গল্প : ডায়োজেনিস : মিলটন রহমান

মিলটন রহমান ।।

লোকটি লণ্ঠন হাতে দিনের আলো দু’ভাগ করে হেঁটে চলেছে। মাথার ওপর চল্লিশ ডিগ্রি তাপমাত্রা বিলাচ্ছে সূর্য। তার পরও আরও আলো চাই তার! প্রকৃতির আলোয় কত প্রকৃতিজ প্রাণ ও অপ্রাণের বসবাস। সেখানে মানুষ খোঁজার উপায় কী? লণ্ঠন! তাই এই লণ্ঠনই লোকটির হাতিয়ার। পিছু পিছু একটি কুকুরও তার সহচর হয়ে থাকে। এই শহরে তার পরিচয় ‘লণ্ঠন মামা’। মুখের দাঁড়ি-গোঁফ বেড়ে চলেছে অযত্নে-অবহেলায়। তবে পোশাকি ঠমকে রয়েছে ভিন্নতর মোজেজা। একহারা লম্বা গড়নের শরীরে মোটা খাদি পাঞ্জাবি, ঢোলা পাজামা। চটি জোড়া আবার আধছেঁড়া। যে লণ্ঠন তার হাতে তাতে কোনো মতেই ময়লা জমা হতে পারে না। চিমনি বারবার ন্যাকড়ামোছা করার লক্ষণ দৃশ্যমান। তিনি হেঁটে চলেন, শহরের এ রাস্তা থেকে সে রাস্তা। কেন্দ্র থেকে উপশহর কোনো এলাকা বাদ যায় না। পায়ে হেঁটেই পুরো শহর মেপে চলেন তিনি। এই শহরের রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী কিংবা চিন্তকদের কাছে লণ্ঠন মামার ভিন্ন ভিন্ন চেহারা রয়েছে। তিনি এই শ্রেণিভুক্তদের বিরাগভাজন হয়ে ওঠেন প্রায়ই। কারণ খ্যাপাটে স্বভাবের এই মানুষটি কাউকে তেমন তোয়াজ করেন না। কয়েকবার রাজনৈতিক পান্ডাদের আক্রমণের শিকারও হয়েছেন। কিছু কিছু সভা-সমাবেশে মামার দেখা মেলে। এসব অনুষ্ঠানে তিনি খাবার হাতে প্রবেশ করেন, এমন গল্পও শোনা যায়। কারও বক্তব্য পছন্দ না হলে সবার সম্মুখে টিফিনক্যারিয়ার খুলে খেতে শুরু করেন। একবার আমাদের প্রেসিডেন্ট এই শহরের বৃহৎ ইউনিভার্সিটিতে পড়তে না পারার দুঃখবিলাপ করে বক্তব্য রাখছিলেন। সেই বক্তব্যের মাঝে নাকি তিনি খেতে শুরু করেন। এত মসলাদার খাবার যে, পুরো অনুষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ল কারির গন্ধ। নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন তেড়ে এলে বলেন, ‘এই প্রেসিডেন্ট দিয়ে কী হবে, তা ভেবেই খিদে পেলো, কী করি বলো? যাও খাওয়া শেষে আমি বেরিয়ে যাবো। কাতুকুতু দেওয়া বক্তব্য আর নির্দেশনাহীন বক্তব্যে আমার লণ্ঠনে কোনো চেহারা দেখা যায় না। আমি চললাম।’ লণ্ঠন মামার এই এক বিরল স্বভাব। খাওয়া এবং ঘুমানোর জন্য তার নির্দিষ্ট কোনো স্থানের প্রয়োজন পড়ে না। যেখানে সেখানে খেতে পারেন।  ফাঁসির আসামির মতো কনডেম সেল পরিমাণ স্থানেও ঘুমোতে তার অসুবিধা হয় না। তা যে কোনো স্থানে হতে পারে। জলে-জঙ্গলে, মনুষ্য-অমনুষ্য ভাগাড়েও সমস্যা নেই। কুকুরকুণ্ডলী পাকিয়ে তার সাথে থাকা কুকুরটির মতো তিনিও ঘুমিয়ে পড়েন। কুকুরটির যেমন কোনো খাবারে অরুচি নেই, লণ্ঠন মামারও নেই। যা হাতের কাছে পান তাই খান। খাবারজাতীয় হলেই চলে। লণ্ঠন মামার নিজস্ব দর্শন আছে। তিনি নাকি কুকুরের মাঝে মানবিক আচরণ দেখতে পান। যা মানুষের মধ্যে নেই। কুকুরটি খাবারের জন্য কোনো উৎপাত করে না। আক্রমণের শিকার না হলে কাউকে কামড়ও দেয় না। লণ্ঠন মামা বলেন, ‘আমরা কুকুরের কামড় থেকে বাঁচানোর জন্য আমিই মানুষকে কামড়াতে থাকি।’ মামা কথার দাঁতে কামড়ে চলেছেন, লণ্ঠনের আলোয় ভালো মানুষ খুঁজছেন। ‘ভালো মানুষ’ কতজন পেলেন কিংবা ‘ভালো মানুষের ধরন-গড়ন সম্পর্কে কোনো হিসাব করেন না মামা। সে খবরও জানা নেই কারও। কেমন ভালো মানুষ খোঁজেন মামা, আর কেনই-বা খোঁজেন, এই প্রশ্নের উত্তর মামার সংখ্যালঘু ভক্তকুল আকুল হয়ে থাকে জানার আকাক্সক্ষায়। মামা তো আর মুখ খোলেন না। মামা কেবল দিনের আলোয় লণ্ঠন হাতে ছুটে চলেন। তার এই ছুটে চলা কবে শেষ হবে কে জানে? বয়সের ভারে এখন ন্যুব্জপ্রায়। মৃত্যুর আগে মামা ভালো মানুষের খোঁজ পাবেন তো? এই প্রশ্ন আমার মনে প্রায়ই জাগে এখন।

এই শহরে হঠাৎ করে নতুন কোনো আগন্তুক নন লণ্ঠন মামা।  সাতচল্লিশে দেশ ভাগের পর বাবা-মার সাথে কলকাতা থেকে চলে আসেন পূর্ব বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) এই শহরে। মাওলানা আবুল কালাম আজাদের প্রচণ্ড ভক্ত তিনি। বলেন, একমাত্র ওই মাওলানা আজাদই শেষ পর্যন্ত অখণ্ড ভারতবর্ষ চেয়েছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের তিনি প্রচণ্ড সমীহ করেন। তবে এও মনে করেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হলে নাকি ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ ছেড়ে যেত না। শুধু ভারতবর্ষই নয়, সে সময় আমেরিকা, আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের কলোনিগুলো ছেড়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ নেতা উইনস্টন চার্চিল। ওই সময় নিজের দেশকে পুনর্গঠন করার জন্যই ছিল এই সিদ্ধান্ত। আর দেশভাগের আগে কলকাতায় যে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা মামার কিশোর মন দেখেছিল এখনও সেই স্মৃতিতর্পণ করেন তিনি। কী বীভৎস! ব্রিটিশরা সাম্প্রদায়িকতার বিষ ঢেলে দিয়েছিল। সকল জাতি-ধর্মের মানুষকে একই ছাতার নিচে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা ছিল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের। কিন্তু ১৯২৫ সালে তাঁর অকস্মাৎ মৃত্যুতে ভেঙেচুরে হয়ে যায় অসাম্প্রয়িক আকাশ। ব্রিটিশরা মুসলিমদের অধিকার আদায়ের ধুয়া তুলে শীতল মবিল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয় মুসলিম লীগের শিখা। সেই তো শুরু সম্প্রদায়িকতার। এক সময়ের অসাম্প্রদায়িক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও কংগ্রেস ত্যাগ করে গিলতে শুরু করেন সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। এক সময় এ জিন্নাহই সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক পান্ডায় পরিণত হন।  ভারতবর্ষের প্রায় সব বড় নেতাই কেবল আইনের শাসন চাইতেন কিন্তু ব্রিটিশ খেদাতে চাইতেন না। এসব মেরুদণ্ডহীন নেতার ভূমিকার সুযোগ নিয়ে ব্রিটিশরা সাম্প্রদায়িক কলকাঠি সহজেই নাড়তে শুরু করে। অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মুসলিম সম্প্রদায়কে শিক্ষিত করার নামে প্রকারান্তরে শ্রেণিদ্বন্দ্বই প্রকট করে তোলে। এই স্মৃতিগুলো লণ্ঠন মামাকে ছেড়ে যায় না। নিউরনে রেকর্ডের ফিতাগুলো রিপ্লে করতে থাকে প্রায় প্রতিক্ষণ।  ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় কোন পক্ষে ছিলেন তিনি? এই প্রশ্ন এখনও নিজেকে করেন মামা। মুসলিমদের পক্ষে ছিলেন কি? তা না হলে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে পূর্ববঙ্গে চলে এলেন কেন? আবার ভাবেন সেই কৈশোরে রাজনীতির তেমন জ্ঞান না থাকলেও পাকিস্তানবিরোধী একটি চিন্তা তার মধ্যে প্রোথিত ছিল। বউবাজারে সারি সারি হিন্দু-মুসলিম মৃতদেহ। একসঙ্গে মিশে দুই জাতের থান থান রক্ত, সেই দৃশ্য এখনও মনে পড়ে লণ্ঠন মামার। একদিন বাবার কথা শুনে চমকে ওঠেন। পূর্ববঙ্গমুখী যাত্রা করতে হবে ভোর হওয়ার আগেই। পোঁটলা-পুঁটলি যা বাঁধার ঝট করে সেরে নিতে হবে। বাবার কথা শুনেই মা এক হাতে শাড়ির আঁচলে চোখ মোছে আর হাতের কাছে যা পায় চটের বস্তায় চালান করে দেয়। তারপর ভোরের ট্রেনে শিয়ালদা থেকে বনগাঁ হয়ে বেনাপোল। এরপর সোজা এই শহরে। এই শহরে সেদিন কেউ ছিল না মামাদের। ঠাটারি বাজারে একটি পুরোনো বাড়ি ভাড়া করে লণ্ঠন মামারা হয়ে ওঠেন পূর্ববঙ্গবাসী। ওই সময়েই ঘ্যাচাং করে রেড ক্লিফ কেটে ফেললেন ভারতবর্ষের মানচিত্র। ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে জুদা হয়ে গেল হিন্দু মুসলিমরা। একপক্ষ রইল ভারতে আর অন্যপক্ষ পাকিস্তানে। চৌদ্দ মিলিয়ন মানুষ ভাগ হয়ে গেল দুই ভাগে। রেড ক্লিফ টেবিলে ভারতবর্ষের মানচিত্র রেখে কলম দিয়ে ইচ্ছেমতো সীমানা নির্ধারণ করলেন। তার কলমের টানে কারও বাড়ির পায়খানা চলে গেল ভারতে আর রান্নাঘর রয়ে গেল পূর্ব পাকিস্তানে। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি হাস্যকরই মনে হয়েছিল মামার কাছে। ভৌগোলিক দূরত্বে অবস্থান করে পূর্ব ও পশ্চিমে মিলে হয়ে গেল একটি রাষ্ট্র। ভূগোলের এসব কাটাছেঁড়া দেখতে দেখতে নিজস্ব দর্শনচিন্তায় এই শহরে জন্ম হয় লণ্ঠন মামার।  চিন্তার তীব্রতা, রাজনৈতিক দর্শন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবব্যাখ্যা তাঁকে দ্রুত পরিচিত করে তোলে বিভিন্ন মহলে। বিশেষ করে দেশ ভাগের সুযোগ নিয়ে যারা ফুলেফেঁপে উঠেছে, তারা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের তাঁবেদার শ্রেণির কাছে তিনি বেশ পরিচিত এবং উটকো ঝামেলা। কারণ তিনি এই শ্রেণিভুক্তদের হামেশাই কাটাছেঁড়া করেন। শরমিন্দা না হয়ে তাদের আক্রমণে মামার ভালো বদনাম আছে। ধর্ম তো বিরোধের মূলে ছিলই, তার সাথে যুক্ত হয়েছে ভাষা। বাংলাভাষীরা নিজের ভাষা ছাড়বে কেন? ক্ষমতা পেয়েই ১৯৪৮ সালে পশ্চিমারা ঘোষণা করল পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। তপ্ত হয়ে উঠল বাংলা মুলুক। বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সালাম, রফিক, বরকতসহ আরও অনেকে নিজেদের রক্ত দিয়ে লিখে গেলেন বাংলাই হবে রাষ্ট্রভাষা। যার মধ্য দিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্রের দাবিও প্রবল হতে শুরু করে। দিন মাস বছর গড়িয়ে শেখের নেতৃত্বে সেই দাবির সাথে এক হয়ে যায় সাত কোটি মানুষ। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন শেষে সমূহ যুদ্ধের মুখে দাঁড়াল বাঙালি জাতি। একাত্তরের সাতই মার্চ শেখের বক্তব্য শুনেই লণ্ঠন মামা যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নেন। একাত্তরে এসে তিনি আবিষ্কার করলেন নতুন একটি জাতি। যারা কেবলই বাঙালি। নেই কোনো হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান। বুঝতে পারলেন, প্রকৃতপক্ষে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে যে দেশ ভাগ হয়েছিল তা পশ্চিম পাকিস্তান, বাংলা নয়। কারণ বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থানের ফলে তাদের কোনো মতেই দুই মেরুর বাসিন্দা বলে ঠাহর হয় না। ব্রিটিশরা এখানে ব্যর্থ। তবে বাংলা স্বাধীন হলেও পশ্চিম পাকিস্তানের ভূতের আসর একেবারে নেমে যায়নি। কিছু প্রেতাত্মা রয়েই যায়। তারাই ওই ধর্মের ধুয়া তোলা অব্যাহত রাখে। ফলে ভিন ধর্মের মানুষদের কেউ কেউ ভারতে পাড়ি জমায়। যাদের কেউ কেউ আর ফিরে আসেনি বাংলায়। লণ্ঠন মামা তাই প্রায়ই বক্তব্য, বৈঠকে বলেনÑ ‘বাংলা স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি। একাত্তরের যুদ্ধ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে নানান প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ অব্যাহত রাখতে হলো। মৌলবাদ, স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং মৌলিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম যেন দিন দিন তীব্র হয়ে উঠেছে।’ লণ্ঠন মামা এসব চিন্তার সাথে গোত্তা মেরে স্থির হওয়ার চেষ্টা করেন। বুঝতে চেষ্টা করেন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক হাওয়ারঅতি ও নেতিবেগ। মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করেন কেন তিনি ভালো মানুষ খোঁজেন? কোন ভালো মানুষ? সেই ভালো মানুষের পরীক্ষণ বা মানদণ্ডই-বা কি? সেই ভালো মানুষের কাজই-বা কী হবে। অতি আত্তীকরণে রাজনীতি দূষিত। তা আর সর্বজনের কথা বলে না। কুয়োর মধ্যে তৈরি একটি প্রাসাদেই এর ঘূর্ণি। সামাজিকতা আর সামাজিক কথা বলে না। হিন্দি সিরিয়ালের মতো কলহই বমি করে। অর্থনীতি দস্যুদের দখলে। শিক্ষা ভঙ্গুর শরীরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। তাহলে স্বাধীন একটি রাষ্ট্র কি অকার্যকর হতে চলেছে? এর জন্য তো যুদ্ধ করেননি লণ্ঠন মামা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে দেশ চেয়েছিলেন, তা তো এ দেশ নয়। তাহলে কোন দেশে এখন আছেন তিনি? লণ্ঠন মামা নিজেকে এ প্রশ্ন করেন? সাতচল্লিশে ভারত ছেড়ে বাংলামুলুকে আসা। তাহলে কি সেই আসাই ভুল হয়েছিল? এসব ভেবে ভেবে তিনি নিজেকে অণু থেকে অণুতর কণার ভেতর প্রবেশ করান। ধ্যানে বুঁদ হয়ে থাকেন। মাওলানা আবুল কালামের কথা খুব মনে পড়ে তাঁর। কালাম সাহেবের চিন্তা যদি টিকে যেত তাহলে অখণ্ড ভারতই অম্লান থাকতÑ এমন সব কথা লণ্ঠন মামার মগজে ঘাঁই দিতে থাকে।

তার পরও মাথা থেকে প্রেমের মায়া খসায় না মামা। বাংলামুলুকই তো এখন নিজের দেশ। এ দেশের প্রতি তাঁর কমিটমেন্ট রয়েছে। স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করেছেন। এখনও সেই যুদ্ধ চলছে। একাত্তরের প্রেতাত্মাদের সাথে এখন আরও কত প্রেতাত্মা যে যুক্ত হয়েছে, তার হিসাব নেই। মামা লণ্ঠন হাতে জঞ্জালের ভেতর থেকে সেই মানুষ খোঁজেন, যার কোনো বিত্তবৈভব নেই, আছে আত্মার বৈভব। সেই মানুষ কী পেয়েছেন তিনি? এই প্রশ্ন করা হলেই মামা বলেন, ‘সেই মানুষ তো আছেই। তা না হলে এই তল্লাট তো বিরান জনপদে পরিণত হতো। তবে ওই মানুষগুলো কোথাও নেই। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষানীতি কোথাও তারা নেই। সেইসব স্থানে অযোগ্য-চতুর্থ শ্রেণির মানুষ দখলে আছে। তাদের সাথে বিতণ্ডায় কেন যাবে আত্মার বৈভবের অধিকারীরা? ওইসব ব্যক্তি জানে না উত্তম মানুষের সংজ্ঞা। তাদের সমাজে বিধ্বংসী, প্রথাবিরোধীদের স্থান নেই। তাদের সুস্থ মানুষ মনে করে না তারা। মানুষের মনে এই যে ভঙ্গুর এবং বিকলাঙ্গ চিন্তা কাজ করছে, তাতে লণ্ঠন মামা বিচলিত হলেও সাহস হারান না। তিনি জানেন এই সমাজের বড় একটি অংশ চোখে শোনে আর কানে দেখে। এদের ওই দুটি শরীরযন্ত্রই অকেজো। তারা এর ব্যবহারও জানে না।

লণ্ঠন মামা অবসরে বৃক্ষবাসী হতে ভালোবাসেন। পোড়া এই শহরের মাঝে দু-একটি বৃক্ষসংযোগ আছে। তাতে মামার আশ মেটে না। তিনি একটু শহরের বাইরেই ছুটে যান। যেতে যেতে বৃক্ষদের বহু যুগের আত্মীয় মনে হয় তার। নানাবিধ পশু-পাখির সাথে লণ্ঠন মামার ভাব কোনো অংশেই কম নয়। প্রায় সব পশুর মধ্যেই একটি শিশুকে খোঁজার চেষ্টা করেন তিনি। মনে করেন, সব অস্ত্রের চেয়েও একটি শিশু অনেক বেশি ক্ষমতাবান। অস্ত্রের মুখ কোনো মতেই বন্ধ হয় না কোনো বীরের সম্মুখে। কিন্তু একটি শিশু সেই যুদ্ধ, সেই দ্বন্দ্ব সহজেই বন্ধ করে দিতে পারে। কারণ সে অবুঝ কিন্তু ভাবাবেগে চলমান। তাকে দেখলে যন্ত্র থেমে যায়, অস্ত্র থেমে যায়। তাই লণ্ঠন মামা নিজের ভেতরের শিশুকে কখনও মরে যেতে দেন না। তিনি চান সব মানুষের মধ্যেই যেন ওই শিশুটি তীব্র থাকে। তাহলে অন্তত মানুষ নিজেকে বুঝতে পারবে। তাহলে অজ্ঞানতা অন্যকে হেয় করার প্রবণতা তৈরি করবে না। এখন তো সমাজে রাষ্ট্রে এক শ্রেণির মানুষ আছে যারা মেধাবীদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে রেখেছে। মনে করে এ ভূমণ্ডলে তাদের চেয়ে জ্ঞানী কেউ নেই।  এই প্রবণতা সেই ডায়োজেনিসের সময়ও ছিল। সেই প্রবণতা মহামারির মতো এখনও ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। লণ্ঠন মামা সে দৃশ্য থেকেই নব নব অনুসন্ধানে থাকেন। তাঁকে দেখা যায় মিছিলে, সভায়, বিক্ষোভে, কৃষক-মজুরের সারিতে, পতিতা এবং পতিতের সারিতে, প্রেমিক এবং প্রেমিকার মধ্যখানে। কখনও কখনও তরুণ আন্দোলনকারীর চোখে তুলে দিচ্ছেন তেজ, কখনও-বা আলোর মিছিল নামিয়ে দিচ্ছেন সবুজ শহরে। কোথায় নেই তিনি? সর্বত্র বিরাজমান।

মিলটন রহমান : কথাসাহিত্যিক

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares