প্রচ্ছদ রচনা

tapon-bagchi-1

প্রচ্ছদ রচনা

হরিপদ দত্তর নিষিদ্ধ ঠিকানা :

সমাজ বদলের স্বপ্নচিত্র

তপন বাগচী

হরিপদ দত্ত ষাটের শেষপাদে সাহিত্যজীবনে প্রবেশ করলেও সত্তরের শুরু থেকেই তিনি আলোচিত ও নন্দিত। ছোটগল্প এবং উপন্যাস রচনা করে খ্যাতি অর্জন করলেও তিনি কথাসাহিত্য বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করেছেন। সত্তরের সুশান্ত মজুমদার, হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের পাশে হরিপদ দত্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত। অন্যদের মতো মিডিয়ার আলো তাঁর দিকে কম প্রক্ষিপ্ত হলেও আপন আলোয় তিনি প্রকাশিত হয়েছেন। এর জন্য কিছুটা সময় হয়তো লেগেছে; কিন্তু সাহিত্যের দূরযাত্রাপথে এই কালক্ষেপণ একেবারেই নগণ্য। হরিপদ দত্ত এখন প্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিক। গোটা বাংলা ভাষার প্রেক্ষাপটেই তাঁর সাহিত্যিকে বিবেচনা করা যেতে পারে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের হতাশা ও স্বপ্নকল্পনা নিয়ে তিনি বেশ কিছু ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী উত্তরণের পথ যে সমাজতন্ত্র, এমন একটি বিশ্বাস থেকে তিনি সাহিত্যরচনা করেছেন। নিজের বিশ্বাস থেকেই তিনি সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজবদলের স্বপ্ন দেখেছেন। তেমনই একটি উপন্যাসের নাম নিষিদ্ধ ঠিকানা

এটি লেখা হয় মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরেই। গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে। আমাদের হাতে আছে এর দ্বিতীয় সংস্করণ (২০১০)। স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষের স্বাধীন স্বপ্ন থাকে। সকল স্বপ্ন তো আর সত্য হয়ে ওঠে না। তবু মানুষ স্বপ্ন দেখে। এবং মানুষ যে স্বপ্ন দেখেছিল সুন্দর আগামী সেই সত্যটিও সময়ের ফ্রেমে ধরা থাকে। নিষিদ্ধ ঠিকানা তেমনই এক সমাজবদলের স্বপ্নচিত্র, সময়ের ক্যানভাসে আঁকা। হরিপদ দত্তের কলমের আঁচড়ে সময়ের এক দলিল হয়ে উঠেছে এই উপন্যাস! উপন্যাস সম্পর্কে শুরুতে বলা হয়েছে, ‘১৯৭১-এ স্বাধীনতার ভিতর দিয়ে মানুষের আশাভঙ্গ, অস্থির রাষ্ট্রযন্ত্র, দুর্ভিক্ষ এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এক স্বপ্নলোক এখানে চিত্রিত হয়েছে। কেবল শ্রমজীবী মানুষই নয়, ঘোর অন্ধকারে পতিত নাগরিক মধ্যবিত্তও স্বপ্নদ্বারা তাড়িত। মানুষ যেখানে পৌঁছতে চায়, সেই ঠিকানা তো রাষ্ট্রকর্তৃক নিষিদ্ধ। উপন্যাসটিতে দেখা যাবে একজন মধ্যবিত্ত শ্রেণিবিচ্যুতি ঘটিয়ে বিপ্লবের সেই নিষিদ্ধ পথে পা ফেলছে। আসল পথ তো একটাই। সেই স্বপ্ন ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে, তবু এই পথটার বিকল্প নেই। সেই নিষিদ্ধ ঠিকানা ছাড়া বিশ্বসভ্যতার দ্বিতীয় কোনো ঠিকানাও নেই।’

লেখকের এই বক্তব্য পাঠ করতে করতে আমরা বুঝতে পারি, কতটা আন্তরিক প্রয়োজনের তাগিদে এটি লেখা হয়েছে। শিল্প যে কেবল শিল্পের জন্য, শিল্প জীবনের জন্যও, এই সত্য ধারণ করেই লিখিত হয়েছে এই উপন্যাস। কাহিনি, পটভূমি, চরিত্র, পরিণতি, এসব নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই। আমাদের চেনাজানা গণ্ডিতেই উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত। পটভূমি কারও অজানা নয়। মধ্যবিত্ত চরিত্র তো আমাদের একান্ত আপন। এই উপন্যাসে যে সমাজতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে, তা চৈনিক আদর্শের সমাজতন্ত্র, মাও সে তুং তার নেতা। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তো এমন বাস্তবতাই বিরাজ করেছিল। তবে একই আদর্শের পতাকাবাহী, একই মাও সে তুং নেতার অনুসারী দলের সংখ্যা ছিল অজস্র। আমরা জানি যে, সত্য এক এবং অদ্বিতীয়। কিন্তু সেই সময়ের বিপ্লবের লক্ষ্য এক হলেও পথ এবং কৌশলের ভিন্নতার কারণে তা আর বাস্তব অবস্থায় পৌঁছতে পারেনি। তবু সময় তো সেই ইতিহাস ধারণ করে আছে। সেই ইতিহাসেরই সাহিত্যিক বিবরণ এই উপন্যাস। উপন্যাসের গুরুত্ব এখানেই।

উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট যেখানে বিপ্লবের আকাক্সক্ষা, সেই আকাক্সক্ষার পরিণতির আগেই কাহিনি শেষ করতে হয়েছে। আকাক্সক্ষা পরিণতি না পেলেও উপন্যাস পরিণতি পেয়েছে। ঔপন্যাসিকের সফলতা এখানেই। মধ্যবিত্ত পরিবারের শ্রেণিচ্যুত হওয়ার অজস্র কাহিনি থেকে একটি কাহিনি বেছে নিয়েছেন লেখক। তুলে ধরেছেন বিশ্বাসযোগ্যভাবে।

উপন্যাসের ভাষা অনেকখানি কাব্যময়। উপমা-প্রতীক ব্যবহারে তিনি বেশ সাবলীল হয়েছেন। তবে কোথাও কোথাও হোঁচট খেয়েছেন। সত্যের খাতিরে এগুলো না বলে উপায় নেই। যদি লেখক নবীন হতেন, কিংবা এটি তার প্রথম যৌবনের লেখার পুনর্মুদ্রণ হতো, তবে হয়তো এড়িয়ে য্ওায়া যেত। লেখক বলেছেন, ‘বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে। বর্তমানের প্রকাশনাটি পরিমার্জিত, বলা যেতে পারে নতুন সংস্করণ’। তো আমরা ধরে নেব যে, এটি ২০১০ সালের পুনঃরচিত গ্রন্থ, যখন হরিপদ দত্ত পরিণত ও সিদ্ধ। তাই ভাষাগত অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলাই যেতে পারে। এই সমালোচনা গ্রহণ করার মতো ধৈর্য লেখকের আছে বলেই বিশ্বাস করি।

লেখা হয়েছে, ‘শিউলীর মেধাশক্তি অত্যন্ত উর্বর। বুঝার চেষ্টা না করেই মেট্রিকে ও অংকে লেটার নম্বর পেয়েছিল। কিন্তু যোগ-বিয়োগে আজো ভীষণ ভয়। যদি না-ই মিললো?’ যে মেয়ে অংক না বুঝে মুখস্থ করে, সে কী করে মেধাবী হয়? মুখস্থ বিদ্যা কখনওই মেধার নমুনা নয়। শিউলীকে যদি মেধাবী হিসেবে তুলে ধরার বাসনা হয়, তবে  তেমন নমুনাই হাজির করার দরকার ছিল। যে নমুনা হাজির করা হয়েছে তা স্মৃতিশক্তির। তাই বলা যেতে পারে ‘শিউলীর স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর’। আর স্বাধীনতার পরে তো মেট্রিক পরীক্ষা ছিল না। ছিল, এসএসসি বা মাধ্যমিক পরীক্ষা। কালিক হিসেব মেলাতে এইসব দিকে নজর দিলে পাঠকের মনে বিভ্রম হতো না।

tapon-bagchi-2লেখা হয়েছে, ‘এরপর কথা নেই। শুধু সেন্ডেলের কর্কশ শব্দ ধীরে ধীরে ধ্বনিহীন হয়ে দূরে মিলিয়ে যায়। মরা মানুষ পোড়ার মতো অলৌকিক দুর্গন্ধ নাকে এসে বাসা বাঁধে মাহমুদের।’ এখানে ‘ধ্বনিহীন হওয়া’ আর ‘দূরে মিলিয়ে যাওয়া’ তো একই অনুষঙ্গ। শব্দ দূরে মিলিয়ে গেলে তো ধ্বনিহীন হবেই। যে-কোনো একটি অনুষঙ্গ বললেই মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়ে যেত। এই বাহুল্য পাঠকের মনে ভুল ইমেজ তৈরি হতে পারে। শেষের বাক্যে মানুষ পোড়ার দুর্গন্ধকে ‘অলৌকিক’ বলার যুক্তি খুঁজে পাই না। এটা লৌকিক বটে! যদি অলৌকিক ঘটনাকেও অলৌকিক বানানো যায়, তখন কার্যকারণ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে। এরকম উদাহরণ আরও দেওয়া যায়। আমি বলতে চাই যে, একটি ভালো উপন্যাস পড়তে গিয়ে এভাবে হোঁচট খেলে এগোনের ইচ্ছাটাই বাঁধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

এসব বাহ্য! অনেক সুন্দর বিবরণ রয়েছে এই উপন্যাসে। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের খণ্ডচিত্র এঁকেছেন অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে। যেমন- ‘অফিসের পথে হাঁটছিল মাহমুদ। রাস্তার পাশে একটি কুষ্ঠরোগী গলিত দুর্গন্ধময় পা দুটো বড়ো স্বাধীনভাবে পেতে রেখে কাতরকণ্ঠে পথচারীদের কাছে ভিক্ষে মাগছিল। দু’একজন নাক বন্ধ করে ত্রিভুজের মতো চোখ তুলে একবার তাকিয়ে পথ হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ ক্ষুধার্ত একটি কুকুর কসাইয়ের রক্তমাখা ছুরির মতো জিহ্বা বের করে চাটতে শুরু করে দিল লাশের মতো মৃত পা দুটো। লোকটা জোরে চেঁচিয়ে উঠল কান্নার মতো করে। কুকুরটা সরে গেলে।’ মানুষ কুষ্ঠাক্রান্ত। কুকুর ক্ষুধার্ত সেই বিবরণ দিয়ে দেশে যে দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করছে, সেটি প্রকাশ করলেন। ‘ত্রিভুজের মতো চোখ তুলে’ এই উপমাটা বুঝতে না পারলেও সমগ্র বিবরণে যে চিত্রকল্প তৈরি হয়েছে, তা অবশ্যই নান্দনিক বিচারে উত্তীর্ণ। লেখকের চোখ খুব তীক্ষ্ণ বলেই তা সম্ভবপর হয়েছে।

এই পর্যন্ত লিখে আমার মনে হচ্ছে সমালোচনা করতে কি একটু বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেললাম। লেখক কি তা মেনে নিতে পারবেন। আমার মূর্খতা তুলে ধরে উল্টো গালাগাল করবেন না তো। তাই আগেভাগে বলে রাখি, লেখককের হাজারো ব্যাখ্যা থাকতে পারে তার লেখার পক্ষে। কিন্তু পাঠকের সামনে তো আর ব্যাখ্যা তুলে ধরা হচ্ছে না, মেলে ধরা রয়েছে মূল লেখাটাই। সেখানে যদি বোঝার ঘাটতি তৈরি হয়, তার দায় একা পাঠকের নয়, লেখকেরও। লেখকের ভয়েই হযতো আমাদের দেশে সমালোচনা সাহিত্য তৈরি হয় না। আমারও পূর্বাভিজ্ঞতা ভালো নয়। তবু হরিপদ দত্তর উপর আস্থা রয়েছে যে, তিনি ভুল বোঝার আগে একবার ভাববেন অন্তত।

এইসব সীমাবদ্ধতার পরেও বলতে পারি যে, সমাজবদলের স্বপ্নচিত্র অংকনে লেখক হরিপদ দত্ত সফল হয়েছেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares