গল্প : ছিনতাইকারীর চোখ : রাশেদ রহমান

রাশেদ রহমান ।।

রিকশাটি দেখেই আমি বুঝতে পারি আমার  চোখ দুটো চকচক করছে। নিজের চোখ, আয়নার সামনে না দাঁড়ালে দেখার কোনো সুযোগ নেই, কিন্তু আমি আমার চোখ দেখতে পারি। ঠিক চোখের সামনে দেখা বলতে যা বোঝায় তা না ঘটলেও  আমার চোখ কখন ছোট হয়, কখন বড় হয়, কখন ধনুকের মতো বাঁকা হয়, কখন চোখের রঙ বদলাতে শুরু করেÑ সবই আমি বুঝি।

এই যে শিকার দেখলেই আমার চোখ চকচক করে কিংবা চোখের আকারে কী রঙের পরিবর্তন ঘটে, এটা মহাখালি কি যাত্রাবাড়ি, গুলিস্তান কি মিরপুর, সদরঘাট কি দয়াগঞ্জ; আমাদের লাইনের ঢাকার কোনো শালাই কিন্তু টের পায় না; বোঝে বা ধরতে পারে একমাত্র জাহাঙ্গীর ওস্তাদ।

তখন আমার বয়স পনেরো কি ষোলো, বছরখানেক আগে এই লাইনে পা রেখেছি; মেহের ওস্তাদের সাগরেদ, মানিক-রতন-সুরুজের সাথে ভোরবেলা, ঢাকা শহরের ঘুম ভাঙার আগেই রাস্তায় দাঁড়াই। কোনোদিন আব্দুল্লাহপুর, কোনোদিন উত্তরা, কোনোদিন মহাখালি। কিন্তু তখনও রাস্তায় দাঁড়ালেই আমার পা কাঁপে। বুক কাঁপে। আমার এই কাঁপাকাঁপি দাঁত-মুখ খিঁচে যথাসম্ভব ঢেকে রাখার চেষ্টা করি- যাতে মানিক-রতন-সুরুজ বুঝতে না পারে আমি ভয় পাচ্ছি। ওরা তিনজনেই আমার চেয়ে বয়সে বড়। লাইনেও আছে অনেকদিন ধরে। তিনজনেই প্রায় ওস্তাদ হয়ে উঠেছে। ওরা রিকশাযাত্রীর গলার চেইন কি ভ্যানিটি ব্যাগ বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে চোখের পলকে কোথায় গিয়ে যে লুকায়, খুঁজে পাওয়ার জো নেই। চাকু হাতে পথচারীদের সামনে দাঁড়াতেও ওরা ওস্তাদ। চাকুর ভয়ে, প্রাণটা রেখে, আর সবকিছু আপসে-আপ হাতে তুলে দিলে ভালো, না দিতে চাইলে কিংবা চিৎকার-চেঁচামেচি করলে শিকারের বুকে চাকু বসিয়ে দিতেও পরোয়া করে না ওরা। মানিক পাবনার ছেলে, রতন চাঁদপুরের; সুরুজ আমার দেশি- আমরা দু’জন শরীয়তপুরের। আমি লাইনে নতুন, বয়সে কম; ওরা আমাকে ছোটভাইয়ের মতোই আদর-স্নেহ করে। কিন্তু রাস্তায় আমার পা কাঁপা ওরা বরদাশত করে না। আমার পা কাঁপছে- এটা দেখেই ওরা আমাকে ‘মেয়েমানুষ’ আখ্যা দিয়ে খুব হাসাহাসি করে। মানিক তো একটা খবিস। র‌্যাব-পুলিশের শিকারি কুকুরের মতো ওর দৃষ্টি ও ঘ্রাণশক্তি খুবই প্রখর। ও সবার আগে টের পায় আমার পা কাঁপছে। আর আমার পা-কাঁপা দেখলেই খবিসটা আমাকে চেপে ধরে, আমার ঠোঁটে চুমু খায়। মুখের লালা ছাড়তে ছাড়তে বলে- আমার শ্রীদেবী যে কেন এই লাইনে এসেছে…!

আমার তখন রাগে-দুঃখে-ঘেন্নায় কাঁদতে ইচ্ছে করে, লাইন ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে; গ্রামে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কোনোকিছুই করতে পারি না। জানি, কান্নাকাটি করলে মানিক আরও বেশি ত্যাঁদরামি করবে। হয়তো আমার পরনের প্যান্টও খুলে ফেলবে। রতন বা সুরুজের তখন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। এই লাইনে সিনিয়রদের খুব দাম। কোথাও তারা ন্যায় করুক কি অন্যায় করুক- সেখানে জুনিয়রদের কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। মানিক-রতন-সুরুজ- এই তিনজনের মধ্যে মানিক সিনিয়র…।

লাইন ছেড়ে দেব? সম্ভব না। উপায় নেই। মেহের ওস্তাদ যেদিন আমার হাতে চাকু ধরিয়ে দিল, সেভেন গিয়ারের চাকু; গিয়ারে চাপ দিলে কড়কড় করে বাঁটের ভেতর থেকে বরফের মতো সাদা চাকু বেরিয়ে আসে; ওস্তাদ সেদিনই বলেছিল- রাজেশ, এই যে চাকু হাতে পথে নামলি, এরপর পিস্তল পাবি; এই পথ তোকে কোনোদিন ছাড়বে না, এই পথ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই- কথাটা মনে রাখিস। লক্ষ্মীপুরের ল্যাংড়া কামাল আমার ওস্তাদ ছিল, মাইডিয়ার লোক; দুর্দান্ত সাহসীও ছিল, ল্যাংড়া মানুষ, তারপরও গণপিটুনির ভেতর থেকে কীভাবে যে বেরিয়ে যেত- ভেবে পাই না। নিজে যত বিপদেই পড়ুক, কোনো সাগরেদকে বিপদে পড়তে দিত না। পুলিশের সাথে ওস্তাদের খুব খাতির ছিল। সেই ওস্তাদ, আমাকে ছেলের মতো আদর করত; আহারে রাজেশ, তার কথা মনে হলেই আমার চোখে পানি আসে, দ্যাখ, এই যে আমার চোখে পানি এসে গেছে; যাত্রাবাড়ীর মোড়ে গণপিটুনিতে মারা গেল সে, পুলিশও তাকে বাঁচাতে পারল না। জেনে রাখ রাজেশ, ওস্তাদের যে পরিণতি হয়েছে, ওস্তাদ যে-পথে গেছে, বাবা রাজেশ, আমাদের জন্যও পথ ওই একটাই…।

তাহলে…?

আমি মরতে চাইলেই তো মরতে পারব না। আমার জন্য যাত্রাবাড়ি কি গুলিস্তান, মিরপুর কি দয়াগঞ্জ; কোথাও না কোথাও নির্ধারিত হয়ে আছে গণপিটুনি। আর এই লাইন যে ছেড়ে দেব, লাইনটার সাথে আমি মানিয়ে চলতে পারছি না; কিন্তু ছেড়ে দিয়ে আমি যাব কোথায়? আমার তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই। গ্রামে থাকতে কয়েক ক্লাস লেখাপড়া করেছিলাম, যে-ক’দিন স্কুলে গেছি, তখন বাংলাদেশ ও বিশ^পরিচয় বইয়ে পড়েছিলাম- বাংলাদেশের আয়তন ৫৫ হাজার ৫৭০ বর্গমাইল। এই ৫৫ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে আমাদের গ্রামটি, শরীয়তপুরের আনন্দপুর; এখন বাংলাদেশের মানচিত্রে নাই, পদ্মার পেটে গেছে; আমাদের গ্রামটিও নাই, মা-বাবাও নাই, বোন দুটিও নাই; তাহলে লাইন ছেড়ে দিয়ে আমি কার কাছে যাব?

ছোটবেলায় দেখেছি, গাঁয়ে আমাদের বেশকিছু জমিজমা ছিল। বাড়িতে আধা পাকা ঘর, গোয়ালভরা গরু, গোলাভরা ধানও ছিল আমাদের। কিন্তু একরাতে রাক্ষসী পদ্মা সবকিছু গিলে ফেলার পর আমরা, শুধু আমরাই বা কেন, গাঁয়ের প্রায় সবাই ভিখারি বনে যাই। বাবা ছিল শৌখিন মানুষ, গানবাজনা, যাত্রাপালা কিংবা মাছধরা- এসব নিয়ে সে মেতে থাকত। বাড়ির কামলাজামলারা করত গেরস্থালির কাজ। তো, আবাদি জমি, ভিটেবাড়ি হারিয়ে মনের দুঃখে না কী কারণে, এখনও তা আমি বুঝে উঠতে পারিনি, বাবা মাকে ছেড়ে, আমাকে এবং আমার বড় দু’বোনকে ছেড়ে একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। বছর না-ঘুরতেই মা এবং বোন দুটোও নিরুদ্দেশ! তারা কোথায় আছে, বেঁচে আছে কি মরে গেছে; কিচ্ছু জানি না; তখন আমার বয়স কম ছিল, আমার মতো একটা কিশোর ছেলে, পদ্মার তীরে তীরে তখন ঘুরে বেড়াই, মা-বাবাকে খুঁজে ফিরি; বোন দুটিকে খুঁজে মরি; কারও সন্ধান মেলে না; কোনোদিন খেয়ে, কোনোদিন না-খেয়ে আমার দিন-রাত কাটে, তখন এক রাতে সদরঘাটের লঞ্চে চেপে বসি…।

মেহের ওস্তাদ আমাকে সদরঘাট থেকে উদ্ধার করে। পরে ওস্তাদের মুখেই শুনেছি, আমি ঘাটের একটা বেঞ্চে মড়ার মতো পড়ে ছিলাম। হুঁশ-জ্ঞান ছিল না। ওস্তাদ ভোরের কাজ শেষে ঘাটপাড়ে এসেছিল, তখনই আমি তার চোখে পড়ি। ওস্তাদ আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। দু’দিন পর, সুস্থ হলে তার ডেরায় নিয়ে আসে…।

ওস্তাদ, মানুষটা খুব ভালো। মদ-গাঁজা খায়, তা ঠিক, কিন্তু দিলদরিয়া মানুষ। এই লাইনের সবাই নাকি নেশা করে। ক’দিন পর আমিও হয়তো মদ-গাঁজা ধরব। কেউ কেউ তো হেরোইনও টানে। টানুক। দেখছি তো, এই লাইনের ওস্তাদ কি সাগরেদ, কারওরই শেকড়-বাকড় নাই, সবাই আমার মতো ভাসা পানা। যাই হোক, যা বলছিলাম; মেহের ওস্তাদ যে-লাইনের লোক আমাকেও ওই লাইনে নিয়ে এসেছে, ঢাকা শহরে, তার এলাকায়, ওস্তাদরা কয়েকজনে মিলে শহরটাকে ভাগ করে নিয়েছে; কোন রাস্তায় কখন দাঁড়ালে শিকারের ঘ্রাণ নাকে এসে বোয়াল মাছের মতো ঘাই মারে, ওস্তাদ আমাকে চিনিয়েছে। হাতে ধরে শিখিয়েছে শিকার ধরার কৌশল, শিকার শেষে পালানোর কৌশল। পুলিশের খাতায় নামও লিখিয়ে দিয়েছে। থানায় নাম থাকাটা নাকি এই লাইনের লোকদের জন্য নিরাপদ। বেওয়ারিশ কুকুরের মতো পথে-ঘাটে কারও লাথিগুতো খেতে হয় না। তো, এতকিছু করেছে মেহের ওস্তাদ, কী করে তাকে ছেড়ে যাই!

তখন, এই লাইনে আমার পাঁচ বছর কেটে গেছে, গাঁজাও ধরেছি; রাস্তায় দাঁড়ালে তখন আর আমার পা কাঁপে না, শিকারের বুকে প্রয়োজন হলে চাকুও বসিয়ে দিতে পারি, অবশ্যি কারও বুকে চাকু মারার তেমন একটা দরকার হয় না; শিকার তো বেছে বেছেই ধরি, বিশেষ করে ধনী-ঘরের মহিলারাই আমাদের টার্গেটের মধ্যে থাকে, চাকু বের করতেই, চকচকে চাকু দেখেই ওরা হাতে-কানে-গলার সব গহনা, ভ্যানিটি ব্যাগের সব টাকা-পয়সা সুড়সুড় করে দিয়ে দেয়। তখন ওরা চিৎকার-চেঁচামেচি বা কান্নাকাটি করার কথাও ভুলে বসে। আমরা কেটে পড়ার পর, সবসময় এই দৃশ্যই দেখি, ওরা তখন কান্নাকাটি শুরু করে। যাই হোক, তখন, একদিন ভোরবেলা কল্যাণপুর মোড়ে শিকার ধরে আমি এমন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, যা আমার কল্পনার মধ্যেও ছিল না। ঘেন্না ধরে যায় এই লাইনের প্রতি এবং নিজের প্রতিও। আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি; না, এই লাইনে আর না। মরে গেলেও না।

দুই

মানিক-রতনের মুখে ঘটনা শুনে মেহের ওস্তাদ আমাকে ১৫ দিনের জন্য সাসপেন্ড করে ঘরে বসিয়ে রাখে। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। ওস্তাদ মানুষ ভালো, বলেছি আগে, কিন্তু কেউ শিকার ছেড়ে দিলে রাগে আহত বাঘের মতো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, সে আর তখন মানুষ থাকে না। যে সাগরেদ শিকার ছেড়ে দেয়, হয়তো উপায়ন্তর না দেখে বাধ্য হয়েই ছেড়ে দিয়েছে, তারপরও ওস্তাদ তার প্রিয় শিষ্যের পিঠ চাকু দিয়ে কেটে ফালা ফালা করে। তারপর কাটা-পিঠে ছিটিয়ে দেয় মরিচের গুঁড়ো। আমাকে সাসপেন্ড করেছে, এ আর তেমন কি!

ঘটনাটা এ রকম।

আমরা চারজন; আমি আর মানিক-রতন-সুরুজ কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডের কিছুটা আগে রাস্তায় দাঁড়িয়েছি। তখন প্রাক-ভোর। চারটার মতো বাজে। রাস্তা একদম ফাঁকা। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গলদঘর্ম লোকজন কিংবা ডায়াবেটিসের রোগীরাও তখন রাস্তায় বের হয়নি। আমরা চারজনেই গাঁজার বিড়ি টানছি; তবে চোখ খুলে রেখেছি, বাজপাখির মতো শ্যেনদৃষ্টি মেলে খেয়াল রাখছি কোনোদিক থেকে শিকার আসে কিনা।

মানিকের ঘ্রাণশক্তি খুব প্রখর। অনেক দূর থেকেই শিকারের ঘ্রাণ ওর নাকে ঘাই মারে। মানিক উত্তর দিকে ইঙ্গিত করে বলল- সুরুজ আর রাজেশ রাস্তার ওইপারে যা। ওই যে দ্যাখ, শিকার আসছে। মালদার পার্টি।

উত্তর দিকে তাকিয়ে দেখলাম- একটা যুবতী মেয়ে দ্রুত হেঁটে আসছে। মেয়েটি আমাদের কাছাকাছি আসতেই আমরা ওকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরলাম। মানিকের সেভেন গিয়ার কড়কড় করে উঠল। বাঁটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো চকচকে চাকু।

মেয়েটি বললো, আপনারা?

মানিক বলল, উত্তর দেয়ার টাইম নাই। গয়নাগাট্টি, টাকা-পয়সা যা আছে জলদি বের করুন। চেহারা দেখে তো মনে হয় বড়লোকের মেয়ে।

মেয়েটি তখন কেঁদে ফেলেছে। চোখ থেকে দরদর করে পানি পড়ছে। মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতেই বললো- বিশ্বাস করুন, আমার কাছে কিচ্ছু নাই।

মানিক তখন ভদ্র-ভাষা ত্যাগ করল। বানরের মতো মুখ খিঁচিয়ে বলল- বাজে কথা রাখ মাগি। যা আছে তাড়াতাড়ি দিয়া দে। নইলে এই যে সেভেন গিয়ারের চাকু, শাওয়ার মধ্যে ঢুকাইয়া দিমু।

মেয়েটির সামনে তখন আর কোনো পথ খোলা নাই। এরকমই হয়- সর্বস্ব হারানো মানুষের কথা কেউ বিশ্বাস করে না। তারপরও শেষ চেষ্টা করলো মেয়েটি। বলল- ভাই, আমি দৌলতদিয়া ঘাটের মেয়ে, দু’দিন আগে মিরপুরের এক লোক আমাকে নিয়ে এসেছিল, তিন বন্ধুতে মিলে আমার সব ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়েছে; কিন্তু একটা কানাকড়িও দেয়নি। কিছুক্ষণ আগে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে গেছে।

আমরা মানুষের টাকা জোর করে কেড়ে নিই। আমরা নষ্ট মানুষ। এখন দেখছি দেশে আমাদের চেয়েও নষ্ট মানুষ আছে। পতিতার টাকাও মেরে দেয়। ছিঃ! এত নিচেও নামতে পারে মানুষ! ভাবতে ভাবতে আমি মেয়েটির মুখের দিকে তাকালাম। এতক্ষণ ভালো করে ওর দিকে তাকাইনি। কথাটথাও কিছু বলিনি। জানি তো, দলে মানিক থাকলে অন্য কাউকে কিচ্ছু করতে হয় না। ও একাই সবকিছু করে। কিন্তু মেয়েটির মুখের দিকে তাকাতেই, ধারেকাছে কোথাও বজ্রপাত হলে মানুষ যেভাবে চমকে ওঠে, সেভাবেই আমি চমকে উঠলাম। একি! কার সামনে আমরা দাঁড়িয়েছি সর্বস্ব লুট করে নিতে? মেয়েটি যে অনি, আমার ছোট বোন!

রাজেশের সামনে তখন তার ছোট বোন অনি, দৌলতদিয়া ঘাটের পতিতা; বোনটি কতদিন ধরে নিখোঁজ, রাজেশ কত জায়গায় যে তাকে খুঁজেছে, কোথাও বোনের খোঁজ পায়নি; এখন ঘটনাচক্রে তার সামনে এসেছে, তাও আবার পতিতা হিসেবে; রাজেশ কি আর রাজেশ থাকতে পারে তখন, আপনারাই কেউ বলুন…?

আমি বাঘের মতো হুঙ্কার ছাড়লাম। মানিক যে লাইনে আমার সিনিয়র, তাকে এই লাইনের নিয়মমতোই আমি যা ইচ্ছে তাই বলতে পারি না, তা ভুলে গিয়ে ওর নাম ধরে চিৎকার করে বললাম- মানিক, তুই সরে দাঁড়া। চাকু বাঁটের ভেতরে ঢোকা…।

আমার ব্যবহার দেখে, আমার কথা শুনে, এই লাইনে যা কখনও হয় না তাই হতে দেখে মানিক স্তম্ভিত। বিমূঢ়। মুখের ভাষাও যেন হারিয়ে ফেলেছে। কী বলবে আমাকে তাও খুঁজে পাচ্ছে না। মানিক, শুনছি, যে কিনা ওস্তাদ হয়ে খুব শিগগিরই নতুন দল গঠন করবে, মেহের ওস্তাদও সায় দিয়েছে; সে ফ্যালফ্যাল করে একবার আমার দিকে, একবার রতন-সুরুজের দিকে, একবার মেয়েটির দিকে চোখ ঘোরাতে লাগল, যেন সে যা দেখতে চাইছে, খুঁজছে; তা ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।

আমি মানিকের এই চোখ ঘোরানোকে পাত্তা দিলাম না। সরাসরি মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- আপনার নাম অনি?

না তো!

আপনার বড় বোনের নাম মনি…?

আমার কোনো বড় বোন নাই।

আপনার ছোট ভাইয়ের নাম রাজীব?

কী বলছেন এসব? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

অনি এখন ঘাটের মেয়ে, ও যে এখন ওর পূর্বপরিচয় প্রকাশ করবে না- এটা আমার বুঝে আসতেই আমি হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলাম। মা-বাবা এবং বোন দুটিকে হারানোর পরও এভাবে আমি কখনওই কাঁদিনি।

তখন আমি সাসপেন্ড, রাস্তায় বেরোতে পারি না; একদিন জাহাঙ্গির ওস্তাদ এলো আমাদের ডেরায়। জাহাঙ্গির ওস্তাদের নাম শুনেছি, জানি- পুরনো ঢাকার বেশিরভাগ এলাকাই জাহাঙ্গির ওস্তাদ কন্ট্রোল করে, কিন্তু তাকে, এই পাঁচ-ছয় বছরেও সামনাসামনি কখনও দেখিনি। মানিক-রতনের মুখে শুনেছি, ঢাকার ওস্তাদদের পারস্পরিক সম্পর্ক খুবই চমৎকার। শহরটাকে ভাগাভাগি করে নিয়েছে, কেউ কারও এলাকায় নাকগলানি করে না। সুযোগ হলে এক ওস্তাদ আরেক ওস্তাদের ডেরায় আড্ডা মারে। যে আসে, সে মদের বোতল নিয়েই আসে। সেদিন যেমন জাহাঙ্গির ওস্তাদ নিয়ে এসেছিল।

মানিক-রতন তখন ডেরায় ছিল না। সেদিন ওরা দুপুরেও রাস্তায় নেমেছিল। আমি আর সুরুজ ডেরায় ছিলাম। দু’জনেই হুকুম তামিল করছিলাম মেহের ওস্তাদের। পানির বোতল দিচ্ছি। মুড়ির টিন দিচ্ছি। পেঁয়াজ-মরিচ কেটে দিচ্ছি। সুরুজই আমাকে চিনিয়ে দিয়েছিলÑ লোকটি জাহাঙ্গির ওস্তাদ। আমাদের লাইনে পুরনো ঢাকার রাজা।

কাটা পেঁয়াজ-মরিচের বাটি হাতে দুই ওস্তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, দু’জনের হাতেই মদের গ্লাস; দু’জনের চোখই আংড়ার আগুনের মতো লাল; জাহাঙ্গির ওস্তাদ আমাদের ওস্তাদকে জিজ্ঞেস করলো- ছেলেটি কে রে মেহের, আগে তো দেখি নাই।

বহুকাল পরে এসেছো আমার ডেরায়, ওকে আগে কোনোদিন নাও দেখতে পারো। ওর নাম রাজীব। বাড়ি ডামুড্যা, শরীয়তপুর। ওকে আমি রাজেশ নামে ডাকি। একটা অপদার্থ।

কী রকম…!

রাস্তায় শিকারের সামনে দাঁড়াইয়া কান্নাকাটি করে।

তাই নাকি?

হুম…।

কিন্তু ওর চোখটা?

মেহের ওস্তাদের চোখ তখন বুজে এসেছে। জাহাঙ্গির ওস্তাদ যে বললো- ‘ওর চোখটা’, তা সে শুনলো কি শুনলো না বোঝা গেলো না। ঘুমঘুম চোখে বলল- ওকে সাসপেন্ড করেছি।

সাসপেন্ড?

হুম।

ছেলেটাকে ধার দে, মেহের। আমি ওকে নিয়া যাই।

তিন

সেই থেকেই আমি জাহাঙ্গির ওস্তাদের সাথে আছি। ইউরোপের বিভিন্ন ফুটবল ক্লাবের খেলোয়াড়রা যে রকম নিজের দল-ম্যানেজারদের সম্মতি সাপেক্ষে, সমঝোতার ভিত্তিতে অন্য দলে খেলে, এই ডিজিটাল যুগে, এসব নিয়মনীতি তো সবারই জানা, এসব কোথাও কাউকে ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না; আমিও সে রকম জাহাঙ্গির ওস্তাদের মাঠে খেলছি। মাঝে-মধ্যে মেহের ওস্তাদের কথা মনে পড়লে মনটা খুব খারাপ হয়, জ্বরজ্বর ভাব হয় শরীরে, ওস্তাদ যে আমাকে ‘অপদার্থ’ মনে করে ধার দিল, এখনও কি ওস্তাদ আমাকে ‘অপদার্থ’ই ভাবে? হয়তো তাই ভাবে, নইলে মেহের ওস্তাদ, এই, এতদিনেও আমাকে কেন ফিরিয়ে নিলো না! খেলোয়াড় ধার দিলে তো ফিরিয়ে নেওয়ার নিয়ম আছে, সুযোগ আছে; মেহের ওস্তাদ আমাকে প্রাণে বাঁচিয়েছিল, বেঁচে থাকার পথ দেখিয়েছিল, আমার একদিনের ভুলেই সে আমাকে ভুলে গেল? হয়তো দুনিয়ার নিয়মই এটা। কেউ কাউকে, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে মনে রাখে না। মনে রাখার দরকারও পড়ে না। মেহের ওস্তাদ হয়তো জানেও না, আমি এখন জাহাঙ্গির ওস্তাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড।

যাই হোক, মেহের ওস্তাদ বিয়ে করেনি, তার ঘরসংসার নাই, মালিবাগের ডেরাই তার বাড়িঘর। ডেরায় চার-পাঁচটি রুম। একটিতে ওস্তাদ নিজে থাকে, একটিতে মানিক-রতন, আরেকটিতে আমি আর সুরুজ থাকতাম। বাকিগুলোতে লাইনে নতুন যারা আসে, তারাই থাকে। জাহাঙ্গির ওস্তাদের বউ-বাচ্চা আছে। গেন্ডারিয়া ঘুণ্টিঘর বস্তিতে থাকে। আমরা যারা তার সাথে আছি, বস্তিতে আমাদেরকেও ঘর নিয়ে দিয়েছে…।

আমি বছর-দুয়েক আগে বিয়ে করেছি। জাহাঙ্গির ওস্তাদই বিয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এই বস্তিরই মেয়ে। দশ মাসের একটা ছেলে আছে আমাদের। আমার বউটা, নিজের বউ বলে বলছি না, খুবই ভালো; বস্তিতে জন্ম হলেও জাতের মেয়ে। আমার শ্বশুর রিকশা চালায়। কামাই-রোজগার ভালোই। আমার বউ, মানে রুবি, আমার এই লাইনটা পছন্দ করে না। রিকশা চালাতে বলে। আমি রাজি হলেই আমার শ্বশুর আমাকে রিকশা কিনে দেবে। আমিও ভাবছি- কী করা যায়? কিন্তু যখনই ভাবি, লাইন ছেড়ে দেব, তখনই মেহের ওস্তাদের মুখটা মনে পড়ে; ওস্তাদ বলেছিল- রাজেশ, এই যে পথে নামলি, এই পথ তোকে কোনোদিন ছাড়বে না।

সেদিন ভোরে, ঢাকা শহরের ঘুম তখনও ভাল করে ভাঙেনি, ভোরবেলাই শিকার ধরার মোক্ষম সময়; তখন রাস্তায় লোকজন খুব কম থাকে, পুলিশও থাকে না বললেই চলে; দয়াগঞ্জ মোড়ে আমি একাই দাঁড়িয়ে ছিলাম। দুপুরবেলাও শিকার ধরার জুতসই টাইম। তখন ঢাকা শহরে ভয়াবহ জ্যাম থাকে। জ্যামে আটকাপড়া মানুষ রাগ-বিরাগ ও অস্থিরতায় ভোগে। বাইরে কোনোদিকে খেয়াল থাকে না। এই সুযোগে শিকার করে সহজেই কেটে পড়া যায়। সেদিন ঝন্টু-মন্টু-কাদের; তিন শালাই একসঙ্গে জ্বরে পড়েছিল। আমি একাই বেরিয়েছিলাম। তো, মাঝে-মধ্যে জ্বর হওয়া ভালো। বিশ্রাম নেওয়া যায়। মাসের ত্রিশ দিনই ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠতে কার ভালো লাগে? ওরা আসেনি, আমি একাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, এর আগেও বহুবার একা শিকার করেছি, কোনো সমস্যা হয়নি, রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিমের ডাল দিয়ে দাঁতন করছি, যেন কেউ শিকারি সন্দেহ করতে না-পারে।

একা একা শিকার করার সুবিধা আছে। টাকা-পয়সা যা পাওয়া যায় তার অর্ধেক মেরে দিলেই ধরে কে? টাকা পেয়েছি দুই হাজার, ওস্তাদকে বললাম- এক হাজার পেয়েছি, ওস্তাদ কিছুই করতে পারে না। আমাকে বিশ্বাস করতেই হবে। ইচ্ছে করলে রোজগারের পুরো টাকাটাও মেরে দেওয়া যায়। ওস্তাদকে বললেই হলো- শিকার পাইনি। ওস্তাদ হয়তো ভেতরে ভেতরে রাগে গুইসাপের মতো ফুলে উঠবে, কিন্তু করতে পারবে না কিছুই। আমি একবার একটি শিকারের পুরো টাকাই মেরে দিয়েছিলাম। দশ হাজার। সেদিন আমার ‘শহিদে কারবালা’ যাত্রাপালার সিমারের একটা সংলাপ বারবার মনে পড়ছিল। ছোটবেলায় আমাদের গ্রামেই এই পালা দেখেছিলাম। সিমার ইমাম হোসেনের মুণ্ডু কেটে বর্শার মাথায় গেঁথে দামেস্কের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। খুব দ্রুত হাঁটছে আর চিৎকার করে বলছে- ‘একাই মারিয়াছি, একাই কাটিয়াছি, একাই পাইবো লক্ষ টাকা…।’

আমাদের টার্গেট থাকে গ্রাম থেকে আসা লঞ্চ বা বাসযাত্রী। সুযোগমতো মহিলা পেলে তো পোয়াবারো। একে তো গেঁয়ো-মানুষ, তদুপরি মহিলা- শিকার ফসকে যাওয়ার কোনো ভয় থাকে না।

সেদিন মহিলার রিকশাটি আসতে দেখেই বুঝতে পারি- আমার চোখ বড় হতে শুরু করেছে…।

এই যে শিকার দেখলেই আমার চোখ ছোট-বড় হয়, চোখের রঙবদল ঘটে; মেহের ওস্তাদের কাছে থাকতে এটা কিন্তু আমি বুঝতে পারতাম না। জাহাঙ্গির ওস্তাদের কাছে আসার পর বুঝতে শিখেছি। ওস্তাদই শিখিয়েছে।

জাহাঙ্গির ওস্তাদ আমার চোখ দেখেই আমাকে ধারে এনেছিল। ওস্তাদ আমার চোখে কী দেখেছিল, কে জানে! আমি তো প্রতিদিনই, দিনে অন্তত দু’বার আয়নায় নিজের মুখমণ্ডল দেখতাম। মুখমণ্ডলে সাঁটানো আছে একজোড়া সাধারণ চোখ। খুব ছোটও না, খুব বড়ও না। তবে জাহাঙ্গির ওস্তাদ কী দেখেছে আমার চোখে? ভোরে কি দুপুরে রাস্তায় দাঁড়াই, দিনের বাকি সময় ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিই। কোনো কোনোদিন এমন হয়- দিনে ঘুমাতে গেছি, শুয়ে আছি বিছানায়, ঘুম আসছে না, তখন একটা ভাবনা জাগে মনে- আমার চোখে আমি নিজে তো কোনো বিশেষত্ব দেখি না, ওস্তাদ কী দেখল? একদিন জিজ্ঞেস করতে হবে…।

মহিলার রিকশা এগিয়ে আসছিল, আমার চোখও টেপা মাছের চোখের মতো বড় হচ্ছিল। মহিলার ভ্যানিটি ব্যাগে অনেক টাকা- আমি দূর থেকেও যেন দেখছিলাম। এই হলো গিয়ে আমার চোখের বিশেষত্ব- কার ব্যাগে কম টাকা, কার ব্যাগে বেশি টাকা, দূর থেকেই আমি দেখতে পাই…।

রিকশা আমার কাছাকাছি আসতেই, চলন্ত অবস্থায়ই আমি ছোঁ মেরে মহিলার ভ্যানিটি ব্যাগ কেড়ে নিই। ব্যাগ কেড়ে নেওয়ার সময় বুঝতে পারি, মহিলার কোল থেকে কিছু একটা ছিটকে পড়ল; কিন্তু কী ছিটকে পড়ল তা দেখার জন্য পেছন দিকে ফিরে তাকানোর তখন সময় ছিল না আমার। আমি এক দৌড়ে গলির ভেতর ঢুকে পড়ি…।

চার

ডিবির যে দারোগা আমাকে আটক করে, নাছিম দারোগা; সে আমার পূর্বপরিচিত। এর আগেও কয়েকবার আমাকে আটক করেছে, গণপিটুনি থেকে বাঁচিয়েছে। নাছিম দারোগা বলল, ‘এটা তুই কী করেছিস রাজেশ? বাচ্চাটি মারা গেছে…।’

বাচ্চাটি মারা গেছে মানে? কোন বাচ্চা…?

পরশু ভোরে দয়াগঞ্জ মোড়ে এক মহিলার ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিলি না…?

নিয়েছিলাম তো…।

মহিলার কোলে দশ মাসের একটা বাচ্চা ছিল। ছেলে বাচ্চা। তুই মহিলার ব্যাগ ধরে টান দিয়েছিস, তোর হ্যাঁচকা টানে মহিলাও পড়ে যাচ্ছিল, তখন ওর কোল থেকে বাচ্চাটা রাস্তার ওপর ছিটকে পড়ে। মাথা ফেটে মগজ বেরিয়ে গেছিল। ওইদিন দুপুরেই মারা গেছে…।

আমার হাতে হাতকড়া। রুবি কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। ওর কোলে আমাদের দশ মাসের ছেলে বাচ্চাÑ আরাফাত। নাছিম দারোগার কথা শুনে আমার চোখে জল এসে গেছে। আমার মনে হচ্ছিলÑ আমি একটা মহা খুনি, দশ মাসের নিষ্পাপ এক শিশুকে খুন করেছি, শিশুটি যদি আমার আরাফাত হতো…!

আমি লোহার ভারী হাতকড়াসহ আমার দু’হাত যেই না আরাফাতের মাথার ওপর তুলেছি, নিজের ছেলেকে মেরে ফেলবো, দেখব- তখন আমার কেমন লাগে; নাছিম দারোগা টেনেহিঁচড়ে আমাকে পুলিশভ্যানে তুলে ফেলল। আমি দ্বিতীয় খুনটা করতে পারলাম না…!

পাঁচ

আমি গোয়ালখালি শ্বশুরবাড়ি থাকি। ঘরজামাই। আমি নিজেও জানি, এই দুনিয়ার কি এই দেশের যারা ঘরজামাই হিসেবে জীবনযাপন করে, তারাও সবাই জানে- ঘরজামাই থাকার কী কষ্ট, কী যন্ত্রণা! ঘরজামাই বুড়ো গরুর মতো, মাঠেও দাম নাই, হাটেও দাম নাই; তারপরও, যেমন আমি থাকি, আমার মতো আরও অনেকেই ঘরজামাই থাকে; বোধকরি এটাকেই বলে নিয়তি, যা না করে তখন আর কোনো উপায় থাকে না…।

বলতে দ্বিধা নাই, শরম-লজ্জাও নাই; আমিও নিয়তির ওপর ভর করে, মানে বাধ্য হয়েই শ্বশুরবাড়িতে আছি; ঘরজামাই হিসেবে থাকছি। বউ যদি ছাগলের মতো খুঁটি ধরে, শ্বশুরবাড়িতে যাবে না; শ্বশুরবাড়ি তার কাছে অসহ্য, বিষ খাওয়ার মতো; কেন, তা জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তরও করে না, কথা একটাই- শ্বশুরবাড়ি যাবে না; তখন আমার আর করার কী থাকে, বউয়ের জেদের কাছে আত্মসমর্পণ করতেই হয়; অনেকেই এরকম আত্মসমর্পণ করে; আমিও বউয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করে শ্বশুরবাড়িতে থেকে যাই…।

আমার নাম শাহজালাল, সিলেটের পীর-বাবা শাহজালালের নামেই মা-বাবা আমার নাম রেখেছিল কিনা জানি না, তবে আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন, মানে, আমার শ্বশুর-শাশুড়ি, দুই সম্বন্ধি, সম্বন্ধিদের বউ, আমার জেঠাস; শ্বশুরবাড়ির কাছাকাছি যারা বয়োজ্যেষ্ঠ, সবাই আমাকে জালাল বলে ডাকে। শাহজালাল আর জালালের মধ্যে ঢের প্রভেদ, তারপরও যারা আমাকে জালাল নামে ডাকে, সবার ডাকেই আমি সাড়া দিই…।

আমি নিজে, কবুল করতে সংকোচ নাই; ভাদাইমাগোছের মানুষ। কামকাজ করে খেতে ভালো লাগে না। বিয়ের আগে বাবার হোটেলে খেয়েছি, ইয়ার-দোস্তদের সঙ্গে গুলতানি মেরে দিন গুজরান করেছি। বিয়ের পরে শ্বশুরের হোটেলে খেতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু বউয়ের তাপিসে কাজে নামতে বাধ্য হই। গোয়ালখালি বাসস্ট্যান্ডে ফুটপাতে বসে শাকসবজি বেচি। আমার বউ সেহেনাই পুঁজি জোগাড় করে দিয়েছে। দুই হাজার টাকা হাতে দিয়ে বলেছিল- এই টাকা দিয়ে একটা কিছু করো, নইলে আমি বিষ খাব…।

বউ নিয়ে কী যে যন্ত্রণা, তা আর কী বলবো! বউ শ্বশুরবাড়ি, মানে আমাদের বাড়িতে যাবে না, আমাকেও শ্বশুরবাড়ি বসে শ্বশুরের ঘাড় মটকে খেতে দেবে না। অগত্যা খালিশপুর বড়বাজার থেকে দুই হাজার টাকার শাকসবজি কিনে গোয়ালখালি বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতে বসে পড়ি। দিন শেষে টাকা গুনে দেখি, অবাক কাণ্ড, ক্যাশে টাকা আড়াই হাজার; মানে পাঁচশ’ টাকা লাভ হয়েছে, তখনও ঝাঁকায় যে সবজি অবশিষ্ট আছে, পঞ্চাশ টাকা বিক্রি হবে…।

সেই থেকে শুরু; গোয়ালখালি বাসস্ট্যান্ডে শাকসবজি বিক্রি করছি। দিন তো একেবারে কম হয়নি; দু’বছর কেটে গেছে গত শাওনে; কেউ কেউ আমাকে সবজি জালাল নামেও ডাকে। ওই ডাক শুনে, বলতে পারব না যে, আমার খারাপ লাগে…।

বউ আমাদের বাড়িতে যায় না, তা ঠিক। কেন যায় না, এতদিনেও জানতে পারিনি। তবে বউ যে আমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে, তা বুঝি। টের পাই রাতে। বিছানায় যেতে না যেতেই বউ আমার চোখ দুটোতে চুমু খাওয়া শুরু করে…।

চোখে চুমু খায় কেন, ঠোঁট বাদ দিয়ে; যদি শুনতে চান কেউ, তবে বলি…।

আমি ভাদাইমাগোছের মানুষ, বলেছি আগে; স্বাস্থ্যও তেমন ভালো না। ঢ্যাঙ্গা শরীর। দেখতে সুপুরুষ তো নইই। তবে আমার চোখ দুটো বেশ বড়সড়। পুরুষ মানুষের এরকম বড় চোখ, আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, নজরে পড়ে কদাচিৎ। সেহেনা আমার এই চোখ দুটোর জন্যই আমাকে ভালোবাসে। রঙ করে বলে- স্বামী গো, তোমার চোখ দুটোতে চুমু খেয়ে আমার আশ মেটে না…।

অর্থাৎ, বউয়ের ভালোবাসা পেতে চোখ দুটো ছিল আমার অমূল্য সম্পদ। কিন্তু আমার এই চোখের ওপর পুলিশের চোখ পড়ল কেন, ভেবে পাই না! পুলিশ আমার চোখ দুটো উপড়ে ফেলেছে। আমি এখন অন্ধ। আমার বউ, আহারে, বেচারি এখন কোথায় চুমু খাবে…!

তখন আমি রাত নয়টা-দশটা নাগাদ শাকসবজি বেচি। রাতের বেলাও, এতদিনে বুঝে ফেলেছি, সবজির ঝাঁকা নিয়ে বসে থাকলে খদ্দের আসেই। বিক্রি-বাট্টাও ভালোই হয়। সেদিন বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছিল, রাত পৌনে ১১টার দিকে বাড়ি ফিরছিলাম। আমাদের এক বছরের একটা বাচ্চা আছে, মেয়ে বাচ্চা, বউ বলে দিছিল- বাচ্চার দুধ নাই, দুধ নিতে হবে; বেচাবিক্রি শেষ করে বাজার ঘুরে দুধ কিনতেই দেরি…।

আমার কাঁধে সবজি বিক্রির দুটো ঝাঁকা, বাঁশের বাইগ; দ্রুতপায়ে হাঁটছি; গোয়ালখালি মোড় পার হতেই একটা পুলিশভ্যান উত্তর দিক থেকে এসে আমার সামনে থামল। ভ্যান থেকে লাফিয়ে নামল চার-পাঁচজন পুলিশ। আমার ঝাঁকা-বাইগ কেড়ে নিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে দিল। আমাকে টেনেহিঁচড়ে ভ্যানে তুলে আমার হাতে হাতকড়া লাগিয়ে দিলো…।

ফুটপাতের সবজি বিক্রেতা জালালকে পুলিশে ধরবে কেন, তার হাতে হাতকড়া পরাবে কেন- তা আমার মাথায় ঢুকল না। আমি গোবেচারা মানুষ, শ্বশুরবাড়ি ঘরজামাই থাকি, ফুটপাতে সবজি বেচে খাই; কারও সাতেপাঁচে নাই, আমাকে কেন পুলিশ টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলল! হাতকড়া লাগানো হাত তুলেই হাতজোড় করে বললাম- স্যার, আমি কী দোষ করেছি, আমাকে কেন…। আমার কথা শেষ করতে দিলো না। এক পুলিশ মুখ খিঁচিয়ে বলল- চুপ থাক শালা ছিনতাইকারী। থানায় গেলেই সব বুঝবি…।

ছিনতাইকারী! গোয়ালখালি বাসস্ট্যান্ডের ‘সবজি-জালাল’ ছিনতাই করেছে? কাণ্ড দ্যাখো পুলিশের! আমি আবার বললাম- স্যার, আমি সবজি জালাল; বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতে শাকসবজি বেচি; বহু মানুষ আমাকে চেনে। আমি ছিনতাই করতে যাবো কোন দুঃখে, স্যার…?

শূকরমুখো পুলিশটা ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে বললো- চুপ থাকবি শালা। কোন দুঃখে ছিনতাই করেছিস তা তুইই ভালো জানিস…।

থানায় নিয়ে আমাকে গরাদে ভরল পুলিশ। ছোকরা মতো আরও দু’জন ছিল গরাদে। ওদের কেন ধরে এনেছে, কে জানে…!

এক পুলিশ লোহার মতো শক্ত রুল দিয়ে আমার ডান হাঁটুতে এমন জোরে বাড়ি মারল, আমি ‘ও মাগো, ও বাবাগো’ বলে চিৎকার করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লাম। লুটিয়ে পড়তেই দুই পুলিশ মিলে আমাকে চিৎ করে শুইয়ে ফেলল। এক পুলিশ বুট জুতা পরা পা দিয়ে আমার গলা চেপে ধরে বলল- মেয়েটির গলায় সোনার চেইন ছিল। চেইন বের কর। খেয়ে ফেলেছিস নাকি…?

কোন মেয়ে, স্যার? চেন কিসের…?

একটু আগেই যাত্রীছাউনির সামনে যাকে ধরেছিলি…?

সব মিথ্যা কথা স্যার। আমি সবজি জালাল। আমি ছিনতাইয়ের কিছুই জানি না…।

পুলিশটা আবার আমার গলা চেপে ধরল। এবার আরও জোরে। আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন গলায় ফাঁস দিয়েছি। এখনই মারা যাবো। পুলিশটা বলল- বাজে কথা ছাড় শালা। চেইন বের কর…।

তখন গরাদের সামনে এক লোক এলো। লুঙ্গি আর হাফ শার্ট পরা। পুলিশের লোক বলে মনে হলো না। লোকটি বলল- বাড়ির খোঁজ পেয়েছি স্যার। খবর পাঠিয়েছি। লোক এখনই এসে যাবে। কতোতে মিট করব, স্যার…?

পুলিশটা বলল- দুই লাখ…।

রাত বারোটার দিকে আমার বউ এলো। শ্বশুর এলো। পরে বউয়ের মুখে শুনেছি- ওই লোকটা পুলিশের দালাল। সে বলেছিল, ছিনতাইয়ের কেস, কোর্টে চালান দিলে বহুদিন পস্তাতে হবে। দুই লাখ টাকা দিলে থানার কাগজে রেকর্ড হবে না, আগেই ছেড়ে দেবে…।

আমার বউ বা আমার রিকশাচালক শ্বশুর দুই লাখ টাকা কোথায় পাবে? এত টাকা তারা কোনোদিন ছুঁয়ে দেখা তো দূরস্থান, চোখেও দেখেনি। আমিও দেখিনি কখনও। তারপরও তারা বিশ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিল। পুলিশ বিশ হাজার টাকায় আমাকে ছাড়তে রাজি হয়নি। আমার বউ-শ্বশুর আমাকে থানায় রেখেই ফিরে গেছিল…।

তখন কিন্তু আমার চোখ ছিল। আমি গারদের ভেতরে বসে ছিলাম। আমার বউ ফেরার পথে জল ছলছল চোখে আমার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল…।

সকালে আমার চোখ নাই। আমি তখন খুলনা মেডিকেলের গরাদে শুয়ে কাতরাচ্ছি। আমার পরনের কাপড়চোপড় রক্তে জবজব করছে…।

বউ থানা ঘুরে হাসপাতালে এসেছে। গরাদের সামনে দাঁড়িয়েই ও চিৎকার করে উঠল- ও স্বপ্নার বাপ, তোমার চোখ গেল কই…?

নাই…।

নাই মানে…?

চোখ তুলে ফেলেছে…।

কে তোমার চোখ তুলে ফেলল…?

পুলিশ…।

কেন পুলিশ তোমার চোখ তুলে ফেলল…?

ওরা টাকা চেয়েছিল দুই লাখ, তোমরা দিতে চেয়েছিলে বিশ হাজার, রাগে পুলিশের চান্দি খইভাজা বালুর মতো গরম হয়ে উঠেছিল…।

বউয়ের আর কোনো কথা শোনা গেল না। অনুমান করলাম ও জ্ঞান হারিয়ে গরাদের সামনে লুটিয়ে পড়েছে…।

ছয়

রাত দুটোর দিকে আমাকে ভৈরব নদের তীরে নিয়ে যায় পুলিশ। খালিশপুরের বুক চিরেই বয়ে গেছে ভৈরব নদ। আমার হাতে হাতকড়া তো ছিলই, পা দুটোও ওরা বেঁধে ফেলে। তারপর আমাকে চিৎ করে শুইয়ে চাকু দিয়ে তুলে ফেলে আমার চোখ দুটো। আর এখন শুনছি কী? পুলিশ বলছে- ওই লোকটা, জালাল, ছিনতাই করার সময় ধরা পড়েছিল, বিক্ষুব্ধ জনতা ওর চোখ তুলে ফেলেছে…।

 রাশেদ রহমান : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares