সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

প্রচ্ছদ রচনা

October 11th, 2016 6:23 pm
প্রচ্ছদ রচনা

mohibul-aziz-1

প্রচ্ছদ রচনা

একটি অনন্য গ্রন্থ

মহীবুল আজিজ

পাঠে আমার কার্পণ্য আছে। দ্রুত ধাবমান সময়ের ছায়ায় নিরর্থক শব্দসম্ভারের সঙ্গে কালাতিপাতের কোনো মানে নেই। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত (অগ্রন্থিত আবদুল মান্নান সৈয়দ) একটি গ্রন্থ পাঠ করে মনে হলো বিস্ময়ের পাশ ঘেঁষে হেঁটে আসা গেল। পিয়াস মজিদের সম্পাদনায় আমাদের এক মহান সব্যসাচী রচয়িতার এতকাল অগ্রন্থিত রচনার সামনে বসে মনে-মনে ভাবছি, সত্যের মতো বদমাশ, জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ, মাছ সিরিজ, শুদ্ধতম কবি, দশ দিগন্তের দ্রষ্টা এরকম কত-কত গ্রন্থ একদা তিনিই রচনা করেছিলেন। তাঁর শক্তি তাঁর জীবদ্দশায় অনুভব করা গেছে। এখন তাঁর প্রয়াণের পরে সেই শক্তি আরও গুণিতক হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। আবদুল মান্নান সৈয়দ বাংলাদেশের সাহিত্যের একজন অনিবার্য লেখক। শুধু তাই নয় ধ্রুপদী বাংলা সাহিত্যের পরিবৃত্তও তাঁকে ছাড়া ঊনতাক্রান্ত থেকে যাবে।

প্রয়াত লেখকদের অগ্রন্থিত-অপ্রকাশিত রচনার প্রকাশায়োজন প্রত্যাশিত। কিন্তু বর্তমান গ্রন্থে আবদুল মান্নান সৈয়দের অগ্রন্থিত রচনার পরিমাণ অনেক লেখকের সম্পূর্ণ জীবদ্দশার অবদানের চাইতেও অধিক। আর এসব লেখা দায়সারাগোছের নয়, রীতিমতো গভীরতাশ্রয়ী ও গুরুত্ববহ। বোঝাই যায় লেখালেখির জন্যে তিনি ছিলেন আশিখরনখ নিবেদিত। এসব রচনায় এমন একজন রচয়িতাকে আমরা পাই যিনি আমাদের নাড়া দেন, ভাবিয়ে তোলেন, তাঁর নিজের ও অন্যদের সম্পর্কে দেন অনেক চমকপ্রদ তথ্য এবং জ্ঞান যা হয়ত এতকাল আমাদের সেভাবে জানা ছিল না। তাঁর শৈশব থেকে শুরু করে লেখালেখির সূচনা, তাঁর সমকাল, সমকালীন লেখকগণ, বইপত্র, দেশীয়-বিদেশী সাহিত্য, ধ্রুপদী বাংলা সাহিত্য ইত্যাকার বিচিত্র বিষয়ে ঋদ্ধ-সম্প্রসারিত তাঁর দুনিয়া। আমাদের দেশে নিজের সমকালীন-সহজীবী লেখকদের নিয়ে লেখার চর্চা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কিন্তু এক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব আবদুল মান্নান সৈয়দ। তাঁর মূল্যায়ন দায়িত্বধর্মী। কোনোরূপ অসূয়া-আবিলতা ছাড়া সাহিত্যকে কেবল এর অন্তর্নিহিত মূল্যানুযায়ী বিচার-বিশে¬ষণের রীতি তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিবেচনার যোগ্য অতি ক্ষুদ্র বিষয়টিও তাঁর মনোযোগ এড়ায় না এবং অবিবেচনার যোগ্য বিষয়টি আপাত বৃহৎ বলে প্রতিভাত হলেও তার সঠিক মূল্যায়নে তিনি নির্ভীক-যুক্তিশীল। সাহিত্য-সমালোচনার নিষ্ঠতা তাঁর কাছে আমরা শিখেছি, এখন তাঁর অগ্রন্থিত রচনা থেকেও আমাদের শেখার রয়েছে।

সাহিত্য-সমালোচনা কথাটাতেই খানিকটা জোর দেওয়া গেল। তা এজন্যে, বর্তমান গ্রন্থে আবদুল মান্নান সৈয়দের সৃজনশীল রচনার তুলনায় মননধর্মী রচনার পরিমাণই অধিক। গ্রন্থের সংকলক-সম্পাদক পিয়াস মজিদ পরবর্তী/দ্বিতীয় যে-খণ্ডের প্রতিশ্রুতি দেন, হয়ত তা হবে ভিন্ন দিকনির্দেশক। বর্তমান গ্রন্থ দশটি শ্রেণিতে বিন্যস্ত। বলাবাহুল্য, শ্রেণিবিন্যাসটি সুচিন্তিত এবং তা রচয়িতার রচনার উদ্দেশ্য ও গভীরতাকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করে। শ্রেণিবিন্যাসটিতে দৃষ্টি দিলে আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখালেখির বহুমাত্রিকতা সম্পর্কে খানিকটা পূর্বধারণা মেলে। যেমন : স্মৃতি-ধৃতি, সংশ্লেষণ-বিশ্লেষণ, রবীন্দ্র- নজরুল, পত্রপ্রবন্ধ, বিশ্বসাহিত্য, বইপত্র, শ্রুতিনাট্য, গল্প, কৈশোরক এবং সাক্ষাৎকারগুচ্ছ। স্মৃতি-ধৃতি পর্যায়ের রচনাসংখ্যা বাইশ। ছোট্ট কিন্তু ঝকঝকে স্মৃতিচারণা। বিখ্যাত প্রিয়নাথ স্কুলের কথকতা, প্রিয়নাথ স্কুলের নবাবপুর স্কুলে পরিণত হওয়া, বাড়িতে ভাইয়েরা সবাই মিলে হাতে লেখা পত্রিকা বের করা কি মুনীর অপটিমায় টাইপ-করা পত্রিকা- প্রকাশ এসব মুগ্ধকর এক কথার স্রোতস্বিনী হয়ে বয়ে যেতে থাকে। আর যত মানুষ ঘটনা ইতিহাস কোনোটাই বাদ যায় না। স্কুল থেকে পকেটে রঙিন পাথর ভরে বাড়ি ফেরার গল্পটাও বর্ণিত হয় ছোটগল্পের ঝলকানির মতো।

আবদুল মান্নান সৈয়দের এইসব রচনায় তাঁর সেই চিরাচরিত বস্তুনিষ্ঠতা লক্ষণীয়। প্রশংসার যোগ্য হলে অকুণ্ঠ এবং অযোগ্য হলে অনুচ্চ-স্বর মূল্যায়ন তাঁর মিতকথন নয় শুধু, চারিত্রিক পরিমিতিরও প্রমাণ। যে-বিষয়ের সমালোচনাই তিনি করেন সে-বিষয়ে নিজেকে সর্বাপেক্ষা যোগ্য বলে প্রমাণ রাখেন। এমন যোগ্যতাধারী লোক সবসময়ই থাকে অঙুলিমেয়। ধরা যাক তাঁর ছয় পৃষ্ঠার একটি রচনার কথা- জীবনী গ্রন্থমালা সূত্রে। আমরা সকলেই জানি বাংলা একাডেমি প্রথমবারের মতন ১৯৮৭ সাল থেকে এটি প্রকাশ করতে শুরু করে এবং এটি যে বাংলা একাডেমির একটি অসাধারণ কর্ম সেটাও আজ প্রমাণিত। কিন্তু এর পেছনের কারিগর বা বিশাল কর্মযজ্ঞের খবর অনেকেরই অজানা। আবদুল মান্নান সৈয়দ এর মূল কারিগর আবু হেনা মোস্তফা কামালের অবদান নিয়ে রচনা করেন এ-প্রবন্ধ। এ-প্রবন্ধটাই হয়ে উঠেছে আবু হেনা মোস্তফা কামালের মানস-অবলোকনের একটি কম্পাস। কবি-সমালোচক- অধ্যাপক আবু হেনা’র মূল্যায়ন এবং সেই সূত্রে বাংলা একাডেমির সমকালীন ঘটনাবলী আর তারও সূত্রে রাজধানি ঢাকার বিস্তর সাহিত্য-সংবাদ সব একসঙ্গে গ্রথিত হয়ে সাধারণ রূপান্তরিত হয় অনন্যসাধারণে। তাঁর শিক্ষক আবু হেনা মোস্তফা কামাল মাত্র চারটি লাইনে কেমন জীবন্ত হয়ে উঠছে, দেখা যাক-

‘ঐ একটি ক্লাসেই সুবেশ তীক্ষ্ণবাক আবু হেনা মোস্তফা কামাল আমাদের সমস্ত ক্লাসকে জয় করে নিলেন। একটানা বলে গেলেন স্যার, ঘণ্টা পড়ার আগে পর্যন্ত থামলেন না, ঘণ্টা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন। আর রুদ্ধশ্বাস সমস্ত ক্লাসে স্যারের প্রশংসাধ্বনি গুঞ্জিত- উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল দু-তিন’শ ছাত্রের কণ্ঠে। সেটা ছিল ১৯৬৪ সাল।’

‘আড্ডা’ চার পৃষ্ঠার একটি লেখা। এই চারটে পৃষ্ঠাই ঘটনা, ব্যক্তি, ইতিহাস আর স্মৃতিতে ভরপুর। অকৃপণ সৈয়দ নাম ধরে-ধরে পথ কেটে যান, বিপুলায়ত তাঁর ঔদার্যক্ষেত্র, সম্পূর্ণরূপে হীনম্মন্যমুক্ত- ‘আহমেদ মুজিব, রিফাত চৌধুরী, কাজল শাহনেওয়াজ, শশী হক, অমিতাভ পাল, আকরাম খান- আশির ও নব্বই-এর দশকে কবিতার একটা আলাদা ঘরানা তৈরি করে চলেছে।’ এরকম একটি বাক্যবন্ধেও তাই ইশারা ভাসে অনুপ্রেরণার।

বাংলাদেশের সাহিত্যে ষাটের দশক সর্বার্থে এক সতেজ-সাড়াজাগানো দশক। রাজনৈতিক-সামাজিক এবং নয়া ঔপনিবেশিক কারণে এর একটা আলাদা মূল্যায়ন চলে কিন্তু এই পুরো দশকের তারুণ্য-সৃজনশীলতা-প্রকাশনা সবই এই দশকের আগেকার এবং পরেকার ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এই দশকে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক শাসন-শোষণ হয়েছে তীব্রতম আর সমান্তরালে সাহিত্যের জোয়ার হয়েছে কূলপ্লাবী। এর সমাজতাত্ত্বিক হেতু সমাজবিজ্ঞানীর পক্ষে নির্ণয় করা সম্ভব। আবদুল মান্নান সৈয়দের রচনায় ষাটের দশকের বাস্তবতা সৃজনশীলতার আয়নায় একেবারে স্পষ্টরূপে দেখা দিচ্ছে। ষাটের তারুণ্য, তার গর্জন, সাহিত্যান্দোলনের সৃজনমুখরতায় সেই তারুণ্যের দর্পিত প্রকাশ এসব তাঁর লেখায় (‘পাঁচটি তলোয়ার হৃদয় খান্খান্’) কেবল তাঁর নিজের অবস্থান নিয়ে নয়, হাজির হয় একটি সর্বসামগ্রিক অবয়বে। এটি অনেকটাই আত্মজৈবনিক-মননধর্মী রচনা কিন্তু এতে সকলের অবদানের পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন ধরা থাকে। এমনকি আমরা যেটা তাঁরই অবদান বলে জানি সেটাকেও তিনি তাঁর একার অবদান না বলে সম্মিলিত অবদান ভাবেন। ষাটের দশকে বিভিন্ন লেখকের মধ্যে ভাবগত কিংবা মতাদর্শগত বা প্রকাশভঙ্গিগত ভিন্নতা ছিল। সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতা বিষয়ে ছিল একই সমকালে ভিন্ন-ভিন্ন দৃষ্টি। ডেকামেরন থেকে শুরু করে মেঘদূতম, ই্উলিসিস, লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার, জোলা’র জার্মিনাল, বালজাকের  ড্রেলি স্টোরিজ, সমরেশ বসুর বিবর, প্রজাপতি এইসব উপন্যাসের শ্লীলতা-অশ্লীলতা নিয়ে তুমুল তর্ক হতো তখনকার তরুণ সাহিত্যিকমহলে। মান্নান সৈয়দ স্বয়ং ছিলেন ফরাসি লেখক মার্কুইস দ্য সাদ-এর অনুরাগী। দারুণ সুন্দর তাঁর মূল্যায়ন- আমাদের মন ও হৃদয়েরই জাতক ও স্পর্শক।

আবদুল মান্নান সৈয়দ জানাচ্ছেন, যেসব লেখক সাহিত্যে বিশুদ্ধ পর্নোগ্রাফিকে যিনি বিশুদ্ধ দর্শনে উন্নীত করতে পারেন, দু’শ বছরের ওপার থেকে তাঁর প্রতিভার প্রতি প্রাণিত না হয়ে উপায় আছে আমাদের? শ্লীলতা-অশ্লীলতার মধ্যবর্তী দেয়াল তিনি ভেঙে ফেলেছিলেন। তাঁর জন্য লাগে একটি নতুন নির্ণায়ক। প্রথায় তাকে আটকানো যায় না। আর সব কিছুর মতো শিল্প-সাহিত্যেরও যৌনতা ব্যবহারের কোনো বাঁধা পথ নেই, শিল্পী নিজেই সেটা নির্ধারণ করে নেন। যদি তা শিল্পোত্তীর্ণ বা সাহিত্যপদবাচ্য হয়, তবে তাকে অশ্লীল বলে খারিজ করা অসম্ভব হবে। তবে প্রকৃত শিল্প কখনওই শরীরসর্বস্ব হতে পরে না, তা সবসময় শরীরোত্তর,শারীরবৃত্তকে অতিক্রম করে তা প্রয়োজনীয় নগ্নতারও বিরুদ্ধে তখনকার সেসব লেখককে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস মজা করে বলতেন ‘পবিত্র লেখক গোষ্ঠী’। মজার কথা, ঠিক একই কথা আমি স্বয়ং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মুখে শুনেছি- আড্ডায়, তাঁর টিকাটুলির বাসায়। তিনি বলেছিলেন, মান্নান সৈয়দ ঐ লেখকদের বলতো ‘পবিত্র লেখক গোষ্ঠী’। দেখা যাচ্ছে না ইলিয়াস না মান্নান সৈয়দ কেউই নিজেকে গৌরবের দাবিদার ভাবছেন না, অন্যের জন্যে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছেন। অগ্রন্থিত রচনায় ষাটের যে-চিত্র আমরা পাই তাতে আবদুল মান্নান সৈয়দ আবশ্যিকভাবে অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র কিন্তু নিজেকে তিনি জোর করেও কেন্দ্রে রাখবার কালোয়াতি প্রদর্শন করেন না। এই মান্নান সৈয়দকেই বিখ্যাত ‘জোড়’ আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং আনিসুজ্জামান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতায় যোগ  দেবার জন্যে যথেষ্ট অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু তিনি তাঁর ডেরা ঢাকা ছেড়ে যেতে আগ্রহী ছিলেন না।

কিছু-কিছু রচনা এমন অনিবার্যভাবে আত্মজৈবনিক যে এগুলোর জন্যে এমনটাই যেন প্রাসঙ্গিক এবং এসব ইতিহাস পাঠ করে আমরা একই সঙ্গে গবেষণা-অন্বেষা-সমকালীন সাহিত্যরুচি প্রভৃতি বিষয়ে লাভ করি আয়ত দৃষ্টি। যেভাবে লেখা হলো শুদ্ধতম কবি, ঋণ শোধের জন্য নয়, ঋণ স্বীকারের জন্য, শামসুর রাহমান : স্মৃতির শহরে, কিছুক্ষণ, আজকালে, তোমার জন্য চেয়ার রাখা আছে, স্মৃতি : আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, বন্ধৃস্মৃতি : সিকদার আমিনুল হক এসব রচনা সেই ধরনের। কিংবা আবিদ আজাদ, আহমদ ছফা, ত্রিদিব দস্তিদার, কাজী রব এঁদের নিয়ে লেখা রচনাগুলোর কথাও বলা যায়। স্মৃতি-সাহিত্যবিশ্লেষণ-সমকাল সব জড়িয়ে-মিশিয়ে একটি অন্যটির সঙ্গে এমন পারস্পরিকতার সূত্রে আবদ্ধ হয়ে ওঠে যে, এই স্বতঃস্ফূর্ততা পরিণত হয় ‘মান্নান সৈয়দীয় ঘরানা’য়। তখন বাংলা সাহিত্য সমালোচনার জগতের অন্যতম ধ্রুপদী গ্রন্থ জীবনানন্দ বিষয়ক ‘যেভাবে লেখা হলো শুদ্ধতম কবি’ লেখাটাকেও মনে হয় তাঁর রচিত গ্রন্থেরই প্রোলোগ বা এপিলোগ। ১৯৫৪-য় ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থীর জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে যে-গল্পের শুরু তারই সফল পরিণতি ১৯৭২-এ। পরবর্তী পর্যায়ে বেরিয়েছে বইটির একাধিক সংস্করণ-মুদ্রণ। এ-গ্রন্থে আবদুল মান্নান সৈয়দের জীবনানন্দ- সমালোচনার ভাষা নিয়েও নানা মত দেখা গেছে। কিন্তু গ্রন্থটির অনন্যতা ও মননঋদ্ধিকে কোনোভাবেই পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভবপর নয়। গ্রন্থটি তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের সারস্বত সমাজেও এনে দেয় প্রতিষ্ঠা- সেসব কথকতার সবিনয় বিন্যাস প্রবন্ধটিকে প্রামাণ্য করে তোলে। আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পর্কে আজকের ও আগামীর পাঠক যথেষ্ট আলোকপ্রাপ্ত হবেন প্রবন্ধটির সূত্রে। বাংলাদেশের সাহিত্যে এবং পত্র-পত্রিকার ইতিহাসে সমকাল-পত্রিকা এবং এর সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর প্রবাদে পরিণত হয়েছেন এরিমধ্যে। আমাদের অনেক বিখ্যাত লেখকের কথা বলা যাবে যাঁদের অনেকের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় সমকালেই। সম্পাদক হিসেবে তিনি রেখে যান ঐতিহ্য ও মানদ-ের এক অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত। পরবর্তীকালে কণ্ঠস্বর, বিপ্রতীপ, পূর্বমেঘ, পরিক্রম, স্বাক্ষর, গণসাহিত্য, ছোটগল্প ইত্যাদি যত পত্রিকাই বেরুক না কেন সকলকেই শিরোধার্য করতে হয় ‘সমকাল’-চিন্তাকে। সত্যিকার অর্থে সমকাল এবং সিকান্দার আবু জাফর সম্পর্কে হাসান আজিজুল হক ছাড়া আর কারও রচনা তেমন চোখে পড়ে না। সেদিক থেকে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রবন্ধ ঋণ শোধের জন্য নয়, ঋণ স্বীকারের জন্য। একজন কবি এবং মেধাবী সাহিত্য-সম্পাদক তাঁর প্রয়াণের বহুকাল পরেও মূর্ত হয়ে দেখা দেন প্রবন্ধটির ভাষা-বিন্যাস আর তথ্যের অনবদ্য কারুকাজের ভেতর দিয়ে। এমনকি তথ্যময়-স্মৃতিময় রচনাও ছুঁয়ে যেতে পারে ছোটগল্পের প্রান্ত :

‘আশ্চর্য জাফর ভাইয়ের মতো লোকও প্রায়ই বলতেন, ‘আমি যখন থাকব না, তখন মনে করো’। প্রায়ই অতীত স্মৃতিচারণ করতেন : তাঁর কলকাতা জীবনের, সমকালের প্রাক্তন সময়ের। কলকতায় থাকতে ‘শনিবারের চিঠি’র দলের সঙ্গে জাফর ভাই যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। কী এক সূত্রে যেন (আমি ভুলে গেছি : যদ্দুর মনে পড়ে বিষয়টি অসাহিত্যিক) সজনীকান্ত দাসের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। জাফর ভাই বলতেন ‘সজনী দা’। সজনীকান্ত দাস, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহাস্থবির  প্রেমাংকুর আতর্থী)- এঁদের কথা জাফর ভাইয়ের মুখে শুনেছি। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তখন সাহিত্যসাধক চরিতমালার কাজ করতেন, তথ্য সংগ্রহের কাজে তরুণ জাফর ভাইকে দু’এক জায়গায় পাঠিয়েছিলেন, সাহিত্যসাধক চরিতমালার দু’একটি খণ্ডে কিছু কাজ জাফর ভাই করে দিয়েছিলেন- জাফর ভাইয়ের ধাতে ওসব পোষায়নি বলে তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন বটে কিন্তু ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মকুশলতার কথা জাফর ভাইয়ের মুখে অনেকবার শুনেছি।’

একইভাবে শামসুর রাহমানের স্মৃতিচারণা হয়ে ওঠে ১৯৬৫ থেকে শুরু করে পরবর্তী চার দশকের রাজধানী ঢাকা’র সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডের নির্যাস। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, হাসান হাফিজুর রহমান, রাজিয়া খান, আবদুল গণি হাজারী, আবুল হাসান, দাউদ হায়দার, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, খান সারওয়ার মুরশিদ- সবাই আসতে থাকেন এক-একে যাঁর-যাঁর জায়গামতো। তখনকার সাহিত্যানুষ্ঠান, সুস্থ সাহিত্যিক তর্ক, সাহিত্য-সম্পাদনা প্রায় সবকিছুরই চুম্বক-উপস্থাপনা তাঁর লেখায় হাজির। বাংলাদেশের সাহিত্যের যে-কোনো ধরনের ইতিহাস লিখতে হলে মান্নান সৈয়দের এসব রচনার কাছে ফিরে যেতে হবে বারবার।

স্মৃতি-ধৃতি পর্যায়ের রচনাগুলো মূলত স্মৃতিচারণা হলেও মূল্যায়ন-বিশে¬ষণও সেসবের আকর্ষণ। শামসুর রাহমান, সৈয়দ আলী আহসান, আহমদ ছফা, ত্রিদিব দস্তিদার, আবিদ আজাদ এঁদের সকলের স্মৃতি তাঁদেরই সমান্তরাল সাহিত্য-বিচারে ভিন্নস্বাদ এনে দেয়। এতে রচয়িতা হিসেবে আবদুল মান্নান সৈয়দের পাঠকসত্তা এবং তাঁর সমালোচনার অঙ্গীকার দু’টোরই উচ্চাঙ্গ অবস্থান চিহ্নিত হয়। ‘সংশ্লেষণ-বিশ্লেষণ’ পর্যায়ে সমালোচক-প্রবন্ধকার আবদুল মান্নান সৈয়দ আরও সংবেদী, আরও গভীরতাশ্রয়ী। তাঁর পঠনপাঠনের বিস্তৃতি ও মননের ব্যাপ্তি প্রবন্ধগুলোয় স্বতঃপ্রকাশিত। কি রেনেসাঁ-শিল্পী পেত্রার্কের সনেটের আলোচনায়, কি মুনীর চৌধুরীর প্রবন্ধ-বিশ্লেষণে- কি মাইকেলের অনন্যতার উদ্ভাবনে, কি অমিয়ভূষণের স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিকরণে সর্বত্রই তিনি আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রাতিস্বিক ও স্বনির্ভর। এই পর্যায়ের একুশটি রচনা যথার্থই সম্পদময়। বিষয় প্রাচীন কিংবা আধুনিক সেটা মুখ্য নয়, তাঁর মনস্বিতায় সবই আলোকোদ্ভাসিত। এভাবেই বাংলাদেশের সাহিত্যে সমালোচনার একটি মানদ- স্থাপনের কৃতিত্ব তিনি অর্জন করেন। বহু পুরনো প্রায় অবহেলার শিকার বিষয়বস্তুর ওপরেও সম্পূর্ণ নতুন আলোক প্রক্ষেপণে সফল তিনি। ধরা যাক, এ-পর্বের ‘সাহিত্য- বিবেচনা : ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’ নামক প্রবন্ধটির কথা। বহুভাষাবিদ- অনুবাদক- প্রাবন্ধিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র বহুমুখী প্রতিভার সংবাদ প্রকৃত সমালোচনার অনুপস্থিতির কারণে অনেকের কাছেই অজানা। অথচ ১৯০৯ সালে ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ (মদনভস্ম) পাঠ করে পত্রিকা-সম্পাদক কুসুমকুমারী দেবী বলেছিলেন, ‘মুসলমান’ হয়েও ড. শহীদুল্লাহ্ সংস্কৃত সাহিত্যের অন্তরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর রচিত দু’টি সনেটের (রমযানের চাঁদ, ১৯১১ এবং সত্যেন্দ্র স্মরণে, ১৯২২) আলোচনা প্রসঙ্গে আবদুল মান্নান সৈয়দের মূল্যায়ন পাঠ করে আমাদের নড়েচড়ে বসতে হয়। তিনি জানান, বাংলা ভাষায় ফরাসি রীতির যে-সনেট প্রমথ চৌধুরীর প্রবর্তনা তারই পরবর্তী অনুসৃতি ড. শহীদুল্লাহ্। তাঁর অনুবাদ, মৌলিক গল্প, প্রবন্ধ সর্বত্রই পৃথক-পৃথক শহীদুল্লাহ্’কে পাওয়া যায়। তাঁর দু’টি প্রবন্ধে যে-দৃষ্টি উন্মোচনকারী শিল্পীসত্তার অধিষ্ঠান সেটিকে নতুন বিশ্লেষণে নবপ্রজন্মের পাঠকের সামনে হাজির করেন মান্নান সৈয়দ- ‘আমাদের সাহিত্যিক দরিদ্রতা’ (১৯১৬) এবং ‘সাম্যবাদী বঙ্কিমচন্দ্র’ প্রবন্ধদু’টি বলিষ্ঠ-মৌলিক বক্তব্য এবং আয়তদৃষ্টির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ১৯৬৮ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সম্পর্কে আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, “তিনি একজন সংস্কার-পূত চিত্তের মানুষ, এবং এইরূপ মানুষ-ই Full Man- ‘পূর্ণ মানব’ অথবা ‘ইন্সান্-অল্-কামিল্-পদবীতে পহুঁছিবার পথে জয়-যাত্রা করিবার যোগ্য।”

abdul-mannan-picএস. ওয়াজেদ আলি, হবীবুল্লাহ বাহার, মুনীর চৌধুরী এঁদের সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা আজও কতটা প্রয়োজনীয় তা আমরা অনুধাবন করতে পারি আবদুল মান্নান সৈয়দের বিশ্লেষণ থেকে। জাতীয় মনন সম্পদ এবং ঐতিহ্যের মূল্যায়ন আসলে বর্তমানের অবস্থানকেই যে মজবুত করে সেটা এইসব প্রখর প্রবন্ধই বলে দেয় আমাদের। সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্’র কবিতায় বাংলাদেশের এক যুগের ‘অন্তঃমানচিত্র’, কিংবা আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্’র কবিতায় ‘ঐতিহাসিক শিকড় সন্ধান’ অথবা ঔপন্যাসিক অমিয়ভূষণ মজুমদারের উপন্যাসে ‘দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবোধের’ উৎসার প্রভৃতি বিষয় এইসব সৃজনশিল্পীর নিজস্ব ভূখণ্ডে প্রবেশে পালন করে সূত্রধরের ভূমিকা। আবদুল মান্নান সৈয়দ এমন সূত্রধরের ভূমিকায় নেমেছেন অসংখ্যবার। বলতে দ্বিধা নেই আমাদের সাহিত্য-ঐতিহ্যের অনেক বিষয় এবং অনেক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে প্রথম সার্থক প্রবন্ধরচয়িতা আবদুল মান্নান সৈয়দ-ই। তাছাড়া বর্তমানের কলস্বনের নিচে চাপা পড়ার উপক্রম হওয়া মূল্যবান লেখালেখিকে পুনরালোকে উদ্ভাসিত করার কৃতিত্বও তাঁকেই দিতে হয়। বিখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী নওয়াজেশ আহমদ-এর অবস্থান আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার বৃত্তেই। জীবনানন্দের কবিতার আলোকচিত্র-সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে তিনিই কবিতাস্পৃষ্ট অপিচ এক কবিতাতিরেক মাত্রার আবিষ্কার করেন যা অভিনব। শুধু জীবনানন্দ নয়, পাশ্চাত্যের বহু কবির কবিতা-থিমের আলোকচিত্রায়ন তাঁকে দেশে-বিদেশে খ্যাতিমান করেছে। সমালোচক মান্নান সৈয়দ তাঁর নিজের জীবনানন্দ-প্রেমের সমান্তরালে নওয়াজেশের জীবনানন্দ- প্রেমকে বিচার করে প্রকারান্তরে জীবনানন্দের কবিতার আবেদন-বৈচিত্র্যকে নতুন উপলব্ধির বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছেন। ‘আামদের ছেঁড়াখোঁড়া সময়ে’ নওয়াজেশ আহমদ তাঁর মাস্তুলকে যেভাবে প্রতিকূল হাওয়াতেও অনাহত রাখেন তা কেবল আলোকচিত্রের জগতের জন্যে নয়, সাহিত্য-সংস্কৃতির সমান্তরাল এক অনুভূতির পরিমণ্ডলেও স্বাগত হওয়ার যোগ্য।

আবদুল মান্নান সৈয়দের নিজস্ব পছন্দের কিছু অভিমুখ আমাদের জানা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ- এসব ব্যক্তিত্বের সাহিত্যকর্ম বিশ্লেষিত হয়েছে তাঁর বহু প্রবন্ধে-গ্রন্থে। একেকজনকে নিয়ে তিনি লিখেছেন একাধিক বা তারও অধিক রচনাকর্ম। একই লেখককে নিয়ে লেখা তাঁর সবক’টি প্রবন্ধ পারস্পরিক বিভিন্ন এবং কোনো না কোনো অন্বেষার ফল সেসবে প্রকাশিত। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে নিয়ে প্রচুর প্রবন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধগ্রন্থে। এখন দেখতে পাচ্ছি এঁদের দু’জনকে নিয়ে লেখা ন’টি প্রবন্ধ এতকাল ছিল অগ্রন্থিত। প্রবন্ধগুলো কম গুরুত্বপূর্ণও নয়। রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা কাব্যনাট্যের বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধে (বঁধূ কোন আলো লাগল চোখে) তিনি দেখান, মাইকেলের মতন, তাঁরই উত্তরসূরী হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রামায়ণ- মহাভারতের কাহিনিকে নতুন অর্থে তাৎপর্যচিহ্নিত করেছেন। শতাধিক বছর আগে রবীন্দ্রনাথ যে নারীকে তার পূর্ণমূল্যে অধিষ্ঠিত করেছেন চিত্রাঙ্গদা’র সূত্রে তা নারীবিষয়ক অযূত বক্তৃতা-বিবৃতির চেয়ে অনেক গুরুত্ববহ। আবদুল মান্নান সৈয়দের সঙ্গীত-সচেতনতার উৎকৃষ্ট প্রমাণ অগ্রন্থিত’তে গ্রন্থিত তাঁর রবীন্দ্র-সংগীত সম্পর্কিত প্রবন্ধগুলো। রবীন্দ্রনাথের একটি গান ‘কাঁদালে তুমি মোরে ভালবাসারই ঘায়ে’ প্রবন্ধেরও এইটিই শিরোনাম। গানটির বিশেষত্ব নির্ণয়ে তাঁর কৃতিত্ব লক্ষযোগ্য। প্রথমত তিনি জানান, গানটি ‘যুক্তবর্ণহীন শব্দের সারল্যে’ আশ্চর্য রকমের পেলবধর্মী। তাছাড়া কবিতার চাইতেও বেশি রবীন্দ্রনাথ সহজ চলতি মুখের ভাষা ব্যবহার করেন গানে। মান্নান সৈয়দের পর্যবেক্ষণ অসাধারণ মাত্রা পায় গানটি সম্পর্কে তাঁর অন্তিম মন্তব্যে- ‘ব্যক্তিজীবনের সুগভীর প্রেমের অভিজ্ঞতা ছাড়া এ রকম গান রচনা বা সম্ভোগ সম্ভব নয়। কে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের গানের এই প্রেমপাত্রীটি?’ এরকম আরেকটি প্রবন্ধ গানের শিরোনামে শিরোনামাঙ্কিত- ‘বন্ধু, রহো রহো সাথে’। শ্রাবণ মাসের ঘোর বর্ষণসিক্ত একটি ‘হৃদয়ছেঁড়া প্রার্থনা’ এই গান। নিঃসঙ্গতা, বেদনা, বেদনাজাত আনন্দ, নিসর্গের স্পর্শ আর উপস্থিতি-অনুপস্থিতি মিলেমিশে গানটিতে একাকার। শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতা বা গান যে আসলে বিরহের তা রবীন্দ্রনাথের এই গানটি শুনলে অনুভূত হয়। মান্নান সৈয়দের কবিত্ব যোগ দেয় সমালোচনায়- ‘গানটি শুনতে শুনতে বা পড়তে পড়তে একটি ঝরনার ধারাজলে আমার মাটির কলস ছাপিয়ে গেল।’

আবদুল মান্নান সৈয়দের সমালোচনার জগতের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে নজরুল-সাহিত্য। উভয় বাংলায় নজরুল-সাহিত্যেও  অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমালোচক তিনি। অগ্রন্থিত পাঁচটি প্রবন্ধ পাওয়া যাচ্ছে নজরুল এবং নজরুল- সাহিত্যসংক্রান্ত। ‘১৯৩১-এর একটি দিন’ সাড়ে তিন পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ কিন্তু বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। দিনটি আসলে ছিল কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর দিন কিন্তু তা হয়ে গেছে নজরুলেরও দিন। সেই দিনটিতে বাংলার সারস্বত সমাজের পক্ষ হতে ‘বাঁশবাগানের মাথার ওপর’ তথা ‘কাজলা দিদি’-খ্যাত কবির সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল ২৪ পরগনার বেলঘরিয়াতে। সংবর্ধনা উপলক্ষে উপাসনা পত্রিকার আশ্বিন ১৩৩৮ সংখ্যা ‘যতীন্দ্র-সংবর্ধনা/বিশেষ সংখ্যা’ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে রবীন্দ্রনাথ নজরুল থেকে শুরু করে প্রেমেন্দ্র মিত্র, জগদীশ গুপ্ত, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রমথ চৌধুরী, এরকম অনেকের লেখা মুদ্রিত হয়। অনুষ্ঠানটির আয়োজনের সূত্রে এর সঙ্গে নজরুলের সংযোগের নানাকথা মান্নান সৈয়দের আলোচনায় আমরা জানতে পারি। কিন্তু কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের সঙ্গে নজরুলের গভীর আন্তরিকতার সম্পর্কটি হয়ত অনেকেরই অজানা। আমাদের জানা হয়, নজরুল তাঁর বিখ্যাত গান ‘এত জল ও কাজল চোখে’ গানটি কবি উৎসর্গ করেছিলেন যতীন্দ্রনাথকে এবং গানটির ‘কাজল’ শব্দের সঙ্গে ‘কাজলা’র সন্নিহিতি কারুরই দৃষ্টি এড়ানো সম্ভব নয়। তিনিও নজরুলকে উৎসর্গ করে কবিতা রচনা করেছিলেন। ‘১৯৩১-এর একটি উত্তাল দিনের’ নজরুল-স্মৃতি উন্মোচিত হয় এর পৌনে এক শতাব্দীকাল পরে অন্য এক তাৎপর্যে, উত্তরকালের অনুসন্ধিৎসায়। নজরুল সম্পর্কিত আরও যেসব রচনা গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে সেগুলোও স্ব-স্ব মূল্যে মূল্যবান।

আবদুল মান্নান সৈয়দের সৃজনশীল সাহিত্যের একটা দিক উঠে আসে তাঁর শ্রুতিনাট্য, গল্প, কৈশোরক রচনা প্রভৃতির সূত্রে। আর গ্রন্থে মুদ্রিত তাঁর এগারোটি সাক্ষাৎকারকে বলা যায় সোনার খনি। কেননা, একটা জায়গায় ধরা না থাকলে বহুমাত্রিক এই শব্দশিল্পীর চেতনার অনেকটা আভাস হারিয়ে যাবে। লেখক তাঁর রচনার সূত্রেই বিচার্য সন্দেহ নেই কিন্তু একজন লেখকের হয়ে ওঠা থেকে শুরু করে তাঁর পরিপূর্ণ বিকাশও তো একটি সমান্তরাল ইতিহাসের গতিপথ এবং সেই পথের যাত্রীর নিজের অভিজ্ঞতার মূল্যও অনেকখানি। মান্নান সৈয়দের স্বাতন্ত্র্য ও চারিত্রকে আমরা আরও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পারি তাঁর এসব সাক্ষাৎকারের সূত্রে। একটা জায়গায় তিনি বলছেন, ‘আমার সমস্ত লেখালেখির কারণ হচ্ছে, আমার নির্জনতা।’ কিংবা আরেকটা জায়গায়- ‘অনেকে বিভিন্ন ইজম করেছেন, আমার একমাত্র মানদণ্ড শক্তিমান লেখক, না শক্তিহীন।’ একটা সাক্ষাৎকারে আমরা পেয়ে যাই আরেক অমর কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সম্পর্কে অনেক অজানা কথা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা- মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তিনি বলছেন, ‘আমরা যে ভূখণ্ড পেয়েছি এর যে মাহাত্ম্য সেটা আমরা কিন্তু বুঝতে পারছি না। যেহেতু এটা আমাদের সবচেয়ে সুসময়। অনেক সময় সুসময়ের মধ্যে থাকলে বোঝা যায় না। চলে গেলে বোঝা যায় আমি কী হারালাম।’ আসলে তাঁর সাক্ষাৎকারগুলো মূল্যের বিচারে অপরিমেয়। হয়ত সামনের দিনে আবদুল মান্নান সৈয়দের সাহিত্য ও চেতনালোকের পূর্ণমাত্রিক আবিষ্কারে এগুলো যোগাবে সার্থক সহযোগ।

সব মিলিয়ে এমন একটি গ্রন্থপাঠের অভিজ্ঞতা আরাধ্যের সান্নিধ্যে অধিবাসের সঙ্গে তুলনীয়।