গল্প : দিব্যদৃষ্টি : রুমা মোদক

রুমা মোদক ।।

আমার একটা দিব্য দৃষ্টি আছে। জানি এভাবে ঘোষণা দিলে ব্যাপারটা আপনারা কেউ বিশ্বাস করবেন না। আমি নিজেই যেখানে দ্বিধাদ্বন্দ্বে বিক্ষত, সেখানে আপনাদের বিশ্বাস করানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণাদি কী করে হাজির করব? অবশ্যি তথ্য-প্রমাণ হাজির করে আমিও যে খুব নিজের কারিশমা প্রকাশ করতে চাই, তাও নয়। মূলত আমার এই দিব্যদৃষ্টি আমার নিজের জন্য খুব গুরুত্ববহ হলেও আমার নিজের কাছেই সন্দেহাতীত নয়। এটা স্বীকার করতে আমার কোনো দ্বিধা নেই। কারণ যতবার আমি তা লাভ করেছি, ততবারই তা আমাকে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্যসমুদ্রে ছেড়ে দিয়ে পালিয়েছে। অতঃপর আমি সত্য মিথ্যা, সম্ভব-অসম্ভবের নানামুখী সম্ভাবনায় হাবুডুবু খেয়েছি এবং কখনওই নিজের দিব্যদৃষ্টি নিয়ে সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠতে পারিনি।

এই যেমন আমার নাম ছিল হারুন। সেই নামটা কী করে জাহাঙ্গিরে রূপান্তরিত হলো সেটা আমি দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাই। কিন্তু আমার আম্মা সেটা বিশ্বাস করেন না। বলেন, হাছা করি কছাইন গফটা কার ধারো হুনছত? আমি যত বলি, আমি শুনি নাই আম্মা, কারও কাছে শুনি নাই। আম্মা বিশ্বাস করেন না। আম্মার অবিশ্বাস আমার দিব্যদৃষ্টির বিশ্বাস ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দেয়। কিন্তু আমি যেমন জানি ঘটনাটা আমি দিব্যদৃষ্টিতেই দেখেছি, আম্মাও তেমন জানেন আমি যা বলি তা হুবহু ঠিক।

আমার দেড় বছর বয়সে নাম বদলানোর ঘটনাটি ঘটেছে আর আমার চার বছর বয়সে আমার আব্বা আমাদের শোক এবং সংকটের অথৈ সাগরে ভাসিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। আমি দিব্যি দেখতে পাই এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যা অতিক্রান্ত অগভীর রাত। পাড়ার সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবার ‘সাহেব বাড়ি’র প্রবেশ ফটকে তাদের শিক্ষা আর অর্থের সমস্ত সম্ভ্রম নিয়ে জ্বলতে থাকা দুটো ফিলিপস বাতির একটি পানির ছোঁয়ায় ফটফট করে নিভে গেল। অবিশ্রান্ত বর্ষণ তবু চলতেই থাকল বাকি একটার গা ধুয়ে ধুয়ে। টিনের বেড়ার গা ঘেঁষে জামগাছ আর নিমগাছের পাতা চুঁইয়ে চুঁইয়ে যেতে থাকে উঠান পেরিয়ে বাড়ির সীমান্তে খালের দিকে। হঠাৎ চরাচর অন্ধকারে ডুবিয়ে ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে ঘরে ঘরে হারিকেন জ্বলে ওঠে। এ-ঘর ও-ঘর থেকে কেরোসিনে ভেজা সলতের গন্ধ তুমুল বর্ষার বাতাসে লুটোপুটি খেলে। মৃদু আলো খুব বেশিদূর নিজেকে মেলে দেওয়ার আগেই বৃষ্টির ঝাপটায় নিভে যাওয়ার জন্য লাফায়। তখন কী হয় বোধহয় আলো ছুঁতে না পেরে বৃষ্টিটা অভিমানে থেমে যায় আর সেই ফাঁকে একটা ছিঁচকে চোর আলো-অন্ধকারের ফোকর গলে টিনের বেড়া বেয়ে সাহেব বাড়িতে ঢুকে পড়ে। বাড়ির লোকেদের অলস অমনোযোগিতা আর উদাসীনতার ফাঁকে কড়িকাঠের পেরেকে ঝুলানো সিকো হাতঘড়ি আর ট্রানজিস্টার নিয়ে পালাবার সময় টিনের বেড়া ভেঙে হুড়মুড় করে পড়ে। সেই বৃষ্টিস্নাত সেই রাতে কর্মহীন আলস্য আড়মোড়া দিয়ে ভাঙার একটা উপলক্ষ্য জোটে পাড়া-পড়শির। ঘটনাটা তাদের উদযাপনহীন একঘেয়ে জীবনে বেশ উৎসাহের জোগান দেয়। হৈহৈরৈরৈ করে ছুটে আসে সবাই, ছেলে, বুড়ো, জোয়ান। সবার হাতে ঘরে সঞ্চিত সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র। এগুলো ব্যবহারের সুযোগ তারা পায়নি বহুকাল। কিন্তু সমবেত সবাই মূলত শুধু হাতটাই ব্যবহার করে, হারুন নামের চোরটাকে উত্তম-মধ্যম দিতে। সমবেত দলের নেতা পর্যায়ের একজন আমার আব্বা। মাত্র দেড় বছর আগে তার ছেলের নাম রেখেছেন হারুন। চোর পর্ব সমাপ্ত করে ঘরে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে তিনি হুঙ্কার ছাড়েন। চোরের নামে নাম অইব আমার পুলার? অইতেই পারে না। আজকের থিক্কা তার নাম জাহাঙ্গির। বাদশাহের নামে নাম।

আম্মা জানতে চান, তবে মনির চাচায় নি কইছে এই গফ? না গো আম্মা, মনির চাচা বলে নাই। মনির চাচার সাথে আমার পথে-ঘাটে, গলিপথে দেখা হয় ঠিক, কিন্তু এই নাম বদলের গল্প করার মতো সম্পর্কের উষ্ণতা তার সাথে আমার নেই। হয়তো একদা ছিল। আব্বার জীবিতাবস্থায়। কিন্তু  আব্বার অবর্তমানে আমার আম্মার টিকে থাকার দুঃসহ লড়াইয়ে সামাজিকতা কমতে কমতে বলতে গেলে অসামাজিকই করে দিয়েছে আমাদের। আর সচরাচর যা হয়, তেলহীন মাথায় সলতে পাকিয়ে তেল দিয়ে কেউ উষ্ণতা বজায় রাখতে আসে না। আম্মা স্মৃতি হাতড়ান। গল্পটি কী তিনি নিজেই আমাকে বলেছেন? সত্তর বছর বয়সে তার স্মৃতি যতদূর যায় তিনি হাতড়ান, কিন্তু মনে করতে পারেন না।

আমিও মনে করতে পারি না, আব্বা মারা যাবার পর কোনোদিন আমাদের তিন ভাইবোনে সাথে মায়ের গল্প করার মতো আনন্দময় সময় আমাদের জীবনে এসেছে কিনা! অহর্নিশ সংগ্রামলিপ্ত জীবনে সবসময় তার মেজাজ তিরিক্ষি। নিজেদের খুব প্রয়োজনটাও তাকে জানাতে হতো ভয়ে ভয়ে, কোনো শিশুসুলভ বায়না তো দূরে থাক। আব্বার সামান্য পেনশনের টাকা আর আম্মার এনজিও স্কুলে মাস্টারির হাজার খানেক টাকায় সংসার টানতে টানতে চাল-ডাল-স্কুলের বেতন জোগাতে জোগাতে যুদ্ধক্লান্ত সৈনিকের মতো ঘরে ফেরা মাকে ভালো-মন্দ কিছু বললেই খেঁকড়ে উঠতেন- তায় আবার গল্প! মনে লয় মনির মিয়াই তরে কইছে, আম্মার সন্দেহ আমি ভাঙাই না, আমি নিজেই বরং সন্দেহে ঢুকে পড়ি, সত্যি কি ঘটনাটা কোথাও শুনেছি আমি?

এই যেমন অফিসে অডিট পার্টি এসে কয়েক লাখ টাকা ঘাপলার রিপোর্ট দিয়ে গেলে এমডি আমাকে ডেকে নিয়ে চাকরিতে রিজাইন দিতে বললেন। ঘটনাটি আমি দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাইনি। সংসারের খরচ মেটাতে হিসাবের বাইরে কিছু টাকা-পয়সা ক্যাশ থেকে নিয়ে মাঝে মাঝে খরচ করেছি বটে, তবে তার পরিমাণ যে লক্ষাধিক হয়ে গেছে কল্পনাও করিনি। এই চাকরি চলে যাওয়াটা দিব্যদৃষ্টিতে দেখলে না হয় একটু-আধটু প্রস্তুতি থাকত, বিনা মেঘে এই বজ্রপাতে ভেতরে-ভেতরে নিহত হলেও খুব স্বাভাবিকভাবে সেদিন বাসায় ফিরেছিলাম। আমার দিকে অন্ন-বস্ত্রের ভরণপোষণের জন্য তাকিয়ে থাকা পাঁচটি পোষ্যমুখ। পুত্র-কন্যার প্রাইভেট মাস্টারসহ নানাবিধ খরচ, আম্মার ওষুধপত্র। ভূমিকম্পের ধাক্কায় যতটা ধস আমার ভেতরে নামে, তার বিন্দুবিসর্গও আমি পরিবারকে আঁচ পেতে দিই না। অফিস অবশ্য দু’মাসের বেতন অগ্রিম দিয়ে যথেষ্ট মানবতা দেখিয়েছে। ফলে দু’মাস সময় আমি পেয়ে যাই নিজেকে প্রস্তুতের আর  সংসারে নিজের বর্তমান ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার। প্রতিদিন অন্যদিনের মতোই ধোপদুরস্ত কাপড়চোপড় পরে ঘর থেকে বের হয়ে যাই, বউ গরম ভাত রেঁধে দেয়। মেয়ে হাত পেতে রিকশা ভাড়া নেয়, ছেলে সন্ধ্যায় বার্গার খাওয়র বায়না ধরে। সব ঠিকঠাক। কে বলবে আমার ভেতরে তখন উথাল-পাথাল তোলপাড়। ঘর থেকে বের হয়ে গলির মোড়ে এক কাপ চা খাই। তারপর হাঁটতে হাঁটতে শহরের শেষ মাথায় নতুন গজিয়ে ওঠা নব্য ধনীদের পাড়ায় চায়ের স্টলে। স্টলটা ঘুরতে ঘুরতে মিলে যায় একদিন। মালিক কয়েক ঘণ্টা বসে থাকলেও বিরক্ত হয়ে বের হয়ে যেতে বলে না, এটাই স্টলটার বিশেষ বিশেষত্ব। কয়েক কাপ চা খাই, চিনি দিয়ে, চিনি ছাড়া। মাস গড়াতে গড়াতে পকেটের টাকায় ভাটির টান পড়তে থাকে। এই শহরে একটা উপচানো মধ্যবিত্তের পরিচিতি আমার। কারও কাছে চাকরির জন্য তদবির করতে যে ইগো বাধা হয়ে দাঁড়ায়, প্রয়োজনটা তার চেয়েও বেশি। এই ইগো আর প্রয়োজনের যুদ্ধ চলে অবিরাম। কার কাছে যাই নিজের প্রয়োজন জানাতে! কুশল বিনিময়ের অযৌক্তিক মুখোশে কয়েকবার  সম্ভাব্য উৎসগুলোতে হানা দিই।

 চেয়ার এগিয়ে দিয়ে, চা-বি¯ু‹টে আপ্যায়িত করে। চাকরি-বাকরি কেমন চলছে ইত্যাদি আলোচনায় এমন একটা পরিবেশ তৈরি হয়, প্রয়োজনের প্রসঙ্গ তুলবার সুযোগই হয় না। ইগো এসে আটকে দেয়। প্রতিদিন রাত করে ঘরে ফিরে ল্যাপটপ খুলে বসি। জব ভ্যাকেন্সিগুলো খুঁজি। যোগ্যতা অনুযায়ী সিভি ড্রপ করি। কেউ ডাকে না। আবার সকাল হয়। এই শহরে আমার সুযোগ সীমিত বিষয়টি স্থির উপলব্ধি করে একদিন ফোন দিই আরিফকে। শৈশব-কৈশোরের ফুটবল ডাংগুলি খেলার সাথি আরিফ ক্লাসে কোনোদিন নিয়মিত পাস করতে পারত না, তার আজ রাজধানীতে কয়েকটা বায়িং হাউস। পরীক্ষার হলে উত্তর দেখানোর কৃতজ্ঞতায় সে ডাকে, চলে আয়… চলে আয় ঢাকা চলে আয়… তোর জন্য আমার দরজা সবসময় খোলা। সুযোগটা অমূল্য। যাব যাব করে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েও কিসে যেন আটকে যাই।

আমাকে পিছু টেনে ধরে যেসব অনুষঙ্গ, সেসবের টান বড় অনিবার্য- আমার ক্লাসের সবের মুবাইল আছে, খালি আমার নাই আব্বা, কবে কিন্যা দিবা? কী অসম্ভব মায়া তার আব্দারে, কী অসম্ভব অধিকারের টান! আমি আমার আব্বাকে পাইনি, কোনোদিন আহ্লাদে আব্দার করব। কন্যার এই আব্দার, এক অচ্ছেদ্য মায়ার বন্ধন হয়ে টেনে ধরে আমাকে। পুত্র সাদা শার্ট, সাদা প্যান্ট আর কেডস পরে আমার কাছে এসে হাত পাতে। আব্বা, আইজকু আমারে টেহা বেশি কইরা দিবায়, ফুছকা খাইতাম। আমার চোখ জলে ভরে আসে। আহা আমার ছেলেটা। কোথা থেকে এই অচেনা মায়া এসে সংসারে বিছিয়ে দেয় অবিচ্ছেদ্য শৃঙ্খল, এ জালে আমি আটকা পড়ে যাই, ছিঁড়তে পারি না। এদের ছাড়া একা একা আমি থাকব কী করে নিদারুন শহরে গিয়ে! আর স্ত্রী! বুয়া কাজে ফাঁকি দিলে সারাদিন ত্যক্তবিরক্ত কথার তুবড়ি ছুটিয়ে রাতে এসে বিছানায় ঘাড়ের কাছে নিজেকে এলিয়ে দিলে আমার মনে হয়, এ তো বিছানা নয়, স্বর্গ! তার ফোঁসফোঁস আহ্বান ছেড়ে আমি কি করে বাঁচবো ঊষর শহরে! আমি পারব না।

তখনই একদিন দেখা হয় লোকটির সাথে। কয়েকদিন থেকেই  দেখছি লোকটিকে। আমার মতোই বসে, চায়ে চুবিয়ে বন-রুটি খায়। সেই এক পুকুরে সাধু আর চোরের গোসল করার মতো লোকটিকেও আমার মতোই সদ্য চাকরি হারানো কূলহারা নাবিক বলেই বোধ হয়। একদিন ফিরে যাবার সময় সে আমার কাছে আসে। হাত পাতে, একশোটা টাকা হবে? স্ত্রী হাসপাতালে। একটা জরুরি ইঞ্জেকশন কিনতে হবে। একটা ময়লা দোমড়ানো প্রেসক্রিপশন এগিয়ে ধরে আমার দিকে। আমার তখন ভাড়ারে টান। সরি বলে ফিরিয়ে দিই তাকে। অবাক হয়ে দেখি এই প্রত্যাখ্যানেও কেমন নির্বিকার বেরিয়ে যায় সে। কিন্তু সেই নির্বিকারত্ব সেদিন হঠাৎ একটা সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয় আমার কাছে। দু’মাস বেকার সময়ের সময় কাটানোর ধান্ধায় শহরের এ-মাথা ও-মাথা গলি-ঘুপচি ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা আমার স্থিত হবার সিদ্ধান্তে সার জল দেয়। অফিস-বাসা, বাসা-অফিস করতে করতে খেয়াল করার সুযোগই হয়নি দু’রাস্তার শহরটা কীভাবে আশপাশে দৈর্ঘ্য-প্রস্থে এতটা বিস্তৃত হয়ে গেছে। ঘরের ওপর ঘর, ঘরের পাশে ঘর, চারতলা, পাঁচতলা সব অচেনা মানুষেরা। ভিন্ন ভিন্ন শহরের। ফুলে-ফেঁপে ওঠা শহরের, ব্যবসাকেন্দ্রের।

খুব হালকা লাগে নিজেকে আপাত একটা পথ খুঁজে পেয়ে। প্রতিদিন রাত করে ল্যাপটপ খুলে আশপাশের দূরত্বে আমি জব রিকোয়্যারমেন্ট খুঁজে যেমন নিয়মিত সিভি ড্রপ করে যাই। রাতে ফিরে সেদিনও তাই করি। ল্যাপটপ বন্ধ করে অতঃপর ভাবতে বসি, কী করে কাজটা শুরু করা যায়, কোথা থেকে… পশ্চিমে গজিয়ে ওঠা নতুন পাড়া নাকি দক্ষিণের পাড়ায়? সব নতুন আবাসিক এলাকা। পাশের উপজেলা গ্রাম আর শহর ঘেঁষে গড়ে ওঠা নতুন ইন্ডাস্ট্রিয়াল কর্মজীবীদের পরিবার-পরিজন। দেশের নানা প্রান্ত থেকে জীবিকার প্রয়োজনে আসা। আমাকে চেনার কোনো সম্ভাবনাই তাদের নেই। হিসাবের টাকায় ছক কেটে চলা দু’মাস প্রায় শেষ, দু’মাসে কম করে ত্রিশখানা সিভি ড্রপ করেছি। কেউ ডাকেনি এখনও। আর কোনো পথ খোলা নেই আমার। আমার দিব্যদৃষ্টি হঠাৎ তখন একটা ঝলক মেরে পালিয়ে যায় দৃষ্টি থেকে। আমি বড় কন্যাকে দেখি, দেখি তার কাছে ধরা পড়ে গেছি আমি… ভাবতে ভাবতে তন্দ্রাচ্ছন্নে তলিয়ে যাওয়া আমি ধড়ফড়িয়ে উঠে বসি। কী দেখলাম! কী দেখলাম আমি!

পরদিন যথারীতি চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে লোকটাকে আবার দেখি আমি। নির্বিকার নিরাসক্ত দৃষ্টি…। কী আছে সে দৃষ্টিতে আমি জানি না। আমাকে আবার নাড়িয়ে দেয়। দূর কীসের কী, দিব্যদৃষ্টি! আতঙ্কিত উৎকণ্ঠিত দৃষ্টি কতকিছুই তো দেখে। কাল তো ছেলেমেয়ের হাতে তুলে দেওয়ার মতো রিকশা ভাড়ার টাকাটাই নেই আমার কাছে। নিয়তির হাতে নিজেকে সমর্পিত করে রাতের সিদ্ধান্তে প্রত্যাবর্তন করি। ব্রেকহীন গাড়ির ড্রাইভারের মতো যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে জেনেও ঝুঁকিটা আমি নিই। নিতে বাধ্য হই। মোড়ের কম্পিউটার দোকান থেকে ডা. মো. জয়নাল আবেদীন এফসিপিএস (লন্ডন), এর একটা প্যাড প্রিন্টআউট নিই। ফার্মেসির কম্পাউন্ডার জয়নাল মিয়াকে ধরে কয়েকটা ওষুধের নাম লিখি। তারপর অভিযানে নেমে পড়ি। প্রতিদিন এ-দরজা ও-দরজা, এ-পাড়া ও-পাড়া…। নতুন পাড়া। নতুন মুখ। গজিয়ে ওঠা পাড়া… অচেনা মুখ। ফিরিয়ে দেওয়া। ডেকে বসিয়ে শরবত খাওয়ানো…। পাঁচশ’, হাজার, একশ’, পঞ্চাশ যে যাই দেয়, কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করি। কোনোদিন খালি হাতে ফিরতে হয় না। আমার ফুলহাতা শার্ট, ইস্ত্রি করা প্যান্ট, গলায় ঝুলানো টাই, পায়ে অফিসিয়াল শু আর গলায় ঝুলানো পুরোনো অফিসের আইডি কার্ড, পকেটে লুকানো পুরো ব্যাপারটা আমাকে সবার কাছে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য করে তোলে। এক্ষেত্রে আমার বাড়ি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বেশ কার্যকর কৌশলের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দামি ফিটিংস, দারোয়ান, গ্যারেজ নানা বিষয় বিবেচনায় আনি। তার পরও যদি কেউ মাফ করেন বলে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়, সেই প্রত্যাখ্যান ঝেড়ে ফেলার নির্বিকারত্বটাও সেই লোকটার কাছে ভালোই আয়ত্ত করেছি। বেশ কয়েক মাস কেটে যায় নির্বিবাদে। একটু ভান-অভিনয়ের বিনিময়ে ভালোই আয়/রোজগার।

তবু এই অসম্মানজনক পেশাটাকে ঠিক স্থায়ী করার ভাবনাটা মনে আনি না। নিয়ম করে নেট ঘাঁটি। সিভি ড্রপ করি। আজ সামনে যে ভ্যাকেন্সিটা আসে, কেন যেন মনে হয় এটা একদমই আমার জন্যই তৈরি। খাপে খাপে মিলে যায় আমার যোগ্যতা দক্ষতাগুলো। একেবারে বাড়ির কাছেই ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ায়। দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাই চাকরিটা আমার হয়ে গেছে। এমডি অ্যাপয়েন্টমেন্ট কার্ড আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলছেন, আপনি আগামী রবিবার জয়েন করুন।

পুরো সপ্তাহটা অপেক্ষা করি অতঃপর, মনে মনে প্রত্যাশা করি সত্য হোক এবার। প্রত্যাশা আর অপেক্ষার তুমুল তাড়া আমাকে এবার অস্থির করে। বাধ্য হয়ে প্রতিদিন আলু সেদ্ধ গরম ভাত খেয়ে ধোপদুরস্ত হয়ে  বের হই… বাসায় ফিরি… স্ত্রীর কাছে জানতে চাই ফোন চিঠি এসেছে? পরপর কয়েকদিন একই প্রশ্নে স্ত্রী অবাক হয়। কিসের চিঠি? কার চিঠি? প্রশ্নগুলো যখন ক্লান্ত রাতে আমার ল্যাপটপের চারপাশে ঘুরঘুর করে, তখন আমার মনে পড়ে আরে ওরা তো নিয়েছে মেইল অ্যাড্রেস, কন্ট্রাক্ট নাম্বার। কিছু জানালে তো মেইলে কিংবা ফোনে জানাবে। আমি মনে মনে হাসি। শালার দিব্যদৃষ্টি! ততদিনে  বার্ষিক গতির নিয়মে পৃথিবী সূর্যের কক্ষপথে একটা পুরো আবর্তন শেষ করে ফেলেছে, কই মেয়ের হাতে তো ধরা পড়িনি এখনও!

শহর ঘেঁষে চলে যাওয়া পুরোনো খাল ভরাট করে নতুন গড়ে ওঠা অভিজাত সুরভীপাড়া টার্গেট করে সকাল পৌনে দশটায় রিকশায় চড়ি আমি। আখঞ্জি টাওয়ারটা গতদিন টার্গেট করে এসেছিলাম। একশ’, দুইশ’… পাঁচশো… একতলা, দোতলা… আটশ’ টাকা রোজগার হয়ে যায় মিনিট পনেরোতে। তিনতলায় বি সাইডের কলিংবেল দিতেই দরজা খোলে যে মেয়েটি, আমার খুব চেনা চেনা লাগে তাকে। আমি তার দিকে প্রেসক্রিপশনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলি আমার স্ত্রী খুব অসুস্থ, কিডনির রোগী, জরুরি অপারেশন…। আমার চিনি কি চিনি না ভাবটাকে সে নিঃসন্দেহ করে, আঙ্কেল আপনি এখানে? আঁখি তো মাত্র এলো। আঁখি, আঁখি আমার বড় কন্যার নাম। ভেতর থেকে দৌড়ে আসে আঁখি। অসময়ে অযাচিত অবস্থায় আমাকে অবিষ্কার করে থতমত খেয়ে যায় সে।

আমার মাথাটা নিমেষে শূন্য হয়ে যায়। মাতৃভাষা বাংলা নয়। পেশার প্রয়োজনে শেখা ইংরেজি নয়, মক্তবে শেখা আরবি নয়… আঁখির এ দৃষ্টির উত্তর দেওয়ার মতো কোনো ভাষা নেই আমার ভাণ্ডারে। আমি হাতড়ে মরি আমার শিক্ষা, রুচি, অভিজ্ঞতা…। সেই শৈশব থেকে কৈশোর যৌবন পার হয়ে এই প্রৌঢ়ত্ব পর্যন্ত সব ক্লান্ত ক্লেদের অভিজ্ঞতা। কীভাবে মুখোমুখি হওয়া যায় এ সময় আত্মজার?

হঠাৎ পকেটে তখন মোবাইলটা বেজে ওঠে… জি আমি মো. জাহাঙ্গীর আলম, পিতা মরহুম আকবর আলী। জি… আগামীকাল রবিবার, জি কয়টায়… আমি ভাষা খুঁজে পাই। মেয়ের বিব্রত আর আহত দৃষ্টি পিছনে ফেলে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে পালিয়ে যাবার ভাষা খুঁঁজে পাই…।

রুমা মোদক : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : কাব্য কারিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares