গল্প : মাটির ধর্ম : জয়দীপ দে

জয়দীপ দে ।।

বুঝছো নি, তুমরা কুনু জাতোর নায়।

এ নিয়ে তৃতীয়বার কথাটি বললেন উকিল দাদু। তিনি জায়গা সম্পত্তির হিসাব-নিকাশ বোঝাচ্ছেন আমাদের। দাগ-খতিয়ান আসল-নকল হাবিজাবি। এরপর শুরু হলো আমাদের বাপ-জেঠাদের ব্যর্থতা আর নিস্পৃহতার ইতিহাস। উকিল দাদুর কথায় যেন মাইক্রোবাসটা একটা ঝাঁকি খেলো। কারও কারও মাথায় গাড়ির সিলিংয়ে লাগল। দু-একজন নারী ‘উঁ’ শব্দ করে তাদের অস্বস্তি জানাল।

অইছে রে বা, রাখো তুমি-

বড় জেঠি আমাদের হয়ে যেন কথাগুলো বলে দিলেন দাদুকে। আসলে এসব বিষয়ী কথাবার্তা শোনার আগ্রহ এখন কারও নেই। আমরা মুগ্ধ হয়ে চরাচর দেখছি। কতদিনের চেনা একটা জনপদ, কিন্তু এই প্রথম আসা। বাপ-কাকাদের গল্পের সূত্র ধরে যে জনপদ মূর্ত আমাদের কল্পনায়, তাকেই দু’চোখ ভরে দেখছি। এখন কথা বলে সময় নষ্ট করার মতো সময় যে হাতে নেই।

সুরমা ব্রিজ পেরোবার পনেরো মিনিটের মধ্যেই আমরা হেতিমগঞ্জ এসে পড়ি। বাবা বলতেন, হেতিমগঞ্জে এসে তারা নৌকা ধরতেন সিলেটের। অথচ হেতিমগঞ্জ একটা শুকনো খটখটে এলাকা। রাস্তার ওপর রংবাজের মতো দাঁড়িয়ে আছে কিছু বিসদৃশ্য দালান। দালানে ঝকমক করছে উদ্বৃত্ত পুঁজির ঐশ্বর্য। হেতিমগঞ্জ বাজারকে বাঁয়ে রেখে ডানে মোড় নিল গাড়িটি। কিছুটা পথ সরলরেখার মতো চলে গেল নির্বিবাদে। তারপর হুট করে ঢুকে পড়ল আদিগন্ত ফসলের মাঠে। অগ্রহায়ণের মাঠ। সোনালি আবেগে দুলে দুলে পড়ছে ধানগাছগুলো।

তার মধ্য দিয়ে চলে গেছে এলজিইডির সর্পিল রাস্তা। পাশাপাশি দুটো গাড়ি যাওয়ার অবস্থা নেই। আমাদের পথপ্রদর্শকের বিবরণ মতে রাস্তা অল্প। গুগল ম্যাপ সক্রিয়। সেও বলছে তাই। কিন্তু প্রকৌশলীদের কূটকৌশলের কারণে তা মনে হচ্ছে অনন্তের পথ। ভুলভুলিয়ার মধ্যে পড়ে গেছি। অবশ্যি আমাদেরও তাড়া নেই, আমরা চাচ্ছি পথ চলতে থাকুক। এই পথের ধুলোয় ধুলোয় আমাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি মিশে আছে। ভাবতেই শরীরটা শিউরে ওঠে। এতদিন নিজেকে একটা উন্মূল মানুষ মনে হতো। বাবা বেঁচে থাকতে ষাটের দাঙ্গায় ফেলে আসা তাদের আদিভিটার গল্প বলতেন। খুবই নরম সুরে। মনে হতো সেখানে দেখাবার মতো আর কিছু অবশিষ্ট নেই। তাই উচ্ছ্বাসেরও নেই কিছু। তিনি কখনও ভিটা দেখাবার উৎসাহ দেখাননি। আমরাও তাকে বিব্রত করিনি। গতকাল এক বিয়ের অনুষ্ঠানে এক দাদুর সাথে পরিচয়। নিজে থেকে এসে পরিচিত হলেন। জানালেন তার বাড়ি লক্ষণাবন্ধ। আমাদের আদিভিটাও সেখানে। আমি আর ভিটা দেখবার লোভ সামলাতে পারলাম না। তিনি এক কথাতেই রাজি হয়ে গেলেন, গেলে কাইল চলো, কোর্ট বন্ধ আছে-

দাদু যেন নবীন কিশোরকে তেপান্তরের মাঠ দেখাতে নিয়ে যাবেন। সেই আনন্দে কাল রাতে ঘুমটাও ভালো করে হলো না। বিয়ে দেখতে করিমগঞ্জ থেকে এসেছিলেন জেঠিমা। জেঠা গত হয়েছেন বছর দশেক হলো। বিধবা জেঠি কী করে যেন খবরটা পেয়ে যান। সকাল থেকেই পিছু নিয়েছেন। অগত্যা তাকেও সঙ্গে নিতে হলো। ছোট কাকি ছিলেন দাদুর সঙ্গে আলাপের সময় মুখের ওপর। তাকে তো আর না করা যায় না। এমন করতে করতেই ৮-৯ জনের একটা কাফেলা হয়ে যায়। আমরা কেউ আদি ভিটা দেখিনি আগে। পথ চলতে চলতে তাই নিজেরাই নিজেদের মধ্যে কথা সেরে নিচ্ছি। হয়তো গিয়ে দেখব পড়ো পড়ো কোনো এক পর্ণকুটির। সামনে একটা মজাপুকুর। তার ওপর টুপটাপ করে পড়ছে সাদা বেলি ফুল। যাই হোক, সেটাই তো আমাদের আদি ভিটা। সিএস, আরএস ঘাঁটলে ঠিকই আমার পূর্বপুরুষের নাম ভেসে উঠবে। এতদিন নিজেকে কেমন যেন লাগত, আর দশটা মানুষের মতো নয়। স্থায়ী ঠিকানায় লোকে সাং, দং, মোং কত কী লেখে। কিন্তু আমাদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। নেই ঠিক নয়, আছে। টরেটক্কা মার্কা একটা ঠিকানা আছে। সেটায় গ্রাম নেই, নদী নেই, নীল আকাশ নেই- চারদিকে উদ্বাহু দালানের নিচে স্যাঁতসেতে একটা টিনের ঘর। তাও মাটিটা আমাদের নয়। তিন প্রজন্ম ধরে ভবঘুরে হয়ে বেড়াচ্ছি। মাটিহীন নদীহীন আকাশহীন একটা পরিবার। কতবার বাবার কাছে গল্পের ফাঁদ পেতেছি যদি ধরা দেয় একটা নদী, একটা গ্রাম, একটা সুনীল আকাশ। বাবা এড়িয়ে গেছেন অন্য গল্পের প্রবাহ এ গল্পের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে। সে গল্পে শুধু ক্ষুধা আর ক্ষুধা। বাড়ি দখলের পর দাদু সপরিবারে চলে আসেন সিলেট। ইচ্ছে ছিল কিছুদিন সেখানে কাটিয়ে চলে যাবেন ইন্ডিয়া। সেই মতলবে বড় ছেলেকে আগেই দিয়ে এসেছিলেন এক নিকটাত্মীয়ের কাছে। তাদের কাছ থেকেই খবর পেয়েছিলেন অল্পদামে কিছু ধানি জমির। ধুতির কোঁচড়ে বারোশ’ টাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন জায়গা কেনার জন্য। ধরা পড়লেন বর্ডারে। সেটা কোন বর্ডার বাবা বলেননি কোনো দিন। সুতারকান্দি না জকিগঞ্জ না অন্য কোনোটি। গল্পে তো ডিটেইলিং লাগে না। এত গভীরে জানতে গেলে প্রবাহমানতা ক্ষতিগ্রস্ত। আমরা কল্পনা করে নিই বর্ডারের দৃশ্য। দু-চারটা টিনের চালার বাড়ি। একটা বাড়ির আরচলায় একটা বড় খাতা টেবিলে নিয়ে বসে আছেন এক সাহেব। সেখানে দাদু কোঁচড়ভর্তি টাকা নিয়ে হাজির। দাপ্তরিক যোগাযোগে অপটু মানুষটা তখন ভয়ে কাঁপছেন। সাহেব খুব রাগী মানুষ। দাদুকে দেখেই ধমক ঝাড়লেন- ‘কিতা, টাকা নিয়া হউফারে যাইরায় গিয়া নি’।

চোরের মনে পুলিশ পুলিশ। দাদু ধরে নিলেন তার এই অর্থ বহনের খবর কেউ হয়ত আগে থেকে তাদের বলে দিয়েছে। তিনি বিনা প্রতিবাদে স্বীকার করলেন অপরাধ। কোঁচড় থেকে দুমড়ানো-মোচড়ানো কিছু টাকা বের করে দিলেন।

অর্থ পাচারের দায়ে দাদুর ছয় মাসের জেল হয়ে যায়। সহায়-সম্পত্তিহীন একটা পরিবার একমাত্র রোজগেরে ব্যক্তিকে হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে এসে পড়ল। ছয়টা মাস পাঁচটা মানুষ খেয়ে না খেয়ে কাটালো। জেঠা রয়ে গেলেন ওপারে, কিন্তু অন্য কারও যাওয়া হলো না। বাড়ি থেকে দশ মাইল দূরে থেকেও ভবঘুরের মতো একটা জীবন কাটিয়ে দাদু গত হলেন। বাবা কাকারা জীবিকার সন্ধানে এদিক-ওদিক ছিটকে পড়লেন।

‘কইছিলাম একটু সকাল সকাল বাইর অইতায়, সন্ধ্যা তো অই যার, এখন গিয়া কিতা ব্যঙ দেখতায়।’ দাদু অসহিষ্ণু হয়ে ওঠেন। তখন আমাদের গাড়িটা ফসলের মাঠ ফেলে একটা চওড়া রাস্তায় এসে উঠেছে। সোজা গেলে ঢাকা দক্ষিণ বাজার। দাদু হাত দিয়ে ইশারা করেন।

সেই রাস্তা ধরে গাড়ি চলল আরও কিছুক্ষণ। তারপর আবার নেমে পড়ল সরু রাস্তায়। দু’পাশে এবার ফসলের মাঠ নয়, ঘরবাড়ি। বর্ধিষ্ণু একটা জনপদের চেহারা। লাল নীল রঙে সাজানো প্রবাসীদের বাড়ি। একটু একটু পর ভুসিমালের দোকান। রাংতা কাগজে মোড়ানো পণ্যে উপচে পড়ছে একেকটা দোকান। প্রত্যেক বাড়ির সামনেই ঘন সুপারি বন। চারদিকে ভাঙা কাচ উপরে দেওয়া সীমানা পাঁচিল। এ রকম কিছু বাড়ি ফেলে এসে গাড়ি থামল রাস্তার ওপর। সামনে অবশ্যি একটা বাড়ি। সন্ধ্যায় বিষণ্ন আলো এসে পড়েছিল বাড়িটার ওপর। দোচালা টিনের স্কুলঘরের মতো লম্বা বাড়ি। দেয়ালের সিমেন্টে রিলিফ করা লতাপাতা, এর মধ্যে থেকে থেকে আরবি হরফে স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা, অর্ধমেলিত পুস্তকের মোটিফ। তার সাথে খুব মিলে যায় মাগরিবের আজানের সুর। দরজায় টোকার আওয়াজ শুনে দু’জন মহিলা বেরিয়ে এলেন। আধভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে বলল, বাড়ির মালিক আইছুইন রে, বাড়ির মালিক-

বিভিন্ন বয়সের আটজন মানুষ আমরা বিভ্রান্ত হয়ে যাই। বাদ পড়ে আমাদের পথপ্রদর্শক উকিল দাদু। তার মুখে একটা ফৌজদারি হাসি। কষা বেয়ে নেমে আসছে নিংড়ানো পাতার রস।

অয় আইছুইন, অহন কিতা করতায় করো-

কিতা আর করতাম খালু, আউক্যা। দুই মহিলার মধ্যে অপেক্ষাকৃত বৃদ্ধ মহিলাটি দরজা মেলে দিল।

সবাই যখন উদ্যত প্রসারিত দরজার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, অংশু তখন জামার খুঁটো ধরে দাদুকে টেনে ধরে, দাদু, আমরার বাড়িত লইয়া যাইতায় নায়?

আয়, আইলে না বুজতে কার বাড়িত আইছচ। দাদু ঘাড় ফিরিয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দেয় প্রশ্নকর্তার মুখের ওপর।

ঘরের ভেতরে একটা একশ’ ওয়াটের বাল্ব জ্বলছে। অনভ্যাসের দরুন হলদে আলোয় ঘরটাকে কেমন রহস্যময় লাগছিল। মনে হচ্ছিল, কোনো একটা রাক্ষসপুরিতে আমরা ঢুকছি। ভালো ভালো কথা বলে রাক্ষসরা তাদের প্রাসাদে ঢুকিয়ে আমাদের ঘাড় মটকে দেবে। চারদিকে তাকিয়ে একটু অবাকই হতে হলো। এই গণ্ডগ্রামে লিভিংরুমের কালচার চলে এসেছে। এক সেট সোফা সাজানো রুমটার একপাশে। আরেক পাশে অস্থিরভাবে ছড়ানো-ছিটানো জিনিসপত্র। মহিলারা মোড়া-চেয়ার টানতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। দলের সবাই আমরা যে যার মতো জায়গা করে বসে পড়ি। আমাদের ছোট কাকি তখন গলা চড়ান, ‘বওয়ার লাগি আইছো নি, বাড়ি দেখতায় নায়?’

দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য অংশু তখনও প্রশ্নব্যাকুল, ‘পরোর বাড়ি দেখিয়া কিতা হইত, আমরার বাড়িত যাইতায় নায়?’

ইগু আমরার বাড়ি নায় তো কার বাড়ি বে?

অংশু জেঠির কথা শুনে বিপাকে পড়ে যায়। এই কাবাঘরের ছবি সংবলিত বাড়িটি কী করে তাদের বাড়ি হয়? তারা বৈষ্ণব মতাবলম্বী। তাদের বাড়িতে থাকবে রাধা-কৃষ্ণের ছবি। থাকবেনি তাই গৌরাঙ্গের উদ্বাহু আহ্বান। মিনিমাম তো একটা তুলসীতলা থাকবে। এমন সময় ধূপ-ধুনোয় অন্ধকার হয়ে থাকবে চারিধার।

তাইন আইরা। নামজো পড়তা গেছুইন। বাড়ির বয়স্ক মহিলা ঘোষণা দিলেন।

তে আমরা একটা গুরান্তি দিয়া আই। জেঠি প্রস্তাব দেন।

চা খাইয়া যাইবা না।

অতক্ষণে তোমরা চা বানাও।

খুবই অন্তরঙ্গভাবে দু’জন দু’জনের হাতে হাত রেখে কথা বলছিলেন। দূর থেকে দেখে কেন যেন বিস্ময় জাগে। মেয়েরা কত দ্রুত একজন আরেকজনকে কাছে টেন নেয়। পুরুষের তৈরি ক্লেদের ইতিহাসের পাশে অবলীলায় একটা ভালোবাসার নয়নতারা তারা ফুটিয়ে দিতে পারে।

বসার ঘরটা টপকে কাফেলার লোকজন বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। বিরাট বাড়ি। একটা উঠোনকে ঘিরে তিনটে বাড়ি। উঠোনের বামে চলছে ধান মাড়াইয়ের কাজ। আলো-শব্দে ধুন্ধুমার কাণ্ড। তিনটা কামলা কাজ করে যেন কূল পাচ্ছে না। একজন আঁটি আঁটি কাটা ধানের বিড়ে ঢুকিয়ে দিচ্ছে মেশিনের মুখে। খেতে না চাওয়া বাচ্চাদের মতো মেশিনটা সক্রোধে ধান আর খড় দু’দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। দলের দু’জন কিশোর সদস্য এসব নিয়ে খুব উচ্ছ্বসিত। তাদের প্রথম ধান মাড়াই দেখা।  সন্ধ্যা লেগে এসেছে। এর মধ্যেও কামলারা ঝাঁকা ঝাঁকা ধান নিয়ে ফিরছে। পাকা ধানের ঘ্রাণটাও কি মায়াময়!

দাদু লক্ষণাবন্ধের ইতিহাস বলছেন আমাকে। শ্রীচৈতন্যের পূর্বপুরুষের আগমনের কাহিনি।

ওউ যেন বাড়ি দেখরায়, ইগু আছিল কমরেড শশীভূষণের বাড়ি। নাম হুনছো নি এন?

না।

ফরওয়ার্ড ব্লকের কমান্ডার আছিলা। ওউ যেন গাজী সাবমেরিন…

মনোযোগের কিস্তি দাদুর থেকে সরে যায় জেঠিমার দিকে। তিনি বলছেন, তুমরার মতো মাই বহুত জায়গা জিরাত-

প্রগল্ভ বয়স্ক মহিলা জেঠির হাত ধরে ফেলে, ‘কিতা কইন গো আফা, জায়গা জিরিত কিতা আমরার নি…’ দুটো হাত উপরের দিকে তুলে দিয়ে বলেন- ‘এইন দিছোইন আমরা ভুগ কররাম’।

বড় আধ্যাত্মিক কথা বলে ফেললেন মহিলা। দলের লোকজন মনে মনে হাসে। সেই হাসি সকৌতুক দৃষ্টি বিনিময়ে পরিস্ফুটিত হয়।

ওনো তোমরার পুস্কুনির ঘাট আছিল, দাদু এসে একটা জায়গায় থমকে দাঁড়ায়।

জেঠি দুই পা এগিয়ে যান, ঘাটোর কান্দাত এগু বেলি ফুলোর গাছ আছিল। টপটপাইয়া ফুল পড়তো। তাইন কইতা মাজে মাজে।

পইনচাশ বছর পরে আইয়া নি তুমি গাছ তুইকাইরায়? দাদুর কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে ওঠে।

তখন গালভর্তি সাদা দাড়ির গাট্টাগোট্টা শরীরের এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন টুপি মাথায়। হাত বাড়িয়ে দিলেন দাদুর দিকে।

‘ভালা আছুইন নি আফনারা?’ আমার দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘হউ তোমার দাদির লাগানি বেলগাছ। বুড়া অই গেছে। আগের লাহান ফল অয় না। আগে তো আমি লইয়া গেছি তোমরার বাসাত বহুত। অহন রে বা আর তনাইত কুলায় না।’

ভদ্রলোক কত দিনের পরিচিতির মতো করে কথাগুলো বলে গেলেন। অথচ তাকে আমার এই প্রথম দেখা। উনি হয়ত আমাকে ছোট কাকার ছেলে ভেবে ভুল করছেন। বাবার কর্মসূত্রে আমাদের সিলেটের বাইরেই পুরোটা জীবন কাটাতে হয়েছে। তবে ছোট কাকার মুখে প্রায় শুনতাম গ্রামের বাড়ি থেকে ফলমূল নিয়ে এক ভদ্রলোক আসতেন মাঝে মাঝে। উদ্দেশ্য- দলিল দস্তাবেজগুলো ক্লিয়ার করে নেওয়া। সে সময় হিন্দুদের জায়গা-সম্পত্তি বিক্রি করা নিষেধ ছিল। তাই বায়নার টাকা দিয়েও তারা জমির কাগজ নিজেদের নামে করে নিতে পারেননি। এখন চাচ্ছে সেটা করে নিতে। কিন্তু এসব ব্যাপারে বাবার আপত্তি ছিল প্রবল। তিনি কোনোভাবেই মানতে রাজি নন, বাড়িটা বিক্রি করা হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, তাদের চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। কিন্তু তার কিছু বক্তব্যের সাথে আবার এ বক্তব্যটা মেলেও না। সিলেট আসার পর জিন্দাবাজারে বাসা তোলার সময় সেই গ্রামের বাড়ি থেকে তিনি নাকি বাঁশ এনেছিলেন। সে পরিবারের লোকজন বাঁশ কাটতে তাকে সাহায্যও করেছিল। এসব টুকরো টুকরো ছবি আমাকে বিভ্রান্ত করে ফেলে।

পুকুর, বেলিফুল সব একাকার করে সাদা একটা দোতলা বাড়ি হয়েছে। দলের কারও ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু বাড়ির লোকজনের আগ্রহের কারণে বন্ধ ঘরটা খুলে দেওয়া হলো। এই বাড়িটা ওদের ছোট ভাইয়ের ভাগে পড়েছে। ছোট ভাই সপরিবারে ঢাকায় থাকে। গ্যাস কোম্পানির সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। পুকুর ভরাট করে পাঁচ বছর আগে বাড়িটা করা হয়েছে। ডুপ্লেক্স বাড়ি। ড্রইংরুম থেকে প্যাঁচানো সিঁড়ি উপরে উঠে গেছে। দেয়ালে মেঝেতে দামি টাইলস বসানো। এ রকম একটা নিভৃত পল্লিতে এমন রাজকীয় বাড়ি ভাবা যায় না।

মাশাল্লাহ, তোমরার ছোট মিয়ায় তো দেখার মতো এগু বাড়ি বানাইছোইন।

‘জি অয় চাচা।’ যে যুবকটি আমাদের দরজা খুলে দিল, সেই পিঠ চুলকাতে চুলকাতে উত্তর করে। ‘মিরপুরো তান বাড়ি আছে। শখ করি অনো বানাইলা। বাপ দাদার ভিটাত এগু স্মৃতি রাখিয়া গেলা। মাজে মইদ্যে আইন’-

অবা, এইটা কিন্তু তারারও বাপ দাদার ভিটা-

দাদুর কথা শুনে ছেলেটি চমকে গেল। সচকিত হয়ে তাকাল। তার ভয় বিহ্বল চোখটি আমার চোখের উপরেই পড়ল। সে হয়ত আমাকে প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করেছে। কিন্তু আমার তেমনটা মনে হলো না। ঘাড় নামিয়ে নিয়ে যুবকটি পাশের বাড়ির দিকে ছুটে যায়।

‘বুজছনি বা, তেত্রিশ বিঘা জমির ওপর বাড়ি। আরও না অয় শ’খানিক বিঘা খেতি পাইবায় তোমার প্র-পিতামহের নামে। তুমরা তো জাতোর নায়, নাইলে কাগজ বেচিয়া কুটিপতি অই যাইতায়।’ দাদু আমার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলেন।

‘তে অনো কত করিয়া চলের ডেসিমেল।’ জেঠির চোখ দুটো চকচক করে ওঠে।

দুই লাখ ত অইব। মাইনসে কিনার মতো জায়গা পারো না। লন্ডনিআলারা খবর পাইলে অইল-

অয়, তুমি তো পয়সা লইয়া যাইবায় গিয়া হউফারো, আর আমরারে কুপাই মারব মাইনসে। ও বাপ, ইতা বাদ দেও-, ছোট কাকি সর্তক অবস্থান নেন।

তখনই বয়স্ক মহিলা আর তার সহচরী এসে হাজির হয়।

বড় বাড়িত আউক্যা, নাশতা করবা।

চলো তুমরা। জেঠি আহ্বান করেন।

সবাই উঠে-পড়ে। এগিয়ে যায় মধ্যের বাড়িটার দিকে। দাদু আর আমি পিছে পড়ে যাই।

দেখছো নি বেটিন তারার অবস্থা। কোন বুঝ বুদ্ধি নাই। যারা তুমরারে তুমারার বাড়ি থাকি উৎখাত করল, তারা অনো আইয়া দেখো এমন একটা ভাব করের, কুটুম বাড়িত আইছে লাগের- পুরি বিয়ার সম্বন্ধ করত।

কিতা করতাম, উষ্ঠা খাইয়া হাসা ছাড়া তো আমরার উপায় নাই বা।

ধুরু মিয়া, লাগাও একটা মামলা আমি তো আছি-

আইচ্চা দাদু, মানুষোর লাগি কিতা ধর্ম খুব জরুরি না মাটি?

কেন এই প্রশ্ন করলায় বা?

আমার পিতৃপুরুষের সামনে কিন্তু এই প্রশ্নটা বড় অইয়া উঠছিল। তারার কাছে ধর্ম বড় লাগছে তাই মাটি হারাইছইন। যদি মাটি বড় অইত, ধর্ম হারাইতা, ঠিক নায় নি?

ওরে বাবা, এত গভীরে তো ভাবছি না।

অথচ দেখো মাটির ধর্ম কিতা, সে যখন যারে পায় তারেই আপন করিয়া নেয়। কে কইব পইঞ্চাশ ষাইট বছর আগে অনো বৈষ্ণব সেবা অইত। বা আরও শ’ পাঁচেক বছর আগে-

ধুরু ভাই ইতা রাখো। নিজোর মাটি নিজে বুঝিয়া লও।

দাদু এই মাটিও কিতা আমরার নি? ধরুক্যা পাঁচ শ’ বছর আগে, অনো তো আমরা আছলাম না। আমরা আইছলাম নদীয়াত থাকি নৌকাত করিয়া। তুমিই কইলায়। তুকাইলে হয়ত হেনো আমরার গুষ্টির মানুষজন পাওয়া যাইব। নদীয়াত যারা আছুইন তারা ভাবের হেনো তারার আদিভিটা, আমরা ভাবলাম এনো। দাদু মাটির ধর্ম বশ্যতা । যার লগে থাকে তার রং ধরে। মাটি আসলে কাউরো নায়। মাটি নিয়া ওতো বাড়াবাড়ির কুনতা নাই।

জয়দীপ দে : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : রাজিব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares