গল্প : কেউ কেউ মরে গিয়ে সংখ্যাও হয় না : সাব্বির জাদিদ

সাব্বির জাদিদ ।।

ভেড়ামারা থেকে যে বৃদ্ধ আমাদের সহযাত্রী হওয়ার জন্য বাসে উঠলেন, তার দিকে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। পোশাকে-আশাকে-চেহারায় তিনি আর দশজন স্বাভাবিক বৃদ্ধের মতোই দেখতে। মাথায় জালি টুপি। গায়ে ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি। হাতে কাপড়ের ছোট্ট ব্যাগ। পরনে কী, শুরুতে খেয়াল করতে পারিনি। হতে পারে মুরব্বিদের প্রিয় ঢোলা সাদা পায়জামা। ধূসর রঙের প্যান্টও হতে পারে। খুব পরিচ্ছন্ন নয়, আবার খুব ময়লাও নয়। বয়সের মতো তার পোশাকও পুরোনো। তার দিকে আমাদের অবাক হয়ে তাকানোর কারণ তার পোশাক কিংবা চেহারা নয়; তার কথা। বাসের পাদানিতে পা রেখে, ইঞ্জিন কভারে বাঁ হাতের ঠেস দিতে দিতে তিনি উচ্চ গলায় বললেন, আপনেরা কেউ পোধানমন্ত্রীর সাতে আমাক দেখা করায় দিতি পারবেন?

বাসে উঠেই বৃদ্ধের হেঁকে ওঠা এবং পোশাক দেখে ভেবেছিলাম আশপাশের নির্মাণাধীন কোনো মসজিদের মুয়াজ্জিন কিংবা খাদেম হবেন তিনি। এই ধারণার পেছনে রয়েছে আমার পূর্বাভিজ্ঞতা। ভেড়ামারা হয়ে ঢাকা যাওয়ার এই রুট আমার খুবই চেনা। প্রায়ই দেখি, কাউন্টারে বাস থামলে হুজুর চেহারার কেউ নির্মাণাধীন মসজিদের জন্য দান গ্রহণ করতে আসেন। তাদের কারও হাতে থাকে রসিদ, কারও হাতে টিনের কৌটা। খুুচরা টাকা থাকলে আমি প্রায় সময়ই শরিক হওয়ার চেষ্টা করি। দানের এই টাকা জায়গা মতো পৌঁছানোর সংশয় মনে জাগলেও পাত্তা দিই না। আজকের এই বৃদ্ধের মতো তারা বাসের পাদানিতে পা রেখেই দানের ফজিলত বর্ণনায় হাঁক ছেড়ে ওঠেন। ফজিলতের বদলে এই বৃদ্ধের মুখ থেকে যখন ‘প্রধানমন্ত্রী’ শব্দটির আঞ্চলিক শব্দ উচ্চারিত হয়, তখন নড়েচড়ে বসতেই হয়। খেয়াল করি, আমার মতো নড়েচড়ে উঠেছে আরও অনেকে, যাদের কানে ইয়ারফোন গোঁজা নেই।

একজন যাত্রী ঢাকাগামী পরিবহনে উঠে সবার আগে যা খোঁজে, তার নাম সিট। যারা অভিজ্ঞ, নিয়মিত যাতায়াতে অভ্যস্ত, তারা টিকিটের সিট নম্বর দেখে সোজা গিয়ে আসন গ্রহণ করে। আর অনভ্যস্তরা সিট খুঁজতে সুপারভাইজারের সহযোগিতা নেয়। কিন্তু এই বৃদ্ধের সিট নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। তার আগ্রহের সবটুকু জুড়ে আছেন প্রধানমন্ত্রী। ইতোমধ্যে তিনি আরও পাঁচবার উচ্চারণ করে ফেলেছেন আমাদের অবাক করে দেওয়া সেই বাক্যটাÑ আপনেরা কেউ পোধানমন্ত্রীর সাতে আমাক দেখা করায় দিতি পারবেন?

বৃদ্ধের প্রশ্নের জবাব দিতে কাউকে আগ্রহী হয়ে উঠতে দেখি না। বরং সবাইকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখি তার ঝুলেপড়া দাড়ির দিকে। সুপারভাইজার এগিয়ে আসেন। বলেন, মুরব্বি, কই যাবেন?

প্রধানমন্ত্রীর বৃত্ত থেকে মুরব্বি বের হতে পারেন না। বলেন, পোধানমন্ত্রীর কাছে যাব।

রসিক সুপারভাইজার গোঁফের নিচে হাসি লুকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, প্রধানমন্ত্রী আপনের কী হয়?

  বৃদ্ধ ভাবলেশহীনভাবে বলেন, পোধানমন্ত্রী হয়।

আচ্ছা, আপনের টিকিট দেখান? কোন সিট আপনের? সুপারভাইজারের হাসি এবার গোঁফের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে আসে।

বৃদ্ধ পাঞ্জাবির বুকপকেট থেকে নীরবে টিকিট বের করে দেন।

সুপারভাইজার টিকিটে চোখ বুলায় আর আমি ভেতরে ভেতরে শঙ্কিত হয়ে উঠি। শঙ্কার কারণ, আমার ডান পাশের সিট খালি। কুষ্টিয়া থেকে যখন সিটটা খালি রেখে বাস চলতে আরম্ভ করেছিল, সুপারভাইজারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম পাশের সিটের যাত্রী সম্পর্কে। যাত্রী কি নেই নাকি সামনের কোনো স্টপেজ থেকে উঠবে? সুপারভাইজার জানিয়েছিলেনÑ ওই সিট ভেড়ামারার এক যাত্রীর। তখন আমার ভেতরটা আপন মনে বলে উঠেছিল, যেন কোনো এক রূপসী তরুণী আমার সহযাত্রী হয়। এ আমার বহুদিনের শখ। অচেনা তরুণীর সাথে আধো আধো আলাপে দীর্ঘ বাস ভ্রমণ। সম্ভবত মানুষ যা খুব করে চায়, তা পায় না। যা অল্পস্বল্প চায়, তা পায়। এ আমার ধারণা। ভুলও হতে পারে।

কুষ্টিয়া থেকে গাড়ি চলতে আরম্ভ করলে নানা ভাবনার জাল বুনেছি। মায়ের কথা ভেবেছি। বাবার কথা ভেবেছি। উঠোনে লাগানো মায়ের প্রিয় লাউগাছ, সবার অলক্ষ্যে যে রয়না গাছে চড়ে বসেছি, তার কথা ভেবেছি। এসব ভাবনার ভেতর প্রত্যাশিত সহযাত্রী তরুণীর কথা একবারের জন্যও মন থেকে সরে যায়নি। কামনার দেয়াল ঘড়িতে টিক টিক কাঁটা ঘুরেছে- পাশের সিটের স্বত্ব নিশ্চয় কোনো রূপসী কিনে নিয়েছে। সে হয়তো এতক্ষণে নির্ধারিত স্টপেজে টিকিট হাতে দাঁড়িয়ে কানের পাশে চুল গুঁজছে আর হাতঘড়ি দেখছে।

সুপারভাইজার নির্বিকার ভঙ্গিতে আমার পাশের সিটের দিকে ইশারা করেন বৃদ্ধকেÑ ওই তো আপনের সিট। D-2 । যান। বসেন।

প্রত্যাশার পাপ হয়তো বেশি হয়েছিল। তাই এই শাস্তি। প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ-প্রত্যাশী একজন আধা পাগল বৃদ্ধের সাথে তিনশ’ কিলোমিটার পথ ভ্রমণ কেমন হবে ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠছে। বিরক্তি চেপে জানালায় চোখ ছড়িয়ে দিলাম। দেখি, সানগ্লাস পরা অপূর্ব সুন্দরী এক তরুণী রিকশা থেকে নামছে। মনে মনে সম্ভবত এই মেয়ের সঙ্গই আমি কামনা করেছিলাম।

ঘামের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে বৃদ্ধ আমার পাশে বসলেন। পায়ের কাছে কাপড়ের ব্যাগটা রাখলেন। আমি বাইরে থেকে চোখ সরালাম না। সেই তরুণী এখন ডাববোঝাই ভ্যানের পাশে দাঁড়ানো। ঠোঁটে সবুজ রঙের পাইপ পুরে ডাবের পানি খাচ্ছে। মেয়েটার ডাব খাওয়া দেখতে ভালো লাগছে।

বাবা, পোধানমন্ত্রীর সাতে আমাক দেখা করায় দিতি পারবা?

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সহযাত্রী বৃদ্ধ আশাভরা চোখে চেয়ে আছে আমার মুখের দিকে।

লুকিয়ে রাখা বিরক্তি প্রকাশ করতে গিয়েও থেমে গেলাম হঠাৎ। বোজা বোজা ধূসর ওই চোখজোড়া দেখে আমার বাবার কথা মনে পড়ে গেল। হয়তো পৃথিবীর সকল বৃদ্ধ বাবার চোখ মরুভূমির মতো ধূসর হয়।

বললাম, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আপনার কী কাজ, চাচা?

খুব জরুরি একটা কাজ আছে, বাবা। হাতে সুমায় খুপ কম। মনে হচ্ছে কিছুদিনের ভিতরেই আমি মরে যাব। মরার আগেই কাজডা করে যাতি চাই।

এটা আপনার কেন মনে হচ্ছে? মানে কিছুদিনের ভেতর আপনি মারা যাবেন, এমনটা কেন ভাবছেন?

আমার মন কচ্ছে। সময় বেশি নেই। বুঝলে বাবা, বুড়ো হয়ে যারা মারা যায়, তারা টের পায়। রাইতে ঘুম হয় না। আজরাইলির গার গন্দ পাওয়া যায়।

আপনি গন্ধ পান, আজরাইলের গায়ের?

পাই বুলেই তো কচ্ছি।

কেমন গন্ধ?    

সিডা কতি পারব না। অমুন গন্দ দুনিয়ায় আর নি। যদি থাইকত, তালি তার সাতে মিলায়ে কতি পারতাম, মাটির গন্দ নাকি ঘাসের গন্দ নাকি অন্যকিছুর।

আপনি একাই ঢাকা যাচ্ছেন? সাথে আর কেউ নেই?

না। একটু চুপ থেকে বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। দেখলাম তার বোজা বোজা ধূসর চোখ কেমন সজল হয়ে উঠেছে।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। চুপ করে নদী দেখতে লাগলাম। আমাদের বাস এখন লালন শাহ ব্রিজে। পদ্মার বুকে পলির দাপট। ক্ষীয়মাণ এক চিলতে জলের ধারা মুমূর্ষু রোগীর মতো ধুঁকছে। এই নদী যেন বিত্তবানের শরীরে ছড়ানো কোনো শিরা, অনিয়মে যার চর্বি বেড়ে গেছে, চর্বি ক্রমেই সংকুচিত করে দিচ্ছে রক্ত হাঁটার পথ। যার অস্ত্রোপচার অনিবার্য। পদ্মার বুকে অস্ত্রোপচার করবে কে?

আমার তিন ছাওয়াল চার মিয়া। কুঁচকানো হাতের তেলো দিয়ে চোখ মুছে বললেন বৃদ্ধ।

এতগুলো ছেলেমেয়ে আপনার। আর ঢাকায় যাচ্ছেন একা?

সবাই বড় হয়ে গেছে যে। ছাওয়াল মিয়া বড় হয়ে গেলি, বিয়ে হয়ে গেলি তারা আর বাপ-মার থাকে না। পর হয়ে যায়। পাখির মতোন। বাপ-মার দায়িত্ব খালি পাখা গজায়ে দিয়া। তারপর যার যার জীবন তার তার। যে ছাওয়ালডা সবার ছোট ছিল, যে আপন ছিল, সে মরে গেল আগুনি পুড়ে।

আগুনে পুড়ে মারা গেল! বলেন কী! কীভাবে?

ওই যে কয়দিন আগে ঢাকায় এক কারখানায় আগুন ধরল না, সেখেনে আমার আবদুল কাজ করত। সেন্ট বানানোর কারখানায়।

এবার সত্যি সত্যি আমার মায়া লাগতে শুরু করল বৃদ্ধের জন্য। যার সবাই পর হয়ে গেছে, একমাত্র আপন যে ছিল, সেও চলে গেল, তাও আগুনে পুড়ে। বড় নির্মম! এবং এই দুর্ঘটনার সাথে বৃদ্ধের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার একটা যোগসূত্রও পেয়ে গেলাম। হয়তো তিনি ক্ষতিপূরণের আশায় আছেন। কর্মক্ষম সন্তান চলে গেছে। বিনিময়ে যদি কিছু টাকাপয়সা পাওয়া যায়। ফ্যাক্টরি-মালিক হয়তো ধানাইপানাই করছে, তাই তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। আমি বললাম, চাচা, আপনি কি ক্ষতিপূরণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন?

বৃদ্ধ যেন আমার কথা শুনতে পাননি। অথবা পেয়েছেন কিন্তু ওই মুহূর্তে ছোট ছেলে আবদুল, যে এখনও পর হয়ে যায়নি, তার স্মৃতি ভর করেছে বৃদ্ধের মাথায়। তিনি আবদুলের স্মৃতির গায়ে হাত বুলাতে লাগলেন। পরম মমতায়। আবদুলির জন্নি একটা মিয়া ঠিক করিছিলাম। রহিমপুরির মিয়া। খুপ মিষ্টি চিহারা। আমি তো ভালো দেখিনে চোখে, ওর মা দেকেছে। সে-ই সপ ঠিকঠাক করে রাকছিল। শবে বরাতের ছুটিতি আবদুল বাড়ি আসলিই বিয়ে। কিন্তুক ছুটির আগেই আবদুল ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। এমুন ফাঁকিই দিল, তার লাশটাও পালাম না। মাটি দিতি পারলাম না।

লাশ পাননি! আমি শিউরে উঠলাম। বিস্ময় এবং বেদনায়। আমার ভাবনার মাটি এবার একটুখানি সরে গেল আগের জায়গা থেকে। টাকা-পয়সা নয়, বৃদ্ধ হয়তো সন্তানের লাশের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে চাইছেন। বললাম, আপনি লাশের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে চান?

বৃদ্ধ যেন এবারও আমার কথা শুনতে পেলেন না। আগের কথার সূত্র ধরে বলতে লাগলেন, আবদুল খুউব লক্ষ্মী ছাওয়াল ছিল। ওর বিয়ের বয়স তো আরো আগেই হয়ে গেছে। কিন্তু বিয়ে করবি নে। ক্যান করবি নে? ও কইত, বিয়ে করলি আমু কিন্তু বড় ভাইর মতোন পর হয়ে যাবোনে। ওর মাথায় ছিল খালি বাপ-মা। বাপ-মার সুখির জন্নি খালি খাটত আর টাকা পাঠাত। এত করে কতাম, এত টাকা পাঠাস ক্যাঁ আবদুল! আমাদের তো এত টাকা লাগে না। তুই কষ্ট করিস, খাটিস, তুই ভালো-মন্দ খাবি। আমার আর তোর মার জীবন তো শ্যাষ। এই শরীরি ভালো-মন্দ কিছু ঢুকানো আর ভাগাড়ে ফেলা দেয়া সুমান কতা। কিন্তু কিডা শোনে কার কতা। মাসে মাসে শামসুলির বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠাত।

বৃদ্ধের কথায় আমার মন কেমন করে উঠল। লালবাগের সেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এখনও চলমান ইস্যু। ইন্টারনেটে সকল খবরাখবর রেখেছিলাম সেই নির্মম ঘটনার। দু’দিন খুব মন খারাপ ছিল। ইউনিভার্সিটির ক্লাসের ফাঁকে একদিন সুযোগ করে ঘুরেও এসেছিলাম লালবাগ থেকে। দেখেছিলাম, পোড়া ইট কীভাবে পুড়ে পুড়ে কয়লা হয়। কিন্তু এসব অস্বাভাবিক মৃত্যুর পেছনে যে আরও অনেক মর্মান্তিক গল্প লুকিয়ে থাকে, যেগুলো মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর, বৃদ্ধের সাথে সাক্ষাৎ না হলে জানাই হতো না। মায়া মায়া চোখে আমি বৃদ্ধের দিকে তাকালাম। তার চোখে এখনও পানি। টলমল করছে। যেন এক দুঃখ-নদী।

আবদুল যখন প্যাটে ছিল, ওর মার ইট্টু কষ্টও হয়নি। ওর আগে ছয়খেন ছাওয়াল-মিয়া প্যাটে ধরছিল ওর মা। কত কষ্ট দেছে তারা। আবদুল দেয়নি। এমনকি জন্মের সুমায়ও কুনু কষ্ট পায়নি ওর মা। তখন আমার বিশ্বাস হতো না। ইয়ার্কি মারে তুমার চাচিক কতাম, ছাওয়াল-মিয়া জন্ম দিতি দিতি তুমার অভ্যাস হয়ে গেছে, তাই আবদুলির জন্ম টের পাওনি। এই নিয়ে কত হাসি-তামাশা। কিন্তুক এখুন বুঝি বাজান, সত্যি সত্যি জন্মের সুমায় আবদুল ওর মার কষ্ট দেয়নি। কারণডা কী জানো?

 কী কারণ চাচা? আমি আন্তরিক গলায় জিজ্ঞেস করি।

আইজকের জন্নি।

মানে?

ও জানত, আগুনি পুড়ে মরে ও আমাদের খুপ খুপ কষ্ট দেবে, তাই জন্মের সুমায় কষ্ট দেয়নি।

একজন সাধারণ বৃদ্ধের মুখে এমন গভীর জীবনবোধসম্পন্ন কথা শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। দুঃখ-বেদনা-মৃত্যু-শোক কি তবে মানুষের ভাবনার জগৎটাকে বিস্তৃত এবং ঋদ্ধ করে দেয়! মানুষকে অন্য মানুষ বানিয়ে দেয়!

সেই রাইতে আবদুল ওর মার কাছে ফোন করছিল।

কোন রাতে?

আগুনির রাইতে। তখন তো রাইত প্রায় শ্যাষ। পুবাকাশ ফর্সা হব হব করছে। শেষ রাইতে আমার আবার ঘুম হয় না। বহুদিনের অভ্যাস। হঠাৎ দেখি মোবাইল বাজছে। বুকির ভিতরটা ধক করে উঠল। অসুমায়ের ফোন হলো অলক্ষুণে। ওর মারে ধাক্কা দিয়ে তুললাম। নবিসন তড়িঘড়ি ফোন ধরেই ডাকে- আবদুল। সে জানে না, কিডা ফোন দিয়েছে। কিন্তু ওই সুমায়ে আবদুল ছাড়া আর কিডাই-বা ফোন দিবি। মার মন বুলে কতা। ওইপারে আবদুলের হাউমাউ গলা। ঢাকায় ওর আলাদা কুনু ঘর ছিল না। রাইতে কারখানায় ঘুমাত। ক্যাম্মা যেন আগুন ধরে গেছে কারখানায়। আবদুল হাউমাউ করে কানছে। ও মা আমাক বাঁচাও। আমি মনে হয় পুড়ে মরে যাব। আমার ঘরের দরজায় আগুন জ¦লছে, মা। আমার দিকিই আসছে।

তুমার বুড়ো চাচি তখুন কী করল জানো। মোবাইল ফেলে ও আল্লারে আমার সুনা-মানিকির কী হলো কয়ে ছুট্টে গেল কলপাড়ে, সেই অন্ধকার রাইতে। বালতিত পানি ভরতি লাগল। তার সুনা-মানিকির ঘরের আগুন নিভাবি বালতির পানি দিয়ে। সেই সুনা-মানিক, জন্মের সুমায় যে তার মারে ইট্টুও কষ্ট দেয়নি।

আশপাশে না তাকিয়েও বুঝছি, যাত্রীদের কেউ কেউ আমাদের খেয়াল করছে। বৃদ্ধের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করছে। অন্য সময় হলে সংকোচে নিজেকে গুটিয়ে নিতাম।  কিন্তু এখন অদ্ভুত এক ঘোর আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। বৃদ্ধের আঞ্চলিক জবানে শোনা তারই জীবনের বেদনাবিধুর গল্প আমাকে ভুলিয়ে দিচ্ছে, এ এক পাবলিক বাস। এখানে শুধু আমরা দু’জন নই, আরও অনেক মানুষ রয়েছে। 

তারপর?

আমি মোবাইল কানে ধল্লাম। শুনি, আবদুল মা মা চিৎকার করছে। আশপাশে কী যেন চটপট করে ফুটছে। তুমার চাচি কড়াইর গরম ত্যালের ভিতর মাছ ছাড়ে দিলে যেমুন শব্দ হয়, তেমুন। সম্ভবত আবদুলের গায় তখুন আগুন লাগে গেছে। আমি বুঝতি পারছিলাম, আবদুল আগুনি জ¦লছে, চুলোর খড়ির মতো, কিন্তুক আমার কিছু করার ছিল না। আমার কলে কত পানি, আমার পুকুরি কত পানি, আমার চোখে কত পানি, কিন্তু আবদুলির গার আগুন নিভাতি পারলাম না।

কপালে দু’হাত চেপে আমি সিটে মাথা এলিয়ে দিলাম। অসহ্য! একজন বাবার মুখে তার সন্তানের পুড়ে যাওয়ার এমন নিখুঁত বিবরণ শুনে আমার গা গোলাতে লাগল। বাস জার্নিতে আমার কখনও বমি হয় না। আজ মনে হচ্ছে বমি হয়ে যাবে। সুপারভাইজারকে ডেকে দুটো পলিব্যাগ নিয়ে রাখি।

তারপর কী হলো? সন্তানের লাশ আনতে ঢাকায় গেলেন?

কে কথা কয়? আমি এবং বৃদ্ধ দু’জনই খানিকটা চমকে উঠলাম। আমার সিট নং উ-১, বৃদ্ধের উ-২। উ-৩ এর এক ভদ্রলোক আমাদের গল্পের ভেতর ঢুকে পড়েছেন। প্রশ্নটা তার কাছ থেকেই এসেছে। বৃদ্ধের শ্রোতা এখন দু’জন।

মেজো ছাওয়ালের সাতে ঢাকায় গিছিলাম। আবদুলিক আনতি। ওর মা তো অজ্ঞান। ঢাকায় ছিলাম দুই দিন এক রাইত। কিন্তু লাশ পালাম না। পুলিশ কইল, মারা গেছে একতিরিশ জন। সবাইরে বাড়ি নিয়ে গেল তাদের আত্মীয়রা। যত্ন করে গোসল দিয়ে জানাজা পড়ায়ে দাফন করল। কিন্তুক আমার আবদুলির কপালে গোসল জুটল না। জানাজা জুটল না। তার লাশের খোঁজই তো পালাম না। শুনলাম, টিবিতি, পেপারে সব জাগায় নাকি একতিরিশ জন মরার কতা কচ্ছে। কিন্তুক না, মরছে বত্রিশ জন। একতিরিশ জন মল্লি আমার আবদুল কোনে গেল! আবদুলরে কেন বাদ দিয়া হচ্ছে! উরা সপ মিছে কতা কচ্ছে। সব শালা মিথ্যুক।

বৃদ্ধের দুই শ্রোতা আমরা নিঃশব্দে চোখে চোখে কথা বলে নিলাম। সেই নৈঃশব্দ্যকে ভাষায় রূপ দিলে তার মানেটা দাঁড়ায় এমন- এ দেশে লাশ গুম করে ফেলা নতুন কোনো ঘটনা নয়। যে কোনো দুর্ঘটনায় মৃত্যু যত বাড়ে, সরকারের ভাবমূর্তি তত ক্ষুণ্ন হয়। তাই সংখ্যা কমাতে অনেক সময়ই লাশ গুম করা হয় রাষ্ট্রীয়ভাবে। একটা লাশের বাবা-মার কাছে ফিরে যাওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ দেশের ভাবমূর্তি। হতভাগা এই বৃদ্ধ এবং তার আবদুল সেই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার।

সমবেদনার গলায় ওপাশ থেকে দ্বিতীয় শ্রোতা বলেন, তা আপনি প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে চান কেন? লাশের জন্য?

বৃদ্ধ চোখ-মুখ শক্ত করে বলেন, না, লাশের জন্নি না। এখন আর তার চোখে জল নেই। তার চোখ এখন পদ্মার চরের মতো শুকনো। অতি শোকে মানুষ কি সত্যি সত্যি পাথর হয়ে যায়!

তাহলে?

সংখ্যা বদলানোর জন্নি।

সংখ্যা বদলানোর জন্য? বুঝতে না পেরে আমরা দু’জন একসঙ্গে বলে উঠি।

হ্যাঁ বাবাজিরা। সংখ্যা বদলানোর জন্নি আমি পোধানমন্ত্রীর সাতে দেখা করতি চাই। সেদিন একতিরিশ জন না, বত্রিশ জন মরেছে। একতিরিশরে আমি বত্রিশ করার আবেদন নিয়ে পোধানমন্ত্রীর কাছে যাব।

বৃদ্ধ হঠাৎ তার ব্যাগ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ব্যাগের ভেতর থেকে শক্ত পলিথিনের প্যাকেট বের করেন। প্যাকেট থেকে বের করেন কাগজ। আমার সামনে মেলে ধরে বলেন, দেখ তো বাবা, এইডা কীয়ের কাগজ?

আমি কাগজটা বৃদ্ধের হাত থেকে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখি। আবদুলের জন্ম নিবন্ধন কার্ড। বলি, এইটা তো আপনার ছোট ছেলের জন্ম নিবন্ধন কার্ড। এটা কেন বের করলেন?

বৃদ্ধ কার্ডটায় কয়েকটা চুমু খান। তারপর বুকে চেপে ধরে বলতে থাকেন, আবদুলির জন্মের পর ইউনিয়ানে যায়ে এই কাগজডা বানায়ে আনছিলাম। এইডা হলো আবদুলির জন্মের পোমান। সে যে এই দ্যাশে জন্ম নিছে, দ্যাশ তার পোমান হিসাবে এই দলিলডা দিছে। আবদুল আর নাই, মরে গেছে, এই দ্যাশ এখুন ক্যান তার মিত্যুর দলিল দিবিনে! আমি আমার আবদুলরে চাইনে, তার লাশও চাইনে, কুনু টাকা-পয়সা চাইনে, খালি চাই তার মিত্যুর একটা স্বীকারপত্তর। এই দ্যাশ বলুক, সেই রাতে আগুনি পুড়ে আবদুল নামের এক কারখানার মজদুর মরে গেছে। একতিরিশ সংখ্যাডারে তারা বত্রিশ বানায়ে দিক। সংখ্যা পরিবর্তনের এই দাবি নিয়ে আমি পোধানমন্ত্রীর কাছে যাব। তুমি কি পারবা আমারে পোধানমন্ত্রীর কাছে নিয়ে যাতি? বৃদ্ধ আমার হাত চেপে ধরেন। বৃদ্ধের রুগ্ন হাতের ওপর আমি ভরসার দ্বিতীয় হাত রাখি। অথচ প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার কোনো উপায় আমার জানা নেই। সেই ক্ষমতাও আমার নেই। পুত্রশোকে পাথর এক পিতার সামনে নিজের অক্ষমতা ঢাকতে আমি চুপ করে থাকি। হঠাৎ মনে পড়ে আমাদের বন্ধু গল্পকার মাহবুব ময়ূখ রিশাদের একটি স্ট্যাটাসের কথা। লালবাগের ওই দুর্ঘটনায় যখন একত্রিশ জনের মৃত্যুর নিউজ বেরোয় পত্রিকায়, রিশাদ একটি পোস্ট দিয়েছিল ফেসবুকে। লিখেছিল, এই দেশে মৃত্যুর পর মানুষ জাস্ট সংখ্যা হয়ে যায়। রিশাদের সেই পোস্টের নিচে আমি ‘সহমত’ কমেন্ট করেছিলাম। আজ আমার মনে হয়, রিশাদ পুরোপুরি ঠিক বলেনি। সহমত লেখাটাও আমার ঠিক হয়নি। কারণ, এই বৃদ্ধের সন্তান মরে গিয়ে সংখ্যাও হতে পারেনি। আমি মোবাইলের ডাটা কানেকশন অন করে ফেসবুকে ঢুকি। রিশাদের সেই পুরনো স্ট্যাটাসের কাছে যাই নতুন কমেন্ট করব বলে। অবাক বিস্ময়ে খেয়াল করি, রিশাদ তার পোস্ট এডিট করেছে। লিখেছে- কেউ কেউ মরে গিয়ে সংখ্যাও হয় না। আমি জানি না, রিশাদ এই বৃদ্ধের গল্প কোথা থেকে জানল।   

৩১ মার্চ, ২০১৯

সাব্বির জাদিদ : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : রাজিব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares