গল্প : যে বিনুকে আমি ভালোবাসতাম : শারমিন শামস্

শারমিন শামস্ ।।

বিনুকে আপনারা চিনবেন।

ওই যে পাড়ার বড় মাঠটার পাশের হলদেটে দোতলা বাড়ির মেয়েটা! না না, বেণি দোলানো ছোট মেয়েটা না। একটু বড় যে জন, বয়স বিশ-বাইশ হবে,  সেও অবশ্যি বেণি বাঁধে, তবে একখানা। পিঠের ওপরে ঝুলে থাকে সেই বেণিটা। রোজ সকালে সে যখন দোতলার ঝুল বারান্দার গাছগুলোতে জল দেয়, তখন ওই বেণিখানা মৃদু আবেশে এপাশ-ওপাশ করে। শ্যামলা-পাতলা মুখের গড়ন, সকালবেলার রোদে সেই মুখ চিকচিক করে। বিনুর পরনে তখন হয়তো মেটে সবুজ কামিজ আর হলদেটে ওড়না। গাছে জল দিয়ে সে একবার বারান্দা থেকে মাথা ঝুঁকিয়ে নিচের দিকে চেয়ে দেখে। তারপর দ্রুত ঘরে ঢুকে যায়। সম্ভবত সে সময় তার খুব তাড়া থাকে।

আমি থাকি বিনুদের বাড়ির ঠিক উল্টো দিকের ছাইরঙা বাড়িটায়। তিনতলা বাড়ির চিলেকোঠায় দু’খানা ঘর। মাসিক চার হাজার টাকা ভাড়া। এ মফস্সলে এও অনেক বেশি। কিন্তু ছাদটা পছন্দ হয়ে যাওয়ায় আমি আর কিছু ভাবিনি। দুমদাম উঠে পড়েছি বাসাটায়। এর আগের বাড়িওয়ালা যে পরিমাণ খচরামি আমার সাথে করেছিল, সে তুলনায় এখন মোটামুটি স্বর্গে আছি। নতুন বাড়িওয়ালা আজাদুর রহমান সজ্জন। চিলেকোঠার ঘরের সাথের এক চিলতে ছাদ- সেখানে আমার অবাধ রাজ্যপাট। আমি এখন নবাব।

তো বিনুর কথা বলছিলাম। বিনু বোধহয় কোনো ইশকুলে পড়ায়। গাছে জল দেবার পর ঘণ্টাখানেক তার কোনো দেখা পাওয়া যায় না। এক ফাঁকে দেখি স্নানের পর টুক করে বারান্দায় এসে সেই সবুজ হলুদ কামিজ ওড়না সব তারে মেলে দিয়ে যায়। বড়জোর মিনিট চারেক থাকে। সেই ফাঁকেই আমি দেখে নিই বিনুর পিঠময় ভেজা চুল; কাছে থাকলে হয়তো দেখতে পেতাম সেই চুল গড়িয়ে জল ঝরছে আর ভিজে চুব চুব করছে বিনুর হলদে রঙ ব্লাউজের পিঠটা। শাড়ির ডুরে আঁচলটা অবশ্য দূর থেকেই বেশ বোঝা যায়। কাপড় মেলে দিয়ে, দীঘল চুল বার দুয়েক ঝেড়ে, লাল গামছাটা শুকাতে দিয়ে হুঁশ করে ঘরে ঢুকে যায় বিনু।

বিনুর এই প্রতিদিনের সকালের রুটিন আমার মুখস্থ। কোনটার পর কী হবেÑ সব আমি এই ছয় মাসে জেনে গেছি।

বিনুর নাম যে বিনু, তা আমি কীভাবে জানলাম? সেও এক গল্প।

ওই যে একদিন, বিনু যখন বাড়ির সামনে রিকশা ঠিক করল, পরনে সাদা খোলের শাড়িতে কমলা পাড়। সাদা ব্লাউজ আর চুলে মস্ত খোঁপা। ব্যাস এটুকুই। আর কোনো সাজ-টাজ নেই। না না, হাতে এক দু’খানা লাল চুড়ি দেখেছি শুধু। তো বিনু রিকশা করে এগিয়েছে একটু সামনে, অমনি ওদের হলুদ বারান্দায় দৌড়ে এলো ছোট মেয়েটা আর সঙ্গে ওদের বাবা (হুম, আমি ধরেই নিয়েছিলাম ওরা দু’বোন আর ভদ্রলোক ওদের বাবা)। তারপর বারান্দা ধরে ঝুঁকে পড়ে দিদি দিদি করে ডাকতে লাগল। সেই ডাক বিনুর কানে যাচ্ছে না ভেবেই বোধ করি ভদ্রলোকও বিনু বিনু করে ডাকতে লাগলেন।

রিকশা তখন আমার বাড়ির কাছাকাছি। মনে হলো, আমিও বিনু বিনু বলে ডাকি আর বলি, ওই যে দেখুন আপনাকে ডাকছে, থামতে বলছে।

তবে আমি ডাকবার আগেই বিনুর কানে ভদ্রলোকের ডাক পৌঁছল। বিনু রিকশা থামাল, ফেরাল। ততক্ষণে ছোট মেয়েটা নিচে নেমে এসেছে। দেখি একটা ছোট ব্যাগ নিয়ে রিকশার কাছে এগিয়ে গেল। বুঝলাম খাবারের ব্যাগ। বিনু ব্যাগখানা নিয়ে রিকশা ঘুরিয়ে চলে গেল। ফের আমার বাড়ির সামনে দিয়ে যখন গেল তখন আমি স্বগতোক্তির মতো বার দুয়েক বিনু বিনু করে ডাকলাম। সে ডাক অবশ্যি বিনুর কানে গেল না। না যাবারই কথা। বিনু রিকশায় চেপে দুলে দুলে চলে গেল।

সেই থেকে আমার কারণে অকারণে বিনু বিনু বলে ডাকতে ভালো লাগার শুরু। বিনুকে আমার বড্ড ভালো লাগতে লাগল কবে কখন থেকে, ঠিক বুঝলাম না। তবে এ বুঝলাম, বিনুর জন্য ভোর থেকে আমার অপেক্ষার শুরু। বিনু ভোরে ওঠে, তাই আমি উঠে পড়ি তড়িঘড়ি। বিনু বারান্দায় আসে। আমিও একটা ছোট স্টোভ কিনে ছাদের কোনায় বন্দোবস্ত করে ফেলাম। চা আর টোস্ট নিজে হাতে করে নিই। আগে গলির মোড়ের দোকান থেকে পরোটা আনাতাম। এখন সেসব বাদ। পাউরুটি আর ডিমের অমলেট করি আর বিনুকে দেখি। এ এক দারুন সময় আমার। জীবনের স্বাদটাই বদলে যেতে লাগল। আগের পরোটা সবজির স্বাদ আর মুখে সয় না।

বিনু যখন ঘরে ঢুকে রেডি-টেডি হয়, আমিও তখন অফিসের জন্য তৈরি হতে থাকি। বিনু রিকশা করে বেরোয়, ছাদের ওপর থেকে তাকে চলে যেতে দেখবার পর আমিও চটিজোড়া পরে বেরিয়ে আসি।

এমনি করে বিনুকে দেখে দেখে মাস দুয়েক যায়। কখনও কথা-টথা হবার সুযোগ নেই। কাছাকাছি হবারও না। একদিন শুধু ওকে দেখলাম মোড়ের দোকানে কী কী সব কিনতে এসেছে। আমিও সেদিন সেখানটাতে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিলাম। বিনুর পরনে অল্প দামি ছাপা শাড়ি। চুল একটু ঢিলে করে বেণি বাঁধা। সেদিন ছিল শুক্রবার। ছুটির দিনের একটা মাখো মাখো আবেশ ছড়িয়ে ছিল ওর চোখেমুখে। বেশ লাগছিল দেখতে। আমিও সব ভুলে বোকার মতো চেয়ে রইছিলাম। হঠাৎ দেখি বিনু তাকিয়েছে আমার দিকে। একটু অবাক একটু বিব্রতÑ তারপরই একটু বিরক্তি ফুটল ওর মুখে। আমিও লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিলাম। জড়োসড়ো পায়ে দ্রুত সরে এলাম। একটু পর বুঝলাম সওদা নিয়ে বিনুও বাড়ি ফিরে গেছে।

এর বাদে বিনুকে নিয়ে আমার আর তেমন কোনো অভিজ্ঞতা হয়নি। না হয়েছে কথা, না সামান্য পরিচয়টুকুও। অথচ বিনুর সব কিছু আমি টের পেতাম। এই যেমন একদিন ঠিক টের পেয়ে গেলাম বিনুর শরীর খারাপ। ঠান্ডা লেগেছে। দু’দিন স্কুলে গেল না। সকাল বেলা গাছে জল-টল দিয়ে একটা মোড়া নিয়ে বারান্দায় বসল চা কি গরম জলের মগ হাতে। আর রুমাল দিয়ে বার বার নাক মুছতে লাগল। বেশিক্ষণ বসলও না। সে দু’দিন আমারও অফিস যেতে একটুও মন টানল না। মনে হলো বিনুর সাথে সাথে থেকে যাই ঘরে। ও সারাদিন কী কী করে দেখি!

কিন্তু তা কি আর হয়! অফিসে গেলাম। অনেক রাতে বাড়ি ফিরে বুঝলাম বিনুরা ঘুমিয়ে পড়েছে, ওদের বাড়ির বাতি নেভানো।

এমনি করে যেতে যেতে একদিন বিনু আমার দিকে আরেকটু ভালো করে নজর দিল। বলতে গেলে ওইদিনই হয়তো আমাকে একটা আস্ত মানুষ হিসেবে খেয়াল করল, তাও ওই বারান্দা থেকে আমার ছাদ বরাবরে।

হয়েছিল কী- একটা ঘুড্ডি আটকে গেল। শীত তখন আসি আসি। এক ছুটির সকালে ওই পাড়ার ক’টা বাচ্চা ঘুড়ি ওড়াচ্ছিল। বিনু আর তার ছোট বোন বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল ঘুড়ি ওড়াউড়ি। আমিও দাঁড়ালাম এসে। একবার বিনুদের দেখি, একবার তাকাই ওদের দৃষ্টি বরাবর ঘুড়িদের দিকে। তো এক নীল ঘুড়ি ভোকাট্টা করে ধাই করে এসে আছড়ে পড়ল আমার ছাদের রেলিং বরাবর- তারপর আটকে গেল ছাদছোঁয়ানো টেলিফোনের তারে। আমি একটু ঝুঁকে ঘুড়িটাকে দেখলাম। তারপর চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি পাড়াসুদ্ধ বাচ্চা তো বটেই বিনুও তার বোনসহ সোজা তাকিয়ে আছে আমারই দিকে। মানে আর কী, ঘুড্ডিটাকে অনুসরণ করে তাদের চোখ এসে পড়েছে আমার দিকে।

আমি দু’মিনিট ভাবলাম, কী চাইছে ওরা? ওরা কি চায় ঘুড়িটা আমি ছাড়িয়ে দিই? নাহ, সে সম্ভব না। রেলিং ঘেঁষে হলেও টেলিফোনের তার বেশ দূরে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই ঘুড্ডি নামানো আমার কম্ম নয়। আমি ঘুড়িটা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে উদাস ভঙ্গিতে একটা সিগারেট ধরিয়ে টানতে লাগলাম। আমার এই ভাব দেখে নিচে জড়ো হওয়া ঘুড্ডি গ্রুপের মধ্যে একটা হতাশা মেশানো গাছাড়া ভাব চলে এলো। ওরা নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে অন্য ঘুড়ি ওড়ানোয় মন দিলো।

আর বিনু?

বিনু তাকিয়ে রইল দূর থেকে। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে আমি দিব্যি টের পেলাম। হয়তো তাকিয়ে তাকিয়ে বিনু আমাকে চেনার চেষ্টা করছিল, কবে কোথায় আমাকে দেখেছে তা মনে করতে চাইছিল। আমি একবার ধোঁয়া ছেড়ে সেই ধোঁয়ার ফাঁক গলে সরাসরি তার দিকে তাকালাম। চোখাচোখি হলো। বিনু চোখ নামিয়ে নিল না। আমিও না। হয়তো দশ সেকেন্ড, কি পনেরো, এরপর বিনু ঘাড় ঘুরিয়ে নিল। আমি অবশ্যি আরও কয়েক সেকেন্ড চেয়ে রইলাম। বিনুর পরনে একটা ক্ষয়েটে নীল শাড়ি। ছুটির দিনে বিনু শাড়ি পরেছে কেন? এসব ভাবতে লাগলাম। সিগারেটের শেষাংশ ছাদের মেঝেতে ঘষে চোখ তুলতেই দেখলাম বিনু নেই। ছোট বোনটাও না। ওদের বারন্দায় দুটো টুনটুনি কি চড়ুই পাখি এসে বসেছে। মাধবীলতার সবুজ কচিপাতা ঝিরিঝিরি নড়ছে বাতাসে।

বিনুকে নিয়ে আমার ভাবনা আর কল্পনা ডালপালা মেলতে লাগল। রাতে ঘুমোতে যাবার আগে ভাবতাম, কাল বিনু কোন রঙ শাড়িতে সাজবে! খোঁপা করবে না বেনি! রিকশা ঠিক করতে করতে একবার কি গ্রীবা উঁচু করে চোখ মেলে তাকাবে আমার ছাদের দিকে। আমিও কি প্রতিদিনের মতো নির্লজ্জ চেয়ে থাকব?

বয়স্ক লোকটি কখনও বাইরে বেরোতেন না। মাঝে মাঝে বিনুর গাছের বারান্দায় এসে বসতেন উনিও। ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চান্ন কি ছাপ্পান্ন হবে বলে ধারণা করতাম। রোগা শরীর। পাণ্ডুর মুখে রাজ্যের ক্লান্তি। বেলা এগারোটা নাগাদ ছোট মেয়েটা স্কুলের পোশাকে বেরিয়ে গেলে ভদ্রলোক হয়তো ঘুমিয়ে পড়তেন। এরপর দুপুরে বিনু ফেরার আগে তাকে আর দেখতে পাওয়া যেত না।

আমি কাজ করতাম এক ওষুধ কো¤পানির হয়ে। মাঝে মাঝে কাজ পড়ত বিকেলের শিফটে। সেদিন বিনুদের ঝুল বারান্দা, বারান্দা পেরিয়ে পর্দা ফাঁক করা ঘরের ভেতরের দিকে বারবার চোখ রেখে রেখে সকাল দুপুর কেটে যেত আমার। দুপুরে বিনু ফিরত। ফিরেই ব্যস্ত হয়ে যেত নানা কাজে। পর্দা সরানো জানালার ভেতর দিয়ে আমি তার ক্ষীণ শরীর আর রঙিন আঁচলের ব্যতিব্যস্ত  ছোটাছুটি দেখতে পেতাম।

আগে আমার দিন কাটত কল্পনায়। এখন কাটে আশায় আশায়। বুঝতে পারি, আমি বিনুর প্রেমে পড়েছি। প্রেম এ রকমই সর্বনাশা বস্তু- কোনো কিছু না জেনেশুনেই, বুদ্ধি বিবেচনার ধার না ধেরেই দিব্যি কারও ঘাড়ে সওয়ার হতে পারে। আজ বিনুর জন্য আমার প্রেম সেই বিবেচনাহীন, অন্ধ বালক হয়ে কাঁধে চেপে বসেছে। আমি তাকে বহন করে চলেছি।

ভাবতে থাকি, কীভাবে বিনুর সাথে একদিন কথা বলা যায়। কিন্তু কাজটা খুব সহজ লাগে না। রিকশায় সে রীতিমতো গুরুগম্ভীর মুখ নিয়ে হুড উঠিয়ে চলে। স্কুলে ছাড়া তাকে সহজে বেরোতে দেখা যায় না। পাশের পাড়ায় যে স্কুল আছে, সেটাতেই সে শিক্ষকতা করে। তাও জানতে পারি, রিকশাওয়ালার সাথে কথোপকথন শুনে। এর বেশি কিছু আর বিনুর ব্যাপারে উদ্ধার করতে পারি না। শুধু একদিন জানতে পারি ছোট মেয়েটার নাম সোমা।

আমি ভাবি একদিন আমার বাড়িওয়ালার সাথেই কথা তুলব। জানতে চাইব বিনুর ব্যাপারে। তিনি বহুদিন এ এলাকায় থাকেন। কিন্তু বড় সংকোচ হয়। তিনি আবার কী থেকে কী ভাবেন কে জানে! আমি এই পাড়ায় শুধু নয়, এ শহরেও একেবারেই নতুন। পেটের ধান্দায় নিজের শহর ছেড়ে এসে রয়েছি আত্মীয়-বন্ধুহীন। হুট করে কিছু একটা উল্টোপাল্টা করে ফেলাটা তাই আমার বিবেচনাবোধে সায় দেয় না।

মাঝে মাঝে খুব অস্থিরতা পেয়ে বসে আমাকে। প্রেম হয়তো এমন। প্রেমের ভেতরে শান্ত-সৌম্য-কোমল আলোর দীপ্তি যেমন আছে, তেমনি আছে তুলকালাম ঝড়ও। সেই ঝড় মাঝে মাঝে আমাকে দিগ্ভ্রান্ত করে। আমি খেই হারাই। মনে হয়, কোনো এক ছুতোয় চলে যাই ওই বাসায়। গিয়ে পরিচিত হয়ে আসি।

কিন্তু কোনো জুৎসই ছুতোও খুঁজে পাই না।

আবার ভাবি, মাকে ফোন করে সব বলি। তাকে একবারে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে পাঠাই ওই হলদে বাড়িতে। ওই ঝুল বারান্দায় বসে চা-নাশতা খেতে খেতে মা ওই বয়স্ক ভদ্রলোকের কাছে আমার সাথে বিনুর বিয়ের কথা পাড়ছেন, এমনটাও স্বপ্নে দেখি। কিন্তু সে স্বপ্ন আর পূরণ করতে পারি না, বাস্তবতা এত সহজ নয় বলেই। মাকে এখন বিয়ের কথা বলাটা নেহাৎ নির্লজ্জতা ছাড়া আর কিছুই হবে না। আমার বেতন সর্বসাকুল্যে চৌদ্দ হাজার টাকা। মাকেই প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে পারি না। মাস শেষ হবার আগেই নিজের টানাটানি শুরু হয়। বিয়ে করে সংসার খরচ কুলাব কীভাবে!

মাকেও তাই আর কিছুই বলা হয় না আমার। কিন্তু আমি মনে মনে বিনুকে আরও আরও ভালোবাসতে থাকি। ভালো যেহেতু হিসাব কষে বাসতে হয় না!

টের পাই, বিনুদের বাড়িটা ক’দিন ধরে খুব স্তব্ধ, নীরব। বিনুকেও স্কুলে যেতে দেখি না। ছোট মেয়েটাও প্রায় প্রায়ই স্কুল কামাই দেয়। ধারণা করি, বয়স্ক লোকটি অসুস্থ হয়েছেন, তাকে একেবারেই দেখা যায় না।

একদিন বেশ রাতে ছোট মেয়েটাকে সাথে নিয়ে বিনুকে বের হতে দেখি। কিছুক্ষণ পরেই ফিরে আসে একটা রিকশা নিয়ে, বিনুর হাতে ওষুধের দোকানের বাদামি কাগজের ব্যাগ। সকালে গাছে জল দেওয়ার কাজটা বাদ পড়ে প্রায়ই। যেদিন দেয়, সেদিন যেন ক্লান্তির ভারে নুয়ে পড়া এক বিনুকে দেখি। দূর থেকেও সেই ক্লান্তি টের পাওয়া যায়।

আবার একদিন বিনুকে ফের দেখি রিকশা ঠিক করে স্কুলে চলেছে। পরনে সেই সাদা খোলের কমলা পাড় শাড়িটা, ন্যাতানো, চুলগুলো বড় অযত্নে খোঁপায় বাঁধা।

ভাবি, এক দৌড়ে নিচে নেমে যাই। রিকশা আটকে জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে আপনার?

যা আমরা প্রাণপণে করতে চাই, তার সবটাই বড় কঠিন। আর আমার মতো মুখচোরা নিজের ভেতরে গুটিয়ে থাকা লোকের জন্য পুরো জীবনটাই বড্ড কঠিন আর গোলমেলে। কঠিন বলেই আমি আর নেমে আসি না ছাদের বাসা থেকে। বিনুর রিকশাও দুলে দুলে চলে যায় গার্লস স্কুলের দিকে।

সেদিন অফিস থেকে ফিরে বড্ড ক্লান্তি লাগে। বাড়িতে ফিরেই বিছানায় গড়াই। রাতের খাওয়া না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ি কখন যেন।

হঠাৎ দরজায় মৃদু আওয়াজে ঘুম ভাঙে। বাড়িওয়ালা আজাদ সাহেবের গলা শুনে উঠে বসি তড়বড় করে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সাড়ে দশটা বাজে। চোখ কচলে দরজা খুলে দাঁড়াই। বাড়িওয়ালা বলেন, আরে সাগর ঘুমিয়ে পড়ছিলা নাকি? আহা! তোমার ঘুম ভাঙ্গাইলাম।

না না অসুবিধা নাই। হুট করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম

একটা দরকারে বাধ্য হইলাম ডাকতে

জি জি বলুন না

আমাদের প্রতিবেশী, হারুন সাব, ওই যে ওই ওই পারের হলুদ দোতলাটা, অসুস্থ তো ছিলই, আজকে অবস্থা খারাপ হইছে। দ্রুত হাসপাতালে নেয়া দরকার!

বাড়িওয়ালার কথা শুনে আমার হাত-পায়ে খিল ধরে আসে। ঝিম লেগে যায় চোখেমুখে। আমি বোকার মতো হাঁ করে চেয়ে থাকি তার মুখের দিকে।

আরে তোমার আবার কী হইল! ওহ ঘুম কাটে নাই বোধহয়। যাও চোখেমুখে একটু পানি দিয়া আস। হাসপাতালে নেয়া দরকার। বড্ড অসুবিধায় পড়ছে ওরা। সব তো একাই সামলায়। এখন একবারে ভাইঙ্গা পড়ছে।

আমি দ্রুত নিজেকে গুছিয়ে নিই। আজাদ সাহেবের সাথে সিঁড়ি দিয়ে নামি। দ্রুত পা চালিয়ে চলে যাই ও বাড়ির কাছে। আহা! কত কত দিন আমি মনে মনে এ বাড়ির কাছে আসতে চেয়েছি। আজ এমন হতভম্ব পরিস্থিতিতে এলাম। তাও তো আসা হলো। আপাতত মাথা কিছুই কাজ করছিল না।

ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম। সবুজ রঙের কাঠের দরজা। বিবর্ণ কলিংবেলের সুইচ। বাড়িওয়ালা সেটা একবার টিপে ধরতেই দরজা খুলে দিল বিনু।

হ্যাঁ বিনু, আমার বিনু। পরনে কামিজ-সালোয়ার, গোলাপি ওড়না। চুলগুলো এলোমেলো পড়ে আছে পিঠের ওপর। শুকনো চিন্তিত মুখ। আমাদের ভেতরে নিয়ে আসতে আসতে বলল- খুব তাড়াতাড়ি নিতে হবে। বড্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।

হ্যাঁ হ্যাঁ আমি রহমান ক্লিনিকের অ্যাম্বুলেন্সটা আসতে কইছি। চিন্তা কইরেন না, আজাদ সাহেব বলেন।

আমরা ভেতরের ঘরে আসি। সেই রোগা ভদ্রলোক শুয়ে আছেন একটা বড় খাটে। শ্বাসকষ্টের দমকে তার বুকটা হাঁপরের মতো উঠছে আর নামছে। ছোট মেয়েটা একপাশে দাঁড়িয়ে আছে চুপ করে। বিনু আমাদের বসতে বলে একটা ছোট ব্যাগে এটা-ওটা ঢোকাতে থাকে।

আজাদ সাহেব পাশে রাখা চেয়ার বসেন। আমি সরে আসি। ঘরের সাথেই সেই ঝুল বারান্দা, গাছে ছাওয়া। আমার ছাদ থেকে রোজ যে বারান্দা আর বিনুকে দেখি তারা আজ আমার এত কাছাকাছি। ঘটনাটা ভালো হলো, না কী হলো এখনও বুঝে উঠতে পারি না। কতক্ষণ সেখানে দাঁড়াই, জানি না। একসময় অ্যাম্বুলেন্সের হর্ন কানে আসে। আজাদ সাহেব উঠে এসে বারান্দা থেকে ঝুঁকে দেখেন। বলেন, আইসা গেছে। চলেন, রোগী তুলি।

পালকের মতো হালকা একটা শরীর ভদ্রলোকের। বোঝা যায় দীর্ঘদিন ধরে রোগে ভুগছেন। রোগটা কী তার? থাক, আস্তে আস্তে জানা যাবে সবই। রোগীকে তোলা হয়। দুই বোন আর আমি পেছনে বসি রোগীর পাশে। অক্সিজেন চালু হয়। তাতে বোধহয় ভদ্রলোক একটু স্বস্তি পান। আজাদ সাহেব সামনে বসেন ড্রাইভারের পাশে।

মফস্সল শহরে রাত এগারোটায় ঘুটঘুটে আঁধার থাকে। আজ চাঁদ আছে আকাশে। তারই নীলচে আলোয় চারপাশ ভরে আছে। আমি বিনুর চিন্তিত ক্লান্ত অবয়বটার দিকে সাবধানে তাকাই। সে তার গোলাপি ওড়নায় মুখ-নাক ঢেকে বসেছে, তাকিয়ে আছে রোগীর দিকে একদৃষ্টে। পাশে বসা ছোট মেয়েটার চোখ জানালার বাইরে।

আমি ভাবি, এরা যদি দু’বোন হয়, এদের মা তবে কই? নিশ্চয়ই মারা গেছে। এই ভাবনাটাই আমি ভেবে রেখেছিলাম এতদিন। কিন্তু আজ এই দুঃসময়েও তাদের কোনো আত্মীয়-পরিজন নেই। আহা! কী অসহায় এই বাপ-মেয়েদের সংসার।

এরপর সময় যায় ঘোড়ার খুরে। ভদ্রলোককে ক্লিনিকে ভর্তি করানো, ডাক্তার, ওষুধ- বিনুকে দেখি ছুটছে শুধু। আজাদ সাহেবকেও দেখি সাথে সাথে যাচ্ছেন আসছেন। আমি এর মাঝে তেমন তাল করতে পারি না। সঙ্গে সঙ্গে থেকে একসময় ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ি একটা বেঞ্চে। রাত কত হয় কে জানে! ঘণ্টা দুয়েক বাদে বাড়িওয়ালা আজাদ সাহেব আসেন। আমাকে একটা ঠ্যালা দিয়ে বলেন, ঘুমিয়ে পড়লা নাকি সাগর?

না না, কী অবস্থা এখন?

অবস্থা একটু ভালো। আজ রাতটা রাখবে কইছে। কাল বড় ডাক্তার আইসা যা সিদ্ধান্ত নিবার নিবে। চল আমরা এবার যাই।

আজাদ সাহেবের পিছু পিছু বেরিয়ে আসি হাসপাতালের করিডোর ধরে। খুব ইচ্ছে করে একবার বিনুর সাথে দেখা করে আসি। দুটো কথা বলে আসি। ওর আর কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করে আসি, পারি না। যেহেতু আমি মুখচোরা, যেহেতু আমি অন্তর্মুখী, যেহেতু আমি যা করতে চাই, যা বলতে চাই, তার কিছুই করতে বা বলতে পারি না।

ফেরার পথে একটা রিকশা নিই। আজাদ সাহেব হাই তোলেন। বলেন, ভালোয় ভালোয় রাতটা কাটলেই অয়।

ওনার অসুখটা কী?

আমি জিজ্ঞেস করি।

লিভার সিরোসিস। প্রায় এক বছর হইল ভুগতাছে। এর আগেও এমন অবস্থা খারাপ হইছিল, এবার হয়তো আর বাঁচানো যাইত না।

ওনার আত্মীয়স্বজনকে খবর দেওয়া দরকার না? কাউকে তো দেখলাম না

আত্মীয় আর আছেডা কে? ওই তো এক অল্প বয়সের বউ। সেই তো টাইনা নিয়া চলতাছে।

বউ!

বুকের মধ্যে শক্ত এক হাতুড়ির বাড়ি পড়ে।

কে বউ? কার?

আরে ওই অল্প বয়সের মেয়েটা, বিনু, বছর দুয়েক আগে এই মেয়েরেই বিয়া কইরা আনছিলেন হারুন সাব। তার কিছুদিন পরই তো অসুখটা ধরা পড়ল।

আমি নির্বাক তাকাই। হয়তো ভুলেই যাই কী বলতে হবে কিংবা কথা বলবার আর কিছুই পাই না। কিংবা এও হতে পারে আর কোনো কথা বলবার কোনো কারণ খুঁজে পাই না।

বাড়িওয়ালা বলে চলেন, মেয়েটা বড় অসহায় ছিল। হারুন সাহেব তো বরাবর রোগে ভোগা লোকই। জানতেন ঠিকই, স্বাস্থ্য ভালো যাইতাছে না। তবু বিয়া করলেন। হয়তো সেবা করার লোকই খুঁজতাছিলেন। মেয়েটার তো তিন কুলে কেউ নাই ওই ছোটবোনটা ছাড়া। বিয়ের পর বোন নিয়াই এসে উডছিল ওই বাড়িতে। কী আর করবে?

একটু থামেন আজাদ সাহেব। একটা ছোট শ্বাস ফেলে ফের বলতে শুরু করেন, চাকরিও নিল বউটা। হারুন সাব তো কাজেও যাইতে পারেন না। ঠিকাদারি করতেন। গত এক বছর ধইরা আয়-রোজগার বন্ধ। অল্প সয়স¤পত্তি আর বিনুর বেতনের টাকাডাই সম্বল। বড় মায়া হয় মেয়েটার জন্য। গরিবের মেয়ে।

কথা শেষ করে পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মোছেন আজাদ সাহেব। একবার মাথা উঁচিয়ে আকাশও দেখেন।

আমিও তাকাই। আকাশে মস্ত চাঁদ উঠেছে। মফস্সল শহরে রাত দুটো মানে একেবারে সুনসান। ভাগ্যিস চাঁদটা আছে। আমি চাঁদ দেখতে দেখতে যাই। আমাদের রিকশাখানা চাঁদের পায়ে পায়ে সামনে এগোয়, আলো অন্ধকারে, বাড়ির দিকে।

শারমিন শামস্ : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : রাজিব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares