প্রচ্ছদ রচনা

ahmad-majhar-1

প্রচ্ছদ রচনা

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ভালোবাসার সাম্পান :

অবক্ষয়ীদের হার্দ্য দলিল

আহমাদ মাযহার

 

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের লেখা ভালোবাসার সাম্পান এক সংরূপ স্মৃতিকথা। তিনি জীবনের একটি বিশেষ পর্বে গত শতাব্দীর ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে কণ্ঠস্বর নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করতেন। সেই কণ্ঠস্বর ছিল তাঁর সমকালীনদের সাহিত্য আন্দোলনের প্রতিভূ। সেই আন্দোলনমুখর দিনগুলোকে পেছন ফিরে দেখা এই বইয়ের উপজীব্য। কিন্তু এটি আবার পুরোনো কালের স্মৃতিকথাতেই বা বিশেষ ওই আঙ্গিকেই সীমায়িত থাকেনি। এর রয়েছে আরও কিছু গুণ। সে-সব কথা নিয়ে আলোচনার আগে ভালোবাসার সাম্পান বইয়ের সমধর্মী পূর্বসূরিদের কথা স্মরণ করে নেয়া যেতে পারে। এর পেছনের এই অনুভব ক্রিয়াশীল থেকেছে যে, বাংলা ভাষার সাহিত্য আধুনিক জীবনবোধকে ধারণ করে প্রবাহিত হয়ে একটা সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। এই সমৃদ্ধি ভবিষ্যতের নিশানা দেখায়! পেছনের যে পথ ধরে এই সমৃদ্ধির দিকে যাত্রা সে-পথের খোঁজও তো একটু নেয়া দরকার! অর্থাৎ খোঁজ করে দেখা দরকার সাহিত্যপত্রিকা-কেন্দ্রী পূর্বসূরি স্মৃতিকথাগুলোর ।

যে-অর্থে তারুণ্যের ও নবীনত্বের ঝাণ্ডবাহী লিটল-ম্যাগাজিন অভিধা কণ্ঠস্বর পত্রিকার প্রাপ্য সে অভিধা প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত সবুজপত্রেরও (১৯১৪) প্রাপ্য হয়েছিল। এই পত্রিকার মধ্য দিয়েই বাংলা গদ্যের কথ্যরূপানুসারী নতুন যুগের শুরু। গদ্যের কথ্যরূপের উপস্থাপনায় সূচিত হয়েছিল এর নবীনতা; তাছাড়া মননশীলতার বৈশিষ্ট্যে তা বাঙালি লেখককে নতুনভাবে তাকাতেও শিখিয়েছিল। যদিও প্রধানত রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরী ছিলেন এর লেখক কিন্তু তাঁরা ছাড়াও নানা বিষয়ে পারদর্শী ও খ্যাতিমান আরও কয়েকজন লেখক যুক্ত ছিলেন এর সঙ্গে। তাদের বলা হতো ‘সবুজপত্রী’ গোষ্ঠী। এই সবুজপত্র-কেন্দ্রী স্মৃতিকথা সবুজপাতার ডাক দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লিখেছিলেন (১৯৬০) পত্রিকাটির অন্যতম লেখক হারীতকৃষ্ণ দেব। এটি বইরূপ পায় অনেক পরে (১৯৮৩)।

কণ্ঠস্বর পত্রিকার জ্যেষ্ঠতর পূর্বসূরি দীনেশরঞ্জন দাস ও গোকুল নাগ সম্পাদিত কল্লোল (১৯২৩) পত্রিকা বেরিয়েছিল সবুজপত্রের একযুগ পরে। এর লাগালাগি বেরিয়েছিল কালি-কলম (১৯২৬) পত্রিকা। কল্লোলকালি-কলম আলাদা পত্রিকা হলেও এবং কল্লোল খ্যাততর হলেও চেতনার দিক থেকে ছিল একই। পত্রিকা দুটির লক্ষ্য ছিল সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের দর্শনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে আধুনিকতার চর্চা। কল্লোলকালি-কলম পত্রিকার অল্পকালের মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছিল আরেকটি পত্রিকা-বুদ্ধদেব বসু-অজিত দত্ত সম্পাদিত প্রগতি (১৯২৭)। আর এই তিনটি পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছিল প্রায় একই লেখক-গোষ্ঠী। বাংলাসাহিত্যে তাঁরা কল্লোলগোষ্ঠীর লেখক বলে পরিচিত। এঁদের প্রাণচাঞ্চল্যের ইতিবৃত্ত উঠে এসেছে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের কল্লোল যুগ (১৯৫০) বইয়ে।

ভালোবাসার সাম্পানকে যে-ধারার বই হিসেবে চিহ্নিত করা হলো সেই ধারার বই হিসেবে কল্লোলযুগই রচিত হয়েছিল সবার আগে। কল্লোল, কালি-কলম ও প্রগতির সামান্য পরে প্রকাশিত হয় সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত পরিচয় (১৯৩১) পত্রিকা। পরিচয় ছিল সাহিত্য, রাজনীতি ও দর্শন বিষয়ে পাণ্ডিত্যের পরিচায়ক সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মনস্বিতা চিহ্নিত একটি সাহিত্য-পত্রিকা।  এরও কিছুকাল পরে বের হয় বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতা ও কবিতাভাবনার পত্রিকা কবিতা (১৯৩৫)। এগুলোর মধ্যে একমাত্র সম্পাদক বুদ্ধদেব বসুই নিজের পত্রিকার আড্ডা ও কবিতা-কেন্দ্রিক লেখকদের সম্পর্কে লিখেছেন ‘আমাদের কবিতাভবন’ যা লেখকের জীবৎকালে গ্রন্থরূপ পায়নি। সেদিক থেকে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ভালোবাসার সাম্পান বুদ্ধদেব বসুর ‘আমাদের কবিতাভবনে’র সমগোত্রীয়। পরিসরের দিক থেকেও ‘আমাদের কবিতাভবন’ ক্ষীণকায়া। অন্য পত্রিকাগুলো সম্পর্কে লিখেছেন পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত লেখকদের কেউ। যেমন কল্লোল সম্পর্কে লিখেছেন পত্রিকাটির অন্যতম লেখক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, পরিচয় পত্রিকা নিয়ে পরিচয়ের কুড়ি বছর ও অন্যান্য স্মৃতিচিত্র (১৯৭৮) লিখেছেন পত্রিকাটির অন্যতম লেখক হিরণকুমার সান্যাল। এ ছাড়াও পরিচয়ের আড্ডায় নিয়মিত অংশগ্রহণকারী শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষ আড্ডার কথা লিখে রাখতেন নিজের দিনলিপিতে। তাঁর মৃত্যুর পরে সেই দিনলিপি প্রকাশিত হয় পরিচয়ের আড্ডা নামে (১৯৯০)। উপর্যুক্ত বইগুলো বাংলাসাহিত্যের পত্রিকাকেন্দ্রী নানা সময়ের সাহিত্যচাঞ্চল্য নিয়ে উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

বাংলাদেশের সাহিত্যে ষাটের দশকের গোড়ার দিকেই যে লিটল ম্যাগাজিন-কেন্দ্রী সাহিত্য আন্দোলন শুরু হয়েছিল কণ্ঠস্বর ছিল এর নেতৃস্থানীয়। এই পত্রিকা-কেন্দ্রী লেখক গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন এর সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। এই লেখক গোষ্ঠীর সাহিত্য-তৎপরতার ইতিবৃত্ত তুলে ধরা হয়েছে ভালোবাসার সাম্পান বইয়ে। সেই সূত্রে সাহিত্যপত্রিকা-কেন্দ্রী পূর্বোক্ত বইগুলোর সঙ্গে যুক্ত হলো আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ রচিত এই বইটি। বাংলাদেশের সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিত অনুধাবনে পূর্বসূরি বইগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভালোবাসার সাম্পান বইটিও বিশেষভাবে বিবেচিত হবে।

ভালোবাসার সাম্পান স্মৃতিমূলক রচনা। এখানে লেখকের স্বকালপটভূমিতে লেখক যে-মানুষদের স্মৃতিচারণা করেছেন তাঁদের একেকজনকে মনে হয়েছে উপন্যাসের চরিত্র। কয়েকটি চরিত্রকে আবার মনে হয়েছে বিশেষভাবে উজ্জ্বল। যেমন শহীদ কাদরী, রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আসাদ চৌধুরী, প্রশান্ত ঘোষাল, সিকদার আমিনুল হক, হুমায়ুন চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক, নির্মলেন্দু গুণ-এঁদের কথা প্রসঙ্গত অনেকবার এসেছে। ফলে ভালোবাসার সাম্পান এক অর্থে লেখকের কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ হয়ে থাকেনি। বরং হয়ে উঠেছে একজন বিশেষ ব্যক্তির দর্পণে একটা গোষ্ঠীর ক্রিয়াকলাপের প্রতিচ্ছবি। আবার ভালোবাসার সাম্পান বইটি একটি লিটল ম্যাগাজিনের ইতিবৃত্ত বলে লিটল ম্যাগাজিন কী তা নিয়ে মাঝে মাঝেই চকিত মন্তব্য হাজির হয়েছে বইটিতে। যেমন,

…লিটল-ম্যাগাজিনের বিদ্রোহ লিটল-ম্যাগাজিনকে বাসিন্দা করে তোলে এক রক্তাক্ত ও নিঃসঙ্গ রাস্তার। নিজের অহঙ্কারী ঔদ্ধত্য ও আপোষহীন অগতানুগতিকতার ভেতর নিরন্তর ও অব্যাহতিহীন সংগ্রামই হয়ে ওঠে তার একমাত্র বিধিলিপি। [পৃ. ১২৭]

ষাটের দশকের ঢাকাকেন্দ্রী সাহিত্য আন্দোলনের একটা বড় বৈশিষ্ট্য ছিল গদ্যকে পরিশীলনের চূড়ান্ত স্তরে নিয়ে যাওয়া। কণ্ঠস্বর-এর গদ্যলেখকেরা সেই প্রয়াসই পেয়েছিলেন। ভালোবাসার সাম্পান বইটির গদ্যরীতিতেও এর ছাপ স্পষ্ট। ষাটের দশকের তরুণদের সৃষ্টি-উচ্ছ্বাসের বৃত্তান্ত তুলে ধরতে গিয়ে লেখক এমন অনায়াস সাবলীল ভাষা ব্যবহার করেছেন যে, পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিল একটি বিনোদনধর্মী ও ঘটনাবহুল উপন্যাস পাঠ করছি। বইয়ের ভাষা একদিকে এমনই সাবলীল যে, তরতর করে পড়ে যাওয়া যায়। তেমনি আবার এর মধ্যেকার কৌতুকময়তা হয়ে ওঠে আনন্দদায়ক।

ahmad-majhar-2আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ছিলেন কণ্ঠস্বর পত্রিকার সম্পাদক। কিন্তু কণ্ঠস্বরের আগেই তাঁদের গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। ‘স্যাড জেনারেশন’, ‘বক্তব্য’, ‘স্বাক্ষর’ ছিল এই গোষ্ঠী গড়ে-ওঠার সময়কার স্বাক্ষরচিহ্ন। এগুলো গড়ে উঠতে উঠতেই জমে উঠছিল কণ্ঠস্বর প্রকাশের গোষ্ঠীগত আকাক্সক্ষা! বইয়ের প্রথম শ’খানেক পৃষ্ঠায় কণ্ঠস্বর পূর্ববর্তী তৎপরতার বিবরণ উঠে এসেছে।

বইটি কখনওই কেবল নিখাদ স্মৃতিচারণার বই নয়, হয়ে উঠেছে লেখকের সমকালের সাহিত্য-তত্ত্বেরও বই! ষাটের দশকের এই পর্বের সাহিত্য কেন অবক্ষয়ী হয়ে উঠেছিল তার একটা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও লেখক এখানে স্মৃতিচারণার পাশাপাশি হাজির করার চেষ্টা করেছেন। কণ্ঠস্বর কী অর্থে এই অবক্ষয়ের প্রতিনিধি, কেনইবা অবক্ষয়ের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিল তা তিনি এই বইয়ে বিশদ আলোচনা করে দেখিয়েছেন। অবক্ষয়ী সমাজের ছবি ফুটিয়ে তুলবার ব্যাপারে ষাটের লেখকদের প্রয়াসের আত্মপক্ষকে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কীভাবে সমর্থন করেছেন তার পরিচয় আমরা পাই এই বই থেকেই! যেমন লেখক বলছেন :

…শিল্পী, এমনকি শ্রেষ্ঠ শিল্পী হবার জন্যও অবক্ষয় সবসময় অন্তরায় নয়। অবক্ষয়ের উদ্দীপনা, নিঃস্বতা, রোমাঞ্চ ও বেদনাকে সততা ও প্রতিভার সঙ্গে সাহিত্যে কাব্যে ফুলিয়ে তুলে একজন লেখক বড় শিল্পীও হয়ে উঠতে পারেন। ইমরুল কায়েস, দস্তয়েভস্কি, গালিব ও বোদলেয়ার অবক্ষয়ী-যুগের বেদনা ও অনুভূতিকে শক্তিশালী ছবিতে ফুটিয়ে তুলে বড় শিল্পী হয়েছেন। ষাটের দশকে যখন আমাদের সমাজ অবক্ষয়ী হয়ে উঠতে শুরু করেছিল সে-সময়কার তরুণ লেখকেরা যদি ঐ অবক্ষয়ের ছবি ফুটিয়ে তুলতে উৎসাহী হয়ে থাকেÑবড় কিছু সৃষ্টি করতে না পারলেও- তাকে তাচ্ছিল্য করা যাবে কি!  [পৃ. ৩৭]

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি থেকে বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাস অনুধাবনের সূত্র মিলবে। তাঁদের গোষ্ঠীর সামগ্রিক একটা মূল্যয়নও হয়তো এখানে পাওয়া যাবে। কিন্তু তার চেয়েও যেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, লেখক এখানে তাঁর সহযাত্রীদের ছবি এমনভাবেই আঁকতে চেয়েছেন যাতে তাঁদের ব্যক্তিত্ব উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। আবার তাঁদের সম্পর্কে উঠে এসেছে তাঁর অনুকম্পায়ী মূল্যায়নও! এই মূল্যায়নধর্মিতার কারণেও ভালোবাসার সাম্পান পাঠকের খুব কাজে আসবে।

ভালোবাসার সাম্পান রচনাস্বভাবে কেবল স্মৃতিকথাই নয়, এর রচনারীতি ব্যক্তিগত রচনার শর্তও পূরণ করে। প্রায় সারাক্ষণই লেখকের ব্যক্তিসত্তা যেন পাঠকের অনুকম্পা কামনা করে, যেন প্রশ্ন তোলে আমি যা বলছি তা কি ঠিক নয়! যা করেছি এ-ছাড়া আর কী-ইবা করতে পারতাম! শুধু তা-ই নয়, কখনও কখনও নার্সিসাসের মতো আত্মসৌন্দর্যেও মুগ্ধ হয়ে উঠেছেন লেখক! তাছাড়া আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ব্যক্তিত্বে যেমন এক ধরনের গাম্ভীর্য ও কৌতুকবোধের মিশ্রণ আছে ভালোবাসার সাম্পান-এর রচনারীতিতেও রয়েছে তার মিশেল। পরতে পরতে উন্মোচিত হয় দার্শনিকতার উদ্ভাস!

এই বইয়ে শহীদ কাদরীকে নিয়ে গল্প আছে, গল্প আছে রফিক আজাদকে নিয়ে। এইসব গল্পে কৌতুকহাস্য মাত্রা পেয়েছে। কিন্তু কৌতুকহাস্যের মাঝখান দিয়েই কখনও কখনও উঁকি দিয়েছে দার্শনিকতা। কবি রফিক আজাদ যখন কাবুলিওয়ালাকবলিত হয়েছেন তার বর্ণনায় তিনি যতটাই কৌতুকহাস্য চড়িয়েছেন কাবুলিওয়ালার অপমানকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি দেখিয়ে মোগলাই পরাটা খাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশের মধ্যে ততটাই গাম্ভীর্য চড়িয়ে তিনি শেষ করেছেন প্রসঙ্গটি। রফিক আজাদের নির্মোহতা থেকে পাওয়া দার্শনিক উপলব্ধিকে তিনি তুলে ধরেছেন পাঠকদের কাছে।  এই রকম উদ্ভাস বইটিতে মাঝে মাঝেই উঁকি দেয়!

বইয়ের শুরু থেকেই মাঝে মাঝে কবিতা উদ্ধৃত করা হয়েছে। উদ্ধৃত কবিতাগুলোকে  পর পর পাঠ করলেও ষাটস্বভাবী একটি কবিতা-সংকলন মনে হবে বইটিকে। এটিও এই বই পড়ার একটি বাড়তি লাভ।

ভালোবাসার সাম্পান বইয়ে অনেকগুলো ব্যক্তির স্মৃতিঅনুষঙ্গের সমষ্টি। স্মৃতিকথাগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য এই যে, তা শেষপর্যন্ত সমাজ-রূপান্তরের ছবি হয়ে ওঠে। ভালোবাসার সাম্পান বইটিও স্বভাবের দিক থেকে তা-ই হয়ে উঠেছে। এইসব সূত্রে ও নানা কারণে এই বইয়ে উল্লিখিত ব্যক্তিদের খোঁজ করতে হতে পারে। বইটিতে কোনো নির্ঘণ্ট না থাকায় ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে খোঁজ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠবে। বিষয় বা ব্যক্তির নির্ঘণ্ট না-রাখা এই ধরনের বইয়ের প্রকাশনামানের জন্য হানিকর। প্রথম সংস্করণে তো তা দেয়া হয়ইনি এমনকি দ্বিতীয় বা তৃতীয় মুদ্রণেও এ-সংক্রান্ত কোনো উন্নতি লক্ষণীয় নয়!

ষাটের দশক তো কেবল অবক্ষয়ী কালই নয়, সে-সময়টা তো ছিল বাঙালির জাতিসত্তার রাজনৈতিক ভাবে জেগে-ওঠার কাল। ঊনসত্তরে অভ্যুত্থানের আঁচ কণ্ঠস্বর পত্রিকায় খুব সামান্যই লেগেছিল। বোঝা যায়, দেশের সর্বস্তরের মানুষ যখন জাতীয়তাবাদী জাগরণে উন্মুখ তখন কণ্ঠস্বর গোষ্ঠীর লেখকেরা প্রধানত অবক্ষয়ের বিবরবাসী, আত্মবিস্মৃত হয়ে সাহিত্যে ‘আমু-ুপদনখ’ নিমগ্ন! ১৯৬৯ সালের উত্তালতার মধ্যেই তাঁরা আয়োজন করতে পারেন লেখক-সম্মেলন! এমনকি ১৯৭১ সালে কণ্ঠস্বর-সম্পাদককে ‘শনি’ চিঠি দিলেও, মানে সম্পাদক ইসলামি ছাত্র সংঘের মৃত্যু পরোয়ানা পেলেও এবং ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে মাথার ওপর বোমারু বিমানের হুঙ্কার চলতে থাকলেও ‘আত্মবিস্মৃতের মতো সারাদিন কালিদাসের কুমারসম্ভব পড়ে’ চলতে পারেন! ভালোবাসার সাম্পান সেই আত্মবিস্মৃত অবক্ষয়ীদের এক হার্দ্য দলিল হয়ে থাকবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares