গল্প : আয়না চটুই : আবু হেনা মোস্তফা এনাম

আবু হেনা মোস্তফা এনাম ।।

সন্ধ্যাটির এ রকম একটি কৌতুক তৈরি হয়। তা যেমন নীরব এবং আঁধারের অস্তিত্বের মতো হাসি লুপ্ত করে। সন্ধ্যাটির এমন ছায়া-ছায়া আঁধারে চটুইয়ের মাথা দোলানোর এমন কী অর্থ যে আবিষ্কার করতে না পারলে লোকেরা, এই ডাউনটাউনের আঁটিআম গাছের তলায়, মুচকি হাসে। মাত্র এ-ই যা!

চটুই ভাবে সবই এদের ভংচং। এই মুচকি গোঁফে হাসি, এতেই এদের মনের হারামজাদা! আর চটুইয়ের নামের মধ্যেই উড়ালের আকাশ ছিল; আর তার গরু, গরুর গোয়াল, খড়বিচালি, চরাট, আর গরুর চোখের ভেতর একটি মুখের অস্ফুট জ্যোৎস্না। জ্যোৎস্নায় গরুর চোখের ভেতর সে ভ্রমণ করে, প্রতিদিন মাথা দুলিয়ে গান গায়, কচিৎ চিৎপটাং ঘুমায় সোনালি খড়ের বিকেলে। গরুর জাবনা আর খড়বিচালির টুকরোর ভেতর তার বিড়বিড় গানের সুর সোনালি বিকেল আর তার শরীরে যে আনন্দ, তখন সে গরুর গলায় বাঁধা ঘণ্টির মতো মাথা দোলায় সারাদিন, সে গরুর চোখের ছলছল শিশিরের ভেতর তেরছা আয়না ঝিলমিল। সে দেখে গরুর চোখে পৃথিবীর সকল আয়নাশিশির আলোর অনুভূতি নিয়ে তার শরীরে। সে দেখে গরুর আয়নাচোখে, যখন দিন যখন রাত যখন দুপুর যখন বিকেল গোধূলির দিকে যায়, ছলছল শিশির-আয়নাচোখের ভেতর একটা পৃথিবীর মুখ। চটুই তখন সকল মুখের ভেতর দেখতে পায় একটা মুখ, একটা মুখের দিকে পৃথিবীর সকল বিকেল গড়িয়ে উড়ন্ত ধূলির নরম জ্যোৎস্না। ধূলিজ্যোৎস্নার ভেতর সে অন্য মুখ দেখে না। একটা মুখই উজ্জ্বল এবং চিকচিক। মুখ যে নারীর, অন্য কারও অনুকরণ নয় যে, চটুইয়ের ভুল কল্পনার স্বপ্ন শেষ হয় না; আর ভংধরা লোকেরা স্বপ্ন দেখা জানে না, অথবা তারা স্বপ্ন শোনে না, অথবা কেউ বলে- যা স্বপ্ন তা দোষ। বলে স্বপ্নদোষ মানুষের চরিত্রের এ এক অন্ধকার-প্রাচীন। পাপ এবং ক্ষমাহীন। লোমকূপের গোড়ায় গোড়ায় শয়তানি হারামজাদা। এই ডাউনটাউনের লোকেরা, সন্ধ্যার কৌতুক ছড়িয়ে স্বপ্নদোষের পাপ কত প্রাচীন কত খারাপ আবিষ্কার করে।

এখন, এখানে ডাউনটাউনের লোকেরা জড় হলে আঁটিআম গাছের তলায়, সে এসব লোকের ভংচং দেখে; এবং ধীরে ধীরে তার ন্যালাভোলা বিস্ময়ের ঘোর কেটে গেলে আনন্দ পায়, হাসি হয়। প্রথমে কৌতুকই হয়েছিল, আর পরক্ষণেই লোকের কথায় গভীরতর শোকের রাজ্য শেষ হয় না; সড়কবাতি ঘিরে ঝিঁঝিপোকাদের মৃত্যু উৎসব শুরু হলে তার দুঃখ হয়, যদিও সে শোক জানে না- কত দুঃখের। দুঃখ বোঝে না- কত শোকের। সে যে চটুই, অসীম আকাশের ভেতর কণ্ঠ উচ্চারিত হওয়ার কোন শিশুকালে সে হারিয়েছে মা, হিমার্ত সন্ধ্যা বা রাতে; কোন যুদ্ধকালে হারিয়েছে সে বাবা। মা হারিয়ে গেলে মৃত্যুর শোক সে বোঝেইনি, বাবা যুদ্ধকালে হারিয়ে গেলে দেখেইনি বাবার মুখ। সে জানে কেবল মাত্র যে, বাবার মুখ লুকিয়ে গেছে যুদ্ধকালে আম বাগানের ভেতর। বাবার মুখ সে জানে গুলি খাওয়া সহস্র মুখের গল্পে; বাবার মুখ তখন অন্তহীন আকাশের ভেতর সহস্র নক্ষত্রের বিস্ময়ে শিশুর নির্বোধ ব্যাকুলতা পেয়েছিল। মা হারিয়ে বাবা হারিয়ে সে শোক হারিয়েছে; অথবা বোঝেইনি কখনও সে, শোকের অন্তহীন সুর ও ধ্বনি। সে জানে কেবল কল্পনার বিস্ময়ের ভেতর স্বপ্ন, স্বপ্নের বিস্ময়ের ভেতর গরুর চোখের ছলছল আয়নাশিশিরÑআয়নার ভেতর তার উড়ালের অস্ফুট আকাশ, সহস্র চাঁদ।

ক্রমশ ভিড় জমে যাওয়া, কিন্তু চটুইয়ের উদাসীন এবং স্বাভাবিক আড়ষ্ট বিস্ময়ের কথাই তো হচ্ছিল। তার অবাক আনন্দ কিংবা অনুশোচনার কোনো চিহ্ন ন্যালাভোলা হাসির ঝুল কাটাকাটি মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ির আঁধারে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। হয়ত, এমনই, সে কি নির্বিকার! ভিড় লোকেরা বলে কত পাপ জমেছে তার- ক্ষমার অযোগ্য। লোকেরা বলে যুদ্ধকালে শহিদ বাবার নাম সে ডুবিয়েছে কত অন্ধকারে- তার শাস্তি হোক, কাঁচা কঞ্চির একশ’ আঘাত। ভিড় লোকের এসব কথার ভেতর সে কোনো সুর খুঁজে না পেলে, কী করবে সে এখন। তাকে দেখতে বা তারই জন্য এমন, এই যে, এই ডাউনটাউন অথবা গ্রামই বলা চলে; কেননা এই ডাউনটাউনের পেটের ভেতর দিয়ে কালো রাস্তায় প্রায়শই ট্যুরিস্টের দল আসে, পনেরো কিলোমিটার দূরে আঁধার-আঁধার আমবাগানের ভেতর স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ দেখার কৌতূহলে কিংবা লর্ড ক্লাইভের নীলকুঠি দেখতে; হয়ত-বা এখানে, এই ডাউনটাউনের বিলুপ্ত ধূলির ভেতর লোকের ভিড়ই হুমড়ি খেয়ে সংকীর্ণ। চটুই ভিড়ের দিকে তাকিয়েছিল।

কিন্তু চটুই ভিড়ের কথাই ভাবছিল, আর সে কখনও ট্যুরিস্টদের অনুগামী নয়; যারা শামসুজ্জোহা পার্কের সবুজ ঘাসের ভেতর যুদ্ধকালের গল্পে অশ্রুর স্বাদ আনে, ঢেঁকুর তোলে, এইসব ট্যুরিস্ট এবং অভ্যাগতদের নিয়ে সাদা কবুতর ওড়ায়, গান করে; বিকেল অথবা বলে যে, গোধূলির ভেতর, চেনা মুখগুলো চটুইয়ের অচেনা, অথবা সমীহ সে বোঝে না, ভয় হয়েছিল তার। সে এখন, ভিড়ের মুখগুলো দেখে- মুখগুলো তার মনে হয় মুখ নয়, এক একটা নাম, এক একটা শব্দের আকার নিয়ে ভিড় করে আছে, অস্পষ্ট ছায়ার মতো নিঃশব্দ। তবু সে দেখে, এসব ছায়ামুখের গলায় ঝুলন্ত থলথলে চামড়া, কিন্তু ঝুলন্ত চামড়া নামসর্বস্বই বা কেন- গরুর গলায় কম্বলের অলসতা গেঁথে যখন। নামসর্বস্ব হলেও এসব নামশব্দ বাংলা ভাষার, তবু ভাষার অন্তরের সুর ও ধ্বনি এক কথায়, চটুই বরং নীলকুঠির দেয়ালে ঝুলন্ত লর্ড ক্লাইভের পোষা খচ্চরের ছবি মনে পড়ে। আর তার গরুর গলায় কেমন আদুরে কম্বল, জড়িয়ে ধরলে আরামে শরীর অলস ঝিমঝিম আর সে একটা আস্ত বোকাই। আব্দুল বলে বেকাই- যে তার বন্ধু, যে চতুর, হয় আর এক রাখাল। আর গরুর গলার কম্বল জড়িয়ে আব্দুল মেয়েদের স্তনের নরম অনুভব করে, সোনালি খড়ের নির্জন মাঠে তখন সে দেখে গরুর চোখের ভেতর উড়ে যাচ্ছে মেঘ, উড়ে যাচ্ছে পাখি; দেখে ছলছল চোখের ভেতর শিশিরে ভেজা একটি মুখ- ঘাসের জ্যোৎস্নায় হারিয়ে যাওয়া মা, চাঁদে চলে যাওয়া মা। তখন সে গরুর আয়নাচোখে চোখ হারিয়ে গান করে- আকাশে চাঁদের গান, চাঁদে মায়ের গান। গানের ভেতর সে মাকে পায়, আয়নাচোখের ভেতর সে মাকে পায়। গরুকে তার মা মনে হয়।

চটুই ভিড়ের কথাই ভাবছিল; আর ভিড়ের অন্ধকারে কি চাঁদ উঠেছিল, লেবু ফুলের গন্ধ এসেছিল? একবার তার গরুর আয়নাচোখের দিকে দেখতে ইচ্ছে করে। সে ভিড়ের মুখগুলো দেখে, ভিড়ের মধ্যে গরুর গলায় কম্বল ন্যাতানো লিঙ্গের মতো ঝুলছে। ভিড়ের ভেতর গরুমুখগুলোর চোখ খুঁজে পায় না সে। তাহলে কীভাবে সে দেখবে পৃথিবীর মুখ! কীভাবে দেখবে সে ধূলির নরম জ্যোৎস্নার ভেতর মায়ের চাঁদমুখ। যেমন দেখেছিল সে একরাতে এক জ্যোৎস্নায় এক নিঃশব্দ অশ্রুর শিশিরে আকলিমার মুখ- যে মুখ সে প্রতিদিন দেখে বাড়িতে, উঠোনে, হাঁড়িপাতিল মাজায়, ভাতের শানকি এগিয়ে দেওয়ায়। তবু এক রাতে শিশিরের নিঃশব্দে আকলিমার হৃদয়ে ঝরেছিল চাঁদের শোক, তার চোখের নিঃশব্দ শিশিরে চাঁদ ভেসে এলে চটুই দেখে তবে আকলিমারও আছে আয়নাশিশির! তখন চটুইয়ের কী যে হয়, সে তার ট্যাঁক থেকে ছোট্ট আয়না বের করে আকলিমার শিশিরচোখের সামনে ধরে। আকলিমা দেখে আয়নার ভেতর আকাশনীলের উৎসব আর সোনালি খড়ের অন্তহীন বিকেল। আয়নার ভেতর গোলাপবাগান, প্রজাপতির ঝাঁক উড়ছে উড়ছে উড়ছে গোলাপবিকেলে; একটা গোলাপ প্রজাপতি নেচে নেচে উৎফুল্ল স্পন্দনে আয়নার বাইরে রাতের কানা অন্ধকারে উড়ে গেলে বিস্ময়ে আকলিমা চুপ। তার আনন্দ হয় কী যে। আনন্দে তার চোখে পুনরায় ছলছল শিশির। তার এই বিস্ময়ের ভেতর চটুই দেখে আকলিমার ছলছল চোখের শিশিরে তার মা গরুর চোখে চাঁদ হয়ে আছে। তখন, অতঃপর থেকে, বাড়িতে দেখে আকলিমার হাঁড়িপাতিল মাজা, গোয়াল ঝাঁট দেওয়া আর সে বাড়িতে কাজের ঝি থাকে না। চটুই দেখে গরু চরানো খড়বিচালি কাটা আর সে রাখাল থাকে না। চটুই বোকাই হয়েছিল, তখন, অতঃপর সে গরুর চোখের ভেতর দেখে আকলিমা সোনালি খড়ের গন্ধে ভরপুর। সে দেখে গরুর আয়নাচোখের ভেতর তার মা আর আকলিমা পৃথিবীর মুখ চাঁদ হয়ে আছে। তখন, আকলিমা চাঁদের নিঃশব্দে কেন কেঁদেছিল, আর আলাভোলা ভোদাই চটুইয়ের মনে এই কান্না সংক্রামিত হলে সে ঘুমিয়ে পড়া গরুর গলা জড়িয়ে ধরে; আর তখন, ক্রমশ সে সংক্রমিত কান্নার শোকের ভেতর, চটুই নিজের শরীরে নতুন এক বিস্ময়ে পুনরায় বোকাই। তখন তার বন্ধু রাখাল আব্দুলের কথা মনে পড়ে, তার খাড়া অঙ্গের অস্তিত্ব দেখে সে লজ্জা অথবা পুলকিত হয়েছিল এই স্মৃতি তাকে রোমাঞ্চিত করে এবং গরুর গলায় কম্বলের নরমে তার ভেতর সোনালি খড়ের নির্জন মাঠের বিস্ময় জেগে ওঠে। সে শরীরের সকল বিস্ময় গৌরব আনন্দ ও চাঁদ নিয়ে গোয়াল থেকে বেরিয়ে দেখে আকলিমা শিশিরচোখ মুছে চলে যাচ্ছে তার ঘরে। ঘাসের জ্যোৎস্নায় আকলিমার পায়ের গন্ধ। চটুই শরীরে গনগনে দুপুরের উত্থান নিয়ে আকলিমার পায়ের গন্ধ দেখে, সে প্রথম এই নতুন গন্ধে পৃথিবীর মুখের দিকে তাকিয়ে শরীরের উত্থান অনুভব করে, ঘুমের ভেতর তাকিয়ে শরীরের আনন্দ, স্পর্শের ভেতর দেখে শরীরের ভেতর রয়েছে শরীরের সকল বিস্ময়।

শরীরে সকল বিস্ময় নিয়ে, চটুই ভিড়ের কথাই ভাবছিল, সে তখন তার গরুর পাল নিয়ে মাঠের দিকে যায় গরু চরাতে; এবং আজ তার আনন্দ, আনন্দের আয়না। সে তখন বারবার গরুর আয়নাচোখের দিকে তাকায় ভিড়ের কোলাহলের বাইরে- এখানে মানুষ নেই, মাঠের প্রান্ত। সে দেখে গরুর আয়নাচোখে মেঘ উড়ে যাচ্ছে, পাখি ভেসে যাচ্ছে গানে- ভিড়ের সম্পর্ক অনেক দূরের, দিগন্তগোধূলির দিকে। ডাউনটাউনের লোকেরা দেখে, চটুই মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে গান করে নিজের মনে- আয়না নিবি/গয়না নিবি/হিমানি নিবি/চিরুনি নিবি…

গাইতে গাইতে চটুই গরুর পাল নিয়ে, সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মসজিদ কাঁসারিপাড়া বিনিময় করা মল্লিকবাড়ি পুরোনো ভাঙা মন্দির পার হলে ডাউনটাউনের লোকেরা চায়ের দোকানে তখন। সরকারি বালক বিদ্যালয়ের ফুটবল মাঠের ভাঙা দেয়াল ঘেঁষে চায়ের দোকানে কত কত সকাল, কত কত দুপুর, কত কত সন্ধ্যা, কত কত রাত তারা আড্ডা ভালোবাসে। তারা তাদের প্যান্টের পকেটের চিপায় আড্ডা জমা রাখে, লুঙ্গির ট্যাঁকের ভেতর আড্ডা ঘুম পাড়ায়, চায়ের দোকানের টিনের চালের অন্ধকারে আড্ডা লুকিয়ে রাখে, আর তখন সন্ধ্যা। আর তখন রাত। সন্ধ্যা আর রাতের তখন আঁধারে জোনাকি-উৎসব। জোনাকি-উৎসবের জন্য আঁধারের প্রহেলিকাই হয়ত নামে ফুটবল মাঠে। তখন ফুটবল মাঠের কোনায় কোনায় ডাউনটাউনের লোকেদের মুখ জোনাকি ভালোবাসে। তাদের মুখে রাতের প্রহেলিকায় জোনাকি জ¦লে ওঠে। প্যান্টের পকেটের চিপা অথবা লুঙ্গির ট্যাঁকের ভেতর অথবা চায়ের দোকানের টিনের চালের অন্ধকার থেকে এসব জোনাকি তাদের মুখে মুখে জ¦লে উঠলে চটুই দেখে চাঁদ ডুবে গেছে। সে গরুর চোখের ভেতর চাঁদ খুঁজে নেয়। সে গরুর চোখে রাতের শিশির সন্ধান করে- আব্দুল বলে, শালা তুই একটা গাছ বোকাই, পাগলের গুষ্টি, লোকে অ্যামনেই তোকে পাগল বুলে। আর সত্যিই, চটুই হাসে আলাভোলা; আর সত্যিই যে, তার পায়ের আঙুল নেই। আঙুল নেই, তবে সে হাঁটে কীভাবে? আঙুল নেই, তবে তার পা গরুর খুরের মতো গোল- এই সাদৃশ্য আবিষ্কারে সে বিস্ময়ে আনন্দে মাটিতে গড়াগড়ি দেয়। এতদিন কেন তবে সে দেখেনি তার গরুর খুর-পা। গড়াগড়ির ভেতর মাটিতে সে গরুর খুরের গন্ধ পায়। খুরের গন্ধ তার শরীরের ভেতর ছড়িয়ে গেলে সে দেখে গরুর খুরের ধূলিগোধূলির ভেতর পৃথিবীর মুখ। সে দেখে গরুর খুরের ধূলিগোধূলির ভেতর শস্যের শব্দ, পাকা ফসলের ঝনঝন গান। তখন, পৃথিবীর সকল গরুর খুরের শব্দ চটুইয়ের শরীরে ছড়িয়ে গেলে তার শরীরে খুরের ধূলি, তার শরীরে শস্যের ধূলি, তার পায়ে পৃথিবীর ধূলিজ্যোৎস্নার অনুভূতি নিয়ে সে গরুর চোখের ভেতর চাঁদ খোঁজে- চাঁদ নেই, আঁধারে জোনাকি জ¦লে উঠলে সন্ধ্যায় সাঁজালের ধোঁয়ায় সে যায় সরকারি বালক বিদ্যালয়ের মাঠে। তার জানা ছিল না- বিদ্যালয়ে পৃথিবীর কত মুখ জমা আছে, কত আয়নাচোখ জমা আছে। তার জানা ছিল না- বিদ্যালয়ের মাঠে কত মার্কো পোলো আর কলম্বাস আর লর্ড ক্লাইভ ঘুমিয়ে আছে। সে যায় তার বন্ধু আব্দুলকে জোনাকি দেখাতে। সে ভাবে এত এত জোনাকি বন্ধুকে দেখিয়ে তাকে দেবে বিস্ময়, তাকে দেবে আনন্দ সুখ। তারা যায় সরকারি বালক বিদ্যালয়ের ফুটবল মাঠের মাঝখানে, আর তাদের চারদিকে জোনাকির ঝিলমিল। চটুইয়ের জানা ছিল না- জ্ঞান মানে আলো। লেখাপড়া মানে জ্ঞান। এই কথা জেনে সে বন্ধুকে নিয়ে আসে নতুন জ্ঞানের খোঁজে। তার জ্ঞান হয়, আব্দুল তাকে পুনরায় বলে- গাছ বোকাই। আব্দুল তাকে পুনরায় এই কথা বলে, আরে বোকাই গেঁজা টাইনচে বে, গন্দ পাচ্চিসনি? গেঁজা আর ডাইল! ডাইল! ডাইল! তোর মহাজন মুনে হয়? না কি তার ছেলি? চটুই কেবল আঁধার দেখে, জোনাকিদের কৌতূহল দেখে। আব্দুলের এই নতুন জ্ঞানে চটুই বিহ্বল, সে কেবল জেনেছিল গরুর খুরের ধূলির ভেতর পৃথিবীর গন্ধ, গরুর আয়নাচোখের ভেতর মায়ের মুখের গন্ধ, জেনেছিল গরুর গলায় কম্বলে জড়ানো সোনালি খড়বিচালির গন্ধ; একদিন কি সে আর তার বন্ধু আব্দুল ভাঙা মন্দিরের ভেতর পেয়েছিল প্রাচীন ইটের ভাস্কর্যে মুথা ঘাসের নোনা গন্ধ? জেনেছিল ঘাসের জ্যোৎস্নায় আকলিমার পায়ের গন্ধ। এখন, এই নতুন গন্ধের ভেতর সে কীভাবে যাবে?

নতুন গন্ধে হয়ত ঘুম আসে না চটুইয়ের, সে গোয়ালঘরে যায়, গরুর ঘুমের ভেতর গলায় কম্বলের বিছানো প্রদরে মাথা গুঁজে দেয়। সে ভাবে, আর যাবে না সে সরকারি বালক বিদ্যালয়ের মাঠে, সেখানে জোনাকির জ¦লজ¦ল আলো তার মনে কৌতূহল ও ভীতির সঞ্চার করে। কৌতূহলের চাইতে ভয়। অথবা তার কোনো কৌতূহল নেই। ভয়ই তাকে নিয়ে যায় দূরে। সরকারি বালক বিদ্যালয়ের মাঠের দূরে, জোনাকিআলোর দূরে। যতদূর সে যায়, ততদূর তার ভালো লাগে। যত যতদূর সে যায়, তত ততদূর মেঘ আর চাঁদের যাওয়া, তত ততদূর আয়নার ভেতর ভ্রমণ। তখন, রাতের আঁধার প্রহেলিকায়, তার পুনরায় বন্ধু আব্দুলের কথা মনে পড়ে এবং শরীরে সোনালি খড়ের নির্জন মাঠের অনুভূতি নিয়ে সে দাঁড়ায় ভাসমান মেঘের ঐকতানে। অতঃপর ছিন্ন মেঘের ভেতর ঘাসের জ্যোৎস্নায় লেগে থাকা আকলিমার পায়ের গন্ধ ছুঁয়ে ছুঁয়ে সে আনন্দে বিহ্বল।

উঠোনের কোনায়, হেঁসেলের সঙ্গে যদিও ঘর আকলিমার, কঞ্চির বেড়ার ফাঁকফোকরে আধখানা চাঁদ ঝোলে; যেন আকলিমা কপাল মেলে দিয়েছে আঁধারে। চটুই হাঁটে, কপালচাঁদও হাঁটে তার সাথে। চটুই দূরে যায়, কপালচাঁদও যায় দূরে। তখন, আধখানা চাঁদকে চটুইয়ের মনে হয় গরুর খুর। আর কী আশ্চর্য, সে দূরে বা কাছে গেলে কপালচাঁদও গরুর খুর-পায়ে যায় দূরে বা কাছে। আর তখন, কী আশ্চর্য! সে গরুর খুর-পায়ে কপালচাঁদের সঙ্গে হাঁটে, আকলিমার ঘরের বেড়ার ফাঁকে আয়নাচোখ ধরলে চাঁদ চলে যায় ঘরের ভেতর। চাঁদ কী বলে তাকে, আকলিমাকে? চাঁদ কী বলে রাতে, আঁধারে? আকলিমা বাইরে এলে তারা গরুর খুর-চাঁদের দিকে তাকায়, আর দু’জনেই হাসে নীরবে, আর দু’জনেই তারা তাদের আয়নাচোখের ভেতর শিশির ঝরতে দেখে। তখন, তারা তাদের শিশিরচোখের ভেতর গরুর খুর-চাঁদের জ্যোৎস্নায় জীবনের এক অবলম্বন গড়ে তোলে। তাদের মনে হয়, তারা তাদের চারটি শিশিরচোখের সেই দৃশ্যাবৃত আহ্বান, সেই দৃষ্টিবিন্দু বিস্ফারিত, সজীব, প্রশ্নকাতর, উজ্জ্বল, সুদূর-অপরিমেয় তার আকর্ষণ, দুর্বার তার সমর্পণ। তারা তখন শিশির-চোখে খুর-চাঁদের জ্যোৎস্নার ভেতর পুকুরপাড়ে বসে। ঘাসে ঘাসে শিশিরের অনুভূতি তাদের শরীরে ছড়িয়ে গেলে চটুই লুঙ্গির ট্যাঁকে গোঁজা ছোট্ট আয়না বের করে। সে আয়না ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চাঁদের প্রতিফলন পুকুরের স্থির পানির অতল থেকে তুলে আনে আকলিমার মুখে, চিবুকে। তখন, চটুই কী যে অবাক! আকলিমার মুখে চিবুকে আধখানা চাঁদের প্রতিফলনে সে দেখে মৃদু জ্যোৎস্নায় সেই মুখ ভাঙা মন্দিরের দেয়ালে প্রাচীন ভাস্কর্য হয়ে আছে। সেখানে আকলিমার কালচে খাঁজকাটা চোখনাকমুখে আশ্চর্য মুথা ঘাসের গন্ধ নিশ্চুপ। চটুই চুপে চুপে এক পা এক পা প্রবেশ করে মন্দিরের আঁধারে। যেন তার পায়ের শব্দে জেগে না ওঠে এই ঘুমন্ত ঘাসের জ্যোৎস্নাপুরী। অতঃপর সে বেরিয়ে আসে ধূলিভূমিরেখায়, আর দেখে তাদের জীবনে গরুর খুর-চাঁদের ধূলিজ্যোৎস্না ঘাসের গন্ধে গোধূলি হয়ে আছে। এখন তারা, তবে, এই খুর-চাঁদের গোধূলি নিয়ে রাত নিয়ে কী করবে? এখন তবে, তারা, আয়নাচাঁদের ভেতর নীরব। এখন তবে তারা কত কত কাল আর আয়নাচাঁদের ভেতর নীরবতা সমস্ত কথার অন্তহীন উৎস হয়ে থাকে। তখন, তারা একদিন জানতে চায়, এই আয়না সে কোথায় পেল? এই প্রশ্নকাতর দৃশ্যে চটুই কী বলবে, সে হাসে মেঘের নিঃশব্দে, সে ঘাসের ফুল ছেঁড়ে রাতের গন্ধে। চটুই ভাবে, তাই তো! এই আয়না সে কোথায় পেল? তখন সে আয়নায় গরুর খুর-চাঁদের আলোছায়ার তরঙ্গ খেলা করে। তার ভালো লাগে এই খেলায়।

তখন, তাদের দু’জনের ভালো লাগা শরীরের ভেতর বয়ে চটুই গরুর পাল নিয়ে মাঠে যায়। মাঠ তার পায়ের নিচে, গরুর খুরের নিচে। গরুর খুরে-খুরে মাঠের ধূলি উড়ে উড়ে চলে যায় তার আঙুলশূন্য গোল পায়ের ভেতর। এইসব ধূলির অনুভূতি নিয়ে গরুর পালের সঙ্গে ঘাসের ভেতর সোনালি খড়ের ভেতর সে গড়াগড়ি দেয়। আর ভাবে, তাই তো! এই আয়না সে কোথায় পেল? কোথায় পেল সে এই আয়না? এই প্রশ্নকাতর দৃশ্যের ভেতর কৌতুক ছিল না, ছিল ভাষা খুঁজে না পাওয়া তাদের ভালো লাগার নীরব ব্যাকুলতা; চটুই এই ব্যাকুলতার ভেতর গড়াগড়ি খায়, গড়াগড়ি হাসে। ট্যাঁকে গোঁজা আয়নার ভেতর সে উড়তে থাকে। তার নামের মধ্যেই উড়ালের আকাশ! তখন, সে গরুর চোখের দিকে তাকালে, তার বন্ধু আব্দুল দেখে যে, চটুই গরুর আয়নাচোখের ভেতর উড়ছে আকাশে। চটুই আকাশে ওড়ে আর কালো কালো মেঘ উড়ে ছায়া-ছায়া নরম নীল আলো ছড়িয়ে পড়ে। চটুই আকাশের অনেক দূর উড়ে গেলে তাকে একটা নীল পাখির মতো দেখায়। গরুর আয়নাচোখের ভেতর চটুইকে এভাবে উড়তে দেখে আব্দুল তাকে ডাকে, বলেÑ বোকাইয়ের হলু কী, নেইমি আয় বোকাই! চটুই নেমে আসে, আর তারা দেখে তাদের গরুগুলো সোনালি খড়ের ভেতর একটা গোল পরিসর রচনা করে হেঁটে চলেছে অন্তহীন। চলমান গরুদের গোল প্রাচীর তখন, আয়নার ভেতর গরুদের অন্তহীন আনন্দের গোল নাচ চটুইয়ের শরীর ও আঙুলশূন্য পায়ের ভেতর সঞ্চারিত হলে সে পৃথিবীর প্রাচীন জনপদে একজন নিদারুণ পরিব্রাজক। সে গরুর খুর-পায়ে হেঁটে চলে অন্তহীন অরণ্যে; নদী, শৈলভূমিরেখা ও নক্ষত্রের ভেতর। আব্দুল তখন চটুইকে ধাক্কা দেয়- কী রে বেকাই, জেগি জেগি স্বপ্ন দেখিস না কি? আব্দুলের ধাক্কা খেয়ে সে আয়নার ভেতর থেকে নেমে আসে নিস্তব্ধ দুপুরে। সে বলে, স্বপ্ন দেখা কি দুষের? তার কথা শুনে আব্দুল হেসে গড়াগড়ি- স্বপ্ন দুষের কী রে বোকাই। আব্দুল এক খেলা আবিষ্কার করে; স্বপ্নদুষ শব্দটি সে কত কত বার উচ্চারণ করে যে, এই খেলার কৌতুকে চটুই স্বপ্নের ভেতর আকলিমার কথাই ভাবছিল- সোনালি খড়ের গন্ধে সে ভরপুর, এবং তখন চটুই দেখে ঘুরতে থাকা গরুদের গোল পরিসরে সোনালি খড়ের ভেতর একটা গাভিন গরু চার পা টানটান করে বাঁবাঁবাঁ-বাঁবাঁ ডাকে; আর তার শরীরের ভেতর থেকে বের করে দেয় তুলতুলে একটা বাছুর। চটুই দেখে আকলিমা আর তার ভেতর জন্ম নেওয়া ধূসর ধূলি রঙের বাছুরটা টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালে সে পুনরায় গড়াগড়ি দেয়, তখন, আব্দুল বলে- সে কীভাবে ওড়ে আকাশে? চটুই এইসব প্রশ্নকাতর দৃশ্যে নির্বিকার; এবং সে ভাবে, তাই তো! কীভাবে সে ওড়ে আকাশে? এবং ভংধরা লোকেরা স্বপ্ন দেখা অজানা থাকলে স্বপ্নদোষ কত খারাপ আবিষ্কার করে।

তখন, সোনালি খড়ের মাঠে বিকেল নেমে এলে চটুই আর তার বন্ধু আব্দুল গরুর পাল নিয়ে বাড়ি ফেরে। চটুইয়ের কোলে নতুন বাছুর, তার কল্পনা ও স্বপ্নের অন্তর্গত ধূলিজ্যোৎস্নার ভেতর আনন্দ সূচিত হলে সে রাতের পুকুরে স্থির পানির অতলে চাঁদের প্রতিবিম্বের কাছে অন্তহীন প্রতীক্ষা অনুভব করে। রাতের সকল আঁধারপ্রস্তুতির ভেতর পুকুরের স্থির পানিতে চাঁদ ফুটলে বলে! এই নাও চাঁদফুল আকলিমার কপালে, এই নাও চাঁদফুল বাছুরের কপালে। অতঃপর তাদের দু’জনের রাতের ভেতর নতুন বাছুর অনিবার্য এক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এবং তাদের মনে হয়, নির্বাক পশুর চঞ্চল জীবনের ভেতর তাদের স্বপ্নকল্পনার বিস্তার ঘটে চলেছে আর তারা এই পশুর আচরণের ভেতর বসবাসে ক্রমশ সহজ ও স্বচ্ছন্দ হয়ে ওঠে। দিনের আলোয় পুকুরপাড়ে আম কাঁঠাল হিজল তমালের ঝোপজঙ্গলে বাছুর লাফিয়ে লাফিয়ে গেলে আকলিমা হাঁড়িপাতিল মাজা ফেলে ছুটে যায়, বাছুরের গলা জড়িয়ে ধরে; সে যেন চাঁদবালিকা- কোমল চাঁদফুলের মালা ঝুলছে বাছুরের গলায়। সেখানে গাছের ডাল-পাতার ছায়ায় ফুলগুচ্ছকে, ফুলের সহিষ্ণুতার ভেতর পতঙ্গ ও প্রজাপতিকে, পতঙ্গ ও প্রজাপতির ওড়াউড়ির ভেতর ফুলের প্রস্ফুটিত রেণুসমূহের উদ্ভবে নীল নীল নীল নীল ছায়াকে গাছগাছালির সবুজে নির্বাক করে। ডাউনটাউনের লোকের এইসব দৃশ্যে বিস্ময় হলে তাদের মনে হয়, গরুর জীবনই এক সৌন্দর্য বটে, এবং একদিন চটুই নারকেল পাতার সবুজ কণ্ঠহার বানিয়ে বাছুরের গলায় বেঁধে দিলে লোকেরা দেখে নারকেল পাতার ফাঁকে জেগে থাকা জ্যোৎস্নায় আকলিমার হাতে গলায় পাতার অলঙ্কার। তখন তাদের ঈর্ষা হয়। তাদের বিস্ময়ের ঘোর কেটে গেলে তারা গরুর বাছুরের সঙ্গে এই যুবক-যুবতীর সম্পর্ক আবিষ্কার করে। লোকেরা কেউ কেউ বলে, এসব বেহায়াপনা; তারা চটুইয়ের সরল আলাভোলা জীবনের আড়ালে ভিন্ন অর্থ খোঁজে আর মহাজনের কাছে এমন বেলেল্লাপনা বন্ধের কথা বলে।

তখন, একদিন রাতের সকল গৌরবের ভেতর চটুইয়ের স্বপ্নকল্পনা অন্তহীন। অন্তহীন প্রতীক্ষার ভেতর রাত দীর্ঘ হলে, চাঁদের ভ্রমণ দীর্ঘ হলে, একা একা কী করবে চটুই। এখন, রাতের গৌরবে, আকলিমা কোথায়? নতুন বাছুরের শৈশবের ভেতর সে না এলে এসব পাতার সবুজ অলঙ্কার কোথায় রাখবে? তখন চটুইয়ের শরীরের ভেতর পুকুর। পুকুরে মৃত গোলাপপ্রজাপতি, পুকুরে মৃত চাঁদ, পুকুরে মা গরুর মৃত চোখ তাকে ডাকে। কিন্তু সে একা কীভাবে নামবে পুকুরের চাঁদে? কীভাবে সে একা যাবে পুকুরের জলজ ছায়ায় গোলাপ প্রজাপতির শরীরে? সে তো একা কোথাও যায়নি কখনও, হাঁটেনি পৃথিবীর পথে কখনও, পৃথিবীর পুকুরে কখনও। তার আঙুলশূন্য খুর-পায়ে সে হেঁটেছে গরুদের সঙ্গে গরুদের সভ্যতায়, গরুদের খুর-ধূলির পৃথিবীতে। কিন্তু এখন সে কীভাবে একা হাঁটবে আকলিমার কঞ্চিঘেরা ঘরের চাঁদে। এইসব দ্বিধা ও শোকের অন্তহীনে চটুই দিশেহারা, তখন, প্রতীক্ষার অন্তহীন ছায়ার ভেতর সে নারকেল পাতার অলঙ্কার পুকুরে ভাসিয়ে দেয়, এসব সবুজ অলঙ্কার মৃদু জ্যোৎস্নায় সৃষ্ট ছোট ছোট তরঙ্গে ভেসে গেলে পাখি ডাকে, পাখির ডাক শূন্যে উড়ে যায়। প্রতীক্ষার ছায়ার ভেতর বাসি সাঁজালের গন্ধ, হয়ত, সে ফিরে আসে ঘরে মুখ ভার ভোরে।

সে মন খারাপ নিয়ে আজ যাবে মাঠে, আলো না ফুটতেই। আজ আঁধার থাকুক এখানে, এই উঠোনে, এই পুকুরের স্থির ছায়ায়। সে চায়-আঁধারের প্রহেলিকা আজ ছড়িয়ে যাক পৃথিবীর পথে পথে, মাঠের চাঁদে চাঁদে। সে চায়-আঁধার থাকুক সরকারি বালক বিদ্যালয়ে আর তার বন্ধু আব্দুলের চোখে। চটুইয়ের মনে হয়, যদি সে বন্ধু, তবে সে কেন জানে না তার মন; সে যদি বন্ধু, তবে কেন জানে না সে তার দুঃখ। এখন সে চায়- আঁধারে কুড়াবে ফসলের গন্ধ, শিশিরের শব্দে সে যাবে দূরে। আর সে আঁধারে তুলে নেবে চাঁদের প্রতিফলন, নারকেল পাতার স্মৃতি। আঁধার থাকুক আঁধারে, আঁধারে সে কুড়াবে আঁধারের নিঃশব্দ-একাকিত্ব। তবু একা একা দুর্দমনীয় দুঃখের অনুভূতি তার পায়ে জড়িয়ে গেলে সে পুনরায় দেখে কঞ্চিঘেরা চাঁদ- নিস্তব্ধ। তবে সে আজ মাঠে যাবে মন খারাপ নিয়ে, ভাতের শানকি সে ছোঁবে না। সে মাঠে যায় আলো আর আঁধারের দিগন্তপ্রহেলিকায়, গরুর খুরের দোফালি চাঁদ পড়ে থাকে কঞ্চির গায়ে।

তখন একদিন যায়, বিকেলের খুর-ধূলির গোধূলিদিগন্তে রাত আসে। প্রতিদিন রাত, তখন এবং এখনও। এখনও, কেবল এখনই বা কেন, তখন রাত্রির গভীরে পৃথিবীর নিশ্চুপ নক্ষত্রেরা দেখে চটুইয়ের নতুন বাছুর তিড়িংবিড়িং নাচতে নাচতে ভেঙে দিচ্ছে পৃথিবীর তিন ভাগ জলে চাঁদের শরীর। বাছুরের পায়ের ছোট কচি খুরগুলো নেচে নেচে ঘাসের জ্যোৎস্না ভেঙে চাঁদ ভেঙে আকলিমার পায়ের গন্ধ ছুঁয়ে ছুঁয়ে কঞ্চির বেড়ার কাছে যায়। সে মাথা নাড়ে চটুইয়ের মতো। বাছুরের গলায় নারকেল পাতার সবুজ অলঙ্কার মৃদু বাজে ঝুমঝুম। বাছুর চটুইয়ের শোক ভুলিয়ে দেয় ঝুমঝুম, বাছুরের তিড়িংবিড়িং নাচ তাকে নিয়ে যায় জ্যোৎস্নায় ঝুমঝুম। কচি খুর-পায়ে বাছুর লাফায় ঝুমঝুম, চটুই মন খারাপ ভুলে লাফিয়ে পড়ে ধূলিজ্যোৎস্নায়। রাত বাছুরের খুব প্রিয়- সে জাগে চাঁদের সাথে সাথে। জ্যোৎস্নায় সে নাচে- চটুই চোখ মেলে বসে থাকে বাছুরের নাচের ছায়ায়। বাছুর একবার নাচে, দুইবার নাচে, তিনবার নাচে- তার নাচের শব্দে তবু চাঁদ নির্বাক। সে চারবার নাচে, পাঁচবার নাচে- তার নাচের শব্দে তবু কঞ্চির বেড়ার ফাঁকে চাঁদ ওঠে না। তখন আঁধারপ্রহেলিকায় চটুই দেখে বাছুরের নাচের শব্দে কান্নার অবিরাম ধ্বনির প্রবাহ বয়ে যায়। বাছুরের কচি খুরের নাচ চটুইয়ের আঙুলশূন্য পায়ের অনুভূতির ভেতর দেখে লাল খুর-চাঁদের আর্তনাদ। তখন, বাছুর দূরে যায়, দূরে দূরে ঘুরে আসে পৃথিবীর সকল চাঁদ নিয়ে; দূরে যায়, দূরে দূরে রেখে আসে সোনালি খড়ের স্মৃতি। একদিন সে যায় দূরে, দুই দিন সে যায় দূরে দূরে, তিন দিন সে যায় আরও দূরে দূরে দূরে। দূর তার কচি খুরপায়ে সহস্র ধূলিকণা জড়িয়ে দিলে পৃথিবীর সকল মুখ চটুইয়ের আয়নার ভেতর আঁকা হয়ে যায়। তবু পৃথিবীর সকল দূর বাছুরের কচি খুর-ধ্বনি শোনেনি, বোঝেনি। দেখেনি সে পৃথিবীর দূরতম রক্তস্রোত। বাছুর তখন পৃথিবীর দূরতম আঁধারে তিড়িংবিড়িং নেচে গেলে চটুই তাকে দেখে না, সে তখন ঘাসের জ্যোৎস্নায় আকলিমার পায়ের গন্ধ ছুঁয়ে ছুঁয়ে কঞ্চির বেড়ার কাছে যায় বাছুরের খোঁজে। না কি সে গিয়েছিল দূরতম কোনো অস্ফুট শব্দের খোঁজে? কঞ্চির বেড়ার ফাঁকে আয়নায় চাঁদের প্রতিফলন ফেলে সে তাকায়। বেড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে ভেতরে চলে যায় বিন্দু বিন্দু চাঁদের শুকনো কলিজার মতো কালচে লাল জোনাকি, আর চটুই দেখে বিন্দু বিন্দু আলোয় বঁটির মতো আকলিমার ঝকঝকে শ্যামলা শরীর ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে আঁটিআমগাছ তলার ভিড়।

চটুই ভিড়ের কথাই ভাবছিল। আর তখন, লাল চাঁদের জোনাকি শিশিরচোখে জমা হলে তার মাথা সরকারি বালক বিদ্যালয়ের ফুটবল মাঠের সন্ধ্যা হয়ে গেছে। নিস্তব্ধ। নির্বাক। তার মাথার ভেতর জোনাকি জ¦লে-নেভে। টুকরো টুকরো আগুনের ফুলকি। কারা কারা, তারা কারা, তারা কারা কারা, চটুইয়ের মাথার ভেতর, ডাউনটাউনের লোকেরা বাছুরের কচি খুরে ধাক্কা মেরে দৌড়ে পালায়। মাথার ভেতর ভীত জোনাকিরা উড়ে আসে ঝাঁক বেঁধেÑআগুনের গোলা। চটুই যে জোনাকি ভালোবাসে, আঁধারে জোনাকিরা চাঁদে চলে গেলে সে চাঁদ ভালোবাসে। তবে জোনাকিচাঁদ আকলিমাকে ছিন্নভিন্ন করে দিলে সে কোথায় দাঁড়াবে? কতদূর যাবে পৃথিবীর পথে? তার আঙুলশূন্য পা নিয়ে সে কতদূর হাঁটবে এই ছিন্নভিন্ন শরীরের রক্তপাত থেকে দূরে? তার মনে পড়ে, সে রাতে তবে, এ জন্যই কি আকলিমা কেঁদেছিল চাঁদের নৈঃশব্দে? কারা পালিয়ে গেল চাঁদ ভেঙে, চাঁদ খেয়ে? কে পালিয়ে গেল চাঁদ খাওয়া আঁধারে? এই প্রথম চটুই দেখে চাঁদ খেয়ে ফেলা। এই প্রথম সে দেখে মানুষের শরীরের ভেতর গলে যাওয়া চাঁদের রক্তস্রোত। তার ভয় হয়েছিল। তখন সে হারিয়ে ফেলে তার সকল কথা, সকল গান, মাথার সকল দোলন। এই প্রথম তার মাথার দুলুনি স্তব্ধ। তার কান্না আসে, ভীষণ কান্নার বিভীষিকা মর্মে মর্মে তার সমস্ত অনুভূতি ও স্বপ্নকল্পনা ছিঁড়েফুঁড়ে আতঙ্কবিস্ফারিত। এই প্রথম তার কান্না পেল? এই প্রথম শোক? তখন মায়ের মুখ চাঁদের গান হয়ে এলে চাঁদ খেয়ে পালানো মুখটি তার আয়নার ভেতর ভেসে ওঠে। তখন অন্তহীন আতঙ্কের ভেতর অন্তহীন শীতের ভেতর শরীর স্নায়ুশূন্য আর মাথার ভেতর ক্রমাগত জোনাকির আর্তনাদ নিয়ে চটুই দেখে তার বাছুরের কচি খুরগুলো চামড়া ছাড়িয়ে নিয়েছে কেউ। চিবিয়ে খেয়েছে সুস্বাদু কচি খুরগুলো, গ্রীবার নরম হাড়গুলো।

এখন, তাহলে এখন, কী করবে চটুই? তার বুকের ভেতর করোটির ভেতর শোঁ শোঁ রক্তফিনকি চিৎকার করে উঠলে ছিন্নভিন্ন আলুথালু রক্তাক্ত আকলিমা কঞ্চিঘরের বাইরে আসে, সে লুটিয়ে পড়ে ঘাসের জ্যোৎস্নায়। চটুইয়ের চিৎকারে ঘুমের ভেতর ডাউনটাউনের লোকেরা দেখে ঘাসের জ্যোৎস্নায় চিকচিক করছে রক্ত। কঞ্চির বেড়ার ফাঁকে ঝুলে আছে রক্তমাখা খুর-চাঁদ। ঘাসের শিশিরে পড়ে আছে বাছুরের কচি কচি খুরের নাচÑ মৃত।

চটুইয়ের শরীর তখন বাতাসের শূন্যতা, আলোর মতো হালকা। ঘাসের জ্যোৎস্নায় আকলিমা আর তার ভেতর নতুন বাছুরের এই অবলম্বন খেয়ে পালিয়ে গেলে সে নির্বাক। নিস্তব্ধ। বাড়ির লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করে ঘটনা কী? কারা চাঁদ খেয়ে ফেলে গেছে টুকরো টুকরো কচি খুর? চটুই কোথায় ছিল? কী করছিল সে এই অন্ধকারে, কঞ্চির বেড়ার ফাঁকে? ভং ধরো, তাই না! লোকেরা বলে তার পাপ ক্ষমাহীন, বিচারে তার কঠিন শাস্তি হোক।

কী উত্তর দেবে তবে এখন চটুই? কোটরের শূন্যগর্ভ চোখে কিছুই ঢোকে না এইসব জিজ্ঞাসার। এই প্রথম সে এত এত প্রশ্নের ভেতর হুমড়ি খেয়ে দিশেহারা বোধে সংকীর্ণ। সে অস্ফুটে কিছু বলে, অথবা সে কিছুই উচ্চারণ করে না, হয়ত ঠোঁট দুটো মৃদু অনুকম্পায় থরথর কেঁপে উঠে নিথর, হয়ত চটুইয়ের কণ্ঠার হাড়ের ভেতর যন্ত্রণাকাতর বীভৎস আর্তনাদ নিদারুণ আতঙ্কে ফিসফিস। ডাউনটাউনের লোকেরা চটুইয়ের ফিসফিস উচ্চারণের অত্যন্ত নিকটে গিয়ে শোনে, কিন্তু তারা কিছুই শুনতে পায় না, শোনে ঝিঁঝির পাখার ফিসফিস। তারা চটুইকে ধমকে জিজ্ঞেস করে, ধাক্কা মারে এবং তখন, তারা পুনরায় তার ঠোঁটের কাছে যায় শ্রবণ আবিষ্কারে- এতেই তাদের বাহাদুরি। কিন্তু তারা দেখে চটুই নিদারুণ চুপ। তখন, লোকেরা তাকে মারতে মারতে নিয়ে যায়, বেঁধে রাখে গোয়ালঘরে।

গরুর গোয়ালে চটুইকে বাঁধা হলে সে দেখে ভেতরে ছায়া, ভেতরে আঁধার-চাঁদ নেই। সে ছায়াকে বলে, পথ দেখাও। আঁধারকে বলে, শরীর হও। চারদিকে আঁধার শরীর বিছিয়ে দিলে লোকেরা তার হাতের বাঁধন সম্পর্কে নিশ্চিত হয় এবং গোয়ালের দরজায় তালা ঝুলিয়ে চলে যায়। চারদিকে আঁধার শরীর ছড়িয়ে দিলে এখন চটুই চোখ খোলে। তার চোখের ভেতর গরুর ঘুমের শব্দ ঢুকে গেলে, চোনা ও গোবরের গন্ধ ঢুকে গেলে গরুর জীবন তার শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর চোখ বন্ধ করে গরুর মুতের গন্ধ তার শরীরের ভেতর, আর গরুর শরীর থেকে নেমে ঝাঁকে ঝাঁকে এঁটুল তার বুকের পশম-খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর উশকো-খুশকো চুলের ভেতর উঠে এলে চটুই একবার হাম্বা-আঁ-আঁ-আঁ ডাক দেয়। তারপর দল বেঁধে আঙুলশূন্য পায়ে সে চলে গিয়েছে খুর-চাঁদের ধূলিধূসরিত গোধূলিদিগন্তের পথে মেঘের ওপারে, তাদের নতুন বাছুরের কচি কচি খুরের নাচের শব্দ ও গন্ধের ভেতর সোনালি খড়ের অন্তহীন বিকেলে। গোলাপপ্রজাপতিরা সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে তার আর আকলিমার শরীরের ভেতর জন্ম নেওয়া নতুন বাছুরের তিড়িংবিড়িং নাচ। সে নাচতে নাচতে গোয়ালে ঢোকে, ঘুমায়।

সারাদিন নিরবচ্ছিন্ন ও মন্থর সময়ের ভেতর ধসে পড়া পুরোনো বাড়ির জানালার মতো শূন্যগর্ভ চটুই গোয়ালে দড়িতে বাঁধা গরুর অনুভূতি নিয়ে, তখন, সারাদিন কত কত লোক উঁকি দিয়ে গেছে- একাকী একটা গরু দড়িবাঁধা হাতের কনুইয়ের ভেতর মাথা গুঁজে ঘুমে। তখন দুপুরে নিস্তব্ধ রোদে, তখন দিনের ঘুমের ভেতর, তখন দিনের ক্লান্তির ভেতর, তখন দিনের অন্ধকারের ভেতর তার বন্ধু আব্দুল আসে- একাকী, চুপে। সে নীরবে বন্ধুর পাশে বসে সোনালি খড় আর গরুর গন্ধ নিয়ে। বলে, কী কইরলি বোকাই; আর বন্ধুর চোখে এখন আয়নাশিশিরের ভেতর দেখে চাঁদ খেয়ে পলানো মুখের আদলটি তার খুব চেনা মনে হয়? কচি কচি খুর চিবিয়ে পলানো শরীরের লাফটি তার খুব চেনা মনে হয়? অথবা এসবই কি আলোছায়ার ধাঁধাঁ? আব্দুল বলে, এভাবে চাঁদ খেয়ে ফেলার নাম ধর্ষণ। এই প্রথম চটুই শোনে ধর্ষণ, নাকি অসংখ্যবার শুনেছে ধর্ষণ? এই প্রথম সে দেখে ধর্ষণ, নাকি বহুবার দেখেছে ধর্ষণ? তার কান্না আসে, ভীষণ কান্নার বিভীষিকা মর্মে মর্মে তার সমস্ত অনুভূতি ও স্বপ্নকল্পনা ছিঁড়েফুঁড়ে আতঙ্কবিস্ফারিত। এই প্রথম সে কান্নার ভেতর ভিড়ের কথাই ভাবছিল। ভাবছিল কি? না কি, মাঝে মধ্যে নির্বিকার আড়ষ্টে দেখছিল ভিড়ের মুখগুলো। কত কত মুখের জঞ্জাল, কয়টা মুখ সে দেখবে? সে দেখে চাঁদ খেয়ে পালিয়ে যাওয়া মুখ চেয়ারের খোলের মধ্যে উবু হয়ে বসে। চেয়ারে বসা মুখগুলো অনেক দূরের, তারা যেন সকলে চাঁদ খেয়ে পালানো আঁধারের এক একটা মূর্তিমান বিভীষিকা। তবু সে ভিড়ের ভেতর দেখে, তার বন্ধু আব্দুলের মুখ খোঁজে। তার বন্ধু আব্দুল! আব্দুল তার বন্ধু! তার মনে হয় এই একটি মুখই তাকে নিয়ে যেতে পারে পৃথিবীর খুরধূলিপথে। অথবা যারা তাকে নিয়ে যেতে পারে দিগন্তধূলিজ্যোৎস্নার দিকে- দুটি মুখ মনে পড়ে তার। তার মা। আর তার আকলিমা। এবং সে বিস্ময়ে এখন ভাবে আকলিমার নামের ভেতর তার মা মিশে আছে। আকলি মা। আনন্দে তার গড়াগড়ি দিতে ইচ্ছে করে। তখন, সারাদিন মন্থর ও নিঃশব্দে কেটে গেলে, এখন, চটুই মাথা দোলায়। আর ভিড়ের ভেতর আঁধারে তার বন্ধু আব্দুল শিশিরচোখে শুনতে পায় চটুই ‘আয়না নিবি গয়না নিবি’ গান করে। তখন, ভিড়ের মুখগুলোর ভেংচিকাটা হাসি হারামজাদা হয়ে আছে। তারা ভেংচি কেটে চটুইয়ের শাস্তি দেয়, সদ্য কেটে আনা হলদেসবুজ কঞ্চিগুলো দেখে তাদের অপার গৌরব হয়। তখন আব্দুল কাঁদে নিঃশব্দে। মানুষের সম্পর্কের অন্তর্গত দূরত্ব এবং বীভৎসতা ভেবে তার এখন কান্না আসে, আর নীরবে সে ভিড়ের মুখগুলোর দিকে দেখে- ঘনীভূত সন্ধ্যার আঁধারে ভেসে আছে চাঁদ। মানুষের নিষ্ঠুরতা থেকে অনেক অনেক দূরে সে আকলিমার সকল স্মৃতি গরুর খুর-ধূলিজ্যোৎস্নায় মানুষের সভ্যতা নির্মাণের আনন্দ ও বেদনার অন্তর্গত বোধে জমা রাখে।

গরুর খুর-ধূলিজ্যোৎস্নায় আকলিমার মুখ জমা রাখতে রাখতে আব্দুল দেখে তার বন্ধু চটুইকে নিয়ে যাচ্ছে আঁটিআম গাছের সঙ্গে বাঁধার জন্য। আব্দুলের কী যে হয়- তার বাল্যকাল, তার কৈশোরকাল, তার যৌবনকাল মুহূর্তে তীব্র শীত হয়ে গেল। সে তখন এই প্রাচীন বৃক্ষের কাছে আশ্রয় চায়, দেখে তার বন্ধু চটুই আঙুলশূন্য গরুর খুর-পা নিয়ে উবু হয়ে ভিড়ের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তার হঠাৎ এই ঘুরে দাঁড়ানো এবং মাথা দোলানো দেখে ভিড়ের লোকেরা অবাক। তারা দেখে চটুই ধীরে ধীরে তার দুই হাত শরীরের দুই দিকে পাখির ডানার মতো প্রসারিত করে, তারপর ট্যাঁক থেকে ছোট্ট আয়না বের করে চাঁদের প্রতিফলন আনে। এ যেন তার খেলা। ভিড়ের লোকেরা দেখে চাঁদের আলোর প্রতিফলনে তাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে যায়। অতঃপর তারা চোখের ধাঁধাঁ কাটিয়ে দেখে চটুই নেই, পড়ে আছে তার আয়না।

লোকেরা আয়নার ভেতর উঁকি দিয়ে দেখে, প্রাচীন আঁটিআম গাছের শাখাপ্রশাখা আর পাতার নিসর্গে উদ্ভাসিত আধখানা চাঁদের আলোয় উড়ছে অদ্ভুত ধূলিজ্যোৎস্না। এমন ধূলিজ্যোৎস্না ডাউনটাউনের লোকেরা আগে কখনও দেখেনি। তারা দেখে, আয়নার ভেতর থেকে ওই নীলাভ ধূলিজ্যোৎস্না ডাউনটাউনের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে, অতঃপর শহর পেরিয়ে সোনালি খড়ের মাঠের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে যায় অন্তহীন পথে, দিগন্তের দূরে। আর চটুই মাথা দুলিয়ে গান গাইতে গাইতে হেঁটে চলেছে, আকলিমার হাত তার হাতের ভেতর, তাদের শরীর থেকে ঠিকরে বেরুচ্ছে নরম ঝলমল আলো, এবং ক্রমেই তাদের শরীর রূপান্তরিত ঝলমল আলোর কুয়াশায়। তাদের মাঝখানে নতুন বাছুর খুরপাচাঁদের ধূলিজ্যোৎস্নার ভেতর দূরন্ত নাচে ঝলমল।

আবু হেনা মোস্তফা এনাম : কথাসাহিত্যিক

#

সচিত্রকরণ : কাব্য কারিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares