতের লাঠিটা কিছুক্ষণ পর পড়বে অপরাধীর পিঠে বা সারা শরীরে।

‘শুনুন নোবেল প্রাইজ পাওয়া লেখক গার্সিয়া মার্কেজের একটি উপন্যাসের নাম মেমোরিজ অব মাই মেলানকোলি হোর্স’’, ওনার বিখ্যাত বই ‘ওয়ান হান্ড্রেস ইয়ার্স সলিটিউড।’ ও আমার বন্ধু আদনান হাফিজ, গল্প লেখে, ওর লেখা ছাপা হয় ভালো সাহিত্য পত্রিকায় আর বড় বড় দৈনিক কাগজের সাহিত্য পাতায়, আমরা মার্কেজের বইটি নিয়ে কথা বলছিলাম।’ সেলিমের কথা শুনে, এক এস. আই বললেন, ‘আরে রাখেন কোথাকার কোন মাকসুদ না মারকুস নামের লেখক, কয়টা অসুধ দিলেই আসল কথা বার হবেনে স্যার।’

ওসি মেয়েটির কাছে জানতে চায়, ছেলে দুটিকে আপনি আগে থেকেই দেখেছিলেন কিনা। মেয়েটি জানায়, দ্যাখেনি। ‘কোন ছেলেটি ওই কথা বলেছিল?’ ও.সির প্রশ্নে মেয়েটি তজর্নী তুলে, নখে ছিল নীল রঙের পালিশ, হাফিজের  চোখে ভেসে ওঠে নদী তীরে পড়ে থাকা মেয়েটির পায়ের নখের নেইল পালিশ, মাছের ঠোকরানো; সেলিমকে দেখায়। এবার ও.সি সেলিমকে জিজ্ঞেস করে, গলার স্বর আগের থেকে ঝাঁঝালো, চোখ দুটি সেলিমের চোখের উপর, ‘উনি যখন আসেন তখন ওনাকে দেখেছিলেন?’ সেলিম মেয়েটিকে দেখেছিল। সত্য বলতেই ও.সি এস. আইকে বললেন, ‘লকে দাও, দেওয়ার আগে কিছু দিও।’ ফুটপাতের ভিড় থেকে যে-ক’জন কৌতূহলের তাড়নায় থানা পর্যন্ত এসেছিল তাদের মধ্যে একজন বিজ্ঞের মতো বলল : লেখকরা খুব শয়তান হয়, মেয়েমানুষ দেখলে ওগো মাথা ঠিক থাকে না।’

৩.

ও.সির সামনে খবরের কাগজ। প্রথম পাতার নিচের দিকে লালকালির বড় হেডিং : সাংগুতীরে ধর্ষিতার লাশ। খবরটি ও.সি পড়েন। এক জায়গায় সাংবাদিক বান্দরবনের পুলিশের বরাত দিয়ে লিখেছেন : নদীর কাছে রিসোর্টগুলিতে গত দুদিন যারা ছিলেন তাদের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর পুলিশ সংগ্রহ করেছে। তদন্ত চলছে।’

হাফিজ ও সেলিমের মোবাইল জমা ছিল ওসির কাছে। লকআপে নিয়ে যাবার আগে সেলিম ও হাফিজ বন্ধুদের ফোন করে তাদের অবস্থানের কথা জানায়। হাফিজের ফোনে কল আসে। হারুনের কল। ওসি ধরেন। ‘কিরে থানায় কেন, তপন বলছিল তুই আর সেলিম থানায়, বান্দরবন থেকে কি বানর হয়ে ফিরসস্, কথা বলিস না ক্যান?’ ও.সি বলেন, ‘আপনার নাম কি, আমি থানার ও.সি বলছি?’ হারুন নাম বলে। ওসির চোখ খবরের কাগজের উপর। ‘হারুন সাহেব আপনারা বান্দরবন থেকে কবে আসছেন?’  ওসির গলা গোয়েন্দাসুলভ। গতকাল সকালে ওরা ফিরেছিল ঢাকায়। হারুনের উত্তর শুনে ওসি বলেন, ‘আপনার বন্ধুরা এখানে আছে, আসুন।’

ও.সি হাফিজের স্মার্ট ফোনের গ্যালারিতে তার নখ না কাটা তর্জনী ছোঁয়ায়। সাঙ্গু নদীতীরে ক’জন বন্ধুর সেলফি। হাফিজ হাসছে, চুল উড়ছে। এক বন্ধুর হাতে সিগারেট। আরও কয়েকটি ছবির পর নদীতীরে একনগ্ন যুবতীর ছবি। একটি ছবিতে স্তনে কামড়ের ক্ষতটা খুব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ক্ষতের উপর দুটো পিঁপড়ে। ‘ছেলেটি কি পারভার্ট, খুন হওয়া মেয়েটির শরীরের ছবি কীভাবে তুলেছে।’

মেয়েটি থানায় অপেক্ষা করছিল তার এক ছেলে বন্ধুর জন্য। হাফিজ আর সেলিমকে নিয়ে এস. আই তার রুমের দিকে চলে যাবার পর মেয়েটি তার এক বন্ধুকে ফোন করেছিল থানায় আসতে। মেয়েটির দু’জন ছেলে বন্ধু ও.সির রুমে আসল। ‘কানিজ, তুই থানায় কেন? কী হয়েছে?’ কানিজের কাছে সব শোনার পর মোরশেদ আর রিয়াজ প্রায় একসঙ্গে বলে : সান অব বিচরা কোথায়?’ ওসি হাত তুলে তাদের শান্ত হয়ে বসতে বলেন। এক তা কাগজ কানিজের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন, ‘অভিযোগ লিখুন।’ রিয়াজ বলে, কেন এটা তো পুলিশ কেসই হতে পারে।’ ও.সি একজন এস. আইকে নির্দেশ দেন অভিযোগ লিখতে। অভিযোগ লেখার সময় এস.আই জিজ্ঞেস করে মেলানকোলি মানে কি? কানিজ বলে, মনমরা ভাব বা বিষাদগ্রস্ততা।’ এস.আই হেসে দেয়। ‘স্যার কখনও রাস্তার মেয়েগো মনমরা ভাব দেখছেন? ওরা তো সমসময় হাসে। ছেলে দুইটা আমাদের বোকা ভাবছে।’

ও.সি খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে এস. আই-এর ঘরে যান। ঢুকেই দেখলেন : সেলিমকে থাপ্পর মারছে আর গালাগালি করছে এস.আই। ও.সি হাত তুলে থামতে ইশারা করলেন। এবং হাফিজ ও সেলিমকে বললেন : বান্দরবন থেকে আপনারা কবে আসছেন?’ সেলিম রিসোর্টে যায়নি। হাফিজকে ও.সি, একটু হেসে বললেন, এই খবরটি পড়–ন।’ ‘সাংগুতীরে ধর্ষিতার লাশ’ পড়া শেষ না হতেই ও.সি হাফিজকে বললেন : দলে ক’জন ছিলেন?’ হাফিজের মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল। ওসি বান্দরবনের ও.সিকে ফোন করে বললেন, ‘মনে হচ্ছে এক ধর্ষক ও খুনি আমার সামনে।’

সেলিম ভয়ার্তস্বরে বলে, ‘ও.সি সাহেব কাউকে আমি বইটা আনতে বলি। দেখবেন সত্য না মিথ্যা বলছি, আমরা ধর্ষক না, খুনি না।’ ও.সি শান্ত গলায় বলেন, ‘আলামত আমরাই সংগ্রহ করবো।’

কানিজ তার দুই বন্ধুকে নিয়ে ও.সির সঙ্গে এস. আই-এর ঘরে এসেছিল।  হাফিজের ডান চোয়ালে সাঙ্গুনদীর ঢেউয়ের মতো চার আঙুলের দাগ। থাপ্পরে অথবা ঘুষিতে সেলিমের ঠোঁট ফেটে গেছে। সেলিম রক্ত মুছতে মুছতে কানিজকে বলে, ‘সত্যি আমি মার্কেজের বইটির নামই বলছিলাম।’

‘আবার মিথ্যে বলছেন’ ও.সির ধমক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares