সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

প্রচ্ছদ রচনা

October 11th, 2016 9:58 am
প্রচ্ছদ রচনা

ahmed-mostofa-1

প্রচ্ছদ রচনা

একজন খ্যাতিমান প্রকাশকের বহুবর্ণিল স্মৃতিকথা

আহমাদ মোস্তফা কামাল

 

বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান প্রকাশনা সংস্থা ‘আনন্দ পাবলিশার্স’-এর প্রকাশক বাদল বসু পিওন থেকে প্রকাশক শিরোনামে একটি স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। শিরোনামটি চমকপ্রদ সন্দেহ নেই। দুই বাংলার সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং বৃহত্তম প্রকাশনা সংস্থার প্রধান কর্তাব্যক্তিটি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একটা প্রেসের সামান্য এক কর্মচারি হিসেবে, এই তথ্যটিই তো আগ্রহী করে তোলে বইটি সম্বন্ধে। মনে হয়, তাঁর এই পিওন থেকে প্রকাশক হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথপরিক্রমা নিশ্চয়ই আমাদের অনেককিছু শেখাবে, জানাবে, বোঝাবে। কিন্তু মুশকিল হলো, শিরোনামটি আত্মজৈবনিক শোনালেও বইটিকে ঠিক আত্মজীবনী বলা যায় না। ব্যক্তি বাদল বসু এই বইতে খুব বেশি উপস্থিত নেই, ছোটবেলার অল্পকিছু ঘটনার বিবরণ থাকলেও এই গ্রন্থে প্রধানত তিনি তাঁর প্রকাশক-জীবনে সংস্পর্শে আসা বিভিন্ন লেখকের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বিষয়ক স্মৃতিচারণ করেছেন।

যেমনটি বলা আছে শিরোনামে, তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন খুব সামান্য একটি চাকরি দিয়ে। পশ্চিম মেদিনীপুরের দহিজুরি গ্রাম থেকে উঠে এসে প্রথমে গৌরাঙ্গ প্রেসের কর্মচারি, তারপর কাকার ব্যবসা (চালের দোকান) দেখাশোনা, কাকার ঘি-এর ব্যবসা প্রসারের জন্য সাইকেলে করে বাড়িতে বাড়িতে ঘি পৌঁছে দেয়া, তারপর আবার প্রেসে প্রত্যাবর্তন, এরপর আনন্দ পাবলিশার্সে যোগদান এবং অবশেষে এই প্রকাশনা সংস্থার প্রধান ব্যক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করে যাওয়া। এই জার্নি তো খুব সহজ হওয়ার কথা নয়! নিশ্চয়ই অনেক রক্তক্ষরণের গল্প আছে এই পথচলার ভেতরে, আছে গ্লানি ও বেদনার গল্প, হাসি ও আনন্দের গল্প, আছে যুদ্ধের গল্প, জয়-পরাজয়ের গল্প, কিন্তু সেসব কথা সম্ভবত তিনি বিস্তারিতভাবে বলতে চাননি। কোথাও কোথাও ইঙ্গিত দিয়েছেন হয়তো, কিন্তু সেগুলো ইঙ্গিতই, বরং বলতে চেয়েছেন প্রধানত আনন্দের গল্প, বিশেষ করে লেখকদের সঙ্গে তাঁর আনন্দময় স্মৃতিগুলোর গল্প। ৭২-টি অধ্যায়ে ভাগ করা ৫৮৭ পৃষ্ঠার এই বিপুলায়তন বইটির বড়োজোর ৫০ পৃষ্ঠার মতো তিনি ব্যয় করেছেন ব্যক্তিজীবন প্রসঙ্গে, বাকিটা লেখকদের সঙ্গে তাঁর স্মৃতিময় ঘটনাবলীর বিবরণ। ফলে নিজের জীবনের উত্থান-পতনময় ঘটনাবলী আর পরিবারের সদস্যরা প্রায় উপেক্ষিতই থেকেছেন এই স্মৃতিকথায়। প্রায় বলছি, কারণ, প্রথম তিনটে অধ্যায়ে তিনি বলেছেন তাঁর শৈশব-কৈশোরের কথা, মা-বাবার কথা, উল্লেখ করেছেন তেরজন ভাইবোন থাকার কথা, আর শেষের অধ্যায়ে এসে বলেছেন বড় বোন আর এক ছোট ভাইয়ের কথা, এমনকি বাকি ১০ ভাইবোন সম্পর্কেও কিছুই বলেননি। কলকাতায় তাঁর যৌবনকাল এবং বিয়ের গল্প বলেছেন দুটো অধ্যায়ে, একটি অধ্যায়ে বলেছেন কলকাতায় তাঁর বাসস্থান বিধান নিবাস সম্পর্কে- এই বৃহৎ কলেবরের বইতে এটুকুই তাঁর ব্যক্তিজীবন। বাকিটুকুতে ব্যক্তি বাদল বসুকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে প্রকাশক বাদল বসুকে যিনি পেশাদারিত্বের আড়ালে নিজের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নাকে ঢেকে রাখেন, ক্ষোভ-রাগ-বিরক্তিও সহজে প্রকাশ করেন না। পড়তে পড়তে মনে হতে থাকে, তাঁর মননশীল প্রকাশক সত্তা দখল করে নিয়েছিল তাঁর ব্যক্তিসত্তাকে, অথবা এই দুই সত্তাকে তিনি মিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন কোনো এক অজানা-দুরূহ উপায়ে। তবু একটু অতৃপ্তি যেন রয়েই যায়, মনে হয়, ব্যক্তিজীবনটিকে এতটা আড়ালে না রাখলেও পারতেন। আরেকটু খোলামেলা হলে আমাদের, মানে পাঠকদের, জানা হতো- কীভাবে তিনি এই দীর্ঘ রুক্ষ-অমসৃণ পথ পাড়ি দিয়েছেন, তাঁর ব্যক্তিজীবন তাতে কতটুকু ব্যাহত হয়েছে, তাঁর স্বজনেরা তাঁর এই বিপুল পরিশ্রমের অথচ মননশীল কর্মজীবনের কতটুকু সঙ্গী হয়েছেন।

জীবন ও পৃথিবী সম্পর্কে বাদল বসুর সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি একান্ত ইতিবাচক, যেমনটি হয়ে থাকে যুদ্ধজয়ী যে-কোনো সফল অধিনায়কের, ফলে নেতিবাচক কোনো কথাই যেন বলতে চান না তিনি। সবার ইতিবাচক গুণগুলোর কথাই যেন বলতে চেয়েছেন তিনি, ঢেকে রাখতে চেয়েছেন তাঁদের সীমাবদ্ধতা। পুরো বইটিতে মাত্র তিন-চারজন সম্বন্ধে খানিকটা অভিযোগের সুরে সমালোচনা উত্থাপন করেছেন, সম্ভবত এঁদের সম্পর্কে খানিকটা বিরূপ ছিলেন তিনি (যেমন জয় গোস্বামী, তসলিমা নাসরিন, সুকুমারী ভট্টাচার্য), হয়তো মারাত্মকভাবে বিব্রত ও বিরক্ত হয়েছিলেন তাঁদের কোনো কোনো আচরণে, তারই অতি সামান্য প্রকাশ ঘটেছে এটুকুতে, বাকিটুকু ইতিবাচক সম্পর্কচর্চার এক প্রামাণ্য দলিল হয়ে থাকবার মতো। পেশাগত প্রয়োজনেই অসংখ্য সৃজনশীল মানুষদের সান্নিধ্য পেয়েছেন তিনি, স্নেহ-ভালোবাসা- মমতা-শ্রদ্ধা সবই পেয়েছেন তাঁদের কাছ থেকে এবং সেগুলোর সপ্রশংস বিবরণ দিয়ে গেছেন আনন্দচিত্তে। যাঁদের সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন (সংখ্যাটি বিশাল) তাঁদের ছোট্ট একটা তালিকা দিলেই বোঝা যাবে, কত রকম মানুষের ঘনিষ্ঠ উত্তাপ তিনি অনুভব করেছেন : শিবরাম চক্রবর্তী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, রমাপদ চৌধুরী, বিমল কর, সমরেশ বসু, সত্যজিৎ রায়, নরেশ গুহ, নিমাইসাধন বসু, নবনীতা দেবসেন, সুকুমার সেন, বেলাল চৌধুরী, তসলিমা নাসরীন, প্রশান্তকুমার পাল, জ্যোতিরীন্দ্র নন্দী, ভবতোষ দত্ত, অশোক রুদ্র, নীরদচন্দ্র চৌধুরী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, জয় গোস্বামী, কিশলয় ঠাকুর, শঙ্খ ঘোষ, সুখময় ভট্টাচার্য, নির্মাল্য আচার্য, সুভাষ ভট্টাচার্য, প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত, মতি নন্দী, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বরুণ সেনগুপ্ত, রানী চন্দ, সৌরীন্দ্র মিত্র, অশোককুমার সরকার, লীলা মজুমদার, প্রবোধচন্দ্র সেন, দিব্যেন্দু পালিত, কমলকুমার মজুমদার, আশাপূর্ণা দেবী, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, পার্থ বসু, সুকুমারী ভট্টাচার্য, সমরেশ মজুমদার, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, বাণী বসু, রবিশঙ্কর, শরশিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজয়া রায়, অমর্ত্য সেন, গুন্টার গ্রাস, সালমান রুশদী এবং আরও অনেক অনেক সৃজনশীল মানুষ। না, এই ক্রমসূচি আমার নয়, লেখক/সম্পাদক এভাবেই সাজিয়েছেন বইটিকে। সূচিক্রমটিকে একটু তালগোল পাকানোর মতো ব্যাপার বলে মনে হতে পারে পাঠকের কাছে। এই সূচি কি বয়সানুক্রমে করা নাকি তাঁর প্রথম সাক্ষাতের সময় অনুযায়ী? নাকি এ তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্রমসূচি? না এর কোনোটিই নয়, ধারাবাহিকভাবে দেশ পত্রিকায় লেখার সময় যখন যাঁর কথা মনে এসেছে তখন তাঁর কথা লিখেছেন বোধ হয় (আমি নিশ্চিত নই, কারণ দেশ-এর ওই ধারাবাহিকটি আমি পড়িনি), কিন্তু বই প্রকাশের সময় এটিকে আরেকটু সাজিয়ে তোলা যেত বলেই মনে হয়েছে। যাহোক, এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যাপার নয়, যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো এই যে, এই দীর্ঘ স্মৃতিকথনে তিনি খুব একটা বিচার- বিশ্লেষণের দিকে যাননি। ঘটনাসমূহের সরল ও মনোগ্রাহী বর্ণনা দিয়েছেন বটে, কিন্তু যাঁর সম্পর্কে বলছেন তাঁর সম্পর্কে তিনি কতটা বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেন সেই প্রশ্নটি পাঠকের মনে জাগবেই বলে ধারণা করি। এও মনে হতে পারে, তিনি শুধু ঘটনার বর্ণনা করেছেন; শুধুমাত্র দর্শক তিনি, পর্যবেক্ষক নন। দু-চারটে উদাহরণ দিলে বিষয়টি বোঝা যাবে।

বইয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে শিবরাম চক্রবর্তী সম্বন্ধে অনেক ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি এক জায়গায় লিখেছেন :

শিবরামবাবুর জীবনযাপন ছিল এলোমেলো। কোনও পরিকল্পনা করে চলতেন না। মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের এক মেসবাড়িতে তিনি থাকতেন। যে-ঘরে থাকতেন, তার দেওয়াল ছিল ঠিকানা আর টেলিফোন নম্বরে ভরা। আবার গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা কিংবা নম্বরের তলায় লাল দাগ দেওয়া থাকত। জীবনের সব কিছুই শিবরামবাবু নিয়েছিলেন হালকা চালে। যেন জীবন এক বিরাট ঠাট্টা ছাড়া আর কিছু নয়!  (পৃ. ২২)

এই যে শেষ দুটো বাক্য-‘জীবনের সব কিছুই শিবরামবাবু নিয়েছিলেন হালকা চালে। যেন জীবন এক বিরাট ঠাট্টা ছাড়া আর কিছু নয়!’-একে আমি বলছি বিশ্লেষণ, বলছি মানুষ বিচারের দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় খুব বেশি একটা পাওয়া যাবে না। সম্ভবত সবার সম্বন্ধে ইতিবাচক ধারণা দেবার দায় থেকেই তিনি বিশ্লেষণের ঝুঁকি নেননি। অথচ তিনি যে তা পারেন না তাও মনে হয়নি। আরেকটা উদাহরণ দিই। প্রসঙ্গ : জয় গোস্বামী। একবার জয় চোখের সমস্যার কথা খুব বলতে লাগলেন। ‘কলকাতার ডাক্তাররা কিছু করতে পারলেন না’ বলে বাদল বসু তাঁকে নিয়ে গেলেন চেন্নাই। এরপর :

বহু ধরনের পরীক্ষা করেও জয়ের চোখের কোনও সমস্যা পাওয়া গেল না। চশমার পাওয়ারও ঠিক আছে। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকরা রায় দিলেন জয়ের সমস্যা চোখে নয়, মনে। জয় কিন্তু কথাটা মানতে পারেনি। সে বারবার বলতে লাগল, চোখে কোনও গোলমাল আছে। প্রায়ই তার মাথা ধরে যায়।

পুরো ব্যাপারটা দেখে আমার মনে হয়েছিল, টেনশনে ভোগার জন্য জয়ের এই অবস্থা। চিরকালই, মানে জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকেই দেখতাম জয় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। যে-সুনাম, যশ, ক্ষমতা সে পেয়েছে, পাছে তা হারিয়ে যায় কিংবা অন্য কেউ পেয়ে যায়, এই আতঙ্কে জয় সন্ত্রস্ত থাকে। ফলে মাথাধরা আর বিচিত্র কী!  (পৃ. ২৭০)

সঙ্গত কারণেই পুরো অধ্যায়টি উদ্ধৃত করলাম না, করলে আরও ভালোভাবে বোঝা যেত, তবু এই অংশটুকু একটু খেয়াল করলেই হয়তো চোখে পড়বে, দুটো প্যারাগ্রাফের প্রথমটি হলো ‘দেখা’ আর দ্বিতীয়টি তাঁর ‘পর্যবেক্ষণ’। বাদল বসু বা জয় গোস্বামী এই দুজনের কারও সঙ্গেই আমার দেখা হয়নি কখনও, এই ঘটনার সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের কোনো সুযোগ নেই; কিন্তু জনপ্রিয়তা সম্বন্ধে ওই পর্যবেক্ষণটুকু অস্বীকার করার উপায়ও নেই। জনপ্রিয় মানুষরা সবসময়ই নানারকম আতঙ্কে ভোগেন, হয়তো সবসময় তা ‘চোখের সমস্যা’ বা ‘মাথাব্যথা’রূপে প্রকাশ পায় না; কিন্তু তাঁদের আচরণে নানা অসঙ্গতি ও অস্থিরতা পরিলক্ষিত হয়। জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলার ভয় তাঁদেরকে সবসময় ভীতিগ্রস্ত করে রাখে। তো, বইটিতে যতটা আছে ঘটনার সরল বর্ণনা, এই ধরনের পর্যবেক্ষণ ততটা পাওয়া যায় না। এই অধ্যায়টি পড়তে পড়তে আমার মনে হলো, জয়কে তিনি ভালোবাসতেন ঠিকই, কিন্তু নানা কারণে তাঁর ওপর খানিকটা বিরক্তও ছিলেন, হয়তো নানা ঘটনায় বিব্রতও হয়েছেন, যখন স্মৃতিচারণ করতে বসেছেন, তখন সে বিরক্তিটা আর চাপা থাকেনি। এবং সম্ভবত সে কারণেই জয় সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়নটি কেবলই মুগ্ধতার বিবরণ হয়ে থাকেনি, যেমনটি থেকেছে অন্যান্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে, হয়ে উঠেছে ‘ক্রিটিক্যাল অ্যাপ্রেসিয়েশন’।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পর্কে একটা মূল্যায়নও মনে রাখার মতো :

সুনীলের মতো জনপ্রিয় তাঁর সমসাময়িক কোনও সাহিত্যিক হতে পারেননি। সেই জন্য বহুজন তাঁকে ঈর্ষাও করতেন। কখনও প্রকাশ্যে কখনও আড়ালে সুনীলের দুর্নাম করতেন। একটা গরিব, উদ্বাস্তু পরিবারের ছেলের স্রেফ কলমের জোরে অত বড় জায়গায় চলে যাওয়াটা তাঁর সমসাময়িক বহু লেখকই মেনে নিতে পারেননি। (পৃ. ৩৯)

ahmed-mostofa-2বাদল বসু নানা দেশের বইমেলায় অংশগ্রহণ করেছেন, তার বেশ কিছু বিবরণ আছে এই গ্রন্থে। ১৯৮৬ সালের ফ্র্যাঙ্কফুটে অনুষ্ঠিত তেমনই এক বইমেলার স্মৃতিচারণ আমার মন কাড়লো। সেবার মেলার থিম ছিল ‘পরম্পরার পরিবর্তনে ভারত’, অর্থাৎ ভারতই সেই মেলার থিম কান্ট্রি। কিন্তু জার্মান সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে বিপুল প্রচারণা চালানো হলেও মেলায় কাক্সিক্ষত সাড়া পেলেন না ভারতীয় প্রকাশকরা। কেন এমনটি হলো? বিষয়টিকে বাদল বসু ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে :

মুশকিল হল, ইউরোপের সাধারণ মানুষের কাছে ভারত নিছক ফকির, সাপ, অলৌকিকের দেশ। এর সঙ্গে জুড়েছে দারিদ্র্য। আধুনিক ভারত নিয়ে তাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। ভারতকে তারা ওই ভাবে দেখতে চায়, দেখতে ভালোবাসে। সেই সব বাদ দিয়ে যদি ‘পরম্পরার পরিবর্তনে ভারত’ মেলার থিম হয়, সাধারণ ইউরোপীয় পাঠক তা দেখতে আসবে কেন? (পৃ. ৩৭৪)

এই কথাগুলো পড়ে বেশ মজা পেয়েছি আমি। এর একটা কারণ আছে। ১৯৯৮ সালে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ আমার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ঠিক একই ধরনের একটা কথা বলেছিলেন। বাদল বসু কেবল ইউরোপ নিয়ে বলেছেন, মান্নান সৈয়দ একইসঙ্গে বলেছিলেন বাংলাদেশ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে।

বহির্র্বিশ্ব যেমন সত্যজিতের চলচ্চিত্রে ভারতবর্ষের রঙিন দুর্ভিক্ষ দেখতে পছন্দ করে- তিনি যদি ভারতের খুব আধুনিক জীবন নিয়ে ছবি বানাতেন তাহলে কিন্তু বহির্বিশ্ব সেটাকে অতো গুরুত্ব দিতো না, কারণ ওই জীবন তো তারা চেনেই- তেমনই কলকাতার একটা পছন্দ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রাকৃত জীবন। বাংলাদেশের আধুনিকতা তারা পছন্দ করবে না, করে না। লেখার মধ্যে বাংলাদেশের সাপ-ব্যাঙ দেখলে ওদের পছন্দ হয়ে যায়, আমরা যে একটি আধুনিক জীবন-যাপন করি ওরা সেটা মনেই করে না, লেখায় সেরকম কিছু দেখলে গুরুত্বপূর্ণ বলে ভাবে না। ওখানে শামসুর রাহমানের চেয়ে আল মাহমুদ বেশি গ্রহণযোগ্য। কেন? তাঁর ওই শব্দ ব্যবহারের জন্য, গ্রামীণ অনুষঙ্গের জন্য, ভাষার জন্য। (ভোরের কাগজ সাময়িকী, ২৭ নভেম্বর, ১৯৯৮)।

বাদল বসু নিশ্চয়ই এই সাক্ষাৎকার পড়েননি, পড়লে কী বলতেন কে জানে! দুজন মানুষের ভাবনা কীভাবে এত মিলে গেল, ভেবে অবাক লাগছে।

বাংলাদেশেও তিনি এসেছেন কয়েকবার এবং এসেছেন একুশের বইমেলাতেও। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমাদের বইমেলার কোনো ইতিবাচক দিকই তাঁর চোখে পড়েনি।  ভাষা আন্দোলন এবং ভাষা-শহীদদের স্মরণে যে এই মেলাটি আয়োজিত হয়, এই বইমেলাকে কেন্দ্র করে যে কয়েক হাজার বই প্রকাশিত হয়, সারা মাসজুড়ে বই নিয়ে চলে পাঠক-লেখক-প্রকাশকদের উৎসবমুখর মিলনমেলা, প্রতিটি গণমাধ্যম বইমেলা কাভারেজের জন্য মাসজুড়ে করে বিশেষ আয়োজন, কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি হয় এই একমাসেই, এসবের কোনোকিছুই তাঁর মন কাড়েনি। উল্টো বাংলাদশের প্রকাশকদের তিনি যাকে বলে একেবারে ধুয়ে দিয়েছেন। বারবার বাংলাদেশে বই পাইরেসির প্রসঙ্গ টেনেছেন এবং এজন্য এ দেশের প্রকাশকদের দায়ী করেছেন। শুধু তাই নয়, যতবার প্রকাশকদের সম্পর্কে কথা বলেছেন তিনি ততবার এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেন তাঁরা নিতান্তই ধাপ্পাবাজ প্রতারক এক চরিত্র। দু-একটা উদাহরণ দিই :

ঢাকার বইমেলায় গিয়ে নিজে যা দেখলাম, তাকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিস্ময়গুলোর পাশে সাজিয়ে রাখা যায়। দেখলাম, ফুটপাথে ভারতীয় বই বিক্রি হচ্ছে না। বিক্রি হচ্ছে শিট ডিলের বই। সবচেয়ে অবাক কা-, লেখকদের অনুমতি না নিয়ে, কলকাতার বইয়ের আসল প্রকাশকদের না জানিয়ে, বাংলাদেশের প্রকাশকরা সেই বই দিব্যি বিক্রি করছেন। অফসেটে হুবহু পুনর্মুদ্রণ। শুধু কলকাতার প্রকাশকদের বদলে ওখানকার প্রকাশকের নাম-ঠিকানা আর বাংলাদেশি টাকায় দাম ছাপা। সেগুলোকে আবার গেরামভারী চালে বাংলাদেশ সংস্করণ বলা হচ্ছে। আবার কয়েকটি বইয়ে কলকাতার প্রকাশকের নাম রেখে হুবহু কপি করে সেসব বই বিক্রি করা হচ্ছে।… এমন বুক-পাইরেসি আমি বিশ্বের অন্য কোথাও দেখিনি। কলকাতার লেখক-প্রকাশকরা জানতে পারছেন না এই চৌর্যবৃত্তির কথা। এমনকি আইএসবিএন নম্বরটিও অবিকল পুনর্মুদ্রিত। (পৃ. ৩৮৬)

অস্বীকার করার উপায় নেই, এখানে বুক-পাইরেসি হয়, কিন্তু তার জন্য কি বাংলাদেশের প্রকাশকরা দায়ী? আমাদের কোনো প্রকাশক পাইরেসি করেন এমন কথা জীবনেও শুনিনি। তিনি একটু খোঁজ নিলেই জানতেন, যে-সব প্রকাশকের নাম ওখানে ছাপা হয়েছে, সেই নামে কোনো প্রকাশকই নেই। ব্যাপারটা সম্পূর্ণভাবে একটা প্রতারকচক্র পরিচালনা করে আসছে। খোঁজ নিলে তিনি এও জানতেন, বাংলাদেশের প্রকাশকরাও এই পাইরেসির বিরুদ্ধে সোচ্চার। কারণ প্রতারকরা যে কেবল কলকাতার বইয়ের পাইরেসি করে  তা নয়, বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখকদের বইও পাইরেসি করে, আর তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হন স্বয়ং এ দেশের লেখক-প্রকাশকরা। বাংলাদেশের কোনো প্রকাশক তো পাইরেসির সঙ্গে জড়িত ননই, বরং নিজেরাও এই যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছেন। অথচ বাদল বসু নিজে একজন প্রকাশক হয়ে অন্য দেশের প্রকাশকদের ওপর এসব অসাধু কর্মকা-ের দোষ চাপালেন! এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিম বাংলার পাঠকদের কাছে বাংলাদেশের প্রকাশনাজগৎ সম্পর্কে একটা ভুল মেসেজ পৌঁছে যাবে। তারা জানতেও পারবেন না, এই প্রকাশকরা প্রতিবছর বাংলাদেশের লেখকদের কয়েক হাজার বই প্রকাশ করেন এবং অন্তত একশ’ কোটি টাকার বই বিক্রি হয় প্রতিবছর। পাইরেসি করে টিকে থাকার প্রয়োজন তাদের পড়ে না। প্রশ্ন উঠতেই পারে, বাংলাদেশে তো পাইরেসির বিরুদ্ধে শক্ত আইন আছে, এইসব পাইরেটসদের বিরুদ্ধে কেন আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না? অস্বীকার করছি না যে, এই ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা আছে। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে পাইরেটেড বই জব্দ করা এবং পাইরেটসদের গ্রেফতারের খবর এলেও ব্যাপারটাকে ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। নতুন নতুন নকলবাজ লোক মাঠে নেমে পড়ছে। এসব ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যতখানি সক্রিয় হওয়া দরকার, ততখানি সক্রিয়তা চোখে পড়ে না।

এই একই অধ্যায়ে তিনি আরেকটি অভিযোগ তুলেছেন :

কলকাতার কয়েকজন লেখক কিছু বই ছাপার অনুমতি বাংলাদেশের প্রকাশকদের দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই অনুমতিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের প্রকাশকেরা দিনেদুপুরে পুকুরচুরি করছেন। ধরা যাক, কোনও বইয়ের অনুমতি দিতে গিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হয়তো লিখেছিলেন, ‘আমার এই বইটি অমুককে ছাপার অনুমতি দিলাম।’

এই বই বলতে কোন বই, বাক্যটিতে লেখা নেই। অতএব বাংলাদেশের একজন প্রকাশ করলেন কী, সুনীলের যে-কোনও বই ছেপে সুনীল স্বাক্ষরিত অনুমতিটি লাগামছাড়াভাবে ব্যবহার করতে শুরু করলেন। এভাবে সত্যজিৎ রায়ের কয়েকটি বই ছাপার অনুমতি নিয়ে তাঁর সব বই ছেপে চলেছেন এক বাংলাদেশি প্রকাশক।

একুশে বইমেলায় গেলে এই সব চোখে পড়ে। আমার মন খারাপ হয়ে যায়।

মন খারাপ হবারই কথা। আমাদেরও মন খারাপ হলো তাঁর অভিযোগ পড়ে। কিন্তু তিনি যে ঢালাওভাবে ‘বাংলাদেশের প্রকাশকেরা দিনেদুপুরে পুকুরচুরি করছেন’ বলে অভিযোগ করলেন, তার কী হবে? কোন প্রকাশক সুনীলের বই নিয়ে এই কা- করেছেন তা উল্লেখ করলেই হতো, তাহলে তো এই অভিযোগের ভার সব প্রকাশককে বইতে হতো না (যেমনটি তিনি অন্যত্র উল্লেখ করেছেন ইফতেখার রসুল জর্জ-এর কথা, সত্যজিতের বইয়ের ব্যাপারে)। এই অভিযোগ পড়লে কি পাঠকের মনে হবে না, বাংলাদেশের প্রকাশকেরা কেবল কলকাতার বই চুরিটুরি করেই টিকে আছেন? এতবড় একটা অন্যায় যদি কেউ করেই থাকেন, তাহলে স্বয়ং সুনীল কেন কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন না? তিনি তো অজস্রবার বাংলাদেশে এসেছেন, এদেশের লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের সঙ্গে তাঁর অতি মধুর একটা সম্পর্কও ছিল। যাহোক, এসব অভিযোগের জবাব দেবার দায়িত্ব প্রকাশকদের। আমি প্রকাশক নই, কিন্তু লেখক হিসেবে যেহেতু এই প্রকাশকদের পঁচিশ বছর ধরে চিনি-জানি, তাই এই ঢালাও অভিযোগের ব্যাপারে আমার প্রতিবাদটুকু লিপিবদ্ধ করে রাখলাম।

বুক পাইরেসির ব্যাপারে অভিযোগ জানাতে তাঁরা একবার শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সে-কথা তিনি জানিয়েছেন এভাবে :

একবার আমি, সুনীল, সমরেশ এবং মিত্র ও ঘোষ-এর কর্ণধার ভানুবাবু ঠিক করেছিলাম বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে যাব। এবং তাঁর কাছে অনুরোধ জানাব, বাংলা বইয়ের এত পাইরেসি, যার জেরে ভারতের প্রচুর প্রকাশক ক্ষতিগ্রস্ত, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে।

সেই উদ্দেশ্যে আমরা ঢাকায় গেলাম। হাসিনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইলাম। তিনি বাংলাদেশের সংসদে আমাদের সঙ্গে দেখা করার, কথা বলার সময়ও দিলেন। সব যখন প্রস্তুত, আমরাও যাওয়ার জন্য তৈরি, এমন সময় সমরেশ মজুমদার জানাল, “তোমরা হাসিনার কাছে যেও না। আমি এরশাদের সঙ্গে কথা বলেছি। উনি ব্যবস্থা করে দেবেন বলেছেন।”

আমরা এই প্রস্তাবে রাজি হতে পারিনি। প্রথমত, একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার পর দেখা করতে না যাওয়াটা চূড়ান্ত অভব্যতা। দ্বিতীয়ত, হাসিনা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী আর এরশাদ ছিলেন বিরোধী দলনেতা। (পৃ. ৪৯৭)

তিনি কবে দেখা করতে এসেছিলেন বলেননি, কিন্তু শেখ হাসিনা কস্মিনকালেও বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন না, এরশাদও বিরোধী দলনেতা ছিলেন না। যদিও পরের প্যারাতেই তিনি তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু একই পৃষ্ঠার দুটো জায়গায় একবার তাঁকে প্রেসিডেন্ট আরেকবার প্রধানমন্ত্রী, আর এরশাদকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে উল্লেখ করার মানে কী? ছাপার ভুল? নির্ভুল বইয়ের প্রকাশক হিসেবে যাঁর এত খ্যাতি, তাঁর এই ভুল? নাকি উদাসীনতা? উন্নাসিকতা? বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর এই উন্নাসিকতার কারণ কী?

যাহোক, যে-কথা শুরুতে বলেছিলাম, তিনি নিজের ব্যক্তিজীবনের ওপর তেমন একটা আলো ফেলেননি, তাতে শেষ পর্যন্ত আমাদের লাভই হয়েছে। লেখকদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ-দীর্ঘ স্মৃতিকথনে আমাদের জানার সুযোগ হয়েছে অনেক-অনেক অজানা গল্প, প্রচুর অজানা তথ্য। যেসব বই আমরা এতকাল ধরে পড়ে এসেছি সেগুলোর জন্মের নেপথ্য গল্প, যেসব লেখককে পড়তে পড়তে আত্মার আত্মীয় করে তুলেছি তাঁদের সম্পর্কে নানা অজানা গল্প পড়তে পারাটা কোনো একটি রোমাঞ্চকর উপন্যাস পড়ার চেয়ে কম আনন্দদায়ক নয় তো! এই অমূল্য স্মৃতিচারণের জন্য তিনি অবশ্যই আমাদের ধন্যবাদার্হ হয়ে থাকবেন।