প্রচ্ছদ রচনা

begum-akhtar-kamal-1

প্রচ্ছদ রচনা

মোহাম্মদ রফিকের

কবিতার দিগন্ত ও প্রান্ত

বেগম আকতার কামাল

কবিতা হচ্ছে কবির অন্তরোৎসারিত সৃজনক্রিয়া। এটি দৈব প্রতিভারও অধীন, কারণ ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’; এই কবির কিছু কথা থাকে যার প্রকাশরূপ বাঁধা পড়ে স্বকীয় শৈলী আর প্রতিভার মিথস্ক্রিয়ায় শব্দে-ছন্দে। এই প্রকাশরূপ, যাকে বলা হয় রূপাদর্শ কালে কালে বিবর্তিত ও বিকাশশীল হয়, আর তাতে জড়িয়ে থাকে দেশকাল ও ইতিহাসের বাস্তবতা, শ্রেণি-জীবনের সংস্কৃতি, একটি ভাষাগোষ্ঠীর জীবনের প্রতিকৃতি ও চিন্তার প্যাটার্ন। কবি তার মেহনত দিয়ে সৃষ্টি করেন নিজের শৈলী ও স্বরভঙ্গি এবং সমবায়ী কাব্যধারায় হয়ে উঠেন স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট। বাংলাদেশের কবি মোহাম্মদ রফিকের কবিতায় আমরা কি তেমন স্বতন্ত্র বিশিষ্ট চিন্তাবেগ-প্রকাশশৈলী দেখি? জীবনের রাজনীতি ও সমাজ-সংস্কৃতির আর উৎপাদন কাঠামোর জটিল জালে জড়ানো থাকে যে মানবমনের গভীর সংকট এষণা-বাসনা-উৎকাক্সক্ষা সেসবের কীরূপ ব্যঞ্জনাময় ভাষিক রূপ তাঁর বাক্যসাধনায় লক্ষ করি?

আধুনিক কবিতা বলে যাকে আমরা জানি, যা তিরিশ-প্রভাবিত তা বাংলাদেশের ঢাকা নগরীর পটভূমিতে কতটা আলাদা হয়ে গেছে- নতুন মানচিত্র ও ভূখণ্ডের জীবনজটিলতার কারণে সেটিও অনুধাবনযোগ্য। মোহাম্মদ রফিকের ২০১১ সালে প্রকাশিত কবিতা সমগ্র-এ মোট সাতটি কাব্য সংকলিত হয়েছে যদিও তাঁর এ পর্যন্ত আরও কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম কাব্য বৈশাখী পূর্ণিমায় (১৯৭০) তাঁর নিজস্বতা উন্মোচিত হয়েছিল। সেটি হলো সুচারু কাব্যকণ্ঠ, শব্দবিন্যাসের মায়াবল এবং স্বদেশের মায়াবী প্রকৃতি আর ঐতিহ্য-পশরা। তবে, সবকিছুকে ব্যক্তিপ্রাণের অজানা উদ্বেল বাসনার সঙ্গে জড়িয়ে দেন এবং একলা ব্যক্তির মুখচ্ছবি নিরীক্ষণ করেন গভীরতর বেদনায়-বিষাদে। বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে স্ত্রীপুত্র-রাজ্য সবকিছু পরিত্যাগ করে তথাগত বুদ্ধের একলা-হয়ে যাওয়া সম্পর্কে তাঁর ভাবনা স্বতন্ত্র: “দেখিলে সমস্ত পৃথিবীতে/ আকীর্ণ-তোমার মৃত্যু।/হৃদয়ের ঘাটে কি সম্ভার তুমি/ দেখেছিলে ভেসে যেতে ম্লান ডালিখানি।/একটি ফুলের ঘ্রাণে ভরে গিয়েছিল/তোমার হৃদয় এই দুর্মর নির্বেদে।/অনুভবে বুঝেছিলে প্রসব- বেদন/শুধু নিয়ে আসে সাথে যুগে- যুগান্তর/অকল্যাণ অমঙ্গল যন্ত্রণা বিষাদ।/শুধুই কি এইটুকু আর কিছু নয়।/তবে এই আনন্দ-বেদনা কে দিল সম্ভার, আজ কবি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন দূরের পরিত্যক্ত দেবালয় বিরহিণী সন্ন্যাসীর মঠ,/ বারবার হাতছানি দেয়/ ডাক দেয় আমার গভীরে,/আলোড়িত হই শুধু, আর কিছু নয়।” এই যে অনির্দেশ্য বিরহ-বেদনা তা রোমান্টিকদের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তবে রোমান্টিকের সঙ্গে পার্থক্য হলো তারা শুধু বিষাদ-বিরহের অতলে নিমজ্জিত হয়েছিল সৌন্দর্য সন্ধানের জন্যে, আর আধুনিক কবিরা সৌন্দর্য নয়, অস্তিত্বকে চৈতন্যের সর্বোচ্চ নিরীক্ষায় নিয়োজিত করে পেতে চেয়েছিল অস্তিত্বের গভীরতা, বুঝতে চেয়েছিল আপাত বাস্তবের আড়ালের মুখচ্ছবি- অন্য-এক রিয়েলিটি যা মননকে আশ্রয় করেছিল, আবেগের পরিবর্তে। জীবনানন্দের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায় গৃহত্যাগ ও অশ্বত্থ বৃক্ষে আত্মহত্যার যে পরিকল্প রয়েছে তাতে সত্তার ও বোধের গভীরতর অসুখকেই মনন আর আত্মনাট্যের আঙ্গিকে ধারণ করা হয়েছে। মোহাম্মদ রফিকের বৈশাখী পুর্ণিমায় আবেগাশ্রয়ী যৌবনবেদনাই প্রকাশ পেয়েছে- “জ্যোৎস্নায় ভরে আছে পৃথিবীর প্রান্তগুলো/নির্জনতা মুড়ে দিল সমস্ত মন্দির দেবালয়/আমার হৃদয় শুধু কান্নায় উতলা হয়/ কি এক পবিত্র অভিমানে।” তিনি ‘এ জন্মের জতুগৃহের’ তথাগতের মধ্যেও দেখেন তাঁর হৃদয়ের কান্না। এই কাব্যের প্রথম কবিতা ‘আবেগ’- এও তিনি বৈরাগ্যের প্রবাহ আর অস্থির ক্রন্দনকেই দেখতে পান। অন্তর্লীন এই বিষাদ ও বৈরাগ্যকে দেখেন অসীম সৈকতে অন্ধকারে ক্রমশ বিলীন হয়ে যেতে, যেমন করে রাত্রির তমসায় ঢেকে যায় দিনের নদী, ‘কিছু প্রেম কিছু ধন/সন্তানের স্নেহ/প্রেমিকের অভিমান/স্বাভাবিক জীবনের স্রোতে/ কী আনন্দে তুলে নেয় এই রাত সবকিছু/ নিজের গভীরে/ম্রিয়বান আশার উৎসবে।’ (যে রাতকে অনুভব করেছি) এই রাত কি নতুন কিছুর জন্ম দেবে? কম্পিত অন্ধকার নিয়ে আসবে ‘আশ্চর্য শিহরণ।’ এরকম আশাবাদী নতুন কিছুর জন্মসম্ভাবনার ইঙ্গিতময়তায় কবিতাটি নিটোল ও স্বচ্ছতোয়ার মতো বয়ে চলেছে।

ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে তৎকালীন এই ভূখণ্ডে যে বাঙালি সত্তার জাগরণ ঘটে, যাতে মিশেছিল সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শ, মুক্তির গতিবেগ, তারই ফলশ্রুতি হচ্ছে ’৬৯-এর গণআন্দোলন। ষাটের কবিতায় ছিল যে অবক্ষয়, নৈরাশ্য আর স্যাড জেনারেশনের গোষ্ঠীবদ্ধ শৈল্পিক আন্দোলন তা দূরীভূত হয়ে জাতীয় চৈতন্যের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের লড়াই আশাবাদ বয়ে এনেছিল, মোহাম্মদ রফিক এই দশকেই উত্থিত হন। হৃদয়-বাসনা, বিষাদ- বিরহবোধ ও যৌবনোচিত ‘গোলাপের মৌন অনীহার’ মধ্যে তিনি আত্মধ্বংসবাদী হয়ে ওঠেন, এই ধ্বংস আধুনিক কবিতার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ঘেরাটোপ থেকে বের হয়ে ও রোম্যান্টিক সাধ-স্বপ্ন অভিসার বাদ দিয়ে জীবনকে গ্রহণের জন্যে প্রস্তুত হতে থাকে। কাব্যটির অনেকগুলো কবিতায় আত্মতা আর স্মৃতিচারণা থাকলেও- যা সব কবির প্রথম কাব্যেই দেখা যায় তা অতিক্রম করার প্রয়াসও করেন। আর তা করেন প্রকৃতির সঙ্গে মিলে গিয়ে। কখনও কথায় প্রত্যয়াভাস ঝলকে ওঠে, কখনও বা নিজস্ব কণ্ঠস্বর যা এখনও একস্বরিক, বহুস্তরিক নয়। ছোট, মিত পরিসরে এসব প্রকৃতিদৃশ্য ধরা দেয়, প্রেমের ইশারাও উদ্ভাসিত হয় চকিতে। তবে সব মিলিয়ে তার আত্মতা ও উচ্চারণই প্রাধান্য পায়। অন্যাসক্ত অলঙ্কারের- যেমন বর্ণের সমারোহ, মুমূর্ষু ধূসর আভা ইত্যাদি, আশ্রয় নিয়ে আত্মার উচ্চারণ একধরনের অন্তর্লীনতা ও নিভৃতি সঞ্চার করে দেয় পাঠকের চিত্তে, দেয় ছন্দস্পন্দিত গতিময়তা যা কবিতাগুলোকে স্রোতোচ্ছল করে। আত্ম-বন্দিতা থেকে বেরিয়ে আসার আকুতিও আছে- ‘আবার আসব কাল/এইখানে দিনের অন্তিমে এড়িয়ে দৃষ্টির বেড়াজাল/সতর্ক পাহারা পিছে রেখে, যদি পারি মেখে নিতে/চোখে মুখে দেহে মনে/ বিপুল বাতাস বা সে উদার আকাশ তারাজ্বলা…। (কয়েদির উক্তি) অর্থাৎ রফিক তার আত্মচৈতন্যকে প্রকৃতিপ্রাণের ও সৌন্দর্যের পশরায় ভরিয়ে তুলতে চান। এই প্রয়াস রাবীন্দ্রিক ও জীবনানন্দীয়ও বটে। আমাদের আদিঅদিতি এই প্রকৃতিমাতাই সচেতন, চিন্তাশীল, আবেগময় মনুষ্যপ্রাণকে নিজের অঙ্গে ফিরিয়ে নিতে চায়। রবীন্দ্রনাথ গেছেন বিশ্ব-প্রকৃতি এমনকি কসমিক জগতের অধিবাস্তব পরিধি পর্যন্ত, জীবনানন্দ গিয়েছেন আদিঅদিতির নিভৃত অন্ধকারের গর্ভে- পরাবাস্তব নিশ্চেতনায়। রফিক শুধু প্রকৃতির প্রাণের স্পর্শে উৎফুল্ল ও অনুভব করতে চাইছেন, তাঁর মননগভীরতা এখানে রোম্যান্টিক চেতনার অনুবর্তী।

begum-akhtar-kamal-2ধুলোর সংসারে এই মাটির (১৯৭৬) কবিতাগুলোর আবহে অপরার জগৎ ছুঁতে চেয়েছেন কবি- সেই অপরাহ্ন ‘তুমি’ ও এই মানবসংসার। ‘ক্রমে ক্রমে সবাই বিরুদ্ধে যায়/এমনকি তুমিও তোমার’- অথবা ‘তোমার তোমাকে নিয়ে কোনোদিন করবার ছিল কাজ’- এরকম পঙক্তিতে ঠিক প্রেমিকা ‘তুমি’-সত্তা নয়, যেন তিনি পাঠকেই সম্বোধন করছেন, আত্মতা এখানে আত্মবিরুদ্ধতায় আক্রান্ত। ছোট-ছোট বাক্যের আবর্তে এক একটি ছবি ফুটিয়ে তোলেন কবি, এটাই তার মূল বৈশিষ্ট্য এবং একধরনের চমৎকারিত্ব সূচিত হয় এসব বাক্যাংশে। চলে-যাওয়া সবকিছু ভেঙে পড়া আর পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্নতা থাকলেও কবিতাগুলোতে চারপাশের দৃশ্যায়নে নিজেকে মিলিয়ে দেয়। আকাশ মেঘ ফুল নদী- সবকিছুর নির্বিকার ও নিত্যতার বহমানতা ফুটে ওঠে, বিপরীতে থাকে কবির চেতনার ভাঙাগড়া একাকিত্ব। এখানে প্রকৃতি আর আত্মতার আশ্রয় নয়। ফলে অন্যাসক্ত অলঙ্কারের চেয়ে চিত্রকল্পের বর্ণদ্যুতি বেশি আলো ছড়ায়- ‘গাছের ছায়ায় বিদ্ধ কম্পমান দেহের সন্ত্রাস’, ‘চোখের আকাশ/জুড়ে ভীতসন্ত্রস্ত আলো, জানালায় মৃত সংকুচিত/ব্যথিত পর্দার ফাঁকে কম্পমান হিমেল বিধুর/শব্দগুলো দূরাগত স্মৃতির স্বপ্নের মন্ত্রপাঠ।’- এরকম কাব্যপঙ্ক্তি ধুলোবালির সংসারটিকে ধরে রাখে। যা-কিছুই দৃশ্যমান ও অনুভবযোগ্য, যে-কোনো তুচ্ছ বস্তু বা স্মৃতি ঘিরে কবিতা ডানা মেলে দেয়, উড়াল দিতে চায় কাব্যিক নীলিমায়। ‘প্রাকৃতিক’ শিরোনামে যে পাঁচটি মিতপরিসরের সিরিজ কবিতা লেখেন তাতে দেখি প্রাকৃতিয়ানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংসার যাত্রা, ‘তুমি’ এবং কখনও কিষাণ ও অন্যরা। কবি যে ক্রমশ আত্মার বেড়ি কেটে বেরিয়ে আসেন প্রত্যক্ষ বাস্তবতায়, মানবমানবীদের ভিড়ে তার ইশারা আছে এখানে। যদিও তা কর্মচাঞ্চল্যে সংঘাতে-দ্বন্দ্বে ভরপুর নয়, বরং একাকিতায় নিমগ্নচেত ‘একাকী কিষাণ/দাওয়ার ফ্যাকাশে রোদে চুপচাপ মূঢ় জবুথবু/সারাদিন খাটাখাটি এন্তার কাজের চাপে ভাঙা, মুমূর্ষু চিন্তার ছোট অস্পষ্ট বালুর কারুকাজ চোখে মুখে…’ (কিষাণের দিনলিপি) ধুলোমাটির এই সংসার যেহেতু রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার বাইরে যেতে পারে না, তাই রফিকের কবিতায় তৎকালীন সত্তরের দশকের দ্বিতীয়ার্ধের সন্ত্রাস-গুপ্তহত্যা- বেয়নেট ইত্যাদি ভিড় করে। ‘মোহাম্মদ রফিক এই যে, ফিরে তাকাতেই তার/প্রচণ্ড মুষ্টির ঘায়ে ছিটকে পড়ব, অসহায়/দরদর রক্তধারা নাইয়ে দেবে, গড়াব ধুলোয়/কিংবা বন্দুকের নল তাক করে বুকের পাঁজরে/মাত্র একটি তীব্র শব্দে চোখের পাতার গাঢ়তর/পরতে-পরতে ক্রমে লেপ্টে যাবে স্থির অন্ধকার। (রফিক এই যে) কিন্তু এই সন্ত্রাসের ছবির পরেই আছে আত্মতার একাকিত্ব, তবে এবার নিজে যে সংসারের ব্যবহারের অযোগ্য- এ বোধটিও আছে। কিন্তু বেশি এমনটি কবিতায় চিত্রিত হয়নি। তার চেয়ে বরং ধুলোমাটির এই সংসারের প্রাত্যহিক অপ্রাত্যহিক দৃশ্যমালাই বেশি স্থানজুড়ে থাকে, পাঠক তার কবিতায় যে চরিত্র বলটি খুঁজে পাবেন তা হচ্ছে চমৎকার ছন্দজ্ঞান, নির্বাধ গতিসচ্ছল বাক্যস্রোত। ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত কীর্তিনাশা কাব্য থেকে মোহাম্মদ রফিকের স্বকীয়তা ধরা পড়ে, দিক পরিবর্তন করেন তিনি। পুরো কাব্যটিতে বাংলা বর্ণমালার অক্ষরগুলোকে শিরোনাম করে সিরিজ কবিতা গড়া হয়েছে। নদীর চিত্রকল্পে আঁকা হয়েছে সংসারেরই চিত্র, মানুষ-মানুষীর জীবনযাপন, অনুভূতি, কষ্ট-বিপন্নতা, প্রতীকী অর্থে এই নদীর ‘প্রতিটি ঢেউয়ের ঘায়ে বেহুলার স্বপ্নে ধস নামে;/ তুমি কোনো আশা নও কোনো শেষ নও শুধু গাঙ।’ ধসের কবলে দূর দিগন্তরেখা/ উথাল-পাথাল শাসায় প্রবল গ্লানি/ তীরজুড়ে ছোটে সুতীব্র ক্ষোভ ব্যথা,’ তাই নদী মানবিক সৃষ্টি নয়, ‘কোনো/প্রাকৃতিক না তাও নয়, শুধু ভীত শুধু খল/ অনুশোচনায় কাঁপে মেঘের আড়ালে ক্ষীণ চাঁদ।’ এই নদী কি তবে জীবন? হয়তো তাই, জীবনের মতোই সুখদুঃখ-বাসনা- স্বপ্নভাঙা বেদনা গর্ভ, আর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মতোই এর ক্রিয়াকৃতি। আসলে কবি মানবজীবকেই, তার কীর্তি ও বিনাশকে ইঙ্গিত করতে চাইছেন। এখানে আত্মতার কণ্ঠস্বর অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে, দৃষ্টিকল্প আর শ্রুতিকল্পের ইন্দ্রিয়বিপর্যয়ে সে নদী ও জীবন পারস্পরিক হয়ে উঠেছে। নদীকে নিয়ে রোম্যান্টিসিজমের পালা এই বর্তমানে অরোম্যান্টিক সময়ে আর তো সম্ভব নয়, নদী জীবনের রূপক হয়ে কোনো মরমিয়া বোধও রচনা করে না। চারপাশের প্রতিবেশে যে খরা তা কীর্তিনাশা কতদূর যাবে- “এই দেশে খরার কি শেষ আছে? মারী ও মড়ার/সারা গায়ে লেপ্টানো শাড়ির ঢেউ শতচ্ছিন্ন দীন/ সূর্যের লোলুপ চোখে জ্বলে ওঠে উদ্ভিন্ন নিষ্ঠুর/এইভাবে দুঃখে দৈন্যে কীর্তিনাশা কতদূর যাবে?/এই দেহ কাল হবে কেউ তাকে ঠিক ছিঁড়ে খাবে।” কী করে মরমিয়া লোকগান আধুনিক চেতনার ভিন্ন আবহ ও মাত্রা তৈরি করে তার দৃষ্টান্ত- “মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে আমি আর বাইতে পারি নে/ কার সঙ্গে কথাবার্তা, দেনা-পাওনা শীতের আঁধারে/ ভাঙা নাও তীর ঘেঁষে পড়ে থাকে আদি অন্তহীন।” তবু কিছুটা জীবনবোধ ছুঁয়ে যায় কবির চেতনাকে- “এইসব ক্লান্ত চলাফেরা/আশা-দ্বন্দ্ব এলোমেলো হিজিবিজি অর্থহীন রেখা/পড়ে থাকে চরের বালুতে একা পড়ন্ত বিকেলে”। তীর-গঞ্জ-গ্রাম সবই অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যায়, মিথ্যে হয়ে যায় জন্মের কাহিনিগুলো, গালগল্প, রূপকথা, শুধু কীতির্নাশা তার পাহাড়ের পাদদেশ, ঝরনা, দীর্ঘ ঝাউ নিয়ে পড়ে থাকে, যার কোনো ভবিষ্যৎ নেই! শেষ পঙক্তির এই ভবিষ্যৎহীনতা কবিরই শুধু নয়, নৈরাশ্য কবলিত স্বদেশেরও। এই ধারানুক্রমে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত সাড়াজাগানো, স্বকীয়তামণ্ডিত কাব্য গাওদিয়া প্রকাশিত হয়।

কাব্যটি উৎসর্গ করা হয়েছে কমরেড তাজুল ইসলামের  স্মৃতিকে, অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায় সন্ধানের স্বদেশী দীর্ঘশ্বাসের মতোই যার জীবন মৃত্যুর অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে, আশা আর হতাশার দ্বান্দ্বিকতায় এই কাব্যের লেখাগুলোর পরিসর কমবেশি বেড়ে গেছে। কবি এখন তার ‘কথা’ খুঁজে পেয়েছেন। একাকী উচ্চারণ থেকে কথায় ছড়িয়ে পড়ায় কবির দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তিত হয়েছে, বিস্তৃত হয়েছে তাঁর দেখবার জগৎটি। আশির দশকের অন্য কবিরা যেখানে স্বৈরশাসনের দীর্ঘছায়ার তলে থেকে কেউ বাস্তবতাকে দেখেছেন মরমিয়া-দার্শনিকতার প্রচ্ছদে, কেউবা গেছেন প্রাকৃতিয়ানে রূপকের ছদ্মবেশও কেউকেউ নিয়েছেন সেখানে মোহাম্মদ রফিক এই জনপদের গ্রামীণ জীবনযাপনে, মানুষের কাছাকাছি, দূরত্ব ঘোচাতে চেয়েছেন নিজের এলিট জীবনের সঙ্গে জনমানুষের নিত্যপ্রবহমান জীবনচেতনাকে, গাওদিয়া গ্রাম হয়ে উঠেছে তার আশ্রয়ভূমি, যেমন কবি রফিক আজাদ তার আর্কেডিয়ার প্রতীক করে তোলেন প্রান্তিক জনপদ চুনিয়াকে।

অবশ্য রফিকের গাওদিয়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথা উপন্যাসের নানা অনুষঙ্গে যেমন ভরা থাকে, যা শুধু স্মৃতির মলাটবন্দি, তা আজ আরও বহু অনুষঙ্গে ঠাসা, চলমান জীবন্ত এক গাওদিয়া আরও বিস্তৃত পরিধি নিয়ে উপস্থাপিত। এখানে ভাঙাচোরা জীবন যেমন বহুতর, বটগাছ, তেমনি হারানার মৃত্যুকে ব্যবচ্ছেদ করে কবি আসলে বর্তমানের স্বদেশকেই তুলে ধরেছেন। “আকাশের দেবতা কেন যে তাকে কটাক্ষ করল/হারান বুঝেছে, এই বাঁচা ঠিক বেঁচে থাকা নয়।/আমুণ্ডু জড়িয়ে শ্যাওলা”।- ঔপনিবেশিক গ্রাম বাংলার চালচিত্রটি যেমন মানিক তাঁর উপন্যাসে নিয়তির জালে আটকে পড়া মানুষগুলোর হাসিকান্না-দ্বেষ- সংস্কার-প্রেমমনস্তত্ত্ব নিয়ে এঁকেছেন, তারই টুকরো-টাকরা দৃশ্যকল্প স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের গাওদিয়ায় রফিকও সিম্ফনিক করে তুলতে চেয়েছেন, অসাধারণ নিপুণ এই দৃশ্যকল্পগুলো কবিতাটিকে করে তোলে চিন্তা ও আবেগের জ্বালায়ন, তাছাড়াও অনুষঙ্গ উল্লিখন হয়ে আসে জসীম উদদীনের নক্সী কাঁথার মাটের সাজু ও রূপাই- শশী আর কুসুমের ফ্রয়েডিয় মনঃসমীক্ষার পাশাপাশি- “শরীর শরীর শুধু তোমার কী মন নেই বউ,’ অথবা, ভীতগ্রস্ত দিনান্তের ঘামেরক্তে সাজু ও রূপাই/ঘরে ফেরে শরীরে শ্রমের কুষ্ঠ পোড়া দুই চোখে/অতীতের কোনোএক নকশি কাঁথা বোনো ভুল পাড়/গামছায় এক মুঠো চাল লঙ্কা কয়েকটা আনাজ।” এই ভাঙাচোরা গাওদিয়ার দারিদ্র্য রূপকথা, মহাজনী সুদ ইত্যাকার বাস্তবতায় ভরে ওঠে দীর্ঘ কবিতাটির আঙ্গিকে। তবু যেন গাওদিয়া অপরাজেয়, আশাময়, “গাওদিয়া একদিন শঙ্কিত আলোক ভেঙেচুরে/ গতিপাকে শুয়াপক্ষী প্রেতলোকে অচিনপুরীর খাঁচা থেকে ভাঙা ডানা নিস্তব্ধ শূন্যে মেঘে-মেঘে,/ তাঁত বোনো/ তাঁতী বউ। হারান এখন জানে সে মরে মরেনি।” স্মৃতি-বিস্মৃতির দোলায়, জনপদের মানুষ আর প্রকৃতি-যা সর্বদাই চলিষ্ণু, কালের রথ থেমে গেলেও যাদের চলা থামে না, আশা ফুরায় না সেই জীবনটি রূপকে চিত্রকল্পে- ছন্দস্পন্দে হয়ে উঠেছে সার্কারামা।

এখন আর প্রকৃতি নিতান্ত রমণীয় নয়, তা জীবনের পায়ে পায়ে জড়ানো। এই চাঁদ এইসব জলধারা, তরুলতা, মেঘ-রৌদ্র, এদেশের গল্পগাথা-রূপকথা উপন্যাসের ছিন্ন সংলাপ- ‘বসন, জীবন এত ছোট কেনে/ও চাঁদ ও জল’ মিলেমিশে যে সিমফনিক আবহ তৈরি করে তা প্রকৃতি/জনপদের জীবন চিত্রণের চিরচেনা আঙ্গিককেই বদলে দিয়ে রফিকের তাঁত বোনার মতো কবিতার অন্তর্বয়ন ও একইসঙ্গে অর্ন্তবয়নকে নান্দনিক করে তুলেছে- একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আমরা তাঁর কবিতায় মিথের ব্যবহার এ পর্যন্ত দেখিনি কিন্তু রূপকথা-গ্রামীণ পরাণকথার উল্লিখন পাচ্ছি গাওদিয়া কাব্যে। কেন্দ্র রাজধানী ঢাকার এলিট কবির এই গ্রামীণ জনপদ-চিত্রণকে কখনও মনে হয় না দূর থেকে দেখা, কবি যেন জীবনাভিজ্ঞতার রসে চিত্রণটিকে রূপবর্ণ দিয়েছেন। কিন্তু আগেই বলেছি এই গাওদিয়া আবহমান হলেও এতে ভিড় করে বর্তমানের আশাভঙ্গের বেদনা, ক্ষুধার তীব্রতা, মৃত্যুর তাপে পোড়া এক জীবন। মনে হয় রফিক গ্রামবাংলার ‘আহা কি সুনিবিড় শান্তির নীড়/ছোট ছোট গ্রামগুলো’- এরকম স্বপ্নময় কথনকে বাস্তবের ছুরি দিয়ে ব্যবচ্ছেদ করছেন। একদিকে বিরাট পরিধিই কেবল নয়, এই কাব্যে অনেক মানুষ, বহুকণ্ঠস্বর পাওয়া যায়, অপরতাকে পাওয়া যায়- যারা মরে বাঁচে তাদের রক্তের স্রোতে, রূপকথারা মৃত্তিকায় এসে দাঁড় করায় জীবনকে ও স্বদেশকে। স্বদেশ চেতনার এটি একরকম ভিন্ন উৎসারণ ও কথন, অনেকটাই সমাজচিন্তার দ্বারা ঘনিষ্ঠ, মনে করিয়ে দেয় কবি বিষ্ণু দে-র পূর্বলেখ বা স্মৃতিসত্তা ভবিষ্যত কাব্যের ভাবনানুষঙ্গ।

খোলা কবিতা (১৯৮৩) গাওদিয়ার আগে প্রকাশিত, এখানে কবির সমাজভাবনা আরও প্রবল ছিল, লোলুপ দুর্নীতিবাজ অপদার্থের “দারুণ কামড়ে/অনুর্বর মাঠ-ঘাট, ছিন্নভিন্ন সমাজকাঠামো/রন্ধ্রে রন্ধ্রে পুঁজিবাদী কালো থাবা লাল রক্ত ঢালে”। আশির দশকেই এদেশের দিনার মোহরের চকমকি শুরু হয় ও পুঁজিবাদের গর্ভে প্রবেশ ঘটে বাংলাদেশের। আর জীবনবিরোধী বাস্তবতারূপে তো আছেই সামরিক স্বৈরশাসন, নানা বিধিনিষেধ, কঠোর শাসনব্যবস্থা, বুটজুতা আর জলপাই ইউনিফর্মের সদম্ভ পদচারণা, কবি তবু আশা ত্যাগ করেন না- ‘এই স্বপ্ন মাটির বয়সী/বাঘা যতীনের রক্ত থেকে জেগে ওঠে প্রভাতী আকাশ।’ ইতিহাসদৃষ্টি এসে বাস্তবতাকে শক্তিমত্তায় উদ্বুদ্ধ করে। আসে বায়ান্ন, একাত্তরের যুদ্ধ ও ধ্বংসের কথকতা, এ সময় মধ্যবিত্তের প্রেমের কড়চা রচনা আর কাম্য নয়, ‘মাটিতে শিকড় নেই। মহাশূন্যে ঝুলে আছে গাছ। তবে তাই হোক, বন্ধ হোক, এই ঠাট্টা প্রেম-প্রেম ভাব।’ মধ্যবিত্তের জীবনটাই এখানে শিকড়হীন ও মহাশূন্যে ঝুলে থাকা গাছের মতই তার বিপ্রতীপ বাস্তবতা। কাব্যিকতাকে বাস্তবের মাটিতে ছড়িয়ে দিতে গিয়ে উল্লিখন ব্যবহার করেন “পাঁকেরক্তে মাখামাখি রাজার কুমার, পঙ্খীরাজ,/ভোমরা প্রাণবন্ধু, নয় কোটি রাজার সন্তান;/কড়িকাঠে ঝুলে থাকে নবীতুন, গাঙুড়ের জলে ঘটিবাটি ছেঁড়া কাঁথা, হরিণীর পোড়া তৃষ্ণা, ধড়” ইত্যাদি-ইত্যাদি খণ্ড খণ্ড ছবি হয়ে ওঠে বিরূপ বাস্তবের উপমান হয়ে। তেমনি ইঁদুরের প্রতীকতায় মোট নয়টি কবিতায় আন্তর্জাতিক বাজারি সভ্যতার বিশ্বব্যাপী চরাচর এদেশকেও গ্রাস করতে থাকে। ইঁদুরকে কৃষিফসল আর সংস্কৃতির বৈনাশক রূপে দেখছেন- কখনও তার ক্ষুদ্রতা সত্ত্বেও ক্ষতিকর গোপন কাজকর্মের জন্যে, কখনও বা শকুনের সঙ্গে তাকে এক করে দেখান যে শকুনের মৃত্যু হলেও অজস্র ইঁদুরের বিনাশ নেই। রাস্তাঘাটে শুধু মানুষের লাশ পড়ে আছে যারা একসময় পুনর্জন্ম পাবে। পাবে কি?

পদ্মানদীর মাঝির কপিলা নামায়নে ১৯৮৩ তেই প্রকাশিত হয় কপিলা কাব্যটি, লক্ষ করা যাচ্ছে মোহাম্মদ রফিক এই দশকে বহুপ্রজ, কবিতা অনেক লিখছেন আর তা লিখছেন জীবনের চাপে। একেবারে লোকায়ত জীবনছন্দ আর লোকমানসের সংস্কৃতিধন্য কিংবদন্তি- রূপকথায় বিমণ্ডিত করে দিচ্ছেন কবিতার শরীরকে। কবিতার আকৃতিই শুধু বেড়ে যায়নি, স্তবক বিন্যাসে রয়েছে বিচিত্রতা অর্থাৎ রফিক তার বলবার কথা, আর অভিজ্ঞতাকে-মননকে প্রগাঢ় করে তোলেন নান্দনিক কুশলতায়ও, তাই কবিতাগুলো পাঠককে আলোড়িত ও মনোযোগী করে রাখে সর্বক্ষণ, ধাপে ধাপে বিন্যাস করে যান শব্দ ব্যবহারের উন্মুক্ত প্রয়োগ ঘটিয়ে- কথ্যচালও, আঞ্চলিক শব্দও আসে ভাষায়, যে স্বাদেশিকতা তাকে গভীরভাবে আবিষ্ট করে রাখে তা হয়ে ওঠে তার নিশ্বাস-প্রশ্বাস, তা হয়ে ওঠে ডিকশনের রূপান্তরশীল বয়নকলা, মুহুর্মুহু পাল্টাতে থাকে কবিতার অন্তঃশরীর, শব্দ ও ছন্দ। জনপদের সোঁদা গন্ধ, মাটির ঘ্রাণ আর মানবের সংসারযাত্রার প্রত্যহে বুনে-বুনে দেয় তাদের আশা-আকাক্সক্ষা -বাসনা-দুঃখদারিদ্র্য আবার লড়াকু উত্তেজনাকে। এই প্রয়াস আরও নিবিড়তর হয় স্বদেশী নিঃশ্বাস তুমিময় কাব্যে (১৯৮৮)।

এই তুমি আর কেউ নয়- স্বদেশভূমি, কিন্তু কবির প্রেমময়ীর অনুষঙ্গ তাতে যুক্ত যা আগে লক্ষ করা যায়নি। তবে খুব বেশিভাবে নয়, আলতোভাবে ছুঁয়ে থাকে মাত্র যেমন ‘লাইলী তোমার এসেছে ফিরিয়া’ কবিতাটি। আর সে অনুষঙ্গ একালের গ্রামীণ প্রেমিক-প্রেমিকার বাসনা-স্পন্দিত- ‘মরুময় নীল ঝরে চারাপোড়া ছাই,/মৃত জটায়ুর পাখা/ সাবধানে থেকো; আজ মজনার আসার কিন্তু কথা আছে। মাঝরাতে।’ জটায়ুর পাখা- এই প্রথম মিথের প্রতিমা ব্যবহৃত হলো সীতাহরণের কথার ইশারায়। প্রতি কবিই তো আত্মজৈবনিক হয়ে ওঠেন তাঁর রচনায়!, তিনি যেহেতু কবি তাঁরও একটি সত্তা-পরিচিতি ও চরিত্রবল আছে, বলেন, ‘এক থেকে একাকিত্ব,/ একাকিত্ব অর্থ তাই সমস্ত মানুষ/ সমস্ত মানুষ নিয়ে কবির একাকী’, এই বয়নে পাই এলিট কবির বহু মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার ইতিকথা যা তাঁর কথা থেকে কাব্যে আস্তে আস্তে বিনির্মিত হয়েছে। রফিকের স্বদেশ পৃথিবী ছাড়া নয় আবার একাকী আত্মময়ও নয়। এখানে কল্পস্বর্গ থেকে কবির মাটির পৃথিবীতে অবতরণ, আর মাকর্সিয় ব্যষ্টি সমষ্টির তাত্ত্বিকতার কাব্যায়ন; ‘কলকণ্ঠ সহস্র ব্যষ্টি, সেই মানবিকী/ ছুঁয়ে যায় জ্যোতির আকাশ;/যেহেতু সে ধুলো মাখে ধুলোর চেয়েও অগণন।’ ধুলা শুধু ধ্বংস বা তুচ্ছতার প্রতীক নয়, তা নবপ্রাণ সৃষ্টিরও উৎস ধুলা জমে জমেই গড়ে ওঠে দ্বীপ- মানবদ্বীপমালা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares