গল্প : ইলোরার শেষ চিঠি : আফসানা বেগম

আফসানা বেগম ।।

‘প্রিয় নাফিস

জানি তুমি ভালো নেই। তা ছাড়া, আমার এ চিঠিটা খুঁজে পেতেও নিশ্চয় তোমার অনেক সময় লাগল। তুমি জানতে, কোথাও না কোথাও আমি কিছু রেখে গেছি, যা তোমাকে বলে দেবে আমি কেন এমনটা করলাম। আবার ভাবতেও পারো কাউকে কিছু বলে গেছি। সেটা ভাবলে এতদিনে আমার আপনজনদের নিশ্চয় অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করেছ। জানি তারা কিছুই বলতে পারেনি। তোমার চেয়ে আপন তো আমার কেউ ছিল না, নাফিস, বললে তোমাকেই বলতাম। আর এখন তোমার মনে নিশ্চয় প্রশ্ন আসছে, চিঠিই যদি লিখেছি তবে, বলতে গেলে ব্যবহারই হয় না, আলমারির এমন একটা ড্রয়ারে তা রাখতে গেলাম কেন! বিছানায় বা টেবিলে ফেলে রাখলেও তো পারতাম। তাহলে বাড়ি ফিরে আমার দশা দেখার পরপরই খোলা চিঠিটার উপরে তোমার চোখ পড়ত। তুমি কাঁপা কাঁপা হাতে সেটা তুলে নিতে, চোখের সামনে মেলে ধরতে, আমার হাতের নীল লেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তোমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসত (তুমি জানো, তোমার অপছন্দ হলেও, আমি নীল কলম ছাড়া লিখি না)। দুটো লাইন পড়ার পরে তাই তুমি আর এগোতে পারতে না কিংবা ইচ্ছে করেই ছোট্ট বিরতি নিতে। বাম হাতে ধরা চিঠির কাগজটার উপরে তোমার ডান হাতটা আলতো করে বুলিয়ে নিতে, আমার গালের উপরে হাত ছুঁইয়ে নেওয়ার মতো তীব্র ভালোলাগার অনুভূতি তখন তোমাকে আচ্ছন্ন করে রাখত খানিকক্ষণ… যা হোক, চিঠিটা ওই ড্রয়ারে আমার গয়নার বাক্সে রাখলাম যাতে তোমার হাত পড়বে বেশ ক’দিন বাদে। আমাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া আর আত্মীয়-স্বজনের আহাজারি বা সান্ত্বনা শেষ হতে হতে এতদিনে তুমি নিজেকে হয়ত বেশ সামলে নিয়েছ। তোমার চারপাশে যখন মন খারাপের কথা আওড়ানোর আর কেউ নেই তখন তুমি একা একা বসে নিশ্চয় আমার কথা ভাবার সুযোগ পাচ্ছ। তুমি হয়ত বসে আছ বসার ঘরের পাশে বারান্দার মতো বাড়ানো জায়গাটায়। ওদিকটায় বারান্দা ছিল না বলে যেখানে বারান্দার মতো করে পাতাবাহারের টব সারি করে রেখেছি, আমাদের প্রিয় ওই কোণটাতে নিশ্চয় বসে আছ তুমি। ওইদিক থেকে সকালের নরম আলো এসে টবের ফাঁক গলে তোমার পায়ের কাছে সরু-মোটা নানান ডোরা তৈরি করেছে। পায়ের তলা দিয়ে উজ্জ্বল আর আবছা আলোর ওই ডোরাগুলো মাড়াতে মাড়াতে তুমি সাদা-সবুজ ছোপওয়ালা পাতাবাহারের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছ। ক’দিন হয়ে গেছে শুকোতে থাকা পুরোনো পাতা আর কাণ্ডগুলো থেকে কেটে সরানো হয়নি, গোড়ায় পানিও হয়ত পড়েনি ঠিকমতো। উঠে গিয়ে সেসব করতে তোমার ইচ্ছে করবে না, মনের ভারে শরীরে বরাবর তোমার আলস্য হয়। চায়ে চুমুক দিতে দিতে তোমার বরং আমার পুরোনো কাপড় আর গয়নার কথা মনে পড়বে। মনে হবে ওই জিনিসগুলোতে আমার কিছু ছোঁয়া থাকলে থাকতেও পারে, নেড়েচেড়ে দেখলে হয়! তাই উঠে গিয়ে আমার আলমারির চাবিটা খুঁজবে তুমি। জানামতো ঠিক জায়গাতেই পাবে, তোমার আলমারিতে ঝোলানো তোমারই পুরোনো কোনো পাঞ্জাবির পকেটে। কপাট খুলতেই আমার শরীরের গন্ধের হলকা তোমার চোখ বুজে দেবে (মাত্র এ ক’দিনে গন্ধটা মরে যাবে না, আমার বিশ্বাস), কিন্তু পরোটার মতো ভাঁজ করে রাখা শাড়ির স্তূপ আর ঝোলানো কামিজের মধ্যে দৃষ্টি গুঁজে দিতে তোমাকে চোখ খুলতেই হবে। তারপর প্রিয় কোনো কাপড়ের দিকে হাত চলে যাবেই যাবে। সে বারে যে শাড়িটাতে পেস্টাল শেডসে হ্যান্ডপেইন্ট করেছিলাম, সেটা? নাকি কাশ্মীর থেকে ফেরার সময়ে তুমি আমার জন্য ফ্যাকাসে গোলাপিরঙা পশমিনার যে শাড়িটা এনেছিলে, সঙ্গে ম্যাচিং পশমিনা স্কার্ফ? ওই যে যেটা পরে আঁচল টেনে ধরলে আমার গোলগাল ফরসা মুখের দিকে তাকিয়ে তোমার স্ট্রবেরি আইসক্রিমের উপরে ভ্যানিলার স্কুপের কথা মনে হতো? আমাদের বিয়ের জামদানিটাও ওখানেই ঝুলছে। লালের উপরে সোনালি জরি, পেটানো কাজ। লোকে বলেছিল, সে কী বেনারসি কই, বিয়ের কনের গায়ে জামদানি! আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। তুমি আর তোমার পছন্দ, দুটোই যে আমার পছন্দ। শাড়িগুলো বেশ খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করে ঝোলানো কামিজগুলোর দিকে তুমি এগিয়ে যাবে। নাক ডুবিয়ে দেবে একটা কোনো কাপড়ে, যা আমি প্রায়ই পরতাম, এমন কোনোটায়। হ্যাঁ, আমার গন্ধটা এখনও টাটকা, শুঁকে নাও প্রাণভরে, বেশি দিন থাকবে না; এ কথা ভাবতেই ডুকরে কেঁদে উঠবে তুমি। কেঁদো না। আমার খুব কষ্ট হয় তোমার কান্নার কথা ভাবলে। না-হলে এতদিন সহ্য করতাম? না-হলে সেই কবেই… সে যাই হোক, গন্ধের মোহ থেকে নাক সরাতে পারলে তুমি হয়ত একটার পর একটা ড্রয়ার খুলে দেখবে। গয়নার বাকসের ড্রয়ার খুলতেই দুটো বাকসো। একটা আমার, একটা তোমার আগের বউ, মিতুর। মিতুর মিনা করা কানের দুল, মিতুর মটরদানার গলার চেন, সেসবই আমাকে বরাবর পরতে হতো। তুমি চাইতে ঘরোয়া পরিবেশে আমি ওগুলোই পরে থাকি, মিতু সবসময় যা পরতো। আমার বিয়ের গয়না বিয়ের পরে আর কই তেমন পরেছি! তবু একবারের জন্য হলেও তুমি গয়নার ওই বাক্স খুলবে, আমি জানি। বাক্সের বদ্ধ বাতাসে যদি আমার ছোট্ট একটা নিশ্বাস কয়েদ হয়ে থাকে, যদি আমার দৃষ্টির ছায়া আজও সেখানে খেলা করে, তুমি সেটুকু লুফে নিতে চাইবে। আর বাক্সটা খুলতেই তুমি পেয়ে যাবে এই চিঠিটা…’

এটুকু পর্যন্ত পড়ে আমি আর এগোতে পারলাম না। আলমারির কপাটের ভিতরের দিকে লাগানো আয়নায় আঙুলের ছাপ লম্বালম্বি টেনে ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়লাম। সেজেগুজে কপাট খুলে সামনে দাঁড়ালে ওই আয়নায় ইলোরার যেমন লম্বা একটা ছবি আঁকা হয়ে যেত। চিঠিটা আমার হাতেই ধরা থাকল। শরীরের আর সব অঙ্গ বিস্মৃত হয়ে বুকটা প্রধান হয়ে উঠল, বুকে চিনচিনে ব্যথা আঘাত করল… এ তো ঠান্ডা মাথার একটা পরিকল্পনা! ইলোরা তুমি এভাবে পারলে আমাকে ছেড়ে… কিন্তু কেন, আমার মন বলছে চিঠির পুরোটা পড়লেই আমি তা জানতে পারব; কিন্তু পড়তে সাহস হলো না কেন যেন। আমার অজান্তেই আমি কি তার কাছে কোনো অপরাধ করে ফেলেছিলাম? চাপা স্বভাবের ইলোরা কি আমাকে তা বলতে পারেনি? কিংবা এমনও হতে পারে যে, সে আমাকে বহুবার বলেছে, মনে করিয়ে দিয়েছে, আমি আমলে নিইনি। আমার এ সমস্যা আছে আমি জানি। আমি ভুলে যাই। আর তাই একই ভুল বারবার করতে থাকি। কিন্তু ইলোরা তো আমাকে মনে করিয়ে দিতে… ব্যাপারটা আসলে ঘুরেফিরে সেই একই দাঁড়াল। কিন্তু ইলোরা, আরেকবার না-হয় বলতে, না-হয় রাগ করতে আমার সঙ্গে, না-হয় কথা বলা বন্ধ রাখতে… আমি কাঁদতে শুরু করলাম। ইলোরার চিঠিটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে থাকলাম। কতক্ষণ জানি না, একসময় মনে হলো আমি কাঁদছি কেবল নিজেকে হালকা করার জন্য। আমার কান্না একরকমের স্বার্থপরতা ছাড়া কিছুই নয়। আমি ভালো থাকতে চাই, এটাই কান্নার উদ্দেশ্য। তাই কান্না বন্ধ করলাম। ইলোরাকে জানা দরকার। ইলোরা আর আমার মাঝখানে যোগাযোগের এখন একটাই সেতু, তা হলো কয়েক পাতার এই চিঠি। ভয়ে ভয়ে আমি আবারও সেতুতে পা ফেললাম।

‘আমাদের বিয়ের ঠিক পরের দিনগুলো তোমার মনে আছে, নাফিস? আমরা হানিমুনে গিয়েছিলাম ইন্দোনেশিয়ার বালিতে। আমি ওখানে যেতে চাইনি, বলেছিলাম চলো থাইল্যান্ডে যাই। না না, আমি তোমাকে ওই ভিড়ের জায়গা, পাতায়া কিংবা আরও দূরে ফুকেট বা ক্রাবিতে যেতে বলিনি। বলেছিলাম ব্যাংককের কাছেই তো বেশ শান্ত একটা জায়গা আছে শুনেছি, হোয়া হিন নাম তার। বলেছিলাম, চলো না ওখানে যাই। কিন্তু তুমি রাজি হওনি। তোমাকে বালিতে যেতেই হতো, যেতে হতো তোমার নতুন বউকে নিয়ে, কারণ, সেবারে তুমি মিতুকে নিয়ে হানিমুনে ঠিক ওখানেই গিয়েছিলে। আর যাবার পরে প্রথমেই তুমি আমাকে তানাহ লতের মন্দিরের সামনে নিয়ে গেলে। কে জানে কী কারণে বারবার ফুঁসে ওঠা ঢেউগুলো সেখানে মন্দিরের পায়ের কাছে এসে আঘাত করে আছড়ে পড়ে। পাথরের পালটা আঘাতে নিজেরাই পরাজিত হয়ে আকৃতি হারায়, জলে ফিরে যায় যেখান থেকে রওনা দিয়েছিল, সেদিকে। সেখানে ঢেউয়ের গর্জন আর বিরতিহীন স্রোতে আবিষ্ট হয়ে আমি হয়ত তোমার কথা ভুলে সেদিকেই তাকিয়ে ছিলাম। অনেক পরে লক্ষ করেছি তুমি অপলক তাকিয়ে আছ আমার দিকে। তোমার সেই অভিভূত মুখ আমার কী যে ভালো লেগেছিল! আর তারপর বহুদিন পরে বুঝতে পেরেছি তুমি আসলে তখন আমার দিকে তাকাওনি। আমি তোমার চোখের সামনে কেবল ছায়ার এক অবয়ব হয়ে দণ্ডায়মান ছিলাম। আমার ভিতর দিয়ে তুমি অন্য কাউকে দেখছিলে। আমি ছিলাম আলো-ছায়ার একটা দরজা মাত্র, যার মধ্যে প্রবেশ করে তুমি অতীতের পথে হাঁটছিলে। আমার পিছনে তানাহ লতের মন্দিরটাকে দাঁড় করিয়ে তুমি আসলে মিতুকে দেখছিলে; যে মিতু সেই কবে কোন কালে ঠিক ওইখানটাতে আমারই মতো করে ঢেউয়ের গর্জনে আবিষ্ট হয়ে তোমাকে ভুলেছিল। সেই মুহূর্তটাকে উপলক্ষ্য করে তুমি লক্ষ মুহূর্তকে মাথার ভিতরে টেনে এনেছিলে; মিতুর সঙ্গে হানিমুনে যাবার স্মৃতি তখন তোমার কছে যেন স্মৃতি নয়, সামনে ঘটতে থাকা বর্তমান!’

চিঠিটা আমার হাত থেকে খসে মেঝেতে পড়ে গেল। আমি যেন ধরা পড়ে গেছি। ইলোরার চোখে আমার চালাকি ধরা পড়ে গেছে। কিন্তু সে কী করে তা জানতে পেরেছিল! কী করে? হ্যাঁ, আমি তার শরীরের প্রান্তিক রেখাগুলোর মাঝখান দিয়ে মিতুকে দেখছিলাম। ঠিক ওইখানটাতে, মন্দিরের সিঁড়ির উপরে ঢেউয়ের ঝাঁপটায় ক্রমশ ভিজে যাওয়া মিতু। আমি মিতুর শরীরে পানির ফোঁটাগুলো স্পর্শ করতে চাচ্ছিলাম, নোনতা হলেও শুঁষে নিতে চাচ্ছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম এখান থেকে হোটেলে ফিরে গিয়েই আমি মিতুকে… কিন্তু ইলোরা কী করে তা জানতে পেরেছিল! মানুষের চোখেমুখে কি তার পরিকল্পনার কথা লেখা থাকে? আমি সত্যিই ওই মুহূর্তের মধ্যে হাজার মুহূর্ত দেখতে পাচ্ছিলাম। ওই মন্দির ছাড়িয়ে তার পরে দেখা উলুওয়াতু মন্দিরের দৃশ্যও আমার বর্তমান বলে মনে হচ্ছিল। সেখানকার অ্যাম্ফিথিয়েটারে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আমি আর মিতু বসে ছিলাম। স্টেজের উপরে আগুন হাতে শিল্পীরা নাচছিল। সন্ধ্যার পড়তে থাকা অন্ধকারের সমুদ্রে দ্রুত ধেয়ে আসা আর তার চেয়ে দ্রুত লাফাতে থাকা আগুনের শিখার আলোয় মিতুর শ্যামলা মুখ অপার্থিব দেখাচ্ছিল, যেন এই আছে এই নেই। স্টেজ থেকে চোখ ফিরিয়ে তাই বারবার আমাকে মিতুর মায়াবী মুখের দিকে তাকাতে হচ্ছিল যেখানে আলো-অন্ধকার ক্ষণে ক্ষণে আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল। তবে সেবারে কী কারণে যেন ইলোরাকে নিয়ে উলুওয়াতু মন্দিরে আমার যাওয়া হলো না। তাতে অবশ্যি কোনো অসুবিধা হয়নি, যা দেখার তা আমি ওই তানাহ লতের সিঁড়িতে দাঁড়িয়েই দেখে নিয়েছিলাম। হারিয়ে যাওয়া সময় আরেকবার ফিরে পাবার ভাগ্য ক’জনের হয়? মানুষ সারাজীবন কেবল আগের সুন্দর দিনের স্মৃতির জাবর কাটতে কাটতে নিঃস্ব হতে থাকে। আমার জীবনে সবকিছু ফিরে ফিরে এসেছে, এসে জানিয়ে গেছে যে কিছু হারায়নি। কারণ উবাদ আর্ট মার্কেটে গিয়ে হলো কী… সেসব পরের কথা, চিঠিটা মেঝে থেকে কুড়িয়ে আবারও কোলের উপরে মেলে ধরলাম।

‘তারপর মনে করো উবাদ আর্ট মার্কেটের কথা, মনে আছে তো? কারুকাজময় কাঠ-পাথরের জিনিসে ঠাসা ওরকম একটা জায়গায় এমনিতেই সারাদিন ঘুরে বেড়ানো যায়। আমার খুব ভালো লেগেছিল। এমনিতে আমি বেড়াতে গিয়ে হাত ভরে শপিং করার পক্ষপাতী নই। কিন্তু ওখানে ঘুরতে ঘুরতে আমাদের নতুন সংসারে সাজিয়ে রাখব বলে টুকটাক কত্ত কী কিনে ফেললাম। আর স্কার্ফের দোকানের সামনে থেকে সরে যাওয়া কঠিন ছিল। কী রঙের স্কার্ফ যে নেই সেখানে! আমি নিতে চাইলাম হালকা গোলাপি বা বাদামি কি ধূসর। অথচ তুমি আমাকে একটা মেরুন স্কার্ফ নেওয়ার জন্য জোরাজুরি শুরু করে দিলে। আমি বললাম আমার ফরসা মুখে হালকা রঙই তো মানায়। কিন্তু তোমার ওই এক কথা, মেরুনটাই নিতে হবে। নিয়েছিলাম বটে, মেরুন রঙ তো আমারও অপ্রিয় নয়। আর তা ছাড়া, ছোটোবেলা থেকেই আশপাশের লোকদের বলতে শুনেছি, ওরকম ফরসা হলে সব রঙই মানায়। যা হোক, মেরুন স্কার্ফ গলায় জড়িয়ে ওখানে দাঁড়াতেই তুমি আমার ছবি তুললে, তারপর ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলে। স্কার্ফের দোকানদার, বুড়ো মানুষটা ফোকলা দাঁত দেখিয়ে হাসল। দোকানে ঝোলানো আয়নায় নিজেকে বেশ টুকটুকে দেখালেও গোলাপি বা বাদামি স্কার্ফগুলোর দুঃখ আমার গেল না। কিন্তু কী আর করা, তোমার হাত ধরে সেখান থেকে চলে এলাম।                       

তারপর বহুদিন পরে মিতুর কাপড়ের মধ্যে আমি হুবহু ওই রকম একটা মেরুন স্কার্ফ দেখতে পেয়েছিলাম। একদম একই, হতে পারে একই দোকানের। আশ্চর্য না? আমার কাছেও প্রথমে আশ্চর্যই লেগেছিল। তুমি তো বলতেই পারতে যে আলমারিতে একই রকম একটা মেরুন স্কার্ফ পড়ে আছে, মিতু  তা এক-দু’বার পরলেও পরে থাকতে পারে। বললে আমি সত্যি সেটাই নিয়ে পরতাম, মানে, আমাকে মেরুনে মানায় এমনটা যদি তোমার মনে হতো আর কী। কিন্তু তাই বলে একই রঙের একই রকম আরেকটা স্কার্ফ কেনার কী দরকার পড়েছিল! সেই দোকানে ফেলে আসা গোলাপি স্কার্ফটার জন্য তখন শোক করব কিনা ভাবতে না ভাবতেই পুরো বিষয়টা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছিল। তুমি আসলে মেরুন স্কার্ফ কেনার ওই মুহূর্তটাকে পেতে চেয়েছিল। ওই যে আমি স্কার্ফ জড়াব, তুমি ছবি তুলবে, তারপর এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরবে, ফাঁকে ফাঁকে অনুপস্থিত দাঁতের সারি দেখিয়ে দোকানদার সুখের হাসি হাসবে… এই সমস্ত কিছু তোমার ওই মুহূর্তে দরকার ছিল; দরকার ছিল অতীতের কোনো মায়াময় দিনে গিয়ে উপস্থিত হবার জন্য।’

চিঠিটাকে আমি আঙুলে চেপে শক্ত করে আটকে ধরলাম। তুমি সব জানতে, ইলোরা! তুমি আমার সব জানতে। তুমি আমাকে খোলা বইয়ের মতো পড়তে পারতে, অথচ আমাকে তা জানতে দাওনি। আমি নিজেকে চালাক ভেবেছিলাম, ভেবেছিলাম আমার সবটা মনোভাব তোমার কাছে গোপন আছে। কত ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে আমি জীবনটা কাটিয়ে দিলাম! ভেবেছিলাম পৃথিবীর সবার কাছে আমি নিজেকে লুকিয়ে রেখেছি। দাও শাস্তি, দাও তুমি… তোমার হাতে শাস্তিই আমার প্রাপ্য। আমি কাঁদতে শুরু করলাম। অন্য কেউ দেখলে সহজে বিশ্বাস করত না যে, আমার মতো হম্বিতম্বিতে অভ্যস্ত লোকটা ভিতরে ভিতরে এত নরম। আমি নিজেও আসলে তখন বিশ্বাস করতে পারলাম না যে, চিঠিটা চেপে ধরে আমি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম। আমার কান্না থামলই না, থামলই না। কাঁদলাম আর বললাম, এত কষ্টে ছিলে তুমি, ইলোরা! আর এদিকে আমি, তোমার উপরে ভর করে কেবল আমার স্বার্থ উদ্ধার করে গেছি… বউ হিসেবে প্রত্যেকটা দায়িত্ব কত দক্ষতায় পালন করতে তুমি। সংসারের কি আত্মীয়দের, কী আমার নিজস্ব প্রয়োজন, কোনোকিছু নিয়েই আমাকে কখনও ভাবতে হয়নি। অদ্ভুত এক জীবন কাটাচ্ছিলাম যেখানে কেবল অফিস যাওয়া আর বাড়িতে ফিরে আসা ছাড়া আমার কোনো কাজ ছিল না। তারপর আমাকে নিয়ে কী করতে হবে সব তুমি জানতে। কোনোকিছু নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবতে হতো না আমাকে। তারপরেও আমাকে সামান্যতম প্রশান্তি দেওয়ার জন্যও কত তটস্থ হয়ে থাকতে তুমি। আর ভালোবাসা? ভালোবাসার জোয়ার যেন আজীবন লেগেই ছিল, তাতে একটা দিনের জন্যও ভাটা আসেনি। অথচ তুমি ভিতরে ভিতরে আমার স্বার্থপরতার কথা জানতে, দেখতে, সমস্ত কিছুই বুঝতে, কেবল আমাকে জানতে দিতে না। এত মহানুভব ছিলে কেন ইলোরা? কেন এত করুণা করেছ আমাকে?

‘তুমি নিশ্চয় ভাবছ, এতসব জেনেও আমি কী করে হাসি মুখে তুমি যা চাও তাই করে যেতাম… কী করে আমি এত খুশি থাকতাম! তুমি আবার ভাবছ না তো যে আমি তোমাকে করুণা করেছি?’… চোখে ভরে ওঠা জল চিঠির অক্ষরগুলো ঝাপসা করে দিচ্ছিল। চিঠিটা রেখে চোখ মুছে নিলাম। হ্যাঁ, করুণাই তো, আর কী? তা ছাড়া আর কী ছিল আমার প্রতি তোমার? না হলে কেউ এভাবে চুপচাপ জীবনের এতগুলো বছর কাটাতে পারে?

‘বিশ্বাস করো, করুণা নয়, নাফিস। আমি তোমাকে ভালোবাসতাম। এত বেশি ভালোবাসতাম যে, সব বুঝতে পারলেও তোমাকে কিছু বলতে পারিনি। কে জানে বললে যদি তুমি কষ্ট পাও! তোমার চিন্তার প্রবাহ নষ্ট হয়ে যায় যদি! যা ভাবতে তোমার ভালো লাগে, আমি চেয়েছিলাম তাই ভাবো। যা করতে ভালো লাগে, চেয়েছিলাম তাই করো তুমি। দেখো কেবল যা দেখলে তোমার আনন্দ হয়। একে কি তুমি করুণা বলবে?

যা হোক, সেসব অনেক আগের কথা ছাড়ো। ভেবে দেখো আমাদের প্রতিদিনের জীবনের কথা। ভাবো সকাল থেকে রাত, দ্রুত কিংবা কখনও ধীরলয়ে বয়ে চলা আমাদের পাশাপাশি থাকার দিনগুলো, কেমন ছিল সেসব দিন? তোমার জন্য নিশ্চয় আনন্দের। মিতু সকালে কালো কফি খেত তাই কালো দুই মগ কফির আগমনে আমাদের ঘরে সূর্য উঠত। আমি যে চা খেতে পছন্দ করি, আর তা চুমুক দিতে চাই চমৎকার ফুলের ছাপওয়ালা কাপে, সেসব তোমাকে বলার কোনো ফাঁকই পেলাম না। মিতুর পছন্দ ছিল ধবধবে সাদা মগ। গাঢ় রঙের কফি ওই সাদা মগগুলোতে অপূর্ব দেখাত। তোমার হাতের ধোঁয়া ওঠা কফির গন্ধ কোনো কোনো দিন যখন আমার ঘুম ভাঙাতো, কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ার ওপারে তোমার হাসি হাসি মুখ কী যে অপার্থিব দেখাতো, তার কথা কী বলব। ঘুম থেকে ওঠামাত্র কালো কফির তিতকুটে স্বাদ দাঁতে আর জিবে চেপে আমি তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। অবাক হয়ে ভাবতাম, কত ছোট ছোট ব্যাপার মানুষকে কত আনন্দ দিতে পারে! ঘুমের রেশ বরাবর সবকিছুকে বড় বেশি বাড়িয়ে চড়িয়ে অনুভব করায়, যেমন, তিতা কফি আরও বেশি তিতা, তোমার হাসি মুখ আরও বেশি সুখী। তুমিই বলো, চায়ের কথা পেড়ে ওই হাসিমুখ ম্লান করতে কারও ইচ্ছে করবে?

তাই সকাল সকাল আমি সাদা মগে কালো কফি মেনে নিলাম। শাড়ি পছন্দের পোশাক হলেও ব্যক্তিগত সময়ের জন্য সালোয়ার-কামিজ মেনে নিলাম। ছোটবেলা থেকে মাছ দেখে নাক সিঁটকালেও প্রতিরাতের টেবিলে মাছ মেনে নিলাম। এই সমস্ত মিতুর পছন্দ ছিল, তুমি বহুবার বলেছ। রাতে খেতে বসে আমার কখনও মনে হতো, আমরা বিড়াল নাকি যে, রাতের খাবারের সময় হলেই বাড়িতে মেছো গন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছি আর মনোযোগ দিয়ে কাঁটা বাছছি? তবে খাবার টেবিলে তোমাকে সতর্ক হয়ে পাবদা কি কইয়ের কাঁটা বাছতে দেখলে কিংবা পাঙ্গাশের সঙ্গে টমেটো আর আলুর ঝোল তৃপ্তি নিয়ে মুখে পুরতে দেখলে ভাবনাটা বদলে যেত। নিজের মনে মুচকি হাসতাম; বেড়াল আমরা নই বটে, আবার জিরাফ বা হাতিও তো নই যে শুধু সবজি খেয়ে বাঁচব। অন্যদিকে, বাঘ-সিংহ তো মোটেও নই যে, কেবল গপাগপ মাংস খাব। আচ্ছা, চলুক মাছ খাওয়া। মজার ব্যাপার কী জানো, বছরের পর বছর বিনা বাক্য ব্যয়ে রাঁধতে রাঁধতে আর খেতে খেতে কিছু মাছ আমার সত্যি ভালো লেগে গেছিল। যেমন ধরো- বাতাসি। সত্যিই দারুণ স্বাদ। তুমি হয়ত ভাববে আমার ভালো লাগাটা নামের জন্য। বাতাস আমার প্রিয় ছিল, মিতুরও ছিল। আমার যে ভালো লাগা মিতুর ভালোলাগার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল তার ব্যাপারে তোমার ছিল অসীম উৎসাহ। আর তাই তো তুমি কিছু জানালা আর খাবার ঘরের পাশের বারান্দার গ্রিল ফেলে দিলে। বাতাস যেন আমাদের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ওদিকটায় পার্ক ছিল বলে বরাবর তাই হতে লাগল। রাতে ঘুম দেরিতে এলে বাতাসের সঙ্গে কথা বলা যেত। এ জন্য আমি সবসময় মনে মনে তোমাকে ধন্যবাদ দিতাম। তুমি ঘুমিয়ে পড়ার পরে তোমার দিকে চোখ ফিরিয়ে মুচকি হাসতাম। জানালার পাতলা পর্দাগুলো এলোমেলো উড়ত। কখনও পাখির ডানার মতো উড়ে উড়ে সামনের দেয়ালটা ঢেকে দিত। অন্ধকার ঘরে আমার ঘুম ঘুম চোখের সামনে বাতাসে ভর করে পরদা উঠত আর নামত। কখনও বড় কোনো বাতাসের ঝাপটায় এতটাই উপরে উঠে যেত যে, বাইরে থেকে চাঁদের বা পাশের কোনো বাড়ির আলো ঠিকরে সোজা ওই দেয়ালটায় এসে পড়ত, যেখানে মাঝারি আকৃতির ফ্রেমে মিতু হাসছে। এমন সর্বগ্রাসী হাসি, নাফিস, যার প্রতিধ্বনি চলতেই থাকে, হেসে চলে গেলেও কানের মধ্যে বাজতে থাকে। মিতু ফ্রেমে আটকা পড়ে হাসতে হাসতে পাথর হয়ে গেছে, অথচ আমার চোখ তাকে ক্রমাগত হাসতে দেখত। আমার কান তার হাসির শব্দ শুনতে পেত। তোমার পাশে কাঠ হয়ে শুয়ে আমি সেই দেয়ালের দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকতাম। মিতু কি আমাকে দেখে উপহাসের হাসি হাসত নাকি তৃপ্তির, সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে কোনো রাত এই ভাবনাতেই কেটে যেত।’

চিঠিটা মেঝের উপরে রেখে আমি মিতুর ছবিটার দিকে তাকালাম। যে আলমারিতে হেলান দিয়ে বসে আছি তার থেকে বাম দিকে। মিতু হাসছে। ফ্রেমে বন্দি হবার পরে আর তার বয়স বাড়েনি, অভিব্যক্তি বদলায়নি, কিছুতে কিছু যায়-আসেনি। তার পরেও তাকে এত বছর হাসিখুশি রাখার অক্লান্ত চেষ্টা ছিল কেন আমার? আর ওদিকে বেচারা ইলোরা… মিতুর ছবিটা তো অন্তত এ ঘর থেকে আমি সরাতে পারতাম; আমার আর ইলোরার ব্যক্তিগত ঘর, আমাদের নিশ্বাসে ঠাসা। কোনো কোনো দিন ইলোরা দেরিতে ঘুম থেকে উঠত। কফি নিয়ে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে নাম ধরে দু-চারবার ডাকলেও নড়ত না। তাকে জাগাতে আমার খারাপ লাগত, কিন্তু কী করব, অফিস থাকত বলে ডাকতেই হতো। চোখ কচলে সে আমার দিকে হাত বাড়াত। তখন ঘুণাক্ষরেও আমি টের পাইনি যে রাতভর মিতুর ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বেচারা ঘুমাতে পারেনি। ছুটির দিনের সকালগুলো হতো দেরিতে, আমি তাকে ডাকতামও না কোনো কোনো দিন। সে নিজেই একসময় উঠে কফি বানিয়ে আনত। তারপর আড়মোড়া ভেঙে কোনো অর্ধসমাপ্ত ছবিতে তুলি টানার জন্য ইজেলের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে যেত। সংসার আর অফিসের কাজ সামলে অবসর সময়ে ইলোরার আঁকাআঁকির অভ্যাসটা আমার বড় ভালো লাগতো। সেভাবে ভাবতে গেলে একমাত্র ওই আঁকার চর্চাই একটা জিনিস যা ইলোরা নিজের আনন্দে করত, কেবল নিজের জন্য করত। আর তার বাকি দিন-রাত, বাকি জীবনটুকু উৎসর্গ করেছিল আমার জন্য; করেছিল নাকি করতে বাধ্য হয়েছিল?… চিঠি হাতে উদাস চোখে আমি জানালার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। বিকেল পড়ে আসছে। বাতাসের আবির্ভাবে জানালার পর্দা দুলতে শুরু করেছে। ওদিকে থমথমে আকাশ উঁকি দিচ্ছে। কেন যেন হঠাৎ সমস্ত কিছু দুর্বোধ্য হয়ে উঠল, এই বিকেল, ইলোরার চিঠি, ইলোরা, যা সে আমাকে জানাতে চেয়েছিল আমি ঠিকঠাক বুঝতে পারছি তো?

‘নির্ঘুম রাতের কথা তোমাকে আর নাই-বা বলি। সেসব তো একা একা উপভোগ বা ভোগান্তির বিষয়। সাথে জাগার সাথি থাকলে ঘুমহীন রাতই সবচেয়ে উপভোগ্য। কিন্তু তোমার অফিস সকাল সকাল, তুমি জেগে থাকবে, এমনটা আমি কখনও চাইনি। মাঝে মাঝে মনে হতো ঘুম যখন নেই, উঠেই পড়ি, কিছু কাজকর্ম করা যাক। আবছা আলোয় ওই মিতুর হাসিমুখ আর কতক্ষণ দেখব! কখনও ইচ্ছে করত উঠে গিয়ে ছবি আঁকি। মনের মধ্যে কিছু কল্পনা ছবি হয়ে উঠতে চাইত অথচ তারা আমাকে বিছানা থেকে ওঠাতে পারত না। বিছানা নড়ে উঠলে যদি তোমার ঘুম ভেঙে যায়, পাশের ঘরের আলোয় কি ইজেল আর তুলির খসখস শব্দে যদি তুমি চমকে ওঠো! তাই কল্পনাগুলো মাথার মধ্যেই লালন করতে হতো। ছুটির দিন আসত, তখন জমিয়ে আঁকতাম। কিন্তু একসময় আমার কল্পনারা কেন যেন বদলে যেতে লাগল। তারা কেবল দেখতে লাগল তোমাকে আর মিতুকে। তুমি আর মিতু ছাদের কোণে দাঁড়িয়ে আছ, তানাহ লতের মন্দিরের সিঁড়িতে মিতু দাঁড়িয়ে, তুমি তার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছ, কিংবা ধরো, বিয়ের পরের দু’বছরে তোমরা যত জায়গায় বেড়াতে গেছ, অ্যালবামের সেসব ছবি, তোমার মুখে শোনা গল্প থেকে উঠে আসা ছবি, এসব ছবি আমার কল্পনার ময়দানটা দখল করে নিল। আমি ওই দৃশ্যগুলো ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারতাম না। ল্যান্ডস্কেপ আঁকতে গেলে হয়ে যেত তোমাদের ঘুরে আসা কোনো জায়গা, মানুষের শরীর ফোটাতে চাইলে হয়ে যেত মিতু আর তোমার অবয়ব। শেষ পর্যন্ত আমি বাধ্য হয়ে তাই আঁকা শুরু করলাম যা আমার মাথায় খেলে। একের পর এক দৃশ্য যার কোনো কোণে তুমি আর মিতু দাঁড়িয়ে আছো, বসে আছো, খুনসুটি করছ। প্রথম প্রথম তুমি হয়ত বুঝতে পারনি। একদিন ক্যানভাসে সেই লাল স্কার্ফ কেনার দৃশ্যটা দেখে ঠিকই বুঝে ফেললে। তুমি যে বুঝতে পেরেছো তা তোমার চোখেমুখে স্পষ্ট লেখা ছিল, কিন্তু আমাকে বলনি। আমি জানতাম তুমি খুশি হয়েছ। তোমার খুশি দেখে আমার কল্পনার উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। আমি একের পর এক জায়গাকে পিছনে রেখে কেবল দু’জন মানুষের ছবি এঁকে যেতে লাগলাম। কোথাও তারা স্পষ্ট, কোথাও এত ঝাপসা যে তাদের অস্তিত্বের কথা কেবল আমি জানতাম আর জানতে তুমি। কিন্তু তুমি কখনও তা জানাতে চাওনি। তোমার আর আমার মধ্যে বিষয়টা একটা প্রকাশ্য-গোপন ব্যাপারের মতো ঝুলে থাকল। তবে প্রদর্শনীতে কয়েকজন দর্শক জানতে চেয়েছিল, মনে আছে? তুমি তখন চোখে অস্বস্তি নিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থেকেছ নয়তো কোনো ব্যস্ততার ভান করেছ। আমি আসলে তোমাকে ও-রকম অস্বস্তিতে ফেলতে চাইনি। প্রদর্শনী করার ব্যাপারে আমার কখনওই আগ্রহ ছিল না। আমি মনের আনন্দে ছবি আঁকতাম, আঁকা শেষ হলে যে তৃপ্তিতে মন ছেয়ে থাকত, আমার জন্য সেটুকুই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু জোড়া মানুষ সামনে রেখে বেশ কিছু দৃশ্যের ছবি জমে গেলে তুমি প্রদর্শনীর জন্য অস্থির হয়ে উঠলে। তোমার আগ্রহ দেখে আমাকে রাজি হতে হলো। তোমার হয়ত বহু মানুষকে দেখাতে ইচ্ছে করছিল, তুমি আর মিতু জীবনের ওই ছোট্ট দুটো বছরে কত কত জায়গায় চষে বেড়িয়েছ, কত প্রেমময় অতীত যা তোমার কাছে বর্তমান, যা আমার, মানে, তোমার দ্বিতীয় স্ত্রী ইলোরার ক্যানভাসে বহমান। প্রদর্শনীতে অল্প কিছু ছবি বিক্রি হয়েছিল, কিন্তু তোমার আনন্দটাই ছিল দেখার মতো।’

আমি আবারও হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম। চিঠি কোলে পড়ে থাকল। ইলোরা, তুমি সব জানতে! সত্যি আমি উপভোগ করতাম যে আমি আর মিতু তোমার তুলিতে জ্বলজ্বল করছি। কিন্তু আমি মিথ্যা ভান দেখাইনি বিশ্বাস করো। তোমার আঁকার অভ্যাসটা সত্যি আমার খুব ভালো লাগত। এ জন্য আমি মনে মনে গর্বিত ছিলাম। আর যখন দেখলাম ক্যানভাসে তুমি ক্রমাগত আমাকে আর মিতুকে এঁকে যাচ্ছ, তখন মনে হলো তুমি যেন বিধাতার পক্ষ থেকে পাঠানো কোনো শিল্পী যে আমাকে আর মিতুকে ক্যানভাসে জীবন্ত করে ধরে রাখার দায়িত্ব নিয়ে এসেছ। তখন যারপরনাই কৃতজ্ঞ হয়েছিলাম তোমার প্রতি, বিশ্বাস করো। তোমাকে জানাতে কেন যেন লজ্জা করল, মনে হলো, তাতে তোমার শৈল্পিক চিন্তায় প্রভাব বিস্তার করা হবে। তাই মনের আনন্দ মনেই চেপে রাখলাম। কিন্তু আমি সত্যি জানতাম না যে, তুমি আমার মনোভাব জানতে পেরেছ। মানে, ওই যে প্রদর্শনী, হ্যাঁ, আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে আমার আর মিতুর চমৎকার ছবিগুলো সবাই দেখুক, এমন একটা গোপন ইচ্ছে থেকেই আমি ওটার আয়োজনে উঠেপড়ে লেগেছিলাম। কিন্তু তুমিও তো মানা করনি! অবশ্যি তুমি আমার কোনো ইচ্ছেতেই কখনও বাগড়া দাওনি। তবে সে যাই হোক, প্রদর্শনীর কারণে তোমার শিল্পীসত্তার প্রচার হয়েছিল, দুটো টিভি চ্যানেলে লাইভ দেখাল, জাতীয় দৈনিকগুলোতে তোমার প্রদর্শনী নিয়ে রিপোর্ট এলো। তুমি তো খুশির বন্যায় ভেসে গিয়েছিলে, ইলোরা, তবু তলানিতে পড়ে থাকল দর্শকদের ওই প্রশ্ন, প্রতিটা ছবিতে ওই নর-নারী কেন, তারা কে?

‘জানি না কেন, তোমার আনন্দ ছাপিয়ে দর্শকদের কণ্ঠস্বর আমার কানে বাজত। যেন ওই প্রথম নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, পৃথিবীতে আর কিছু ছিল না আঁকার? কেন তোমার আর মিতুর এতগুলো ছবি আঁকতে গেলাম? এটা কি আমার লুকোনো ইচ্ছা বা গভীর কামনা যে, তুমি আর মিতু এক হয়ে যাও আর আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি? বিশ্বাস করো তুমি চাইলেও আমার আর কখনও ছবির প্রদর্শনী করার আগ্রহ হয়নি। সত্যি কথা বলতে কি, দর্শকদের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আমার ছবি আঁকার ইচ্ছেটাই মরে গিয়েছিল। তোমার হয়ত মনে আছে যে তারপর থেকে আমি আর নিয়মিত ছবি আঁকিনি।

ছবি আঁকাআঁকির কথা বরং থাক। আমাদের প্রতিদিনকার কথা ভাবো। সকাল থেকে রাত অব্দি কতবার তুমি আমাকে মিতুর কথা বলতে কোনো হিসাব আছে? বলতে বলতে কখনও ভুলে তুমি আমাকে ‘মিতু’ বলে ডেকেই ফেলতে। সামান্য হেসে তোমার ভুল শুধরানোর আগে আমি সে ডাকে সাড়াও দিয়ে ফেলতাম। প্রতিটা বিষয়েই তোমার আর মিতুর কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা থাকত। বিষয় সামনে এলেই আমাকে সে স্মৃতির কথা শুনতে হতো। কোনো গান, কোনো দৃশ্য, কোনো ছবি কি, কবিতা, সমস্ত কিছু তোমাকে কেবল মিতুর স্মৃতি সামনে এনে দিত। আর অবধারিতভাবে শব্দ-গন্ধ-স্পর্শের স্মৃতিময়তার সেই সমস্ত কাহিনি চুপটি করে বসে শোনার বাধ্য শ্রোতা হয়ে উঠত হতো আমাকে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এই করতে করতে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কেটে গেছে। আচ্ছা, নাফিস, আমাদের সংসারের এতগুলো দিনে একটাবারের জন্যও তুমি এই কথাটা ভেবে দেখেছ, ভেবে দেখেছ যে বারো বছর ধরে তুমি কেবল তোমার জীবনের ফেলে আসা দুটো বছরের পুনরাবৃত্তি করে চলেছ?’

না… না না আমি ভাবিনি, ইলোরা। আমার ভাবা উচিত ছিল। আমি সত্যিই অপরাধ করেছি। কিন্তু তুমি তো আমাকে মনে করিয়ে দিতে পারতে! অবশ্যি হয়ত তুমি কয়েকবার তা চেষ্টাও করেছ। তোমার যা স্বভাব, ভাবে, কাজে-কর্মে তুমি আমাকে আমার ভুল ধরিয়ে দিতে চেয়েছ। সরাসরি চেঁচিয়ে বলা তো তোমার কমনীয়তার সঙ্গে যায় না। তুমি ছবি এঁকে বুঝিয়েছ আমি তোমার মাথার মধ্যে কী করে আমাকে আর মিতুকে ঢুকিয়ে দিয়েছি। তারপর ছবি আঁকা বন্ধ করে বুঝিয়ে দিয়েছ যে, যথেষ্ট হয়েছে আর নয়। কিন্তু নির্বোধ আর একগুঁয়ে আমি কিছুতেই তোমার সে মনোভাব ধরতে পারিনি। আসলে হয়তো-বা আমি বুঝতেই চাইনি। ইলোরা, তুমি তো জানো, মানুষ তা-ই দেখে যা সে দেখতে চায়, তা-ই বোঝে যা সে বুঝতে চায়। আর আমার এ অবস্থা দেখে দিনের পর দিন তুমি আমাকে ক্ষমার চোখে দেখেছ। অথচ তারপর, তারপর এমন কী হলো যে, তোমাকে এ রকম সিদ্ধান্ত নিতে হলো?                                                                          

‘পুনরাবৃত্তি, নাফিস, কেবল একই পথে হেঁটে চলা, একই একই কথা বলা, এসব আমি আর পারছিলাম না। মানুষ বরাবর যে কোনো কিছু মানিয়ে নেবার চেষ্টা করে; আমিও করেছিলাম। সবার ধৈর্য তো সমান নয়, কারও বেশি কারও কম। আমি বারো বছর ধৈর্য ধরেছি। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, না তুমি বদলাবে, আর বেঁচে থাকলে না আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে পারব। মানেটা তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছ, আমার আর ভালো লাগছিল না ওই মটরদানার গলার চেন, ওই মিনা করা কানের দুল, সকাল সকাল সাদা মগে ধোঁয়া ওঠা কফি, রাতে মাছের গন্ধের সঙ্গে মিতুর সঙ্গে ডিনারের অপূর্ব কোনো গল্প, বিশ্বাস করো আমার আর ভালো লাগছিল না। অথচ এর বাইরে জীবন মানে তোমাকে ছাড়া জীবন। তুমি মানেই তোমার সাজানো সংসার, সে সংসারে আমি যেন কেবল দর্শক-শ্রোতা, কখনও মিতুর কাছে পৌঁছানোর দরজামাত্র।

তাই আমি একদিন ভাবলাম দরজাটা বন্ধ করে দিই, কেমন হয় তাহলে? ঘরের মধ্যে আটকে থাকবে তুমি আর জানবে যে, মিতু বর্তমান নয়- সে স্মৃতি। তুমি আর তার কাছে যেতে পারবে না। ভাবনাটা আসতেই আমি তোমাকে এই চিঠিটা লেখা শুরু করলাম। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল কোন ছুরিটা দিয়ে পায়ের গোড়ালির রগটা কাটব। তুমি বাড়ি ফিরে দেখবে রক্তের একটা ছোট নদী, চৈত্র মাসের মতো তার উপরিভাগ স্থির, উপরে বহু ব্যবহারে জীর্ণ নৌকার মতো আমি পড়ে আছি। শুধু একটা ছোট্ট দুশ্চিন্তা রয়ে গেল, দুই বছরের ঘোর যখন তোমার বারো বছরেও কাটেনি, বারো বছরের ঘোর কাটবে কবে?

তোমার ইলোরা’

বারো বছরের ঘোর কাটবে কবে? আর তোমার ইলোরা, এই কথা দুটো আমাকে খুব কষ্ট করে পড়তে হলো। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘর দখল করে ফেলেছে। পর্দা ঘন ঘন উড়ছিল বলে সামান্য আলোর উপস্থিতিতে চোখের কাছে চিঠিটা ধরে পড়তে পারলাম। আমার আর ওঠা হলো না। মেঝেতেই পড়ে থাকলাম সারা রাত। না ঘরের বাতি জ্বলল, না চুলা জ্বলল। তবে সারারাত কেবল দুটো হাত সচল থাকল আমার, চোখ মুছতে মুছতে তারা ক্লান্ত হলো। ভোরের আলো ফুটতেই আমি ওঠার তাগিদ অনুভব করলাম। আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার প্রমাণ হিসেবে এই চিঠি নিশ্চয় যথেষ্ট। ভাঁজের সঙ্গে ভাঁজ মিলিয়ে চিঠিটা একটা খামে ভরলাম। থানায় যাবো।

আফসানা বেগম : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares