গল্প : মৌন কোলাহল : হামীম কামরুল হক

হামীম কামরুল হক ।।

আমার দরজার বাইরে কারা যেন প্রতিদিন আসে। ঘরের ভেতর থেকে টের পাই। এসে চুপচাপ থাকে। তারপর একটা সময় চলে যায়। তারা কি আমার জন্য অপেক্ষা করে? আমাকে না পেয়েই কি চলে যায়? নাকি আমারই ভুল। এবার চর এলাকা থেকে ফেরার পর আর বাইরে বের হইনি। সেখানে একটা মজার ব্যাপার হলো- একটা ছোট মেয়েকে, বয়স তাও দশ-এগারোর মতো হবে, জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘এ দেশটার নাম কী?’ কয়েকভাবে কয়েকবার বলেছি, বুঝিয়েছি। বলতে পারেনি। এটা মনের ভেতরে বেশ কয়েকটা দিন নানান দিক থেকে ঘাই দিচ্ছিল। বাইরে গেলে এমন ‘শরীরের গায়ে’ নয়ত মনের গায়ে কিছু না কিছু ধাক্কা নিয়ে ফিরতে হয়। সেটা জীবাণু হোক কিংবা কোনো কথার বা দৃশ্যের আঘাত। এ জন্যই এখন আর বাইরে যেতে ইচ্ছা করে না। তাছাড়া আমার তো বাইরে বেরোনোর দরকারও নেই। ঘরে বসেই কাজ করি।

ধৃতি আমাকে সব শিখিয়ে দিয়ে আমেরিকা চলে গেছে। দেশে সে নিজের মতো করে কিছুই করতে পারছিল না। আমিও পারছিলাম না। তারপর এই কাজ ধরি। তা-ই করে চলেছি। মাঝে মাঝে যেখানে খুশি চলে যাই। একদম একা একা। কাউকে সঙ্গে নিই না। নিতে ইচ্ছা করে না। কে যে কবে মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল : বেড়াতে হলে- একা একা। কেবল অনার্সের আগে ধৃতিকে নিয়ে কক্সবাজার-টেকনাফ-রাঙামাটিতে একটা লম্বা সফর দিয়েছিলাম। না, না, ধৃতির সঙ্গে আমার একেবারে নিপাট বন্ধুত্বের সম্পর্ক। আমাদের মধ্যে একটা চুমুও হয়নি। কেবল আমি একবার বলেছিলাম, বলেছিলাম তাও মায়ের কথার তালে, ‘আচ্ছা তোর সঙ্গে আমাকে বলে খুব মানাবে। আম্মা বলেছিল।’

মানিয়েছেই তো। তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।

সে কথা নয়।

তাহলে?

বিয়ে।

ধুস! তোকে আমি বিয়ে করতে যাব কেন রে!

কেন আমি খারাপ?

দুরো, তুই খারাপ হতে যাবি কেন! তোর মতো এমন সুইটি সুইটি কিউটি কিউটি আর কটা ছেলে আছে বল তো? বলে, আমার গাল ধরে টেনে আদর করে।

ধৃতি দেখতে সাদামাটা। কেবল এখানের মেয়েরা যা হয় লম্বায়, ধৃতি তার চেয়ে একটু বেশি লম্বা। চেহারাটা অনেকটা নম্রতা পুরোহিতের মতো। নম্রতা পুরোহিত মানে ধৃতি ফিট থাকার জন্য যার ব্যায়ামগুলো ফলো করে। আমার তো মনে হয় নম্রতাকে ফলো করতে করতে আকারে-প্রকারে ধৃতিও আরেক নম্রতা পুরোহিত হয়ে যাচ্ছে। আমাকেও শেখাতে চেয়েছিল। আমি শিখিনি। বলেছি, ‘আমার অত ফিট থাকার দরকার নেই। আর শুনেছি ব্যায়াম করে শরীর ঠিক রাখার তাল করলে- সেটা সারা জীবন চালিয়ে যেতে হয়। নইলে শরীরের বারোটা। হুম!’

কে বলেছে তোকে।… তবে ব্যায়াম তো সারাজীবনই করার জিনিস।

আচ্ছা ব্যায়াম করলে বলে সেক্স বেড়ে যায়।

তা যায়।

তখন?

তখন আবার কী! ব্যায়াম দিয়েই সেটা সামাল দিতে হয়। তার জন্য তোর কি ধারণা ব্যায়াম করলেই সেক্স  না করে থাকা যাবে না?

বলি, ‘মিনিমাম মাস্টারিটাতে…’

মার খাবি শুয়োর…!

ধৃতির সঙ্গে সব বলা যায়। একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মেয়েদেরও স্বপ্নদোষ হয় কিনা। ধৃতি বলেছিল, ‘ছেলেদের যা হয়। মেয়েদেরও তাই হয়। দুয়েকটা ব্যাপার ছাড়া ছেলে-মেয়ে তো একই, তাই না?

আমি বলি, ‘কে জানে! আমি তো তোর মতো ডাক্তারের মেয়ে নই। পড়িওনি তোর মতো এত্ত এত্ত বস্তা বস্তা!

ধৃতি ইন্টারনেটে দারুণ করিৎকর্মা হয়ে উঠেছিল। বলতাম, ‘তুই তো এখন ‘সবজান্তা বনবিবি’!’

মানে শমশেরের স্ত্রীলিঙ্গ- বনবিবি!

নিজের টাকা দিয়ে ল্যাপটপ কিনেছিল, এ জন্য কয়েক মাস ইংলিশ মিডিয়ামের একটা বাচ্চা মেয়েকে পড়িয়েছে। বিষয়টা ওর বাপ-মাকে গোপন করে করতে হয়েছিল। পরে তখন বাজারের সবচেয়ে নতুন মডেলের যেটা এসেছিল ল্যাপটপ, সেটা কিনেই টিউশনি খতম।

ধৃতি সব কিছুতে একেবারে যাকে বলে হালনাগাদ। আর আমি তো যাকে বলে কুড়ের বাদশা। বাপের এই বাড়িটা না থাকলে একটা কুড়েঘরে থাকার যোগ্যতাও নাকি আমার তখন ছিল না। ধৃতি আমাকে কম খোঁচায়নি। প্রায় বলে, ‘আমি মেয়ে হয়ে এত কিছু করছি। এত চেষ্টা করছি! তোর কোনো উদ্যোগই নেই?’

সেটাই। ধৃতির নোট পড়ে পড়েই তো বিশ্ববিদ্যালয় পাস করলাম। ধৃতি ছিল বলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর একটা মেয়ের সঙ্গে কোনো দিন ঠিকমতো কথাও বলতে হয়নি। দরকারও হয়নি। যেখানে যাও- ধৃতি সঙ্গে। ধৃতিও যেখানে যাবে আমাকে নিয়ে যাবে। সারা ভার্সিটি লাইফ ফুলহাতা লম্বা ঢোলা জামা, জিনসের প্যান্ট আর জুতা পরে পার করেছে। আর কাঁধে একটা হ্যাভারস্যাক। ধৃতি বলে, ‘তোর চেহারাটা একটু ভালো বলে, নইলে তোর সঙ্গে মিশতামই না। কোনো কিছু নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। এই তুই কি মরা মানুষ নাকি?’

ধৃতির এসব শুনে আমি কেবল হেসেছি। হো হো হা হা। ধৃতির কী বকা, ‘অসভ্য একটা। ইতর একটা। পাজির পা ঝাড়া!’

তখন হলে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে আমার তেমন কোনো কথা হতো না। তাদের ধারণা ধৃতির সঙ্গে আমার সব হয়। নিয়মিত হয়। আসলে তো ধৃতির হাত ধরেও কোনো হাঁটিনি। রাস্তা পার হওয়ার সময়ও কেউ কারও হাত ধরিনি। আমি আশ্চর্য হতাম- আচ্ছা, মানুষ কি ছেলেমেয়েদের মধ্যে ওই সেক্স ছাড়া আর কোনো সম্পর্কের কথা ভাবতে পারে না?

ধৃতির ‘ধুস!’ শুনে আমি বলেছিলাম, ‘তাহলে আমার কী হবে?’

তোর কী হবে মানে?

আমার তো কোনোদিন বিয়েই হবে না।

আচ্ছ বাবা, চিন্তা করিস না। আমি আমেরিকা থেকে ফিরি। তারপর আমি এসে একটা ভীষণ ভালো লক্ষ্মী মেয়ে দেখে তোর বিয়ে দেব।

তাও তুই নিজে আমাকে বিয়ে করবি না?

ধৃতি মাথা নেড়ে বলে, ‘না। আরে পাগলা এটা সম্ভবই না। ইয়ু আর নট মাই ম্যাচ অ্যাট অল।’

মানে!

এখন বলব না। পরে।

একটু থেমে বলে, ‘আরে বাবা তোর কোনো চিন্তা করতে হবে না। তোর লাগবে- টাকা?’

আমি বলি, ‘না।’

তো?

তোকে!

ধুরো। একদম ফাজলামি করবি না।

ফাজলামি না, সিরিয়াস।

এই তুই আমাকে বিয়ে করতে চাস। করলে খাওয়াবি কী? কিছু করার মুরোদ আছে তোর?

কেন আমি খাওয়াব কেন? তুই রোজগার করবি। আমি বাড়ির সব কাজ করব। বাচ্চার দেখাশোনা করব। মানে তুই হবি আমার স্বামী, আমি হবো তোর ঘরের বউ। সমস্যা আছে কোনো?

ধৃতি আমার মাথায় একটা হালকা গাঁট্টা মেরে মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে চলে যায়।

ধৃতি চলে যাওয়ার দিন মনে হচ্ছিল অনেক কান্নাকাটি করব। কিন্তু তার বদলে কেমন একটা আনন্দও হচ্ছিল। কীসের জন্য সেটা হচ্ছিল তখন বুঝিনি। আমি একেবারে নিজের মতো থেকে দেখতে চাইছিলাম, কারও ওপর কোনো নির্ভরতা থাকবে না, কেউ সারাক্ষণ ফোনে আমার খোঁজ নেবে না, উঠতে বসতে বকবে না, জামা-কাপড় তার পছন্দমতো কিনে দেবে। বলবে, ‘না, আমি যেটা পছন্দ করি সেটা পরবি। আপ রুচি খানা। পর রুচি পরনা।’

এ করো না, তা করো না, হাত দিও না। আমি কি বাচ্চা ছেলে?

শুধু বাচ্চা না। একেবারে কাচ্চাবাচ্চা! খোকাবাবু সোনা একটা।

বলে আমার গাল টেনে ধরে পুরো মাথাটা ডানে-বাঁয়ে নাড়াবে। আমি কিছু খেতে গেলেও আমার খাবারের পছন্দ দেখলে ও ‘ছ্যা ছ্যা’ করে উঠবে।

আমি বলব, ‘ঘটির বাচ্চারে, তোর জন্য আমি কিছু করতে পারলাম না জীবনে।’

ধৃতি বলে, ‘তা পারবি কেন? ভেড়া একটা।’

আমি বললাম, ‘আমি ভেড়া নই। আমি ঘোড়া।’

মানে?

আমি অশ্বপুরুষ।

সে আবার কী!

বাৎসায়ন-সূত্রে।

শয়তানের বাচ্চা।

এটা বাংলাদেশ বলে। নইলে একেবারে ফাটিয়ে দিতাম দুনিয়া।

ছি ছি! কী কথা। তোর মুখে এত কথা ফুটল যে! তাও কী কথা। ফাটিয়ে দিতাম! অসভ্য ইতর বদের বদ একটা।

ধৃতি চলে গেছে, কিন্তু  আমাকে শূন্য করে দিয়ে যায়নি। বরং ‘ধৃতিময় আমি’ আর ‘ধৃতিহীন আমি’Ñ দুটোকে খুব ভালো করে বুঝে নিতে পারছিলাম। কে জানে, আমি হয়ত বিসিএস-ও দিয়ে দিতে পারি। ধৃতির নোট পড়ে রেজাল্ট তো খুব খারাপ হয়নি। আর ইংরেজি, গণিতটা ভালো শিখেছিলাম। ধৃতির কারণেই। কিন্তু কে জানে আমার ইচ্ছা যদি হয়। ধৃতির কারণে কম্পিউটারে আমাকে এতকিছু শিখতে হয়েছিল। এখন আমি যা করি তাতে নিজেকেই তো নিজের বিশ্বাস হয় না যে, আমাকে দিয়ে এটাও করা সম্ভব ছিল। কাগজে ফিচার হলো, টিভিতে আউটসোর্সিংয়ে সফল ছেলেমেয়েদের নিয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া হলো আমাকে। ধৃতি নাকি আমেরিকা বসে দেখেছিল আমার সে সাক্ষাৎকার। ফোন করেছিল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে- কি পরের দিনও হতে পারে। যা কোনোদিন ধৃতির মধ্যে দেখিনি, শুনিনি- সেটা হয়েছিল সেদিন। সে কী কান্না। হাউমাউ করে। বার বার বলছিল, ‘তুই তো এখন দিব্যি আছিস! এক্কেবারে লায়েক হয়ে গেছিস! আমাকে তোর আর লাগবে না!’

আমি এটাই বুঝি না- যখন ছিল এদেশে, বার বার বলত- নিজের মতো চলতে শেখ। মানুষ হ। আমার ঘাড় থেকে নাম। আর এখন আমি এত ইনকাম করছি বলে, এখন উল্টা কথা।

আমি বলেছিলাম, ‘তোর কী ধারণা আমি তোকে ছেড়ে দেব!’

তো কী করবি!

আমি যে ঘোড়া সেটা প্রমাণ করব। আমি তোর বা কারও ভেড়া নই।

মানে কী!

মানে হলো, আমার যৌবনের মৌবনে ফুল ফোটাতে হবে। কাউকে বেছে নিতে হবে। সময় এসে গেছে। নইলে কবে আমার নিজেকেই বলতে হবে, ইয়োর টাইম ইজ আপ। নাউ ফাক ইয়োরসেল্ফ অ্যান্ড হ্যাভ অ্যা সেল্ফি উইথ ইয়োর ফাকিং ডিক! হা হা হা।

কত্ত বড় শয়তান হয়েছিস তুই! এত্ত বড় কথা।

তুই তো এই চেয়েছিলি, তাই না।

আমি ফোন ছাড়ছি।

শালা, পৃথিবীর যেখানে যাবি তোর ঘটিগিরি বজায় রাখবি।

ধৃতির দাদা ১৯৫২ সালে খুলনায় চলে আসেন। অপশন দিয়ে। তারপর থেকে খুলনায় ছিলেন ওর বাপ-চাচারা। বাপ পাকিস্তান মিলিটারিতে ডাক্তার হিসেবে ঢুকেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্রিপুরায়। স্বাধীনের পর ইস্তফা দিয়ে নিজের মতো করে আবার শুরু করলেন লেখাপড়া। নিজের চেষ্টায় স্কলারশিপ জোগাড় করে ইউরোপে গেলেন। ফিরে এসে নিজের ক্লিনিক। তারই তো মেয়ে নুসরাত ইয়াসমিন ধৃতি। ধানমন্ডিতে দুই বিঘার ওপর ওদের বিশাল বাড়ি। আর আমাদের মালিবাগের বাপের তোলা এই ছাপরা ঘর। মানে একতলা পাকাবাড়ি, টিনের চালা। বড় ভাই অবশ্যি উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। কাছেই বেইলি রোডে থাকেন। প্রতি সপ্তাহে বৌ-ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেড়িয়ে যান। একেবারে পরিপূর্ণ জীবন। আমি ইংরেজিতেও ভর্তি হতে পারতাম। কিন্তু ভাইয়াই আমাকে জোর করে বায়োটেকনোলজিতে ভর্তি করায়। বলে, আগামী পৃথিবী হলো বায়োটেকনোলজির পৃথিবী। তখনও ভাইয়ার ছেলেমেয়েরা ছোট ছোট। এখন তাদের নিয়ে ব্যস্ত। আমাকে দেখলে বলে, ‘কী তুই কিছু করবি, না আমি কিছু করব?’ তিনি কোথাও বলে দিলে আমার আসলেই একটা চাকরি হয়ে যায়।

ধৃতি চলে যাওয়ার পর যে কী হলো, একটা জিদের দুধ জমে দৈ হতে শুরু করল – আমি ঠিক যা কিছু করব নিজের চেষ্টায়। ভাইয়াকেও সেটা আভাসে-ইঙ্গিতে বলেছি। তার সাহায্য আমার লাগবে না। ভার্সিটিতে পড়ার সময় আমার কোনো কোনো বন্ধু বলতো- ‘আবিরের আর চিন্তা কী! পাস করলেই কেল্লাফতে। ভাই এত বড় চাকরি করে!’

আমি কেল্লা বা কল্লা কোনোটাই ফতে করতে চাই না। আমি এখন চাই আমার নিজের যতটুকু ও যা কিছু করার যোগ্যতা আছে সেটা পরখ করতে।

আর সেটা যত বাড়ছিল, আমি টের পাচ্ছিলাম আমাকে ভিড় করে যেন কী এবং কারা প্রতিদিন ঘরের দরজার বাইরে আসে। অনেক দিন ধরেই আমি টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু এত ক্লান্ত লাগে। অনেক সময়ই আমাকে রাত জাগতে হয়। তারপর টের পাই দরজার সামনে, বন্ধ জানালার ওপাশে কারা যেন এসে ভিড় করেছে। একটা হালকা খস খস, সঙ্গে কিছুটা মৃদু গুঞ্জনও।

ধৃতি এমন করে কাঁদল আর আমার অনেক শান্তি লাগল। আসলে কি আমরা টেরও পাইনি কেমন একটা গোপন পাল্লা দেওয়ার ব্যাপার ছিল আমাদের ভেতরে। ঈর্ষাও হয়তো। কে জানে! একসঙ্গে থাকার সময় তো এটা কল্পনাও করিনি। যত সময় যায়, মানুষ দূর থেকে দূরে চলে যায়। একা হতে হতে, আরও একা হতে  হতে, চরমতম একা হয়ে যায়। তখন আগের অনেক না বোঝা ও না দেখা কিছু নতুন করে বুঝতে পারে, দেখতে পারে। আমি মনে হয় সেই দশায় এসে গেছি। কিন্তু এখন আমার একটা কঠিন প্রেম দরকার। কিন্তু সময় কোথায়? এখন অন্য এক নেশায় আমি মাতোয়ারা দিনরাত্রি। কাগজে ফিচার, টেলিভিশনেও ওই সাক্ষাৎকারের পর সবচেয়ে বড় কথা ধৃতির ফোন আর কান্নায় আমার অন্য সবকিছু ভেসে গেছে। একটা জেদ আর কী একটা শান্তি মিলেমিশে অন্যকিছুর রসায়ন তৈরি হয়েছে আমার শরীরের প্রতিটি রক্তের ফোঁটায়। সেই রক্তের কোথাও হয়তো অন্য টানে আমি সেদিন রাতে দরজার কাছে যাই।

আমাদের বাসাটার সামনে কিছুটা খোলা আর পেছনে অনেকটা জায়গা। সেখানে রীতিমতো আম-কাঁঠালের বাগান। প্রায় আট কাঠা ওই জমিটার ওপরে এখন অনেক ডেভেলপারের চোখ। আমাদের বাসাটা অনেকটাই ভেতর দিকে, তাতে কী? জমি পেলে ডেভেলপাররা আসমানে কি হাওয়ার ওপরে বাড়ি তৈরি করে দিতে রাজি আছে।

দরজাটা খুলে আমি চমকে উঠি, থমকে দাঁড়াই। আকাশে সেদিন চাঁদ ছিল কিনা জানি না। রাত ক’টা বাজে সে খেয়ালও আমার ছিল না। দেখি, আমাদের বাসার সেই পেছনে বাগানে এখানে-ওখানে ছয়জন লোক এবং সেগুলো কেউ নয়, আমি। আমারই নকল। আমারই প্রতিমূর্তি। তিনজন দাঁড়িয়ে, আগু-পিছু করে তিন জায়গায়। আর তিনজন তিনটা গাছের ডালে, তিন রকম ভঙ্গি করে বসে আছে। ছয়জনই কী সব বিড়বিড় করে বলছে, আমার দিকে চাইছে আর বিড়বিড় করছে একে অন্যের সঙ্গে।

আমি বিস্ময়ে হতবাক। না, কোনো ভয় পাইনি। ভয় পাওয়ার আগেই মূর্তিগুলো একেবারে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

কী বলছিল ওরা?

কী বলতে চাইছিল ওরা?

আমি সম্বিৎ ফিরে পেতেই মনে হয় ভুল দেখেছি। পরে আবার মনে হয়। আমাকে আমার মতো দেখতে লোকেরা কেন ভয় দেখাতে আসবে? তারা নিশ্চয়ই কিছু বলতে চায়। আমাকে তাদের কথা শুনতে হবে। বুঝতে হবে। হয়ত আরও দু-একটা রাত এর জন্য আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। তারা হওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার আগেই যাতে আমি তাদের কথাগুলো বুঝতে পারি, সেজন্য সর্বইন্দ্রিয় দিয়ে চেষ্টা করতে হবে।

আর একটু নিশ্চিত হতে হবে- আমার মাথা পুরোটাই ঠিক আছে কিনা।

হামীম কামরুল হক : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares